Published : 25 Sep 2020, 12:08 AM
বাংলাদেশে মৃতপ্রায় ফুটবলে নির্বাচনি হাওয়া লেগেছে। ৩ অক্টোবর ১৩৯ জন ভোটার দেশের ফুটবল পরিচালনা করার জন্য আগামী চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নতুন কমিটি নির্বাচন করবেন। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন এর নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদই আবার নির্বাচিত হতে যাচ্ছে। যদিও তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন দেশের এক সময়ের স্বনামধন্য খেলোয়াড় বাদল রায় কিন্ত পরবর্তিতে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন।
সভাপতি পদে নির্বাচন করছেন বলে বছরব্যাপী আলোচনায় থাকলেও আলোচিত ব্যবসায়ী ও সংগঠক তরফদার মো. রুহুল আমিন মনোনয়নপত্রই কিনেননি। তবে এ পদে মনোনয়নপত্র কিনে এখন পযন্ত আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও দেশের অন্যতম কোচ শফিকুর ইসলাম মানিক।
বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন টানা চতুর্থবারের মত লড়বেন সভাপতি পদে এবং তার জয়লাভের সম্ভবনাই বেশি। যদিও গত ১২ বছর সময় ধরে তার নেতৃত্বাধীন পর্ষদ বলার মত তেমন কোন সাফল্য দেখাতে পারেনি। সরকারি দলের দুইজন সংসদ সদস্য আব্দুর সালাম মুর্শেদী ও কাজী নাবিল এবং বিএনপির 'মানিব্যাংক' খ্যাত তাবিথ আওয়ালের মত প্রভাবশালীরা তার পর্ষদে থাকার পরেও কেবল সুস্থ পরিকল্পনার অভাবে তাদের নামের পাশে ব্যর্থ শব্দটি জুড়ে দিয়েছে দেশের ফুটবল প্রিয় অধিকাংশ মানুষ।
আগামী ৩ অক্টোবরে বাফুফের নির্বাচনে সভাপতিসহ অন্যান্য পদে লড়তে যাওয়া প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহারে তৃণমূল থেকে খেলোয়ার তৈরি করে জাতীয় দলে নিয়ে আসার সুস্থ কোনও পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ৮০ দশকে ঢাকায় অনুর্ধ্ব ১৪ বছরের কিশোর লীগ হতো, এরশাদ কাপ হতো, স্কুল ফুটবল লীগ হতো। এসব লীগগুলো চলার সময়ে ঢাকার মহল্লায় মহল্লায় কিশোরদের মাঝে একটা ফুটবল উত্তেজনা বিরাজ করতো। বিশেষ করে স্কুল ফুটবল লীগ যখন চলতো, তখন তো অন্যরকম এক আমেজ বিরাজ করতো এলাকার স্কুলে স্কুলে। এসব ক্ষুদে লীগগুলো থেকে খেলোয়াড় উঠে আসতো আর এদের প্রধান টার্গেট থাকতো বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আয়োজিত পাইওনিয়ার ফুটবল লীগে অংশগ্রহণ করা। এরপর তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ হয়ে জাতীয় দল। ওই সময় স্কুল ফুটবল লীগ খেলা একজন ক্ষুদে ফুটবলার তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের সিঁড়িটি সাজাতেন এভাবেই।
আমি ও আমার বন্ধুরাও ছিলাম এ স্বপ্নবাজদের তালিকায়। এ স্বপ্ন যাত্রায় আমি ব্যর্থ হলেও বন্ধু মিজানুর রহমান ডন ব্যর্থ হননি। তিনি এ সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম সার্ক চাম্পিয়ান দলের অন্যতম সদস্য হতে পেরেছেন। কিন্তু আজ পাড়ায় মহল্লায় ঘুরে বেড়ানো একটি কিশোর ছেলে এমন স্বপ্ন দেখতে পারে না। কারণ এমন স্বপ্ন দেখারও কোন সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন আমাদের গুণী ফুটবল কর্তা ব্যক্তিরা। যারা পরিচালনা করছেন বাংলাদেশের ফুটবলকে।
আসন্ন বাফুফের নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন অনেকেই। এ ইশতেহারে তারা জাতীয় দলকে ঢেলে সাজাবেন, বিদেশ থেকে ভাল প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন, লীগগুলো সময় মত চালানোর অঙ্গীকার করেছেন। কেউ কেউ পাইওনিয়ার ফুটবল লীগ, এমনকি স্কুল লীগ শুরু করার কথাও বলেছেন। কিন্তু ফুটবলার তৈরির কথা কেউই জোর দিয়ে বলেননি। স্কুল লীগের কথা বলা হলেও স্কুলের ক্ষুদে বাচ্চারা কোথায় ফুটবল অনুশীলন করে ক্ষুদে ফুটবলারের তালিকায় নাম লেখাবে সেটা কেউই তাদের ইশতেহারে উল্লেখ্য করেননি!
ঢাকা শহরে কয়টা স্কুলের খেলার মাঠ রয়েছে? আরো পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, ঢাকার শহরে খেলার জন্য কয়টা মাঠ রয়েছে বা সারা দেশেই বা কয়টা মাঠ রয়েছে?
স্কুল ফুটবল লীগ চালু করলে শিক্ষার্থীরা কি স্কুলের ছাদে ফুটবল অনুশীলন করে ওই লীগে অংশগ্রহণ করবে? এটা সবারই জানা যে ফুটবল ফেডারেশনের দায়িত্ব নয়, খেলার মাঠ তৈরি করা। কিন্তু যেহেতু আমাদের মাঠ সংকট রয়েছে, সেহেতু সুস্থ এবং পরিছন্ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা এ অঙ্গীকার করতে পারতেন যে, তারা নির্বাচিত হলে সিটি কর্পোরেশনের সাথে আলোচনা করবেন মাঠে করে দেওয়ার জন্য। আর ঢাকায় অনুর্ধ্ব ১৬ পাইওনিয়ার লীগ ফুটবল লীগের তো বেহাল দশা। কাগজে কলমে অনুর্ধ্ব ১৬ হলেও খেলা চলার সময়ে দেখা যায় বিভিন্ন দলে ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সের খেলোয়াড়েরাও খেলে থাকেন। পাইওনিয়ার লীগ ফুটবলে জুরাইন ফুটবল একাডেমির ফুটবল টিম পরিচালনা করতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে পাইওনিয়ার ফুটবল লীগ কমিটিকে উকিল নোটিস পাঠিয়েও কোনও ফল পাইনি।
তৃণমূলে ফুটবলকে এমন বেহাল অবস্থায় রেখে জাতীয় দলের জন্য বিদেশ থেকে হাইপ্রোফাইল কোচিং স্টাফ এনে কাদেরকে কোচিং করাবে তার সুনিদিষ্ট কোনও পরিকল্পনা নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ নাই।
অর্থ সংকটে ভোগা বাংলাদেশ ফুটবলকে ফিফার র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০ তম বা এর কাছাকাছি আসতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে নজর দিতে হবে। বয়সভিত্তিক লীগগুলো নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার করে পরিচালনা করতে হবে। সেখানে কড়া নজর রাখতে হবে যেন কোনওদলেই নির্ধারিত বয়সের বেশি বয়স্ক খেলোয়ার খেলতে না পারে। তার আগে খেলার মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই সম্ভব প্লেয়ার মনিটরিং, সফটওয়্যার হেলথ মনিটরিং, ম্যাচ অ্যানালাইসিস সফটওয়্যারসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ভাল ফল আশা করা। প্রবাস থেকে প্রবাসীদের সন্তানদের ঢাকায় এনে নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে হয়তো দুই একটি ম্যাচে ভাল রেজাল্ট আশা করা যায়, তবে তাতে দেশের ফুটবলে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন চাইলে উল্লেখিত বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি ডিএফএতে (জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েসন) ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। জেলা পর্যায়ে ফুটবলকে ছড়িয়ে দিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদ বন্টণ বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা ফুটবল সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়ারদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। আর সর্বোপরি এলাকায় এলাকায় মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই সম্ভব হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলকে একটি অন্যান্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
কিন্ত হতাশার কথা হলো, আগামী ৩ অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহারে কেউ এরকম পরিছন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেনি। তাই আগামী চার বছরে দেশের ফুটবলে তেমন কোন সাফল্য আশা করতে পারছি না। ভারতের মাটিতে ৭০ হাজার দর্শকের সামনে জিততে জিততে ড্র করা ফলাফল অনেকের কাছে চমক মনে হলেও এটা দেশের ফুটবলে সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে বলে মনে করার মত বোকা দেশের জনগণ নয়।