যতই আমার বয়স বাড়ছে আমি ততই নিজের ভিতর একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। যখন বয়স কম ছিল তখন দুনিয়ার সব বিষয়েই আমার নিজেস্ব মত ছিল। কোনটা ভুল আর কোনটা শুদ্ধ আমি সেটা একেবারে নিশ্চিতভাবে জানতাম এবং নিজের ধারণাটাকে একেবারে গলার বড়া ফুলিয়ে ঘোষণা করে অন্যদের জানিয়ে দিতাম। এখন যখন বয়স হয়েছে তখন  আবিষ্কার করছি কোনো বিষয়েই আর পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারি না। কোনো কিছুর পক্ষে যখন কেউ কিছু বলে তখন মনে হয়  এটাই ঠিক, আবার যখন বিপক্ষে কেউ যুক্তি দেয় তখন নিজের মাথা চুলকাই এবং মনে হয়, নাহ্ এটাই মনে হচ্ছে ঠিক। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সেটা নিয়ে নিজের ভেতরেই তাল গোল পাকিয়ে যায়। কয়েকটা উদাহরণ দিলে মনে হয় ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হবে।

যেমন ধরা যাক গণতন্ত্র নামের বিষয়টা। সারা জীবন শুনে এসেছি, জেনে এসেছি এবং বিশ্বাস করে এসেছি যে দেশ চালাতে হয় গণতন্ত্র দিয়ে। আমাদের পাশেই বিশাল ভারতবর্ষ কী চমৎকার গণতান্ত্রিকভাবে বছরের পর বছর চলে আসছে। সারা পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। তার পাশেই আমরা, বাংলাদেশ হওয়ার পরও জোড়াতালি দিয়ে চলছে। মাঝখানে বড় একটা সময় মিলিটারি শাসন করে দেশের বারোটা বাজিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত যখন গণতন্ত্র এসেছে তখন একটা নড়বড়ে গণতন্ত্র। এখনো নির্বাচন নিয়ে কতো রকম অভিযোগ।  যখন ভারতবর্ষের গণতন্ত্র নিয়ে তাদের হিংসা করে এসেছি তখন হঠাৎ করে নরেন্দ্র মোদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। সন্ত্রাসী হিসেবে আমেরিকায় যে মানুষটি নিষিদ্ধ ছিলেন, হঠাৎ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা সেই নিষিদ্ধ মানুষের সাথে গলাগলি করার জন্য ছোটাছুটি করতে শুরু করে দিলেন। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতবর্ষে এখন গরুর সম্মান রক্ষা করার জন্য নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে ফেলা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

আমি ভাবলাম, ঠিক আছে ভুলেভালে একবার এই দুর্ঘটনা ঘটে গেছে পরের  নির্বাচনে ভারতবর্ষের মানুষ নিজেদের ভুল শুধরে নেবে, ঠিক মানুষকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানাবে। কিসের কী? আমি অবাক হয়ে দেখলাম এবারে নরেন্দ্র মোদি আগের থেকে বেশি ভোট পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনের আসল শক্তিই হল ধর্মীয় উম্মাদনা। শুধু তাই নয় এবারে নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ প্রশাসনকে পুরোপুরি ব্যবহার এবং টাকার খেলা। গণতান্ত্রিক একটা পদ্ধতিতে একটা দেশ চোখের সামনে এভাবে পাল্টে যাচ্ছে দেখতে কেমন লাগে? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে কি জার্মানি এভাবে আস্তে আস্তে নাৎসি জার্মানি হয়ে গিয়েছিল? এতোদিন বলে এসেছি, গণতন্ত্র খুবই ভালো। আজকাল বলি, গণতন্ত্র খুবই ভালো, কিন্তু তারপর থেমে গিয়ে মাথা চুলকাই বাক্যটা কীভাবে শেষ করব বুঝতে পারি না।

সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রের মোড়ল হচ্ছে আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র সাপ্লাই করতে গিয়ে সেখানে কী অবস্থা করেছে সেটা আমরা চোখের সামনে দেখছি। খবরে দেখলাম, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিশুদ্ধ এবং পরিশীলিত করার জন্য তারা একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। এই দেশের মার্কিন কূটনীতিকদের সাথে আমার কোনোদিন দেখা হয় না, দেখা হলে জিজ্ঞেস করতাম সৌদি আরবের রাজা বাদশাহদের সরিয়ে সেখানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে তাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কীনা। পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা সমাধান নিয়ে তাদের নিজস্ব প্রস্তাব থাকে। আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে তাদের একজন কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাব সবচেয়ে চমকপ্রদ, মিয়ানামারের রাখাইন প্রদেশটি দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া। গুরুতর বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করা ঠিক না। কিন্তু এই প্রস্তাবটি শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গিয়েছিল। এই আমেরিকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার কারণে আমার জীবনে কোনো উনিশ-বিশ হয়নি, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশের অর্ধেক মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্ণ-বিদ্বেষ কিংবা পৃথিবীর সাধারণ মানুষের জন্য অপরিসীম অবজ্ঞার সাথে একমত এটা চিন্তা করে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

যাই হোক, ধরে নিই গণতন্ত্র  অনেক বড় ব্যাপার, আমার মত আদার ব্যাপারী এই বিশাল জাহাজের খবর বুঝবে না, কিন্তু আমাদের সমাজের চারপাশের দৈনন্দিন ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই বুঝতে পারব। আজকাল খবরের কাগজ মানেই হচ্ছে খুনখারাপির খবর। কতো রকম খুন দেখে আতংক হয়। কিছুদিন হল খুনের খবরের সাথে শুরু হয়েছে ধর্ষণের খবর। শুধু ধর্ষণ নয়, অনেক সময় গণধর্ষণ (ইস্ কী ভয়ংকর একটা শব্দ) সেখানেই শেষ নয় ধর্ষণ-গণধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড।  খবরের কাগজ পড়তে হলে নয়মাসের বাচ্চা থেকে শতবর্ষী বৃদ্ধাকে ধর্ষণের খবর পড়তে হয়। আজকাল ধর্ষক হিসেবে শিক্ষকেরাও এগিয়ে এসেছেন, বিশেষ করে মাদ্রাসার শিক্ষক। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা ভয়ংকর রোগে সবাই আক্রান্ত হয়ে গেছে। এই খবরগুলো পড়ে পড়ে ক্লান্ত হয়ে একবার মনে হল পৃথিবীর অন্য দেশের মানুষেরা এই সমস্যাকে কীভাবে সমাধান করে সেটা একটু দেখি। আমাদের দেশে স্কুল কলেজে ছেলেমেয়েদের ঠিক করে বড় করি না, পরিবার ছেলেমেয়েদের ঠিক করে মানুষ করতে পারে না, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক কিছু গোলমাল করে বিচার করা যায় না, শুধু তাই না বড় বড় মাস্তান এবং গড ফাদারেরা নয়ন বন্ডদের পুষে পুষে বড় করে, রাজনীতির মানুষেরা এদের ব্যবহার করে কাজেই আমাদের সমস্যার শেষ নেই। খুন ধর্ষণ যদি ভয়ংকর রোগ হয়ে থাকে তাহলে আমরা শুধু  রোগাক্রান্তদের চিকিৎসা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দক্ষ দেশগুলো নিশ্চয়ই এই রোগটি ছড়িয়ে পড়তেই দিচ্ছে না। পৃথিবীর পরিসংখ্যানে চোখ বুলাতে গিয়ে আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেছি। যে দেশগুলোর সবকিছু ঠিক করে করার ক্ষমতা আছে এবং আমার জানামতে সবকিছু ঠিকভাবে করে তাদের অনেকের পরিসংখ্যান আমাদের থেকে ভালো নয়, অনেকের পরিসংখ্যান আমাদের থেকেও খারাপ। স্ক্যান্ডিনিভিয়ান দেশগুলোর সামাজিক অবস্থা নিয়ে আমার সবসময়েই একটা উচ্চ ধারণা ছিল, পরিসংখ্যান দেখতে গিয়ে আমার সেই ধারণায় চোট খেয়ে গেল, সুইডেনে ধর্ষণের হার আমাদের দেশের ধর্ষণের হার থেকে ছয় সাত গুণ বেশি। না, তথ্যটা দেখে আমি স্বস্তি পাইনি, বরং হতবুদ্ধি হয়ে আছি, অপেক্ষা করে আছি সমাজবিজ্ঞানীরা বিষয়টা বিশ্লেষণ করে আমাকে বোঝাবেন। আমার পক্ষে  এটা বোঝার কিংবা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই। বিভ্রান্ত হয়ে আছি।

আমাদের দেশ এই দেশের স্টাইলে সমস্যাটা সমাধানের চেষ্টা করছে। সেই সমাধানের চেষ্টা করার প্রক্রিয়াটার নাম ক্রসফায়ার। ক্রসফায়ার একটা ইংরেজি শব্দ এবং ডিকশনারিতে নিশ্চয়ই তার আসল অর্থ দেওয়া আছে। আমাদের দেশে ক্রসফায়ারের অর্থ হচ্ছে অপরাধী সন্দেহে বিনা বিচারে মেরে ফেলা। এই পদ্ধতি কাজ করে কীনা আমি জানি না। শুনেছি কোনো কোনো দেশে এটা কাজ করেছে এবং সেইসব দেশ এখন খুবই আইন মেনে চলা শান্তিপূর্ণ দেশ। কিন্তু আমি অনেক খুজেঁও সে সম্পর্কে কোনো তথ্য কোথাও পাইনি। বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি ফিলিপাইনে এটা কাজ করছে না, সেখানে সাত হাজার থেকে বেশি মানুষকে মেরে ফেলেছে কিন্তু তাদের মাদকের সমস্যা মিটেছে সেরকম নিশানা নেই। আমাদের দেশে ক্রসফায়ার যথেষ্ট জনপ্রিয় পদ্ধতি বলে মনে হয়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো আজকাল বেশি উচ্চবাচ্য করে না। মনে আছে বেশ কয়েক বছর আগে একবার কক্সবাজার গিয়েছি- বিচে বসে আছি, তখন একজন কমবয়সী আর্মি অফিসারের সাথে দেখা হল। (আমি কক্সবাজার এসেছি খবর পেয়ে সে আমাকে খুজেঁ বের করেছে।) সেই কম বয়সী আর্মি অফিসার নিজে থেকেই বলল, উত্তরবঙ্গে তার পোস্টিং থাকার সময় সে একজন ভয়ংকর খারাপ মানুষকে ক্রসফায়ার করেছে (তখন এই প্রজেক্টের নাম ছিল অপারেশান ক্লিন হার্ট)। বোঝাই যাচ্ছিল ঘটনাটি তাকে বিচলিত করেছিল এবং আমার কাছে থেকে সে কোনো এক ধরনের নৈতিক সমর্থন কিংবা সান্তনা পেতে চাইছিল। আমি তাকে কোনোটাই দিতে পারিনি, তাকে বলেছিলাম একজন কখনই বিনা বিচারে অন্যজনের প্রাণ নিতে পারে না, আমরা সমাজে থাকার জন্য নিয়ম করে নিয়েছি যত খারাপই লাগুক আমরা কখনোই বিনা বিচারে হত্যা করার দায়িত্ব  নেব না। আমি এখনও এটা বিশ্বাস করি  (ক্যাম্পাসে যখন একজন আমাকে খুন করে ফেলতে চেয়েছিল, তাকে ধরে সবাই যখন পিটিয়ে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল আমি তখন তাদের থামাতে চেষ্টা করেছিলাম) তারপরও মনে হয় আজকাল যখন ভয়ংকর অপরাধীকে ক্রসফায়ার করে ফেলে তখন সেটা শুনে আগের মত বিচলিত হই না। ক্রসফায়ারের কথা শুনতে শুনতে গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। নাকী অপরাধের মাত্রা আমার যুক্তিতর্ককে আবেগ দিয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলছে বুঝতে পারি না। বিভ্রান্ত হয়ে যাই।

যতগুলো উদাহরণ দিয়েছি সবগুলো এক ধরনের জটিল উদাহরণ। আরো মাটির কাছাকাছি উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম যখন শুনেছি গ্যাসের দাম শতকরা তিরিশ ভাগ বেড়ে গেছে আমি  রীতিমত আঁতকে উঠেছি, একদফায় ত্রিশ শতাংশ? সর্বনাশ। বিষয়টা নিয়ে  অনেকদিন পর দেশে হরতাল হলো মোটামুটি উত্তপ্ত পরিবেশ। তখন হঠাৎ একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ জানালেন, দেশের মাত্র বিশ শতাংশ মানুষ সরাসরি রান্নাঘরে গ্যাস ব্যবহার করার সুযোগ পায়। আশি ভাগ মানুষের কাছ গ্যাস পৌঁছায়নি। তথ্যটুকু কতোটুকু সঠিক আমি জানি না কিন্তু যদি এটা সত্যি হয়ে থাকে তাহলে হঠাৎ করে পুরো বিষয়টাকে আমি আর একটা জাতীয় ব্যাপার ভাবতে পারছিনা। দেশের শতকরা বিশ ভাগ সুবিধাভোগী মানুষের জীবনযাত্রার জন্য আমার কী দুর্ভাবনা করায় প্রয়োজন আছে? (আমি নিজে সেই সৌভাগ্যবান বিশভাগের একজন) বাম রাজনৈতিক দল আর সরকার মিলে দেন দরবার করে কোনো একটা সমাধানে পৌছে যাক, আমি দর্শক হয়ে ব্যাপারটা দেখি, বোঝার চেষ্টা করি। (সরাসরি গ্যাস ব্যবহার না করলেও গ্যাস ব্যবহার করে যে সব কাজ কর্ম করা হয় সেই সুবিধা নিশ্চয়ই দেশের সব মানুষই ভোগ করে সেটা কতোখানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কেউ একজন নিশ্চয়ই সেই হিসাব করে বলবে তখন বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। এখন এটি আমার বোঝার ক্ষমতার বাইরে।)

আরও মাটির কাছাকাছি উদাহরণ দিই। যখন ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়া হল তখন আমার মনে হল কাজটা ঠিকই হয়েছে। ঢাকা এতো বড় একটা মেট্রোপলিটন শহর, তাকে একটা আধুনিক শহর হিসেবে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে হলে আসলেই  তো বড় বড় রাস্তা থেকে রিকশা তুলে দিতে হবে। তারপর যখন দেখলাম রিকশাওয়ালারা সব পথে নেমে এসেছে তাদের রুটি রুজি বন্ধ হওয়ার প্রতিবাদ করার জন্য তখন আমার মনে হলো, সত্যিই তো রিকশা চালানোর মত কঠিন আর  অমানবিক ব্যাপার কী হতে পারে? সেই কষ্ট করে বেঁচে থাকা মানুষের আয় উপার্জন কেন আমরা বন্ধ করতে চাইছি? তাদের জন্য সত্যিকার আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা না করে হঠাৎ করে রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার আমাদের কী অধিকার আছে? তাদের কি ঘর সংসার নেই? স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নেই? তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে যায় না? মোট কথা আমি বিভ্রান্তিতে ভুগতে শুরু করেছি।

আমার বিভ্রান্তি নিয়ে এবারে হালকা কয়েকটা উদাহরণ দিই। আমার যে সব সহকর্মী বা ছাত্রছাত্রী জাপান বা কোরিয়াতে মাস্টার্স পিএইচডি করতে গিয়েছে তারা সবাই দেশে ফিরে এসে বলেছে, ওইসব দেশে সবাইকে শুধু কাজ এবং কাজ করতে হয়,  নি:শ্বাস ফেলার সময় নেই। আমি শুনেছি এবং ভেবেছি বাহ! কী চমৎকার কাজের পরিবেশ। এতো কাজ করে বলেই তো জাতি হিসেবে তারা এতো সফল। বেঁচে থাকতে হলে তো কাজ করতেই হবে। তখন হঠাৎ একদিন দেখলাম ইউরোপের কোনো কোনো দেশ ভাবছে সপ্তাহে দুইদিন ছুটি কাটিয়ে  টানা পাঁচদিন কাজ অনেক বেশি  হয়ে যায়। সপ্তাহে চারদিন কাজ করে তিনদিন ছুটি কাটালে কেমন হয়? খবরটা পড়ে আমার মনে হলো, সত্যিই তো এই চমৎকার আইডিয়াটা আমার মাথায় কেন আসেনি? আসলেই তো, একটা মাত্র জীবন, সেটা কী শুধু কাজ করে করে কাটিয়ে দিলে হবে? যত কম কাজ করে, যত বেশি ছুটি উপভোগ করা যায় সেটাই তো ভালো।

এই হচ্ছে আমার অবস্থা। যেটাই শুনি সেটাই বিশ্বাস করে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে যাই। গত রাতে একটা খবর পড়ে আবার বিভ্রান্ত হয়ে গেছি।  সারাজীবন শুনে এসেছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়, ধোয়া কাপড় পরতে হয়। গতরাতে দেখলাম খবর বের হয়েছে জামা-কাপড় ধুতে নাই। জামা কাপড় ধুলে পরিবেশের ক্ষতি হয়। যত কম ধোয়া যায় তত ভালো। কথাগুলো হেজিপেজি পাগল-ছাগলের মুখ থেকে আসতো তাহলে সেটা হেসে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু এগুলো গরুত্বপূর্ণ মানুষের কথা। জিনসের এর প্যান্ট নির্মাতা লিভাইসয়ের সিইও বলেছেন- জিনস কখনো ধুতে হয় না। তিনি যে জিনসটা পরে আছেন  সেটা তিনি দশ বছর খেকে পরে আসছেন, একবারও ধুয়ে পরিষ্কার করেননি। খবরটা পড়ে আমার মনে হলো আসলেই তো এতোদিন শুধু শুধু কাপড় ধোয়ার পিছনে এতো সময় নষ্ট করে এসেছি। কাপড় ধুতে না হলে জীবন কতো সহজ! (আমার একশ হাতের ভেতর হয়তো কেউ আসবে না, কিন্তু  একটা বড় অর্জনের জন্য ছোট খাটো ত্যাগ তো স্বীকার করতেই হবে।)

আমি নিশ্চয়ই বোঝাতে পেরেছি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোক আর হালকা বিষয়ই হোক আমি আজকাল খুব সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যাই।

সেদিন খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে আমি মেরুদণ্ড সোজা করে বসেছি। জামায়াত সম্পর্কে বলতে গিয়ে অন্য অনক কিছুর সাথে কর্নেল অলি আহমদ বলেছেন, ‘তারা দেশ প্রেমিক লোক’। না, এবারে আমি এতোটুকু বিভ্রান্ত হইনি। আমি খুব ভালো করে জানি দেশটির নাম যদি হয় বাংলাদেশ, তাহলে তারা দেশ প্রেমিক না। লন্ডন টাইমস লিখেছিল, রক্ত যদি স্বাধীনতার মূল্য হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশ অনেক মূল্যে স্বাধীনতা কিনেছে। সেই রক্তের দাগ জামায়াত ইসলামীর হাতে লেগে আছে এবং সেটা তারা কোনাদিন মুছে ফেলতে পারবে না। তারা বাংলাদেশ চায়নি। একাত্তরে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে। বদর বাহিনী তৈরি করে দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, লেখকের হাত কেটেছে, চোখের চিকিৎসকের চোখ তুলে নিয়েছে, হৃদরোগ চিকিৎসকের বুক চিরে হৃদপিণ্ড বের করে নিয়েছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে গেছে, কিন্তু তারা একবারও নিজেদের দোষ স্বীকার করেনি। দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চায়নি। একাত্তর আমাদের কাছে পুরানো ইতিহাস নয়, একাত্তরের ইতিহাস আমাদের বুকের রক্তক্ষরণ।

আমি অনেক সহজে বিভ্রান্ত হয়ে  যাই, কিন্তু  এই একটি ব্যাপারে আমার কোনো বিভ্রান্তি নেই। কখনো ছিল না, কখনো থাকবে না।

মুহম্মদ জাফর ইকবাললেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

২০ Responses -- “বিভ্রান্ত হওয়া না হওয়া”

  1. S M Shafiul

    আল্লাহ বলেন, ৬. সূরা আনআম আয়াত ১১৬। ”(হে নবী!) তুমি যদি পৃথিবীতে বসবাসকারী অধিকাংশ লোকের কথামতো চলো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা তো সাধারণভাবে আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে আর খেয়ালখুশিমতো চলে।”
    অর্থাৎ গণতন্ত্র একটি অচল ব্যবস্থা। মূলত এটি শয়তানের যুক্তিসিদ্ধ প্রক্রিয়া। বিশ্ব শান্তির জন্য কল্যাণমুখী একনায়কতন্ত্র প্রয়োজন। আল্লাহর বিধানই সর্বোৎকৃষ্ট।

    নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের জন্য সেই নারী নিজে, তার পিতা-মাতা, ভাই, স্বামী ও চরিত্রহীন শয়তান দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পর্দা প্রথা প্রচলিত সব বড় ধর্মই বলে। বিষয়টির গুরুত্ব সর্বাধিক।

    আমাদের বর্তমান অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য দেশের সকল জেলখানাকে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রুপান্তর করতে হবে। সকল আদালত ও নিরাপত্তা বাহিনীকে নিরাপদ ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় একীভুত করে দ্রুত বিচারে এবং কঠোর সাজা ও পুণর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।

    সর্বোপরি হতাশ হওয়া যাবে না। ভাল কাজের চেষ্টা করে যেতে হবে। ফলাফল কাজের উদ্দেশ্যের উপরই নির্ভরশীল।

    Reply
  2. জাকের আহম্মদ খোকন

    জাফর ইকবাল স্যারের হেটার্সরা অনেক কিছু বলছেন। কারণ একটাই।

    “একাত্তর আমাদের কাছে পুরানো ইতিহাস নয়, একাত্তরের ইতিহাস আমাদের বুকের রক্তক্ষরণ।

    আমি অনেক সহজে বিভ্রান্ত হয়ে যাই, কিন্তু এই একটি ব্যাপারে আমার কোনো বিভ্রান্তি নেই। কখনো ছিল না, কখনো থাকবে না।”
    আমরাও আছি স্যার আপনার সাথে।

    Reply
  3. সুনীল আকাশ

    স্যার
    সালাম নেবেন। আশাকরি ভালো আছেন। আপনার লেখা পড়ে বুঝলাম আপনি বিভ্রান্ত, অনেক কিছু নিয়ে আপনি আসলেই বিভ্রান্ত নাকি সত্য স্বীকার করতে চান না? আপনার দল এখন ক্ষমতায়, প্রায় ১১ বছর ধরে ক্ষমতায়। এবার নির্বাচন কেমন হলো তা সুকৌশলে আপনি বিভ্রান্ত বলে এড়িয়ে গেলেন, অথচ এ দেশের শিশু পর্যন্ত জানে এবার নির্বাচনের মূল ঘটনা কি! পৃথিবীর অন্যতম দূর্নীতিগ্রস্থ দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকা কারা লুটপাট করে এটা নিয়ে আপনি বিভ্রান্ত, দেশের আইন শৃংখলা গত ১১ বছরেও কেন উন্নতি হয়নি এটা নিয়ে আপনি বিভ্রান্ত, দেশের বিচার বিভাগ কার ইশারায় চলে এটা নিয়ে আপনি বিভ্রান্ত। আমরা সাধারণ জনগণ কিন্তু বিভ্রান্ত না স্যার। কারণ আমরা কোন দল করি না। আমরা সব পরিস্কার দেখতে পাই।

    Reply
  4. shondhani

    এই একটি ব্যাপারে আমার কোনো বিভ্রান্তি নেই। কখনো ছিল না, কখনো থাকবে না।
    সেদিন খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে আমি মেরুদণ্ড সোজা করে বসেছি। জামায়াত সম্পর্কে বলতে গিয়ে অন্য অনক কিছুর সাথে কর্নেল অলি আহমদ বলেছেন, ‘তারা দেশ প্রেমিক লোক’। না, এবারে আমি এতোটুকু বিভ্রান্ত হইনি। লন্ডন টাইমস লিখেছিল, রক্ত যদি স্বাধীনতার মূল্য হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশ অনেক মূল্যে স্বাধীনতা কিনেছে। সেই রক্তের দাগ জামায়াত ইসলামীর হাতে লেগে আছে এবং সেটা তারা কোনাদিন মুছে ফেলতে পারবে না। তারা বাংলাদেশ চায়নি। একাত্তরে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে। বদর বাহিনী তৈরি করে দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, লেখকের হাত কেটেছে, চোখের চিকিৎসকের চোখ তুলে নিয়েছে, হৃদরোগ চিকিৎসকের বুক চিরে হৃদপিণ্ড বের করে নিয়েছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে গেছে, কিন্তু তারা একবারও নিজেদের দোষ স্বীকার করেনি। দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চায়নি। একাত্তর আমাদের কাছে পুরানো ইতিহাস নয়, একাত্তরের ইতিহাস আমাদের বুকের রক্তক্ষরণ।

    Reply
  5. হাফিজ মোহাম্মেদ

    তাদের দেশের জন্য ঠিক আছে!!!! আর ঠিক এই ভাবে যদি বাংলাদেশে ঘটে তখন কি হবে?????

    Reply
  6. Priyonti Haque

    গণতন্ত্র এমন এক সমাজব্যবস্থা যেখানে ১টি সিংহের থেকে ২টি ভেড়ার দাম বেশি।
    আমাদের দেশের গণতন্ত্র তো গত্যন্তর।
    জামায়াতের অবশ্যই ক্ষমা চাওয়া উচিত।

    Reply
  7. MD ABDULLAH AL MAMUN

    স্ক্যান্ডিনিভিয়ান দেশগুলোর সামাজিক অবস্থা নিয়ে আমার সবসময়েই একটা উচ্চ ধারণা ছিল, পরিসংখ্যান দেখতে গিয়ে আমার সেই ধারণায় চোট খেয়ে গেল, সুইডেনে ধর্ষণের হার আমাদের দেশের ধর্ষণের হার থেকে ছয় সাত গুণ বেশি- Mr. Are you drunken?

    Reply
  8. Engr Akhtarudduza

    গাড়ি ওয়ালারা একটা ভূল করে ফেলার পর এখন শুধরিয়ে নিয়ে সঠিক পথে আছেন (এটা বুঝতে পারছেন যে, রিকশা বন্ধ করতে হলে জনগনের চলাচলের জন্য অন্য কিছু জরুরী ব্যবস্থা নিতে হবে)। আশা করি এবার যানজট সমস্যা সমাধান হবে। রাস্তায় চলাচল আমাদের মৌলিক অধিকার। মোট পাঁচটি মাধ্যমের সবার অধিকার : ১-ফুটপাত দিয়ে হাটা; ২- গাড়ি বা হালকা যানবাহনে চলাচল করা; ৩- রিকশায় চড়ে চলা; ৪-বাসে চলা; ৫- ভারী যানবাহন ব্যবহার করে মালামাল পরিবহন করা। প্রধান সড়কে একসাথে সব করতে গেলে ভয়াবহ যানজটে সব অচল হয়ে যাচ্ছে তাই 25 বছর আগে থেকে দিনে লরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে ভিআইপি সড়কে রিক্সা চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পুলিশ এই কাজগুলো ভালোভাবেই করছে তারপরেও যানজট কমেনি – কারণ গাড়ি অনেক বেড়েছে মানুষ বেড়েছে। একটা দুঃখজনক ব্যাপার হল ফুটপাত বেদখল থাকায় মানুষ হাঁটতে পারছে না , অল্প দূরত্বে রিক্সা ও গাড়ি ব্যবহার করছে (ফুটপাত চালু থাকলে অন্তত কিছু গাড়ি বা রিকশা রাস্তায় কম থাকতো, ফলে যানজট কিছু কম হতো) ।
    এখন বাসযাত্রীরা স্ট্যান্ড পর্যন্ত গিয়ে বাসে না উঠে রাস্তার মাঝখানে বাস থামিয়ে উঠছে অথবা রিক্সায় গিয়ে বাসে উঠছে – এই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে যদি সবাই ফুটপাত দিয়ে দু এক কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটেন , তাতে রিকশা কমবে প্রাইভেট কারের ব্যবহারও একটু কমবে। ফলে বাসগুলো শুধু স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে বাধ্য হবে । যানজট কমতে শুরু করলেই বাসের ট্রিপ বাড়বে এবং যাত্রী পরিবহন ক্ষমতাও বাড়বে । এসব কারণে যানজট অনেক কমে যাবে । পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে রিক্সা ও প্রাইভেট কার রাস্তায় চলাচল হিসাব-নিকাশ করে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এভাবে যানজট অবশ্যই অনেক অনেক কমে যাবে । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অবগত আছেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং দেশ সেদিকেই যাচ্ছে

    Reply
  9. সৈয়দ আলি

    ১. ড. জাফর ইকবাল জামাতকে নিয়ে রাজনীতিবিদ অলি আহমেদের উধৃতি দিয়েছেন। তবে, ড. ইকবাল আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের পরামর্শ মোতাবেক, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষে বাছাবাছি না করা নিয়ে পেছন ফিরে রয়েছেন।
    ২. গনতন্ত্র নিয়ে মহান চিন্তক ড. ইকবাল ভারত সহ অনেক দেশের উদাহরণ দিয়ে পান্ডিত্য প্রদর্শন করেছেন। যদিও ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন কর্তৃক গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার প্রধানদের কারনে কেন তাঁর হাত পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে তার কোন যুক্তি দেখাননি। গনতন্ত্রের মূল কথাইতো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের মতামতভিত্তিক সরকার। যে কাউকে তারা নির্বাচিত করতে পারেন। সাথে অবশ্য ভিন্নমতাবলম্বীদের মত প্রকাশ করার অধিকার দেয়া গনতান্ত্রিক সরকারের একটি শর্ত। তবে ড. ইকবাল বাংলাদেশের ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে রাজপথে বিক্ষোভ করতে তাঁর প্রিয় বাংলাদেশ সরকারের হাজারো ইনিয়ে-বিনিয়ে বা রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে দমন করা নিয়ে চুপ রয়েছেন।
    ৩. বাংলাদেশে ধর্ষণ সমস্যা নিয়ে ড. ইকবাল বলেছেন। তবে এটি অবশ্যই বলেননি (এবং বলবেননা) যে এই সব ধর্ষণের অধিকাংশ পশ্চাতশক্তি সরকারী ক্ষমতাসীনেরা।
    সুতরাং ড. ইকবাল একজন ভীষন নিরপেক্ষ সমাজ সচেতন চিন্তক। তিনিতো তার কলাম প্রসবের পরে এর উপরে মতামত পড়েন না, তাই তাঁর পুজারীরা অধমের মতামতটি পড়ে দেখতে পারেন। ধন্যবাদ।

    Reply
  10. A failed person

    “Confusion” comes from taking too much input (misinformation) from your environment both online and offline. Best way to deal is treating everything with a ‘grain of salt’, not as truth/lie or fact/fiction. Don’t read/watch news, don’t use social media – that will help you avoid some confusion.

    There is no right or wrong answer, you can come to your own conclusion using imagination, observation and experience – that is the best answer !

    Nice cover picture, you look really confused, btw.

    Reply
  11. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    নারী নির্যাতনের সমাধান হিসাবে পশ্চিমা বিশ্ব সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধ্যানধারণাকে জোরের সাথে প্রচার করলেও, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার মিথ্যা শোগানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পশ্চিমের নারীরা হয়েছে এক অভিনব দাসত্বের শিকার। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সুপার হিট হলিউড মুভি, নামী-দামী ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপনের সাহায্যে তারা মুসলিম বিশ্বেও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করছে তাদের মুক্ত-স্বাধীন নারীদের। তাদের ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়াতে আধুনিকা নারীদের দেখলে মনে হয় জীবনের সবক্ষেত্রেই তারা প্রচন্ড রকম স্বাধীন। স্বাধীন সমাজে তাদের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, স্বাধীন পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কিংবা স্বাধীন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে।কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের শরীরের ওজন, প্রতিটি অঙ্গের মাপ, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সাজসজ্জা পর্যন্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ফ্যাশন, ডায়েট কিংবা কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রীর দ্বারা। সমাজের নির্দেশ মানতে গিয়ে তারা নিজেকে পরিণত করে সস্তা বিনোদনের পাত্রে। আর, মুক্ত-স্বাধীন হবার জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে কাঁধে তুলে নেয় জীবিকা উপার্জনের মতো কঠিন দায়িত্ব।
    পশ্চিমা পুঁজিবাদী সভ্যতা – নারী নির্যাতনের মূল কারণ:
    পুঁজিবাদ হচ্ছে মানুষের তৈরী এক জীবনব্যবস্থা, যার মূলভিত্তি ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধি। এ জীবনব্যবস্থায় মানুষের নেই কারো কাছে কোন জবাবদিহিতা। বরং রয়েছে লাগামহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ। তাই, পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত সমাজে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি আর চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মানুষ, অন্যের চাওয়া-পাওয়া, আবেগঅনুভূতি, অসহায়ত্ব এমনকি নারীকেও পরিণত করে মুনাফা হাসিলের পণ্যে। পুঁজিবাদী সমাজ নারীকে দেখে নিরেট ভোগ্যপণ্য ও মুনাফা হাসিলের উপকরণ হিসাবে। ফলে, নারী সমাজের কোন সম্মানিত সদস্য হিসাবে বিবেচিত না হয়ে, সমাজে প্রচলিত অন্যান্য পণ্যের মতোই পরিণত হয় বিকিকিনির পণ্যে। আর হীন স্বার্থ সিদ্ধির মোহে অন্ধ মানুষ নারীর দৈহিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে চালায় জমজমাট ব্যবসা। বস্তুতঃ নারীর প্রতি এ জঘণ্য দৃষ্টিভঙ্গীর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে স্বেচ্ছাচারী মানুষ শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সকল নারীকেই করে নির্যাতিত।
    মুক্ত সমাজ, মুক্ত মানুষ, মুক্ত অর্থনীতি ইত্যাদি পশ্চিমা পুঁজিবাদী জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র হলেও, মুক্ত সমাজের মুক্ত জীবনের ধারণা নারীকে মুক্তি দেয়নি বরং বহুগুনে বেড়েছে তার উপর অত্যাচার আর নির্যাতনের পরিমাণ। বাস্তবতা হলো, ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধারণা পশ্চিমা সমাজের মানুষকে ঠেলে দিয়েছে স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এক জীবনের দিকে। যেখানে স্বাধীনতার অপব্যবহারে নির্যাতিত হচ্ছে নারীসহ সমাজের অগণিত মানুষ। জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে এক মানুষের স্বাধীনতা হচ্ছে অন্য মানুষের দাসত্বের কারণ। আর, ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগে তাদের সমাজে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানী ও পারিবারিক সহিংসতাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন। এছাড়া, সীমাহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য নারীকে পরিণত করছে নিখাদ ভোগ্যপণ্যে।
    এক নজরে পশ্চিমা সমাজে নারী নির্যাতন:
    ১. ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা সমাজে মূলতঃ তাদের ফ্যাশন, ডায়েট আর কসমেটিকস্‌ ইন্ডাস্ট্রিগুলোই নির্ধারণ করে নারীর পোশাক, তার সাজ-সজ্জা, এমনকি তার দেহের প্রতিটি অঙ্গের মাপ। স্বাধীনতার মিথ্যা শ্লোগানে নারীকে তারা বাধ্য করে জঘণ্যভাবে দেহ প্রদর্শন করতে। তারপর, অর্ধনগ্ন সেইসব নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ১৯৮৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রতিবছর ৮.৯ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা অর্জন করে থাকে। আর, সমস্ত বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো বছরে অর্জন করে মাত্র ১.৫ হাজার বিলিয়ন ডলারের মুনাফা।
    অপরদিকে, নামকরা মডেল বা সুপার মডেল হতে গিয়ে নারীকে কমাতে হয় আশঙ্কাজনক পর্যায়ে তার ওজন। পরিণতিতে বন্ধ্যাত্ব, ভয়াবহ নিম্ন রক্তচাপ, অ্যানোরেক্সিয়া কিংবা বুলেমিয়ার মতো মারাত্মক রোগ হয় তার জীবনসঙ্গী।
    ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেনটাল হেলথ এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২০ জনে ১ জন নারী অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া কিংবা মারাত্মক ক্ষুধামন্দার শিকার হয়। আর প্রতিবছর ১০০০ জন মার্কিন নারী অ্যানোরেক্সিয়া রোগে মৃত্যুবরণ করে। (সূত্র: আমেরিকান অ্যানোরেক্সিয়া/বুলেমিয়া অ্যাসোসিয়েশন)। বস্তুতঃ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলোর বেঁধে দেয়া ভাইটাল স্ট্যাটিকটিকস্‌ অর্জন করতে গিয়েই পশ্চিমে অকালে ঝরে যায় এ সব নারীর জীবন।
    ২. ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি: নারী-পুরুষের লাগামহীন মেলামেশা আর প্রবৃত্তি পূরণের অবাধ স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ফলাফল স্বরূপ পশ্চিমা সমাজের নারীরা অহরহ হয় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার। এমনকি এই বিকৃত আচরণ থেকে সে সমাজের নিষ্পাপ শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায় না। নারী স্বাধীনতার অগ্রপথিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে ধর্ষিত হয় একজন নারী, আর বছরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাত লক্ষে। (সূত্র : দি আগলি ট্রু, লেখক মাইকেল প্যারেন্টি)। আর, বৃটেনে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন নারী ধর্ষিত হয় এবং মাত্র ১০০ জনের মধ্যে একজন ধর্ষক ধরা পড়ে।
    ৩. কর্মক্ষেত্রে হয়রানি: গণমাধ্যম গুলোতে নারীকে প্রতিনিয়ত সেক্স সিম্বল হিসাবে উপস্থাপন করার ফলে নারীর প্রতি সমাজের সর্বস্তরে তৈরী হয় অসম্মানজনক এক বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গী। আর বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গীর ফলাফল হিসাবে শিক্ষিত নারীরাও কর্মক্ষেত্রে তাদের পুরুষ সহকর্মীর কাছে প্রতিনিয়ত হয় যৌন হয়রানির শিকার। মিডিয়া ও সরকারী তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৪০-৬০% নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। আর ইউরোপিয়ান উইমেনস লবির প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাজ্যেও ৪০-৫০% নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়।
    ৪. পারিবারিক সহিংসতা: যে সমাজে নেই কারো কোন জবাবদিহিতা, নেই পরস্পরের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ আর সেই সাথে রয়েছে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ, সে সমাজে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতা হয় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বস্তুতঃ জীবন সম্পর্কে এ ধরণের ভয়ঙ্কর ভ্রান্তিমূলক ধারণা থেকেই বিয়ের পূর্বে বা পরে সবসময়ই পশ্চিমের নারীরা হয় তার পুরুষসঙ্গীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে একজন নারী স্বামী কর্তৃক প্রহৃত হয়। ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এর ১৯৯৮ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৯ লক্ষ ৬০ হাজার পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আর, প্রায় ৪০ লক্ষ নারী তার স্বামী অথবা বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা শারীরিকভাবে হয় নির্যাতিত।
    ৫. কুমারী মায়েদের যন্ত্রনা: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার প্রধান অসহায় শিকার হয় পশ্চিমের কুমারী অল্পবয়সী নারীরা। আনন্দের পর্ব শেষে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ সঙ্গী আর্থিক বা সামাজিক কোন দায়দায়িত্ব স্বীকার না করায় একাকী নিতে হয় তাকে অনাহুত সন্তানের দায়িত্ব। আর, অপরিণত বয়সে পর্বতসম দায়িত্ব নিয়ে গিয়ে তাকে হতে হয় ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের গুটম্যাচার ইনস্টিটিউট এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৫-১৭ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার অবিবাহিত নারী গর্ভবতী হয়।
    আর, সেদেশের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বছরে ১ লক্ষ ১৩ হাজার কিশোরী মেয়ে গর্ভধারণ করে।
    ৬. কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নির্যাতন: পশ্চিমা সভ্যতা পৃথিবীব্যাপী নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বার্তা প্রচার করলেও তাদের নিজেদের সমাজেই নারীরা প্রচন্ড বৈষ্যমের শিকার। শুধু মাত্র নারী হবার জন্য একই কাজের জন্য তাকে পুরুষের চাইতে দেয়া হয় অনেক কম অর্থ। এখন থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রে ইকুয়েল পে অ্যাক্ট আইন পাশ করলেও, এখনও ১৫ বছর ও তার উর্ধ্বে কর্মরত নারীরা একই কাজের জন্য পুরুষদের চাইতে প্রতি ডলারে ২৩ সেন্ট কম উপার্জন করে। ইউ.এস গর্ভমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস এর জরিপ থেকে দেখা যায়, সে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা বিভাগের মোট কর্মচারীর প্রায় ৭০ ভাগ নারী হলেও নারী ব্যবস্থাপকরা পুরুষের চাইতে অনেক কম অর্থ পেয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ১৯৯৫-২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের উপার্জনের এই বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বস্তুতঃ পশ্চিমের দেশগুলোতে নারীরা শুধুমাত্র দুটি পেশায় পুরুষদের চাইতে বেশী উপার্জন করে, তার একটি হচ্ছে মডেলিং আর অন্যটি হচ্ছে পতিতাবৃত্তি।
    ৭. পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা বিশ্বে নারীরা সবচাইতে জঘন্য ভাবে নির্যাতিত হয় পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে। যেখানে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মতোই নগ্ন নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত মুনাফালোভী এক চক্র। আর, এর জঘন্য শিকার হচ্ছে লক্ষ কোটি অসহায় নারী ও শিশু। শুধু নগ্ন নারী দেহকে উপজীব্য করে এই পৃথিবীতে ৫৭ বিলিয়ন ইউ.এস ডলারের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক রাজস্ব সে দেশের বহুল প্রচারিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ.বি.সি, সি.বি.এস এবং এন.বি.সি-র প্রদত্ত মোট রাজস্বের চাইতেও বেশী (৬.২ বিলিয়ন ডলার)। প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত মানুষের সীমাহীন লোভ আর চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারীতাই বিশ্বব্যাপী পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠার মূলকারণ।

    Reply
    • shochib

      I do not really understand what made it so logical to relate western openness with the recent rape scenario in Bangladesh. I have been living in North America for 8 years and I do not see this sort of cruelty in that magnitude. Rape is one thing , and killing brutally after rape, is of course something big alarming situation for Bangladesh. No matter how you justify the eastern conservative life style, We, people living in the west are far civilized and human than so called Muslims at this era. Culture of hating west or non-Muslims is a sign of intolerance that we practice in every extremist society, This rhetoric ideology is pulling us backward more. We need to check first the problem with this dogmatic social system before we criticize other. Who will believe a Muslim country,ie. Saudi Arab is a well civilized country than Sweden? House hold workers are being molested over the decades under so called religious but arrogant, brutal and uncivilized country.

      Reply
    • মোহাম্মদ মোজাম্মেল

      মানুষ নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তা করে। এরপর হচ্ছে যে সোসাইটিতে এ ধরনের কোনো কাজ করবেন, সে সোসাইটি যদি আপনাকে পুরস্কৃত না করে আরও ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দেয় তাহলে কে যাবে রক্ষা করতে? বাঁচাতে গিয়ে যদি তাকেই নিপীড়নের শিকার হতে হয়, বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, কোর্টে বারবার যেতে হয় তাহলে তো সে নিজেই আরেকভাবে ভিকটিম হয়ে যাবে। তাই এই বিষয়টিও কাজ করে এগিয়ে না আসার ক্ষেত্রে। আগে জনসভায় হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতো। কিন্তু সমাজ পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদী মানসিকতা কমে গেছে। এক ধরনের আত্মবাদী হয়ে যাচ্ছে মানুষ। উন্নত বিশ্ব কিন্তু বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এসব মানবিক কাজে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের দেশে এসব দেখা যাচ্ছে না। এখন মানবিকতা জিনিসটাই উঠে গেছে। এই ট্রানজিশনাল সোসাইটিতে এটা থাকবে না- এটাই স্বাভাবিক। তাই আমাদের সোসাইটি শেষ হয়ে গেছে যারা বলেন, তারা কিন্তু আবেগে কথাটি বলেন। একাডেমিক জায়গা থেকে যদি বলি তাহলে এটাই কিন্তু স্বাভাবিক। কারণ এসব বিষয় মানুষ প্রাইমারি লেভেলে স্যোশালাইজড হওয়ার মাধ্যমে পেয়ে থাকে। আর আমাদের সে রকম কোনো বিকল্প সামাজিক ইনস্টিটিউশনই গড়ে ওঠেনি। কাজেই সবার আগে আমাদের এই জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমরা যে অবস্থার মধ্যে আছি, সেখানে এ রকম আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। উন্নত বিশ্বের ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি যেগুলো আছে, সেসবের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানুষের এই পশু প্রবৃত্তি খুব একটা দমন করা যায়নি। আফ্রিকান যেসব ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে- হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া, মানুষকে কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড় দেওয়া, গালিগালাজ করা। এসব কিন্তু আবার ইউরোপ ও আমেরিকায় দেখা যায় না। এসবকে তারা কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হলো সামাজিকীকরণ, পরিবার, স্কুলিংসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া রাষ্ট্রের বিধান অনুযায়ী অন্যায় করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে যখন আমরা লোডশেডিং দেখেছি, ব্ল্যাক আউট হয়েছে- তখন মানুষ লুটপাটসহ সবই করেছে। তার মানে হচ্ছে, মানুষের মধ্যে এই প্রবৃত্তিটা থাকে। এই প্রবৃত্তিটা দমন করার জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুশাসন প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ট্রানজিশনাল সোসাইটিতে এই জিনিসগুলোর দারুণ অভাব বলে আমরা যত্রতত্র এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখি।

      Reply
    • কেউ একজন

      ধন্যবাদ। আমার ৩০৩ উইমেন এন্ড এন্ডার স্টাডিজ কোর্সে পুরো লেখাটা আমার প্রেজেন্টেশনে ব্যবহার করেছি এবং পরীক্ষার খাতায়ও লিখে দিয়ে এসেছি। নাম জানিনা বিধায় রেফারেন্সে আপনার নাম উল্লেখ করতে পারিনি। আমার হায়েস্ট মার্ক্সের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!!

      Reply
  12. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    যতবার একটি করে ধর্ষণ হচ্ছে বাঙালিরা হুঙ্কার দিয়ে ওঠে ফাঁসি চাই। ফাঁসি চাই। তনু ধর্ষণ হত্যা, নুসরাত, হালের শিশু সায়মা! হাইকোর্টের সেই শিশু তানিয়া’র কথা মনে আছে তো? নাকি হিসেবে নেই? গত ৬ মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৩১ জন নারী ও শিশু। যাদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে। এটা মহিলা পরিষদের রিপোর্ট। গতবছর এই সংখ্যাটি ছিল ৯৪২টি। অর্থাৎ ২০১৮ সালের রেকর্ড ২০১৯ সালের প্রথম ৬ মাসেই অতিক্রম। ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’ ও ‘শিশু কল্যাণ ফোরাম’ নামের ২টি রিপোর্টে ৩২ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার। এই রিপোর্টের তথ্য আরও ভয়াবহ। ২০১৯ সালে এখন পর্যন্ত ২১৫৮ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে মারা গেছে ৯৮৮। গত বছরের তুলনায় এবছর ইতোমধ্যে শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে ৪১ শতাংশ। একটা জিনিস লক্ষণীয় বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ ধর্ষণ নিম্নবিত্ত বা লো ক্লাসে ঘটছে। উচ্চবিত্তের মধ্যে এটা নেই বা খুবই কম। কারণ একটাই উচ্চবিত্তরা শিক্ষিত। আইন জানে এবং উচ্চবিত্ত পুরুষরা তাদের শরীরের খোরাক জোগাতে অর্থ বা প্রেমের বিনিময়ে সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে পুরুষগুলো সমাজের নিম্ন-শ্রেণির থেকে আসছে তাদের কি সুযোগ? শুধু তাই নয় মেয়ে মানুষের শরীর সম্পর্কে তাদের ধারণাই নেই। অথচ হাতের মুঠোয় স্মার্ট ফোনের কল্যাণে বা ডিভিডি শপে পর্ন দেখছে। তাদের সামাজিক অবস্থান ও স্বপ্নের পর্ন দেখা বা মেয়ে মানুষের শরীর পাওয়া একেবারেই অসামঞ্জস্য তাদের বানিয়ে দিচ্ছে ‘ধর্ষক’। তাদের ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। অথচ ধর্ষণ করে খুন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে না। মানুষের মধ্যে পাশবিক প্রবৃত্তির সঙ্গে শিক্ষা বা মানবতাবোধের প্রচণ্ডভাবে অভাব ঘটছে। এই শ্রেণির পুরুষের কাছে মেয়ে মানুষ যে বয়সেরই হোক না কেন তারা শুধু একটি ‘অবজেক্ট’। মানুষ নয়। আমাদের সমাজের ব্যবস্থাই তাদের মাথায় ঢোকাচ্ছে নারী মাত্রই ভোগের সামগ্রী। তাদের ভোগ করো, খুন করো, অত্যাচার করো। কোনও ব্যাপার না। চলছে ইন্টারনেটে পর্ন দেখা। ইউটিউব বন্ধ করেও লাভ নেই। আগের যুগের মতো ডিভিডি, ভিসিডি চল শুরু হয়ে যাবে। বিশ্বের যে কোনও দেশেই ধর্ষক বা ক্রিমিনালদের ওপর নানা গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। শিক্ষার অভাবে তারা বাস্তবতা ও স্বপ্ন বা চাহিদার মধ্যে তখন তফাৎ করতে পারে না। সবচেয়ে সহজ ভিকটিম শিশু। মর‌্যালিটি যেখানে মৃত। সেখানে শিশুটিকে সুযোগ মতো রেহাই দিতে নারাজ ধর্ষকরা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বিশাল বাজেট আমাদের আছে। কিংবা ৫০ বছর উদযাপনের বাজেট। কিন্তু সরকারের কাছে বস্তিতে বস্তিতে বা মিল কারখানায় বা স্কুলে অন্য যে কোনও জায়গায় ‘মর‌্যাল’ শিক্ষা দেওয়ার মতো মুড বা বাজেট নাই। ধর্মীয় শিক্ষালয়ে তো মাদ্রাসার কিছু শিক্ষকই ধর্ষক হয়ে বসে আছে। এমনকি মফস্বলের শিক্ষকরাও। বাংলাদেশে যৌনকর্মীদের লাইসেন্স দেওয়া হয়। আমি তো বিশ্বাস করি, যে কোনও ঘুষ খোর, ভেজাল অসৎ ব্যবসায়ী এমনকি স্মাগলার মাদক ব্যবসায়ী–এসব পুরুষ বা নারীর চেয়ে একজন যৌনকর্মীর সম্মান অনেক বেশি। সে চুরি করে না। মিথ্যা বলে না। লিগ্যালি অর্থ উপার্জন করে। হাজার হাজার বছরের পুরনো ব্যবসা এই পতিতালয় হঠাৎ করে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেওয়া শুরু করলো কেন? টান বাজার, নিমতলি বা ইংলিশ রোডের পতিতালয়গুলো গেলো কোথায়? নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, জাপান ইত্যাদি দেশে পতিতালয় মোটেও বেআইনি নয়। গ্রামে পরিবার রেখে শহরে কাজ ও বাস করা পুরুষের সংখ্যা বেশিই বলা যায়। কখনও কি ভেবেছেন তাদের যৌনবৃত্তির জন্য সমাজ বা সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে? পতিতালয় বন্ধ করে লাভ কী হয়েছে? এখন পুরো শহরেই ভাসমান যৌনকর্মীরা। নেই তাদের ঠিকানা। পুরুষ গ্রাহকদেরও অবস্থা তথৈবচ। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত এই অবস্থা আমাদের শ্রেণির নারীদেরও কি অনিশ্চয়তা এবং অনিরাপত্তা এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে না? এমন না যে, ব্রথেল সেন্টার রাস্তার মোড়ে মোড়ে খুললেই ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ব্রথেল সেন্টার অবশ্যই সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের নাকের ডগা দিয়ে ব্রথেল সেন্টারগুলো একের পর এক বন্ধ করে সামাজিক ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি করা হয়েছে প্রচণ্ডভাবে। শিশু ও নারী ধর্ষণ আইন সংশোধন ও দ্রুত প্রণয়ন সম্ভব নয় কেন? ধর্ষকদের জামিন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর বছরের পর বছর ধরে বিচারের নামে নাটক চলছে। এসব বন্ধ করা অতি জরুরি। বিশেষ ট্রাইবুন্যালে ১ মাসের মধ্যে বিচার প্রয়োজন। বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া জরুরি। কিন্তু মনে রাখতে হবে ১ ধর্ষককে ফাঁসিতে চড়ালেই নতুন আরও ১০ ধর্ষক তৈরির পথ বন্ধ হবে না। আর ফাঁসিতে চড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভারত বিশ্বের অন্যতম দেশ যেখানে ধর্ষণ রেট সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে প্রতিদিন গড়ে পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আরও অনেক অনেক ধর্ষণ লিপিবদ্ধই করা হয়নি। ফেসবুকে, টুইটারে ও অন্যান্য গণমাধ্যমসহ প্রতিদিন খবরের কাগজ ও অনলাইন নিউজগুলো একই কথা বলে যাচ্ছে ধর্ষকদের ফাঁসি চাই। Don’t worry. এক ধর্ষক ফাঁসি দেবেন, নতুন ধর্ষকদের দল তৈরি হবে। উদাহরণ তো মাত্র দিলাম। ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধই নয়, এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। নেটফ্লিক্সে ৭ পর্বের ‘দিল্লি ক্রাইম’–এ ছবিটি দেখে নিতে পারেন। মেয়েটি ২ সপ্তাহ পর মারা যায়। ২০১২ সালের এই ঘটনাটি শিক্ষিত মহলকে হতভম্ব করে দিয়েছিল।

    হ্যাঁ, সবার ফাঁসি হয়েছে। ধর্ষণ কমেছে কি?

    Reply
  13. younusur rahman

    কিন্তু আপনি তো প্রথমদিকে কোটা আন্দোলন সমর্থন করেছিলেন। সেখানেও কেন বিভ্রান্ত? এ আন্দোলনটা তো সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার আন্দোলন ছিল। যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই দেশ পেলাম, তারা কি এই সামান্য সন্মান পেতে পারে না। তারা না থাকলে তো, মুক্তিযুদ্ধ না করলে তো বা বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে তো এই দেশের লোক কয় পার্সেন্ট বিসিএস পাস করে চাকরি করতেন, সব তো পাকিস্তানের উচ্চ বংশের মানুষগুলি দখল করে নিত। ৯৫% পাকিস্তান আর মাত্র ৫% বাংলাদেশ থেকে নেয়া হোত ইতিহাস তাই বলে। এইটুকু বুঝতে কি এতো শিক্ষিত হওয়া লাগে, এই আন্দোলন যারা করছে তারা স্বার্থপর।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—