ধুমপান (তামাক বা Tobacco smoke) ব্যাপারটার মধ্যে একটা ‘আভিজাত্য’ থাকে বলেই মনে হয়। পৃথিবীর অনেক ক্ষমতাবান মানুষের ছবিতে তাদের হাতে কিংবা ঠোঁটে চুরুট বা সিগারেট দেখা যায়, এবং বলাই বাহুল্য, এটা তাদের যেনও আরো  অভিজাত আর আকর্ষণীয় করে। একটা সময় ছিল  গ্রাম-গঞ্জের সম্ভ্রান্ত মানুষের বৈঠকখানায় হুঁকো ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। আর শহুরে মানুষদের ছিল কিংবা আছে- পাইপ। সিনেমার নায়কদের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। উত্তম কুমার কিংবা গ্রেগরী পেক এর হাতে সিগারেট আর মাথা উঁচিয়ে ঘাড় বাকিয়ে মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়ার দৃশ্য যুগের পর যুগ হৃদয় হরণ করেছে কত কোটি তরুণীর, আর তাদের মত হওয়ার বাসনা জেগেছে কত তরুণের!  আমি আমার বন্ধুবান্ধবের বেশ কয়েকজনকে দেখেছি সুন্দরী তরুণীদের আকৃষ্ট করতে ধুমপান শুরু করতে। আবার কেউ মনে করে ধুমপানে আসক্তি তাদের ‘সৃজনশীল’ করে তুলবে। আবার কারো হয়ত শুরু হয় বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনায়, এবং পরে তা আর ছেড়ে দেয়া হয়না।
ছোটবেলা থেকেই আমার কাছে ধুমপান ব্যাপারটার ভালো-মন্দ  ঠিক বোধগম্য হতনা। অপেক্ষাকৃত কমবয়সীরা কেউ মুরুব্বিদের সামনে ধুমপান করত না, কারণ এটাকে বদঅভ্যাস এবং বেয়াদবী বলে গণ্য করা হত, অথচ মুরুব্বিদের অনেককেই দেখতাম বেশ আয়েশ করে ধুমপান করে!
সিগারেট এর প্যাকেট নিয়েও আরেক জ্বালা। দেদারসে বিক্রি হচ্ছে সিগারেটের প্যাকেট অথচ গায়ে লেখা ‘ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’, ‘ধুমপানে ক্যান্সার হয়’ ইত্যাদি। আমাদের ছোটবেলায় একটা হিন্দি গানের এরকম প্যারোডি বেশ জনপ্রিয় ছিল:
“আই অ্যাম আ ডিস্কো ড্যান্সার-
বিড়ি খাইলে হয় ক্যান্সার”
কলেজে পড়াকালীন পরিচিত এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। তিনি আমার সাথে কথা বলছেন আর আয়েশ করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছেন। আমি বলেই ফেললাম- ‘ধুমপান তো শুনেছি ভালোনা, এতে নাকি ক্যান্সার হয়!’ উনি মোটামুটি খেপেই গেলেন এবং বললেন- ‘ধুর, ধুর এসব বাজে কথা। এই যে আমি এত বছর ধরে ধুমপান করছি, আমার কি ক্যান্সার হয়েছে?’
আসলে কী? ধুমপান কতটা ক্ষতিকর? এর ক্যান্সারের যোগসূত্র কতটুকু?
ধুমপানের সাথে ক্যান্সারের যোগসূত্রিতা প্রথম খুঁজে পাওয়া যায় ঠিক ১০০ বছর আগে। আর গতশতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে এসে এই যোগসূত্রিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বহু গবেষণা হয়েছে এ নিয়ে। আপনি বায়োমেডিক্যাল সাইন্সের প্রধানতম ডেটাবেজ Pubmed এ গিয়ে ‘smoking’ আর ‘cancer’ শব্দযুগল দিয়ে খুঁজুন। ষাট হাজারের  কাছাকাছি গবেষণাপত্র পাবেন। ক্যন্সার ছাড়াও আরো অনেক রোগের পেছনে ধুমপানের বড় ভুমিকা আছে। তবে ক্যান্সারের সাথেই যোগসূত্রিতা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ফুসফুসের ক্যান্সার (Lung cancer)। বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে ফুসফুসের ক্যান্সারের ৮৫% ক্ষেত্রেই ধুমপান কারণ। ১৯৫০-২০০০ সালব্যাপী এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, উন্নত বিশ্বে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে ৯০% পুরুষ এবং ৭০% নারী ধুমপায়ী! ফুসফুসের ক্যান্সার ছাড়াও ধুমপান মূত্রাশয়ের ক্যান্সার (bladder cancer), অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার (pancreatic cancer), স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার (cancer of larynx), খাদ্যনালীর ক্যান্সার (esophageal cancer) ইত্যাদির জন্যও দায়ী। ধুমপায়ী মহিলাদের স্তনক্যান্সার (breast cancer) আর সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের (cervical cancer) হারও অনেক বেশি।
সমস্যাটা কোথায়? সিগারেটের ধোঁয়ায় কি এমন থাকে যে ক্যান্সারের জন্য তা এমন মারাত্মক?
সিগারেটের ধোঁয়া থেকে প্রায় হাজার পাঁচেক রাসায়নিক দ্রব্য সনাক্ত করা গেছে এ পর্যন্ত। এর মধ্যে কমপক্ষে ৭০ টি ক্যান্সারের জন্য দায়ী (carcinogen)। এর মধ্যে অবশ্য নিকোটিন (N-Nitrosonornicotine) বেশি পরিচিত, যেটা প্রথমসারির carcinogen! এই বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ বিভিন্নভাবে আমাদের আক্রমণ করে; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, এগুলো আমাদের শরীরের কোষের অন্যতম প্রধান জৈব-অণু ‘ডিএনএ’ (DNA) এর ক্ষতি করে। ফলে শরীরবৃত্তীয় কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে এবং ক্যান্সার ও অন্যান্য মরনব্যাধিকে ত্বরান্বিত করে।
 ধুমপানের এই ভয়াবহ প্রভাব যে শুধু ধুমপায়ীর ক্ষতি করে, তা নয়। পরোক্ষভাবে তা পাশের জনেরও ক্ষতি করে। এভাবেই একজন ধুমপায়ী নিজের সাথে নিজের পরিবারের প্রিয়জনদের, প্রতিবেশিদের, সহপাঠী, সহকর্মীদের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে যাচ্ছে।
ধর্ম বলছে, ধুমপান খারাপ, কারণ এটা অপচয় এবং ক্ষতিকারক। সমাজ বলছে, ধুমপান খারাপ, কারন এতে অন্যের ক্ষতি করা হয়, মানবাধিকার লংঘন করা হয় (ধুমপায়ীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অধুমপায়ীকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন এটা মানবাধিকারের লংঘন কিনা)। বিজ্ঞান বলছে, ধুমপান খারাপ, কারণ এতে ক্যান্সার এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগ হতে পারে। ধুমপান তাই আসলেই ক্যান্সারের অন্যতম কারন- এতে কোন ভ্রান্তি নেই।
এতকিছুর পরেও আপনি কিংবা আমি ধুমপান কেন করব? অনেকেই বলে থাকেন, অধুমপায়ীদের কী রোগ হয়না, ক্যান্সার হয়না? হয়। হয়ত অন্য কারণে। অথবা ধুমপানের পরোক্ষ কারণে। আমাদের ক্ষতিকারক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলাই উচিত। যতদিন পৃথিবীর বুকে আমরা মানুষেরা বেঁচে থাকি, সুস্থভাবে বাঁচার চেষ্টা করি।
একটা পরিসংখ্যান দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। ধুমপানের শুরু হয়েছিল উন্নত বিশ্বে। অথচ গত বিশ বছরে উন্নত দেশগুলোতে ধুমপানের হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। উল্টো ঘটেছে উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত দেশে। সেখানে ধুমপানের হার বেড়ে গেছে!
বাংলাদেশে নাকি সম্প্রতি সিগারেটের দাম অনেক বেড়ে গেছে। ফেসবুকে অনেক পরিচিতকে দেখি এ নিয়ে আহাজারি করতে। সচেতন মানুষের উচিত এই ব্যাপারটাকে স্বাগত জানানো। ধুমপানের মূল্যবৃদ্ধি থেকেই শুরু হোক ধুমপানের অভ্যাস ত্যাগ করা।
আমার লেখাটা কিংবা কথাগুলো অনেকেরই ভালো লাগবেনা, নিশ্চিত। কি আর করা! আপনার জীবন আপনি যেভাবে ইচ্ছা যাপন করবেন। তবে এও ঠিক, ধুমপায়ীরা কিন্তু অধুমপায়ীদের মানবাধিকার লংঘন করছেন। ভেবে দেখুন অধুমপায়ীদের অভিশাপ থেকে বাঁচতে পারবেন কিনা।
সকলের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা কামনা করছি।
লেখায় যে পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে তার সূত্র: Peto et al. (2006). Mortality from smoking in developed countries 1950–2000: Indirect estimates from National Vital Statistics. Oxford University Press. ISBN 978-0-19-262535-9.
ইমেইলঃ asadkhanbmj@yahoo.com

Responses -- “ধুমপানে ক্যান্সার: সত্যি নাকি ভ্রান্তি? ”

  1. আবু সালেহ

    সিগারেট, তামাক, বিড়ির উদ্ভট আভিজাত্য দিয়ে লেখাটির শুরুটাই হাস্যকর

    Reply
  2. younusur rahman

    কেউ আমাকে আটকে রাখ কিন্তু আমিতো নিজে নিজেকে এখনও আটকাতে পারছি না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—