বিল্ডিং কোড বর্তমানে বাংলাদেশে একটি আলোচিত শব্দ, বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে পুরোনো ঢাকায় কয়েকটি এবং সর্বশেষ বনানী-গুলশানের মতো জায়গায় বহুতল ভবনে আগুন লেগে বহু মানুষ হতাহত হলে বিল্ডিং কোড শব্দটি আলোচনার শীর্ষে চলে আসে। বিল্ডিং কোড যেকোনো দেশের ইমারত নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান; যা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে ভবনের নির্মাণ ও ব্যবহারের সময় জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না বলে আশা করা হয়। এই নিবন্ধে বাংলাদেশে বিল্ডিং কোডের ইতিহাস, আইনগত ভিত্তি, বাস্তবায়নের হাল-হকিকত ও প্রতিবন্ধকতা আলোচনার পাশাপাশি কানাডার আলবার্টা প্রদেশে কীভাবে অনুরূপ কোড বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তার একটা তুলনামূলক চিত্র সংক্ষেপে তুলা ধরা হবে। সরকারের তরফে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিতকরণসহ প্রয়োজনীয় কোড প্রণয়নের পক্ষে বড় ধরনের আলোচনার সূচনা করা এই নিবন্ধের লক্ষ্য।

ইতিহাস:

১৯৯১ সালের ১৪ই ডিসেম্বরে একনেকের এক সভায় বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড প্রণয়নের লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিজাইন ডেভেলপমেণ্ট কর্পোরেশন বা ডিডিসিকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১লা জুন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি তাদের যাত্রা শুরু করে। সমাজের নানাক্ষেত্রে কর্মরত প্রকৌশলী, স্থপতি, নগর-পরিকল্পনাবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের যোগ্যদের নিয়ে একটা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। খসড়া কোড প্রস্তুতের আগে ও পরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশসহ নানা জায়গায় সেমিনার করে জনমত গঠন ও মতামত গ্রহণ করা হয়। অবশেষে, ১৯৯৩ সালের ২৮শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ১৯৯৩’ অনুমোদন করা হয়। তখন পর্যন্ত কোড বাস্তবায়নের পক্ষে কোনো আইন অথবা কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। ফলে নির্মাণের সাথে যুক্ত ভবনের মালিক থেকে শুরু করে ডিজাইনার বা স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষের (যথা: রাজউক) বিল্ডিং কোড অনুসরণের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কোড থাকলেও সেটার অনুসরণ ছিল ভলান্টিয়ারি। অনেক পরে ২০০৬ সালে এসে ১৯৫২ সালের বিল্ডিং কন্সট্রাকশন অ্যাক্ট সংশোধন করে তাতে ১৮(ক) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড’ এর পক্ষে একটা আইনগত ভিত্তি দেয়া হয় এবং ২০০৬ সালে বিল্ডিং কোডটি যুগোপযোগী করে সংশোধন করা হয়। ১৯৫২ সালের নির্মাণ আইন সংশোধন করে বিল্ডিং কোড অনুচ্ছেদ তৈরী করা হলেও নির্মাণের সাথে যুক্ত জটিলতা নিরসনে সেটা যথেষ্ট ছিল না। ফলে বিল্ডিং কোডকে বাস্তবায়ন করবে এবং কীভাবে করবে সেই প্রশ্নটির কোনো সূরাহা হয়নি। ২০০৬ এর মতো ২০১৫ সালের বিল্ডিং কোডেও প্রশাসনিক কাঠামোর একটা প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড ২০০৬:

মোট দশটি ভাগে বিভক্ত কোডটির প্রথম ভাগে ইতিহাস ও উদ্দেশ্য, দ্বিতীয় ভাগে কোডটি বাস্তবায়নের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো, পারমিট ও পরিদর্শন, তৃতীয়ভাগে নগর-পরিকল্পনা ও স্থাপত্য ডিজাইনসহ ভবনের শ্রেণিবিন্যাস, চতুর্থ ভাগে অগ্নি নির্বাপন ও প্রতিরোধ, পঞ্চম ভাগে সুপারিশকৃত বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস, ষষ্ঠভাগে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, সপ্তম ভাগে কন্সট্রাকশন, অষ্টমভাগে গ্যাস-বৈদ্যুতিক-যান্ত্রিক-শব্দ-পানি ও পয়ের ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা, নবম ভাগে পুনর্নিমাণ ও সংস্কার এবং দশমভাগে সাইন বা চিহ্ন বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, জটিলতা বিবেচনায় নগর-পরিকল্পনার অংশটিকে দ্বিতীয়ভাগে অবাস্তবায়নযোগ্য মনে করে বাদ দেয়া হয়েছে।

পর্যালোচনা:

কোড বাস্তবায়নের জন্য দ্বিতীয় অংশে যে প্রশাসনিক পরিকাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে, তা এই কোডের অংশ হয়ে উঠেছে। পরিকাঠামোসহ বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ পৃথক আইনের আওতায় করাটা যুক্তিসংগত। দ্বিতীয় অংশের সূচনায় বিষয়টি উল্লেখ থাকলে ভালো হতো এবং পরবর্তী সংস্করণে এই অংশটি বাদ দেয়া যেত। এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি না হলেও ২০১৫ সালের প্রস্তাবে সেটির কারণ আলোচনা ব্যতিরেকেই নতুন ধরণের বাস্তবায়ন পরিকাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যাহোক, উভয় প্রস্তাবে বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষকে বিল্ডিং কোডের অধীনস্ত করে রাখা হয়েছে।

ভবনের ডিজাইনে সবচে গুরুত্বপূর্ণ পেশার নাম আর্কিটেক্ট বা স্থপতি। ভবনে আলো-বাতাস থেকে শুরু করে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার, শব্দ চলাচলকে সীমিত করা, সর্বোপরি আগুন লাগলে আগুনের বিস্তার ধীরলয়ে করা, কীভাবে দ্রুততম সময়ে এবং কোনো রকমের প্রাণহানি ছাড়া মানুষকে নিরাপদে ভবনের বাইরে আনা যায়, সেই বিষয়গুলো মাথায় রেখে তাকে নকশা করতে হয়। সেই নকশার উপর দাঁড়িয়ে স্ট্রাকচারাল-মেকানিক্যাল-ইলেকট্রিক্যাল এবং প্রয়োজনবোধে ফায়ার ফাইটিং ইঞ্জিনিয়াররা স্ব-স্ব ডিজাইন দাঁড় করায়। স্ব-স্ব ডিজাইন হয়ে গেলে সেগুলো সমন্বয় করার কাজটি স্থপতিকেই করতে হয়, সেজন্য উন্নত দেশে একজন স্থপতি তার ডিজাইনের অতিরিক্ত হিসাবে প্রধান সমন্বয়কারীর ভূমিকাও পালন করে। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ বিল্ডিং কোডে এই বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। ডিজাইনে স্থপতিদের গুরুত্বহীন করে রাখা, সিভিল ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পার্থক্যটা পরিষ্কার না করা, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-কে অধিকতর গুরুত্ব দেয়ার মতো অসংগতি আছে। আবার ফায়ার ফাইটিং এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশটির ডিজাইন ও বাস্তবায়ন কে করবে সে সম্পর্কে কোনো ধারণার অনুপস্থিতি দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। ফায়ারসহ মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ডিজাইনের অনেক প্রস্তাবনাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট-বিবেচনায় অবাস্তব; যেমন: ফায়ার সাপ্রেশন হিসাবে স্প্রিংলারের ব্যবহার― বাংলাদেশে এ বিষয়ে কোনো পড়ালেখা হয় কি না, হলেও বড় বড় শহরের পানি সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষ, যেমন ঢাকার বেলায় ওয়াসার সেই সক্ষমতা নেই বিধায় রাস্তায় যেখানে ফায়ার হাইড্রান্ট বসানো হয় নাই, সেখানে ভবনে স্প্রিংলার বসানো অসম্ভবই হবে। লেক সংলগ্ন এলাকায় লেকের পানি ব্যবহার করে বিকল্পভাবে স্প্রিংলার বসানো হয়তো সম্ভব; কিন্তু তাকে পুরো জনপদে বিস্তৃত করা অবাস্তব চিন্তা। অগ্নি প্রতিরোধের চেয়ে বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থায় বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত অগ্নির ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, বিশেষ করে হতাহতের সংখ্যা শূণ্যে নামিয়ে আনা। আর তা করতে হলে ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার একজিট এবং ধোঁয়ার নিয়ন্ত্রণ― এই তিন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ভবনের ডিজাইন করা হলে অনেক বড় ধরণের অগ্রগতি সাধিত হবে। এমনকি বিদ্যমান কাঠামোয় সামান্য পরিবর্তন এনেই এটা অর্জন করা সম্ভব। কোডে পরিবেশ বিষয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। তা সত্ত্বেও, কোডে যেভাবে বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণকালে তা অনুসরণ করা সম্ভব হলে বা তাকে অনুসরণে বাধ্য করা গেলে ভবন অনেক বেশি নিরাপদ থাকবে, তাতে সন্দেহ নেই।

সমস্যা:

বিল্ডিং কোডের দ্বিতীয়ভাগে বর্ণিত প্রশাসনিক পরিকাঠামো অদ্যাবধি প্রস্তাবনা আকারেই আছে এবং এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ত্ব নেই। ১৯৫২ সালের নির্মাণ অ্যাক্ট সংশোধনে করে বিল্ডিং কোড তৈরীর আইনগত ভিত্তি দেওয়া হলেও কথিত নির্মাণ অ্যাক্টের আওতায় কোডটি বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে, যা হয়েছে সেটাকে বলা হয় ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া; অর্থাৎ কোডটি কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ব্যবহারের প্রয়োজনে জন্ম না হয়ে সে নিজে আগে জন্ম নিয়েছে এবং ব্যবহারকারী খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই সংকট চলমান। সমস্যার দ্বিতীয় চরিত্রটি আইনগত। বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের পক্ষে আইন দরকার; ১৯৫২ সালের নির্মাণ আইনের অধিকতর সংশোধন কাজে লাগবে না এবং সেদিকে অগ্রসর না হওয়াটাই উত্তম। সমস্যার তৃতীয় চরিত্রটি পেশাগত। ভবনের নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণের সাথে যুক্ত পেশাজীবী, অর্থাৎ স্থপতি, প্রকৌশলী তো বটেই এমনকি ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ফায়ার অ্যালার্ম টেকনিশিয়ান, বিল্ডিং ইন্সপেকটর পেশাগুলো বাংলাদেশে আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কোনো পেশা না। বাংলাদেশে পশুর ডাক্তার পেশার জন্য আইন আছে, কিন্তু স্থপতি বা প্রকৌশল পেশার জন্য কোনো আইন নাই। আইইবি’র সদস্যদের ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বিবেচনা করা হলেও সেই বিবেচনা আইন দ্বারা স্বীকৃত না। একই কথা স্থপতিদের বেলায়ও প্রযোজ্য। সমস্যার পঞ্চম দিকটি শিক্ষাগত। স্থাপত্য বা প্রকৌশল বিদ্যার প্রতিষ্ঠান আছে; কিন্তু নির্মাণের সাথে যুক্ত অন্য কোনো পেশার জন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা এই সংকট উত্তরণে সহায়ক না। আবার পলিটেকনিকগুলো যেদিকে ঝুঁকে পড়েছে সেখান থেকে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ফিটার, ইন্সপেক্টর তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেভাবে এই পেশায় মানুষ আসছে সেটার উপরে নির্ভর করে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব না।

বিশ্বের অন্য প্রান্তে:

কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জাতীয় গবেষণা কাউন্সিল বিল্ডিং কোড, ফায়ার কোড, প্লাম্বিং কোড, এনার্জি কোডসহ নানা ধরণের কোড বই প্রস্তুত করে। কিন্তু বাস্তবায়নের বেলায় কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো এখতিয়ার নেই। সেজন্য প্রতিটি প্রদেশে ‘সেফটি কাউন্সিল’ নামে আইনগত কর্তৃত্বপূর্ণ সংস্থা আছে। তারা যে কোনো কোড হুবহু অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অথবা জাতীয় কোড অনুসরণ করে নিজেদের উপযোগী কোড প্রস্তুত করার জন্য রিসার্চ কাউন্সিলকে অনুরোধ করতে পারে। আলবার্টা প্রদেশের সেফটি কাউন্সিল তেমন একটা সংস্থা যা মিউনিসিপ্যালিটি অ্যাফেয়ারস বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটি রেগুলেটরি সংস্থা, যা প্রদেশের সেফটি কোড অ্যাক্ট বা আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত। অনেকটা বাংলাদেশে বিটিআরসি বা টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনের মতো। আলবার্টা সেফটি কাউন্সিল জাতীয় বিল্ডিং কোড ও জাতীয় ফায়ার কোড দুটিকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী করে রিসার্চ কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘আলবার্টা বিল্ডিং কোড’ ও ‘আলবার্টা ফায়ার কোড’ প্রস্তুত করে নিলেও প্লাম্বিং এবং এনার্জির বেলায় জাতীয় কোডটি হুবহু অনুসরণ করছে।

আলবার্টা বিল্ডিং কোডের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট:

দুটো ভলিউমে প্রস্তুত বিল্ডিং কোডের প্রথম ভলিউমে ডিভিশন এ এবং ডিভিশন সি অন্তর্ভূক্ত। ডিভিশন এ অনেকটা বাংলাদেশ বিল্ডিং কোডের প্রথম ভাগের মতো, এতে তিনটি অংশ। ডিভিশন সি প্রশাসনিক, অর্থাৎ বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ (যেমন সেফটি কাউন্সিল অব কানাডা) কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবে তার দিক-নির্দেশনা সেখানে আছে। কোনো কোড আংশিক না পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে, বা কোডের কোনো অংশ সংশোধন বা স্থগিতকরণ করতে হবে কি না, সেই আদেশটি সেফটি কাউন্সিল দিয়ে থাকে। দ্বিতীয় ভলিউমের একমাত্র ডিভিশনটি হলো ডিভিশন বি। এতে আছে ডিজাইন ও নির্মাণ এবং শিরোনাম ‘গ্রহণযোগ্য সমাধান’। এই সেকশনে এগারোটি অংশ, প্রথম ও দ্বিতীয় অংশের পরে গুরুত্বপূর্ণ অংশের সূচনা হয়েছে ‘ফায়ার প্রটেকশন, অকুপ্যাণ্ট সেফটি এবং অ্যাকসেসাবিলিটি’ দিয়ে। বলাবাহুল্য, ব্যারিয়ার ফ্রি ডিজাইন যা অচল মানুষদের জন্য প্রযোগ্য এবং অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়। চতুর্থ থেকে অস্টম অংশ যথাক্রমে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, পরিবেশগত পৃথকীকরণ, শীতাতপ ও ভেন্টিলেশন, প্লাম্বিং সার্ভিস, এবং নির্মাণকালীন সেফটি। নবম অংশটি ছোটছোট বাসা-বাড়ির জন্য পৃথকভাবে প্রস্তুতকৃত প্রস্তাব যার ডিজাইনে পেশাদার প্রকৌশলীদের প্রয়োজন পড়ে না। পরের তিনটি অংশ বাংলাদেশের জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ না, কারণ ওসবের জন্য নানা মন্ত্রণালয় কাজ করছে। উল্লেখ্য, আলবার্টা বিল্ডিং কোডটি স্বয়ংসম্পূর্ণ না, অর্থাৎ ডিজাইনের বেলায় একে অন্যান্য কোড, যেমন: প্লাম্বিং কোড, ইলেকট্রিক্যাল কোড, ফায়ার কোড, এনার্জি কোড তো বটেই উত্তর আমেরিকার নানা স্ট্যান্ডার্ডের উপর নির্ভর করতে হয়। উল্লেখযোগ্য স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে, অ্যাশরে বা আমেরিকান সোসাইটি অব হিটিং, রেফ্রিজ্যারেটিং অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং প্রস্তুতকৃত ৬২.১ (ভেন্টিলেশন), ৯০.১ (এনার্জি), আমেরিকান ন্যাশনাল ফায়ার প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন প্রস্তুতকৃত এনএফপিএ-১৩ (ফায়ার স্প্রিংল্যার সিস্টেম)। বলাবাহুল্য, অ্যাশরে, এনএফপিএ, সিএসএ, এএসটিএম, ইউএলসি এগুলো সবই স্ব-শাসিত গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান, যাদের কাজই হচ্ছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নানা ধরণের স্ট্যান্ডার্ড প্রস্তুত করা।

যেভাবে কাজ করে:

ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্থানীয় সরকারের একটি পৃথক ব্যবস্থাপনা, যেখানে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সেখানে কী ধরনের বিল্ডিং হবে তার একটা মাস্টার প্লান করা হয়। উক্ত প্লানের আওতায় কোনো ডেভেলপার দ্বারা নিযুক্ত হয়ে একজন স্থপতি প্রধান সমন্বয়কারী হিসাবে কাজ শুরু করে। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে তার টিমে অন্তর্ভূক্ত করে তাঁকে দিয়ে সাইট সার্ভিসিং প্লান তৈরী করে এবং সিটি বা কাউন্টিতে তাদের অনুমোদনের জন্য জমা দেয়। উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান, যেমন: সিটি কর্পরেশন বা টাউন বা কাউন্টিগুলো সরকারের সেফটি কাউন্সিলের অনুমোদন প্রাপ্ত অ্যাক্রিডিটেড বা নিসৃষ্ঠ প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ, উক্ত প্রতিষ্ঠানে বিল্ডিং কোড, ফায়ার কোড, প্লাম্বিং কোডসহ যাবতীয় কোড বুঝার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল আছে এবং তারা প্রকৌশলী, বা স্থপতির নকশা বুঝতে এবং প্রয়োজনে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। যাহোক, সিটি কর্পরেশন থেকে সাইট সার্ভিসিং প্লান অনুমোদন লাভ করলে, তখন স্থপতি বিল্ডিং-এর একটা মডেল জমা দেয় ডিপি বা ডেভেলপমেণ্ট পারমিটের জন্য, এই সময় এসে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের দরকার হয়, কারণ বহিঃদেয়াল বা ছাদ ডিপির অংশ এবং সেখানে বাতি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসলে তাকে ডিপিতে দেখাতে হয়। সিটি কর্তৃক ডিপি অনুমোদন লাভের পরে, স্থপতি, ইন্টেরিওর ডিজাইনার, স্ট্রাকচারাল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল এবং প্রয়োজনবোধে স্প্রিংলার ডিজাইনরা তাদের ডিজাইনের কাজ শুরু করে, এবং তা হয়ে হয়ে গেলে বিল্ডিং পারমিটের জন্য জমা দেয়া হয়। ডিজাইন যেই করুক, স্থপতিকে আর্কিটেকচারাল প্লানের জন্য এবং লাইসেন্সড বা প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ারকে স্ব-স্ব ডিসিপ্লিনের ডিজাইনের দায়িত্ব নিয়ে স্ট্যাম্প করতে হয়। এপর্যায়ে টেন্ডার করে নির্মাণ ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় এবং নির্মাণ শুরুর আগে ঠিকাদার এবং স্ব-স্ব ট্রেড সিটি থেকে কন্সট্রাকশন বা নির্মাণ পারমিট সংগ্রহ করে। নির্মাণ চলাকালীন ডিজাইনের সাথে যুক্ত প্রতিটা ডিসিপ্লিন কাজের পরিদর্শন করে। এছাড়া সিটির পক্ষ থেকেও পরিদর্শন করা হয়। এভাবে পরিদর্শন শেষ হলে একজন কমিশনিং এজেন্ট পুরো কাজের সাথে যুক্ত লাইফ সেফটি আইটেম, অর্থাৎ ফায়ার অ্যালার্ম, স্প্রিংলার (যদি থাকে), এয়ারকন্ডিশনিং ও ভেন্টিলেশন যন্ত্রপাতি, মেকানিক্যাল স্টেয়ারকেজ প্রেসারাইজেশন, এলিভেটর, একজিড করিডোর ইত্যাদির অপারেশন পরিদর্শন করে এবং সন্তুষ্ট হলে সনদ প্রদান করে। এই সনদ, সিটির পরিদর্শন সনদ এবং প্রতিটি ডিসিপ্লিন থেকে দেওয়া কাজ সম্পন্ন হওয়ার সনদ একত্রে সিটিতে জমা দিলে তখন তারা অকুপ্যান্সি সনদ প্রদান করে। তখনই কেবল বিল্ডিংটি ব্যবহার উপযোগী হয়। তার আগে সেফটি আইটেম অর্থাৎ, সেফটি জুতা, চশমা, ভেস্ট ইত্যাদি পরিধান না করে উক্ত ভবনে কারও প্রবেশাধিকার থাকে না।

প্রস্তাবনা:

  • সায়েন্সল্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে তাকে জাতীয় রিসার্চ কাউন্সিলে উন্নীত করা। বিল্ডিং কোড সহ যাবতীয় সেফটি কোড প্রস্তুতের দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নানা স্ট্যান্ডার্ড-এর হালনাগাদ তথ্য রাখা ছাড়াও সেকল স্ট্যান্ডার্ডের কতটুকু এবং কোন অংশটুকু বাংলাদেশে ব্যবহার করা যায়, সময়ে সময়ে তার সুপারিশ প্রস্তুত করাটা তাদের কাজের আওতায় রাখা দরকার।
  • কোড প্রয়োগ করার মতো সংস্থা গড়ে তোলা। কানাডার আলবার্টা প্রদেশের সেফটি কোড কাউন্সিল একটা দৃষ্টান্ত হতে পারে। অনতিবিলম্বে বাস্তবায়নের স্বার্থে সীমিত আকারে বিটিআরসির অনুরূপ কাঠামোও অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে, সুদুরপ্রসারী প্রশাসনিক পরিকাঠামো তৈরী করার ঘোষণাটি থাকতে হবে। কাজেই সেইফটি কোড অ্যাক্ট নামে আইন তৈরী করে তার আওতায় কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৫২ সালের কন্সট্রাকশন অ্যাক্ট বাতিল করে এর মধ্যে পাহাড় কাটার মতো বিষয়গুলোর জন্য পৃথক আইন তৈরী করা। এই কাউন্সিলের কাজ হবে:
  • ডিজাইনের সময় কোড মেনে করা হচ্ছে কি না তা যাচাই করে ডেভেলপমেন্ট পারমিট প্রদান, বিল্ডিং পারমিট প্রদান, নির্মাণকালীন সময়ে কোড মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে কি না তা পরিদর্শন করা এবং সবশেষে বিল্ডিং এর অকুপ্যান্সি সনদ প্রদান করা;
  • সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের যেসব বিভাগ নিজেরাই বিল্ডিং নির্মাণের সাথে যুক্ত তাদের সক্ষমতা যাচাই করে অ্যাক্রিডিটেশন প্রদান করা এবং সময়ে সময়ে তা হালনাগাদ করা;
  • বিল্ডিং কোডের যে অংশ বাস্তবায়নযোগ্য বা বাস্তবায়নযোগ্য না, তাকে চিহ্নিত করে আদেশ জারি করা; এবং সময়ে সময়ে কোডের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে আদেশ জারি করা।
  • প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা পর্যন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সেফটি কোড সেল’ নামে একটা সেল গঠন করে তাকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে সংযুক্ত করা এবং তাদের অবকাঠামো ও জনবলকে ব্যবহার করে বিল্ডিং কোড বা অন্যান্য কোড প্রয়োগের প্রয়োজনী আদেশ জারি করা। প্রয়োজনে পৃথক প্রকল্পের আওতায় জনবল সংগ্রহ করা যায়, তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই সেলকে কাউন্সিলে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘নগর-পরিকল্পনা সেল’ গঠন করা, যার দায়িত্ব হবে সারাদেশের সকল শহরের জন্য মাস্টার প্লান তৈরী করা;
  • বড় বড় শহরে রাজউকসহ যেসকল প্রতিষ্ঠান সিটি কর্পরেশনের কর্তৃত্বের বাইরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদেরকে সিটির আওতায় আনা।
  • ডিজাইন ও নির্মাণে পেশাদারিত্বে প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাক্ট’, ‘আর্কিটেক্ট অ্যাক্ট’, ‘ইলেকট্রিশিয়ান অ্যাক্ট’ এর মতো প্রয়োজনী আইন তৈরী করে পেশাগুলোকে রেগুলেটেড করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • নির্মাণের সাথে যুক্ত যেসকল ট্রেডের পক্ষে শিক্ষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নাই, সেগুলোকে চিহ্নিত করে দেশের কলেজগুলোতে বা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে সেসব কোর্স চালু করা। ক্যারিকুলাম প্রস্তুতের কাজটি সায়েন্স ল্যাবকে উন্নীত করা রিসার্চ কাউন্সিল করলে ভালো হয়। তবে, তাতে সেফটি কাউন্সিল, স্থপতি ও প্রকৌশলীদের লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, নির্মানের সাথে যুক্ত সমিতির প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেডের প্রতিনিধিদের যুক্ত রাখা দরকার।
লতিফুল কবিরবর্তমানে কানাডায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। রাজশাহী বিআইটি থেকে গ্রাজুয়েশনের পরে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথোরিটিতে কাজ করেছেন দীর্ঘ বারো বছর

Responses -- “বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড: একটি পর্যালোচনা”

  1. সৈয়দ আলি

    কানাডাতে থাকি। কানাডার ফায়ার কোড জেনে খুব উপকৃত হলাম।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—