বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে বিজেপি ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের খোলনলচে বদলে দেওয়ার যে চক্রান্ত এতদিন ধরে করছিল, তা অবশেষে বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাশ্মীরকে প্রদত্ত সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার এবং ৩৫-এ ধারার অবলুপ্ত করল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে কাশ্মীর যে ধরনের সুযোগ পেয়ে এসেছে বা পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতবর্ষে যে ধরনের সুযোগ পেয়েছে, যেমন সুযোগের দৃষ্টান্ত ফরাসি সাম্রাজ্যে আলজেরিয়ার ক্ষেত্রে আছে- সেখান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছে দ্বিতীয় দফার নরেন্দ্র মোদি সরকার।

কাশ্মীর সম্পর্কে মোদি সরকার যে সিদ্ধান্ত নিলো তা একদিকে যেমন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষকে ভারতবর্ষের মূলস্রোত থেকে বিভাজিত করার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করবে,  তেমনি গোটা দেশের মুসলমান সমাজের ভেতরেও একটা গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

গোটা প্রক্রিয়াটাই আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি যে বিভাজনের রাজনীতি করতে চায়,  সেই বিভাজনের রাজনীতিকেই আরো সুযোগ করে দেবে।  চরম রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ভাবনার উপর ভর করে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি আজ দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বার কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর এবং ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

ভারতের একমাত্র মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হিসেবে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যটিকে রাজনৈতিক  হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বরাবরই তাদের ফ্রন্টলাইন হিসেবে দেখে এসেছে। কাশ্মীর নিয়ে যেকোনও আলোচনাতেই তারা শরৎচন্দ্রের গরুর রচনার  মতো ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলালের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং তার দল জাতীয় কংগ্রেসের মুসলিম তোষণের রাজনীতির কথা বলে থাকে। কংগ্রেসের পাশাপাশি একইভাবে মুসলিম তোষণের তথাকথিত অভিযোগে তারা ভারতবর্ষের বামপন্থী রাজনীতির লোকেদের,  বিশেষ করে কমিউনিস্টদের- অভিযুক্ত করে থাকে।

সংঘ পরিবার দাবি করে যে, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক তথা তাদের প্রথম যুগের রাজনৈতিক সংগঠন জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি নাকি এই ৩৭০ ধারা বিলোপের দাবিতেই কাশ্মীরের জেল হেফাজতে প্রাণ দিয়েছিলেন!‍

গত ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপি যখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা, আরএসএস, তথা গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের একান্ত নিজস্ব কর্মসূচি সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ও ৩৫-এ ধারা অবলুপ্তির দাবিকে উগ্রতা দিতে শুরু করে।

২০১৪ সালে হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা প্রভাবিত একটি তথাকথিত সমাজসেবী সংগঠন ‘উই দ্য সিটিজেন্স’ সংবিধানের ৩৫-এ ধারার সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি জনস্বার্থে মামলা দায়ের করে দেশের সুপ্রিম কোর্টে। সেই সময় জম্মু-কাশ্মীরে ক্ষমতাসীন পিডিপি সরকার, তাদের জোটসঙ্গী বিজেপির আপত্তি অগ্রাহ্য করে ও সেই মামলার তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আইনজীবী কে কে বেনুগোপাল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের স্পষ্ট অভিমত জানাতে অস্বীকার করেন ।তিনি বৃহত্তর বিতর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন। বেনু গোপালের সুপারিশ অনুযায়ী মামলাটি সেই সময় প্রধান বিচারপতি জে এস খে হার এবং বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের এজলাস থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিল তিন সদস্যের বেঞ্চে কাছে ।

এই শুনানিটিও এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিজেপি প্রভাবিত জম্মু কেন্দ্রিক ‘ওয়েস্ট পাকিস্তান রিফিউজিস অ্যাকশন কমিটি’ সংবিধানের ৩৫ এ ধারাটি রোধের দাবি জানিয়েছিল। ২০১৭  সালে আইনজীবী চারু ওয়ালি খান্না ৩৫-এ আইনে কাশ্মীরের মহিলাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে এবং সেটি ভারতীয় সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারার পরিপন্থী বলে আর একটি পৃথক আবেদন করেন।

এই সময়ে একই দাবি নিয়ে আরো দুটি আবেদন করেছিলেন কালি দাস ও রাধিকা গিল। মূল আবেদনের বিরোধিতা করে ন্যাশনাল কনফারেন্স, সিপিআই (এম) এবং পিডিপি আদালতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তাদের অভিমত জমা দিয়েছিলেন। চলতি বছরে সবকটি আবেদনের শুনানি শুরু করার কথা ঘোষণা করেছিলেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি এল নাগেশ্বর রাও এবং বিচারপতি সঞ্জীব খান্নাকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের ডিভিশন বেঞ্চ।

এরপর পুলওয়ামা কাণ্ড, লোকসভা নির্বাচন ইত্যাদির কারণে এই শুনানি হওয়া সম্ভব না হলেও খুব শিগগিরই যে এই শুনানি শুরু হবে সেই সম্ভাবনা স্পষ্ট ছিল। এইরকম একটি প্রেক্ষিতে, কার্যত জরুরি অবস্থার সময়কালে যেভাবে ইন্দিরা গান্ধী মধ্যরাত্রে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি কে দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন, সেই রকমই সংসদ চলাকালীন, কার্যত সংসদকে এড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করিয়ে, পরে সেটিকে লোকসভায় ঘোষণা করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়কালে কাশ্মীরের হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দাবির প্রেক্ষিতে কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিংয়ের যাবতীয় কুচক্রী ভাবনাকে হেলায় অস্বীকার করে সে রাজ্যটির মানুষদের ঐকান্তিক চেষ্টাতে ভারতভুক্তির ভেতর দিয়ে যে সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশ রচিত হয়েছিল, সেই পরিবেশটিকে নষ্ট করবার ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ  ধারা অবলুপ্তি করার সিদ্ধান্ত একটি বড় ভূমিকা পালন করবে ।

ক্ষমতা হস্তান্তরের কালে দেশের অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলির প্রশাসনিক বন্দোবস্ত বিষয়ক যে আইন ছিল তার ২৩৮ নং ধারা থেকে জম্মু কাশ্মীর কে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। ফলে জম্মু-কাশ্মীরের নিজস্ব সংবিধান তৈরির ক্ষেত্রে কোনও বাধা ছিল না। জম্মু কাশ্মীরে ভারতীয় সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হলেও ভারতভুক্তি দলিলে উল্লেখিত বিষয়গুলি ছিল ।

জম্মু কাশ্মীরে ভারতীয় সংসদের আইন প্রয়োগের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়। ভারতভুক্তি দলিলে উল্লেখিত যে সমস্ত বিষয়গুলি ছিল তার ভেতরে দেশের রাষ্ট্রপতি একটি সাংবিধানিক নির্দেশের  মধ্যে দিয়ে এই বিষয়ে যাবতীয় আইন জম্মু-কাশ্মীরে জারি করতে পারবেন রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে- এই কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল।

তবে অন্যান্য বিষয়ে আইনের  ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নির্দেশ ছাড়াও লাগবে জম্মু-কাশ্মীরের সরকারের সম্মতি। তাছাড়াও জম্মু কাশ্মীরের ভারতভুক্তি সংক্রান্ত চুক্তি ১ ডি  উপধারাতে বলা হয়েছিল- সংবিধানের কোনও কোনও অংশ জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে, অথবা কিছুটা অদল বদলের আকারে প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সেটা রাষ্ট্রপতিকে একটি সাংবিধানিক নির্দেশের মাধ্যমে ঘোষণা করতে হবে সে কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল।

এখানে খুব পরিষ্কারভাবে বলা দরকার যে, ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীরে ৩৭০ নম্বর ধারায় যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল সেটি যখন প্রস্তাবিত হয় এবং গৃহীত হয়, তখন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন সর্দার প্যাটেলের মতোই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ।

মজার কথা হল শ্যামাপ্রসাদ কিন্তু একটি বারের জন্যও এই ৩৭০ নম্বর ধারার প্রস্তাব এবং সেটি গৃহীত হওয়ার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের কথা কল্পনা করেন নি। বরঞ্চ ৩৭০ নম্বর ধারা নিয়ে শ্যামাপ্রসাদের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে জম্মু-কাশ্মীর গণপরিষদের এক ভাষণে শেখ আব্দুল্লাহ যখন বক্তব্য দেন, হিন্দুত্ববাদিদের পক্ষ থেকে তার বিরোধিতা করে একটি শব্দ উচ্চারিত হয়নি।

নেহরু – শেখ আব্দুল্লাহ চুক্তির যে বিষয়গুলিকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদিরা এই দুই জাতীয় নেতার সমালোচনা করে ৩৭০ নম্বর ধারা ও ৩৫-এ ধারার অবলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছিল এবং অবশেষে আজকে তার অবলুপ্তি ঘটালো, তারা কিন্তু একটিবারও এ কথা বলেননি যে, ওই চুক্তিতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে সুরক্ষা বিদেশনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা এই তিনটি বিষয় ছাড়া অন্যান্য সব বিষয়ে কাশ্মীরের আইনসভার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি সেই চুক্তিতে আছে।

সেই চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে বলা ছিল যে, ভবিষ্যতে কাশ্মীরের আইনসভা কোন কোন বিষয়ে আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা ভারতীয় সংসদের হাতে তুলে দিতে পারে। তাছাড়া ভারতীয় সংবিধানের কেন্দ্র রাজ্য ও সংযুক্ত তালিকায় উল্লেখিত বিষয়গুলির বাইরে নতুন বিষয়ে আইন তৈরি করার ক্ষমতা কাশ্মীরের আইনসভাকে দেওয়া হয়েছিল।

ওই চুক্তিতে জম্মু-কাশ্মীরের ডোগরা বংশানুক্রমিক শাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে এই ডোগরা শাসকদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদিদের একটি বিশেষ রকমের আদর্শগত এবং শ্রেণিগত সখ্যতা আছে ।

সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে পরিষ্কার বলা হয়েছিল সদর-ই-রিয়াসাত নির্বাচন করবেন কাশ্মীরের আইনসভা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এবং তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রপতি দ্বারা স্বীকৃত হবেন।

ওই চুক্তিতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল, জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দারা ভারতবর্ষের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হবেন। আর জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার হাতে রাজ্যে স্থায়ী বাসিন্দাদের বিশেষ অধিকার ও সুযোগ সুবিধা সংক্রান্ত আইন পাশ করবার ক্ষমতা থাকবে। ভারতবর্ষের সংবিধানের স্বীকৃত মৌলিক অধিকারগুলি কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে বলবৎ থাকবে। তবে সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত মৌলিক অধিকার ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না একথা নেহেরু-আব্দুল্লাহ চুক্তিতে খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল ।

ভারতের রাষ্ট্রপতির আপদকালীন পরিস্থিতি ঘোষণা করার ক্ষমতা কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, কিন্তু আভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য আপদকালীন পরিস্থিতি ঘোষণা করতে হলে জম্মু কাশ্মীর রাজ্য সরকারের সম্মতি লাগবে- এ কথা খুব পরিষ্কার করে সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল।

দেশের অন্যান্য অংশের সাথে জম্মু-কাশ্মীরের মামলা-মোকদ্দমা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে সে কথা চুক্তিতে বলা হয়েছিল। কাশ্মীরের ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার বিষয়ক মামলাগুলির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই অধিকারের স্বীকৃতি সেখানে দেওয়া হয়েছিল।

কাশ্মীরের অর্থনৈতিক সম্পর্কের খুঁটিনাটি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলাপ-আলোচনার সংস্থান সেই চুক্তিতে রাখা হয়েছিল। জম্মু-কাশ্মীরের আইন সভার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল রাজ্যে স্থায়ী বাসিন্দা কারা হবেন তা নির্ধারণের ক্ষমতা। সরকারি চাকরি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি বিষয়ে স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ অধিকার এবং সুযোগ সুবিধার বিষয়টিও সেই রাজ্যের আইনসভার হাতেই ন্যস্ত ছিল।

 ৩৭০ নম্বর ধারার ১-ডি উপধারাতে জম্মু-কাশ্মীরে ভারতবর্ষের সংবিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে সমস্ত সম্ভাবনা এবং আধুনিকতার কথা বলা হয়েছে, ৩৫-এ ধারাতেঠিক তা-ই ছিল- সেটা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। 

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে কাশ্মীরের রাজনীতিতে বেশকিছু অদল বদল ঘটে। ১৯৫৩  সালে শ্রীনগরে একাধিক সভায় শের-ই-কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লাহ দিল্লি চুক্তি নিয়ে তার অসন্তোষের কথা জানিয়েছিলেন। সেই বছরের অগাস্ট মাসে শেখ আব্দুল্লাহকে বিধানসভায় শক্তি পরীক্ষার কোনো রকম সুযোগ না দিয়েই সে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন তৎকালীন কাশ্মীরের  তৎকালীন সদর-ই-রিয়াসত করন সিং, যিনি ছিলেন কংগ্রেসের একদম পকেটের লোক।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ কুখ্যাত কাশ্মীর ষড়যন্ত্র মামলায় ১৮ বছর তিনি কারারুদ্ধ অবস্থায় থাকেন। এই গোটা ঘটনাটি ঘটানোর পেছনে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন তৎকালীন কংগ্রেস দল একটি বড় রকম ভূমিকা পালন করেছিল।

এই ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে কংগ্রেস দল সেই সময় শেখ আব্দুল্লাহের  সহযোগী বকশি গোলাম মোহাম্মদ-কে কার্যত নিজেদের এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে কাশ্মীরের সংগ্রামী মানুষদের আবেগ, গোটা ভারতবর্ষের প্রতি তাদের ভালোবাসা , ভারতবর্ষের জাতীয় সংগ্রামে তাদের ঐতিহাসিক অবদানকে নিছক দলীয় স্বার্থে অস্বীকার করে কাশ্মীরের গোটা পরিস্থিতিকে জটিল থেকে জটিলতর হতে দিতে সাহায্য করেছিল।

Responses -- “কাশ্মীর: ধর্ম-নিরপেক্ষ সংবিধান ধ্বংসে বিজেপি”

  1. সাজ্জাদ সৌম্য

    কাশ্মীর নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।
    তবে মেহবুবা মুফতির একটা উক্তি আমাকে ভাবায়। তার মতে, ৩৭০ ধারা বাতিল কাশ্মীরে চলমান বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ মানসিকতাকে আরো উস্কে দেবে।
    অমিত শাহর মতো একজন চাণক্যের এই কুটিল বুদ্ধি ভারতকে ভবিষ্যতে আরো ভোগাবে। ৪৭ এর পর ভারতের এতগুলো সরকারকে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কোনো মাথাব্যথায় ভোগায়নি। কিন্তু বিজেপি একাই সব ব্যথা নিজের মাথায় ধারণ করে নিল। লেট’স ওয়েট অ্যান্ড সি সাম্প্রদায়িকতার পাগলা ঘোড়ায় চেপে বিজেপি কতদূর যেতে পারে?
    স্বায়ত্তশাসিত এবং সাংবিধানিকভাবে বিশেষ মর্যাদায় স্বীকৃত একটি রাজ্যকে রাতারাতি এতটা হীন করে ফেলাটা মোদি গংয়ের রাষ্ট্রীয় এবং ঐতিহাসিক ভুল হলো কিনা সময়ই বলে দেবে।

    Reply
  2. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    জম্মু কাশ্মীর থেকে উঠে গিয়েছে স্পেশাল স্ট্যাটাস। স্তব্ধ উপত্যকাজুড়ে শুধু একটা কথাই যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- ভারত কাশ্মীরিদের নয়, এর জমিটুকুই চায়। আরও সহজে বললে, কাশ্মীরের মানুষ নয়, মাটি চায় ভারত। বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে কাশ্মীরের দুর্ভাগ্যের এ চিত্র উঠে এসেছে। সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা ৩৭০ ধারা বিলোপের একদিন না যেতেই বিতর্কিত মন্তব্য করলেন মোদির শিষ্য ‘যোগী রাজ্যের’ এক বিজেপি বিধায়ক। কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ড করার আনন্দ-উৎসব চলছিল উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরে। মঙ্গলবার খাতাওলির বানকোট হলের ওই উৎসবের মাঝেই বিধায়ক বিক্রম সাইনি দলীয় কর্মীদের বলেন, ‘ফর্সা টুকটুকে কাশ্মীরি মেয়েদের বিয়ে করতে পারবেন। আর কোনো বাধা রইল না।’শুধু এটুকুতেই থেমে থাকেননি ওই বিধায়ক। বরং বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেন বিজেপির সর্বোচ্চ অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম করে। কারণ তিনি বলেন, ‘মোদিজি আমাদের স্বপ্নপূরণ করেছেন। কর্মীরা আজ ভীষণ খুশি। বিজেপি কর্মীরা উচ্ছ্বাস করছেন। আগে কোনো কাশ্মীরি মেয়ের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের কারও বিয়ে হলে নাগরিকত্ব বদলাতে হতো। উপত্যকার মেয়েদের বাইরে বিয়ে হলে নাগরিকত্ব বাতিল হতো। এবার আর বিয়েতে কোনো বাধা রইল না। ওখানের ফর্সা-সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করতে পারবেন উত্তরপ্রদেশের নাগরিকও।’এর আগেও বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছিলেন এ বিজেপি নেতা। নিউ ইয়ার উদযাপন নিয়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি বলেন ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন বন্ধ করা উচিত কারণ এটি কোনো হিন্দু উৎসব নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বলেন, যারা ভারতে থেকে অনিরাপদবোধ করেন তারা অবশ্যই ভারতবিরোধী- তাদের বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়া উচিত, এরপরই ফেব্রুয়ারিতে এ নেতা পারমাণবিক বোমা দিয়ে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দেয়ার কথাও বলেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেন, আমি আমার স্ত্রীকে আরও সন্তান জন্ম দেয়ার কথা বলেছি যাতে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় কিন্তু সে বলেছে দুটি সন্তানই যথেষ্ট আমাদের জন্য। সোমবার রাজ্যসভায় বিল পাস হওয়ার পর মঙ্গলবার ৩৭০টি ভোট পেয়ে পাস হয়েছে ৩৭০ ধারা বিলোপের বিল। পাস হয়ে গিয়েছে জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখকে পৃথক দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার প্রস্তাবও।

    Reply
  3. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি ও রাশিয়া পোল্যান্ডকে অধিকার করে নিজেদের মধ্যে পোল্যান্ড রাজ্যটি ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। বিজেপির এর পরের টার্গেট হবে বাংলাদেশ। বিজেপি ফাঁকা মাঠে একটার পর একটা গোল দিয়ে চলেছে। জম্মু–কাশ্মীর নিয়ে যা করল, তা তো রীতিমতো ধামাকা! কারও কোনো পরোয়া নেই। কাউকে তোয়াক্কা করারও নেই। গণতন্ত্রে যাকে বলে ‘ব্রুট মেজরিটি’, সেই শক্তিতে ভর দিয়ে বিজেপি সংসদের ভেতর ও বাইরে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের যাবতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ‘অ্যাজেন্ডা’ সাকার করতে। করবে নাই–বা কেন? তারা বুঝে গেছে বিরোধীরা ছত্রখান। কারও ফুসফুসে বিন্দুমাত্র দম নেই। সংসদ অচল করে দেওয়ার মুরোদ নেই। শাসকের ইচ্ছাই প্রথম ও শেষ কথা। এই কদিন আগে ৪৯ জন বিশিষ্ট মানুষ উদ্বেগভরা চিঠি লিখলেন প্রধানমন্ত্রীকে, যাতে ধর্মের নামে গণপিটুনি ও হত্যা বন্ধ হয়। সেটা যেন ছিল আগুনে ঘৃতাহুতি! দুই দিনের মধ্যেই ৬২ জন অন্য বিশিষ্ট মানুষ পাল্টা খোলা চিঠি লিখলেন। তাতে প্রবল বাপবাপান্ত করা হলো ওই ৪৯ জনের মানসিকতার, ‘একচোখোমির’ এবং ‘ভণ্ড ধর্মনিরপেক্ষতার’। গোহত্যার নামে গণপিটুনি ও গণহত্যার ধারকাছ দিয়ে না হেঁটে তাঁরা টেনে আনলেন অন্য বহু ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা দেখা সত্ত্বেও কেন তাঁরা একই রকম প্রতিবাদী হননি, সেই প্রসঙ্গ। বলা হলো, এঁরা বিদেশের কাছে দেশের উঁচু মাথা হেঁট করছেন। মোদির স্বপ্নের ভারত গড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। দেশদ্রোহিতাকে সমর্থন করছেন। অসমীয় জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে আসামের ক্ষুদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠীকে সব রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রয়াস হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভাজন এবং এর থেকে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ যে শুধু ভারতের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, সেটি বুঝতে তেমন একটা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রয়োজন হয় না। এতসংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিতকরণের প্রক্রিয়াটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাংলাদেশের। বিজেপি নির্বাচনী প্রচারণায় আসামে তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়নের বিষয়টিকে যেভাবে জোর দেওয়া হয়েছিল এবং নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের পর নাগরিকত্বের তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আর যা-ই হোক, এই তালিকা প্রস্তুত যে নির্বাচন-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি নয়, সেটি নিশ্চিত; বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন বলেই ধরে নেওয়া যায়। এমনকি বিজেপির এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রক্রিয়াটিকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও ভবিষ্যতে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। খোদ সুপ্রিম কোর্টের যে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে, সেই সিদ্ধান্তেই আসামের অবৈধ অধিবাসীদের বাংলাদেশেই ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে। তাই এই পুরো প্রক্রিয়াকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ ধরে নিয়ে চিন্তামুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। শরণার্থী সংকটের বাইরেও এই বিভাজনমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি আসামে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার যে নতুন মাত্রা যোগ করবে, তা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে কতটা আঘাত হানবে, সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত নাগরিকত্বের তালিকা প্রকাশ সামনে রেখে তাই বাংলাদেশের সঠিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নির্ণয় করা অতি জরুরি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—