হংকংয়ে বিক্ষোভ, বিমান বন্দরে যাত্রীদের অনিশ্চয়তা, ফ্লাইট বাতিল ইত্যাদি সংবাদ এখন বিশ্বমিডিয়ায় ঘুরে ফিরে আসছে।

হংকং বিমান বন্দর হলো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ যাত্রী এই বিমান বন্দর দিয়ে যাতায়াত করেন। এমন একটি ব্যস্ত বিমান বন্দরে ফ্লাইট বাতিলের কারণে অসংখ্য যাত্রী বিপাকে পড়েছেন। পর্যটন নগরী হিসেবেও হংকংয়ের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বিক্ষোভে পর্যটন শিল্প দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যার ঢেউ আছড়ে পড়ছে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য মানুষের জীবনে।

সাম্প্রতিক এই সংকট ও বিক্ষোভের সূচনা যে ঘটনা থেকে তার দিকে ফিরে তাকানো যাক। গত বছর তাইওয়ানে ছুটি কাটানোর সময় অন্তঃসত্ত্বা প্রেমিকাকে হত্যার অভিযোগ ওঠে হংকংয়ের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। কিন্তু তাইওয়ানের সঙ্গে হংকংয়ের বন্দি বিনিময়ের কোন চুক্তি না থাকায় সে ব্যক্তিকে তাইপেতে ফেরত পাঠানো যায়নি।  চীনের মূল ভূখণ্ড বা অন্য দেশে অপরাধ করে হংকংয়ে পালিয়ে আসা ব্যক্তিকে যদি চীনের মূল ভূখণ্ডে বা সেই দেশে ফেরত পাঠানো না যায় তাহলে অপরাধীদের স্বর্গে পরিণত হতে পারে হংকং। এই আশংকা থেকে অপরাধী প্রত্যাবর্তন বিল আনে হংকংয়ের আইন পরিষদ। প্রস্তাবিত বিলে সন্দেহভাজন অপরাধীকে ফেরত পাঠানোর পথ সুগম করা হয়। কিন্তু এই বিলের বদৌলতে হংকংয়ের উপর বেইজিংয়ের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাবে এমন অভিযোগে ৯ জুন থেকে সেখানে শুরু হয় বিক্ষোভ। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিলটি মৃত ঘোষণা করেন হংকংয়ের বর্তমান প্রশাসক ক্যারি ল্যাম। কিন্তু বিলটি মৃত ঘোষণা করার পরও সেখানে বিক্ষোভ বন্ধ হয়নি। শুধু তাই নয়, এই বিক্ষোভ সহিংসতাতেও রূপ নিয়েছে যা হংকংয়ের জনজীবনকে স্থবির করে দিচ্ছে।

এখানে একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো যাক। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত হংকং ছিল ব্রিটিশ কলোনি। ১৯৯৭ সালে চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয় হংকংকে। হংকং এর ক্ষেত্রে চীন ‘একদেশ দুই নীতি’ অবলম্বন করে চলেছে ব্রিটেনের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে।এই কারণে চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে হংকংয়ের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা ও আইন পরিষদ রয়েছে। চুক্তি অনুসারে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত এই নীতি মেনে চলবে চীন। এরপর ধীরে ধীরে চীনের মূল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে আত্মীকরণ করে নেওয়া হবে হংকংকে। কারণ একই দেশে দুই রকম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থাকাটা সঙ্গত নয়। চীন এই চুক্তিকে অনুসরণ করে চলেছে। কিন্তু এর ফলে হংকংয়ে মাঝে মধ্যেই অস্থিরতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।

সত্তর ও আশির দশকে হংকং ছিল মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধীচক্রের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই।  চীনের অংশ হওয়ার পর হংকং-এ আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নতুন শতাব্দিতে এখন উন্নত। হংকংয়ের অর্থনীতিও বেশ মজবুত অবস্থায় আছে। তবে চলতি বছরের প্রথম দিকে হংকংয়ের অর্থনীতি কিছুটা নিম্নদিকে যেতে থাকে। এর মূল কারণ চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ। সে কারণে স্থানীয় মোট উৎপাদন মূল্য, আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য ও পণ্যবাণিজ্য হ্রাস পায়। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলাই বাহুল্য। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ ও মহাসাগর শিপিং শিল্প হলো হংকংয়ের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। বিক্ষোভে এই দুটি ব্যবসাই ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরেই চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে এঁটে উঠতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্র হংকং ইস্যুতে চীনকে চাপে রাখতে চাইছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো তাই জল আরও ঘোলাটে করছে। হংকং পুরো এশিয়ার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। গত বছরই হংকং, ম্যাকাওসহ গুরুত্বপূর্ণ নয়টি শহর এবং চীনের মূল ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ শহর চুহাইকে সংযুক্ত করে নির্মিত হয়েছে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সেতু। ফলে এ অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই সেতু নির্মাণ করে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভে আরেকটু আঘাত হেনেছে চীন। এখন স্বাভাবিকভাবেই হংকংয়ে সংকট সৃষ্টি করে চীনকে একহাত দেখে নিতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।

হংকংয়ে সংকট সৃষ্টি হওয়ার পর বেইজিং অবশ্য ওয়াশিংটনকে এই ব্যাপারে নাক গলাতে বারণ করে।মার্কিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের ‘চীন-বিরোধী’ ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করা এবং ভিত্তিহীনভাবে চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করাকেও নিন্দা জানিয়েছে চীন।

তবে হংকংকে কেন্দ্র করে চীনের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী নাজুক ইস্যু তৈরি করে রাখা এবং এই ইস্যুটিকে জিইয়ে রেখে চীনকে অস্বস্তিতে রাখা যে যুক্তরাষ্ট্রের তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এজন্য চীনের প্রয়োজন হংকং ইস্যুটিকে চিরস্থায়ীভাবে সমাধান করা। হংকংবাসীদের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের মন মানসিকতায় ফারাক আছে অবশ্যই। হংকং ১৫৬ বছর ছিল ব্রিটিশ অধীনে। ঔপনিবেশিক শাসনে তাদের মনমানসিকতা কিছুটা ভিন্ন হয়ে গেছে। তারা পুঁজিবাদে অভ্যস্ত। এর বিপরীতে চীনের ‘বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র’কে তারা মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারছে কিনা বা পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

মনোভাবের এই দূরত্ব দূর করতে চাই মূলভূখণ্ডের সঙ্গে হংকংয়ের অধিবাসীদের আরও বেশি সাংস্কৃতিক আদান প্রদান।

সম্প্রতি ‘কুয়াংতুং-হংকং-ম্যাকাও বৃহত্তর উপসাগর এলাকার সাংস্কৃতিক ভূমিকা’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ফোরাম চীনে অনুষ্ঠিত হয়। সেই ফোরামে হংকংয়ের প্রশাসক ক্যারি ল্যাম ছেং বলেন কুয়াংতুং-হংকং-ম্যাকাও বৃহত্তর উপসাগর এলাকা চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। প্রকৃত কথা হলো, কুয়াংতুং- হংকং-ম্যাকাও ও চীনের মূল ভূখণ্ডের যুব সমাজ ও সামগ্রিক অধিবাসীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান যত বাড়বে, যত বেশি পারষ্পরিক সম্পর্ক উন্নত হবে, মানসিক দূরত্ব ততো কমবে। একটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠির মধ্যে পারষ্পরিক আদান প্রদান ও যোগাযোগ বৃদ্ধিই পারে জনগণের মধ্যকার ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে। শান্তিপূর্ণভাবে হংকং সংকট সমাধানের এটাই বোধহয় টেকসই পথ।

শান্তা মারিয়ালেখক; সাংবাদিক।

One Response -- “হংকং সংকট: সমাধান কোন পথে?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—