ঝড়ের তিন দিন পরে যখন মোংলা বন্দর দিয়ে সুন্দরবনে গিয়ে পৌঁছাই তখনও সুন্দরবনের ভেতরের নদীগুলোতে অসংখ্য হরিণ, বানর, শেয়াল ও শুকরের মৃতদেহ। তেমনি বনের ভেতর ছড়িয়ে আছে মরা মাছ। বানরের মৃতদেহ দেখে বুঝতে পারি, জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের ভেতর কতটা পানি ঢুকেছিলো আবার ঝড়ের তীব্রতা কত বেশি ছিলো যে বানররা গাছ আঁকড়ে থাকতে পারেনি ওই ঝড়ের ধাক্কার বিপরীতে। ওই ঝড়ে সুন্দরবনের যত গাছ নষ্ট হয়েছিলো এত গাছ একমাত্র সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ ছাড়া অন্য কোন কারণে নষ্ট হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আমার জানা নেই বলছি এ কারণে ২০০৬ সালের পর থেকে সুন্দরবন ও বাঘের খোঁজখবর আর আগের মত রাখতে পারছি না। কারণ, ২০০৪ থেকে এক ধরনের জেলখানায় বসে সাংবাদিকতা করছি। আগে যে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ আমার ছিলো, সেটা নেই। এখন ইচ্ছে করলেই কোথাও ছুটতে পারি না। অথচ যে বয়সই হোক না কেন, ঘরের ভেতর বসে যে সাংবাদিকতা করা যায় না- এ সত্য তো মানতে হবে। তাছাড়া আতাউস সামাদ ভাইকে দেখেছি জীবনের শেষ দিন অবধি স্পটে যেতে। মার্ক টালী মনে হয় সব থেকে সাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন স্পটে।

যাহোক, স্পট সাংবাদিকতার এই নেশা থেকে কখনও বাদ দিতাম না কোনো ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা। ছুটে যাবার চেষ্টা করতাম দ্রুততম সময়ে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে। ১৯৮৮’তে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত করে। এই ঘূর্ণিঝড়টি খুব বেশি প্রচার পায়নি। যতদূর মনে পড়ে ঘুর্ণিঝড়ের চার পাঁচদিন পরে শুধু দৈনিক সংবাদই খুলনার দাকোপ থানার বিলে পচে পেট ফুলে ওঠা অসংখ্য গরুর ছবিসহ ওই ঘুর্ণিঝড়ের নিউজ ছেপেছিলো। ইত্তেফাক ঘুর্ণিঝড়ের নিউজে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তারা শুধু শেখ হাসিনার সফর ছেপেছিলো। বাস্তবে ওই ঘুর্ণিঝড়ের পরে তৎকালীন এরশাদ সরকারের পক্ষ থেকে ওই এলাকায় কোন ত্রাণও দেয়া হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ কেউ পরিদর্শনেও যাননি। শুধু বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা ওই এলাকায় যান। তাঁর সঙ্গে সংবাদ ও ইত্তেফাকের সাংবাদিকরা গিয়েছিলেন। তাঁরা এই রিপোর্ট করেন। বাদ বাকি সব পত্রিকার নিউজ ছিলো লোকাল সংবাদদাতাদের পাঠানো নিউজ। আর ঘুর্ণিঝড়ের বেশ কিছুদিন পরে নানান বন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের লেখায় উঠে আসতে থাকে আসল চিত্র। বাস্তবে ১৯৮৮ এর ওই ঘুর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের কতবড় ক্ষতি হয়েছিলো। মানুষ মারা যায়নি, মারা গিয়েছিলো সুন্দরবনের গাছ। যে ক্ষতি আজো পূরণ হয়নি।

১৯৮৮’র ঘূর্ণিঝড়ের তিনদিন পরে ঢাকা থেকে সুন্দরবনে পৌঁছাই। মোংলা পোর্টের সোজাসুজি নদী পার হয়ে মাটির রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে ওই এলাকায় ঢুকি। এলাকার একটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ওই পথে যাই। ওদের পথ ঘাট সব চেনা। যাবার পথে পথে দেখতে পাই তখনও অসংখ্য পশুর মৃতদেহ জোয়ার ভাটায় ভাসছে। বেঁধে আছে চড়ার কেয়া, ধানি, গোলপাতার ঝাড়ে ঝাড়ে। সমুদ্র ও জঙ্গলের পাশের মানুষ ওরা। তাই কোনো দুর্যোগ এসব এলাকার মানুষকে দমাতে পারে না। এর আগে পরেও অনেক ঘুর্ণি দুর্গত এলাকায় গিয়ে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, এসব এলাকার মানুষ অনেক বেশি সংগ্রামী। তাদেরকে দমানো খুবই কঠিন। তাই ঝড়ের তিনদিন পরে যখন সেখানে পৌঁছেছি, দেখি জঙ্গলের সঙ্গে যে গ্রামগুলো সেখানে আবার নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সংগ্রাম। ঝড় ও জলোচ্ছাসে তাদের যেসব পাতা ও কাঠ দিয়ে তৈরি ঘর বাড়ি ভেঙ্গে গেছে তারা সেগুলো মেরামত করতে ব্যস্ত। তাছাড়া স্বেচ্ছাশ্রমে তারা নদীর পাশের ভেঙ্গে যাওয়া বাধ তৈরি করছে। ওই সব বাধ শুধু যে ভেঙ্গে গিয়েছিলো তা নয়, নীচু এসব বাধের অন্তত আরো দশ ফুট ওপর দিয়ে পানি এসেছিলো প্রবল বেগে। সে পানিতে বাধের পাশের ছোট ছোট কুটির সব ভেসে যায়। ওই পথ দিয়ে চলতে চলতে চোখে পড়ে বিলের ভেতর বেশ কয়েকটি মেয়ের মৃতদেহ। মৃতদেহগুলো পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। রাস্তার পাশের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করি, মানুষের এই মৃতদেহগুলো তারা সৎকারা করেনি কেন? তারা উত্তর দেয় ওগুলো সব বেশ্যাদের মৃতদেহ। ওগুলো কেউ ছোবে না। তাদের মুখের কথা শুনে থমকে দাড়িয়ে যাই। মনে মনে ভাবি, এই আমাদের মানব সমাজ। এই মেয়েগুলোকে সমাজ ও সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো পতিতাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য করেছিলো। আবার পতিতালয়ের ওপর নিউজ করতে গিয়ে দেখেছি অনেক মেয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে সেখানে এসেছে। তাই তাদের তো কোন দোষ নেই ওই বৃত্তি জীবনের তাগিদে বেছে নেয়ায়। অথচ এই সমাজে তাদের মৃতদেহ সৎকারেরও কোন সুযোগ নেই। তাদের জীবদশায় যেমন তাদেরকে খুবলে খেয়েছে মানুষের মত দেখতে কিছু শেয়াল কুকুর এখন তাদের মৃতদেহগুলো খুবলে খাবে শেয়াল কুকুরে! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার হাঁটতে শুরু করি। কারণ, আর যাই হোক রিপোর্টার তো কবি নই, তার তো বেদনার সব রূপ দেখার সুযোগ নেই। তাকে ছুটে চলতে হবে সংবাদের জন্যে কত বেশি তথ্য সে জোগাড় করতে পারে। কত তার বৈচিত্র হয় সেদিকে নজর দেবার জন্যে।

আরো সত্য হলো যে কোন স্পটে গিয়ে যত বেশি ঘোরাঘুরি করা যায় ততই নিউজ মেলে। যাহোক, কিছুদূর এগিয়েই জঙ্গলের পাশ ঘেষা গ্রামে ঢুকি। গ্রামে গিয়ে জানতে পারি, বিলের ভেতর যে পতিতাদের মৃতদেহ দেখলাম এরা জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচার জন্যে এই গ্রামের অনেক বাড়িতে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভেতর আশ্রয় নিতে গিয়েছিলো। কিন্তু তাদেরকে রীতিমতো লাঠিপেঠা করে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়। কারণ তারা অপবিত্র। ঘরে ঢুকলে ঘর অপবিত্র হয়ে যাবে। তাই তারা শেষ অবধি ডুবে মরে জলোচ্ছ্বাসের পানিতে। তবে ওই গ্রামের অনেক ঘরে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আশ্রয় পেয়েছিলো হরিণ, বানর এমনকি বাঘও। যে বাড়িতে বাঘ আশ্রয় নিয়েছিলো ওই বাড়ির মানুষেরা বাঘের পায়ের ছাপ তখনও সংরক্ষণ করে রেখেছে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, রাতে তাদের ঘরের ভেতর আশ্রয় নেয় একটি বাঘ, দুটি হরিণ ও একটি বানর। বাঘ দেখে তারা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। তবে সারারাত বাঘটি পোষা কুকুরের মত মানুষের পাশে বসেছিলো। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস শেষ হবার পরে ভোরের আলো ফুটতেই অনেকটা মাথা নীচু করে বের হয়ে যায় বাঘটি। মনে পড়লো ১৯৭০’র ঘূর্ণিঝড়ের দৈনিক বাংলার সেই বিখ্যাত ছবি’র কথা, সাপ ও মানুষ ঝড়ে জড়াজড়ি করে মরে আছে। তাদের সঙ্গে যখন বাঘ নিয়ে কথা বলছি ওই সময়ে বাড়ির মালিক এসে তার এই অথিতিকে দুপুরে খাবার খেতে বলেন তাদের বাড়িতে। বার বার না বলাতে এক পর্যায়ে বলেন, হরিণের মাংস দিয়ে যেন অল্প করে দুটো ভাত খাই। হরিণের মাংস শুনে তার দিকে তাকাতেই বলেন, ওই রাতে যে হরিণটা ঢুকে ছিলো বাঘ চলে যাবার পরে তারা সেটাকে আটকে রেখেছিলো, তারই মাংস। কেমন যেন একটা অসহ্য জ্বালা করে চোখের কোন বেয়ে জল এল। চশমার আড়ালে জল লুকিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি। আর বের হতে হতে মনে মনে ভাবি, তাহলে কি পৃথিবীর সব থেকে হিংস্র জীব মানুষ! কারণ, যে বিপদে সাপ মানুষকে কামড়ায় না, বাঘ মানুষ বা হরিণ খায় না- সেই বিপদের মধ্যে বসে মানুষ আশ্রিত হরিণ ধরে খায়। তবে আবার একটু এগিয়ে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাও বেড়ে যায়। সেখানে দেখতে পাই তখনও কতকগুলো আহত পশু পাখি রয়েছে। মানুষ তাদের সেবা শুশ্রূষা করছে। এবং ইতোমধ্যে যেগুলো সুস্থ হয়েছে তাদের বনে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। তাদের দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো, আসলে এ জন্যে এখনও পৃথিবীতে চন্দ্র সূর্য আলো দেয়।

দুই দিন পরে আবার ভিন্ন পথে সুন্দরবনে ঢুকি। দেখতে পাই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সুন্দরবন। হাজার হাজার গাছ ঝড়ে ভেঙ্গে গেছে। আর এই জঙ্গলে আঘাত হেনেই মূলত ঝড়টি দুর্বল হয়ে যায়। এই জঙ্গলটি না থাকলে সেদিন দক্ষিণ খুলনার এই এলাকাটি আরেকটি ১৯৭০ এর ভোলা হতো। আবারও দশ লাখ মানুষের প্রাণ যেতো। সুন্দরবনের গাছের গায়ে পানির দাগের উচ্চতা মেপে দেখেছিলাম, নরমাল এক তলা বিল্ডিং এর উচ্চতা ছিলো ওই পানির। আর যদি পূর্ণ জোয়ারে হতো তাহলে নদীতে এর উচ্চতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? সেদিন সুন্দরবন থেকে যখন বের হই তখন দেখি, জঙ্গলের গা ঘেষে থাকা গ্রামের কিছু নারী ও পুরুষ এসেছে সেখানে বনবিবির পুজো করতে। বাংলাদেশে এই একটি পুজো আছে যা ওই এলাকার সকল ধর্মের মানুষ সমান ভক্তিতে করে। বন বিবির নানান ইতিহাস পড়েছি। অনেক মিথও পড়েছি। তবে ওই দিন মনে হলো আসলে এই বনই তো এই মানুষগুলোর সাক্ষাৎ ঈশ্বর। বন শুধু তাদের জীবিকা দেয় না। মৃত্যুর হাত থেকেও রক্ষা করে। আর তাইতো সবাই মিলে বনের পুজো করে। শহরের পণ্ডিতরা এই বনের গুরুত্ব কতটুকু দেন তা জানার কোন উপায় নেই। বন ও পরিবেশ মন্ত্রী যতবার বিদেশে যান পরিবেশ সেমিনারে যোগ দিতে তার এক শতাংশ বার দেশের কোন বনের অবস্থার খোঁজ নিতে যান না। অথচ ১৯৯১ এর ঘুর্ণিঝড়ের পরে চকরিয়া গিয়ে যখন দেখি মহেশখালি চ্যানেলে শত শত শিশুর মৃতদেহ মাছের ঝাঁকের মত জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে তখন এক বৃদ্ধকে বলতে শুনি, আজ চকোরিয়ার সুন্দরবনটি থাকলে এ অবস্থা হতো না। চকোরিয়ায় ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের কোন অস্তিত্ব এখন আর নেই। অথচ এই মানুষই ধ্বংস করেছে সেটা। সরকার আসে সরকার যায়, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট কেবলই কমে। বাড়ানোর কোন উদ্যোগ নেই। অথচ এবারও দুর্বল ফণিকে আরো দুর্বল করেছে দক্ষিণ খুলনায় ম্যানগ্রোভ ফরেস্টটি।

স্বদেশ রায়সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—