ব্যক্তিগতভাবে ধার করা আমি পছন্দ করি না, আর আমার বাবাও আমাকে সেটাই করতে শিখিয়েছেন। তবে কখনো যে কারো কাছ থেকে ধার নিইনি তা কিন্তু না। কোনও না কোনও সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় আপনি চান বা না চান করতে বাধ্য। কিন্তু সময় মতো ধার পরিশোধ করাটাই উচিত। আব্বা আমাকে আরো একটা উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, যে মানুষ টাকার জন্য তাগাদা না দেয় তার টাকাটা আগে পরিশোধ করা উচিত। ধারই করিনা অতএব এসব উপদেশ মানার খুব একটা দরকার পড়ে না। আমার কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার- আয় বুঝে ব্যয় করো, উপার্জন কম হলে কম খরচ করা বা কম দামের জিনিস ব্যবহার করা। তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। একসময় জার্মানিতে বিদেশিদের কাজের অনুমতি বন্ধ করে দিয়েছিল তখন সরকারি সাহায্য দিয়ে চলা বেশ কষ্টকর ছিল। আমি খুব কম দামের রুটি কিনে খেতাম। কষ্ট হতো, কিন্তু তারপরও ধার এড়িয়ে চলতাম।

আমার বিএসএস পরীক্ষার পর কিছুদিন আমার বন্ধু এনামুলের কাছে শহিদুল্লাহ হলে ছিলাম। তখন আমি রাজনীতিতে এতটাই সক্রিয় ছিলাম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হওয়া সত্বেও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে আমাকে পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হয়েছিল। আমি এই দলের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ যে এখান থেকে শিখেছি অনেক। সে সময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নে এক ঝাঁক মেধাবী ছাত্রের সমাবেশ ঘটেছিল। পদার্থবিদ্যার দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মঈন উদ্দিন মঈন ভাইও ছিলেন তখন ছাত্র ইউনিয়নে। উনার বাড়ি ছিল নড়াইলে। উনার পরিবারের সবাই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। যতদূর জানি উনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ফার্মেসি বিভাগের আবু আলী ভাই ছিলেন উনি ডাকসুর একটা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সময়ের তরুণ কবি, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম স্থান অধিকারী সৈয়দ মুর্তাজা তারিন একটা কবিতার বই লিখেছিল। কবি শামসুর রাহমান তার সেই কবিতার বইয়ে মুখবন্ধ লিখেছিলেন। বেশ কিছু বিভাগের প্রথম শ্রেণির অধিকারী বা অধিকারিণী সেই সময়ে ছাত্র ইউনিয়নে ছিল।

এদের মধ্যে ছিল মইন হোসেন রাজু, মাহমুদ ও আরো অনেকে। মাহমুদ রাজুর খুব ভালো বন্ধু ছিল। পরবর্তীতে যতদূর জানি মাহমুদ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতিও হয়েছিল। রাজু, মঈন ভাই, আবু আলী ভাই ও মাহমুদের সাথে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে রাজু ওকে আমি আমার নিজের ছোট ভাইয়ের মতো জানতাম। রাজু মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল।

রাজুও খুব মেধাবী ছাত্র ছিল। ও প্রথম শ্রেণিতেই উত্তীর্ণ হচ্ছিল। তবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে হয়তো বা লেখাপড়ার ফলাফল একটু খারাপ হয়েছিল, না হলে আরো ভালো করতে পারতো। কিন্তু রাজুর কথা ছিল আলাদা রাজনীতি থেকে যা শিখছি তা জীবনে অনেক বেশি কাজে দেবে। সামান্য একটু খারাপ ফলাফলে কিছু যাবে আসবে না। তাছাড়া আমার ফলাফল তো প্রথম শ্রেণিতেই আছে। অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক মানুষ ছিল সে। মিষ্টি মিষ্টি কতো দুষ্টুমি করত। তার কোনও দুষ্টুমিতে কেউ কখনো বিরক্ত হওয়া তো দূরে থাক, তার দুষ্টুমি ছাড়া ভালোই লাগতো না।

রাজুর বাসা ছিল শ্যামলীতে, কিন্তু মাঝে মাঝে হলে থাকত বিশেষ কোনও কাজ থাকলে। ও খুব ভালো চিকা দেয়াল লিখন) লিখত। চিকা লেখার দিন আমরা সবাই এক জায়গায় থাকতাম। মাঝেমধ্যেই রাজু, মইন ভাই, আমি, মাহমুদ আমি দুপুরে চানখারপুলের কাছে একটা রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। আমরা সবাই এক একজন এক একটা আলাদা খাবার নিতাম তারপর সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খেতাম। বিভিন্ন রকম ভর্তা থাকতো অধিকাংশ ক্ষেত্রে মঈন ভাই ভাগাভাগি করে দিতেন, উনি আমাদের বড় ছিলেন। এখনো যখন নিজে কোন ভর্তা তৈরি করি রাজুর কথা মনে হলে বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে, গলা আটকে আসে। রাজুর বড় ভাই ওকে খুব আদর করত। ভাইয়ের কাছে ওর অনেক আবদার ছিল। তিনি সেগুলো পূরণ করতেন অকাতরে। এমন ভাইকে কি কখনো না করা যায়?

শ্রেণিকক্ষেও রাজু একটু আধটু দুষ্টুমি করত কিন্তু কেউ কখনো কোন অভিযোগ করেনি, এমনকি শিক্ষকরাও না। কারণ ওর অদ্ভুত এক মানুষকে খুশি করার মতো ব্যক্তিত্ব ছিল। আমি আমার জীবনে এরকম একজন অদ্ভুত বালক আর দেখিনি আর দেখবোও না। আমার চোখে ও সর্বকালের সেরা বালক, বিস্ময়বালক। ১৯৯১ সালে উড়ির চরের জলোচ্ছ্বাস দুর্গতদের সাহায্যে আমরা অনেক কাজ করেছিলাম একসাথে। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের  আয়োজন করা হয়েছিল দুর্গতদের সাহায্যে। ওই অনুষ্ঠানের টিকেট আমরা অনেককে গছিয়ে দিয়েছি। তখন টিকেটের দাম ছিল ১০০ টাকা। ১০০ টাকার টিকিট বিক্রি করা একটু কঠিনই ছিল। তারপরও আমার আমাদের লক্ষ পূর্ণ করেছিলাম। এ সময় রাজু প্রায় পুরোটা সময় হলেই ছিল। কারণ সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম বন্যার্তদের সাহায্যার্থে টাকা ও ত্রাণ সংগ্রহ করতে। একদিন আমরা বাবু বাজার গেলাম সংগ্রহে ত্রাণ সংগ্রহে বাদ্যযন্ত্র গলায় ঝুলিয়ে গান গেতে গেতে।

সম্ভবত ১৯৯২এর ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে একদিন রাজু বলল, “লীপু ভাই চলেন পাবলিক লাইব্রেরিতে দুর্গতদের  সাহায্যে ছবি দেখাচ্ছে দেখে আসি। আমি বললাম রাজু আমি তোমাদের সাথে যেতে পারবো না আমার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। যে টাকা আছে বাড়ি যাওয়ার জন্য টিকিট করতে লাগবে। তখন ও বলল আমরা সবাই ছবি দেখব আর আপনি দেখবেন না তা হয় না। তাছাড়া এটা দুর্গত মানুষদের সাহায্যার্থে আমাদের সবার এখানে অংশগ্রহণ করা উচিত। আমার কাছে টাকা আছে আমি আপনার টিকেট কিনে দিচ্ছি আপনি বাড়ি থেকে ফিরে না হয় আমার টাকা দিয়ে দেবেন। আমরা সেদিন যে ছবিটা দেখেছিলাম সেটা ছিল  ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।”

ছবি দেখে বেরিয়ে আমরা সবাই একসাথে বসে সেদিন চা পান করে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। তখন তো জানতাম না সেদিনই রাজুর সঙ্গে আমার শেষ দিন, শেষ আড্ডা। এর পরদিন আমি আলমডাঙ্গাতে আমার বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন দ্রুত খবর পাবার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। না মোবাইল ফোন না ইন্টারনেট। সরকারি টিভিতে এসব খবর দেখানো হতো না। টিভি ছিল সরকারি তোষামোদের জন্য। বেসরকারি কোনও টিভি চ্যানেল সে সময় ছিল না। ঘটনার পরদিন রাতের দিকে ইত্তেফাকে প্রধান শিরোনাম ছিল মইন হোসেন রাজুর মৃত্যুর খবর। আমি খবরের শিরোনাম পড়ে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম- এ যেন আমাদের রাজু না হয়। না নিষ্ঠুর বিধাতা সে অনুরোধ রাখেননি। পুরো খবর পড়ে জানলাম আমাদের রাজু আর নেই। একজন সেরা কমরেড, একজন সেরা সহযোদ্ধাকে হারালাম। রাজু ছিল আমার ছোটভাইয়ের মত, তাকে আমি আমার ভাই বলেই জানতাম, এখনো জানি। সে আছে আমার হৃদয়ে কারণ তার সাথে সম্পর্কটা ছিল হৃদয়ের। সে আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ ছিলনা। কিন্তু আমার এক পরিবারের ছিলাম। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের আমি যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলাম তারা সবাই বঙ্গবন্ধুকে খুবই শ্রদ্ধা করতো ভালোবাসতো। এই জিনিসটা আমাদের মধ্যে প্রভাবিত করেছিলেন মঈন ভাই। উনি বঙ্গবন্ধু এবং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সম্বন্ধে অনেক অজানা তথ্য আমাদের দিয়েছিলেন। তাছাড়া আমিও ব্যক্তিগতভাবে এবং পরিবার থেকে বঙ্গবন্ধুকে ছোটবেলা থেকেই ভালবাসতে শিখেছিলাম।

রাজু সব সময় শোষিত নিপীড়িত মানুষের জন্য কিছু করা, একটা সন্ত্রাস মুক্ত দেশ গড়ে তোলার নিমিত্তে কাজ করেছে। আমি আগেই বলেছি আমি যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলাম তারা প্রত্যেকে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করতো। ছাত্র ইউনিয়নের সবাই যে এই মানসিকতার ছিল সে কথা আমি বলবো না। কিন্তু মইন ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল এবং মইন ভাই এই ব্যাপারে আমাদের অনেক প্রভাবিত করেছেন। মইন ভাই সর্বদা বঙ্গবন্ধুর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন নীতি আদর্শ নিয়ে আমাদেরকে জানিয়েছেন। ওনার কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধুর  বিভিন্ন কর্মসূচিকে খুব সুন্দরভাবে আমাদের ব্যাখ্যা করেছেন। সেগুলো বাস্তবায়িত হলে কী হতো বা কী সুফল হতে পারতো। আমি হলফ করে বলতে পারি ছাত্র লীগের কোন নেতা সেই সময় বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে এতটা জ্ঞান রাখত না, আর এখন তো ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতারা প্রায় বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে জ্ঞানশূন্য।

রাজু ছিল নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সর্বদা সোচ্চার কণ্ঠ এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। সেই সন্ত্রাস বিরোধী  মিছিলে নেতৃত্ব দিতে যেয়ে সে আত্মত্যাগ করেছিল। রাজু চাইলে একজন স্বার্থপর মানুষের মতো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারতো। কিন্তু সে সেটা করেনি কখনো ভাবেনি একজন সংকীর্ণ মানুষের মতো। তার বাবা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, মা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে দেশেই ছিলেন। রাজু কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাজনীতি করেনি। তার সেটার প্রয়োজন ছিল না। মৃত্যুর এত বছর পরেও রাজুর অনুপস্থিতি আমাকে এখনও সেই আগের মতই ব্যথা দেয়। এ ক্ষত নিরাময় সম্ভব না। আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ কেউ যখন পরিবার প্রীতির কথা বলে তখন হাসি পায়। এরা জানে না আমার পরিবার কাদের নিয়ে। আমার এই পরিবার প্রীতিতে আমি কখনো কার্পণ্য করিনা করবও না।

১৯৯৩ সালে যখন আমি দেশ ছাড়ি তখন চায়ের দোকানে আমার সাড়ে সাত টাকা দেনা ছিল। হঠাৎ করে সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ায় সবার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিতে পারিনি সবার কাছ থেকে। এ কারণেই চায়ের দোকানে যেয়ে নিজে দেনা শোধ করে আসতে পারিনি। আরেক কাপড়ের দোকানে ২৫০ টাকার মতো দেনা ছিল। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত দেনা না। আমার এক এলাকার বড় ভাই উনার স্নেহভাজন আমাদের আরেক বড় ভাইকে একটা শার্ট প্যান্ট উপহার দিয়েছিলেন, কিন্তু সে সময় উনার কাছে টাকা ছিল না। উনি আমাকে বললেন, তুমি একটা দোকানে বলে দাও। আমি দোকানে বলে দেওয়ায় শার্ট প্যান্টের কাপড় দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমি দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত কোন লক্ষণ দেখাননি তার সে ঋণ পরিশোধ করার। অবস্থাদৃষ্টে আমি আসার আগে আমার ছোট মামাকে টাকাগুলো দিয়ে চায়ের দোকানের এবং কাপড়ের দোকানের দেনা পরিশোধের ব্যবস্থা করেছিলাম।

কিন্তু একটা ঋণ পরিশোধ করতে পারিনি, পারবোও না। সেটা রাজুর কাছে সেই ঋণ, সেদিনের সেই বিশ টাকা। সেটা আসলে ঋণ ছিল না, সেটা ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা- যে ভালোবাসার কারণে আমাকে ছাড়া সে ছবি দেখতে যেতে চাইনি। কারণ আমরা ছিলাম একটা পরিবারের মতো। রাজুরা ঋণী, থাকেনা ঋণী করে যায়।

খালেদার পোষ্যদের হাতে রাজু জীবন দিয়েছিল। তার হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেনি তার মা। যেদিন প্রবাসে রাজুর মা চির বিদায় নিলেন সেদিন খবরটা পড়ে খুব খারাপ লেগেছিল। আমি বাংলাদেশে থাকতেও কোনদিন রাজুর মার সাথে দেখা করতে যাইনি। কারণ এই মহীয়সী রত্নগর্ভা মাকে সান্ত্বনা দেবার মত কোন ভাষা আমার ছিল না।

রাজুর চোখ দুটো ছিল অদ্বিতীয়। অনেক সময় আমি নিষ্পলক ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। নিষ্পাপ মুখটা কেমন যেন শিশুসুলভ একটা ভাব সর্বদা। কিন্তু যখন কোন রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করত তখন সে ছিল পরিপক্ক এক ছাত্রনেতা অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়ী ছিল। রাজু পত্রিকার বিশেষ নিবন্ধগুলো সংগ্রহ করতো। মাঝে মাঝে সেগুলো আমাদের পড়তে দিত। রাজুর মৃত্যুর খবরটা ইত্তেফাকে পড়ার পরে আমি খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মা বুঝতে পেরেছিল, মা আমাকে যথেষ্ট সান্ত্বনা দিয়েছিল।

সেই সময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ দোজা। আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়নের দায়িত্বে নাসির উদ দোজা যখন প্রাগে ছিলেন, তখন আমিও প্রাগে ছিলাম। প্রাগ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির কিছু বাংলাদেশি ছাত্রের সঙ্গেই আমি ছিলাম। কথা প্রসঙ্গে তারা জানালেন- তখন কিভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে বিত্ত বৈভবের দিকে নাসির ভাই ঝুঁকে পড়েছেন। সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা নীতি বোধ সবকিছুই তিনি তখন ভুলে গেছেন।

নাসির উদ দোজার সাথে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছিল। দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু দ্রুত জার্মানি চলে আসার কারণে উনার সাথে আর দেখা হয়নি। আর সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান বাবুলও সকল নীতি-আদর্শের জলাঞ্জলি দিয়ে মস্কোতে বিভিন্ন রকম অবৈধ কাজে লিপ্ত থেকে কোটি কোটি টাকা বানিয়েছেন। তারপর উনি খালেদা জিয়ার দলে যোগ দিয়েছেন, বাকি ইতিহাসগুলো আপনারা জানেন। অথচ এই সব নেতারা রাজু মারা যাওয়ার পরে একটা বিবৃতি দিয়েই শেষ। যে নীতি আদর্শ তারা এইসব নিষ্পাপ মানুষগুলোকে শিখিয়েছে এবং সেই নীতি আদর্শ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যারা জীবন দিয়েছে তাদের কে কি কৈফিয়ৎ এই নেতারা দেবে।

আমার এখনো মনে আছে সেই সময় বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক এবং সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নাহিদও বিবৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে উনারা দুজনেই আদর্শ আদর্শচ্যুত হয়ে একজন গণফোরাম যোগ দিয়েছিলেন আর একজন আওয়ামী লীগে। তাছাড়া বেশ কিছু নেতা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে যোগ দিয়েছিল। অথচ এদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে রাজু প্রাণ দিয়েছিল। কী জবাব আছে এসব নেতাদের জানিনা।

মানুষ সাধারণত ঋণী থেকে লজ্জা বোধ করে বা লজ্জিত থাকে। কিন্তু রাজুর কাছে আমার এই ঋণ আমাকে গর্বিত করে। তার মতো ব্যক্তিত্বের কাছে ঋণী থাকতে পারা সৌভাগ্যের। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। লাল সালাম কমরেড।

Responses -- “রাজুর কাছে ঋণ আমাকে আজীবন গর্বিত করবে”

  1. Anupam Roy

    মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দার জানি না ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য থাকাকালীন আমরা পরস্পর পরিচিত ছিলাম কি না। স্নেহাষ্পদ রাজু শাহাদাৎ বরণকালে আমি ক্যাম্পাস ছেড়ে এসেছি শারীরিকভাবে, তাই ঘটনাস্থলে থাকা হয়নি। তবে রাজুর জন্যে মনের ক্ষত শুকোয়নি, কোনদিন শুকোবেও না। রাজুরা এমনই হয়। আপনার আবেগপূর্ণ লেখাটি নতুন ক’রে চোখ ভিজিয়ে দিল। অশেষ কৃতজ্ঞতা। ভাল থাকবেন।
    ও আর একটা কথা রাজুদের নীতিবোধ আর আবেগ নিয়ে এখনও আমরা খেলা করি – নির্দিষ্ট দিন বা তারিখে সামান্য ফুল দিয়ে দায় সারি। জানি না এর শেষ কোথায়!
    শেষ কথা তাহেরভাই, বাবুলভাই, নাসিরভাই আমাদের সময়ের শুধু নেতা ছিলেন না ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালবাসার মানুষও ছিলেন। আমার ভালবাসা এখন গুমরে কাঁদে।

    সুপ্রিয় ভাইটি রাজু ভাল থাকিস – আমি নিশ্চিত দাদার ভালবাসা আদর তোকে কক্ষণো ধোঁকা দেয়নি।

    অনুপম রায়
    (বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি তবু আমি এখনও মনেপ্রাণে ছাত্র ইউনিয়ন করি)

    Reply
  2. NASIR UD DUZA

    প্রিয় জোয়ার্দার,

    আমার অনুজপ্রতিম রাজু কে নিয়ে আবেগ ও ভালোবাসা ভরা সুন্দর লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। আমার ছাত্র আন্দোলনের জীবনে অনেক শহীদের লাশ কবরে নামাতে হয়েছিল। সব চাইতে ভারী লাশটি ছিল মঈন হোসেন রাজুর। রাজুর ছাত্র আন্দোলন শুরু অনেকটাই আমার হাত ধরে। এটি আমার জন্য পরম গর্বের। তার ছাত্র আন্দোলনের পরিসমাপ্তিও আমার হাতে , ভায়ের লাশ কবরে শুইয়ে। আমার এই জীবনের সব চাইতে বেদনাময় ঘটনা মনে হয় এটিই।

    সে সময় রাজু ছিল ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য, আমি ছিলাম সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিল রুহিন হোসেন প্রিন্স। পরবর্তীতে আমি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস এর সম্পাদক এর পদে নির্বাচিত হয়ে , এর সদর দপ্তর , প্রাগ এ অবস্থান করেছিলাম। আমি তখন বা এখন কখনই কোন ব্যাবসাতে যুক্ত হইনি কোন বিত্ত বা বৈভবের অধিকারীও হইনি। আমি ছাত্র ইউনিয়নের ও রাজুর আদর্শকে পরিপূর্ণ ভাবে এখনো ধারন করি। রাজু যে রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিল, আমি এখনো তার সাথেই যুক্ত।

    কবি শামসুর রাহমানের পুরানের পাখী, আমার শহীদ ভাই রাজু তোমার স্মৃতি অমর হয়ে থাক যুগ থেকে যুগান্তরে !

    নাসির উদ দুজা

    Reply
    • Momtajul Ferdous Joarder

      শ্রদ্ধেয় নাসির ভাই
      আমি ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে ১১ তারিখ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত প্রাগে ছিলাম। সেই সময় বেশ কিছু বাংলাদেশী ছাত্র প্রাগ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র হিসাবে গিয়েছিল। তারা হলঃ কামাল(চশমা ছাড়া চলতে পারতেন না), রাজীব (রাজশাহীর বর্তমানে প্রাগে তার হিমালয় নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে), জাহাংগীর আলম (আদম পাচার করত) আরও অনেকে যাদের নাম মনে নেই । এরা প্রাগ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির মধ্যে লেখাপড়া শেষ না করে দুইটা রেস্টুরেন্ট খুলেছিল। একটার নাম ছিল গঙ্গা আর একটা হিমালয়। এগুলো ছিল প্রাগের স্ট্রাহফে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যে সম্ভবত ৩২ নাম্বারে।
      আমি যখন তাদেরকে আপনার কথা বলেছিলাম এবং আপনার নেতৃত্বের সুনাম করেছিলাম তখন তারা আমাকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছিল। যে আপনি প্রাগে ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত হয়েছেন আপনার ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা আমার না তাদের অভিযোগ। তবে তারা আমাকে আপনার টেলিফোন নাম্বারটা যোগাড় করে দিয়েছিল। সম্ভবত আমি আপনার সাথে ৯৪ সালের জুলাইয়ের ১৭ তারিখে কথা হয়েছিল আমার। আপনি আমাকে ১৮ তারিখে দেখা করার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু আমার বন্ধুরা হঠাৎ ১৭ তারিখে সন্ধ্যায় জার্মানি আসার সিদ্ধান্ত নেয়ায় দেখা হয়নি। না হলে সাক্ষাতে আপনাকে জানাতে পারতাম।
      এতদিন পরে আমার লেখায় আপনার মন্তব্য আমি খুশি হয়েছি। যে আপনি আদর্শ চ্যুত হননি। কিন্তু একটা দায় দায়িত্ব আপনাদের ঘাড়ে অবশ্যই বর্তায় তা হল আমি যখন ছিলাম মস্কোতে ছিলাম আড়াই মাস তখন প্রায় দেড়/দু’শ ছাত্রের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একজনকেও আমি খুঁজে পাইনি। অধিকাংশই ছিল বিএনপি জামাত বা আওয়ামী মন-ভাবাপন্ন। আমার প্রশ্ন আপনার কাছে সুনির্দিষ্টভাবে এই সব ছেলেরা কিভাবে বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং সাবেক চেকোস্লোভাকিয়াতে? এইসব বৃত্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের অনুমোদন তারা কেমনে পেয়েছিল? এই জাতিয় জামাত পন্থি বা বিএনপি পন্থিরাই আপনার সম্বন্ধে তথ্য দিয়েছিল। আমি দুঃখিত আপনাকে যদি আঘাত দিয়ে থাকি। আপনি আমারও নেতা ছিলেন। আমার এখনও মনে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একানব্বই বা বিরানব্বই সালের সেই সম্মেলনের কথা। সেদিন সেখানে কোন মাইকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল না প্রথমে। আমরা ঠিকমতো কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না এই নিয়ে হলে একটু গুঞ্জন ছিল। তখন আপনি বলেছিলেন যে আমি যখন কথা বলি তখন মাইকের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
      লীপু

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—