এন আর এস এর ঘটনাবলীর গভীর উদ্বেগের ভেতরেই একটু হলেও স্বস্তিদায়ক খবর এই যে, বহিরাগত হামলাকারীদের দ্বারা ভয়ংকরভাবে আক্রান্ত জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায় তুলনামূলকভাবে ভালো আছেন। সামাজিক গণমাধ্যমে তাঁর একটি ভিডিও প্রচারিত হয়েছে। সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে, তিনি বেডে বসে সামান্য কথাবার্তা বলছেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিবেশের ভেতরেও সামান্য স্বস্তিদায়ক একটি খবর।

কলকাতা মহানগরীর বুকে একটি শতাব্দীপ্রাচীন হাসপাতলে এক ৮৪ বছরের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকদের উপরে বাইরের হামলাবাজদের যে নারকীয় বীভৎসতা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, তার প্রেক্ষিতে প্রথমেই একটা কথা বলা জরুরী এই যে, সমাজের সর্বত্র একটি পেশার মানুষ সম্পর্কে অপর পরিসরের মানুষদের নানা অভাব অভিযোগ থাকে, চিকিৎসকদের সম্পর্কে রোগীদের বা রোগীর পরিবারগুলির নানা অভিযোগ আছে। উকিল বাবুদের সম্পর্কে তাঁদের মক্কেলদের আছে। সরকারি কর্মচারীদের সম্পর্কে আমজনতার আছে। এমন কি বাড়ির পরিচারিকাদের সম্পর্কে বাড়ির বাবুদের আছে।

অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের ক্ষোভ-বিক্ষোভের পেছনে আর্থ-সামাজিক নানা প্রেক্ষাপট কাজ করে। তবে এন আর এস হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের উপরে বাইরের গুণ্ডাদের নাটকীয় হামলার যে ঘটনা ঘটে গেল, সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে হয় এই যে, চিকিৎসকসহ নানা পেশাজীবীদের নিয়ে ক্ষোভ বিক্ষোভকে সম্মান জানিয়েই এটা মনে রাখতে হবে সেই প্রসঙ্গগুলি নিয়ে আলাপ, আলোচনা, পর্যালোচনার অনেক সময় রয়েছে।

এখন সেগুলিকে সাময়িক দূরে সরিয়ে রেখে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর একদল গুণ্ডারা যে নারকীয়তা চালিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা দরকার। সমস্যার সমাধান দরকার। একাংশের চিকিৎসকদের ঘিরে নানা ধরনের সামাজিক ক্ষোভ- বিক্ষোভ উদগিরণের সময় কিন্তু এখন নয়। এই নিয়ে আলাপ আলোচনার ক্ষেত্র কিন্তু এই মুহূর্তে প্রলম্বিত করা উচিত নয়। তার জন্য সময় পড়ে আছে, ক্ষেত্র পড়ে আছে।

যদি চিকিৎসকদের উপর বাইরের সশস্ত্র গুণ্ডাদের এই আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে একাংশের চিকিৎসকদের ঘিরে কিছু মানুষের ক্ষোভ নিয়ে আমরা আলোচনায় মশগুল হয়ে পড়ি, তাহলে কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই সেই সব সমাজবিরোধী, যারা এন আর এস হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে এক রোগী মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে, সেই ভয়াবহকতাকেই আড়াল করা হবে।

অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, এন আর এস হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের উপরে বাইরের একদল সমাজবিরোধীদের দানবীয়তাকে একটা সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। একাংশের রাজনৈতিক মহল থেকেই এই সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।
হামলাকারীদের ধর্ম বিশ্বাসকে সামনে নিয়ে এসে অত্যন্ত কৌশলে একটি বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের খেপিয়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। হামলাকারীদের কোন জাত -ধর্ম-ভাষা-বর্ণ থাকতে পারে না। তাদের একমাত্র পরিচয় তারা’ হামলাকারী ‘।

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যারা, তারা একটি বিশেষ ধর্মের মানুষ হলেও যেমন সেই নারকীয় অপরাধের জন্য সেই বিশেষ সমাজের মানুষের গোটা অংশকে দায়ী করা যায় না, তেমনি তর্কের খাতিরে যদি আমরা ধরেই নিই এন আর এস হাসপাতালে কর্তব্যরত জুনিয়ার ডাক্তার বাবুদের উপর হামলাকারী গুণ্ডাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের মানুষ, তবুও গুণ্ডামি, নারকীয়তার দায়ে সেই গোটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদেরকেই দেগে দেওয়া যায় না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে হামলাকারীদের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে, সেই সম্প্রদায়ের মানুষদেরই সার্বিকভাবে অপরাধপ্রবণ হিসেবে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করবার যে ভয়ঙ্কর প্রবণতা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি পশ্চিমবঙ্গের বুকে দেখাচ্ছে, সেই প্রবণতা তারা দেখাতে পারছে এই কারণে যে, অপরাধীদের ধরার ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত রাজ্য সরকার আদৌ কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ নেননি। অপরাধীদের যদি ধর্ম রাজনৈতিক পরিচয় ইত্যাদির কোন তোয়াক্কা না করেই কেবলমাত্র ‘অপরাধী ‘হিসেবে দেখে রাজ্য সরকার একদম ঝড়ের গতিতে আটক করতেন, তাহলে কিন্তু হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি গোটা বিষয়টি নিয়ে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রচার করবার সুযোগ পেত না।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের সার্বিক ব্যর্থতা, তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং ব্যর্থতা আজ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপিকে এন আর এসের জুনিয়ার ডাক্তারদের উপর বাইরের একদল হামলাকারীর নারকীয় অত্যাচারকে একটা বীভৎস সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করল। বস্তুত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই এ রাজ্যের কোন পেশাজীবী মানুষেরই অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয়– কোন রকম নিরাপত্তা নেই। আজ এন আর এস-এ একদল বাইরের হামলাকারীর দ্বারা ডাক্তারদের উপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নিরাপত্তা ঘিরে যে বিষয়টি উঠে আসছে, সেই বিষয়টি কিন্তু গত আট বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ক্ষেত্রেরই আনাচে-কানাচে ঘটে চলেছে।

এমনকি আমরা শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের ভয়ে থানার ভিতরে পুলিশকে খাতার আড়ালে নিজের মাথা তথা জীবন বাঁচাতে দেখেছি। তখন কিন্তু আমরা আজকের মত প্রতিবাদে সামিল হইনি। আমরা চুপ করে থেকেছিলাম। অনেকটা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কমিক, ‘দেখি না কি হয় ‘এর মত আমরা আরো কত বীভৎসতার মুখোমুখি হতে পারি তার জন্যই যেন প্রতীক্ষায় থেকে ছিলাম।

স্বাধীনতার পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত আমাদের এই রাজ্যে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু কোন আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে কোন পেশাজীবী মানুষেরই আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আজকের মত এমন ভয়াবহ প্রশ্নচিহ্নের সামনে এসে দাঁড়ায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেসের বদান্যতায় আজ পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের পেশাজীবনে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, বাড়ির মানুষটি পেটের তাগিদে বাড়ি থেকে বের হলে যতক্ষণ না তিনি সুস্থ শরীরে বাড়িতে ফিরছেন বাড়ির মা, বোন, স্ত্রী, পুত্র- কন্যারা নিশ্চিন্ত হতে পারেন না।

বস্তুতপক্ষে পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের ঘটনাটির জেরে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিটি আজ নগ্নভাবে প্রকাশ্যে এলেও আমাদের রাজ্যের একদম উঁচু স্তর থেকে নিচু স্তর পর্যন্ত পেশাজীবনের যে ভয়ঙ্কর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে তৈরি হয়েছে, এমন পরিবেশ সম্ভবত ভারতবর্ষের আর অন্য কোনো রাজ্যে নেই। ‘যোগী’ আদিত্যনাথের পরিচালনাধীন উত্তরপ্রদেশে নানাভাবে পেশাজীবী মানুষদের উপরে নানা ধরনের অত্যাচারের ঘটনা শোনা গেলেও এভাবে পশ্চিমবঙ্গের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তাঁর রাজ্যে তৈরি হয়নি। অন্য কোনো রাজ্যে তৈরি হয়নি।

এন আর এসের ঘটনার অব্যবহিত পরেই বর্ধমান মেডিকেল কলেজেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও বাইরের গুণ্ডাদের দ্বারা জুনিয়র ডাক্তারেরা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডাক্তারবাবুরা আউটডোর বন্ধ করেছেন। সাময়িকভাবে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবেই তাঁরা আউটডোর বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কোন সন্দেহ নেই এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গরিব মানুষই ভয়ঙ্কর রকমের অসুবিধায় পড়বেন। কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো, কেন জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে কেবল এন আর এস-ই নয়, কলকাতা মহানগরীর বুকে অন্য সমস্ত সরকারি হাসপাতালগুলি তথা গোটা রাজ্যের হাসপাতালগুলির ডাক্তারবাবুরা আউটডোর বন্ধ রাখলেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পর্যালোচনা করে দেখা দরকার।

আজ যদি আমার সন্তান বা আপনার সন্তান কোনো পেশাগত কারণে বাড়ির বাইরে যাওয়ার পর তার পেশার দোহাই দিয়ে একদল গুণ্ডাদের হাতে আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে, আর রাজ্যের প্রশাসন শাসক দল সেই গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে কোনো রকম প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমার মনের অবস্থাটা কি হতে পারে,আপনারই বা মনের অবস্থাটা কি হতে পারে তা সবার আগে বিবেচনা করে দেখা দরকার।

ডাক্তারদের আউটডোর বন্ধ করে দেওয়ার দরুণ সাধারণ মানুষের বহু অসুবিধে হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে হয় যে, এই বাস্তবতা এবং ভয়াবহতার সামগ্রিক দায় ব্যক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অপরাধীদের আড়াল করবার জন্য তিনি নিজে, ভাইপো তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর আজ্ঞাবাহী পুলিশ যে নক্কারজনক ভূমিকা পালন করে চলেছে, সেই ভূমিকাই একদিকে ডাক্তারদেরকে আউটডোর বন্ধ করে দেওয়ার মতন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, অপরদিকে সাধারণ গরিব বুড়ো মানুষদের চিকিৎসা না পাওয়ার এই ভয়াবহ অবস্থার ভিতর ঠেলে দিয়েছে।

গত আট বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে এ রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর, জটিলতম আকার ধারণ করছে। আইনের শাসনের এ রাজ্যে কোনোস্তরেই নেই– এই কথাগুলি এতদিন বামপন্থীরা বলে যেতেন। প্রচার মাধ্যমের একটা বড় অংশ মমতা বন্দোপাধ্যায় কীর্তন করবার তাগিদেই বামপন্থীদের এই অভিযোগকে সেভাবে আমল দিতেন না। প্রচার দিতেন না। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের করুণ অবস্থা এবং বিজেপির এ রাজ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে মাথা তোলার পর আইন-শৃংখলার এই ভয়াবহ রূপ, যে রূপটি এতদিন নানাভাবে ধামাচাপা দেওয়া ছিল, তা আমজনতার দৃশ্যগোচর হচ্ছে।

কিছুদিন আগে হাওড়ার আদালতের ভেতরে আইনজীবীদের উপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সুশৃংখল প্রশাসনিক গুণ্ডারা অর্থাৎ পুলিশেরা হামলা চালিয়েছিল। সেই হামলার জেরে আইনজীবীদের কর্মবিরতি এখনো অব্যাহত আছে। সেই কর্মবিরতির জেরে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আইন-আদালতজনিত ভয়ঙ্কর রকম সমস্যার ভেতরে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের সেই সমস্যার দিকে সেভাবে সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের দৃষ্টি পড়েনি। এটা দুর্ভাগ্যের বিষয়, ডাক্তারদের উপর গুণ্ডাদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আজ গোটা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য অংশের মানুষদের সামনে উঠে আসছে। এটা আবার একটা স্বস্তিদায়ক বিষয় ও বটে, কারণ, এ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার যে ভয়াবহকতা গোটা দেশ সেভাবে জানতো না, এখন জানছে।

তবে উদ্বেগটা কিছুতেই যাচ্ছে না। তার কারণ এই যে, রাজ্যের শাসক আর কেন্দ্রের শাসক গোটা বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার জন্য কার্যত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। গুণ্ডার কোন জাত-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা হয় না। তার একটাই পরিচয় সে ‘সমাজবিরোধী’। তার একটাই পরিচয় সে ‘গুণ্ডা ‘। সে হিন্দু নয়, সে মুসলমান নয়, সে শিখ নয়, সে ক্রিশ্চান নয়।

আমাদের রাজ্যে প্রশাসন রাজধর্ম পালন করছে না। জনজাগরণের ভেতর দিয়েই প্রশাসনকে রাজধর্ম পালনে বাধ্য করতে হবে। আর এটা করতে পারেন সাধারণ গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষই।

Responses -- “পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন রাজধর্ম পালন করছে না”

  1. Drms Shekhar

    সুন্দর বিশ্লেষণ । ধর্মীয় উন্মাদনায় মাতিয়ে বাজিমাৎ করেছে বিজেপি । একটা প্রচলিত কথা আছে “ সব দেশে সংখ্যাগুরুদের কাছে সংখ্যালঘুরা বিপন্ন বোধ করে “। একমাত্র ব্যতিক্রম ভারত ( কেউ কেউ আবার ভারতকে ভারতবর্ষ বলতে শুরু করেছেন )। ভারতে হিন্দুরা সংখ্যগরিষ্ঠ , কিন্তু তাঁরাই নাকি সংখ্যালঘুদের দ্বারা বিপন্ন – বিজেপির প্রচারের মুখ্য বিষয় এটি । মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে অবশ্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সংখ্যালঘু ( কম বেশী ৩,৫ % ) – তাঁরাই কি বিপন্ন বোধ করছেন? এই প্রচারের দ্বারা তাঁরা সংখ্যাগুরু হিন্দুদের মনে সংখ্যালঘু বিদ্বেষ ঢুকাতে সমর্থ হয়েছে । হিন্দু নামের তকমা দলিত ও অন্যান্যদের ঘাড়ে চাপিয়ে আত্মরক্ষার বর্ম বানাচ্ছে । বিষয়টি প্রশাসনিক , রাষ্ট্রীয় , সুশাসনের ব্যাপার , ব্যর্থতাও তাই । কিন্তু দেখানো হচ্ছে ধর্মীয় হিসাবে । অধিকাংশ মানুষ তা’তে মেতেও যাচ্ছে । দৃষ্টিভঙ্গী ও রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য কী হবে ?

    Reply
  2. Mute Spectator

    ভারত ভূমিতে মানুষের জীবন চারণে ধর্মনিরপক্ষতার অবশিষ্ট থাকবে না- বিগত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল দেখে আন্দাজ করা যায়। এর কারণ স্বীকৃত ধর্মনিরপক্ষ দল গুলোর ব্যার্থতা। এছাড়া বিশ্ব রাজনীতিতে ডানপন্থার উত্থান দেশেদেশে। ভারতে এবারের ভোটের মূল যে চেতনা কাজ করেছে তা হচ্ছে আন্তর্জতিক স্তরে কট্টর পাকিস্তান বিরোধী আর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মুসলিম বিরোধী সেন্টিমেন্ট। বিজেপির জাতীয়তাবাদ হচ্ছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, ভোটে যার জয় হয়েছে। মমতার মত একজন ক্ষমতা লোভী অবিবেচক ও অসৎ রাজনীতিকের জন্য বাংলায় আজ এই অবস্থা, এর সাথে সর্বভারতীয় ডান পন্থার জোয়ার তো আছেই। মমতার হালনাগাত কৌশল হচ্ছে, উগ্র বাঙ্গালীপনা, আখেরে যা সর্বভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদের কাছে পরাজিত হবে।
    হাজার বছরে গড়ে উঠা ধর্ম নিরপেক্ষতা গঙ্গাজলে ভেসে যাবে।

    Reply
  3. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ভারতের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ হয়েছে। আরও হবে। ভোটারদের ‘মন জয়’-এর কারণ হিসেবে বিজেপি ও মোদি জির অনেক ইতিবাচক কাজের বিবরণ জানাচ্ছেন আলোচকেরা। তবে একটি বিষয় আলোচনায় বেশি আসেনি। বিজেপি জোটের মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি অপরাধে বিচারাধীন আসামির সংখ্যাও গতবারের চেয়ে বেশ বেড়েছে এবার। মোদির প্রথম মন্ত্রিসভায় ‘আসামি’ ছিল ৩১ শতাংশ। এবার হয়েছে ৩৯ শতাংশ। আসামি হলেও এঁরা ভোটেই ‘জিতে এসেছেন’; সেটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে! অনেকের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ইত্যাদির মামলাও আছে। এ রকম সাতটি পর্যন্ত মামলা আছে এমন ব্যক্তিও মন্ত্রী হয়েছেন। এর মধ্যে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে রয়েছে চারটি মামলা। অথচ তাঁকে নিয়েই এই মুহূর্তে সমগ্র ভারত উচ্ছ্বসিত। এবারের নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেও বিশ্লেষক ও প্রচারমাধ্যমে ক্ষণে ক্ষণে উচ্চারিত হচ্ছে অমিত শাহর নাম। তাঁকে নিয়ে বই প্রকাশের ঘোষণা এসেছে। সিনেমা তৈরির উদ্যোগ চলছে। বলা হচ্ছে, রাজনীতিতে অমিত শাহর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ও বিরোধীদের দলনে নির্মমতাই বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের মূল জাদু। অমিতই মূল ‘নায়ক’। জিন্নাহ ও গান্ধীর পরিবারের সূত্রে উপমহাদেশের ইতিহাসে গুজরাটের বিশেষ খ্যাতি আছে। সেই গুজরাট এখন আরও গর্বিত মোদি ও অমিত শাহকে নিয়ে। এই বিস্ময় ইতিমধ্যে ভারতীয়দের কেটে গেছে যে, গান্ধীর গুজরাট থেকেই অমিত শাহ উঠে এসেছেন। গান্ধীর জগৎখ্যাত উক্তি ছিল, ‘চোখের বদলে চোখনীতি গোটা বিশ্বকে অন্ধ করে দেবে।’ অমিত শাহর সামনে অবশ্য এ মুহূর্তে উৎপাটনযোগ্য আর কিছু বাকি নেই। তিনি বহু কিছু ছিলেন। বহু কিছু হলেন। তার মধ্যে গুজরাট দাবা ফেডারেশনের একসময়কার সভাপতিও ছিলেন। অসাধারণ এই ‘দাবাড়ু’ ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিপক্ষদের তো বটেই খোদ বিজেপির আদভানি, সুষমা স্বরাজ, মুরলি মনোহর যোশিদেরই নিঃস্ব করে রাজনীতি থেকে বিদায় দিয়েছেন। ২০১২ সালে নির্বাচনী হলফনামায় স্ত্রীসহ অমিত শাহর সম্পদ দেখানো হয়েছিল ১২ কোটি রুপির। এবার সেটা দেখানো হয় ৩৯ কোটি। বিজেপির এক মেয়াদেই শাহ পরিবারের সম্পদের এরূপ বৃদ্ধি এ মুহূর্তে ভারতীয় রাজনীতিতে মোটেই কোনো ইস্যু নয়। বিজেপির সভাপতি হওয়ার পথে কোনো ধরনের অপরাধের অভিযোগ তাঁকে থামাতে পারেনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর আবির্ভাব তাই সমগ্র ভারতের জন্যই বিশেষ বার্তাবহ। কারও কারও জীবনবৃত্তান্ত অমিত শাহ ও প্রতাপ চন্দ্রের চেয়েও ‘সমৃদ্ধ’। হাল আমলের এ রকম আরেক তারকা প্রাগ্য ঠাকুর। এখনো মন্ত্রী হননি। তবে প্রতাপ চন্দ্রের মন্ত্রিত্ব পাওয়া প্রাগ্য ঠাকুরের মন্ত্রী হওয়ার পথে আশাবাদ তৈরি করেছে। ২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে ভারতজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার প্রধান কারিগর হিসেবে প্রাগ্যকে অভিযুক্ত করা হয়। কোথাও কোথাও মুসলমানদের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে এবং কোথাও আবার মুসলমানবিরোধী দাঙ্গা উসকে দিতে হিন্দু স্থাপনা লক্ষ্য করে ওই সন্ত্রাসী কাজ চালানো হয়। হামলার কাজে ব্যবহৃত প্রাগ্যর মোটরসাইকেলটি ঘটনাস্থলেই পাওয়া যায়। তাঁর নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদী একটি গোষ্ঠী এই হামলায় যুক্ত বলে বিভিন্ন তদন্তে বেরিয়ে আসে। তাঁদের আদালতে আনা হলে সবাইকে চমকে দিয়ে ‘শ্রী রাম সেনা’ নামের একটি সংস্থা আইনি সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে। পরে বাড়তি তদন্তে দেখা যেতে থাকে ‘রাষ্ট্রীয় জাগরণ মঞ্চ’, ‘অভিনব ভারত’ ইত্যাদি নামে বহু গোপন সংগঠন প্রাগ্যদের সহযোগী। ওই ঘটনায় অন্তত ১০ জন মারা যান এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনায় সম্পৃক্ততার জন্য ইতিমধ্যে নয় বছর কারাগারেও কাটিয়েছেন প্রাগ্য। এবারের নির্বাচনে বিজেপি তাঁকে ভূপাল থেকে মনোনয়ন দেয়। মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী দ্বিগবিজয় সিংকে প্রায় চার লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে প্রাগ্যের বিজয় প্রমাণ করছে, হত্যা ও দাঙ্গায় তাঁর সম্পৃক্ততা ভোটারদের কাছে তাঁর মর্যাদাই শুধু বাড়িয়েছে। নির্বাচনী প্রচারকালে প্রকাশ্যেই তিনি গান্ধীর হত্যাকারীকে ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে অভিহিত করতেন। অমিত শাহ নিজে প্রাগ্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগকে মিথ্যা বলছেন। ভারতে বিচারাধীন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বাধা নেই। তবে অপরাধী প্রমাণিত হলে এমপিত্ব যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, ঠিক কী ভরসায় এত এত অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন? এর উত্তর খুব সোজা। এর উত্তর হলেন অমিত শাহ। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতায় থাকলে গুরুতর অভিযোগের ফৌজদারি মামলাও রাজনীতিতে আসামিদের স্তব্ধ করতে পারে না। এর তারকাসাক্ষী বিজেপির প্রেসিডেন্ট। এ রকম ক্ষেত্রে বিজেপি যা করেছে তা হলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধর্মের ঢাল দিয়ে আড়াল করেছে। মুসলমান ও খ্রিষ্টান বিরোধিতার সৈনিক হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে বোমা হামলা, খুন, ধর্ষণের আসামিদেরও। ঠিক এই ফর্মুলাতেই আইনের চোখে ভিলেন হলেও ধর্মভীরু ভারতীয় হিন্দুদের কাছে অনেক ‘অপরাধী’ আজ হিরো। এরাই হয়ে দাঁড়িয়েছেন আম্বেদকর, গান্ধী, নেহরুদের উত্তরপুরুষ। অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর চোখে ‘নিরপরাধ’ প্রাগ্য ঠাকুরের মামলার পরিণতি কী দাঁড়াবে, তা অনুমান করা দুঃসাধ্য নয়। আবার প্রাগ্য ঠাকুর মন্ত্রী হলে যাঁদের বিরুদ্ধে ২০০৮-এ বোমা বসানো হয়েছিল, তাদের যে আরও দুর্গতি আছে, সেটাও নিশ্চিত। কিন্তু এটা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত, অমিত শাহ, প্রতাপ চন্দ্র, প্রাগ্য ঠাকুররাই লোকসভায় বসে আগামী দিনের ভারতের নীতি নির্ধারণ করবেন। সে ভারতের অভিমুখটি অনুমান করা দুঃসাধ্য নয়। কিন্তু সে রকম এক ভারত কতটা স্বস্তিকর হবে?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—