“আমাদের পরিবারটা ছিল বড়। সাত ভাই ও তিন বোনের সংসার। পঞ্চম আমি। আব্বা ছিলেন এইচএমভি ডাক্তার। কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন। হাসান হাফিজুর রহমানের ছোটভাই ডা. ফারুক। তিনি ছিলেন আব্বার ঘণিষ্ঠ বন্ধু। দুইজনই ভাল ডাক্তার। চিকিৎসা করতেন গ্রামেই। বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে ফারুক চাচা এসে ট্রিটমেন্ট করতেন। আর উনাদের বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে আব্বা যেতেন। প্রসবের সময় ব্যাথা কমাতে হোমিওপ্যাথির একটা ভাল ওষুধ দিতেন আব্বা। দূর-দূরান্ত থেকে বহু লোক এসে সে ওষুধ নিত। এলাকায় বেশ নাম ডাক ছিল তার।

আমাদের জমি-জমা ছিল অনেক, একটা দাগেই ছাব্বিশ বিঘা। বর্গা বাড়ি থেকে ধান আসতো ঘোড়ার গাড়িতে। এক সময় ওই জমিগুলো চলে যায় যমুনার ভাঙনে। আব্বার পক্ষে তখন সংসার চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে তিন মাইল দূরে ছিল বাহাদুরাবাদঘাট। ওখানে আব্বা একটা চেম্বার করেন। উনি ফিরতেন অনেক রাতে। এক রাতে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। অন্ধকার পথ পেরিয়ে আব্বা আসেন বাড়িতে। এসেই মাকে বললেন- ‘সাপে কাটছে আমারে।’ মা দ্রুত পা-টা বেধে দেন। আব্বা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ওই দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা ধুপ করে ওঠে। পাশের গ্রাম থেকে আনা হয় ওজা। রাতভর চেষ্টা করে সকালে বিষ নামে আব্বার শরীর থেকে। ভেবেছিলাম তিনি মরেই যাবেন। ওই রাতটা কাটে নানা শংকায়। এখনও মনে হলে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।”

বাল্যকালের নানা স্মৃতিচারণ এভাবেই তুলে ধরেন মুক্তিযোদ্ধা মো.মিজানুর রহমান খান বীরপ্রতীক। এক বিকেলে তার বাড়িতে বসেই কথা চলে। আলাপ হয় যুদ্ধদিনের নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। মিজানুর রহমান খানের পিতার নাম ডা. রিয়াজুল ইসলাম খান আর মা নুরুন্নাহার খানম। বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার কুলকান্দি গ্রামে। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি কুলকান্দি টিকে প্রাইমারি স্কুলে। ১৯৬৯ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন গোঠাইল হাই স্কুল থেকে। এরপর চলে আসেন জয়দেবপুরে, বড় ভাই নজরুল ইসলাম খানের কাছে। ইন্টারমেডিয়েটে ভর্তি হন ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র।

স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “রওশন আলম খান, কামরুল হাসান খান, হারুন-অর-রশিদ খান, সুরুজ্জামান, বদরুল, আন্জু এরাই ছিল বন্ধু। পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলাম না। তবে শান্ত ছিলাম। ফুটবল, দারিয়াবান্দা ও হাডুডু খেলতাম। বাইন নদী আর ছোট নদীতে মাছ ধরছি বরসি আর ঠেলা ঝাল দিয়ে।”

“তখন টিচারদেরকে যমের মতো ভয় পেতাম। টিকে প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন আব্দুল গফুর খান। সম্পর্কে বড় মামা। এক বাড়িতেই থাকতাম। উনি খড়ম পায়ে হাঁটতেন। খট খট শব্দ হতো। আমাদের বাড়িটা ছিল বেশ লম্বা। বাড়ির এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত হাঁটতেন তিনি। যতক্ষণ খড়মের শব্দ হতো ততক্ষণ পড়তে হতো। তখন নতুন বই ছিল না। অন্যের পুরাতন বই-ই পড়তাম আমরা। আগের টিচাররা জ্ঞান রাখতেন। সেই জ্ঞান ছাত্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়াটাকেও দায়িত্ব মনে করতেন। এখন এটা নেই। অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস শিশুদের মাথায় এখন ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি। সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি…।’ কত সুন্দর কথা। এমন উপদেশমূলক কবিতা তো এখন শিশুরা শিখছে না।”

মিজানুর রহমান খান রাজনৈতিক জ্ঞান লাভ করেন তার বড় নজরুল ইসলাম খানের কাছে। তিনি জয়দেবপুর মেশিন টুল্স ফ্যাক্টরিতে চাকুরি করতেন। তখন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতিও ছিলেন। ফলে কলেজে ভর্তি হয়েই মিজানুর রহমানও যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের কোষাধক্ষ্য ছিলেন। ওই সময় ছাত্র আন্দোলনে নানা মিছিল মিটিংয়েও যুক্ত থাকতেন তিনি।

১৯৭০ সালে নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ জয় লাভও করল। সবাই তখন খুশি। বাঙালিরাই এবার দেশ চালাবে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা দিতে টালবাহান শুরু করে। ফলে সারাদেশে আন্দোলন দানা বাধতে থাকে। অ্যাসেম্বলি ডাকা হয় ৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখে।

এরপর কী হলো?

সে ইতিহাস শুনি মিজানুর রহমানের জবানিতে। তার ভাষায়-

“১ মার্চ ১৯৭১। কলেজ থেকে ফিরছি। জয়দেবপুর রেল ক্রসিংয়ের পাশে একটা পুরানা বটগাছ ছিল। ওখানে এসেই হতভম্ব হই। মানুষজন নেই। দোকানপাট সব বন্ধ। একজন বলল, তিন তারিখের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। পুরা দেশ অগ্নিস্ফূলিংগের মতো ঝলে উঠে। কল-কারখানা, হাট-বাজার, স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যায়।”

“ভাওয়াল রাজবাড়ির পাশেই ছাত্র ইউনিয়নের মিটিং হয়। প্রস্তাব উঠে ট্রেনিং করার, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং। একজন বাঙালি নন-কমিশনড অফিসারের সাথে কথা হয়। পরদিনই উনি লিচু বাগানে বাঁশের লাঠি আর ডামি রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং করানো শুরু করেন। ট্রেনিং করি আমরা ২০-২৫ জন। কাঞ্চন, হাতেম, আতিক, সিরাজ প্রমুখও ছিল। এরপর খবর আসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সিদ্ধান্ত হয় রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার।”

“মার্চের প্রথমেই জয়দেবপুরে সর্বদলীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। যার হাইকমান্ডে ছিলেন হাবিবুল্লাহ মাষ্টার, এম এ মোতালেব, ডা. মনিন্দ্র নাথ গোস্বামী। পরিষদের সেক্রেটারি ছিলেন আ ক ম মোজাম্মেল হক (বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রী)। মিজানুর রহমানের বড় ভাই নজরুল ইসলাম খান ছিলেন কোষাধক্ষ্য। সদস্য ছিলেন- হারুনুর রশিদ, আবুল হোসেন প্রমুখ। তখন এই সর্বদলীয় মুক্তিসংগ্রাম পরিষদই জয়দেবপুরের আন্দোলনটা নিয়ন্ত্রণ করেছিল।”

বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার আকাশে প্রতিদিনই বহু হেলিকপ্টার টহল দিতে থাকে। কিছু ঘটবে। লোকমুখে শুনেছি ওরা ট্যাংক আর কামান নিয়ে প্রস্তুত। কী হবে দেশে? বড় ভাই রেসকোর্স ময়দানে মিজানুর রহমানকে যেতে দিলেন না। কিন্তু উনি নিজে গেলেন।
মিজানুর বলেন-‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে নজরুল ভাই আসলেন অনেক রাতে। আমরা তো টেনশনে। উনি এসেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাগুলো বললেন। পরদিনই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন গ্রামে, কুলকান্দিতে। ওখানে আনসার অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন মুসা চাচা। উনার মাধ্যমে বিশ-পচিশজন বাঁশের লাঠি নিয়ে ট্রেনিং শুরু করি, মিয়াবাড়ির মাঠে।”

“গ্রামে ফকা দুলাভাই ইপিআরের সুবেদার ছিলেন। উনার একটা রেডিও ছিল। সেখান থেকেই খবর শুনতাম। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে আর্মিরা। পরদিন গ্রামের যুবক বয়সীদের নিয়ে হাসান ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা বাহাদুরাবাদ ঘাটে গিয়ে মিছিল করি কালো পতাকা নিয়ে। ২৮ মার্চ তারিখে নজরুল ভাই চলে আসেন জয়দেবপুর থেকে। উনিও যুক্ত হন আমাদের সঙ্গে।”

“জামালপুরে আর্মি চলে আসে এপ্র্রিলের মাঝামাঝিতে। তখনই যুবকরা ভারতে চলে যেতে থাকে। আঠাশ তারিখ চলে যান নজরুল ভাইও। কিন্তু আব্বা আমাকে যেতে দেন না।”

আপনাদের ওখানে আর্মি গেল কবে?

“৯ জুলাই। রাতের বেলা। বাবা এসে ডেকে বলেন- ‘গুলির শব্দ শুনলাম। তোমরা সাবধানে থেকো।’ তার কথা বিশ্বাস করলাম না। ভোরে ডেকে তুলে ছোটবোন। বলে- ‘গিয়া দেখ স্কুলের ওখানে কতজনকে মেরে ফেলে রাখছে।’ আমরা ছুটে গেলাম। টিকে স্কুলের পেছন দিক দিয়ে একটি রোড চলে গেছে বাহাদুরাবাদঘাটের দিকে। ওই রাস্তার পাশে ছোটনদীর পাড়ে পড়ে আছে মানুষের লাশ। দেখি সব আমাদের আত্মীয়। ফারুক চাচা, তার ভাই কাউসার চাচা, শাহজাহান চাচা, দোকানদার ছিল হামিদ ভাই, মেম্বার মুরাদ আলী খান, তসর আলী খান প্রমুখ। এরা একেবারেই নিরীহ ছিল।”

“কয়েকদিন আগে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল নৌকায় ছোটনদী দিয়ে এসে টিকে স্কুলে উঠে। গ্রামের লোকেরা তখন কেউ মুরগি দিয়ে, চাল দিয়ে তাদের সহযোগিতা করে। ওরা খেয়েই চলে যায়। এই খবর রাজাকার আর শান্তিকমিটির লোকেরা দিয়ে আসে পাকিস্তানিদের কাছে। ওরা ৯ জুলাই রাতে গ্রামে হানা দেয়। গুলি করে হত্যা করে নিরীহ নিরাপরাধ ১১জনকে। ভরসা ভাইসহ ১২জনকে নদীর পাড়ে দাঁড় করিয়েছিল। ফায়ারের আগেই ভরসা ভাই পড়ে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায়।”

“একদিন পরেই মামাতো ভাই হারুনুর রশিদ খান হিরুকে জামালপুর থেকে আর্মিরা ধরে নিয়ে যায়। এ খবর আমাদের মধ্যে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। আব্বা তখন অনুমতি দেন ভারতে যাওয়ার।”

ট্রেনিং নিলেন কোথায়?

মিজানুর রহমান বলেন, ‘১৫ জুলাই ১৯৭১। হাসানুজ্জামান খানকে নিয়ে বাড়ি ছাড়ি। পরনে ছিল আব্বার একটা টুপি আর পাঞ্জাবি। প্রথমে দেওয়ানগঞ্জের চিকাজানি গিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠি। ওরা বলে আজ তো যেতে পারবা না। বৃহস্পতিবারে সূর্যনগর বাজারে হাট। হাটে যারা যায় তাদের সঙ্গে চলে যেতে পারবা। আমরা চারদিন ওখানে থাকি। হাটের দিন সন্ধ্যায় সূর্যনগর বাজারে গিয়ে শুনি ওই এলাকায় মিলিটারিরা কম্বিং অপারেশন চালিয়েছে। ভয়ে কেউ আমাদের জায়গা দেয় না। একজনকে বলে রাত কাটিয়ে পরদিনই চলে যাই ভারতের মাহেন্দ্রগঞ্জে।”

“ওখানে থানার সামনে ট্রেনিংয়ের জন্য নাম লেখাই। ২৭ জুলাই রিক্রুটের জন্য লোক আসে। আমিসহ ৪০০-৪৫০জনকে ওরা নিল ট্রেনিংয়ে। চারটা কোম্পানি করা হয়। আমরা ছিলাম বদি কোম্পানিতে। কমান্ডার মাদারগঞ্জের বদি। সবমিলিয়ে ছিলাম একশোর ওপরে। ১২জন করে একটি গ্রুপ করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে একটা পাহাড়ে উঠে আমরা তাঁবু গাঁড়ি। ওখানেই চলে ট্রেনিং। ট্রেনিংয়ে বিএসএফের ধন বাহাদুর আর ক্যাপ্টেন নিয়োগীর কথা এখনও মনে পড়ে।”

যুুদ্ধ করেন কোথায় কোথায়?

“ট্রেনিং চলার সময়েই ছোট ছোট অপারেশনে আমাদের পাঠানো হত। ট্রেনিং শেষে এগার নম্বর সেক্টরের ধানুয়া কামালপুরে অপারেশন করেছি। সেখানে ১৮টি অ্যাটাকের ১৬টিতেই অংশ নিয়েছিলাম।”

কয়েকটি অপারেশনের কথা তুলেন ধরেন এই বীরপ্রতীক। তাঁর ভাষায়Ñ

“অগাস্টের ২ বা ৩ তারিখের ঘটনা। ট্রেনিং করছি। হঠাৎ খবর আসে ধানুয়া কামালপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা পেট্রোল পার্টিকে পাকিস্তানি আর্মিরা ঘিরে ফেলেছে। সবাই অস্ত্র হাতে ছুটে যাই। পাকিস্তানিদের ক্যাম্পের দিকে তাক করে গোলাগুলি শুরু করি। ওরা তো ট্রেন্ড সৈন্য। আমাদের দিকে তখন মর্টার শেল মারা শুরু করে। বামপাশে ছিল আমানুল্লাহ কবির (বীর বিক্রম)। আমার সহযোদ্ধা ও বন্ধু। হঠাৎ একটা মর্টারের স্প্রিন্টার পেটে লেগে তার নাড়িভুড়ি বেড়িয়ে যায়। সবকিছু ঘটছিল চোখের সামনে। আমরা কিছুই করতে পারিনি! এক সময় মর্টারের মুখে আমরাও পিছু হটি। নয়পাড়া গ্রাম হয়ে ফিরে আসি ক্যাম্পে। সকালেও একসঙ্গে নাস্তা করেছি আমানুল্লাহ কবিরের সঙ্গে। আর বিকেলেই সে বেঁচে নেই। ঠিক মেনে নিতে পারছিলাম না। অকাতরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য এভাবেই জীবন দিয়েছিল একাত্তরে। জীবনের মায়াও তখন ছিল না।”

“মাহেন্দ্রগঞ্জ ছিল এগার নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার। কর্নেল তাহের কমান্ডার। ওই সময় বদি কোম্পানি থেকে চলে আসি হেলাল কোম্পানিতে। ১৪ নভেম্বর তারিখে কর্নেল তাহেরকে রেসকিউও করেছিলাম। ওইদিন ছিল তার জন্মদিন। তার আগের দিন ঘোষণা করলেন- ‘কাল কামালপুর ক্যাম্প দখল করব।’ আমিসহ ১০জনকে ডেকে নিয়ে ওরিয়েন্টেশন দিলেন তিনি। নয়াপাড়া গ্রামের শেষ অংশে অপেক্ষা করবে। আমি আসলে তোমাদের নিয়ে কামালপুর ক্যাম্পে ঢুকব। ওরা সারেন্ডার করলে ওদের আর্মসের ট্রিগার খুলে পানিতে ফেলে দিবে। যা পরে ব্যবহার করা যাবে। আমরা অপেক্ষা করছি। এদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। তিনদিক দিয়ে ওদের ঘিরে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধারা। চু চু করে গুলি চলছিল। ওই দৃশ্য এখন কল্পনা করতেও ভয় লাগে। কখন মারা যাব তার নিশ্চয়তাও ছিল না।”

“কর্নেল তাহের এসেই বলেন ‘মুভ’। নয়াপাড়া গ্রামের শেষ প্রান্তে গিয়ে ক্রলিং করতে থাকি। ধানি জমি। কিন্তু কর্কশ মাটি। নোম্যান্স ল্যান্ড পাড় হয়ে পাকিস্তানি বান রোডে এসেই পজিশনে চলে যাই। তখন তুমুল গোলাগুলি চলে। মাত্র একশো গজ সামনে ছিল ওদের বাংকার। হঠাৎ দেখি কর্নেল তাহের গড়িয়ে নিচে পড়ে আছে। তার বাম পা রক্তে ভেজা। উনি একটা লাঠি ব্যবহার করতেন। হাতে ছিল একটা ওয়ারল্যাস। ও দুটো তুলে নিলাম। লেফটেনেন্ট মিজান, সুজা ভাইসহ আরও মুক্তিযোদ্ধারা আসলেন। আমরা কর্নেল তাহেরকে তুলে নিই। দূর থেকে পাকিস্তানিরা মর্টার মারে। মেশিন গানের গুলিও চলছেই। তার ভেতরেই আমরা ছুটে চলি।”

“উনাকে নয়াপাড়া গ্রামে নিয়ে একটা দরজার পাল্লায় শুইয়ে দিই প্রথম। অতঃপর নিয়ে যাই ইন্ডিয়ান আর্মিদের কন্ট্রোল রুমে। কর্নেল তাহের নিজের চিন্তা করছিলেন না। পা দিয়ে রক্ত পড়ছে। তবুও বলছেন, ‘তোরা আমারে রাখ। কামালপুর দখল করতে যা।’ এমন যোদ্ধা আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি।”

যে দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করলেন স্বপ্নের সে দেশ কি পেয়েছেন?

প্রশ্ন শুনে মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান বলেন, “দেশ অবশ্যই পেয়েছি। আজ বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের পতাকা সারাবিশ্বে উড়ছে। এটাই তো আমাদের অ্যাচিভমেন্ট। আজ পদ্মাসেতু করছি, বড় বড় বিল্ডিং, বড় বড় চুক্তি করছি বিদেশিদের সঙ্গে। এই দেশ স্বাধীন না হলে তো এটা সম্ভব ছিল না।”

মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভাগ হওয়াকে দুভার্গ্যজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা তো মুক্তিযোদ্ধাই। খেতাব পাইছি এটা কোন বড় ব্যাপার না। আমি যে দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করতে পেরেছি এটাই বড় কথা। মূলত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সুবিধার জন্যই মুক্তিযোদ্ধাদের দলীয়করণ করেছে। এটা হয়েছে সব সরকারের আমলেই।”

স্বাধীনতা লাভের এতো বছর পরেও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কেন বাড়ে?

তিনি বলেন, “ভুয়ারাই ভুয়া বাড়াইছে। অমুক্তিযোদ্ধারাই তাদের দল বাড়াতে অমুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দিয়েছে। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কীভাবে ভুয়া সনদ পায়! অসৎ লোকেরাই এটা করেছে।”

স্বাধীন দেশে রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের উত্থান প্রসঙ্গে এই বীরপ্রতীক বলেন, ‘এটা মুক্তিযোদ্ধাদেরই ব্যর্থতা। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি কিন্তু শত্রু মুক্ত করে যাইনি। যুদ্ধের পরেই রাজাকারদের শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল। আমরা সেটা করিনি। রাজাকারদের একটা তালিকাও হয়নি। ফলে রাজনীতির ছত্রছায়ায় এরা প্রভাবশালী হয়েছে।”

দেশ কেমন চলছে?

“অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশের অনেক উন্নতি করছেন। কিন্তু তার আমলে বিচারবহির্ভুত হত্যা ও অপমৃত্যুগুলো দেখলে খারাপ লাগে। গণতন্ত্র, কথা বলার স্বাধীনতা এগুলোর জন্যই তো আমরা পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করলাম। সেগুলো ঠিক রাখাও সরকারের দায়িত্ব।”

স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাল লাগার কথা জানাতে এই সূর্যসন্তান অকপটে তুলে ধরেন নিজের অনুভূতি। তার ভাষায়, “প্রজন্মকে দেখলে মন ভাল হয়ে যায়। এই প্রজন্মের হয়েও আপনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাবছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করছেন। এমন অনেক তরুণই আছে। যারা নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা চেষ্টা করছে। আমি মনে করি এটা দেশের জন্য অনেক বড় একটি বিষয়। কারণ দেশের সত্যিকারের ইতিহাসই সম্ভাবনার পথ দেখাবে।”

খারাপ লাগে কখন?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই বীর বলেন, “‘সমাজে অন্যায়টা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। এটা খারাপ লাগে। একজন অন্যায় পথে দুটি বিল্ডিংয়ের মালিক হলেই সে সফল ব্যক্তি। আর যে সততার সঙ্গে কাজ করছেন। সে হয়তো কষ্ট করেই চলছেন। অথচ সমাজে তাকে নিয়ে কোনো কথা হয় না। সকল প্রশংসা চলে যায় ওই বিল্ডিংয়ের মালিকের কাছেই। এটা বদলাতে হবে। কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অন্যায় আর দুর্নীতিও বন্ধ করতে হবে।”

নানা সমস্যা থাকলেও দেশ এগোচ্ছে। দেশটা আরও উন্নত হবে প্রজন্মের হাত ধরেই। তাই চোখেমুখে আলো ছড়িয়ে তাদের উদ্দেশে বীরপ্রতীক মিজানুর রহমান বলেন শেষ কথাটি, “তোমরা কথা ও কাজে সৎ থেকো। দেশটাকে মায়ের মতো ভালবেসো। লাল-সবুজের পতাকাকে তুলে ধরো সারাবিশ্বে।”

সংক্ষিপ্ত তথ্য
নাম : মুক্তিযোদ্ধা মো. মিজানুর রহমান খান বীরপ্রতীক।
ট্রেনিং করেন : ভারতের মাহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে।
যুদ্ধ করেছেন : এগার নম্বর সেক্টরের অধীনে ধানুয়া কামালপুরের ১৬টি অ্যাটাকেই অংশ নিয়েছিলেন। ১৪ নভেম্বর ১৯৭১ তারিখে কর্নেল তাহেরকে রেসকিউও করেছিলেন তিনি।

ছবি ও ভিডিও : সালেক খোকন

সালেক খোকনলেখক, গবেষক।

Responses -- “দেশ স্বাধীন করেছি কিন্তু শত্রু মুক্ত করে যাইনি!”

  1. আব্দুল্লাহ

    “জাসদ” কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে দিয়ে সেই আত্মঘাতী রাজনীতিটাই করিয়ে নিয়েছিল। এটা কোন ভাবেই জনগণকে সম্পৃক্ত করে গণ অভ্যূত্থানের পরিকল্পনা ছিল না, বরং সাধারণ সৈনিকদের উসকিয়ে দিয়ে অফিসারদের হত্যার করে দ্রুত ক্ষমতা দখলের অবাস্তব, ভুল ও হঠকারী চিন্তা। কৌশল ব্যর্থ হবার পর ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলা যার জন্য ছিল অবধারিত। জাসদ নেতারা সেটা পরিষ্কারই জানতেন। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসির মঞ্চে বলী দিয়ে হাসানুল হক ইনু ও তাঁর সহকর্মীরা আজও বেঁচে আছেন, রাজনীতি করছেন । পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ‘৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুরা সেনাবাহিনীতে সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী দিয়ে যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, ‘৭৫-এর ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় তাদের শক্তিকে প্রকাশ্যে এনেছিলেন। ১৫ই আগস্ট না ঘটলেও গণবাহিনী মুজিব সরকার উৎখাতের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলতো! কিন্তু কর্নেল আবু তাহের নাই। বাংলাদেশ একজন মুক্তিযোদ্ধা ও অকুতোভয় বিপ্লবীকে হারিয়েছে। সম্প্রতি শেখ হাসিনার আমলে তাঁকে আদালত নতুন করে ‘দেশপ্রেমিক’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেন আদালত সিদ্ধান্ত না দিলে আবু তাহের বাংলাদেশের জনগণের কাছে ‘দেশপ্রেমিক’ বলে গণ্য হতেন না। জিয়াউর রহমানের নিয়ে কর্নেল আবু তাহেরের ক্যু ভাবটা নাই বাদ দিলাম।শেখ মুজিবর রহমানকে ভালবাসবার বা তাঁর প্রতি আনুগত্যের কোন কারন কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের ছিল না। কিন্তু নতুন জাসদীয় রাজনীতি নিজেরা যেমন আওয়ামি লিগের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য বেচাইন হয়ে উঠেছিল, তেমনি তাদের প্রমান করতে হয়েছে আবু তাহেরও আদতে আওয়ামি লিগই করতেন। মহীউদ্দিন আহমদের লেখা প্রথম আলোর নিবন্ধে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুর খবরে সিরাজুল আলম খান বিচলিত হলেও আবু তাহের উল্টা কেন তার লাশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় নি সেই আক্ষেপ করেছেন। অর্থাৎ শেখ মুজিবর রহমানের প্রতি আবু তাহেরের অনুরাগ থাকা দূরের কথা বরং বিদ্বেষ ছিল। এটা জাসদকে আওয়ামি বান্ধব প্রমাণ করতে যারা গত কয়েক দশক ধরে কাজ করছেন তাদের জন্য নতুন এক বিড়ম্বনা।

    Reply
  2. নাজমুল

    ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানের দু’পক্ষে আলোচনা চলছে, সে আলোচনার মূল থিম প্রথমে ছিল পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষা করে বাঙ্গালীদের অধিকার আদায়ের। কিন্তু এই গ্রুপটি সমাজতান্ত্রিক পৃথক রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আলোচনাকে ঠেলে দেয় ভাঙ্গনের পথে। বাংলাদেশের পৃথক পতাকা তৈরি করে তা বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে সুকৌশলে উন্মোচন করে তারা এক প্রকার ক্যু করে ফেলে। স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্নে বিভর করে তারা দেশকে মুক্তিযুদ্ধে ঠেলে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় চার নেতার একজন ছিলেন এই সিরাজুল আলম খান। ভারতের সক্রিয় সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী থেকে আলাদা করে মুজিব বাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দান করা হয়। পেছনে সবসময় ক্রিয়াশীল ছিল এই বাম আদর্শভিত্তিক দলটি। যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের নিজেও একজন বামপন্থী হওয়া ছিল তাদের জন্য এক বিরাট লাভ। যোগ্যতার সর্বোচ্চ প্রদর্শনে এই মানুষটি বাঙ্গালীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম হন, ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথে দেশকে পরিচালনা করেন। বাম গোষ্ঠীটির পরিকল্পনা ছিল একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা এবং সুযোগ সন্ধানী বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাদের স্রোতে তাদের সে স্বপ্ন ভন্ডুল হওয়ার উপক্রম হয়। যদিও তারা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ভেতর প্রভাবশালী হতে পেরেছিল, তবুও সংখ্যায় এতো বেশি ছিল না যাতে করে স্বার্থপর লোভী আওয়ামী লীগারদের উপর বিজয়ী হতে পারে। এটি ছিল তাদের জন্য এক বিরাট স্বপ্নভঙ্গের ব্যাপার। এ পর্যায়ে বামদের মধ্যে বড় ধরণের বিভেদ তৈরি হয়। চীনপন্থি আর মস্কোপন্থি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে তারা। বামদের মধ্যে আদর্শগত মিল থাকলেও বাস্তব কর্ম্পন্থায় তারা শতধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ছাত্র ইউনিয়ন তার সেরা সময়টি পার করে ফেলেছিল। তার অসাধারণ মেধাবী প্রোডাকশনগুলোকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেয়া হয়। তাঁদের কাছে বিপ্লবী সুর্যসেনের বা মাও সে তুং এর আদর্শ ছিল স্রেফ গল্প। সরকারি কোষাগার লুট করে বিপ্লবীদের সাহায্য করার ধারনাই তাঁদের ছিল না বরং তাঁদের এক অংশ জনগনের সম্পদ লুট করতো আরেক অংশ মুল চেতনা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের টেবলেট গিলে ইয়াবা খোরের মতই নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেন। না কেউ বৈজ্ঞানিক হলেন, না দেশে সমাজতন্ত্র হল, প্রাণ গেল শুধু শুধুই ৩০০০০ কর্মির ! লক্ষাদিক কর্মির জীবন উচ্ছন্নে গেল। শেখ মুজিবের মৃত্যু ত্বরান্বিত হল! এই জাসদের জন্যই আওয়ামী লীগের ক্ষমতার বিরতি ২১ বছরে ঠেকলেও খুনী ও জঙ্গি ইনু-শাহজাহান খানরা কিন্তু ঠিকই মন্ত্রিত্ব পেলো ! কিন্তু স্বপ্ন দেখা সে হাজার লক্ষ যুবকের কি কোন গতি হলো?

    Reply
  3. শাহাদাৎ

    বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এটা সচেতন মানুষ মাত্রেই জানেন। প্রচলিত অর্থে বিপ্লব বলতে যা বুঝায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সে অর্থে কোনো বিপ্লব নয়, জাতীয়তাবাদী গণজাগরণ। কাজেই স্বাধীনতাযুদ্ধও নিশ্চিতভাবেই গণযুদ্ধ, সশস্ত্র বিপ্লবী লড়াই নয়। এই গণযুদ্ধ সংগঠনে ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাঁদের ভূমিকা ছিল কেবলই অনুঘটকের, নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি (বঙ্গবন্ধু) মনেপ্রাণে ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পূজারী। অন্যদিকে ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের অনুসারী। এঁরা ( ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ) মনে করতেন, জাতীয়তাবাদী গণজাগরণ সংগঠনে বঙ্গবন্ধু যাতে সফল হন সে লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মধ্যদিয়ে এমন একটা বাতাবরণ তৈরি করতে যাতে বঙ্গবন্ধু সর্বকাজে তাঁদের পরামর্শমতো কাজ করেন। কিন্তু স্বাধীনতার পূর্বপর্যন্ত ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ বঙ্গবন্ধুর সহায়তায় যেসব কাজ করেছেন তাতে বিপ্লবী ভাবাদর্শের সংশ্লেষ খুবই দুর্লক্ষ্য; বরং সেসব কাজে জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ ক্রমশ সংহত করার সুচিন্তিত প্রয়াসই জ্বলজ্বলে। যেমন জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ইত্যাদি। অথচ তাঁদের মনের গভীরে ছিল সমাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা। ফলে দেখা গেল, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নিকট তাঁরা হাজির হলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আবদার নিয়ে। এখানে স্মরতব্য যে, জাতীয়তাবাদী গণজাগরণ সংগঠনে তাঁদের ( ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ) একটি কার্যকর ভূমিকা ছিল বটে কিন্তু তাঁরাই এক্ষেত্রে একমাত্র ভূমিকার অধিকারী ছিলেন না। এতে আওয়ামী লীগের তো বটেই, এমনকি সাধারণ মানুষজনেরও ভূমিকা ছিল। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সহসাই ঘোষিত নীতির উল্টো কথা বলা সহজ ছিল না। যদিও পরে তিনি যাদের পরামর্শে বা আবেদনের প্রেক্ষিতে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁদের কেউই আত্যন্তিকভাবে কখনই সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন না। তবে ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশ জাসদ গঠন করে যে তান্ডবনৃত্য শুরু করলেন তা যদি না করতেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুর বাকশাল প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন হতো না বলেই মনে হয়।

    Reply
  4. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ১২ই ডিসেম্বর টাঙাইলে পলায়মান পাকিস্তানীদের একটি দল ঘেরাও হয়ে আত্মসমর্পণ করে। দেখা গেল ময়মনসিংহ সেক্টরের পাকিস্তানী অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার কাদির খান আছেন এই দলে। ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার তাঁর লেখা ‘12 Days to Dacca’ গ্রন্থের ৮৬ পৃষ্ঠায় কাদির খানের আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে বলছেন, “৯৩ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার কাদির খান তাঁর পুরো স্টাফসহ আত্মসমর্পণ করেন। এই প্রথম এমন উচ্চপদস্থ একজন পাকিস্তানী অধিনায়কের আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটলো”। ১৬ই ডিসেম্বরে রেসকোর্স ময়দানে হানাদার বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের ৪ দিন আগেই তা ঘটলো। এখন কাদির খান বন্দী। তার দেখা হবে মিত্রবাহিনীর সাথে ঢাকার পথে আগুয়ান ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ ভাইয়ের সাথে। আম্মা-আব্বার কাছে আমরা আগেই জেনেছিলাম কাদির খানের কথা। ভারতীয় অধিনায়ক ক্লেয়ারকে সে কথা জানালেন ইউসুফ ভাই। যুদ্ধবন্দী ব্রিগেডিয়ার কাদির খানকে বললেন তিনি মেজর তাহেরের বড়ভাই। যুদ্ধ চলাকালে বন্দী করার পরও আমাদের পিতা-মাতা-ভাইকে সসম্মানে মুক্তি দিয়েছিলেন বলে তাকে ধন্যবাদ জানালেন। এ কথা শোনার পর ইউসুফ ভাইকে জড়িয়ে ধরে অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন সুদূর পাকিস্তান থেকে বহু দূরে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক রণাঙ্গনে বন্দী পাঠান সেনানায়ক ব্রিগেডিয়ার কাদির খান। তাহের বেঁচে আছেন জেনে তিনি বারবার ‘শুকরিয়া’ প্রকাশ করছিলেন। বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ভারত থেকে ১৯৫ জন শীর্ষ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর সাথে ব্রিগেডিয়ার কাদির খান পাকিস্তানে ফিরে যান। পরে আমার অনেক সময় মনে হয়েছে পাকিস্তানী এই সেনানায়কের সাথে যোগাযোগ করে তার একটি সাক্ষাৎকার নেই। তা আর হয়ে উঠেনি। ব্রিগেডিয়ার কাদির খান এখনো বেঁচে আছেন কিনা জানিনা। থাকলেও পরাজিত হানাদার বাহিনীর যুদ্ধবন্দী ১৯৫ জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর একজন হয়ে দুর্বিষহ জীবনই হয়তো কাটাতে হচ্ছে পাকিস্তানী ৩৬ পদাতিক ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত ৯৩ এডহক ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার কাদির খানকে। যুদ্ধই মানুষের জীবনে এমন নিয়তি ডেকে আনে। এ কথা সত্য মূলত জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্মম গণহত্যা ও এক অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল আমাদের উপর। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে সমরনায়ক ইয়াহিয়া ও রাজনীতিবিদ বিশেষ করে পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর অশুভ আঁতাতের ফলই হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর একটি ব্রিগেডের অধিনায়ক কাদির খানের যুদ্ধাপরাধের দায় নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু এ প্রশ্নও মনে জাগে সুদূর পাঠান মুল্লুক থেকে বহু দূরে বাঙালীদের উপর চাপিয়ে দেয়া এক অন্যায় যুদ্ধে হয়তো ইচ্ছা বহির্ভূতভাবে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার কাদির খানকে। কি করে ভুলি প্রতিপক্ষ মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর তাহেরের বন্দী পরিবারকে শুধু সসম্মানে মুক্তিই তিনি দেননি, তাহেরের কুশল কামনা করেছেন আন্তরিকভাবেই। যুদ্ধ মানুষকে পশুর পর্যায়ে অবনমিত করে, কিন্তু প্রবুদ্ধ মানুষ সে অবস্থা থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে চায়। ন্যায়বোধ হয়তো একেবারেই সে হারিয়ে ফেলে না। খুব ভাবতে ইচ্ছা করে ব্রিগেডিয়ার কাদির খান ছিলেন তেমন একজন মানুষ। এমনও হতে পারে ব্রিগেডিয়ার কাদির খান হয়তো ততদিনে বুঝে গেছেন তাদের আশু পরাজয়ের কথা। বাংলাদেশ যে স্বাধীন হবে সে কথাতো তিনি আম্মাকে বলেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার মাইল দূরে পরাজয় পরবর্তী দিনগুলোর কথা তিনি হয়তো ভেবেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের বিচার হবে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। তখন প্রতিপক্ষ মুক্তিযোদ্ধা অধিনায়ক তাহেরের সহানুভূতি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এসব ভেবে হয়তো মুক্তিযোদ্ধা অধিনায়ক মেজর তাহেরের পরিবারকে তিনি মুক্তি দিয়েছিলেন, কামারুজামানের হাতে বন্দী তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তি দিয়েছেন।কোয়েন্টিন টারান্টিনো পরিচালিত অস্কার জয়ী চলচিত্র ‘ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস’-এর মুখ্য চরিত্র জার্মান এসএস কর্নেল হান্স লান্ডার কথাও মনে পড়লো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে জার্মান অধিকৃত ফ্রান্সে হিটলারের বিশ্বস্ত এই কর্নেল প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ছিলেন খুবই তৎপর ও নিষ্ঠুর। কিন্তু যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে নাৎসি জার্মানির সমূহ পরাজয় আঁচ করতে পেরে কর্নেল রান্ডা প্রতিরোধ যুদ্ধের সেনানায়ক লেফটেন্যান্ট রাইনের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়ান এই আশায় যে যুদ্ধ শেষে তিনি মার্জনা পাবেন। তা অবশ্য হয়নি। কপালে এঁকে দেওয়া স্বস্তিকার চিহ্ন নিয়ে তাকে যেতে হয় কারাগারে। এমনও হতে পারে জার্মান এস এস কর্নেল হান্স লান্ডার বিবেচনা থেকে নয়, ন্যায়বোধ ও বিবেকের দংশন মুহূর্তের জন্য হলেও ব্রিগেডিয়ার কাদির খানের মনকে আচ্ছন্ন করেছিল। মানুষের মনোজগৎ বড় বিচিত্র। কোন বিবেচনা ব্রিগেডিয়ার কাদির খানকে চালিত করেছিল ’৭১-এর মধ্য সেপ্টেম্বরের কোন এক তারিখে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউসে তার অফিসে প্রবল শত্রু তাহেরের বন্দী পিতা-মাতা-ভাই ও পরিজনদের ভাগ্য নির্ধারণে? কেনই বা তিনি বদর বাহিনীর কমান্ডার কামারুজ্জামানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দবির হোসেন ভূঁইয়া, হামিদ ও আরেকজন বন্দী কে ছেড়ে দেয়ার? এ জীবনে তা আর জানা হলো না।

    Reply
  5. ইকবাল করিম

    যুদ্ধ এমন এক মহাবপির্যয়কর ঘটনা যা মানুষের ভেতরের হিংস্রতম পশুকে বের করে নিয়ে আসে আবার এর মধ্যেই মানুষের মানবিকতার শ্রেষ্ঠতম নজিরগুলো রচিত হয়। আর মহানিয়তির পরিহাস এই যে, সেই মানবিকতার উদাহরণগুলোর কিছু কিছু রচনা করে তারাই যাদের গায়ে যুদ্ধাপরাধীর মতো জগতের ঘৃণ্যতম তকমা লেগে থাকে। যুদ্ধ এমনই।
    রোমান পোলানস্কির সেই সিনেমাটির কথাও মনে পড়ে। নাম মনে হয় দ্য পিয়ানিস্ট। ছবিটিতে এক ইহুদি পিয়ানোবাদকের নাজি অফিসারের হাতে ধরা পড়ে আবার মুক্ত হওয়া এবং যুদ্ধশেষে সেই নাজি অফিসারের সোভিয়েত রাশিয়ায় যুদ্ধবন্দী হিসাবে মৃত্যুর কাহিনী বিবৃত হয়েছে। যুদ্ধের কোনো এক ক্ষণে কোনো গভীর কারণে একজন গড়পড়তা সৈনিকের হৃদয়ে তার দৈনন্দিন হত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের মাঝে মানবিকতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে পারে। তার দ্বারা প্রাণে বেঁচে যেতে পারে কেউ। তারপর লড়াইয়ের ধূষর মাঠে সকলেই ফিরে যায়।
    ব্রিগেডিয়ার কাদির কতটা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তার সুষ্ঠু তদন্ত হলে বের হয়ে আসত নিশ্চয়ই। তিনি নিজে যদি এর অংশ হতে না চাইতেন তবে পথ কি তাঁর খোলা ছিল না? এসব প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে তাঁর দায় পরিমাপ করা হতো, যা আমরা করতে পারিনি তিনি এবং তাঁর বাকি ১৯৪ জন সহকর্মীকে পাকিস্তান সিমলা চুক্তির প্রতিশ্রুতিমতো বিচারের কাঠগড়ায় তোলেনি বলে।
    এ প্রসঙ্গে আলজেরিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলন নিয়ে আরো একটি সিনেমার কথা মনে পড়ছে। আলজেরিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলন দমনের জন্য একসময় সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল সহিংসতার অভিযোগ উঠলে এক জেনারেল বলেন, বেসামরিক সরকার ব্যর্থ হওয়ার কারণেই সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে আর সেনাবাহিনী তার নিজের প্রক্রিয়াতেই কাজ করবে। যুদ্ধ মানেই তাই সেনা অভিযান আর সেনা অভিযান মানেই হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ।
    দু-দুটি মহাযুদ্ধ পার করে আসার পর মানবসমাজ যদিও যুদ্ধের নানা আইনকানুন, বন্দীদের প্রতি আচরণ, শরণার্থী আইন ইত্যাদি তৈরি করেছে তারপরও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তী কোনো যুদ্ধ সেসব মেনে হয়েছে বলে জানি না।
    বস্তুত, সৈনিক জীবনের একটা মাত্রা রয়েছে যা বেসামরিক জীবন থেকে হয়তবা আলাদা। উপমহাদেশের ক্ষেত্রে তার একটি আলাদা পরিপ্রেক্ষিতও রয়েছে বিশেষ করে অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যারা কাজ করেছেন তাঁদের জন্য। শোনা যায়, নিয়াজী ও অরোরা একসঙ্গেই উপমহাদেশের রাজকীয় বাহিনীতে ছিলেন যে বাহিনীর ধারাবাহিকতায় ভারতীয় ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়। নিয়তির পরিহাস এই যে, সেই অরোরার কাছেই নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। অন্যায় ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি জাতির মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় এই দুজন সেনানায়কের নির্বুদ্ধিতা বনাম শৌর্য্য, দম্ভ বনাম ধীশক্তির অ্যাখ্যানই স্বাভাবিক গুরুত্ব পাবে, আড়ালে পড়ে থাকবেএকসময়কার সহযোদ্ধা দুই সৈনিকের বিরোধী শিবিরে পড়ে যাওয়ার করুণ পটভূমি। এখানে দুইজন মানুষের জীবনের প্রকৃত নায়ক হয়তবা সময়, আর কেউ নয়।

    Reply
  6. ফজলুল হক

    মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আর জাসদ চেয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের বেনিফিসিয়ারি হয়ে সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন করতে। এ কারণেই তারা সেনাবাহিনীর মধ্যে গণবাহিনী সৃষ্টি করে অফিসারদের হত্যার মাধ্যমে সেই তথাকথিত বিপ্লবী মিশন সফল করতে চেয়েছিল। অ্যাডজুটেন্ট জেনারেলের পদ থেকে তাহেরকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পুরো বিগ্রেডের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হলে- তাহের ‘পিপলস আর্মি’র মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।তাহের কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সিপাই আর অফিসারদের বলেন, “আমাদের আর্মির হিস্ট্রিকে তোমাদের ক্রিটিক্যালি দেখতে হবে। পাকিস্তান আর্মি যাদের নিয়ে তৈরী হয়েছিল এরা তো সব ব্রিটিশ আর্মিরই লোকজন। ব্রিটিশদের চাকরি করতো পরে পাকিস্তান হওয়াতে তারাই হয়েছে পাকিস্তান আর্মি। ব্রিটিশ আর্মিতে যে ইণ্ডিয়ানরা চাকরি করত, হোয়াট ওয়াজ দেয়ার রোল? ওরা ছিল একটা ভাড়াটে বাহিনী। লোকাল আপরাইজিংগুলোকে ঠেকানোর জন্য এই আর্মিকে ব্যবহার করা হতো। ঐ বাহিনীকে তারা লেলিয়ে দিয়েছিল সিরাজদৌল্লার বিরুদ্ধে, টিপু সুলতান- বাহাদুর শাহ জাফরের বিরুদ্ধে। ইণ্ডিয়ার সোলজার, অফিসার দেশের মানুষের বিদ্রোহগুলোর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। এরা ছিল স্রেফ ব্রিটিশদের তাবেদার, ঠেঙ্গার বাহিনী। পাকিস্তান আর্মি তো ঐ ধরণের ব্রিটিশ ভাড়াটে বাহিনীরই কন্টিনিউশন। তাদের মাইণ্ড সেটটাও তো তাই, শুধু কারো না কারো তাবেদারি করা আর ঠেঙ্গানো। কিন্তু আমরা বাংলাদেশ আর্মি তো গড়ে তুলেছি একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। আমরা কেন ঐ লেগাসি ক্যারি করব? আর্মি এদেশের মানুষ দিয়েই তৈরি কিন্তু এই অর্গানাইজেশনটাকে সমাজের সবরকম কাজকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা আছে সবসময়। আর্মির লোকের সাথে সাধারণ মানুষের মেলামেশার কোন সুযোগ নেই। এতে করে একটা এলিটিস্ট মানসিকতা তৈরি হয়। যেন আর্মির কাজ হচ্ছে দেশের মানুষের উপর খবরদারি করা। এটা একটা তাবেদার আর্মির এজেণ্ডা হতে পারে। বাংলাদেশ আর্মির মাইন্ড সেটটা এমন হবে কেন- যার জন্ম হয়েছে একটা জনযুদ্ধের মধ্যে। আমাদের আর্মিকে হতে হবে পিপলস আর্মি”। তাহেরের আশা ছিল- তার এই মডেল পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিগ্রেডগুলোতেও অনুসরণ করা হবে। কিন্তু সেটা হয় না। তাকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। মানতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগই করেন।১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যে সিপাহিরা গৃহবন্দী অবস্থা থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে এবং তাকে কাঁধে তুলে সেনা সদর দফতরে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কর্নেল তাহের। সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে, জিয়ার উচিত ছিল তাহেরের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা। কিন্তু তিনি কৃতজ্ঞ হতে পারেননি কয়েকটি বিশেষ কারণে। সাধারণ সৈনিকেরা তখন কর্নেল তাহেরের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সেদিন তারা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে জিন্দাবাদ জানালেও, গোটা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ঘুরে-ঘুরে ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই-ভাই, অফিসারের কল্লা চাই’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল এবং জাসদের প্রচারপত্র বিলি করছিল। তাহেরের প্রভাবে তখনকার নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলাভঙ্গের বহু ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মেনে নিতে এবং অফিসারদের স্যালুট করতে সিপাহিরা অস্বীকার করেছিল। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে স্যালুট না করায় এক মেজর জনৈক সার্জেন্টের আঙুলে গুলি করেছিলেন। এ ঘটনার পরিণতি খুবই গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমান সনাতনী কায়দার মিলিটারি অফিসার ছিলেন। দেশে, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে যেকোনো মূল্যে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে হবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি দিব্য চোখে দেখতে পেয়েছিলেন, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সিপাহিদের আচরণ বরদাশত করা হলে এ জাতীয় ঘটনা আরও বেড়ে যাবে। ফলে সেনাবাহিনী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না এবং নতুন স্বাধীন দেশও ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কর্নেল তাহের ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে সে জন্যই জিয়াকে বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যার পর বিবিসি থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনে স্যার মার্ক টালি বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান প্রাণ দিয়ে তার সেনাবাহিনীকে ভালোবাসতেন; হয়তো সে জন্যই তাকে প্রাণ দিতে হল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—