পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাত মাসের মাথায় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য বহু বছর পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, প্রথম সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বৈশ্বিক চাপের মুখে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়।

ছয় দফা আন্দোলনে ও আগরতলা মামলায় গ্রেপ্তারের পর ১৯৬৬ সালের ২ জুন থেকে ১৯৬৭ সালের ২২ জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কুর্মিটোলা সেনানিবাসে অফিসার মেসে বঙ্গবন্ধুর অন্তরীণ থাকাকালীন দিনলিপির বিবরণ নিয়েই ‘কারাগারের রোজনামচা’ লেখা হয়েছে। এটি বঙ্গবন্ধুর লেখা দ্বিতীয় রচনা। বাংলা একাডেমি কর্তৃক এটি প্রকাশিত হয়েছে গত মার্চে।

শুরুতে নাতিদীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। পাঠকের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ ভূমিকাটি বেশ সহায়ক হয়েছে। সঙ্গত কারণে রোজনামচা জেলজীবনের খুঁটিনাটি নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই গ্রন্থে সমকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক জীবনের অনেক ঘটনা বস্তুনিষ্ঠ, প্রাঞ্জল ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

‘থালা-বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল’
রোজনামচায় যাওয়ার পূর্বে ‘থালা-বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল’ শীর্ষক অংশে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় জেলখানার নানা নিয়মকানুন আলোচনা করেছেন। সাধারণত জেলখানার অভ্যন্তরের বিষয় সাধারণ পাঠকের জানার সুযোগ থাকে না।

“জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই তারা জানে না জেল কী জিনিস। বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সম্বন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা।… জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে।”

বঙ্গবন্ধু এভাবেই শুরু করেছেন জেলের ভেতরে কয়েদিদের নানা দায়-দায়িত্বের বিবরণ। যেমন, রাইটার দফা, চৌকি দফা, জলভরি দফা, ঝাড়ু দফা, বন্দুক দফা, পাগল দফা, দরজি খাতা, মুচি খাতা ইত্যাদি। এই অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলে রাজবন্দিদের সুযোগ-সুবিধার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ইংরেজ আমলে খাবার ও থাকার ব্যবস্থা ভালো ছিল। জেলখানার হাসপাতালের চিকিৎসার মান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে। ভালো, মন্দ দুই ধরনের দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছেন। বন্দিরা সপ্তাহে একটি চিঠি আর ১৫ দিনে একবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারত। কিন্তু সেখানেও বাধা-নিষেধ ছিল। গোয়েন্দা দপ্তরের কর্মচারীদের পড়ার পর চিঠি হাতে পাওয়া যেত, সাক্ষাতের সময় গোয়েন্দা ও জেলের কর্মচারীরা উপস্থিত থাকত। বঙ্গবন্ধু দুঃখ করে লিখেছেন:

“নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সাথে দেখা হলে আর কিছু না হউক একটা চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছ হয়, কিন্তু উপায় কী? আমরা তো পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষ হই নাই। তারা তো চুমুটাকে দোষণীয় মনে করে না। স্ত্রী সাথে স্বামীর অনেক কথা থাকে কিন্তু বলার উপায় নাই।”

এই অধ্যায়ে আরও কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন। জেল-জীবনের শুরু থেকেই সিপাহি, কয়েদিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বেশ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে ছিল। যে কারণে সবাই তাঁর সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করেছে। তিনিও জেলের আইন মেনে চলতেন, তবে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে জেল কর্তৃপক্ষের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতেন। সাধারণ মানুষকে বঙ্গবন্ধু সব সময় দেখেছেন মমতা ও সহানুভূতির চোখে, লুদু ওরফে লুৎফর রহমানের প্রতি তিনি যে স্নেহ দেখিয়েছেন, তা এককথায় নজিরবিহীন। তথাকথিত ভদ্রলোকেরা লুদুদের সঙ্গে কথাও বলবেন না। কারণ লুদু একজন পেশাদার চোর। লুদুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যে সদয় আচরণ করেছেন তাতে মনে হয়েছে ‘অপরাধকে ঘৃণা কর, অপরাধীকে নয়’– তিনি আক্ষরিক অর্থে তা বিশ্বাস করতেন। কেন একজন সাধারণ চোরের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন:

“আমি লিখছি এর জীবনের ঘটনা থেকে পাওয়া যাবে আমাদের সমাজব্যবস্থার চিত্র, মনুষ্যচরিত্র সম্বন্ধে, যারা গভীরভাবে দেখতে চেষ্টা করবেন। তারা বুঝতে পারবেন আমাদের সমাজের দুরবস্থা এবং অব্যবস্থায় পড়েই মানুষ চোর ডাকাত পকেটমার হয়। আল্লাহ কোনো মানুষকে চোর ডাকাত করে সৃষ্টি করে না।”

বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের ইতিহাসে ছয় দফা আন্দোলন একটি অসামান্য দিক পরিবর্তকারী ঘটনা। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলীয় কনভেনশনে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। উল্লেখ্য, ২৬ বছর পূর্বে আরেক বাঙালি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। লাহোর প্রস্তাব যেমন গৃহীত হয়েছে, ছয় দফা তেমনি প্রত্যাখাত হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন ছয় দফা হল বাঙালির বাঁচার দাবি। তাই ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে জানপ্রাণ দিয়ে নেমে পড়লেন।

ছয় দফা আন্দোলন দমনের নামে পাকিস্তান সরকার জেল-জুলুম অত্যাচারের পথ বেছে নিল। ১৯৬৬ সালের ৮ মে রাতে বঙ্গবন্ধুকে দেশরক্ষা আইন ৩২(১)ক ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পূর্বে ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ থেকে ৭ মে পর্যন্ত তিনি ৩২টি জনসভায় ভাষণ দেন। ৫০ হাজার লিফলেট ছাপিয়ে জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করা হয়। সব মিলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে ছয় দফার পক্ষে জনমত দানা বেঁধে উঠে। ৭ জুনের হরতাল প্রতিহত করার উদ্দেশে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়।

মানবিক বৃত্তি
জেলে বন্দি থাকা অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু সব সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর নিতেন। জেলের ভেতরে কাকে কোথায় রাখা হল, খাবারের ব্যবস্থা করা, মশারির ব্যবস্থা করা, আবার কাউকে কষ্ট দিলে প্রতিবাদ করেছেন। বেগম মুজিবের দেওয়া খাবার সবাইকে দিয়ে তারপর খেয়েছেন। নিজের শারীরিক অসুস্থতা, খাবারের কষ্ট, ঘুমের কষ্ট, বাবা-মাসহ সন্তানদের চিন্তা, আর্থিক সংকট তারপরও তিনি ছিলেন সবার আশ্রয়স্থল, যেন বটবৃক্ষ।

‘৬ দফার জন্য জেলে এসেছি’
বাস্তবিক অর্থে ছয় দফা আন্দোলন পাকিস্তানের রাজনীতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়, হয় ছয় দফার পক্ষে, না হয় বিপক্ষে। ধান্দাবাজ, সুবিধাবাদী তথাকথিত প্রগতিবাদীদের পক্ষে ছয় দফার পক্ষে থাকা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে এই বিভাজন প্রকট ধারণ করে। ন্যাপ নেতা মশিয়ুর রহমান ছয় দফাকে বিচিন্নতাবাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন, এর জবাবে বঙ্গবন্ধু ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন:

“জনগণ জানে এই দলটির কিছু সংখ্যক নেতা কিভাবে কৌশলে আইয়ুব সরকারের অপকর্মকে সমর্থন করছে। আবার নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে দাবি করে এরা জনগণকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছে। এরা নিজেদের চীনপন্থী বলেও থাকেন। একজন একদেশের নাগরিক কেমন করে অন্য দেশপন্থী, প্রগতিবাদী হয়?”

হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গর্ভনর মোনায়েম খান গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও হরণ করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“এটা ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম নয়, জনগণকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সংগ্রাম।”

৭ জুন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজেরও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কম ছিল না, একই সঙ্গে এদেশের জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল সীমাহীন। সারা জীবন ত্যাগ আর আদর্শের রাজনীতি করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘ত্যাগের মাধ্যমেই আদর্শের জয় হয়।’

৭ জুন বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাধে উজ্জ্বল একটি দিন। আইয়ুব-মোনায়েম চক্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। নজিরবিহীন হরতাল পালন করে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দিনলিপির পাতায় লিখেছেন:

“সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কি হয় আজ? আব্দুল মোনায়েম খান যেভাবে কথা বলছেন তাতে মনে হয় কিছু একটা ঘটবে আজ। কারাগারের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে খবর আসলো দোকান-পাট, গাড়ি, বাস, রিক্সা সব বন্ধ। শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল চলছে।”

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকতে দেওয়া হয়নি। অশান্তি সৃষ্টি করেছে, যাদের শান্তিরক্ষার দায়িত্ব ছিল। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টিয়ার গ্যাস, লাঠি চার্জ করে ক্ষান্ত হয়নি; গুলি করে সরকারি হিসেবে ১০ জনকে হত্যা করেছে। গ্রেপ্তার করেছে অগণিত। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“গুলি ও মৃত্যুর খবর পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে।… অনেক রাত হয়ে গেল, ঘুম তো আসে না। নানা চিন্তা এসে পড়ে। এ এক মহাবিপদ, বই পড়ি, কাগজ উল্টাই, কিন্তু তাতে মন বসে না।”

mujib-baby

একজন মহান নেতা দেশ ও জনগণের কথা না ভেবে পারেন না। ছয় দফা দমনের নামে সরকার আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। ১৩ জুন তারিখের মধ্যে ৯,৩৩০ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে বন্দি করা হয়। এর পূর্বে আওয়ামী লীগের প্রায় ৩,৫০০ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করা হয় ১০ মের মধ্যে। সরকারি চরমপন্থার অংশ হিসেবে ১৫ জুন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিন ১৬ জুন। ইত্তেফাক নিষিদ্ধ এবং পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন বলে ‘নিউনেশন প্রেস’ বাজেয়াপ্ত করে সরকার। বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে মানিক মিয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ছিল আত্মিক সম্পর্ক। দুজনেই ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক শিষ্য। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“মানিক ভাইকে সেখানে রেখেছে, সেখান থেকে খবর আনা খুবই কষ্টকর। এত বড় আঘাত পেলাম তা কল্পনা করতে বোধ হয় অনেকেই পারবে না। প্রথম থেকেই এই কাগজের (ইত্তেফাক) সাথে আমি জড়িত ছিলাম।”

জুলম-নির্যাতনের পাশাপাশি ছয় দফার আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। সর্বোপরি আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও ভাঙনের ষড়যন্ত্র করে সরকার। নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যে দলের ঐক্য ধরে রাখা এবং ছয় দফার আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই রকম পরিস্থিতিতে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন (Pakistan Democratic Movement বা পিডিএম) গঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন যে, ছয় দফার আন্দোলন নসাৎ করার জন্যই এসব আয়োজন। তিনি দ্বিধাহীনভাবে লিখেছেন:

“৬ দফার জন্য জেলে এসেছি, বের হয়ে ৬ দফার আন্দোলনই করব। যারা রক্ত দিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিসনদ ৬ দফার জন্য, যারা জেল খেটেছে ও খাটছে তাদের রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করতে আমি পারব না।”

শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলেও কারাগারের ফটক থেকেই সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে। কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অফিসার্স মেসের ১০ নং কক্ষে তাঁকে বন্দি করা হয়। ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ মামলার এক নম্বর আসামি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এমনকি বন্দি অবস্থায় তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়। দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বাধ্য হয়ে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন। যদিও মামলা চলাকালীন ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানন্দিতে বঙ্গবন্ধু নিজেকে নির্দোষদাবী করে বলেন:

“আমি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি।… আমি অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে কদাপি আস্থাশীল নই।… আমি কখনো পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার জন্য কোনো কিছু করি নাই কিংবা কোনোদিনও এই উদ্দেশ্যে কোনো স্থল, নৌ বা বিমানবাহিনীর কোনো কর্মচারীর সংস্পর্শে কোনো ষড়যন্ত্রমূলক কার্যে আত্মনিয়োগ করি নাই।”

যৌক্তিক কারণেই বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য সব অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা এবং স্মৃতিকথা থেকে জানা যাচ্ছে যে, মূলত কৌশলগত কারণে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কর্ণেল শওকত আলী তাঁর ‘সত্য মামলা আগারতলা’ গ্রন্থে লিখেছেন: “অভিযুক্তদের সঙ্গে বসে অভিযোগনামা শুনতে শুনতে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধু আমাদের সার্বিক পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন এবং সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনায় তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন।”

বলা যেতে পারে এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতার জন্য তিনি কোনো পন্থাই বাদ দেননি। বাবা-মা, পুত্র-কন্যার ভালবাসা বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। দেশের মানুষও তাঁকে ভালবেসেছে অকৃপণভাবে। ছাত্র-জনতা তাকে আইয়ুব কারাগার থেকে মুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিষিক্ত করেছে।

সেলের চৌহদ্দি
বঙ্গবন্ধুকে জেলে বন্দি রেখেও মোনায়েম খানের গায়ের ঝাল মেটিনি। জেলে আইনানুগ সুবিধা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করে। অধিক কষ্ট দেওয়ার অলিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন গর্ভনর। যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে জেল আইন ভঙ্গ করে Solitary Confinement-এ রাখা হয়। কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হয় তাঁকে। কৌতুক করে লিখেছেন:

“আমার অবস্থা হয়েছে, ‘পর্দানসিন জানানা’র মতো কেউ আমাকে দেখতেও পারবে না, আমিও কাউকে দেখতে পারব না। কেউ কথা বলতে পারবে না, আমিও পারব না।”

বঙ্গবন্ধুকে যে কক্ষে রাখা হয়েছে তার দক্ষিণে ১৪ ফুট উঁচু দেওয়াল, উত্তর দিকে ৪০ সেল, যেখানে পাগলদের রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকে ১৫ ফুট দেওয়াল ও নতুন ২০ এবং পশ্চিমে থাকে একরারী আসামি, ছয় সেল ও সাত সেল। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একাকী বন্দি জীবনে অনেকের পক্ষে শারীরিক-মানসিক সুস্থতা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হবে না। ১৯৬৬ সালের ৮ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি লাভ করেন। প্রায় তিন বছর এক দুঃষহ নির্যাতন ভোগের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। প্রবল মানসিক শক্তির জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। তিনি পাকিস্তানি শাসকচক্রের বদ মতলব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:

“যতই কষ্টের ভিতর আমাকে রাখুক না কেন, দুঃখ আমি পাব না।… এরা মনে করেছে বন্ধু শামসুল হককে (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক) জেলে দিয়ে যেমন পাগল করে ফেলেছিল। আমাকেও একলা একলা জেলে রেখে পাগল করে দিতে পারবে। আমাকে যারা পাগল করতে চায় তাদের নিজেদেরই পাগল হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে।”

আন্তর্জাতিক রাজনীতি: ‘ভিক্ষুকের কোনো সম্মান নাই’
রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক রাজীনীত, পাকিস্তানের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক, ঋণ, সাহায্য ইত্যাদি বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি মনে করেন ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের জনগণের স্বার্থে কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করা উচিত। এ ক্ষেত্রে তিনি ভারতকে অধিক দায়ী করে মন্তব্য করেছেন যে:

“ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি করে নেওয়া।”

স্নায়ুযুদ্ধকালীন পর্বে ঋণ-সাহায্যের নামে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় বিস্তারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর মার্কিন সাহায্য নেওয়ার অসম্মানজনক প্রক্রিয়ায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে লিখেছেন:

“নিজের দেশকে এত হেয় করে কোনো স্বাধীন দেশের সরকার এরূপভাবে সাহায্য গ্রহণ করতে পারে না। শুধু সরকারকে আপমান করে নাই, দেশের জনগণ ও দেশকেও অপমান করেছে। ভিক্ষুকের কোনো সম্মান নাই।”

তিনি বরং সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতি ছিলেন। জনগণের স্বার্থে সমাজতন্ত্র কায়েমের পক্ষে মত দিয়েছেন। ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সোভিয়েত সহায়তায় উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলেছেন: “রুশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বন্ধুত্ব কায়েম হউক এটাই আজ সাধারণ মানুষের কামনা।”

তবে চীনের ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ঠ ছিলেন। পাকিস্তানের পিকিংপন্থীদের আইয়ুবের দালালি এবং পুঁজিবাদের সমর্থক জেনারেল আইয়ুবের প্রতি চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সমর্থন তাঁকে রুষ্ঠ করেছে। ১৯৬৬ সালের ২৯ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রীর রাওয়ালপিন্ডি সফর উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু চীনের নীতির খোলামেলা সমালোচনা করেছেন:

“আপনার জনগণের মুক্তিতে বিশ্বাস করেন, আর যে সরকার (আইয়ুব সরকার) জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া আপনাদের উচিত না। এতে অন্য দেশের ভিতরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হয়। এই ব্যাপারে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও আপনাদের পথ এক না হওয়াই উচিত।”

‘পাকিস্তানের আপন মার পেটের ভাই’
রোজনামচা পড়তে গিয়ে পাঠক বঙ্গবন্ধুর মার্জিত রসবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দিত না হয়ে পারবেন না। সুযোগ পেলেই তিনি ব্যঙ্গ, বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেছেন। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের মধ্যে সাযুজ্য লক্ষ করে বঙ্গবন্ধু ‘ইন্দোনেশিয়াকে পাকিস্তানের আপন মায়ের পেটের ভাই’ বলে অভিহিত করেছেন। পাকিস্তানের বাজেটের একটা বড় অংশ মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ইন্দোনেশিয়াকে ১৪ কোটি টাকা ঋণদানের ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু ব্যঙ্গ করে লিখেছেন:

“এভাবেই আমরা ইসলামের খেদমত করছি। কারণ না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানো তো ইসলামের হুকুম। দয়ার মন আমাদের! এমন প্রেম-ভালবাসাই তো আমাদের নীতি হওয়া উচিত! কাপড় যদি কারও না থাকে তাকে কাপড়খানা খুলে দিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি চলে আসবা। আমাদের সরকারের অবস্থাও তাই।”

আমাকে দেখতে আয়, আমি আর বেশি দিন বাঁচব না’
বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুন খুলনা থেকে ছেলেকে ফোনে জানালেন: “তুই আমাকে দেখতে আয়, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না।”

মমতাময়ী মায়ের আকুল আহ্বানে কেউ কি সাড়া না দিয়ে পারে? বঙ্গবন্ধু বাবা-মা দুজনেরই অতি আদরের ‘খোকা’। যদিও তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ৪৭, তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। তারপরও তিনি বাবা-মার গলা ধরে আদর করেন। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মার অত্যন্ত স্নেহধন্য পুত্র। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“আমি জানি না আমার মতো এত স্নেহ অন্য কোনো ছেলে পেয়েছে কি না! আমার কথা বলতে আমার আব্বা অন্ধ। আমারা ছয় ভাইবোন। সকলে একদিকে, আমি একদিকে। খোদা আমাকে যথেষ্ট সহ্যশক্তি দিয়েছে, কিন্তু আমার আব্বা-মার অসুস্থতার কথা শুনলে আমি পাগল হয়ে যাই, কিছুই ভালো লাগে না। খেতেও পারি না, ঘুমাতেও পারি না, তারপর আবার কারাগারে বন্দি।”

Bangabandhu - 10

বঙ্গবন্ধু তাঁর স্নেহময়ী মাকে কথা দিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালের ১৩ মে গ্রামের বাড়িতে খাবেন। কিন্তু ৮ মে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার। মায়ের অসুস্থতার সংবাদ বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ ব্যাকুল করে তোলে। মাতৃভূমির ডাকে ৬ দফার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে জন্মদাত্রী মায়ের ডাকে সাড়া দিতে পারেননি।

‘আব্বা বালি চল’
বঙ্গবন্ধুর কারা-জীবনে তিনি সীমাহীন শারীরিক, মানসিক নির্যাতন, কষ্টের শিকার হয়েছেন। অপমান, অবহেলাও কম সহ্য করেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বন্দি থাকাকালীন তাঁর সংসার, সন্তান, সহধর্মিনীর জীবন কতটা কষ্টের, দুর্বিষহ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে– সে বিষয়ে আমরা খুব বেশি মনোযোগী নই। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী এবং রোজনামচা প্রকাশের পূর্বে অন্ধকারেই ছিল সেই ইতিহাস।

দুবছরের ছোট্ট শিশু রাসেল, মুখে বোল ফোটেনি, ভালো করে উচ্চারণ করতে পারে না। কিন্তু বাবার স্নেহ বোঝে, বাবা যে বাড়িতে থাকে না, তা জানে। বাবার ভালোবাসা পেতে চায়, স্নেহের দাবিতে যখন বলে: “আব্বা বালি (বাড়ি) চল।”

বঙ্গবন্ধু তাঁর আদরের সন্তানকে কী উত্তর দেবেন ভেবে পান না। তিনি লিখেছেন:

“দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।”

আর্থিক সংকট
বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নানা সময়ে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে। ভরসা ছিল পিতা শেখ লুৎফর রহমান আর সহধর্মিনী শেখ ফজিলাতুন্নেছা। পারিবারিক ব্যয় হ্রাসের জন্য বেগম মুজিব বললেন: “যদি বেশি অসুবিধা হয় নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে ছোট বাড়ি একটা ভাড়া করে নিব।”

বঙ্গবন্ধু আশ্বাস দিতে গিয়ে বললেন: “পারিবারিক সম্পদের আয় থেকে সংসার চলে যাবে।”

বেগম মুজিব সুস্পষ্টভাবে বললেন: “চিন্তা তোমার করতে হবে না।”

বাস্তবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। আন্দোলন, সংগ্রাম, জনগণ, দেশ ছাড়া তাঁর ভাবনার জগতে আর কিছু ছিল না। এমন যোগ্য সহধর্মিনী পেয়েছিলেন বলে বঙ্গবন্ধু অখণ্ড মনোযোগ দিতে পেরেছিলেন দেশ ও জাতির জন্য।

‘তার নিষেধ না শুনে পারলাম না’
বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থদ্বয়ে অগণিত স্থানে তাঁর সহধর্মিনীর প্রতি গভীর ভালবাসা, আস্থা, বিশ্বাস ও পরম নির্ভরতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি অকুণ্ঠ চিত্তে বেগম মুজিবের ধৈর্য্য, ত্যাগ ও অবদানের বিবরণ দিয়েছেন। প্রায় ৪০ বছরের দাম্পত্য জীবনে বেগম মুজিব ভালবেসে তাঁর স্বামীর সংগ্রামমুখর, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে সঙ্গি ছিলেন। তবে বেগম মুজিব সবসময় তাঁর স্বামীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন। গোপালগঞ্জ থানায় বেগম মুজিব তাঁর স্বামীকে কিছু কথা বলেছিলেন যা বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিপিবদ্ধ করেছেন:

“রেণু আমাকে যখন একাকী পেল, বলল, ‘জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোট বেলায় বাবা-মা মারা গেছেন… তোমার কিছু হলে বাঁচব কী করে?”

বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী যেমন তাঁর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন আবার বঙ্গবন্ধুও বেগম মুজিবের ওপর কোনো অংশে কম নির্ভরশীল ছিলেন না। শুধু পারিবারিক জীবন নয় বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে ঝুঁকি ও সংকটকালীন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বেগম মুজিব নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন। বেগম মুজিবের রাজনেতিক পরামর্শ বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছেন এমন দৃষ্টান্ত কম নয়।

বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে বেগম মুজিবের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই মাথাব্যথায় আক্রান্ত হতেন। তাই ব্যথা হলেই ব্যথানাশক স্যারিডন সেবন করতেন। বেশি ব্যথা করলে ২-৩টা একসঙ্গে খেয়ে নিতেন। বেগম মুজিব ব্যথানাশক ওষুধ খেতে নিষেধ করতেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু খুব একটা আমল দিতেন না। কারাগারে তীব্র মাথাব্যথ্যায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর প্রিয় সহধর্মিণীর কথা মনে পড়েছে। লিখেছেন:

“রেণু স্যারিডন খেতে দিতে চাইত না। ভীষণ আপত্তি করত। বলত, হার্ট দুর্বল হয়ে যাবে। আমি বলতাম আমার হার্ট নাই। অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে। বাইরে তার কথা শুনি নাই, কিন্তু জেলের ভিতর তার নিষেধ না শুনে পারলাম না।”

‘একুশ মাসের ছেলের সাথে রাজনীতি’
রোজনামচায় বঙ্গবন্ধুর জেল জীবনের কষ্ট-বেদনার কথার পাশাপাশি রসবোধের পরিচয় পাবেন পাঠক। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, কন্যারা দেখা করতে এসেছেন। বেগম মুজিবের সঙ্গে মামলা ও সাংসারিক নানা বিষয়ে আলাপের ফাঁকে ছোট্ট রাসেল তার বাবার সঙ্গে নতুন খেলায় মেতে উঠেছে। তখন তার বয়স মাত্র ২১ মাস। কানে কানে কথা বলে বা কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপ করে থাকে আর হাসে। জেলের আইন অনুযায়ী গোয়েন্দা দপ্তরের দুজন কর্মকর্তার সামনে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করতে হত। সরকারের গোয়েন্দা দপ্তরকে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন:

“আমার কানে কানে কথা বললে আইবি (গোয়েন্দা দফতর) নারাজ হবে, ভাববে একুশ মাসের ছেলের সাথে রাজনীতি নিয়ে কানে কানে কথা বলছি।”

‘বড় মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব’
বঙ্গবন্ধুর তিন পুত্র, দুই কন্যার মধ্যে কে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন। তা আমরা স্পষ্টভাবে জানি না। কারণ বঙ্গবন্ধুর এযাবৎ প্রকাশিত কোনো রচনায় এ বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত নেই। আত্মজীবনীতে তিনি সন্তানদের মধ্যে সবেচেয়ে অধিকবার উল্লেখ করেছেন শেখ হাসিনা সম্পর্কে, অন্যদিকে রোজনামচায় সব চেয়ে বেশি উঠে এসেছে রাসেল প্রসঙ্গ। রাসেল নিতান্তই শিশু, আদর-আবদার বেশি থাকাটা স্বাভাবিক। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রকাশিত রচনাতে জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনার প্রতি একটু বেশি দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।

শেখ হাসিনার বিয়েতে প্রথমে বঙ্গবন্ধু সম্মত হননি। তিনি চেয়েছিলেন বিএ পাস করার পর কন্যার বিয়ে দেবেন। তবে বেগম মুজিবের আগ্রহের কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মত হন। কিন্তু কন্যাও বেঁকে বসেছিলেন দুটো কারণে। প্রথমত, তাঁর পিতা তখন কারাগারে বন্দি, দ্বিতীয়ত, বিয়ের আগে বিএ পাস করতে চান। শেষ পর্যন্ত কন্যার সম্মতি আদায়ের দায় পড়ল পিতার ওপর, তিনি শেখ হাসিনাকে বললেন:

“মা আমি জেলে আছি, কতদিন থাকতে হবে, কিছুই ঠিক নাই। তবে মনে হয় সহজে আমাকে ছাড়বে না, কতগুলি মামলাও দিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে চলেছে। তোমাদের আবারও কষ্টা হবে। তোমার মা যাহা বলে শুনিও।”

বঙ্গবন্ধুর ফুপাতো ভাই মমিনুল হক খোকা তাঁর ‘অস্তরাগে স্মৃতি সমুজ্জল’ গ্রন্থে ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার শুভ পরিণয়ের বিবরণ দিয়েছেন। দাদা, দাদী ও পিতার অনুপস্থিতিতে একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে, অনাড়ম্বরভাবে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিবাহ সম্পন্ন হয়।

‘পশ্চিম পাকিস্তানে চাঁদ দেখেছে, এখানে নামাজ পড়তেই হবে’
পাকিস্তানি শাসকবর্গ কেবল ভাষা, সংস্কৃতি বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাঙালিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আরচণ করেছে তা-ই নয়, এমনকি ধর্ম পালনের ক্ষেত্রেও জবরদস্তি করেছে। ১৯৬৭ সালের ঈদ-উল-ফিতরের ঘটনা। হঠাৎ রাত ১০টায় সরকার ঘোষণা দিল, পরের দিন ১২ জানুয়ারি সারা পাকিস্তানে ঈদ হবে। যদিও পূর্ব পাকিস্তানে কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি। সিপাহি, জেল কর্মচারী তারা রোজা ভাঙতে রাজি হয়নি। তাদের ন্যায্য কথা: “চাকরি করে বলে নামাজও সরকারের ইচ্ছায় পড়বে নাকি?”

১১ জানুয়ারি বেগম মুজিব সন্তানদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে যান। সন্তানরা কেউ ঈদের কাপড় নেবে না। কারণ বাবাকে কারাগারে রেখে ঈদের আনন্দ হয় কী করে? তারপরও তিনি বেগম মুজিবকে বললেন ভালোভাবে ঈদ উদযাপনের জন্য, না হলে বাচ্চাদের মন ছোট হয়ে যাবে। যা হোক, ঈদ পালনের সরকারি ঘোষণায় বঙ্গবন্ধুও ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছেন:

“শুনলাম পশ্চিম পাকিস্তানে সরকারি লোক চাঁদ দেখেছে। পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নতি হলে পূর্ব বাংলার উন্নতি হয়! হাজার মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তানে চাঁদ দেখেছে, এখানে নামাজ পড়তেই হবে। আমাদের (কয়েদিদের) আবার নামাজ কী! তবুও নামাজে গেলাম, কারণ সহকর্মীদের সাথে দেখা হবে।”

‘পাখি দুইটা যে আমার কত বড় বন্ধু’
কারাগারের চার দেওয়ালে বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু নিসর্গের যে অপূর্ব বিবরণ দিয়েছেন তা এককথায় অসাধারণ বললে মোটেই অত্যুক্তি হয় না। আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু দিল্লির ঐতিহাসিক নিদর্শনাবলীর মনোজ্ঞ বিবরণ দিয়েছেন। রোজনামচায় পাচ্ছি প্রকৃতির নানা রূপের বিবরণ। ঘুরেফিরে এক জোড়া হলুদ পাখির জন্য তাঁর ব্যাকুলতার কথা লিখেছেন।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অসত্য ও অর্ধসত্য ‘মিথ’ তৈরি করা হয়েছে

এ ছাড়া চড়ুই, কাক ও কবুতর নিয়েও আলোচনা আছে। তিনি একটা মুরগি পালতে শুরু করেছিলেন। মুরগির হাটা, চলা, খাওয়ার নিখুঁত বিবরণ দিয়েছেন। মুরগির মৃত্যুতে তিনি শিশুর ন্যায় কষ্ট পেয়েছেন। সুন্দর একটি ফুলের বাগান তৈরি করেছেন। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে তাঁর প্রকৃতি প্রেম উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ১৯৫৮ সালে প্রথম এক জোড়া হলদে পাখি দেখেছিলেন। আট বছর পরে আবার হলদে পাখি দুটিকে দেখার তীব্র বাসনা নিয়ে তাঁর চোখ দুটি গাছের ভেতরে খুঁজে ফিরেছে সেই প্রিয় পাখি দুটি। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“বড় ব্যথা পাব ওরা ফিরে না আসলে। পাখি দুইটা যে আমার কত বড় বন্ধু যারা কারাগারে একাকী বন্দি থাকেন নাই তারা বুঝতে পারবেন না। আমাকে তো একেবারে একলা রেখেছে। গাছপালা, হলদে পাখি, চড়ই পাখি আর কাকই তো আমার বন্ধু এই নির্জন প্রকোষ্ঠে।”

‘কলম ফেলে দিন। লাঠি, ছোরা চালান শিখুন’
বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীন চিন্তা ও জ্ঞানের কেন্দ্র বলে মনে করতেন। যে কারণে মুক্ত চিন্তা ও সৃজনশীলতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে তিনি বেশ গুরুত্ব দিতেন। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপে তিনি উদ্বিগ্ন না হয়ে পারেননি। কিন্তু শিক্ষকমণ্ডলী প্রতিবাদ না করায় হতাশ হয়ে লিখেছেন:

“কলম ফেলে দিন। লাঠি, ছোরা চালান শিখুন, আর কিছু তেল কিনুন রাতে ও দিনে যখনই দরকার হবে নিয়ে হাজির হবেন। লেখাপড়ার দরকার নাই। প্রমোশন পাবেন, তারপরে মন্ত্রীও হতে পারবেন।”

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে সংসদে আইন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু আজ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা কতটুকু রক্ষা করতে পেরেছেন? পাকিস্তান আমলে শিক্ষকরা তেলবাজি, দালালি করেছে মন্ত্রী হওয়ার জন্য, স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষকদের একটা বড় অংশ সহকারী প্রক্টর, আবাসিক শিক্ষক হওয়ার জন্য দলবাজি করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. এম এন হুদার (মীর্জা নূরুল হুদা) প্রতি ইঙ্গিত করে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রী হওয়ার কথা বলেছেন। ড. হুদা ১৯৬৫-৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ৬ দফা ও আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন:

“একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন, হঠাৎ একজনের দয়ায় মন্ত্রী হয়ে রাজনীতিবিদ হওয়ার চেষ্টা করছেন।… মন্ত্রিত্বের লোভে ভদ্রলোক এত নিচে নেমে গিয়েছেন যে একটা দলের বা লোকের দেশপ্রেমের উপর কটাক্ষ করতেও দ্বিধাবোধ করলেন না।”

উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিচারপতি সায়েম তাঁকে উপদেষ্টা, জিয়াউর রহমানের সময়ে অর্থমন্ত্রী এবং বিচারপতি সাত্তার তাঁকে উপ রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের বিরোধীতার ‘পুরস্কার’ ড. হুদা পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে যথাযথভাবে পেয়েছিলেন!

স্বল্প পরিসরে ‘কারাগারের রোচনামচা’ গ্রন্থের আলোচনা অত্যন্ত দুরূহ। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু আলোকপাত করেছেন। এসব বিষয়ে আলোচনা, বিতর্ক, বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। কারণ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্বের (১৯৬৬-১৯৬৯) দিনলিপি এই গ্রন্থ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অমূল্য উৎস হিসেবে গণ্য হবে এই গ্রন্থ। বাঙালির জাগরণের দলিল বলাই যুক্তিসঙ্গত। বাঙালি জেগে উঠেছিল শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রামে। জাতিকে জাগিয়ে তোলার গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

একটি তথ্যবিভ্রাটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তা হল বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন ন্যাপ নেতা মশিহুর রহমানের (১৯২৪-১৯৭৯) কথা, যিনি ‘যাদু মিয়া’ নামে অধিক পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার কারণে স্বাধীনতার পর দালাল আইনে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এবং বিএনপিতে যোগ দেন। টিকা অংশে পরিচিতি দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা যশোরের মশিউর রহমান (১৯২০-১৯৭১)। তবে টিকা অংশে আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ঘটনার বিবরণ যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রচ্ছদ ও গ্রন্থ নকশার জন্য তারিক সুজাতকে অভিনন্দন। এই গ্রন্থ প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ মহান জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছে। আশা করি পরবর্তী সংস্করণ আরও নির্ভুল হবে এবং আরও সুলভ মূল্যে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মোহাম্মদ সেলিমঅধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Responses -- “‘কারাগারের রোজনামচা’: বাঙালির জাগরণের দলিল”

  1. abida

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ন লেখাটি বাঙালি জাগরণের একটি দলিল এবং পাঠকদের জন্য একটি শিক্ষনীয় লেখা। লেখককে ধন্যবাদ তার এই অসাধারণ লেখনীর জন্য ।

    Reply
    • আনোয়ার

      আমার চোখে: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাঙালি জাগরণের দলিল লেখাটি অত্যন্ত গবেষণালব্ধ জ্ঞানগর্ব। আমারমত পাঠকদের জন্য একটি শিক্ষনীয় লেখা। এক কথায় অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী প্রফেসর মোহাম্মদ সেলিম স্যার। ধন্যবাদ স্যারকে।

      Reply
      • hafiz

        without any doubt this is one of the most importent writing and valuable document regarding Bbongobondhu and independent movement of Bangladesh. I was having goose bump abd could not hold my tears while i was reading this. my heads of to the writer and publisher hafiz dfw @gmail hsfiz Dallas texas

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—