অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “বিরাট আশ্বাস দেব না যেটা বাস্তবায়ন করা যাবে না। আমরা মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি এবং প্রাইভেট সেক্টরকে মাথায় রেখে বাজেট প্রণোয়ন করছি।”
Published : 25 Mar 2025, 06:10 PM
আসন্ন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব না দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার নীতি গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছে অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম-ইআরএফ।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ইআরএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাজেটপূর্ব প্রস্তুতি ও পরামর্শমূলক বৈঠক করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদসহ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা। সেখানে ইআরএফের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম দুই মেয়াদের শাসনামলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশ ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছিল। এরপর আসে মহামারী, তাতে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে যায় ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে। সবশেষ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
বৈঠকে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, “আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে মনযোগ না দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দিকে নজর দেওয়া উচিত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার কৌশল নিতে হবে।”
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজার স্থিতিশীল করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বা সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতা সাধনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনার সরবরাহ চেইনে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভাঙা ও চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
বয়স্ক, বিধবা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার পাশাপাশি বর্তমান কর্মহীন অবস্থা বিবেচনায় বেকার ভাতা চালুর পরামর্শ দেয় ইআরএফ।
সংগঠনের প্রস্তাবে আরও বলা হয়, কোন খাতে কতটা সংস্কার হবে এবং অর্থনীতি ও জনজীবনে এর কী প্রভাব পড়বে এর সুস্পষ্ট ধারণা কেউ করতে পারছেন না। সংস্কার পদক্ষেপের সম্ভাব্য প্রভাব কী, তা বাজেট বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আইএমএফের ঋণ না পেলে এডিবি, বিশ্ব ব্যাংক ঋণ সংকোচন করবে কি না সেক্ষেত্রে জ্বালানির আমদানি মূল্য পরিশোধ ও আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ কীভাবে হবে সেটা জানালে ভালো হয়।
এবারের বাজেটে সম্পদ কর চালুর পরামর্শ দিয়ে মালা বলেন, “আমাদের দেশে এখনও প্রপার্টি ট্যাক্স চালু নেই। কারণ ভ্যালুয়েশন পদ্ধতি নেই। পৃথক কোনো ভ্যালুয়েশন কর্তৃপক্ষ গঠন করে প্রপার্টি ট্যাক্স আদায় শুরু করা যেতে পারে।”
বড় অংকের ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোকে এনবিআর তথ্য বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দিয়ে ইআরএফের প্রস্তাবে বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে ড্রাইভার, দারোয়ান, অফিস সহায়কসহ বিভিন্ন জনের নামে ব্যবসা দেখিয়ে বড় অংকের ঋণ বের করে নিয়েছেন, টাকা পাচার করে নিয়েছেন। বড় ঋণ অনুমোদনের আগে এনবিআরের ডেটাবেইজ থেকে ব্যবসায়িক তথ্য নেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে কি না চিন্তা করবেন। এতে ঋণ জালিয়াতি কমবে এবং শূল্ক আদায় বাড়বে।
টু দ্য পয়েন্ট কথা বলব: অর্থ উপদেষ্টা
সংসদ না থাকায় এবার টেলিভিশনে বাজেট বক্তব্য প্রচার করা হবে। সেক্ষেত্রে অতীতের মতো লম্বা বক্তব্য না দিয়ে খুব সংক্ষেপে তা উপস্থাপনের কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
বৈঠকে তিনি বলেন, “বিরাট আশ্বাস দেব না যেটা বাস্তবায়ন করা যাবে না। আমরা মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি এবং প্রাইভেট সেক্টরকে মাথায় রেখে বাজেট প্রণোয়ন করছি।
“আগে আড়াইশ-তিনশ পাতা হলেও এবার ৫০ থেকে ৬০ পাতায় বাজেটের নির্জাস শেষ করব। ডাইরেক্ট, টু দ্য পয়েন্ট কথা বলব। আগের মতো ভূমিকা, অবতারণা এসব কিছু থাকবে না। বাজেটে কিছু কিছু মধ্য মেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি বিষয় থাকবে।”
এবার বাজেট উপস্থাপনের এক বছর পর তা বাস্তাবায়ন বা প্রতিফলন বিশ্লেষণ করা হবে বলে জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “বাজেটের প্রভাব কী এবার এটা আমরা একটু ইন্ডিকেইট করব, যাতে আগামী জুলাই মাসে প্রশ্ন করা যাবে যে, এই বলেছিলেন, এই হলো না কেন? তখন কারণ হিসাবে দেখা যাবে যে, হয়ত বাস্তবায়ন করা হয়নি অথবা যে টার্গেট নেওয়া হয়েছিল সেটা হয়ত ভুল ছিল। সরকারকে আরও বেশি জবাবদিহিতার মধ্যে আনার জন্য এটা করা প্রয়োজন।”
কর দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করার বিষয়ে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমি এই সেবা পেলাম না, ওই সেবা পেলাম না, এসব চিন্তা না করে সামাজিক সেবার কথা চিন্তা করে আপনারা কর দিন। আপনার বাসায় লাইটে সমস্যা হচ্ছে এজন্য কর দেবেন না বিষয়টি তা নয়। আপনার বাসায় না জ্বললে অন্য কোনো পরিবারের লাইট জ্বলবে। ট্যাক্স দেবেন দেশের মঙ্গলের জন্য। এবারও কিছু শুল্ক যৌক্তিকীকরণ করা হবে।
“ডিজিটাইজেশন করব যাতে করে মুখ দেখাদেখি না হয়। মুখ দেখাদেখি হলেই কেবল টেবিলের নিচ দিয়ে হাত নাড়াচাড়া করে।”
২০২৩-২৪: চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.২২%, চার বছরের সর্বনিম্ন