ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের ফোন ধরতাম, ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসত কলরব— খোকা, নামাজে গেলি তো?
Published : 01 Apr 2025, 10:24 AM
প্রায় এক যুগ! ঠিক এগারটি বছর হয়ে গেল প্রবাসে ঈদ পালন করছি। ২০১৫ সালে প্রথমবার দেশের বাইরে ঈদের চাঁদ উঠতে দেখেছিলাম, সাইপ্রাসের আকাশে। সেই থেকে ঈদের চাঁদ দেখা আর আনন্দের নয়, বরং এক ধরনের বাস্তবতার চিহ্নমাত্র।
ঈদ মানেই ছুটি নয়, ঈদ মানেই নতুন কাপড় নয়, ঈদ মানেই আতর মেখে বাবা-মায়ের হাত ছুঁয়ে সালাম করা নয়— এখানে ঈদ মানে আরেকটা দিনের মতোই কাজের ব্যস্ততা, কখনোবা একটু স্বস্তির শ্বাস।
প্রথম প্রথম কষ্ট হতো, খুব কষ্ট। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের ফোন ধরতাম, ওপ্রান্ত থেকে ভেসে আসত কলরব— খোকা, নামাজে গেলি তো? ছোট বোনের কচি গলায় হাসি-ঠাট্টা, বাবার গম্ভীর স্বর— সব মিলিয়ে যেন এক টুকরো বাংলাদেশ হাতের মুঠোয় চলে আসত।
কিন্তু ফোন রেখে দিলেই ফিরে আসত নিষ্প্রাণ বাস্তবতা। চারপাশে ঈদের কোনো রেশ নেই, কেউ ব্যস্ত নয় নতুন জামা কেনার তাড়নায়, কেউ উন্মুখ নয় চাঁদরাতে মেহেদির রং মেলাতে।
সাইপ্রাসে প্রথম ঈদের সকালটা ছিল ক্লান্তির এক জড়তা। তখন গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করতাম, ঈদের দিনও ছুটি মেলেনি। সাইপ্রাসে ঈদের ছুটি সাধারণত দেওয়া হয় না, কারণ এটি প্রধানত একটি খ্রিস্টানপ্রধান দেশ। দেশটির সরকারি ছুটির তালিকায় মুসলিম ধর্মীয় উৎসব অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে কিছু কোম্পানি, বিশেষ করে যেখানে মুসলিম কর্মীদের সংখ্যা বেশি, সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ছুটি মঞ্জুর করা হয়। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই ঈদ উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি নেই, তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
সাইপ্রাসে ঈদের নামাজ পড়তে হলে যেতে হতো ৪০ কিলোমিটার দূরের মসজিদে। রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যাব না, কিন্তু বন্ধুদের জোরাজুরিতে পুরোনো জামা গায়ে চাপিয়ে রওনা দিলাম।
নামাজ শেষে বন্ধুরা ঈদের দাওয়াত দিল, কিন্তু মালিকের ফোন একের পর এক বেজে উঠল। অগত্যা খালি পেটে কাজে ফিরে গেলাম। সেই প্রথম বুঝেছিলাম, প্রবাসে ঈদ মানে আলাদা কিছু নয়, এখানে ঈদ বলে কিছু হয় না। পরিবারের বাইরে ঈদের আনন্দ যেন শূন্যতার আরেক নাম।
এভাবে বছর কেটে গেল। ঈদের দিনে কাজে যাওয়া, ঈদের দিনেই কাজ শেষে বাসায় ফিরে একাকী বসে থাকা— সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল। অভ্যাসই যেন সবচেয়ে বড় বর্ম। একসময় ঈদের জন্য মন পোড়ানো বন্ধ হলো, নতুন জামার শূন্যতা অনুভব করাও বন্ধ হলো। ঈদ হয়ে গেল একটা সাধারণ দিন, কাজের ফাঁকে একটু ফোনালাপ, হয়তো রাতের খাবারে একটু ভালো কিছু রান্না করা।
এরপর ২০২০ সালের শেষের দিকে চলে এলাম সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এখানে এসে জীবন একটু সহজ হলো। ঈদের দিন অন্তত ছুটি পাই, পরিবারের সদস্যদের কাছে পেলাম। প্রথম ঈদে মনে হয়েছিল যেন দেশেই আছি— এতদিন পর ঈদের দিন প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ঈদ বেশ উৎসবমুখর হয়, বিশেষ করে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় এখানে ঈদের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। ঈদ এখানে শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে দেশের একটি বড় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।
আমিরাতে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জন্য সরকারি ছুটি থাকে। সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবীদের জন্য অন্তত তিন থেকে পাঁচ দিনের ছুটি দেওয়া হয়, যা অন্য অনেক দেশে কল্পনাতীত। ঈদের আগের দিন থেকেই বাজার, মসজিদ, শপিং মল ও রেস্টুরেন্টে সাজসজ্জা শুরু হয়।
কিন্তু বছর ঘুরতেই বুঝলাম, এ সুখও আংশিক। দেশ থেকে দূরত্ব কমলেও, ঈদের অনুভূতি আর আগের মতো নেই। তবে দেশে না থাকা মানেই ঈদের আনন্দ ম্লান? অনেকে ভাবেন, প্রবাসীরা সবাই ঈদে ভীষণ কষ্ট পায়। সত্যি বলতে, এটা পুরোপুরি সত্য নয়। যারা নতুন আসে, তাদের জন্য ঈদটা কষ্টের। কিন্তু যারা অনেকদিন ধরে আছে, তারা একধরনের অনুভূতিহীন হয়ে যায়।
কারণ ঈদ মানে অনুভূতি, আর অনুভূতির জন্ম হয় আশা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে। যদি কোনো কিছু পাওয়ার আশা না থাকে, তবে না পাওয়ার বেদনাও থাকে না। প্রবাসে ঈদের এই অনুভূতিহীনতাই এক ধরনের বেঁচে থাকা। না হলে প্রতিবার ঈদের দিনে মন খারাপ করতে করতেই জীবন ফুরিয়ে যাবে।
তাহলে প্রবাসীদের ঈদ আর দেশের ঈদের পার্থক্য কোথায়? দেশে ঈদ কেবল এক দিনের উৎসব নয়, ঈদের আগে-পরে এক উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে। পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা, চাঁদরাতের সাজসজ্জা, আত্মীয়দের বাড়িতে দাওয়াত— সব মিলিয়ে এক অন্য রকম উত্তেজনা।
আর প্রবাসে? ঈদের দিনের সকালটা হয়তো একটু ব্যতিক্রমী, কিন্তু তারপর? কেউ কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটায়, কেউ বা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়।
এখানে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। ইউরোপের প্রবাসীদের ঈদ আরও নিঃসঙ্গ, সেখানে কিছু দেশে ধর্মীয় ছুটিও মেলে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা উৎসবের আবহ থাকে। তারপরও, দেশের ঈদের মতো হতে পারে কি? এখানে কেউ চাঁদরাতে বোনের হাতের মেহেদি দেখে হাসে না, কেউ বাবা-মায়ের জন্য নতুন কাপড় কিনতে যায় না। এখানে ঈদের আগে বাড়ির উঠোনে গরু বাঁধা থাকে না, কোরবানির সকাল মানে এখানে একটুখানি ফোনকল, ভিডিও কলে দেখা—ব্যস!
প্রবাসের ঈদ হলো আমার উপলব্ধির নতুন পাঠ। এক যুগ পর ঈদের দিনে যখন জেগে উঠি, তখন অনুভব করি— এটাই আমার ঈদের বাস্তবতা। আমি আর ঈদকে উৎসব হিসেবে দেখি না, আমি দেখি এক দিনের অবসান হিসেবে। ঈদের সকালে নামাজ পড়তে যাই, ফোনে দেশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলি, তারপর কাজে বা বিশ্রামে ডুবে যাই।
কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি, কষ্ট কি সত্যিই ফুরিয়েছে? নাকি আমি শুধু অনুভূতিহীন হয়ে গেছি? আমার ঈদ এখন কেবল একটা দিন, আর কিছু নয়। কিন্তু মনের ভেতরে তখনও একটা প্রশ্ন জেগে থাকে— আমি কি ঈদ ভুলে গেছি, নাকি ঈদই আমাকে ভুলে গেছে?