Published : 18 Apr 2021, 11:50 AM
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনা কেন ঘটল, কেন শ্রমিকরা উত্তেজিত হলো, কেন পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বেশ কয়েকজন শ্রমিককে হত্যা করল- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া দরকার। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, এই ঘটনায় বাইরের উস্কানি ছিল। শ্রমিক নিয়োগের ঠিকাদারি না পাওয়া স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘোঁট পাকানোর কথাও শোনা যাচ্ছে। ঘটনার নেপথ্যে যাই থাক, তাই বলে প্রতিবাদী শ্রমিকদের গুলি করে মেরে ফেলা হবে? তাদেরকে রক্তাক্ত করা হবে?
গণমাধ্যমের খবর মতে, ওই কারখানাটিতে কয়েকদিন ধরেই শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল। শ্রমিকরা মালিক পক্ষের কাছে ১০ দফা দাবিও উত্থাপন করে। শ্রমিকদের দাবির মধ্যে ছিল মাসের শুরুতে অর্থাৎ ৫–১০ তারিখের মধ্যে বেতন, রোজার মাসে বিকেল ৫টার মধ্যে ছুটি এবং ইফতারের জন্য বরাদ্দ, যখন তখন ছাঁটাই বন্ধ, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আইন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ করা ইত্যাদি। এসব দাবির কোনোটাই অন্যায্য কিংবা বাস্তবায়ন না করার মতো নয়। তবু কেন মালিকপক্ষ দাবি বাস্তবায়নে গরিমসি করছিল? মালিকপক্ষের উদাসীনতা, লাভ ও লোভের কাছে শ্রমিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে, তারা যৌক্তিক দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুললে তাদের গুলি করে হত্যা করা হবে, এ কোন তন্ত্র? শ্রমিকের জীবনের কি তবে কোনও মূল্য নেই?
যে কারখানায় পাঁচ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করে সেখানে অসন্তোষ থাকবে, ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকবে, উস্কানি থাকবে, দলাদলি থাকবে, নাশকতার চেষ্টা হবে- এর কোনও কিছুই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এসব ঝুঁকি ম্যানেজ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ যেকোনো কারখানা ব্যবস্থাপনার একেবারে প্রাথমিক শর্ত। সেখানে কেন এমন রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটল? ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ক্ষোভ প্রশমনে কর্তৃপক্ষ কী উদ্যোগ নিয়েছে? এ হত্যাকাণ্ডের দায় তাই কারখানা কর্তৃপক্ষকেও নিতে হবে। টাকার জোরে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মজুরের রক্ত ঝরানোর খেলা তাদের অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্রে বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা দাবি জানিয়ে আসলেও মালিকপক্ষ বরাবর এড়িয়ে গেছে এবং তাদের উপর নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। শনিবার ন্যায্য বেতন–বোনাসের দাবিতে আন্দোলনের এক পর্যায়ে মালিকপক্ষ তাদের উপর চড়াও হয়। পরে মালিকের নির্দেশে পুলিশ এসে শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের এ আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়ে। পুলিশ কেন এমন মারমুখী ভূমিকা পালন করল? এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের প্রথমে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করার কথা। তাতে কাজ না হলে রাবার বুলেট ছোঁড়ার কথা। সব ব্যর্থ হলে, নিজেদের প্রাণ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে তাহলেই কেবল গুলি চালানোর কথা। সেটাও টার্গেট করে নয়, ফাঁকা গুলি যাকে বলে। নিতান্তই অনিবার্য হয়ে উঠলে তাহলে তারা পায়ে গুলি চালাতে পারেন। কিন্তু বুক কিংবা কপাল বরাবর গুলি চালানোর মতো পরিস্থিতি আদৌ হয়েছিল কি? যদি তেমনটা না হয়ে থাকে তাহলে কেন টার্গেট করে গুলি চালানো হলো?
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে এলাকার জনমত শুরু থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ায় আগেও কয়েকবার সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কারখানা স্থাপনকারী এস আলম গ্রুপ কিংবা সরকার, কোনও পক্ষ থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে ওই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, এ অভিযোগে ২০১৬ সালেও গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমি অধিগ্রহণের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ৪ জন নিহত ও বহুসংখ্যক গ্রামবাসী আহত হয়, যার গ্রহণযোগ্য কোন নির্মোহ তদন্ত ও বিচার এখন পর্যন্ত হয়নি। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের ন্যস্ত দায়িত্ব পালন না করে উল্টা পুলিশ বাহিনী কর্তৃক এমন নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও মানুষ হত্যার ঘটনা একটি সভ্য দেশে অচিন্তনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেটাই বার বার ঘটছে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেও সেখানে মতবিনিময়সভা চলাকালে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতেই কেন বার বার সংঘর্ষ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে? এ ব্যাপারে কেন যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না? বার বার নিরস্ত্র শ্রমিকের রক্তে মাটি ভিজে যাবে, আর সেই মাটির উপর দিয়ে সদর্পে রক্ষীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হেঁটে যাবে মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষায়, তা হতে পারে না। অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দমনের নামে পুলিশি সন্ত্রাসের অবসান হওয়া উচিত। পুলিশের ভূমিকা পরিবর্তন হওয়া উচিত। আত্মরক্ষার নামে তারা যখন খুশি, যাকে খুশি গুলি করে হত্যা করতে পারে না।
আমাদের দেশের পুলিশকে অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে, তারা প্রায়ই এ ক্ষমতার অপব্যবহার করে। ধরে আনতে বললে বেঁধে তো আনেই, সঙ্গে চলে লাঠিপেটা। অথচ এসবের কোনো কিছুই আইনসিদ্ধ নয়। পুলিশের কাজ অপরাধ দমন করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। কাজটি মোটেও ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা কিংবা গুলি করে খুলি উড়িয়ে কবরে পাঠিয়ে দেয়া নয়। এ জন্য প্রয়োজন কঠোর ধৈর্য ও সংযম। কোনো অবস্থাতেই পুলিশ দস্যুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে না।
মনে রাখতে হবে আইনবিরুদ্ধ উপায়ে আইন–শৃঙ্খলা ফিরতে পারে না। উপায়টা যদি আইন মোতাবেকও হয়, কিন্তু এমন আইন যা সাধারণ ন্যায়বিচারের বিপ্রতীপ, তবেও নয়। আমাদের দেশে এখনও অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অপরাধীদের চেয়ে পুলিশকে বেশি ভয় পায়। এর কারণ জবাবদিহি না থাকা আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। এটা মানবধর্ম: কারও হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তুলে দিলে কর্তব্যের আতিশয্যেই হোক আর হাতের সুখ মেটাতেই হোক, বাড়াবাড়ি সে করবেই— পাইকারী স্বৈরাচারের অস্ত্র হবে খুচরো স্বৈরাচার। এখানে হচ্ছেও তাই।
আমাদের দেশে নানাভাবে পুলিশের কর্তৃত্ব বাড়ানো হচ্ছে। নতুন আইন বা হুকুমনামা জারি করে, পাশাপাশি সাবেক আইনে নতুন শান দিয়ে। রাজনৈতিক নজরদারির পাশাপাশি অজস্র সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয় আইনের আওতায় চলে এসেছে। আইনগুলোকে শিখণ্ডী করে দানা বাঁধছে অজস্র বেআইনি অনাচার উৎপীড়ন। আর এসবকে কেন্দ্র করে পুলিশের সামরিক মহড়া বাড়ছে। তাদের খবরদারি দেখে নিজেদের নাবালকত্বে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাচ্ছে আমাদের। ফণিমনসার মত গজিয়ে উঠেছে তারা শাসক বনাম নাগরিকের মাঝখানে। হ্যাঁ, তারা মানুষ মারতে পারে, মেরে পার পেয়ে যায়, কারণ গুলি তো নাকি সর্বদাই চলে 'আত্মরক্ষার্থে'!
প্রশ্ন হলো, এভাবে আর কতদিন চলবে?