মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাতের মৃত্যুতে কাঁদছে বাংলাদেশ। ‘যৌন নিপীড়ক’ মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলার প্রতি ঘৃণায় সামাজিক মাধ্যমে ঝড়। সাহসী, প্রতিবাদী নুসরাতের অগ্নিদগ্ধ, ব্যান্ডেজমোড়ানো শবদেহের ছবি দেখে বেদনার্ত হয়নি, এমন মানুষ বিরল। মনে হচ্ছে যেন নুসরাতের শব কাঁধে নিয়ে শোক করছে বাংলাদেশ।

নুসরাত বাংলাদেশে একজন নয়। এর আগেও এমন অনেক শবদেহ বহন করতে হয়েছে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রকে। দেখতে হয়েছে রিশা ও তনুদের অসহায় মৃত্যু। সামাজিক মাধ্যমে ঝড়ও নতুন কিছু নয়। একের পর এক বিষয়ে উত্তাল হওয়াই সামাজিক মাধ্যমের বৈশিষ্ট্য।

কিন্তু নুসরাতের যৌন-আক্রান্ত হওয়া, প্রতিবাদ করা, তার উপর আবার আক্রমণ চালানো, কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগ এবং অবশেষে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা- এর মধ্যে একটি বেশ গুরুতর বিষয় লক্ষ্যণীয়। নুসরাত যখন মৃত্যুশয্যায় সেসময় অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলার মুক্তি দাবি করে সোনাগাজী এলাকায় একটি মিছিল বের হয়। সে মিছিলের প্রকৃত ছবি এবং ফটোশপ করা ছবি দুটোই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফটোশপ করা ছবিটি প্রসঙ্গে কিছু বলার কোনও মানে না হলেও প্রকৃত ছবিটিতে দেখা যায় মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থীকে। বোরখা পরিহিত নারীদেরও দেখা যায়। নুসরাতের দেহে যারা অগ্নিসংযোগ করে তারাও ছিল বোরখা পরা নারী। নুসরাতের হত্যার পর দেশের মাদ্রাসাগুলোর পরিচালকদের পক্ষ থেকেও কোনও প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানো হয়নি।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে দেশের মাদ্রাসা-শিক্ষা ব্যবস্থার আড়ালে জমে থাকা অন্ধকার নিয়ে। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে রয়েছে অসংখ্য মাদ্রাসা ও এতিমখানা। মাদ্রাসা ও এতিমখানায় শিশুদের উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানোর খবর অনেকবারই পত্রিকায় এসেছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অনেক বছর ধরেই। এই নির্যাতিতদের মধ্যে ছেলে ও মেয়েশিশু রয়েছে। মসজিদের ভিতরে ছেলে ও মেয়েশিশুর যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে অসংখ্যবার। অনেক শিশুকে হত্যাও করা হয়েছে। মক্তব ও মাদ্রাসায় সকল শিক্ষকই যে অপরাধী তা নয়। কিন্তু এসব জায়গায় প্রচুর অপরাধী যে রয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের মতো ধর্মান্ধ সমাজের সমস্যা হলো মাদ্রাসা শিক্ষকদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ করতে গেলেই মনে করা হয় ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে। এখানে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, ভ্যাটিকানের ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধেও অনেকবার শিশুর উপর যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে কোন কথা বলা হচ্ছে। এর মানে হলো অপরাধী যাজকের শাস্তি বিধান করা এবং শিশুকে নির্যাতন থেকে বাঁচানো। তাহলে মাদ্রাসা শিক্ষকের অপরাধের শাস্তি চাইলে সেটাকেও ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর কোন মানে নেই। নির্যাতনকারী ধর্ষক  অধ্যক্ষের মুক্তি দাবি করে যারা মিছিল করেছে নিঃসন্দেহে তাদের মগজ এমনভাবে ধোলাই করা হয়েছে যে তারা বুঝতেই পারেনি তারা কি করছে। অথবা তারা সিরাজুদ্দৌলার চ্যালাচামুন্ডাদের ভয়ে বাধ্য হয়েছে। মাদ্রাসাগুলোর ভিতরে কি ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম রয়েছে তা এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের দেখলেই বোঝা যায়।

মাদ্রাসা শিক্ষার পদ্ধতি কতটুকু যুগোপযোগী সেটাও ভেবে দেখার দরকার আছে বৈকি। এখন সারা বিশ্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুর শারীরিক ও মানসিক শাস্তির বিরুদ্ধে প্রচার চলছে। নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এই বর্বরতা। অথচ মাদ্রাসাগুলোতে এখনও শিশুকিশোরদের ভয়ানক সব শারীরিক শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুকিশোরদের বেত মারা, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, তাদের উপর ধর্ষণ ও বলাত্কার চালানো শিক্ষকদের কাছে ডালভাত। মাদ্রাসাগুলোতে এতটাই ত্রাসের রাজত্ব চলে যে এর প্রতিবাদ করার কথা শিক্ষার্থীরা স্বপ্নেও ভাবে না। তাছাড়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়ের সংখ্যাই বেশি। তারা ধরেই নেয় এভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়াটাই তাদের নিয়তি। মাদ্রাসাগুলোতে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তাও একজন শিশুর ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য কতটা উপযোগী হবে সেটাও একটা প্রশ্ন। দেশের কাওমী মাদ্রাসাগুলোতে বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি বিরোধী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখার সময় হয়ে গেছে অনেক আগেই। ধর্মের নামে তাদের দেওয়া হচ্ছে প্রগতি ও মানবাধিকারবিরোধী শিক্ষা।

ফিরে আসি নিহত নুসরাত ও নির্যাতনকারী সিরাজুদ্দৌলার প্রসঙ্গে। সাহসী নুসরাত তার উপর সংঘটিত নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছিল। তাই তাকে হত্যা করা হলো।  সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে আগেও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই অভিযোগগুলো মাদ্রাসার পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি। যদি নিত তাহলে আজ নুসরাতকে মরতে হতো না। দেশের ছোট বড় প্রতিটি মাদ্রাসাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা দরকার অবিলম্বে। মানব সভ্যতা এগিয়ে চলছে বিজ্ঞানের আশীর্বাদে। মানুষ আজ ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তুলতে পেরেছে, মহাবিশ্বের রহস্য আবিষ্কারের সাধনায় মগ্ন রয়েছে।

একই দেশে তিন, চার রকম শিক্ষা পদ্ধতি চালু না রেখে সমন্বিত শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলন করাটাই বিজ্ঞানসম্মত। তবু যদি মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি রাখতেই হয়, তাহলে তা থেকে জমাট বাঁধা অন্ধকার দূর করে সেগুলোর আধুনিকায়ন করতে হবে। মাদ্রাসাগুলো যেন যৌন নির্যাতনের আখড়া, কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের ডিপো এবং প্রগতিবিরোধী ও মানবাধিকারবিরোধী চিন্তার সূতিকাগারে পরিণত না হয় সেটা নিশ্চিত করতেই হবে। সরকারের কঠোর নজরদারি ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। নুসরাতের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও  যৌন নির্যাতক অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলার কঠোর শাস্তি যেমন চাই তেমনি লাখো নুসরাতের নিরাপদ এবং সুস্থ জীবনও কামনা করি।

শান্তা মারিয়ালেখক; সাংবাদিক।

Responses -- “নুসরাতের শব কাঁধে বাংলাদেশ”

  1. Fakhruddin Ahmad

    দারুণ লেখা কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষার আসল কালো দিকগুলো এবং এর আসল কারণগুলো নিয়ে আপনার কাছ থেকে লেখা আশা করছি। এ ব্যাপারে আপনাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে আমি ইচ্ছুক। আমি অনেকদিন ধরে এনিয়ে কাজ করছি এবং আপনার সাথে ইনফরমেশান শেয়ার করতে চাই।

    Reply
  2. মোঃ কারিমুল ইসলাম

    ইসলাম আমাদের ধর্ম।
    ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে আরবি শিক্ষা আবশ্যক।
    তেমনি আবশ্যক আমাদের দেশের সকল জাতি বা সকল শ্রেনীর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা । আমরা স্বভাবগত ভাবে হুজুর ,মাওলানা ও শিক্ষকদের সম্মান শ্রোদ্ধা করি।
    তাদের কাছে আমরা ভালো কিছু তথা শিক্ষা ও আশ্রয় বা নিরাপত্তা আশা করি। আর সেই জায়গা যদি হয় অনিরাপত্তার কারখানা তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থা কোথায়। অবশ্যই একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে আমাদের সকল দিকে খেয়াল রাখতে হবে ।সাহায্য করতে হবে প্রশাসনকে । আর অপরাধী যেই হোক তার উপযুক্ত বিচার হাওয়া উচিৎ।

    Reply
  3. Abdul Qader

    Shanta Maria,
    Salute for such a bold article. Hope more Shanta Maria will be surfaced soon to try to mobilise the concious of Bangladesh against these institutions wich are the centres for unscientific education that teaches the students only blind faith and all baseless superstitions. A country cannot be modernised while having such a big population with backward education.

    It has been proved that all paedophilics/sex offenders can find a secured refuge in such institutions which are not brought under open inspection of rules and regulations.

    Hope Nusrat’s death would bring this issue moving forward that can make her soul happy and in peace.

    Reply
  4. মিসির আলি

    বাস মালিক ক্ষতি করে, জরিমানা দিতে নারাজ।হিরো আলম জেলখানায় বন্দী। সেফুদারও নতুন কোন ফাটাফাটি লাইভ পাচ্ছি না। টেলিসামাদও হটাৎ কইরা মইরা গেলো। এরশাদ সাহেবও আগের মতন নাই। টিকটক বন্ধ। ইনু-মেননও আগের মতন পারফর্ম করতে পারছে না। তসলিমারও পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। সানাই-সালমানও ডিবির নজরদারির মধ্যে। আবার, এইদিকে রাস্তায় বাহির হইতেও দূর্ঘটনার ভয় লাগে। বাসা আর অফিস দুই জায়গাতেই আগুনের পোড়া লাশের গন্ধ পাই। আকাশে উড়বার সাধ্যি নাই। গান শুনতে গিয়ে মনে হয় আইয়ুব বাচ্চু… নেই। টিভি দেখতে গিয়ে দেখি বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন। এদিকে ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিযোগিতার শেষ নেই। বাসের সিরিয়াল, অফিসে ঢুকতে সিরিয়াল বের হইতে সিরিয়াল। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি অফিসে দিয়ে যখন বাসায় ফিরি, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যখন বাসে ঝুলে থাকার একটু সুযোগ পাই তখন কেউ বলে ওঠে, গাঁ ঘেষে দাড়াবেন না। এত কিছুর মধ্যেও, জীবনটা কলিজা ভুনার মত “উমমম….কুব টেশ” এটাই সোনার বাংলাদেশ😂🙈🐸

    Reply

Leave a Reply to Abdul Qader Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—