তার কণ্ঠ ও গায়কী আলাদা ছিল বলেই তিনি অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। এই সেদিনও কোনও এক টিভিতে দেখলাম গান গাইছিলেন। এখন কী হয়?  এককালের খ্যাতিমান গায়কেরা যারা বয়সে তার চেয়েও ছোট আর গাইতে পারেন না, যন্ত্র দিয়ে কাভার করেন । কেউ কেউ দোহারির মতো অন্যদের পাশে রাখেন উঁচুতে উঠলে টেনে দেবে বলে। আর এম ও দেখেছি কেউ কেউ গানের অধর্পথে তা থামিয়ে ওপরের জায়গাটা আবৃত্তির মতো করে বলে আবার খাদ থেকে গান ধরেন। সুবীর নন্দীর বয়স যাই হোক তা করার দরকার পড়তোনা।
এমন একটা সময় আমাদের আধুনিক ও সিনেমার গানে এসেছিলেন যখন মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়েছিল সব শেষ। এককালের বিখ্যাতজনেরা পুরনো গান দিয়ে চলে আর নতুনদের গান মানে মিশ্র কোনও কোলাজ। তখনো অবশ্য যন্ত্রের সাহায্যে কণ্ঠ ঠিক করা কিংবা সাউন্ড অ্যাফেক্ট দিবে গান করার চল আসেনি। আশির দশকে একটি নতুন কণ্ঠ কেন জানি আবেশ ছড়িয়ে দিলো বাঙালির মনে। মনে আছে রাঙামাটি গিয়েছিলাম বেড়াতে। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে। রাতে একটা হোটেল ভাড়া করে থাকা আর সন্ধ্যায় সিনেমা দেখা। তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল। বিনোদন মানে রেডিও টিভির- একটা চ্যানেল আর সিনেমা। সেই সিনেমাটি আহামরী কিছু ছিল না। যেমন হয় গতানুগতিক কাহিনী। ফারুক ছিলেন নায়ক। অতি অভিনয় আর ট্রাক ড্রাইভারের প্রেম। কিন্তু সিনেমা শেষ হলেও গান ফুরালো না। তখন কী সুযোগ ছিল, যে বারবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একই গান শুনে তা মনে রাখবো? অথচ সে গানটির কয়েকটি লাইন ঢুকে গিয়েছিল মগজের কোষে কোষে। দিন যায় কথা থাকে গানটির এক জায়গায়- ‘যে ছবি নয়নে আগুন আল্পনা আঁকে’- বলে একটা লাইন আছে। কী অসাধারণ কণ্ঠ আর কি গায়কী। সে মানুষটি হালকা গানেও এমন ভাব আনতে পারতেন কারণ তিনি মাটি ফুঁড়ে উঠেননি। এসেছিলেন মাটি কামড়ে।

ক্লাসিক্যাল চর্চা ছাড়া যারা গাইতে আসেন তাদের গান হিট হোক আর না হোক একটা সময় তাদের জন্য আপনার মায়া হবেই। হতশ্রী চেহারার মতো ভাঙা গলা আর ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র সেসব গায়কদের মতো ছিলেন না তিনি। আমাদের দেশের প্রথিতযশা শিশু কিশোর সংগঠক কচি-কাঁচার আসরের রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই নামেই যিনি পরিচিত) সিলেট ঘুরে ‘দাদাভাইয়ের কথা’ কলামে সুবীর নন্দীর কথা লিখেছিলেন। তাকে সারা রাস্তা গান শোনানো এই কিশোর মন ভরিয়ে দিয়েছিল। তিনি বাজি রেখে বলেছিলেন- এ একদিন বাংলাদেশ জয় করবে। করেছিলেন বৈকি! আড়াই হাজারের বেশি গান আর চারবার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া শিল্পী সুবীর নন্দী। মরণের আগে আগে পেয়ে গেলেন একুশে পদক। পুরস্কার তাকে সম্মানিত করেছে যতটা, তিনি পাওয়ায় পদকও সম্মানিত হয়েছে ততোটাই। এমন নিভৃতচারী সজ্জন আর ভদ্রলোক এখন বিরল। আমি কথা বলে জেনে বলছি অল্পে অহংকারী আর আকাশে মাথা তোলা মানুষদের ভিড়ে সুবীরদা ছিলেন ব্যতিক্রম।

তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আমরা যে বলি- ‘প্লেইন লিভিং হাই থিংকিং’- তেমন ধারার মানুষ সুবীর । পোশাকে- খাবারে-কথায় পরিমিত। আমি কারও নিন্দা করতে শুনিনি। সিডনি বেড়াতে এসে একরাত আড্ডা দেয়ার সুবাদে আমি তার সৌজন্য আর বিনয়ে মুগ্ধ হয়েছি বারবার। এ বিষয়গুলো এখন নেই বললেই চলে। এখন শো আপের যুগ। অথচ এই সাদাসিদে মানুষটি জয় করেছিলেন আপামর বাঙালির মন। আমার এখনও মনে আছে  গানের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের নামে এখন যে কর্পোরেট বাণিজ্য তেমন একটি শো-তে অতিথি হয়েছিলেন হৈমন্তী শুক্লা। তিনি আমাদের দেশের এক প্রতিযোগীকে বেশ ধমকের সুরে বলেছিলেন তোমরা সবসময় এসব পল্লীগীতি  গান গাইতে  চাও কেন ? আধুনিক গান গাইতে পারো না? সুবীর নন্দীর গান? এমন কথা তার ব্যাপারেই মানায়। এভাবেই তিনি উভয় বাংলায় তার জায়গা করে নিয়েছিলেন।
আমাদের দেশে ভালো গীতিকারের অভাব। সুরকারও হাতে গোণা। সেখানে এমন করে নিজের একটা বিশেষ স্থান  করে নেওয়া দুঃসাধ্য। সেটা করার কারণ খুব পরিষ্কার। সঙ্গীত গুরুমুখীবিদ্যা। তাছাড়া গান হচ্ছে সাধনা । আজকাল কি কারও তেমন ধৈর্য বা সময় আছে? সবাই খুব তাড়তাড়ি নাম করতে চায়। সুবীর নন্দীরা বহু সময় পার করে তারপর গায়ক হয়ে উঠেছেন। আজ এসে কাল সিডি-ক্যাসেট বের করে নাম করায় মেতে উঠেননি। নাম করাটা যেখানে মূখ্য সেখানে নামের পরিচয় আকার মুছে যাওয়া ও সময়ের ব্যাপার। দাগ কাটতে হলে দাগের মতো কাজ করে যেতে হয়। ধরুন কোন গানই থাকলো না, দুটো গানতো বাঙালি কোনকালে ফেলতে পারবেনা। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরও সমান আধুনিক থাকবে- ‘আমার এই দুটি চোখ পাথর তো নয়…’, ‘কিংবা আমি চাইনি হতে কারও নয়নের জল…’, এমন ভাবাবেগ- এমন সুরেলা জাদু কি ভোলা সহজ? না সম্ভব?
আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি হেমন্ত, মান্না কিংবা শ্যামল মিত্র আমাদের ছিল না বটে,  তবে গর্ব করে আরও কয়েকজনের সাথে সুবীর নন্দীর নাম আমরা বলতেই পারি। নিরহংকারী সাদামাটা মানুষটি গান দিয়ে বাঙালির মন জয় করে গিয়েছেন। অকালে তো বটেই এমন কোনও বয়স হয়নি যে চলে যাবেন। তারপরও প্রকৃতি অথবা নিয়তি এমনই। তার মৃত্যুর পরদিন  আমরা কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করেছি। যিনি আমাদের শিখিয়েছেন মৃত্যু জীবনের অমোঘ সত্য। যিনি বলেন- মরণ বলে আমি তোমার জীবন তরী বাই..
খুব মনে পড়ছে তার কথা। ভালো মানুষরা চমক লাগাতে পারেন না বটে, কিন্তু কেমন  জানি একটা ছাপ রেখে যান। যে ছাপটা দীর্ঘ সময় ধরে লালন করি আমরা। গানের জগত এমনিতেই ভালো নেই। আজকাল কতো হাঙ্গামা। গান- গাওয়া শোনা নিয়ে কতো নিষেধ! কত বারণ! সেখানে এমন একজন মৌলিক ও আধুনিক শিল্পীর চলে যাওয়া বড় ঘটনা।

কোন সন্ধ্যায় কিংবা মন খারাপ করা কোন বিকেলে যুবকের কণ্ঠে নিশ্চয়ই ভেসে আসবে- ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম…’, অথবা ‘রাতজাগা চাঁদের দিকে তাকিয়ে গুণগুণ করে কেউ গাইবে, এক যে ছিলো কন্যা…’।
সুবীর নন্দী আপনি আমাদের বেহুলা বাংলার গানের লখিন্দর। আমরা আপনাকে বহুকাল, চিরকাল মনে রাখবো।
অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—