পর্বত-অরণ্য মরু-সমুদ্র, পশু-পাখি, মাছ মাছালি-গাছ গাছালির এই শতরূপে অপরূপা গ্রহে মানুষ চিরকাল কষ্ট পেয়েছে বন্যা, খরায়, ভূমিকম্প-সাইক্লোনে, রোগে শোকে। কিন্তু মানুষের হাতেই মানুষ যে কষ্ট পেয়েছে তা অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়। লক্ষ কোটি নিহতের বীভৎস মৃতদেহ, সংখ্যাহীন বিধবা-এতিমের আর্তনাদ হাহাকার, কোটি কোটি দগ্ধ-ধ্বংস বসতির দুঃসহ স্মৃতি বুকে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে মানুষের ইতিহাস।

এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস।  এখন ‘ইসলাম-ভীতি’, ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসী’, ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’,  ‘ইউজফুল ইডিয়টস’, ‘ইসলামের শত্রু’, ‘ইসলাম বাঁচানেওয়ালা’, ‘রাইট ও লেফট উইং’… উথাল-পাথাল দুনিয়া।  কোনটা মিথ্যে- কোনটা সত্যি, কোন সত্যির মধ্যে কী কী ভেজাল, কোন পক্ষের কে ও কারা কী মুখোশ পরে সামনে পেছনে কী মতলবে কী করছে তা বুঝে ওঠা অসম্ভব। এই ধরনের সন্ত্রাস আগে ছিল স্থান কালে সীমাবদ্ধ। এখন অরক্ষিত প্রতিটি দেশে প্রতিটি মানুষ তাদের বাড়ি বা হোটেল-দালানে, মিউজিক কনসার্টে, স্টেডিয়ামে, শিক্ষাঙ্গনে, রাস্তা-ঘাটে এমনকি উপাসনালয়েও।  কেউ জানেনা হঠাৎ কখন কোথায় নিরীহ মানুষের ওপরে উঠে পড়বে ঘাতক ট্রাক বা ছুটে আসবে ঘাতক বুলেট।  এই দাবানল কি আদৌ বন্ধ হবে?  নাকি শান্তির সময়টুকু আসলে পরের রক্তপাতের প্রস্তুতির সময় মাত্র?

সমস্যাটা অতিকায় এবং বহুমাত্রিক।  মাঠে দৃশ্য-অদৃশ্য খেলোয়াড়ের দল, টেবিলে দৃশ্য-অদৃশ্য তাসের ধুম্রপাহাড়, আকাশে বাতাসে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ঘূর্ণিঝড়। সেই সাথে মিডিয়ার তেলেসমাতি তো আছেই। ওদিকে আবার ইসলামিক স্টেট্ মুসলিম সন্ত্রাসীদের কিছু হামলার দায় স্বীকার করাতে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম ভীতি বেড়েছে।   বিশ্ব-মুসলিম নেতৃবৃন্দ বলেছেন ওটা ইসলাম নয় ওরা মুসলিম নয় কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি।  ধোঁয়াশার এই উৎকণ্ঠায় একটুখানি স্বস্তির হাওয়া – নিউজিল্যান্ড পার্লামেন্টে কোরান তেলাওয়াত, প্রধানমন্ত্রীর মাথায় হিজাব, সংসদে তড়িৎগতিতে অস্ত্র-আইন পাশ, দু’মিনিটের জন্য নীরব পুরো দেশ, রেডিও-টিভিতে জোহরের আজান, সন্ধ্যায় পার্কে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা, দেশ জুড়ে পশ্চিমা হিজাবী নারীরা, দেশে দেশে অমুসলিমরা মুসল্লিদের নামাজ পাহারা ইত্যাদি ইত্যাদি…।

স্যালিউট ! কিন্তু  !!!

এখানে এসেই আত্মসমালোচনা করাটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।  দেশ-বিদেশের বহু মওলানার বক্তব্যে কাউকে উল্লেখ করতে শুনলাম না মুসলিম সন্ত্রাসীদের হাতে পশ্চিমা বিশ্বে আহত-নিহতদের প্রতি সমবেদনা, নাইজিরিয়া মিসর ইন্দোনেশিয়ায় শত শত চার্চ ভাঙা ও হাজার হাজার খ্ৰিস্টানদের হত্যা, সৌদির আক্রমণে ইয়েমেনের কোটি মানুষের ভয়াবহ ধ্বংস, দুর্ভিক্ষে অসংখ্য শিশুর আসন্ন মৃত্যু। বাংলাদেশেও অমুসলিমদের ওপর শত শত অত্যাচার, সম্পত্তি উপাসনালয় ভাঙা হয়েছে কিন্তু  সমবেদনায় ছুটে যাননি কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতা। সভ্য-অসভ্যের এই লক্ষ্মণরেখা দুনিয়ার নাকের ডগায় তুলে ধরা আছে তা আমরা মুখে বলি বা না বলি।

অনেক দেশে সন্ত্রাসীরা ধরা পড়েছে এবং আদালতে আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হয়েছে, হচ্ছে, হবে।  আত্মসমালোচনায় এসে পড়ে সংশ্লিষ্ট শারিয়া আইনটাও।  আইনটা এতই সুস্পষ্ট যে তার মধ্যে “এর মানে ওই আর ওর মানে তাই” করে পানি ঘোলা করার সুযোগ নেই।  উদ্ধৃতি দিচ্ছি বাংলাদেশ ইসলামী ফাউণ্ডেশনের প্রকাশিত ৩ খণ্ডের “বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন” থেকে, কেউ চাইলে পৃষ্ঠাগুলোর স্ক্যান পাঠাব।

১. “যে কোন কর্মের বাস্তব সংঘটনই উহাকে অপরাধকর্মে পরিণত করে… বাস্তবে সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত কোন কর্মের জন্য কাহাকেও দায়ী করা যায় না।” – ১ম খণ্ড পৃষ্ঠা ২০৮।

২. “কোন ব্যক্তির অপরাধ প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাহাকে গ্রেপ্তার বা আটকের মাধ্যমে তাহার ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাইবে না।” – ৩য় খণ্ড ধারা ১২৮২।

অর্থাৎ সন্ত্রাসীদের প্ল্যান, মিটিং, যোগাযোগ, ষড়যন্ত্র, অস্ত্র জোগাড় ইত্যাদি প্রমাণিত হলেও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা যাবে শুধু “বাস্তবে সংঘটিত” অর্থাৎ খুন হবার পরেই, আগে নয়।   এসব আইন দিয়ে কাজ হবে?  এক’শ বছর আগেও প্রতিশোধপরায়ণতার হিংস্র দানব মোটামুটি বন্ধ ছিল বোতলে,  এখন স্বার্থের কারণে তাকে ছিপি খুলে মুক্ত করেছেন বিশ্বনেতারা।  রক্তপিপাসু সে দানব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বময়, এখন ইচ্ছে করলেও তাকে তারা আবার বোতলে ছিপিবন্ধ  করতে পারবেন না।  মানুষের রক্তে প্রবাহিত ষড়রিপু (ছয় শত্রু) – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য – এই তালিকায় যোগ হয়েছে আরেক মারাত্মক শত্রু – প্রতিশোধপরায়ণতা।

প্রতিটি সন্ত্রাসের পর আহত-নিহতদের জন্য বিশ্বের বিশ্বের সাধারণ মানুষের অশ্রু ঝরেছে, সমবেদনার সাগর বয়েছে কিন্তু অক্ষত রয়ে গেছে প্রতিশোধ-চক্র। নিউজিল্যান্ড গণহত্যার কদিনের মধ্যেই হল্যান্ডে মুসলিম গোকমেন তানিস খুন করেছে তিনজন অমুসলিমকে।  হল্যান্ডের পরেই ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে আগুন দিয়েছে কেউ, ডেনমার্কে প্রকাশ্যে কোরান পুড়িয়েছে একজন। সবারই মাথায় একই আগুন – “প্রতিশোধ”!  এখানেই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞেরা আজ অসহায়।  আগে সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্ল্যান করত, মিটিং, ইমেইল, টেলিফোন ফেসবুক ইত্যাদি ট্র্যাক করে তাদের ধরা যেত।  এখন সন্ত্রাসী একাই প্ল্যান ও সন্ত্রাস করছে।  তাই তাকে চিহ্নিত করা কঠিন।  ট্যারেন্ট একাই দীর্ঘ দুইটি বছর ধরে এই হামলার প্ল্যান করেছে, তার কোনো দল লাগেনি, লাগেনি অর্থায়ন বা কোনো “সহযোদ্ধা”। কে জানে হয়তো এখনো “প্রতিশোধ” নিতে গোপনে একা তৈরি হচ্ছে অন্য কোনো ট্যারেন্ট, রহমত আলিকভ বা তানিস!  প্রতিশোধ-চক্রটা এরকম:-

** ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ২০১৭ সালে স্টকহোমের সন্ত্রাসী রহমত আলিকভ-এর হামলায় নিহতদের প্রতিশোধ নিতে নিউজিল্যাণ্ডে মানুষ খুন করেছে।

** ১০১৭ সালে রহমত আলিকভ আগের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে স্টকহোমে মানুষ খুন করেছে।

** তার আগের সন্ত্রাসীরাও তাদের আগের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে মানুষ খুন করেছে।

** এর পরে যদি আবার হামলা হয়, এবং না হবার কোনও কারণ নেই, তবে সেই সন্ত্রাসীরাও আগের সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে মানুষ খুন করবে।

 হায় ! ব্রেন্টন ট্যারেন্ট কোনোদিন জানবেনা, স্টকহোমের যে সন্ত্রাসী রহমত আলিকভ-এর হামলায় নিহতদের প্রতিশোধ নিতে নিউজিল্যাণ্ডে সে মানুষ খুন করেছে, তার নিজের হাতে আহত-নিহত মুসলিমেরা রহমত আলিকভকে তার মতোই ঘৃণা করেছে। রহমত আলিকভ কোনোদিনই জানবেনা যেই সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নিতে সে মানুষ খুন করেছে, তার হাতে আহত-নিহতেরা সেই সন্ত্রাসকে তার মতোই ঘৃণা করেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক  ইনফরমেশন গ্যাপ এটা, এর শেষ কোথায়?  প্রতিশোধের এই করাত-চক্র কি অনন্তকাল ধরে এখানে ওখানে এদেশে ওদেশে ছিন্নভিন্ন করতেই থাকবে সাধারণ মানুষের দেহ?  এ অভিশাপ থেকে পরিত্রাণের কি কোনোই উপায় নেই?

আছে। বহু শতাব্দী আগে ছিল একই রকম অন্তহীন প্রতিশোধ-চক্র। তোমার দলের কেউ একজন আমার দলের কেউ একজনকে খুন করেছিল, তাই এখন আমিও তোমার দলের যতজনকে পাব খুন করব। এই চক্রে খুন হয়েছে কত শত মানুষ কত শত যুগ ধরে।  তারপর এক মাহেন্দ্রক্ষণে খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছিল বহু শতাব্দীর সেই অভিশপ্ত প্রতিশোধ-চক্র, মানুষ বেরিয়ে এসেছিল অন্তহীন প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে। এখনো মহাকালের ওপার হতে অস্ফুটকণ্ঠে ভেসে আসছে সেই বুলন্দ ঘোষণা, কেউ শুনবে কি?

“জাহিলি যুগের সকল রক্তের দাবি রহিত করা হইল। সর্বপ্রথম আমি রবিয়া ইবনে হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের শিশুপুত্রের রক্তের দাবি রহিত করিলাম”- (বিদায় হজ্বের ভাষণ)।

শুধু মুখের কথা নয় বরং নিজেও সেটা পালন করার কঠিন উদাহরণ। মুসলিমদের জন্য এ হুকুম কোনো মুসলিম নেতা পালনের আহ্বান জানান নি। বিশ্ব-মানবের জন্য এটা কার্যকরী বাতিঘর অথচ সে আলো কোনো অমুসলিম নেতা কাজে লাগান নি।

ইতিহাসের ওপার থেকে আজ হয়ত তিনি করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন আমাদের রক্তাক্ত বিশ্বের দিকে।

কি ভাবছেন কে জানে!

ছবি: নিউজিল্যান্ডে জুমার নামাজের সময় সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত ওমর ফারুকের লাশ নারায়ণগঞ্জে এনে দাফন করা হয়েছে।

হাসান মাহমুদমুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

Responses -- “নিউজিল্যান্ড: প্রতিশোধের করাত-চক্র  ও ‘বিদায় হজ’ এর ভাষণ”

  1. aminur rahman

    বহু শতাব্দী আগে ছিল একই রকম অন্তহীন প্রতিশোধ-চক্র। তোমার দলের কেউ একজন আমার দলের কেউ একজনকে খুন করেছিল, তাই এখন আমিও তোমার দলের যতজনকে পাব খুন করব। এই চক্রে খুন হয়েছে কত শত মানুষ কত শত যুগ ধরে। তারপর এক মাহেন্দ্রক্ষণে খানখান হয়ে ভেঙে পড়েছিল বহু শতাব্দীর সেই অভিশপ্ত প্রতিশোধ-চক্র, মানুষ বেরিয়ে এসেছিল অন্তহীন প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে। এখনো মহাকালের ওপার হতে অস্ফুটকণ্ঠে ভেসে আসছে সেই বুলন্দ ঘোষণা, কেউ শুনবে কি?

    “জাহিলি যুগের সকল রক্তের দাবি রহিত করা হইল। সর্বপ্রথম আমি রবিয়া ইবনে হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের শিশুপুত্রের রক্তের দাবি রহিত করিলাম”- (বিদায় হজ্বের ভাষণ)।

    শুধু মুখের কথা নয় বরং নিজেও সেটা পালন করার কঠিন উদাহরণ। মুসলিমদের জন্য এ হুকুম কোনো মুসলিম নেতা পালনের আহ্বান জানান নি। বিশ্ব-মানবের জন্য এটা কার্যকরী বাতিঘর অথচ সে আলো কোনো অমুসলিম নেতা কাজে লাগান নি।

    ইতিহাসের ওপার থেকে আজ হয়ত তিনি করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন আমাদের রক্তাক্ত বিশ্বের দিকে। (islami somaz andola)

    Reply
  2. Truth

    Please, Listen carefully and undoubtedly. I am telling you the truth. I want every people will die naturally. But the possibility of dying naturally is becoming more difficult. Because there are many beasts around us. Every religion consists of the beasts. There is a religion which is major. They have established many international beast organizations by financing to kill others. They are killing innocent people, destroying praying place. But no country in the world had taken any praising steps till now. Most of the people of these countries make discussion on the offices or other places supporting that killing. But I can see that they make movement while people of other religion do that. What kind of mentality is it? I can definitely see that people of this religion cannot tolerate the people of other religion. Why? There is no day when they do not make bad comments about other religions. If all the people of the world take steps to destroy the international beast organizations, the small terrorists or beasts will die soon. Otherwise, other religions can build universal beast world to protect themselves. There are many beasts live in Bangladesh who are destroying the sculptures of other religions but no action is taken to stop it. I want to live peacefully. Please, publish my comments.

    Reply
  3. Md shayem mozumder

    Excellent effort for origin of knowledge which told the holy quran;
    so, at first we know real knowledge Islam like know thyself sofiuezom knowledge knowing mandatory all of muslim community

    Reply
  4. Saiful Islam

    দেশ-বিদেশের বহু মওলানার বক্তব্যে কাউকে উল্লেখ করতে শুনলাম না মুসলিম সন্ত্রাসীদের হাতে পশ্চিমা বিশ্বে আহত-নিহতদের প্রতি সমবেদনা, নাইজিরিয়া মিসর ইন্দোনেশিয়ায় শত শত চার্চ ভাঙা ও হাজার হাজার খ্ৰিস্টানদের হত্যা, সৌদির আক্রমণে ইয়েমেনের কোটি মানুষের ভয়াবহ ধ্বংস, দুর্ভিক্ষে অসংখ্য শিশুর আসন্ন মৃত্যু। বাংলাদেশেও অমুসলিমদের ওপর শত শত অত্যাচার, সম্পত্তি উপাসনালয় ভাঙা হয়েছে কিন্তু সমবেদনায় ছুটে যাননি কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতা। সভ্য-অসভ্যের এই লক্ষ্মণরেখা দুনিয়ার নাকের ডগায় তুলে ধরা আছে তা আমরা মুখে বলি বা না বলি।
    Excellent sir. Absolutely true…. No muslim leader ever remorse after 1/11 attack.

    Reply
  5. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা যাঁরা ভয়কে পুঁজি করে, মানুষের ভেতরের মৌলিক তাড়নাকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন, থাকতে চান, তাঁদের আমরা আশার কথা বলতে শুনি না। যে রাজনীতি সবার অংশগ্রহণের কথা বলে না, অংশীদারত্বের সমাজে বিশ্বাস করে না, সেই রাজনীতির প্রতিনিধির কাছে ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলা কেবল প্রতিহিংসার বিষয় কিংবা তার আদর্শিক অনুসারীদের ভূমিকাকে ছোট করার সুযোগ। ধর্ম বা দেশভেদে তাদের ভূমিকা ভিন্ন হয় না। কিন্তু এটা কি কেবল রাষ্ট্রনায়কদের বিষয়? অবশ্যই নয়। বিশ্ব আজকে যে দুই ধরনের উগ্র সহিংস গোষ্ঠীর বিপদের মধ্যে আছে—শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী এবং কথিত ইসলামপন্থী, তাদের আচরণ এবং বক্তব্যের মধ্যে তাকালেই তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে। ২০১১ সালে নরওয়ের সন্ত্রাসী আন্দ্রেস ব্রেইভিক, ২০১৯ সালের ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী ব্রেনটন টারান্ট যে তাঁর চেয়ে যারা ভিন্ন, ‘অন্যদের’ একেবারে নির্মূল করে একটি শুদ্ধ সমাজের, পৃথিবীর ‘স্বপ্ন’ দেখে তা আসলে অ্যাবসলুইটিজিমের, বাংলায় যাকে বলা যায় নিরঙ্কুশতার, আদর্শের ফল। এর সহজ অর্থ হচ্ছে আমার পরিচয়, আমার আদর্শই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ এবং চূড়ান্ত। অ্যাবসলুইটিজিমের এই ধারণা তৈরি হতে পারে ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা অন্য রাজনৈতিক আদর্শের মধ্য থেকেও। মার্ক জারগেন্সমায়ার তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ টেরর ইন দ্য মাইন্ড অব গড (চতুর্থ সংস্করণ, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৭) দেখিয়েছেন যে, সব ধর্মের মধ্য থেকেই সহিংসতার পক্ষে যুক্তি তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা—তাতে ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, বৌদ্ধ, শিখ, হিন্দু, ইহুদি—কিছুই বাদ যায়নি। এগুলো যেমন ব্যক্তিপর্যায়ে আছে, তেমনি আছে সাংগঠনিক পর্যায়েও। যে কারণে আমরা দেখতে পাই যে আইএস বা আল-কায়েদা যেমন বিদেশিদের আক্রমণকারী বা ইনভেইডার বলে চিহ্নিত করে, তেমনি পিটসবার্গে ইহুদিদের সিনাগগে হামলাকারী রবার্ট বাওয়ার্স মেক্সিকো এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা থেকে আসা মানুষদের আক্রমণকারী বলেই বর্ণনা করেছে। একই ভাষ্য পাওয়া যায় ব্রেনটন টারান্ট এবং আন্দ্রেস ব্রেইভিকের ইশতেহারে। ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার আগেই উগ্রপন্থার এই মিল, নিরঙ্কুশতার আদর্শের কুফল বিষয়ে আমরা অবগত ছিলাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণ, আচরণের মধ্যে কি এই কুফলের ব্যাপারে সচেতনতা প্রকাশিত হচ্ছে? ঘৃণা, বিভক্তি এবং নিরঙ্কুশতার আদর্শ কী আমরা আমাদের কথায় তৈরি করে চলেছি? পশ্চিমারা সন্ত্রাসীর ধর্ম পরিচয়কে বড় করে তোলে এই যুক্তিতে কি আমরাও এক সন্ত্রাসীর ধর্মের পরিচয়কেই বড় করে তুলছি? সংকট কেবল নেতৃত্বের পরীক্ষা নেয় না, সাধারণ মানুষেরও পরীক্ষা নেয়। আমরা কি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছি?

    Reply
  6. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    নিউজিল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলা ইসলামবিদ্বেষসহ সব ধরনের বর্ণবিদ্বেষের বিপদের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে অভিবাসন একটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তা বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতিকদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম যে সরকারি আদেশ জারি করেছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা। পিউ রিসার্চের তথ্য বলছে, নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদার হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানরা যতটা বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়েছেন, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আর ইন্টারন্যাশনাল টেররিজম ইনডেক্স ২০১৮–এর হিসাবে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যুর হার ২০১৪ সাল থেকে বেড়েই চলেছে। অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগের হিসাবে গত ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী সন্ত্রাসে হতাহতের সংখ্যা ইসলামপন্থী সন্ত্রাসে হতাহতের দ্বিগুণের বেশি। ইউরোপেও এই একই ধারার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। হাঙ্গেরি ও ইতালি উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো অভিবাসী ভীতি এবং ইসলামবিদ্বেষ প্রচারের মাধ্যমে রাজনীতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, নরওয়ে, পোল্যান্ড, সুইডেনসহ ইউরোপের অনেক দেশেই ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার আড়ালে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত হচ্ছে। বিশ্বের আরেক প্রান্ত অস্ট্রেলিয়ায়ও ডানপন্থী দলগুলো অভিবাসন এবং ইসলামভীতিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। মানবাধিকারকর্মীদের আপত্তি সত্ত্বেও দেশটি বহু অভিবাসনকামীকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় রেখেছে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পটভূমিতে নিউজিল্যান্ডেও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি ও ইসলামবিদ্বেষ অস্বাভাবিক নয়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে নিউজিল্যান্ড যে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি ও ইসলামবিদ্বেষের প্রভাবমুক্ত থাকবে, এমনটি মনে করার কারণ নেই। বস্তুত, ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্সের বিরুদ্ধেই এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এশীয়দের কথিত আগ্রাসনের (ইনভেশনের) বিরোধিতায় তিনি অগ্রগামী ছিলেন। রাজনীতিকদের এ ধরনের ভাষা এ ধরনের উগ্রবাদী সন্ত্রাসকে যে উৎসাহ জোগায়, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কই? প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্ন নিজেও বিবিসির কাছে এই বর্ণবাদিতার অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে তার বিরুদ্ধে ঐক্যের কথা বলেছেন। ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যেমন প্রশংসা করেছে, তেমনি প্রশংসা নরওয়ের গণহত্যাকারী অ্যান্ডারস ব্রেইভিকের মুখে শোনা গেছে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড সম্পর্কে। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে। গণমাধ্যমে উচ্চারিত শব্দ ও ব্যবহৃত ভাষা পক্ষপাতমূলক এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিদ্বেষ ছড়ানোয় ভূমিকা রাখছে—এমন অভিযোগ ক্রমশই জোরদার হচ্ছে। ইসলামপন্থী জঙ্গিদের হামলার জন্য প্রায়ই পুরো মুসলিম সম্প্রদায় এবং ধর্মকে দায়ী করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়—যার কিছুটা অসতর্কতাজনিত আর কিছুটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিপরীতে, হামলাকারী শ্বেতাঙ্গ এবং ডানপন্থী আদর্শের অনুসারী হলে তাকে বিচ্ছিন্ন সত্তা হিসেবে তুলে ধরা, তার মানসিক সুস্থতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে একধরনের সহানুভূতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। জর্জিয়া ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইসলামপন্থীদের সন্ত্রাসী হামলায় অন্যান্য সন্ত্রাসী হামলার চেয়ে ৩৫৭ শতাংশ বেশি খবর তৈরি হয়। আর হিংসা ও বিদ্বেষের প্রচার প্রসারে সর্বসাম্প্রতিক সংযুক্তি হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। ক্রাইস্টচার্চের হামলার সরাসরি সম্প্রচার এবং সেই ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিতর্কে এর তীব্রতার প্রমাণ মেলে। লন্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকা তাই যথার্থই শিরোনাম করেছিল, ‘দ্য ফার্স্ট সোশ্যাল মিডিয়া টেরর অ্যাটাক’। আশার কথা, নিউজিল্যান্ডে এই হামলার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্ন বিরল নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন শ্বেতাঙ্গ এই নারী। তিনি হামলার শিকার উদ্বাস্তু অভিবাসীদের ‘তোমরাই আমরা’ বলে ঘোষণা করে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী হামলাকারীর আমাদের মধ্যে কোনো স্থান নেই।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়ায় তিনি মুসলমানদের স্বীকার করে নেওয়ার কথা বলেছেন। ক্রাইস্টচার্চের অনুসরণে লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে যাজকেরা মসজিদে গিয়ে নামাজের সময়টা পাহারা দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন, পাহারা দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষ এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছেন। স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিন শহরে ২০১৩ সাল থেকে সেন্ট জর্জ চার্চের দরোজা পাশের মসজিদের মুসল্লিদের জন্য প্রতি শুক্রবার খুলে দেওয়া হয় এবং গির্জার ভেতরেই অনেকে নামাজ পড়েন। সব ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী যদি এই সম্প্রীতি ও সহযোগিতার নীতি চর্চা করে, তাহলে সন্ত্রাস ও বিভাজনের রাজনীতি পরাস্ত হবে।

    Reply
  7. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড যত অভাবনীয়ই মনে হোক না কেন, এমন ঘটনা শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল।
    গত চার দশকে পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানসহ সব বহিরাগত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা জমে উঠেছে। শ্বেতসভ্যতার অনুসারীদের বিশ্বাস, কালো, বাদামি ও হলুদ রঙের এই মানুষগুলো সাদা মানুষদের দেশে এসে ভিড় জমিয়েছে, আর তার ফলে তাদের শ্বেতসভ্যতা হুমকির সম্মুখীন। এই শ্বেতসভ্যতার দুটি খুঁটি: মানুষগুলো সব সাদা, আর তাদের বিশ্বাস খ্রিষ্টধর্মে। সে মনে করে অন্য সবার চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ, একে টিকিয়ে রাখতে হলে বাকি সবাইকে তাড়াতে হবে। অশ্বেতাঙ্গ যারা ইতিমধ্যে এসে পড়েছে, তাদের ঝেঁটিয়ে তাড়ানো অসম্ভব হলে নিদেনপক্ষে তাদের নতুন করে আসা ঠেকাতে হবে।
    শ্বেত বর্ণ, শ্রেষ্ঠত্ব ও খ্রিষ্টধর্মের দোহাই দিয়ে হিটলার ৬০ লাখ ইহুদিকে পুড়িয়ে মেরেছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, এ–ও একধরনের মৌলবাদ, যা সব যুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। সাদারা যত দিন ক্ষমতায় বসে ছড়ি ঘুরিয়েছে, তত দিন কোনো দুশ্চিন্তার কারণ দেখেনি। সমস্যা বাধল যখন কালো, হলুদ ও বাদামি মানুষগুলো স্বাধীন হওয়া শুরু করল। শুধু স্বাধীনই নয়, নিজেদের সাদাদের সমান ভাবা শুরু করল। বিপদ সেখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অভিবাসনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরা ইউরোপ ও আমেরিকায় দল বেঁধে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসতে লাগল। পশ্চিমা অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য শ্রমিক হিসেবেই তাদের আনা হয়েছিল। কিন্তু সংখ্যায় ক্রমে বাড়তে থাকায় হঠাৎ সাদাদের খেয়াল হলো, এদের না ঠেকালে একসময় এরা তো সংখ্যায় আমাদের চেয়েও ছাড়িয়ে যাবে। শুরু হলো উল্টো প্রতিক্রিয়া: যেভাবে পারো অভিবাসন ঠেকাও।
    Eprothom Aloশ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের নয়া প্রবক্তাদের অন্যতম প্যাট বুকানন। আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির নামজাদা নেতা, একসময় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি ২০০১ সালে প্রকাশিত তাঁর দ্য ডেথ অব দ্য ওয়েস্ট গ্রন্থে লিখেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব এখন আক্রান্ত, অভিবাসীদের ‘আগ্রাসনের’ কারণে পশ্চিমা সভ্যতা মরতে বসেছে। এই ‘আগ্রাসন’ ঠেকানো না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের দেশে পরিণত হবে। তিনি আমেরিকার সাদা মানুষদের জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অভিবাসীদের ‘আগ্রাসনের’ কথা বলে বুকানন তিনবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করে পারেননি। ২০১৬ সালে সেই ‘আগ্রাসনের’ কথা বলেই নির্বাচনে লড়ে আমেরিকার ৪৫ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন আরেক সাদা মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু আমেরিকায় নয়, ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই এখন এই শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ জেঁকে বসেছে। হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া, সুইডেনে ‘সাদা বাঁচাও’ স্লোগান তুলে অতি-দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতা দখল করছে। অভিবাসন ঠেকানোর যুক্তিতে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। হাঙ্গেরির ভিক্তর ওরবানের প্রধান স্লোগান হলো অভিবাসন ঠেকাও, নইলে নিজেরা মরবে। যদি ভেবে থাকো অভিবাসন অব্যাহত রেখে বাঁচতে পারবে, তাহলে সেটা ভুল। ওরবানের এই কথাকে শ্বেত জাতীয়তাবাদীরা অভ্রান্ত বলে বিবেচনা করে। আমেরিকার সবচেয়ে পরিচিত শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী প্যাট রামসি বলেছেন, ওরবান ‘পশ্চিমা সভ্যতার একজন নায়ক’। ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের সময় ঘোষণা করেছিলেন, ‘আজ থেকে এই দেশে আমরা এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা চালিত হব। এখন থেকে সব ব্যাপারেই শুধু আমেরিকা প্রথম—এটাই হবে আমাদের নীতি।’ ট্রাম্প আসলে কী বলছেন, কার উদ্দেশে বলছেন, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্লেইট পত্রিকার জামিল বুয়ি লিখেছিলেন, এখন থেকে হিসাবের মধ্যে থাকবে আমেরিকা, আর যেসব আমেরিকান এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে, তারা সবাই সাদা।দুই বছর আগে ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে কেকেকের বর্ণবাদী হামলার সমর্থনে ট্রাম্প বলেছিলেন, এদের মধ্যেও অনেক ভালো মানুষ আছে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের সেই ঘাতকও কোনো দ্বিধা ছাড়াই ট্রাম্পকে ‘শ্বেত জাতীয়তাবাদের নবায়িত আত্মপরিচয়ের প্রতীক’ হিসেবে বাহবা দিয়েছেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমরা শ্বেত জাতীয়তাবাদের বিপদকে দু-একটি দেশের ‘অল্প কিছু মানুষের কাণ্ড’ বলে ভাবতাম। ট্রাম্পও সে কথাই বলেছেন। কিন্তু ইন্টারনেটের এই যুগে মানুষে মানুষে সীমান্ত চিহ্ন উঠে গেছে। একাকী একজন মানুষও ইন্টারনেটের কারণে এক বিশাল ‘সম্প্রদায়ের’ অংশ হিসেবে নিজেকে ভাবতে পারে। ক্রাইস্টচার্চের ঘাতক যুবকটি ঠিক এই কারণেই পুরো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ফেসবুকে সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। লাখ লাখ মানুষ সেই ভিডিও দেখেছে, উৎফুল্ল মন্তব্য করেছে।কোনো সন্দেহ নেই, অব্যাহত অভিবাসন প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শ্বেত জাতীয়তাবাদী তৎপরতা বাড়বে। একজন ব্যক্তি হোক বা সংগঠিত কোনো গ্রুপই হোক, ক্রাইস্টচার্চের মতো ঘটনা শুধু ‘প্রার্থনা ও শুভকামনা’ জানিয়ে থামানো যাবে না। যেমন থামানো যাচ্ছে না জঙ্গিবাদকে। এই দুইয়ের মতো অন্তর্গত মিল অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই কারণে তাদের ঠেকাতেও আমাদের অভিন্ন রণকৌশল অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, প্রতিবাদ করতে হবে। কোনো ধরনের মৌলবাদকেই মূলধারাভুক্ত হতে দেওয়া যাবে না। শ্বেত জাতীয়তাবাদী বক্তব্য একবার ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গৃহীত হলে তা জাতীয় আলোচনার অংশ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। ঠিক এভাবেই হাঙ্গেরিতে ওরবানের মতো শ্বেত মৌলবাদী ক্ষমতা দখল করে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, শ্বেত জাতীয়তাবাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু অভিবাসী সম্প্রদায়। তাদেরও এই প্রতিবাদপ্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠতে হবে। একা নয়, মূলধারাভুক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে। যত দিন অভিবাসীরা বহিরাগত থেকে যাবেন, তত দিন তাঁরা শ্বেত জাতীয়তাবাদের সহজ ‘টার্গেট’ই হয়ে থাকবেন।তৃতীয়ত, শ্বেত জাতীয়তাবাদের বিস্তারের একটি প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেট। অভিবাসী ও ভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ ছড়ানো হয় এই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমেই। ফেসবুক ও গুগলের মতো প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে, যাতে এদের মাধ্যমে শ্বেত জাতীয়তাবাদী ঘৃণা ছড়ানো সম্ভব না হয়। তারা হয়তো নিজে থেকে এই কাজ করবে না। আমরা যারা ভোক্তা, তাদের সে কাজে বাধ্য করতে পারি। শেষ কথা, শুধু শ্বেত জাতীয়তাবাদকে আক্রমণ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব হবে না। যতই অনিষ্টকর হোক, এই বর্ণবাদী আন্দোলনের একটি কল্পিত ভিত্তি রয়েছে। অভিবাসন নিয়ে পশ্চিমের সাদা মানুষদের একধরনের ভীতি গ্রাস করেছে, যেই ভীতিকে ব্যবহার করে ট্রাম্প ও ওরবানের মতো রাজনীতিক ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসেছেন। এই ভীতির কারণ বুঝতে হবে, তা মিথ্যা সে কথা প্রমাণ করতে হবে। তা প্রমাণের দায়িত্ব শ্বেত জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে এমন সব মানুষের। অভিবাসীদেরও এই বিপক্ষ তালিকায় কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—