সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়েছে। সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি আবার একক গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে চলেছে। কংগ্রেস, বামপন্থিসহ সমস্ত বিরোধী দলই এই নির্বাচনে যাবতীয় অংক উল্টে দিয়ে অত্যন্ত খারাপ ফল করেছে। পশ্চিমবঙ্গে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের শতাংশের হিসেবে ভোটের হার সামান্য কমলেও আসন সংখ্যার নিরিখে তারা ভয়ঙ্কর রকমভাবে কমে গেছে ।

অপরপক্ষে বামপন্থিদের ভোটের শতাংশ তো কমেছেই, দুঃখের বিষয় হলো- তারা একটি আসনও পাননি। জাতীয় স্তরের নির্বাচন নিয়ে যেমন পর্যালোচনা হচ্ছে তেমনি মানুষের ভেতরে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল  ঘিরে নানা ধরনের ভাবনাচিন্তা উঠতে শুরু করেছে । বস্তুত ২০১১ সালে এ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতা দখল করবার পর থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে রাজ্যে যেমন রাজনৈতিক জমি খুঁজে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি সংসদীয় রাজনীতিতে পা রাখবার জোরালো সুযোগ এনে দিয়েছে ।

নিজেকে সংখ্যালঘুপ্রেমী হিসেবে নানা ধরনের ছদ্মবেশে উপস্থাপিত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলমানদের নিজস্ব সম্পত্তি। সেই ওয়াকফের টাকা দিয়ে মুসলমান সমাজের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের একটা ছোট্ট অংশকে সামান্য কিছু ডোল দিচ্ছেন মমতার প্রশাসন। এই ডোল দেওয়ার ভেতর দিয়ে তিনি সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের ভেতরে ‘মুসলমান সমাজের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে’- এমন মানসিকতাকে এতটাই চাগিয়ে দিয়েছেন যে, যার জেরে হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশ গত আট বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সাম্প্রদায়িক বিজেপির দিকে ঢলতে শুরু করেছে।

মুসলমান সমাজের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক- কোন উন্নয়ন না ঘটিয়ে কার্যত মুসলমান সমাজকে ধর্মীয় কুসংস্কারে আবদ্ধ রাখাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক মেরুকরণ সৃষ্টির  অন্যতম প্রধান কৌশল। পবিত্র ইসলাম ধর্মের উদারনৈতিক দিকগুলির কোনও চর্চা কিন্তু গত ৮ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটিবারের জন্যও করেননি।  ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের একটা বড়ো অংশ  যাতে সংখ্যালঘু মৌলবাদের ফাঁদে গিয়ে পড়তে পারে, যার দ্বারা উপকৃত হবে সংখ্যাগুরু মৌলবাদ, তার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন ।

এই চেষ্টা যে কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই করেছেন তা নয়। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তিনি এ রাজ্যে কেবলমাত্র মুসলমান মেয়েদের জন্য নার্সিং ট্রেনিং কলেজের সাড়ম্বর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। টিপু সুলতান মসজিদের তৎকালীন স্বঘোষিত ‘শাহী’ ইমাম বরকতি-কে দিয়ে এই ভিত্তি স্থাপনের কাজটি তিনি করেছিলেন। মজার কথা হলো, ভারতীয় সংবিধানের কোথাও কেবল একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য কোনরকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করবার আদৌ কোনও সংস্থান নেই ।

প্রশ্ন হলো তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার কেন তাদেরই মন্ত্রিসভার একজন সদস্য, কার্যত ভারতীয় সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই প্রতারণা করছে জেনেও চুপ করে বসে ছিল? বস্তুত এ রাজ্যে বামপন্থিদের হেনস্থা করতে, বামপন্থিদের সামাজিক ভিত্তিকে নষ্ট করতে, বামপন্থিদের হটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দীর্ঘদিন ধরে মেরুকরণের রাজনীতি করে চলেছেন, তার সেই মেরুকরণের রাজনীতির প্রথম প্রধান সমর্থক হিসেবে কংগ্রেস দল পশ্চিমবঙ্গে যে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে তাকে ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই।

আজ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এই সাফল্যের পেছনে কংগ্রেস দলের ভূমিকাকে অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় । আজ আমাদের রাজ্যের রাজনীতি এবং সামাজিক মেরুকরণের লক্ষণ দেখে এই আশঙ্কায় ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ও তাদের সঙ্গী সাথীদের সামাজিক, রাজনৈতিক জায়গা করে দেওয়ার জন্য প্রথম থেকেই নাগপুরের কেশব ভবন , আরএসএস এর সদর দপ্তর, সেখানকার তৈরি করে দেওয়ার ছক অনুযায়ী কাজ করে গেছেন?

যদি তাই না হতো, তাহলে মুখে সম্প্রীতির কথা বলে কেন মমতা গত আট বছর ধরে ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’-কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি জায়গা করে দিলেন? মমতা ধর্মে বিশ্বাসী হতে পারেন । কিন্তু সেই ধর্মে বিশ্বাসকে তিনি তার গোটা রাজনৈতিক জীবনে কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির তাগিদেই নগ্নভাবে ব্যবহার করে গেছেন। মমতা ফুরফুরা শরীফে গিয়ে মাথায় হিজাব দিয়ে মোনাজাতের ভঙ্গিমায় ফটোশুট করেছেন। আবার ইসকনে গিয়ে গায়ে নামাবলী জড়িয়ে পরম বৈষ্ণবের   মতন আচরণ করেছেন । সেই মমতা ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের আশ্রমে গিয়ে নিজেকে ‘মতুয়া’  বলে ঘোষণা করে মতুয়া ভোটকে নিজের বাক্সে টানবার সব রকমের চেষ্টা করেছেন ।

ধর্মকে ব্যবহার করে মমতার এই যে বহুরূপী চরিত্র, সেটাই এ রাজ্যে আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সাধারণ মানুষের ভেতরে ধর্মের ভিত্তিতে, জাতপাতের ভিত্তিতে, সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের ভেতরে মমতার প্রশাসনিক ভূমিকা, তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের সীমাহীন দুর্নীতি, ঔদ্ধত্য, বিশেষ করে ভূমি স্তরের নেতাকর্মীদের কয়েক দিনেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়ার ঘটনা, অপছন্দের লক্ষ্যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নানা রকম মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে জেল খাটানো, আইনি সমস্যায় ফাঁসিয়ে দেওয়া- এইসব হাজারো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের ভেতরে যে সীমাহীন ক্ষোভ-হতাশা-রাগ-বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে, তাকেই আরএসএস তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির পক্ষে ব্যবহার করে গেছে ।

সেই ব্যবহারের ফলাফল আমরা এবারের নির্বাচনে দেখতে পেলাম। এবারের নির্বাচনী প্রচারকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে যে নিচুমানের অরাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক প্রচার চালিয়ে গেলেন, সেই প্রচারের ভেতর দিয়েও কিন্তু তিনি কার্যত আরএসএস- বিজেপির তৈরি করা সামাজিক মেরুকরণের ভূগোলকে সব রকমভাবে প্রসারিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কার্যত বলতে পারা যায়, গত আট বছর ধরে এ রাজ্যে বিজেপিকে সংসদীয় রাজনীতিতে একটা সুবিধাজনক অবস্থায় পাইয়ে দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দল এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্ত রকমভাবে ব্যবহার করে গেছেন।

বস্তুত তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে প্রথম থেকেই একটা বড় অংশের এমন ধরনের মানুষ থেকে গেছেন, যারা শারীরিকভাবে করে কম্মে খাওয়ার তাগিদ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস করলেও, মানসিকভাবে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী চিন্তা চেতনার দ্বারা তাড়িত ছিলেন। সেই অংশটি তাদের দলের ভেতরে গত আট বছর ধরে মমতার এই ভেকধারী সংখ্যালঘু প্রীতির বিষয়টিকে কেন্দ্র করে নিজের নিজের জনমণ্ডলীর  ভেতর হিন্দু ভোটকে একত্রিত করে, সেই ভোটকে বিজেপির বাক্সে চালান করবার জন্য সবরকম ভাবে চেষ্টা করে গেছেন।

অপরপক্ষে মমতা গত নির্বাচনে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে একটা লোক দেখানো সোচ্চার মানসিকতা দেখালেও সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠেছে যে, তাহলে কেন তিনি বাজপেয়ির আমলে প্রায় সাড়ে ছয় বছর এই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছিলেন ? তাদের হয়ে, তাদের সঙ্গে মন্ত্রিসভায় অংশ নিয়েছিলেন? বাজপেয়ির আমলে বাজপেয়ি ভালো, আর আডভানি ‘খারাপ ‘- এই তত্ত্বে মমতা সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন। তেমনি মোদি জামানাতে মোদি ‘খারাপ’ এবং একদা মমতার কাছে’ খারাপ’ আডভানি  ভালো  তে পরিণত হন। মোদিকে  খারাপ বোঝাতে নীতিন গড়করি, অরুণ জেটলি প্রমুখের  প্রতি মমতা তার উচ্ছ্বাস গোপন রাখেননি।

এইসব ঘটনাক্রম মমতার বিজেপি বিরোধিতার ভেতরে যে দ্বিচারিতা, সেই দ্বিচারিতাকে সাধারণ মানুষের ভেতরে, এমনকি তার নিজের দলের কর্মী-সমর্থকদের ভিতরেও খুব পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সেই দ্বিচারিতার নিরিখেই সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ, এমনকি তার দলেরও একটা বড় অংশ ,যারা করে-কম্মে খাওয়ার তাগিদে মমতার প্রতি এতদিন আস্থাশীল ছিলেন, তারা আরও বড় রকমের করে-কম্মে খাওয়ার তাগিদ থেকেই সেই আস্থাটা এখন বিজেপির প্রতি প্রকাশ করেছেন ।

গত আট বছর ধরে মমতা প্রশাসন পশ্চিমবঙ্গে কার্যত কোনও বিরোধী দলকেই রাজনীতি করতে দেয়নি। বিজেপির পেছনে আরএসএসের এক ধরনের সামাজিক রাজনৈতিক ব্যাক-আপ আছে। বিজেপি অতীতেও জরুরি অবস্থার কালে, যখন তাদের পরিচিতি ছিল ‘ভারতীয় জনসংঘ’ হিসেবে, তখন রাজনৈতিক কাজকর্ম করতে না পারলে, সেই কাজকর্মগুলিকে সামাজিক ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে আরএসএস এবং আরএসএসের নানা ধরনের শাখা সংগঠনের  ভেতর দিয়ে কাজ করে গেছে ।

একই অবস্থা গত ৮ বছরের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সম্পর্কেও আংশিকভাবে বলা যায়। ‘আংশিক’  শব্দটা  এই কারণে উল্লেখ করা হলো যে, গত ২০১৬ সালের বিধানসভার ভোটকে কেন্দ্র করে বিজেপির প্রাণ-ভোমরা আরএসএসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  বা তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি দুর্বলতার কথা, সাহায্য- সহযোগিতার কথা খোদ বিজেপি নেত্রী উমা ভারতী এ রাজ্যে এসে প্রকাশ্যে স্বীকার করে গিয়েছিলেন ।

গত বিধানসভা নির্বাচনে খড়গপুর আসন থেকে দীর্ঘদিনের বিধায়ক, কংগ্রেসের জ্ঞান সিং সোহন পালকে হারিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের জয়ী হওয়ার ঘটনা, তার পেছনে মোদি-মমতার বোঝাপড়াকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ভেতরে অনেক গুঞ্জন আছে। বিজেপি গত ৮ বছরে মমতার লোক দেখানো বিরুদ্ধতার সম্মুখীন হলেও আরএসএস এবং তার বিভিন্ন ধরনের শাখা সংগঠনগুলির সাহায্যে সামাজিক বিস্তারের ভেতর দিয়ে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ‘সাম্প্রদায়িকতা’-কে এ রাজ্যের প্রায় প্রতিটি মানুষের ভেতরে গেঁথে দেওয়ার জন্য সব রকমভাবে চেষ্টা করে গেছে।

সেই চেষ্টার আংশিক সাফল্য যে তারা সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের ফলের  ভেতর দিয়ে পেয়েছে- সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বামপন্থিরা এই সুযোগটা কোনও অবস্থাতেই পাননি। মমতা কার্যত গত আট বছর ধরে বিরোধী রাজনীতি টুঁটি চেপে ধরে, একদম ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাজ্য পরিচালনার জন্য বামপন্থী রাজনীতির উপর ভয়াবহ অত্যাচার করে গেছেন। শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জে সর্বত্র বামপন্থি নেতাকর্মীদের শারীরিক-মানসিক, অর্থনৈতিক, আইনগত-  সব ধরনের হেনস্থা তিনি করে গেছেন। এই আক্রমণকে  প্রতিহত করবার জন্য সরাসরি রাজনৈতিক কার্যক্রমের  বাইরে সে অর্থে বামপন্থিদের কোন সামাজিক শেকড় বিস্তারের সুযোগ সুবিধা ছিল না।

আরএসএস বা তার শাখা সংগঠনগুলোর সুযোগ নিয়ে বিজেপি যেভাবে নানা ভঙ্গিমায় নিজেদের রাজনৈতিক বিস্তার ঘটিয়েছে এ রাজ্যে, যে বিস্তারের পিছনে মমতা প্রশাসনের পরিচ্ছন্ন মদত ছিল, সেই ধরনের কোন সামাজিক সহযোগী সংগঠন বামেদের ছিল না। এই ধরনের সংগঠন না থাকার দরুণ মমতার চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতার কারণে বামপন্থিরা সেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখা বা তাকে বিস্তার করার সুযোগ পাননি।

গত ৮ বছরে আমাদের জাতীয় আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলগুলি বা সশস্ত্র বিপ্লববাদী বিশ্বাসী গোষ্ঠীগুলি নিজেদের মতাদর্শের বিস্তারের উদ্দেশ্যে, নিজের নিজের এলাকায় সামাজিক ভিত্তি থেকে জোরদার করবার উপর অত্যন্ত জোর দিতেন। পরবর্তীকালে বামপন্থিরা তাদের রাজনৈতিক বিস্তারের ক্ষেত্রে এই সামাজিক বিস্তারের উপরেও কিন্তু অত্যন্ত জোর দিতেন। তাদের সামাজিক বিস্তারের একটি বড় অংশ ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। পাঁচ, ছয় বা সাতের  দশকে আমাদের এই বাংলায় বামপন্থি আন্দোলনকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বামপন্থিদের নেতৃত্বে প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একটা বড় রকমের ভূমিকা পালন করেছিল ।

সেই বামপন্থিরাই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সময়কালে ধীরে ধীরে এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক, সাহিত্যমূলক বিনোদন, সুস্থ-বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের ধারা থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন অর্থাৎ পৌরসভা, পঞ্চায়েত ইত্যাদির সংযোগকে ঘিরে- সেটিকেই সামাজিক ক্ষেত্রে বিস্তারের একমাত্র উপক্রম হিসেবে ধরে নেন। সেই জায়গা থেকে ধীরে ধীরে সময়ের নিরিখে বাংলার গ্রাম এবং শহরের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে  অদল-বদল ঘটছে, তার সময় উপযোগী বিবর্তন তারা নিজেদের মধ্যে ঘটাতে পারেন না ।

স্থানীয় প্রশাসনগুলো অর্থাৎ পৌরসভা পঞ্চায়েত ইত্যাদিকে ঘিরে ক্ষমতা ও অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণের যে দৃষ্টিভঙ্গি বামপন্থি রাজনীতির ‘৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ছিল, সেই জায়গাটি ক্রমশ হয়ে ওঠে পছন্দের কিছু মানুষ বা গোষ্ঠীকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার একটি উপকরণে। যে বামপন্থিদের নেতৃত্বে একদিন গণ-নাটের প্রবাহমানতা গোটা বাংলায় প্লাবন দেখা দিয়েছিল, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের ‘নবজীবনের গান’ তেতাল্লিশের মন্বন্তরের বাংলা-কে নতুন করে সংকল্পে স্থিত থেকে রুখে দাঁড়াবার শক্তি যুগিয়েছিল, সেই বাংলাতেই একদল লোক বামপন্থার নাম করে’ হোপ ৮৬’ থেকে শুরু করে সামান্তা ফক্সকে নিয়ে নাচানাচি করবার সুযোগ পেয়েছে ।

বামপন্থিদের সামাজিক ভিত্তি থেকে সরে যাওয়ার কার্যকারণ এবং সেই কার্যকারণকে কিন্তু হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবির সব রকমভাবে ব্যবহার করে গেছে। যে বাংলায় একদা নিজেদের মতাদর্শের প্রচার-প্রসারের স্বার্থে বামপন্থিরা নৈশ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, সাহিত্য পত্রিকা ইত্যাদির ভেতর দিয়ে মানুষের মনে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সামাজিক অনগ্রসরতা, জাতপাতের নামে নোংরামি ইত্যাদি সরানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছিলেন, সেই পর্যায়ক্রমটি শুকিয়ে যাওয়ার সুযোগেই সেই পতিত জমিতে সরস্বতী শিশু মন্দির, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, ভারত সেবাশ্রম সংঘ ইত্যাদি সংগঠনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ‘সাম্প্রদায়িকতা’র প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে মন প্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছে আরএসএস।

তাদের এই কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে এ রাজ্যে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়েই তাদের লক্ষ্য ছিল এ রাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রে নিজেদের দখলদারি কায়েম করা। একদা বামপন্থিদের শক্ত রাজনৈতিক সামাজিক ভিত্তি এবং বুনিয়াদের  দরুণ সেই কাজ সরাসরি আরএসএস করতে পারেনি। সেদিন তাদের সেই কাজ করবার জন্য সহায়ক শক্তির দরকার ছিল। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদে সেদিন আরএসএস- বিজেপির এই রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির সহায়ক শক্তি হিসেবে নিজেকে সর্বাত্মকভাবে সঁপে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।

দুর্ভাগ্যের বিষয় বামপন্থিরা যেমন সংখ্যাগুরু প্রধান এলাকাতে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে সামাজিক ভিত্তিকে, সংস্কৃতিক ভিত্তিকে প্রবাহমান রাখবার তাগিদ অনুভব করেননি, তেমনি সংখ্যালঘু প্রধান এলাকাগুলিতে ও সংখ্যালঘুদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অধিকার এবং উত্তরাধিকার বজায় রাখবার ক্ষেত্রে সেভাবে তাগিদ অনুভব করেননি ।

বামপন্থি রাজনীতির ভেতরে জন্মসূত্রে মুসলমান যেসব নেতৃত্ব সেই তাগিদ অনুভব করে সচেষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছেন, অত্যন্ত বেদনার কথা হলো এই যে, সেইসব নেতৃত্বের গায়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা সেঁটে দেওয়ার একটা গোপন প্রচেষ্টা চলেছিল। এই যে পর্যায়ক্রম, সেটার পরিপূর্ণ সুযোগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রহণ করেছেন ।

বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসবার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এ রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ ঘটিয়েছিলেন। মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশের ভেতরে আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনষ্কতা প্রসারে সচেষ্ট থেকেছে বামফ্রন্ট সরকার। সেই সংখ্যালঘু সমাজকেই নানাভাবে বিভ্রান্ত করে এবং তাদের কিছু ন্যায্য ক্ষোভকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে, সেই মুসলমান সমাজকে নিজের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছেন  মমতা।

সেই ব্যবহারের পাল্টা হিসেবে একটা ধারাবাহিক পদ্ধতির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে হিন্দু ভোট ব্যাংক, যারা এতোকাল জাত-পাত বা ধর্ম-  এসবের কোনও তোয়াক্কা না করে বামপন্থিদের ভোট দিয়ে গেছেন, সেই  বিপুল অংশের মানুষকে অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক মমতা  ঠেলে দিয়েছেন হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের দিকে। ফলে একদা বামপন্থিদের ভোট দেওয়া, জন্মসূত্রে হিন্দু, অথচ ধর্ম নিয়ে সেভাবে মাথা না ঘামানো মানুষ- খুব সহজেই মোদি-মমতার তৈরি করা ‘গট আপ গেম’- মেরুকরণের রাজনীতির শিকার হয়ে নিজেদের বামপন্থি রাজনীতির প্রতি আস্থাটা রাতারাতি রূপান্তরিত করেছে রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শিবিরের প্রতি আস্থাতে ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে রাজনৈতিক হিন্দু মৌলবাদী শিবিরকে সমর্থনের ভিতর দিয়ে।

পরিশেষে একটি ঘটনাক্রম উল্লেখ করেই এই আলোচনা শেষ করবো। কেইস স্টাডি হিসেবে এই ঘটনাক্রমের ভেতর দিয়েই অনেক বলা, না বলা কথার উত্তর পাঠক পেয়ে যাবেন। বামফ্রন্টের অন্তর্গত  আরএসপি তাদের দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, গোয়া মুক্তি আন্দোলনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব ত্রিদিব চৌধুরী। লোকসভায় দাঁড়িয়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সামনে চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘শাসন করুন ,নয় গদি ছাড়ুন’। ত্রিদিব চৌধুরী তার নিজের নামে একটি কলোনি তৈরি করেছিলেন দক্ষিণ ২৪  পরগনার গোসাবা অঞ্চলে।

গত ৮ বছরে সংশ্লিষ্ট দলের নেতারা  একটি বারের জন্যও সেই কলোনিতে যাননি। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের আগে, ভোট প্রচারের সময়, সেই দলের নেতারা যখন ওই কলোনিতে যান, তখন সেই কলোনির  মানুষেরা তাদের বলেন- এতদিন কোথায় ছিলেন? মমতা প্রশাসন, পুলিশি হেনস্তা, আইনি হেনস্তার ভেতর দিয়ে আমাদের জীবন একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। স্থানীয় বিজেপির নেতা কর্মীরা এগিয়ে এসে আমাদের সব রকমের আইনি, সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছে। আপনাদের তো তখন টিকিটিরও দেখা আমরা পাইনি ।

কলোনির এই মানুষদের ইশারার ভেতর দিয়েই যা কিছু বোঝার সমঝদার পাঠক আশা করি বুঝে নেবেন।

Responses -- “লোকসভা ভোটে বাংলার প্রেক্ষাপট”

  1. আবুল কাশেম

    মমতার মুসলিম প্রীতির বিশ্লেষণ ভালো হয়েছে। কিন্তু এক টার্মেই ২০ শতাংশ বাম ভোট (২৬-২০=০৬) কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো সেই বিষয়টা বিশ্লেষণে আসেনি।

    Reply
  2. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এই প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করল যে আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা বা এনআরসি থেকে যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের বাংলাদেশেই ‘ডিপোর্ট’ করা হবে। বিজেপির অত্যন্ত প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে এনআরসি বিষয়ক এক আলোচনাসভায় তাদের এই নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন।
    সেখানে তিনি বলেন, “এখানে আমাদের পরিকল্পনা হল তিনটে ডি – ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট। অর্থাৎ প্রথম ধাপে অবৈধ বিদেশী কারা, তাদের শনাক্ত করা হবে (ডিটেক্ট) – যেটা এখন চলছে।” “তারপর ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া ও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে (ডিলিট)। আর তারপর আমরা তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করব!” এর আগে বিজেপির শীর্ষ স্তরের কোনও নেতাই এত স্পষ্টভাবে এনআরসি থেকে বাদ-পড়া লোকজনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেননি। ওই একই আলোচনাসভায় হাজির ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও। তিনি মন্তব্য করেন, অবৈধ বিদেশিদের খুঁজতে আসামের পর এবার সারা ভারতেই এনআরসি প্রক্রিয়া চালু করা উচিত। রাম মাধব যখন ডিপোর্ট করার কথা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী সোনোওয়াল-সমেত সভায় উপস্থিত বিজেপির শীর্ষ নেতারা ও শ্রোতা-দর্শকরা টেবিল চাপড়ে ও তুমুল করতালিতে সেই মন্তব্যকে স্বাগত জানান। বস্তুত রাম মাধব ‘অবৈধ বিদেশি’দের যেভাবে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে পরিষ্কার বিজেপির মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক ভাবনাচিন্তা হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ, সেখানে কীভাবে আপনি এই লোকগুলোকে ডিপোর্ট করবেন? আরে, বন্ধু তো আপনাদের সবাই – তাই বলে কি তাদের যে সব লোকজন অবৈধভাবে এখানে আছেন তাদের কি ফেরত পাঠানো যাবে না?
    “আরে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের দিকেই তাকান না। বাংলাদেশ নিজেরাই তো লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সে দেশের সঙ্গে সক্রিয় আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। সৌদি আরবও সে দেশে থাকা অবৈধ পাকিস্তানি, বাংলাদেশী বা ভারতীয়দের মাঝ মাঝেই ফেরত পাঠায়। কাজেই ডিপোর্ট করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই।” ভারত সরকার বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিষয়টি ঠিকই ‘কূটনৈতিক দক্ষতায় ম্যানেজ করে নিতে পারবে’ বলেও তিনি দাবি করেন।
    রাম মাধব বিজেপির নিছক একজন সাধারণ সম্পাদক মাত্র নন – দলের কাশ্মীর নীতি থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের নীতি, সবই তিনি দেখাশুনো করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সঙ্গে বিজেপির প্রধান সেতুও তিনি। বিজেপির পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও দলের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি ও কর্মকান্ডও পরিচালিত হয় রাম মাধবের নির্দেশে। বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বা এইচ টি ইমাম, জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ কিংবা জাকের পার্টির নেতা আমির ফয়সল মুজাদ্দেদি – দিল্লিতে যারাই আসুন না কেন, রাম মাধবের সঙ্গে তারা দেখা করবেন ধরেই নেওয়া যায়। দিল্লিতে রাম মাধব ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ নামে যে থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত, বাংলাদেশের নেতা-মন্ত্রী-নীতি নির্ধারকরাও সেখানে নিয়মিতই বিভিন্ন আলোচনাসভা বা সেমিনারে যোগ দিয়ে থাকেন। এই কারণেই রাম মাধব যখন এনআরসি থেকে বাদ পড়া লোকজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেন, সেটাকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হয়। বস্তুত এটা যে তার কোনও ব্যক্তিগত দাবি নয়, বরং বিজেপির ‘সুচিন্তিত মতামত’, সেটাও তিনি সোমবার সভার পর একান্ত আলোচনায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তবে এনআরসি থেকে যারা বাদ পড়বেন, তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাটা ভারত সরকারেরও নীতি কি না – দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টতই এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমরা এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলছি।” “ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া যে এখনও শেষ হয়নি এবং খসড়ায় যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা যে নিজেদের ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করার আরও অনেক সুযোগ পাবেন সেটাও বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।” “এই মুহুর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের বলার নেই”, জানাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তার কথা থেকে এটা পরিষ্কার, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার কথা পরিষ্কার করে বললেও ভারত সরকার এখনই এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছে না। ভারতে জুলাই মাসের শেষে আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি)-র যে দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশিতহ হয়েছে, তা থেকে রাজ্যের প্রায় চল্লিশ লক্ষ বাসিন্দার নাম বাদ পড়েছে।
    সরকার যদিও বলছে, এরা সবাই আবার আপিল করার বা নথিপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তারপরেও যদি এনআরসি-তে তাদের নাম না-ওঠে, তাহলেও তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে বা শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে যাওয়ার অবকাশ থাকবে।
    কিন্তু এই সব প্রক্রিয়ার শেষেও আসামের বেশ কয়েক লক্ষ লোক অবৈধ বিদেশি হিসেবেই চিহ্নিত হবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। বিজেপি এই লোকজনদেরই এখন বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলছে – যদিও বাংলাদেশ সরকার অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা এদের বাংলাদেশী নাগরিক বলে মনে করে না, আর তাই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ারও কোনও প্রশ্ন নেই। সুত্রঃ বিবিসি বাংলা

    Reply
  3. পূজাব

    এই নির্বাচনের প্রধান চরিত্র ছিলেন আসলে বিজেপির অমিত শাহ। নরেন্দ্র মোদি তাঁর নির্দেশনামতো অভিনয় করে গেছেন। স্বাধীন ভারতে নির্বাচনী সংস্কৃতির বয়স ৬৭ বছর। কিন্তু এর আগে ভারতীয় রাজনীতিতে এত ভালো নির্বাচনী জুটি আর আসেনি। এই জুটির প্রথম ‘অবদান’ পুরো প্রচারাভিযানকে তাঁরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আদলে পাল্টে দিয়েছেন। অথচ নির্বাচন হয়েছে পার্লামেন্টের জন্য এবং ৫৪৩ আসনে প্রায় আট হাজার প্রার্থী ছিলেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এবং উদীয়মান পরাশক্তি চীনের উত্তপ্ত নিশ্বাসের সামনে বিজেপি ভারতমাতার কোটি কোটি সন্তানের কাছে মোদিকে তুলে ধরেছিল এক পুরুষালি শক্তিশালী ভাবমূর্তিতে। বিপরীতে, রাহুলের ইমেজ ছিল অনেকটা একজন সুশীল বুদ্ধিজীবীর মতো, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীদের যতটা মুগ্ধ করেছেন, গ্রামের মানুষদের কাছে ততটাই অবোধ্য থেকে গেছেন। কেবল ব্যক্তি মোদির দুর্বল বিরোধিতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে একই ধাঁচের পুরোনো আহাজারিই তাদের সম্বল ছিল। অমিত শাহ আবারও দেখালেন, বামেরা কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থ যতটা বোঝে, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় উগ্রতা মোকাবিলার কৌশলে ততটা স্বচ্ছন্দ নয়। পুলওয়ামার ফাঁদটি বিজেপির জন্য বেশ ভালো ফল দেয়। এমনকি বিজেপির পুনঃপুন গরুর ছবিকে কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, এ নিয়েও প্রগতিশীলদের কোনো শক্তিশালী কৌশলের দেখা মেলেনি। অমিত শাহ জানতেন,নির্বাচন এখন আর আর্টস নেই, এটা সায়েন্স হয়ে গেছে। বিজেপি তাই ইশতেহার নয়, নজর দিয়েছে মিডিয়া, অর্থ এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করার প্রকৌশলবিদ্যায়। টুইটার থেকে টিভি—র্বত্র তাদের প্রচারকৌশলে ছিল সমন্বিত চিন্তার ছাপ। ভুয়া সংবাদ ছড়ানোতেও তারা ছিল একচেটিয়াভাবে সেরা। এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর পোশাকও তারা প্রচারাভিযানে ব্যবহার করেছে। গ্রামেগঞ্জে ঢেউ তোলার জন্য পাকিস্তানবিদ্বেষী হিস্টিরিয়া থেকে শুরু করে মোদিকে মন্দিরে ধ্যানে বসানো পর্যন্ত—সবই করেছেন অমিত শাহ চুলচেরা পরিকল্পনায়। রাষ্ট্র-সরকার-দল-ধর্ম—এই চারকে একাকার করে উপস্থাপন করতে পেরেছিল তারা। তৃতীয় বিশ্বে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বোধ হয় এ ধরনের ইমেজই তৈরি করতে হয়। অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায়। সর্বত্রই বিজেপি প্রার্থীরা মুসলমান ও খ্রিষ্টানবিদ্বেষ ছড়িয়ে সংখ্যাগুরুদের মধ্যে বিজয়ের বোধ তৈরি করতে চেয়েছে। এতে পুরো দেশ অনেকখানি বিভক্ত হয়েছে। নীতি-নৈতিকতা হিসেবে এটা কতটা খারাপ, সে বিষয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এটা ফলদায়ক ছিল। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর মধ্যে এই বিভক্তির গাণিতিক সমীকরণ ৮০: ২০। বিজেপি জানে, এই সমীকরণের পরিণতি কী।

    Reply
  4. রাশেদ

    কত বাম-কর্মীর ভোট রামে? খোঁজ শুরু করল সিপিএম । সিপিএমের হার্মাদরা আগে লাল জামা পরত। এখন তারা হয়েছে বিজেপির জল্লাদ৷ এক হাতে গদা, এক হাতে তরোয়াল নিয়ে ধর্ম করছে৷ নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর শনিবার সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী ফলাফলের প্রাথমিক ময়নাতদন্ত করে। সিপিএম নেতৃত্বের পর্যবেক্ষণ, তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে মেরুকরণের রাজনীতি বাম কর্মীদের উপরেও প্রভাব ফেলেছে। অনেক জায়গায় পরিকল্পিত ভাবেই সিপিএম কর্মী-সমর্থকরা বিজেপিকে সমর্থন দিয়েছেন। সদস্যদের মধ্যে কারা এই কাজে যুক্ত, তাঁদের চিহ্নিতকরণের কাজই শুরু করেছে সিপিএম। ৪ জুন রাজ্য কমিটির বৈঠকের আগেই প্রতিটি জেলার নেতৃত্বকে রিপোর্ট পাঠাতে বলা হয়েছে। আজ, রবিবার থেকে দিল্লিতে সিপিএম পলিটব্যুরোও বৈঠকে বসছে। কোন কোন কারণে রাজ্যে বামেদের ভোট এত কমল, তার কারণ ব্যাখ্যা করে সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করেছে। পলিটব্যুরো সেই রিপোর্ট পর্যালোচনা করবে। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখলে নিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। ওই সময় পশ্চিমবেঙ্গর ৪২ আসনের মধ্যে বামফ্রন্টের দখলে ছিল ১৫ আসন। কিন্তু সে শক্তি দ্রুতই ক্ষয়ে গেলে মমতার তৃণমূল রাজ্য জয় করার পর থেকে। লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের বামদের সর্বশেষ আসন ছিল মাত্র দুটি। তার একটি হলো, রায়গঞ্জ আর অপরটি মুর্শিদাবাদ। এ নির্বাচনে সে দুটি আসনও হারাতে হলো তাদের। দীর্ঘ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এবারই প্রথম নির্বাচনের মাঠ থেকে একেবারে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে বাংলার বামদের। রাজনীতির সমীকরণে বামফ্রন্ট এবং বিজেপি, দুপক্ষেরই অবস্থান তৃণমূলবিরোধী। বাংলায় লোকসভা নির্বাচনে এই দুপক্ষের ভোট কেন মিশে গেল, তার তিন দফা কারণ উঠে আসছে রাজনৈতিক শিবিরের প্রাথমিক পর্যালোচনায়। প্রথমত, দেশে নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রত্যাবর্তনকে ঠেকানোর চেয়েও রাজ্যে তৃণমূলের হাত থেকে ‘নিস্তার’ পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বাম কর্মী-সমর্থকরা। বামদের রাম রামশুনতে শুনে নিজেই গুলিয়ে ফেলি, কোনটার আগে কি? রামের আগে বাম নাকি বামের আগের রাম!!!! অনেক তর্ক বিতর্ক চলছে বাম আর ইসলাম নিয়ে। পৃথিবীর শান্তির জনক সবার সমমর্যদা’র তরিকত প্রাপ্ত বামদের কারনের পৃথিবীতে এসেছে শান্তির ত্রাণ। আমি শুধু দর্শক আর শুনে যাচ্ছি দু’পক্ষের তর্ক বিতর্ক। পেপার পড়ার মত ধর্য্য না হলেও যেন তাদের কথায় স্বাক্ষী না মেনে বসে তাই পেপারে মননিবেশ। হযরত মুঃ সঃ নিজে কুড়ে ঘরে থেকে তার সাহাবীদের ভালো থাকার ব্যবস্থা করতেন। আর বাম তথা সেকুরা নিজেরা অট্টালিকায় থেকে অনুসারীদের কুড়ে ঘরে রাখে। কেননা তারা কুড়ে ঘরে না থাকলে তো পুজিই শেষ তাদের নেতাদের। এটাই হল বাম আর ইসলামের মধ্যে পার্থক্য।

    Reply
  5. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    বহুত্ববাদী রাজনীতির নামে পরিবারতন্ত্রকে ভারতীয় ভোটাররা আর মেনে নিতে চাইছেন না। যেমনটি দেখা গেছে কয়েক মাস আগের পাকিস্তানের নির্বাচনেও। সিন্ধুর ভুট্টো ও পাঞ্জাবের শরিফ ডাইনেস্টিকে হতবিহ্বল করে ইমরানকে বেছে নিয়েছিলেন সে দেশের ভোটাররা। হয়তো আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার অপরাপর দেশেও এই মনোভাবের বিস্তার দেখব আমরা। গত পাঁচ বছরে ভারতের যেসব রাজ্যে বিজেপির বিজয়রথ থমকে ছিল, সে রকম ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো অঞ্চলও এখন ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার পক্ষে। হিন্দুত্ববাদের এই প্রাতিষ্ঠানিকতায় ভারতীয় পুঁজিতন্ত্রের স্পষ্ট মদদ রয়েছে। মোদির বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং তাঁর দলের বিরুদ্ধে দলিত ও মুসলমানদের নির্যাতনের যেসব বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ বিভিন্ন সময় প্রচারমাধ্যমে এসেছে, ভোটাররা তা অগ্রাহ্য করেছেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আদৌ আর কোনো প্রভাব ফেলতে সমর্থ কি না,Ñভারতের নির্বাচনী ফল সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করেছে। মোদির সঙ্গে ভারতের এই চূড়ান্ত সংহতি কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানকে বাড়তি গতি দেবে। অন্তত কাশ্মীরে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে তা আসন্ন বিপর্যয়কর এক অবস্থার বার্তা দিচ্ছে। ভারতীয় সামরিক আমলাতন্ত্র ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটা উল্লসিত হওয়ার মতো মুহূর্ত বটে। তাৎক্ষণিকভাবেই দেশটির শেয়ারবাজারে তার প্রতিফলন ঘটেছে। আরএসএস এই সুযোগে সংবিধানকে সংশোধন করে ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ পরিচয় দিতে আগ্রহী হবে বলে অনুমান করা যায়। করপোরেটদের দাপটের মুখে শিগগির ভারতীয় শ্রমিক ও কৃষক সমাজ বামপন্থীদের অনুপস্থিতিজনিত সংকট টের পাবে। অভিভাবকহীন বোধ করবে অনেক স্থানের দলিত, আদিবাসী, খ্রিষ্টান ও মুসলমানরাও। এটা বিস্ময়কর হলেও এখন বাস্তবতা, এককালের বামদুর্গ কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা মিলে কাস্তে–হাতুড়ি মার্কায় মাত্র একজন জিতেছেন এবং এসব স্থানে সংখ্যালঘুরাও তাঁদের ভোট দেননি। অথচ তাঁরা বরাবর বামদের ভোট–ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতেন। ২০০৪ সালেও ভারতীয় লোকসভায় কাস্তে-হাতুড়ির ৫৯ জন সদস্য ছিলেন। এবার সেখানে থাকবেন মাত্র ছয়জন। ভারতে মোদির কট্টর ধর্ম ভিত্তিক দলের জয়ে এদেশে যারা আনন্দে আটখানা হচ্ছে তাদের মনোস্কামনা হলো – “বাংলাদেশী ধর্মভিত্তিক দল গুলোর রাজনীতি করার অধিকারই যেন না থাকে”।

    Reply
  6. আসিফ

    বিজেপির এবারের প্রচারণায় জাতীয়তাবাদের বিষয়টি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সে কারণে ৬৫ জন মুসলমানকে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি প্রজ্ঞা ঠাকুরকে মনোনয়ন দিতেও দলটি কুণ্ঠাবোধ করেনি। শুধু প্রজ্ঞা ঠাকুরই নন, এবার মনোননয়ন পাওয়া নির্বাচিতদের মধ্যে আরও অনেকেই আছেন, যাঁরা বারবারই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। লন্ডনপ্রবাসী ভারতীয় লেখক সলিল ত্রিপাঠি একটি বাক্যে এই নির্বাচনের ফলাফল মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্ব যে বছরটিতে (অহিংসার বাণী প্রচারক) গান্ধীর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করছে, সে বছরেই ভারত নির্বাচিত করেছে এমন একজন সন্ত্রাসীকে, যে গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে প্রকৃত দেশপ্রেমিক মনে করে।’ হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুকে নির্বাচনে প্রাধান্য দেওয়ায় ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশও বিতর্কের বিষয় হয়েছে। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর প্রচারণায় বাংলাভাষী মুসলমানদের অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের ঘুণপোকার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এসব সীমান্তবর্তী জেলায় বিজেপির সাফল্যও লক্ষণীয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য আসামে মুসলমান বাংলাভাষীদের বিতাড়নের লক্ষ্যে নাগরিকত্বের তালিকায় নাম থাকা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়ে গত বছর যে তোলপাড় হয়েছে, তা কারোরই ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ৪০ লাখের বেশি মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। তবে সংসদে বিরোধীদের বিরোধিতায় এনআরসি কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও বিজেপির সভাপতি এবারের নির্বাচনী সভায় ঘোষণা দিয়ে গেছেন যে পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য সীমান্তবর্তী রাজ্যেও তা চালু করা হবে। এই এনআরসির কারণে তখন আশঙ্কা তৈরি হয় যে শুধু আসাম থেকেই দশ থেকে ত্রিশ লাখের বেশি বাংলাভাষীকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এখন সেই সংখ্যা কত গুণ বাড়তে পারে, তা অনুমান করা মোটেও কঠিন নয়। ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচিতি হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে কার্যত বিলুপ্তির পথে এগিয়ে গেল। বিভিন্ন উগ্রবাদী হিন্দু দল-উপদলের কথিত নজরদারি (ভিজিল্যান্টিজম), হয়রানি এবং পিটিয়ে হত্যার ঘটনাগুলোর কারণে সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করা যায় না। এর প্রতিক্রিয়া দেশটির সীমান্তের বাইরেও সংক্রমিত হতে পারে। ফলে, বাংলাদেশে উগ্রবাদী ইসলামপন্থীদের তৎপরতা বাড়বে। এর পরিণতিতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারতের উদ্বেগ বাড়বে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করা অন্যায় হবে না যে এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার প্রভাব বাড়বে।

    Reply
  7. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    কংগ্রেস বহুত্ববাদী ভারতের সমর্থক। বিজেপি একসত্তাবাদী। মোদি ও তাঁর টিম বোঝাতে পেরেছেন, ভারতের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ধর্ম তথা হিন্দুত্ব তাদের হাতেই নিরাপদ। এই স্লোগানকে শুধু হিন্দিবলয় নয়, সমগ্র ভারতই গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল মোদির জমানা শেষ করে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও তারা একক কোনো জোট করতে পারেননি। মমতা, মায়াবতী, চন্দ্রবাবু নাইডু প্রমুখ কংগ্রেসের বাইরে যে তৃতীয় ফ্রন্ট নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেছেন, তা শেষ পর্যন্ত বিজেপির পক্ষেই গিয়েছে। এসব আঞ্চলিক নেতারা দিল্লি জয় করার বাসনা ব্যক্ত করলেও তাঁদের পায়ের তলার মাটি যে সরে গেছে, সেটি উপলব্ধি করতে পারেননি। আবার উদার গণতন্ত্রী আঞ্চলিক দলগুলো বামদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা শেষ বিচারে বিজেপির পক্ষে গিয়েছে।

    উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের কথা বলতে পারি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে বিরোধীদের শুধু নির্মূল করার কৌশল নিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ছাড়া আর কোনো দল থাকবে না। স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নির্বাচনে বিরোধীদের দাঁড়াতেই দেননি। ফলে এই কর্মীরা বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছেন। অতীতে বাম ফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম্যে টিকতে না পেরে অনেকে যেমন তৃণমূলে ভিড়েছিলেন। অর্থাৎ মমতার কৌশল এখন বুমেরাং হয়েছে। তাঁর উচিত ছিল অতীতের হিংসা দ্বেষ ভুলে কংগ্রেস ও বাম ফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধে বিজেপিকে মোকাবিলা করা। তাঁর ২০১৪ সালের জনপ্রিয়তা অটল থাকারও কোনো কারণ নেই। তিনি সুশাসন ও সমৃদ্ধি কোনোটাই দিতে পারেননি। ফলে এ কথা বলা ভুল হবে না যে মমতা বিজেপির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে তিনিই পশ্চিমবঙ্গের জন্য গেরুয়া শাসনের পথ সুগম করলেন। রাজনীতিতে সম্ভবত আদর্শের দিন শেষ। সারা পৃথিবীতেই এখন জনতুষ্টিবাদের জোয়ার চলছে। শাসকেরা এখন স্ট্রংম্যান—ট্রাম্প, মোদি, দুতার্তে, মাহাথির মোহাম্মদ প্রমুখ। বহুদলীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি মেনে শাসন পরিচালনা করা এঁদের সাজে না। তাঁরা সবকিছু ভেঙেচুরে দিয়ে নিজ সমর্থকদের তুষ্ট করতে চান। ভারতের মতো বর্ধিঞ্চু দেশের মানুষও এ রকম একজন স্ট্রংম্যানের অপেক্ষা করছিলেন। অন্যদিকে কংগ্রেসসহ অন্যরা মানুষকে কোনো বিকল্প কিছুর সন্ধান দিতে পারেনি। তাই মোদির এই জয়জয়কার। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের আসন দাঁড়াল ২২। বিজেপি ১৮। মমতার জন্য এটি অশনিসংকেতও বটে। আনন্দবাজার লিখেছে, এই মেরুকরণকে নিছক সাম্প্রদায়িক বললে তা খণ্ড সত্য হবে। এর বাইরেও আরও একটি মেরুকরণ এবার স্পষ্ট। সিপিএম এবং কংগ্রেস কার্যত মুছে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে এবার। সিপিএম একটি আসনও পায়নি। ভোট মাত্র ৮ শতাংশ। কংগ্রেস দুটি আসন পেলেও ভোট ৬ শতাংশও নয়। অর্থাৎ শাসক এবং বিরোধী ভোট সরাসরি দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে গেল। যার অর্থ ২০২১-এ বিধানসভার লড়াই হবে মুখোমুখি—বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের। কিন্তু শুধু আনন্দবাজার কেন কোনো গণমাধ্যমই জনগণের মনোভাব আঁচ করতে পারেনি। নির্বাচনের আগে কোনো গণমাধ্যম কংগ্রেস বা মমতাকে সতর্কও করে দেয়নি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—