Feature Img

শারমিন আহমেদ -- ১তাজউদ্দীন আহমদ মনে হয় ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। তাঁর মতো করে ভবিষ্যৎ দেখতে স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে বোধহয় আর কেউ পারেননি। কিন্তু যারা ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন এবং সেই সঙ্গে ন্যায়নীতির প্রশ্নে থাকেন আপোসহীন-অবিচল, তাদেরকে, বিশেষ করে আমাদের মতো রাষ্ট্রীয় চিন্তা-ভাবনায় অনুন্নত (উন্নত চিন্তা জাতীয় অগ্রগতির মূল সোপান) দেশে বড় রকমের মাসুল দিতে হয়।

তাজউদ্দীন আহমদকেও তা দিতে হয়েছিল নানাভাবে ও শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন দিয়ে। দূরদ্রষ্টা, স্বাধীনতা যুদ্ধের সফল নেতৃত্বদানকারী ও অসাধারণ প্রশাসক তাজউদ্দীন আহমদের নীতি-উপদেশ গ্রহণ করলে বা তিনি বেঁচে থেকে কাজ করার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ আজ যে সভ্য, সুন্দর ও সফল রাষ্ট্ররূপে পরিগণিত হত তা বলাবাহুল্য। আজ বাংলাদেশকেও জ্বলতে হত না পাকিস্তান পন্থায় ধর্মের নামে চরম অধর্মপূর্ণ সহিংসতার অগ্নিকুণ্ডে। তাজউদ্দীন আহমদের কাছে সব ধর্মের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়টি ছিল তাঁর আজীবনের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের অঙ্গ।

তিনি সংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে বাংলাদেশে ধর্মের ভিত্তিতে কেউ সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত হবে না। সংখ্যালঘু হবেন সেই ব্যক্তি বা দল যিনি নির্বাচনে ভোট কম পেয়েছেন। কথাটি তিনি বেশ অনেকবারই বলেছিলেন। পত্রপত্রিকায়ও তা প্রকাশিত হয়েছিল। যেন তিনি জানতেন যে পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের উসকে দেওয়া সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি এবং ধর্মের অপব্যবহারকে স্বাধীন বাংলাদেশে রোধ করতে হলে সংখ্যালঘু এই ধারণাটিরই নতুন ব্যাখ্যা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তার চর্চার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে।

গণতন্ত্র বলতে তিনি সত্যিকারের আইনের শাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত, জনগণের জান-মাল ও অধিকার সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রব্যবস্থার কথাই বলেছিলেন। সেই ব্যবস্থাটি যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন তার খেসারত বিশেষ করে দিতে হয় সেই নাগরিকবৃন্দকে যারা ধর্ম ও জাতির ভিত্তিতে সংখ্যালঘু।

পাকিস্তান আমলে যেমন হত। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান সরকারের উসকানিতে সংঘটিত দাঙ্গায় আমাদের পাড়ায় যে হিন্দু গোয়ালা দুধ বিক্রি করত তার মাথা ফাটিয়ে তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্যরা তাকে ধরাধরি করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন।

সেই গোয়ালার মাথা যখন তাজউদ্দীন আহমদ যত্নের সঙ্গে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছিলেন, তাঁর শিশুকন্যা পাশে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর পাঠশালা হতে এক নির্মম শিক্ষা নেয়। মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘মানুষ’ পরিচিতিটি তার নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়। জাতি-ধর্মের ভিন্নতা, অবিবর্তিত ও অনালোকিত সমাজে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়েছিল এক নতুন ও বৈপ্লবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে যে সমাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভিন্নতা উদযাপিত হবে বৈচিত্র্যময় এক সম্পদ রূপে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও উপজাতির ভেদাভেদ পেরিয়ে এক বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। আমাদের সংবিধানও গঠিত হয়েছিল ওই একই চেতনা নিয়ে, যে রাষ্ট্র ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, জন্মস্থান, নারী ও পুরুষের ভিত্তিতে কারও প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। সকল ধর্মের মূলবাণীও তাই।

আমরা বাঙালিরা বহুলাংশেই স্মৃতিবিভ্রষ্ট এক জাতি। অতীতের ভুলভ্রান্তি হতে শিক্ষা গ্রহণ আমরা করি না। দেশসেবার অঙ্গীকার ভুলে যাই বলেই খুঁজে পাই না ভবিষ্যত এবং যার ফলে হাবুডুবু খেতে থাকি বর্তমানের অন্তহীন ঘূর্ণিপাকে। সাম্প্রতিককালে ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস আক্রমণ ও নির্যাতন তারই এক বেদনাদায়ক পরিণতি।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে ছোট ভাই সোহেলের নির্বাচনের সময় তা স্বচক্ষেই প্রত্যক্ষ করেছিলাম। বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা সোহেলের নির্বাচনী এলাকার হিন্দু ভোটারদের হুমকি দিয়েছিল তারা যাতে ভোটের দিন ঘর থেকে বের না হয়। সেই নির্বাচনে সোহেল জয়লাভ করলেও তার এলাকাসহ সারা দেশেই বিজয়ী বিএনপি দলের ক্যাডাররা শুরু করে তাণ্ডব এবং তাদের সহিংসতার অন্যতম টার্গেট হয় হিন্দু নাগরিকরা।

সে সময় আমি যে রাষ্ট্রের বাসিন্দা, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটে গেছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং পেন্টাগনে প্লেন হামলার মতো নৃশংস ঘটনা ও প্রায় তিন হাজার নির্দোষ নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যু। ১৯ জন প্লেন হাইজ্যাকারের মধ্যে ১৫ জনই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের মিত্র দেশ, কট্টর ও উগ্র মতাদর্শ ওয়াহাবীবাদের ধারক-বাহক সৌদি আরবের নাগরিক।

এই সকল সন্ত্রাসীদের পরিচিতি যেহেতু মুসলিম হিসেবে (যদিও সন্ত্রাসীরা কখনওই কোনো ধর্মের প্রতিনিধি নয়), সেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের ওপরেও প্রতিহিংসাস্বরূপ ঢালাওভাবে হত্যাযজ্ঞ শুরু হবার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি স্টেটে স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠা মুসলিমদের মসজিদ, স্কুল-কলেজ,ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান, বাসস্থান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার কথা ছিল, যেমনটি হয়েছিল ভারতের কট্টর হিন্দুদের বাবরী মসজিদ ভাঙার জের ধরে বাংলাদেশের নিরীহ হিন্দুদের ওপর। রাষ্ট্র তাদেরকে রক্ষা করতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের ওপর যে কোনো রকম ঝড়-ঝাপটা যায়নি বা তারা কোনো প্রকার ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি, তা নয়। কিন্তু সেই ঘটনাগুলি ছিল খুব সীমিত। মুসলিমদের লাশে যুক্তরাষ্ট্রের রাজপথ রঞ্জিত হয়নি, যেমন হয়েছিল গুজরাটের উগ্রপন্থী হিন্দুদের হাতে, যাদের সমর্থন করেছিল স্বয়ং গুজরাটেরই পুলিশ বাহিনী এবং এর পেছনে ওই রাষ্ট্রের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীর উসকানি ছিল যা অনেকেই মনে করেন।

বিশ্বজুড়েই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাদী বৈদেশিক ও দ্বিমুখী নীতি প্রচণ্ডভাবে সমালোচিত হলেও, সেই রাষ্ট্র ও সেই দেশের মূলধারার নাগরিকরা বরং সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষিতে সেদিন এগিয়ে এসেছিল সংখ্যালঘু ইসলাম ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানে। ম্যারিল্যান্ডের সিলভার স্প্রিং-এ আমার বাড়ির কাছেই, সন্ত্রাসী হামলার মাত্র তিনদিন পরে, সব মসজিদগুলিতে জুম্মার নামাজের দিন রাষ্ট্র হতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল, যাতে আমরা নিরাপদে নামাজ আদায় করতে পারি।

ম্যারিল্যান্ডের মন্টোগোমারী কাউন্টির তৎকালীন এক্সিকুটিভ ডগলাস ডানকান ও পুলিশ চিফ চার্লস মুস সেদিন প্রতিহিংসার হাত হতে মুসলিমদেরকে রক্ষার জন্য যেভাবে নিজেদেরকে নিবেদন করেছিলেন তা আজও আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমার মার্কিন বন্ধু ও প্রতিবেশিরা, যারা মুসলিম নন তারাও সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের সাহায্য ও সমর্থনে।

সোহেলের নির্বাচনের জন্য আমার ঢাকায় যাবার ফ্লাইট ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলার কারণে বাতিল হয়ে পরে নির্ধারিত হয়। সেই অনিশ্চিত সময়, ওই নির্মম হামলার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ও শান্তির পক্ষে একাত্মতা প্রদর্শনের জন্য ভার্জিনিয়ায় কর্মরত আইনজীবী তাসনীম আহমেদ ও আমিরকভিল টাউন সেন্টারে এক জনসভার পরিকল্পনা ও আয়োজন করি। সেই জনসভায় বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির শতাধিক মানুষের আগমন ঘটে।

হিজাব পরিহিত যেসব মুসলিম মহিলা চিহ্নিত হবার আশঙ্কায় ঘর থেকে বাইরে আসতে শঙ্কিত বোধ করেছিলেন তারাও সাহস করে যোগ দিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে শান্তির পক্ষে মুসলিমদের আয়োজিত এই জনসভার কথা প্রচারিত ও প্রশংসিত হয়।

বলাবাহুল্য যে আমাদের পক্ষে ওই শান্তিসভার আয়োজন সম্ভবপর হত না যদি না রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণ আমাদের পাশে এসে দাঁড়াত।

অথচ কী নিদারুণ দুঃখ ও লজ্জার ব্যাপার যে আমি যে দেশটিতে জন্মগ্রহণ করেছি এবং যে দেশটি সামাজিক ন্যায়বিচারকে উচ্চ সোপানে অধিষ্ঠিত করার জন্য লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে– সেই দেশটির সাধারণ নাগরিক, বিশেষত যারা ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত তাদের জীবন, সম্ভ্রম ও নিরাপত্তা লুণ্ঠিত হচ্ছে প্রতিদিন! সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের প্রতি সুবিচার করতে পারছে না।

সংখ্যালঘু আসলে কারা? এ নিয়ে আমি আমার অভিজ্ঞতালব্ধ একটি চিন্তার কথা তুলে ধরব। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশে এসে প্রি-নেটাল এডুকেশনের ওপর এক মাস ব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করি। সে সময় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র হতে আমার সঙ্গে আগত তিনজন ট্রেনারকে নিয়ে ঢাকার আশেপাশের এলাকাসহ সিলেটে চাবাগানের শ্রমিকদের গড়া স্কুল, শ্রমিক মা, ধাত্রী এবং স্থানীয় খাসিয়া (যাদেরকে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়) তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা-করি ভ্রুণের বিকাশ, সন্তানের জন্ম, লালনপালন, শিক্ষা ইত্যাদি সম্পর্কে।

চাবাগানের শ্রমিকরা যাদের অধিকাংশই উপজাতি তারা উঁচু পাহাড়ের ওপর চমৎকার এক স্কুল করেছেন। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের খুবই অসুবিধা হয় বৃষ্টি-বাদলের দিনে পাহাড় বেয়ে উঠতে। খুব অনিরাপদ। সমতলে স্কুল করার জন্য তারা কর্তৃপক্ষ থেকে সহযোগিতা না পেলেও তাদের লেখাপড়া শেখার উদ্যম ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর হয়নি।

শহর অঞ্চলগুলিতে সিজার করে সন্তান জন্মের সংখ্যাক্রম বর্ধিত হলেও ধাত্রী জানালেন যে গত এক বছরে নারী শ্রমিকদের একটি বাচ্চাও সিজারের মাধ্যমে ভূমিষ্ঠ হয়নি। সব বাচ্চাই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করেছে (সন্তান ও মায়ের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে সিজার সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে পরিগণিত হয়)।

খাসিয়ারা যে জায়গায় থাকেন সেখানে ঢোকার কোনো রাস্তা ছিল না। একটি নালার ওপর মরা গাছের গুঁড়ি ফেলে কোনোমতে চলাচল করা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। সরকারি কোনো স্কুলও নেই তাদের জন্য। সেখানে যেয়ে তাদের উন্নত চিন্তা ও আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়ে শ্রদ্ধাবনত হয়েছিলাম।

তারা কঠোর পরিশ্রমী। অত্যন্ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। দলাদলি করেন না। মিথ্যা বলেন না। মানুষকে ঠকান না। তারা পান-চাষের উপার্জন দিয়ে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা উঁচু ক্লাসে পড়ছে, তারা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে নিচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছে। আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম, কলেজেপড়ুয়া খাসিয়া এক তরুণ, বাচ্চাদের পড়াচ্ছিল।

আমার সহকর্মী জুডি সব দেখে এতই অভিভুত হয়ে পড়ে যে সেই তরুণের লেখাপড়ার খরচা বহনের দায়িত্ব সে তাৎক্ষণিকভাবেই নেয়। এই উপজাতিদের মতো মহৎ চিন্তাকর্মের মানুষেরা কি জাতিধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে? এই চিন্তাটি সেদিন মনে উদয় হয়েছিল।

আমার ধারণা যে মানুষ যখন সব ধর্মের মূলবাণী মনুষ্যত্বকে নিজ চিন্তা ও কর্মে লালন করেন তখন তারা প্রতিনিধি হন বিশ্বমানবতার। তারা অতিক্রম করে যান বিশেষ ধর্ম, জাতি ও উপজাতির সীমানা। তারা আর সংখ্যালঘু থাকেন না। বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশ বিশেষের অমানবিক কার্যকলাপ তাদের করে তোলে লঘু থেকে লঘুতর। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর। তারা বিশ্বমানবতার এবং বিশ্বপ্রতিপালকের দরবারে কোনো স্থানই পায় না।

বাংলাদেশ কাদের প্রতিনিধিত্ব করবে? রাষ্ট্রপরিচালনায়, দলীয় কার্যক্রমে ও জাতিগতভাবে সেই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্ব।


কোস্তারিকা, ১৬ নভেম্বর, ২০১৩


শারমিন আহমেদ :
শিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জ্যেষ্ঠ কন্যা।

শারমিন আহমদশিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জ্যেষ্ঠ কন্যা

৪৪ Responses -- “সংখ্যালঘু কারা”

  1. muhammad ali manik

    বরাবরের মত সুন্দর লেখনি৷ আরও লেখা দেখতে চাই৷ আপনার স্বর্গীয় পিতা, আমাদের সফল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক যথার্থই বলেছিলেন, “ধর্মীয় মূল্যবোধে নয়, জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতেই সংখ্যালঘু নির্ধারিত হবে”৷

    তার সঙ্গে আমি যোগ করতে চাই, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ’ বলে কিছু থাকতে পারে না। স্বাধীন বাংলাদেশে শুধুমাত্র স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিরাই বসবাস করবে৷ কেননা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির কবর রচিত হয়েছিল ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরে।

    আটলান্টায় আমরা আপনাকে খুব মিস করি। আবার কবে আসবেন?

    Reply
  2. ফরীদ আহমদ রেজা

    আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি প্রত্যেক মন্তব্যকারীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন দেখে আমি অভিভূত। আমি আপনার লেখার উদ্ধৃতি দিয়েছি ঐকমত্য প্রকাশ করার জন্যে। বাংলাদেশের খুব কম মানুষই, ধর্মপ্রাণ বা অধার্মিক নির্বিশেষে এভাবে বিষয়টা দেখে।

    ’জীবে দয়া করে যেই জন সেইজন সেবিচে ইশ্বর‘– এটা স্বামী বিবেকানন্দের কথা হলেও একই ধরনের বক্তব্য সকল ধর্মেই আছে। ধর্ম যদি মানুষকে মানুষ না করে তাহলে সে দোষ ধর্মের নয়। আমরা যারা ধর্ম নিয়ে হৈ চৈ করি (পক্ষে-বিপক্ষে) তারাই এ জন্যে দায়ী।

    জ্ঞান (যে জ্ঞানই হোক) যদি মানুষকে উন্নত মানুষে পরিণত না করে তাহলে সে জ্ঞানকে গাধার পিঠে বইয়ের বোঝার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

    আমাদের দেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সে তুলনায় জ্ঞানী মানুষ কি বাড়ছে? এর কারণ কী? শৃগালের মতো ধূর্ত এবং বাঘের মতো সাহসী কিছু দক্ষ মানুষ দিয়ে কি সুখী সমাজ গড়া যায়?

    আমাদের প্রয়োজন মানুষের।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      যথার্থ বলেছেন। মানুষের অমনুষ্যত্বর জন্য ধর্ম দায়ী নয়। দায়ী আমরা। আমরা শিক্ষিত হতে পারলেও সত্যিকারের জ্ঞানী এবং আলোকিত হতে পারিনি বলেই আজ এই অবক্ষয় সমাজ জুড়ে পরিলক্ষিত।

      Reply
  3. MozharukHoque

    আমি জানতাম না আপনি এত সুন্দর বাংলা লিখতে পারেন। লেখাটি এত সুন্দর, এত দারুণ …

    ধন্যবাদ।

    Reply
  4. Bappi

    আপনার লেখাটি আমাকে খুব ইন্সপায়ার করেছে। আপনিই খাঁটি মুসলিম। কিছু লোক আছেন যারা মুখে সবসময় ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলেন, তারাই যে খাঁটি মুসলিম তা বলা যায় না।

    আপনাকে স্যালুট। আমরা যারা সংখ্যালঘু তাদের জন্য আপনার মতো লোকদের পরামর্শ পেলেই আর কোনো বিশেষ অধিকারের দরকার হবে না।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      লেখাটি আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে জেনে খুব ভালো লাগল। পরামর্শ এবং মতামত নিতে হবে আমাদের পরস্পরের কাছ থেকে, তবেই সম্প্রীতি গড়া সম্ভবপর হবে।

      আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
  5. Clifford Gonsalves

    আপনি যেভাবে লিখেন এবং নিজের চিন্তা প্রকাশ করেন তা আমার খুব ভালো লাগে। এটা প্রশংসার যোগ্য, অসাধারণ, অনিন্দ্য, খুব প্রতিভাশালী, ধন্যবাদার্হ এং একই সঙ্গে ক্রেডিবলও বটে।

    সত্য সবসময খুবই সিম্পল যদি আপনার মনটা ঠিক থাকে এবং আপনার মনও থাকে।

    ধন্যবাদ। অপেক্ষায় থাকলাম আপনার এমন আরও লেখালেখির জন্য।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      আপনি সঠিক বলেছেন যে সত্য খুব সহজ হয় যদি মনটা আমরা সরল রাখতে পারি।

      “জীবে দয়া করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর” এই সত্যটি কত সহজ-সুন্দর অথচ আমরা কতজন তা অনুসরণ করি? আমরা প্রায় সময় সবকিছুর দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিই, কিন্তু নিজ হৃদয়ের খবর নিই না। নিজের ভুলত্রুটিগুলো নিজের কাছে উন্মুক্ত করে তুলতে আমাদের বড় দ্বিধা।

      এই অপারগতা যখন ব্যক্তি হতে সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায় তখুনি সে ভয়ংকর অবস্থা হয় যা বাংলাদেশের ভাগ্যে আজ ঘটছে।

      আপনার প্রাণঢালা মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

      Reply
  6. ফাহাদ জিতু

    আবারও অনেক কিছু জানতে পারলাম। ভালো লাগে আপনার লেখা পড়তে, অনেক ইতিহাস জানা যায় যেগুলা সত্য। প্রি-ন্যাটালে আমিও ছিলাম, সিলেট যেতে পারলে আরও অনেক কিছু জানতে পারতাম।

    আপনাকে ধন্যবাদ যে ওই রকম সেমিনার আপনি সফলভাবে করেছিলেন।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      ধন্যবাদ তোমাকেও।

      তোমাদের মতো তরুণ প্রজন্ম যত শিক্ষা, মানবতা ও নৈতিকতাবোধে উন্নত হবে ততই বাংলাদেশ খুঁজে পাবে তার গৌরব …

      Reply
  7. Nirob

    বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আর তাজউদ্দীনের বাংলাদেশ এক হলেও নির্মম সত্য হল বঙ্গবন্ধু একসময় কাছে টেনে নেন খন্দকার মোশতাককে। তারপরের বাংলাদেশ তো যা হবার কথা তা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীরা তাদের দর্শন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। ৭১-এর স্বপ্নকে ঢেকে দিয়ে নতুন স্বপ্নে আঁকিয়েছে পরাজিতরা। অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন রাষ্ট্রের সহযোগিতায় চলেছে। দেশ ছেড়ে ওদের তাড়িয়ে দেবার এক ঘৃণ্য অপপ্রয়াস। ৯০-এ গণতন্ত্র এলেও তার কমতি এতটুকু হয়নি। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প দমন করা না গেলে সংখ্যালঘুরা অত্যাচারিত হবে ভারতীয় উপমহাদেশে।

    দেশে তাজউদ্দীনের মতো আপনার এবং সোহেল তাজের উপস্থিতি খুব জরুর। আমেরিকা তার নাগরিকের সুশান্তির জন্য সব করবে। আর বাংলাদেশের একাত্তরের বৃক্ষটিকে বাঁচাতে আপনাদের নির্ভীক উপস্থিতির মুখরিত বাংলা চাই। তবেই তাজউদ্দীনের স্বপ্নের বাংলাদেশ পাব আমরা।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      আপনার সঙ্গে একমত। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মারাত্মক রাজনৈতিক ভুলের মাশুল আমরা জাতিগতভাবে আজও দিয়ে চলেছি। সেই ভুলের সুযোগটি নিয়েছে তারাই যারা পাকিস্তান-সৌদির পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মের নাম দিয়ে করছে চরম অধর্ম।

      কিন্তু এই দেশটির জন্মের সঙ্গে তো মিশে আছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ দেশকে ভালোবেসে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের সকলের রক্ত। সেই পবিত্র রক্তকে আলাদা করা কি সম্ভব? কখনওই নয়।

      দেশে আমি প্রায়ই আসি। তৃণমূলে শান্তিশিক্ষার ওপর নিভৃতে কাজ করি। আমরা যদি সুশিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত প্রজন্ম তৈরি করতে পারি তারাই হবে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নত চেতনার ধারক-বাহক।

      Reply
  8. Kibria Zahid Mamun

    বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক হত্যা মানতে পারি, পারি না একটা মানুষের হত্যা সেটা আপনার বাবা তাজউদ্দিন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র নিয়ে যখন সামান্যতম বুঝতে শিখেছি তখন থেকে আপনার বাবাকে এদেশের রাজনৈতিক পিতার আসন দিয়েছি। জাতির পিতা হবার একমাত্র যোগ্য মানুষ তিনি ছিলেন।

    আজ আমি যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে লাল সবুজের পতাকা হাতে বিলীন আকাশ ছোঁবার চেষ্টা করি তা আপনার বাবার দান। মহান আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত, আপনার বাবা, ইন্দিরা গান্ধী, ভারত চায়না সীমান্তের বরফ, ভারত রাশিয়া প্যাক্ট , এই সমীকরণগুলো না হলে হয়তো-বা আমরা আজও প্যালেস্টাইনিদের মতো ক্লান্ত এক যুদ্ধ চালিয়ে যেতাম।

    আপনার ভাই সোহেল তাজের ১০৪ ডিগ্রি জ্বর, আপনার বাবা একটি বারের জন্য ছেলেকে দেখতে যাননি কলকাতার বাসায়। নিজের কাপড় নিজে ধুয়েছেন যুদ্ধের নয়টি মাস। ইন্ডিয়ান ট্রুপস কখন বাংলা ছাড়বে, কী করে সিভিল প্রশাসন প্রতিষ্ঠা হবে সদ্যস্বাধীন দেশে, তার রূপকার ছিলেন আপনার বাবা।

    তাকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। আপনার বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো-বা আজকের বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হত। নিশা-নিনিয়ানরা এসে আমাদের নসিহত করতে পারতেন না।

    ভাল মানুষ বেঁচে থাকে না, শয়তানরা বহুদিন বাঁচে। এদেশের একজন রাজনীতিবিদের ছবি আমার অফিসে টাঙাতে ইচ্ছা করে সেটা আপনার বাবা। ভালো ছবি পেলে বাঁধিয়ে রাখব।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      ভাই কিবরিয়া জাহিদ মামুন,

      আপনি তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে যে বস্তুনিষ্ঠ কথাগুলি বলেছেন তা এই ভিন্নমার্গের রাজনীতিবিদ সম্পর্কে আপনার সুগভীর জ্ঞানেরই প্রতিফলন। ভালোবাসারও।

      রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এবং দলমতের উর্ধ্বে, সততা, মেধায় এবং ন্যায়নিষ্ঠায় এই অবিতর্কিত মানুষটির কর্মকাণ্ডকে যদি তুলে ধরা হত, তাহলে হয়তো-বা কিছুটা হলেও আজকের প্রজন্ম খুঁজে পেত নতুন আলোর পথ।

      আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ।

      Reply
      • Kibria Zahid Mamun

        শারমিন আপা ধন্যবাদ আমার লেখার উত্তর দেবার জন্য। যতদিন এই লুটেরা আওয়ামী লীগ গং ও লুটেরা বিম্পি গংরা এদেশের মসনদে থাকবে ততদিন তাজউদ্দিনকে খুঁজে নিতে হবে। খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজ, আগামী ও ভবিষ্যত যে প্রজন্মের কথাই বলেন আলোর পথ এই দেশে নিজেদের খুঁজতে হয়। রাষ্ট্র খুঁজে পেতে সাহায্য করে না।

        তাজউদ্দিন দূর নীলিমায় মিশে থাকেন। কালো মেঘের বৈতরণী পেরিয়ে তাঁকে খুঁজে পেতে হয় ….

  9. উতপল

    সন্দেহ নেই লেখকের বক্তব্য ইতিবাচক। তবে তিনিও অন্যদের মতো আমাদের ‘উপজাতি’ হিসেবে অভিহিত করলেন– এটা দুঃখজনক।

    এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      আমি দুঃখিত যে ‘উপজাতি’ উল্লেখ করায় আপনি দুঃখ পেয়েছেন। এই বিশেষণটি উল্লেখ করেছি তার প্রতি সমর্থনস্বরূপ নয়। উচ্চ মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডের মানুষেরা যে কোনো বিশেষ জাতির সীমারেখাভুক্ত নন সেটাই ছিল আমার বক্তব্যর নির্যাস …

      Reply
  10. ফরীদ আহমদ রেজা

    আমার ধারণা যে মানুষ যখন সব ধর্মের মূলবাণী মনুষ্যত্বকে নিজ চিন্তা ও কর্মে লালন করেন তখন তারা প্রতিনিধি হন বিশ্বমানবতার। তারা অতিক্রম করে যান বিশেষ ধর্ম, জাতি ও উপজাতির সীমানা। তারা আর সংখ্যালঘু থাকেন না।

    বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশবিশেষের অমানবিক কার্যকলাপ তাদের করে তোলে লঘু থেকে লঘুতর। ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর। তারা বিশ্বমানবতার এবং বিশ্বপ্রতিপালকের দরবারে কোনো স্থানই পায় না।

    চমৎকার!

    Reply
  11. Amit Mallick

    সংখ্যালঘু বলে বলে কিন্তু সংখ্যাগুরুরা সাহস নিয়ে এ সমাজে ঘৃণিত কাজ করার উৎসাহ পায়।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর বিভাজন দূর করার জন্য ব্যক্তিগত ও জাতীয় পরিসরে গণসচেতনতা ও শান্তিশিক্ষার গুরুত্ব ব্যাপক। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এই বিভেদ দূর করতে হবে।

      অন্যান্য জাতি পারলে আমরা কেন পারব না?

      Reply
  12. suman chowdhury

    সুন্দর লেখা। কিন্তু লেখাটি এর অবজেকটিভিটি হারিয়েছে যখন এতে এমন একটি দেশের প্রশংসা করা হয়েছে যেটি ভিয়েতনাম, ইরাক, লিবিয়া, সুদান ও আফগানিস্তানে ধারাবাহিকভাবে আগ্রাসন চালাচ্ছে। আবার কিউবা, ভেনিজুয়েলা, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে আগ্রাসন চলানোর চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

    কী করছে না তারা?

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      আপনার সঙ্গে একমত যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যুদ্ধ এবং আগ্রাসন বাঁধিয়ে রেখেছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ অস্ত্র রফতানিকারক এই রাষ্ট্র নির্মম যুদ্ধ-অর্থনীতির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল, একই সঙ্গে আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির।

      আমি আমার এই লেখায় উল্লেখ করেছি যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়েই প্রচণ্ড সমালোচিত তার যুদ্ধবাদী ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড পররাষ্ট্রনীতির জন্য। কিন্তু জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে তার নিজ রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য যে এই রাষ্ট্র উন্নত নিরাপত্তা প্রদান করে থাকে, বিশেষ করে ৯/১১ এর পর মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাপরায়ণতা যে খুব সীমিত ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তা-ব্যূহের জন্য– তা স্বীকার না করলে তো আমার বক্তব্য হারিয়ে ফেলত বস্তুনিষ্ঠতা।

      আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ যার সৃষ্টি হয়েছিল সাম্য ও সৌহার্দ্যের চেতনায়, সেই রাষ্ট্রে আমাদের হিন্দু নাগরিকসহ অন্যান্য ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য আমরা কি নিরাপত্তা প্রদান করতে পারছি? আমাদের সাধারণ নাগরিকদের জন্য কেন থাকবে না নিরাপত্তা এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা কেন হবেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু?

      Reply
  13. জাহিদ হোসেন

    সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা চিন্তাশীল ব্যক্তিরাই সমাজ পরিবর্তনের নিয়ামক। কলহপ্রিয় জাতির মধ্যে সে ধরনের লোক কম থাকে বলে সেটা উন্নতির রাজপথে উঠতে অনেক সময় নিয়ে থাকে। অধিকাংশ মানুষ যা বিশ্বাস করে ও পেতে চায় রাষ্ট্রব্যবস্থায় তারই প্রতিফলন দেখা যায়– তা যতই অর্বাচীন, ভ্রান্ত ও পৌরাণিক হোক না কেন।

    মূলত ঝগড়া-বিবাদপ্রিয় জাতি এই মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে সংখ্যাগুরু ও লঘুর ধারণা লালন করে থাকে। ধর্মবিশ্বাস সেই সংখ্যাগুরু ও লঘু-বিভক্তির মূল পর্দা সর্বদা টানিয়ে রাখে। সমাজের এই দুর্বল পয়েণ্টটি এক ধরনের নেতৃত্বের কায়েমী স্বার্থ প্রতিষ্ঠা রাখার একটা শক্ত সোপান।

    এই বিভক্তিটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের একটি বিরাট বাধা তা বোঝার লোক খুবই নগণ্য সংখ্যক, তাই তারা অনেক বড় প্রতিভা হলেও তাদের মূল্যায়ন হয় না। বরং এদের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডের প্রতি এক ধরনের অবমূল্যায়ন ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা চলে আসে। তখন বরং এই ধরনের লোকেরাই সংখ্যালঘু হয়ে যায় এবং মাঝে মাঝে দিতে হয় চরম মূল্য, যা তাজউদ্দীন আহমদের ক্ষেত্রে ঘটেছে।

    এই সমস্যা বিজ্ঞান ও রাজনীতি দুটির মধ্যেই আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যাপারটাকে ২+২=৪ এর মতো করে দেখিয়ে দেওয়া যায়। তাই তো কেউ বিরোধিতা করে মূর্খতার পরিচয় দিতে যায় না। রাজনীতির ক্ষেত্রে যেহেতু সে রকম কিছু প্রামাণিক দলিল দেওয়া সম্ভব নয়, তাই অধিকাংশ মানুষই তা বুঝতে পারে না। রাজনীতিতে সাধারণের মূল্যায়ন হয় প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণার উপর। সেখানে ব্যক্তিপ্রীতি, দলপ্রীতি দেশের চিরস্থায়ী শান্তিব্যবস্থার চেয়ে বেশি গৃহীত হয়ে থাকে।

    যেমন কাল দেখলাম এরশাদ বলেছেন তারা ক্ষমতায় গেলে হেফাজতের ১৩ দফা বাস্তবায়ন করবেন। এই ১৩ দফা মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি যে একেবারে ভোটের তা মনে হয় খোদ হেফাজতের নেতৃত্বই বুঝবেন। অন্যকথায় এই ১৩ দফা যে এদেশে প্রতিষ্ঠা করা এ যুগে সম্ভব নয় তা জাতীয় পার্টির সব নেতাই জানেন। এই ১৩ দফা যে আমাদের দেশের এই পর্যন্ত হওয়া সমস্ত উন্নয়নকে এক নিমিষে ধ্বংস করে দিয়ে চিরস্থায়ী অশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো তা সাদা চোখে আপাতত বোঝার উপায় অধিকাংশ জনগণের মধ্যে নেই।

    তাই এখন যদি বর্তমানের নারী নেতৃত্বের প্রতি বিরক্ত হয়ে আমাদের দেশের এই অধিকাংশ লোকেরা এরশাদকে প্রধানমন্ত্রী বানাবার ব্যবস্থা করে এবং সে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে যদি আসলেই ওই ১৩ দফা প্রতিষ্ঠা করে তখন দেশ যে একেবারে গোল্লায় যাবে তা বোঝার লোক এদেশে কজন আছে?

    সে অবস্থার মধ্যে যারা প্রাথমিকভাবে এর বিরোধিতা করবে তাদের অবস্থা তাজউদ্দীন সাহেবের মতো হবে, কারণ তখন এই বিরোধী মনোভাবাপন্ন লোকেরা হয়ে যাবে সংখ্যালঘু। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন এই ১৩ দফাবিরোধী লোকদেরকে সমাজ ঠিক বলে মেনে নিবে, যেমন আমরা তাজউদ্দীন সাহেবকে আজ মূল্যায়ন করছি।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      আপনার এই আশাবাদ “কিন্তু একটা সময় আসবে যখন এই ১৩ দফাবিরোধী লোকদেরকে সমাজ ঠিক বলে মেনে নিবে, যেমন আমরা তাজউদ্দীন সাহেবকে আজ মূল্যায়ন করছি”– সফলতা লাভ করুক এই কামনা করি।

      আপনি বর্তমানের এই অস্থিরতার সুন্দর মুল্যায়ন করেছেন।

      Reply
  14. pk

    বারবার ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করে হিন্দুদের আড়াল করার কী দরকার! আপনারা কি হিন্দু বলতে লজ্জা পান? এদেশে হিন্দুরাই সংখ্যালঘু … আর কেউ নয়।

    স্বাধীনতা যুদ্ধে হিন্দুরাই সংখ্যালঘু ছিল … এখনও … আরোপিত শব্দরাশি কিছু ঢাকতে পারে না…

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      আপনি ঠিকই বলেছেন যে হিন্দুরাই এদেশের সংখ্যালঘু। একমাত্র নয়, কিন্তু বৃহত্তম সংখ্যালঘু।

      আমার লেখার মূল কথা ছিল যে ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘুর বিভাজন হতে অতিক্রম এবং সব ধর্মের মধ্য শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা তখুনি সম্ভবপর হবে যখন আমরা মনুষ্যত্ববোধে উন্নতি সাধন করতে পারব। যা কিনা সব ধর্ম ও সভ্যতার ভিত্তি।

      আমার বিশ্বাস যে এত কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতা যাতে রক্ত দিয়েছিল হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ– সেই দেশকে এই শোষণ, নির্যাতন ও বিভাজনের অমানিশা হতে মুক্তি পেতেই হবে।

      Reply
  15. Monsur

    কোনো মানবসমাজ যদি দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র, অশিক্ষিত, যথাযথ কর্মসংস্থানহীন, নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে থাকে তবে সেই সমাজ ধীরে ধীরে ধংসপ্রাপ্ত হয়– জাতি পরিণত হয় হতদরিদ্র, কুশিক্ষিত, লোভী আর দুর্নীতিপ্রিয় এক অসভ্য সমাজে। বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়ার প্রভাব যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। এই অবস্থায় ‘কল্যণমুখী গণতন্ত্র’ তার স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারায়, শাসনব্যবস্থা পরিণত হয় সন্ত্রাসপ্রিয় নষ্ট কু-রাজনীতিবিদদের হাতিয়ারে।

    ফলে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি=সন্ত্রাসপ্রিয় নষ্ট রাজনীতিবিদ+দুর্নীতিবাজ আমলা+ লোভী ব্যবসায়ী+অনৈতিক শিক্ষক+কুশিক্ষিত লোভী বৃহৎ জনগোষ্ঠী+নির্যাতিত অসহায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

    Reply
    • Sharmin Ahmad

      ঠিকই বলেছেন। বিশেষ করে অশিক্ষা ও নৈতিকবোধের অবক্ষয় একটি সমাজকে দ্রুত পতনের দিকেই নিয়ে যায়।

      Reply
  16. ATANU HALDER

    আপনার লেখাটা তারা পড়বেই না যারা সাম্যতায় বিশ্বাসী নয়। খুবই ভালো লাগল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—