“তহন পরিবারে ছিল অভাব। একদিন খাইতে বসছি। পাতিলে ভাত শেষ। আর দুইটা দিলে পেট ভরতো। কিন্তু ভাত নাই। মা তহন কাঁদতো। তিনবেলা খাবার জুটত না। খিদার জ্বালায় কতদিন যে কাঁনছি!
লগে গেলেই খাবার পামু। তাই বাবার লগে কাজে যাইতাম। পেটের দায়ে পরের বাড়িত পেটেভাতেও কাম করছি। অভাবের মধ্যেই বড় হইছি আমি। তাই স্কুলে যাইতে পারি নাই।”

“বাবার কোন জমিজমা ছিল না। পরের বাড়িতে কাজ করতো। দশ বছর বয়স থেকে আমিও কাজে নামছি। ধানকাটা, ধান লাগনো, খেত নিড়ানো আর গরু দেখা ছিল কাজ। প্রথম প্রথম শুধু খাওয়া দিছে। পরে তিন টাকা মাইনা পাইছি। কাজের খোঁজে দূরেও চইলা গেছি। হিন্দুস্থান-পাকিস্তান যুদ্ধ চলছে। তহন ছিলাম মাগুরার শ্রীপুরে, আব্বাস শেখের বাড়িতে। মাইনা পাইতাম পনের টাকা।”

“গ্রামে তহন হাডুডু খেলতাম। হায়ারেও খেলতে গেছি। আমার কাছে আসলে কেউ ছুটতে পারত না। সবাই আমারে ‘গ্রাফি’ বলে ডাকত। নৌকার নৌঙ্গর ফেলার লোহার বাঁকানো জিনিসটারে গ্রামে গ্রাফি বলত। খেলতে গেলে কামাই হতো দশ টাকা। কাজে গেলে আরও কম পাইতাম। তাই খেলাতেই ঝোঁক ছিল। একবার খেলতে গেছি যশোরে। রাজশাহীর লগে বরিশালের খেলা। আমরা রাজশাহীর পক্ষে খেলি। অনেক মানুষ হইছিল ওইদিন। ওই খেলাটার কথা খুব মনে পড়ে।”

“মা-বাবা দু’জনই মারা যায় পাকিস্তান আমলে। অসুখ হইয়া মা বিছানায় পইরা ছিল অনেকদিন। টাকার জন্য চিকিৎসাও করাতে পারি নাই। মা মরার তিনমাসের মধ্যে বাবাও জ্বরে মইরা গেছে। আমরা তহন এতিম হইয়া যাই।”

“সমাজে তহন অভাব ছিল খুব। কারো একটা শার্ট থাকলে সেটা ধুইয়ে কাঁধে করে নিয়া যাইত। কারো অনুষ্ঠানে বাড়ির কাছাকাছি গিয়া ওই শার্ট পড়ত। একজনের শার্ট ধার নিয়া বহুজন পরছে! অভাব থাকলেও একজনের পাশে তহন আরেকজন মানুষ থাকত। এহন মানুষের অভাব নাই। কিন্তু তারপরও স্বার্থের জন্য পাগল সবাই। আরেকজনের পাশে দাঁড়ানোর সময় নাই!”

“পেটের অভাবে আনসার ট্রেনিং নিছিলাম পাকিস্তান আমলেই। আমার লগে গ্রামের গেদা, খালেক, আকবর, মুজিবর এই চারজনও ট্রেনিং নিছে। ফরিদপুর পুলিশ লাইনে ট্রেনিং হয় তিন মাস। রাইফেল চালানো শিখি ওখানেই। ফরিদপুর সুফি শহীদ নামে একটা রোড আছে। ওই সুফি সাহেবরে মাইরা ফেলে মুসলিম লীগের সোবহান মোল্লা। তহন সোবহান মোল্লার বাড়ি পুড়ায়া দিছিল গ্রামবাসী। আনসার হিসেবে ওই বাড়ি পাহাড়ার ডিউটি করছিলাম সাতদিন।”

“দেশের অবস্থা খারাপ হইলে পরিবারসহ চইলা যাই খুলনায়। কাজ নিই আলিম ঝুটমিলে। মিলের ১৫-২০ জনরে বাঁশের লাঠি দিয়া ট্রেনিংও করাইছি, মিলের মাঠে। পাকিস্তানিগো ট্রেনিং যে পাকিস্তানিগো বিরুদ্ধেই কাজে লাগবো আগে ভাবি নাই।”

শৈশব, কৈশোর ও যুদ্ধদিনের নানা ঘটনার কথা নিজ জবানিতে এভাবেই তুলে ধরেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. ওহাব আলী শেখ।

“আনেচ আলী শেখ ও রওশনারা বেগমের তৃতীয় সন্তান ওহাব। বাড়ি রাজবাড়ি জেলার (পূর্বে ছিল ফরিপুর জেলা) বালিয়াকান্দি উপজেলার বাকশাডাংগী গ্রামে। এক সকালে তার বাড়িতে বসেই আলাপ চলে আমাদের।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সাত মার্চের ভাষণটি ওহাব আলীরা শোনেন রেডিওতে। তার ভাষায়-

“খুলনায় আটরা বাজারে দুনিয়ার মানুষ একত্রে ওই ভাষণ শুনছি। পাকিস্তানিগো অত্যাচারগুলোর কথাই বঙ্গবন্ধুর তুলে ধরছে। তিনি বলেন, ‘… তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব-এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয়বাংলা।’ ওই ভাষণেই বুইঝা যাই কি করতে হইব। এরপরই মিলের মাঠে ট্রেনিং করাইছি।”

“আফিল, আলিম ও ইস্টার্ন- তিনটি ঝুটমিল ছিল পাশাপাশি। ইস্টার্ন ঝুটমিলের পাশেই ছিল একটি সেলুন। সেখানে এসে পাকিস্তানি সেনারা একজনকে গুলি করে হত্যা করে। ফলে থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়। ২৫ মার্চের পর ক্রমেই পাকিস্তানিদের অত্যাচার যায় বেড়ে। ওহাবরা তখন নসু সর্দারের নেতৃত্বে আফিল জুটমিলের ভেতরেই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।”

কীভাবে?
সে ইতিহাসটি শুনি তার নিজ বয়ানে। তার ভাষায়-

“নসু সর্দার সবাইরে একত্রিত করে। আফিল ঝুটমিলের সতেরটি বন্দুক ছিল ম্যানেজারের কাছে। উনি ছিলেন পাঞ্জাবি। চাবি চাইলে, চাবি দেন না। সবাই তহন ক্ষিপ্ত। আমি সুন্দরী কাঠের একটা লাঠি দিয়া তার মাথায় বাড়ি দিই। মাথা ফেটে রক্ত পড়তে থাকে। সতেরটি বন্দুক তখন হাতে। এরপরই ফুলতলা থানা লুট করি। সেখান থেকে পাই আরও ২২-২৩টি রাইফেল। শত শত মানুষ তহন রাস্তায় নামছে। ফুলতলা থানা আক্রমণ পর্যন্ত নেতৃত্ব ছিল নসু সর্দারের। এরপর যে যার মতো চলছে।”

ভিডিও: আফিল জুটমিলে নসু সর্দারের নেতৃত্বে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই

“খবর আসে যশোর থেকে আর্মিরা এদিক দিয়াই খুলনা যাবে। ওগো ঠেকাতে পাল পাড়ায় রাস্তার দুইদিকের পাটখেতে আমরা পজিশন নিই। ইপিআরের কিছু লোকও ছিল। ওরা গরুর গাড়ির ওপরে কলাগাছ কেটে বসায়া আলকাতরা দেয়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন কামাল ফিট করা। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা আসে হাজারে হাজার। তাদের সামনে দাঁড়ানো সম্ভব না। তাই তহন অস্ত্রগুলো ফেলে আমরা সরে পড়ি। ভৈরব নদী পাড় হয়ে প্রথমে বারেক নামে একজনের বাড়িতে উঠি। পরে ছোটভাইদের নিয়া খুলনা থেকে পায়ে হেঁটে সাতদিনে পৌঁছাই গ্রামে।”

গ্রামে কি তখন পাকিস্তানিরা চলে আসছে?

“না। ১৫-২০ দিন পর শুনলাম শান্তি কমিটি গঠন হইছে। গ্রামের চেয়ারম্যান হাতেম মোল্লা। উনি শান্তি কমিটিতে যোগ দিলেও মানুষের কোন ক্ষতি করে নাই। কিন্তু পাশের বিলদাহ গ্রামের শাহাদত মোল্লা ছিল পিছ কমিটির সেক্রেটারি। তার ভাই ছিল আক্তার মোল্লা। তাদের কারণে ওই গ্রামে রাজাকারও ছিল বেশি।”

“গ্রামে আওয়ামী লীগের নেতা তহন ইয়ার উদ্দিন মুন্সি, মোহন ডাক্তার আরও অনেকে। ওদের সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা ছিল। আবার আনসার ট্রেনিংও আছে। তাই ওদের টার্গেট হই। একদিন ওরা আসে বাড়িতে, আমারে খুঁজতে। আমি ঘরেই ছিলাম। চাচারে বলে- ওহাব কই? সে বলে বোনের বাড়িত। ওরা বলে- শালা আর কতদিন পালায়া থাকবো।”

এরপর কি করলেন?

ওহাব আলীর উত্তর- “যাদের আনসার ট্রেনিং ছিল তাদের সঙ্গে দেখা করে বললাম- ‘চলো মুক্তিযুদ্ধে যাই।’ কেউ রাজি হইল না। পরে একাই রওনা হই। শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়া বাজারের পাশেই ছিল আকবর স্যারের বাড়ি। উনি আকবরিয়া বাহিনী গঠন করেছেন। তার সাথে জয়েন করমু। তাই গড়াই নদী পাড় হয়ে একটা বাজারে আসি। সেখানে পাই ১৬-১৭ জনের একটা গ্রুপ। কাশেম মাষ্টার, শহর আলী, লতিফ বিশ্বাস প্রমুখ ছিলেন। ওদের সাথে যাই লাঙ্গলবাদ বাজারে। সেখান থেকে একটা স্লিপ দেওয়া হলে তা নিয়ে আসি খামারপাড়া বাজারে। ওখানে আকবর সাহেব একেকজনকে ডেকে কথা বলেন। ওটাই ছিল ইন্টারভিউ। আমাদের বাছাই করে পাঠানো হলো ক্যাম্পে। আকবর সাহেবের বাড়িটাই ছিল ক্যাম্প। বড় একটি টিনের ঘর। মেঝেতে খেজুর পাটি বিছানো। সেখানে থাকত বহু লোক।”

“রাইফেল ট্রেনিং ছিল। তাই যোগ দেওয়ার পরেই মোহাম্মদপুর থানা অপারেশন করে আমরা নয়টি অস্ত্র পাই। এসপি মাহবুব সাহেব তখন মাগুরায়। আকবর স্যারের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। তিনিই কিছু রাইফেল ও অস্ত্র দিয়েছিলেন আকবর সাহেবকে।”

“কিন্তু আকবরিয়া বাহিনীতে একটা ঝামেলা তৈরি হয়। পুলিশের ওরা তাদের নিজেদের লোকদের নামে অস্ত্র ইস্যু করে। আমরা কোনও অস্ত্র পাই না। এ নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়। তখন আকবর সাহেবই পরামর্শ দেন অস্ত্রের জন্য ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার। কাশেম, লতিফ, শহর আলীসহ আমরা রওনা হই। ছড়াতল বর্ডার পাড় হয়ে পিক আপে করে চলে যাই কল্যাণী ইয়ুথ ক্যাম্পে। ট্রেনিংয়ের জন্য নাম লেখাই সেখানেই।”

“আ স ম আব্দুর রবকে সঙ্গে নিয়ে কল্যাণী ইয়ুথ ক্যাম্পে একদিন আসেন শ্রমিক নেতা মান্নান সাহেব। উনি তখন এমএনএ ছিলেন। ওহাবসহ ১৭-১৮ জনকে হায়ার ট্রেনিংয়ের জন্য রিক্রুট করেন তারা। পরে ট্রেনে করে কৃষ্ণনগর হয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় করিমপুর ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানকার ইনচার্জ ছিলেন ক্যাপ্টেন ব্যানার্জি। ওখানে সাতদিন থাকার পর ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় বিহার চাকুলিয়ায়। ২৫০ জন করে গ্রুপ ভাগ করে ওহাবকে দেওয়া হয় ১ নম্বর উইংয়ে।

১০ জন করে এক তাঁবুতে থাকতেন তারা। ওহাব আলীর এফএফ নম্বর ছিল ৪৭৭২।

ট্রেনিং নিয়ে তিনি বলেন, “ওটা ছিল ব্রিটিশ আমালের একটা ক্যান্টনমেন্ট। পরিত্যক্ত এয়ারপোর্টের মাঠে চলত পিটি-প্যারোড। থ্রি নট থ্রি রাইফেল, স্টেনগান, এসএলআর চালানো, গ্রেনেড, ডিনামাইট নিক্ষেপ ও পেট্রোল বোমা তৈরি শিখি আটাশ দিনে। একেকদিন একেকটা অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। খুব কষ্টদায়ক ছিল রোলিং করা। কবরের মতো মাটি খুঁড়ে তার ভেতর দিয়ে রোলিং করতে দিত। মাথা তুললেই বুট দিয়ে পাড়া দেওয়া হতো। তখন মনে হতো দমটা আটকে যাচ্ছে। বাঙালি ক্যাপ্টেন মুজিবর রহমান স্যারকে পেয়েছিলাম ওখানে। ট্রেনিং শেষে চলে আসি কল্যাণীতে, আট নম্বর সেক্টরের হেড কোয়াটারে। এম এ মঞ্জুর স্যার তখন দায়িত্বে।”

“বড় একটা গ্রুপকে অস্ত্র দিয়ে দেশের ভেতর পাঠানো হলো। আমাদের বলা হলো ক্যাম্পে থাকতে। সবার মন তখন খারাপ। ক্যাম্পেই কি বসে থাকব! মঞ্জুর স্যার বুঝতে পারলেন। একদিন তিনি ডেকে এম এ আমজাদকে কমান্ডার করে আমাদের ১৭ জনকে পাঠিয়ে দেন বানপুর অপারেশনাল ক্যাম্পে। তখন বানপুর সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান।”

কোথায় কোথায় অপারেশন করেছেন?

মুক্তিযোদ্ধা ওহাব আলীর উত্তর, “বানপুর ক্যাম্পে ৩-৪টি ছেলে ছিল। বয়স ৭-৮ বছরের মতো। কেউ ডিম বেঁচত, কেউ বাদাম, কেউ পান সিগারেট। ওরা আর্মিদের ক্যাম্পগুলো রেইকি করে আসতো। ক্যাম্পে ঢুকে কয়জন আর্মি আছে, কয়জন রাজাকার, কী কী অস্ত্র আছে- এইসব খবর এনে দিত মুস্তাফিজুর রহমান স্যারকে। তার ভিত্তিতে উনি অপারেশনের পরিকল্পনা করতেন। আমরা বাংলাদেশে ঢুকতাম সন্ধ্যার পর। জায়গার নাম মনে নেই। তবে ভোরের আগেই গেরিলা অপারেশন সেরে ক্যাম্পে ফিরে আসতাম। ওই ছেলেদের তথ্য না থাকলে হয়তো অপারেশন সম্ভব হতো না। যখন মুক্তিযোদ্ধার বয়স নিয়া কথা ওঠে তখন খুব মনে পড়ে ওদের কথা। খুব রিস্ক নিয়া কাজ করেছে ওরা। ওরা তো মুক্তিযোদ্ধাই ছিল!”

এক অপারেশনে রক্তাক্ত হন মুক্তিযোদ্ধা ওহাব আলী শেখ। পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজাকারদের গুলিতে বিদ্ধ হয় তার দুই পা।

কী ঘটেছিল ওইদিন?

তার জবানিতে শুনি সেদিনের আদ্যোপান্ত ঠিক এভাবে- “১২ নভেম্বর ১৯৭১। আলমডাঙ্গা থানা আক্রমণ করা হবে। ৪টা ডিনামাইট, ৬টা এলএমজি আরও কিছু অস্ত্র দিয়ে ১১ তারিখ আমাদের ৩৬ জনকে পাঠানো হয় হালসা রেলগেইটে। থানা অপারেশনের সময় কুষ্টিয়া থেকে পাকিস্তানি সেনারা আলমডাঙ্গায় আসতে চাইলে তাদের ঠেকাতে হবে। অর্ডার ছিল ওরা আসলে ট্রেনসহ রেলগেটের ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়ার। আমরা ওখানেই পজিশনে। ১২ তারিখ বিকেল তখন ৫টা। ওরা আসলো না। হঠাৎ আমজাদ স্যারের কাছে উইড্রোর অর্ডার আসে।”

ভিডিও: ‘হালসা রেলগেইটে রাজাকারদের ছোড়া দুটি গুলি এসে লাগে আমার দুই পায়ে’

“ফেরার সময়টায় আমরা ততটা সর্তক ছিলাম না। রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু রাজাকাররা যে অ্যাম্বুস করে বসে আছে টেরই পাইনি। অ্যাম্বুসে ঢোকার আগেই ওরা ফায়ার ওপেন করে। কাঁচা রাস্তা। রাস্তার মাটি যেন ভেঙে না পড়ে সে কারণে বাঁশের বেড়া দিয়ে দুইপাশ বেধে দেওয়া। বাঁশের চোখা কঞ্চি বেরিয়ে আছে। গুলির শব্দে সবাই রাস্তার দুপাশে লাফিয়ে পড়ে। বৃষ্টির মতো গুলি চলছিল। আমিও রাস্তার পাশে লাফ দিই। কিন্তু বাঁশের কঞ্চিতে লুঙ্গিটা আটকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচের দিকে গিয়ে পা দুটি উপরের দিকে উঠে আসে। ফলে রাজাকারদের ছোঁড়া দুটো গুলি এসে লাগে আমার দুই পায়ে। ডান পায়ের গুলিটি মাংস ভেদ করে বেরিয়ে যায়। কিন্তু বাঁ পায়ের পাতার ওপরের গুলিটি ভেতরেই রয়ে যায়। রক্ত ঝরছে দু’পা দিয়েই। আমি গোঙ্গাচ্ছিলাম। সহযোদ্ধারা তখন এগিয়ে আসে। আমারে কাঁধে তুলে নিয়ে যায় বানপুর ক্যাম্পে। সেখানে বাঁ পায়ের গুলিটা বের করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয় না। পরে কল্যাণীতে নেহেরু হাসপাতালে নিয়ে গুলিটি বের করা হয়। সাতদিন চিকিৎসার পর আবার ফিরে আসি ক্যাম্পে।”

এরপর মুক্তিযোদ্ধা ওহাব আলীদের ক্লোজ করে নিয়ে আসা হয় বনগ্রামে। তখন শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। ডিসেম্বরে তারা যশোর ক্যান্টমেন্টের দিকে রওনা হয়ে প্রচণ্ড গোলাগুলির মুখে পড়েন নাবারুন বাজারে। পেছনে থাকা ইন্ডিয়ান আর্মিরা সেসময় আর্টিলারি সার্পোট দেয়। ফলে টিকতে পারে না পাকিস্তানি সেনারা। যশোর মুক্ত হলে আউট পাস নিয়ে এই বীর যোদ্ধা ফিরে যান গ্রামে। সেখান থেকে রাজবাড়িতে বিহারী ও পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পনের অপারেশনেও অংশ নেন তিনি।

অকুতোভয় দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল বলেই নয় মাসেই দেশটা স্বাধীন করা সম্ভব হয়েছে- এমন মত দেন মুক্তিযোদ্ধা ওহাব আলী শেখ। তার ভাষায়, ‘সহযোদ্ধা মন্টু মিয়া আমারে চাচা ডাকত। ফরিদপুর নগরকান্দায় মিয়াবাড়ির ছেলে সে। তার চাচার নামও ছিল ওহাব। তারেসহ ওই বাড়ির ১৮ জনকে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে মেরে ফেলে। একমাত্র জীবিত ছিল মন্টু নিজে। সে ছিল দুর্ধষ। একদিন অপারেশনে না গেলে, পাকিস্তানিদের না মারতে পারলে মন্টু পাগল হয়ে যেত। জীবনের মায়া তার ছিল না। রক্তে ছিল প্রতিশোধের আগুন। এমন যোদ্ধাদের কাছে যেকোন শক্তিই পরাজিত হতে বাধ্য।’

বঙ্গবন্ধুই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা- এমনটাই মনে করেন এই যোদ্ধা। তার প্রতি ভালবাসার এক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমি তো লেখাপড়া জানি না। কিন্তু তহন বুঝতাম আমাদের মুক্তির একমাত্র নায়ক বঙ্গবন্ধু। তার সাত মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি। দেশকে স্বাধীন করা আর বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। ট্রেনিংয়ের সময় আমরা আঠারজন মুক্তিযোদ্ধা শপথ করেছিলাম- বঙ্গবন্ধু না ফিরলে চুল কাটামু না। চুল অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল। তবুও কাটাই নাই। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে পা রেখেছেন- এই সংবাদ শুনে সেদিন কি যে ভালো লেগেছিল! ঠিক বোঝাতে পারমু না ভাই।”

১৫ অগাস্ট ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার খবর পেয়ে আবেগে মুষড়ে পড়েন এই সূর্যসন্তান। সেদিনের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হন তিনি। অতঃপর অকপটে বলেন- “বঙ্গবন্ধুরে মাইরা ফালা মানে এই দেশরে পিছিয়া দেওয়া। আমি তখন ঢাকায়। ধুপখোলা পুলিশ ফাঁড়ির পাশে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’ শ্রমিক লীগের পোস্টার লাগাইতে যাইয়া অ্যারেস্ট হইছিলাম। আঠার দিন জেলও খাটছি। আমার সাথে জেল খাটছে টাঙ্গাইলের আরশাদ নামে এক ছেলে। ছিল দুখি হাওলাদারও। বঙ্গবন্ধুর সব খুনিদের তো আমরা এখনও সাজা দিতে পারি নাই। বিদেশে পালায়া আছে কয়েকটা। এটাই দুঃখ। পলাতক খুনিদের এনে সাজা দিতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর আত্মাও শান্তি পাইব না।”

যে দেশের জন্য রক্ত দিলেন স্বপ্নের সে দেশ কি পেয়েছেন?

“অবশ্যই পাই নাই। স্বাধীনের পর খুবই অবহেলিত ছিলাম। বঙ্গবন্ধু অর্ডার দিল তোরা অস্ত্র জমা দাও। রাজবাড়িতে মিলিশিয়া ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিলাম। তিনমাস ৫০ টাকা করে ভাতাও পাই। বঙ্গবন্ধু এরপর বললেন- তোমরা যার যার কাজে ফিরে যাও। আমার বাবার তো জমিজমা নাই। কি করমু। চাচার ওখানে থাকি। আসলে মুক্তিযোদ্ধাদেরও দেশের কাজে লাগানো দরকার ছিল। চাওয়া পাওয়ার জন্য তো যুদ্ধে যাই নাই। কষ্টের জীবন থেকে যুদ্ধে গেলাম। আবার ফিরে পাইলাম কষ্টেরই জীবনে। ঢাকা শহরে আইসা এক সময় পুরান ঢাকার লোহারপুলের ঢালে রিকশাও চালাইছি। বাইন্ডিং কারাখানায়ও কাজ করছি দীর্ঘদিন। স্বাধীনের পর আমার জীবন বদলায় নাই। কিন্তু তবুও একটা দেশ তো পাইছি। এটা ভেবেই শান্তি পাই ভাই।”

স্বাধীনতার এতো বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কেন বাড়ে?

মুচকি হেসে মুক্তিযোদ্ধা ওহাব আলী অকপটে বলেন, “এ জন্য তো দায়ী আমরাই। আমার নারুয়া ইউনিয়নে ১৯৭২ সালে যারা অস্ত্র জমা দিয়েছিল সেই তালিকায় ছিল ৩৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। এখন ভাতা তোলে ৫৬ জন। যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না তাদের নামেই এখন অবজেকশন নাই। কারণ তাদের সংখ্যা এখন অনেক বেশি। তাই অভিযোগ উঠছে প্রকৃতদের বিরুদ্ধেই। এর চেয়ে দুঃখের আর কি আছে বলেন! মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই এখন একটা ব্যবসা হয়ে গেছে। সব কাগজ আছে। তবুও কয়েকদিন পর পর কেন যাচাই-বাছাই?”

স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাললাগার অনুভূতি জানতে চাই আমরা। উত্তরে এই বীর বলেন, ‘দেশের উন্নতি আর সফলতার খবরে তৃপ্ত হই। মন ভরে যায় তখন।’

খারাপ লাগে কখন?

উত্তরে খানিকটা নিরবতা। অতঃপর বুকে জমানো কষ্ট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ওহাব আলী বলেন, “আওয়ামী লীগের ছায়াতলে রাজাকারদের সন্তানদেরও যখন দেখি তখন সত্যি কষ্ট পাই। সাহাদত মোল্লা, আক্তার মোল্লার মতো রাজকারদের ভয়েই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম। একাত্তরে রাজাকাররাই আমারে রক্তাক্ত করেছিল। অথচ স্বাধীন দেশে আক্তার মোল্লার মতো রাজাকার এখনও বেঁচে আছে। তার কোন বিচার হয় নাই। বরং অনেক প্রভাবশালী হয়েছে। বর্তমান এমপি সাহেব এলাকায় আসলে ওই আক্তার মোল্লার বাড়িতে গিয়াই ওঠেন। রাজাকার সাহাদত মোল্লার ছেলে এখন আওয়ামী লীগের বড় নেতা। মোসলেমের ছেলে যুবলীগের নেতা। ওদের নিয়ে সত্য কথা বললে অনেক মুক্তিযোদ্ধারাই এখন আমার ওপর চড়াও হয়। বঙ্গবন্ধুর এমন দেশ কি আমরা চেয়েছিলাম?”

তবুও তরুণ প্রজন্মই দেশের আশা। তারাই দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত করবে দেশকে। এমনটাই মনে করেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. ওহাব আলী শেখ। তাই তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বললেন শেষ কথাটি, “তোমরা ন্যায়ের সাথে থাকো, সত্যের সাথে থাকো। ন্যায়ের পথে থাকলে দেরিতে হলেও তোমাদের ভাল হবে। বিপদে ভয়ে পেয় না। মনে রেখ, আমরা বাঙালি জাতি। বাঁশের লাঠি দিয়া পাকিস্তানিদের তাড়াইছি। অসম্ভবকে জয় করা আমাদের দ্বারাই সম্ভব।”

সংক্ষিপ্ত তথ্য
নাম : যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. ওহাব আলী শেখ।
ট্রেনিং: ২৮ দিন ট্রেনিং করেন ভারতের বিহার চাকুলিয়ায়। এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) নম্বর ৪৭৭২।
মুক্তিযুদ্ধ করেছেন : আট নম্বর সেক্টরের বানপুর সাব সেক্টরের আওতাধীন এলাকায়।
যুদ্ধাহত : ১২ নভেম্বর ১৯৭১। বিকেল ৫টার দিকে। হালসা রেলগেইট এলাকায় রাজাকারদের ছোড়া দুটি গুলি এসে লাগে তার দুই পায়ে।

ছবি ও ভিডিও: সালেক খোকন

সালেক খোকনলেখক, গবেষক।

Responses -- “যুুদ্ধাহতের ভাষ্য-৯৫: পলাতক খুনিদের সাজা দিতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর আত্মাও শান্তি পাইব না”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    রাজাকারের বাড়ীতে সংসদ সদস্যের আতিথ্য গ্রহণ??? ছি: ছি: লজ্জায় মরে যাই। কেউ কেউতো আবার রাজোকারের সঙ্গে আত্মীয়তাও করে! কি জানি আরও কত কি দেখবো এই জীবনে!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—