আগুন দুর্ঘটনা- এই মুহূর্তে আমাদের জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক বিভীষিকাময় আতঙ্কের নাম। ইদানিংকালে প্রায়ই আমরা খবর পাচ্ছি এই ভয়াবহ দানব কারো না কারো উপর জেঁকে বসেছে। এ দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে অনেকের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে এই দানবের করাল থাবায়। আমরা হয়ত এই দানবের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া তাজা প্রাণগুলোকে দেখে আঁতকে উঠছি, হয়ত শোকে মুহ্যমান হচ্ছি  কিন্তু এই দানবকে মোকাবেলা করতে আমাদের আসলে কতটুকু সক্ষমতা রয়েছে? কেনই বা এ দানব বার বার আমাদের আক্রমনের সুযোগ পাচ্ছে? সময় এসেছে প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বের করার ।

প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা দেখি আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা মিডিয়ার সামনে এসে শোক প্রকাশ করে বেশ শক্ত শক্ত কথা বলেন। তারা আরও শক্তভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন । কিন্তু শক্ত তদন্ত কমিটির শক্ত রিপোর্টটি কোনও এক অজানা কারণে নরম হয়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।আরও হাস্যকর বিষয় হল প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা জানতে পারি ভবনটি নিয়ম মেনে করা হয়নি।কাদম্বিনী দেবীকে যেরূপ মরিয়া প্রমাণ করতে হয়েছিল তিনি মরেন নাই ঠিক তেমনি ভবনকে দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে প্রমাণ করতে হয় ভবনের মালিক তিনি নিয়ম মেনে ভবন করেন নাই।এমন কোনও দুর্ঘটনা নেই যেখানে কর্তা ব্যক্তিরা এই নিয়মের ব্যতিক্রম করেছে।হোক নে সেটা পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা কিংবা নতুন ঢাকার এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড।

চকবাজারের দুর্ঘটনার পর একটি কথা বলে মূল দায়িত্বকে এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা হলো পুরান ঢাকার স্থাপনাগুলো অনেক পুরানো এবং এলাকা ঘিঞ্জি হবার কারণে সেখানে চাইলেও অনেক কিছু করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ঘটনাটি যখন অভিজাত এলাকা বনানীতে ঘটলো তখন কিন্তু আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অবস্থা রইল না।দুর্ঘটনার পর জানা গেল সেই একই পুরানো কথা তা হলো, ভবনটি রাজউকের নিয়ম মেনে করা হয়নি। ভবনটিতে জরুরি মুহূর্তে বের হওয়ার মতো কোনো পথ ছিল না। ২৪ ইঞ্চি সাইজের একটি পথ ছিল। প্রত্যেক ফ্লোরে পথটি এমনভাবে ডেকোরেশন করা ছিল যে, সেই পথ দিয়ে সহজে বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।কোনো ফ্লোরে আগুন নেভানোর মতো যন্ত্র ছিল না। দুয়েকটি অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র পাওয়া গেলেও সেগুলো ছিল অকার্যকর।আবার সেই পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে বিন্দুমাত্র ভুল করলেন না কর্তা ব্যক্তিরা, সেই একই গল্প শোনালেন দেশবাসীকে ।

অথচ আমরা জানি একটা ১০ তলার উপরের বিন্ডিং এর প্ল্যান পাস করাতে পরিবেশ, ফায়ার ফাইটিং সহ প্রায় ১৩ টি দপ্তরের অনুমোদন লাগে।আমরা শুধু জানলাম নিয়ম মানা হয়নি কিন্তু সেই ১৩টি দপ্তরের কি ভূমিকা ছিল তা অন্ধকারেই রয়ে গেল। ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে কিভাবে ২৩ তলা হলো? এই অনুমোদনহীন ৫ তলার বিষয়ে রাজউক কেনই বা এতদিন চুপ ছিল? যথাযথ নিয়ম না মেনেও কিভাবে রাজধানীর অভিজাত এলাকার বুকে ভবনটি দাঁড়িয়ে ছিল? এ সকল প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে এক প্রকার রহস্যজনক নীরবতাই পালন করা হল। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে বনানীর যে জায়গাটিতে এই টাওয়ারটি অবস্থিত সেই এলাকায় গা ঘেঁষে আরও বেশ কয়েকটি টাওয়ার রয়েছে। প্রত্যেকটি টাওয়ার এতটাই ঘিঞ্জি অবস্থায় যে একটিতে আগুন লাগলে সেই আগুন ছড়িয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবেনা। স্বভাবতই যে প্রশ্নটি জাগছে তা হলো সেই এলাকার অন্যান্য ভবন গুলো নির্মাণে কি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কিনা? সেই ভবনগুলোতে অনুমোদনহীন কোনও তলা রয়েছে কিনা? নাকি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার জন্য আমাদের আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের অপেক্ষা করতে হবে?

জবাবদিহিতার পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের উপর নজর দেবার সময় এসেছে তা হচ্ছে সক্ষমতা। আগুন দুর্ঘটনা মোকাবেলা করার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আমাদের রয়েছে কিনা?

তবে এই সক্ষমতা সরকারি, বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও বাড়াতে হবে। প্রত্যেককে তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।মনে রাখতে হবে আগুন দুর্ঘটনার ক্ষতি ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় সকল পর্যায়কেই সমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সরকারকে অবশ্যই ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিকায়নে মনোযোগী হতে হবে। ফায়ার ফাইটারদের যথাযথ সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।ফায়ার ফাইটারদের  প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ না দিয়ে তাদের কাছে উচ্চাশা করা হবে অনেকটা হাত পা বেধে সাঁতার কাটতে বলার মতো। ফায়ার সার্ভিস যত বেশি আধুনিকায়ন হবে আগুন দুর্ঘটনায় ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ তত কম হবে। তাই  সম্পদ রক্ষা এবং মূল্যবান প্রাণ রক্ষার স্বার্থে ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন অবশ্যম্ভাবী।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সাথে সাথে সচেতনতা বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে সমভাবে জরুরী। অবশ্যই যে কোনও প্রতিষ্ঠান যে কোনও স্থাপনা ভাড়া নেবার ক্ষেত্রে আগুন দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা সেই স্থাপনাটির আছে কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাড়ি ভাড়া নেবার ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিশ্চিত করা উচিৎ। মনে রাখতে হবে যখন ভবন মালিকেরা ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে এই ধরনের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে তখন তারা নিজেদের স্বার্থেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন।যখন স্থাপনাতে আগুন দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকবে তখন আগুন দুর্ঘটনায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে।

সবশেষে বলতে চাই, সময় এখন অসহায়ত্ব প্রকাশের নয় বরং সময় এখন সক্ষমতা বৃদ্ধির, সময় এখন রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এবং দুর্ঘটনা মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে আগুন দুর্ঘটনা নামক ফ্রাংকেনস্টাইন কেড়ে নেবে আরও তাজা প্রাণ, নিভে যাবে আরও অনেক প্রজ্বলিত আশার প্রদীপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—