বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে ৭ মার্চের ভাষণকে উপস্থাপন করেছে তাতে নতুন প্রজন্মের কাছে কোনওভাবেই সঠিক বার্তা পোঁছাচ্ছে না, বরং ভুল তথ্য ক্রমাগত সংক্রামিত হচ্ছে। এছাড়াও স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষের কোনও সরকার এ ব্যাপারে গঠনমূলক কোনও পদক্ষেপ কোনও সময় নেয়নি। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিভাগ যেভাবে এই ভাষণকে উপস্থাপন করেছে তা কিছুটা হলেও সাংঘর্ষিক এবং তা বিতর্কের সৃষ্টি করবে এবং ইতিমধ্যে করেছে। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংবিধান যেভাবে ভাষণটাকে উপস্থাপন করেছে তাতে সঠিক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছায় না।

আইসিটি বিভাগ ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের একটা ভিডিওচিত্র ছেড়েছে যেখানে উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রঙ্গিন করা হয়েছে। এই ভিডিওটার গুণগত মান উন্মুক্ত যে কোনও সচলচিত্রের চেয়ে খুবই ভাল। এই সচল চিত্রকে রঙ্গিন করে উপস্থাপন করার ঘোর বিরোধী বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আইনজীবী মশিউর মালেক। এই জায়গায় উনার সাথে আমার মত পার্থক্য আছে, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না এই ভিডিও চিত্রটাকে রঙিন করার কারণে ইতিহাসের কোনও বিচ্যুতি ঘটেছে। কারণ সেই সময়ে রঙিন সচলচিত্র করা যেত না বিধায় ভিডিও চিত্রটি সাদাকালো ছিল। কিন্তু তখন গাছপালা ঘরবাড়ি সবকিছু রঙিনই ছিল, অতএব এটা রঙিন না সাদাকালো সেটা বড় কোনও অর্থ বহন করে না। তবে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে রঙিন করার সময় ভিডিও চিত্রটার মান অনেক বেড়ে গেছে। এটা দর্শক-শ্রোতার জন্য স্বস্তিদায়ক।

তথ্য মন্ত্রণালয় প্রদত্ত ডক্টর কবির চৌধুরী সম্পাদিত ভিডিও চিত্রটা আর আইসিটি ভিডিও একেবারেই একই রকম। শুধু আইসিটি শুরুতে কিছুটা অংশ বেশি যোগ করেছে। তবে এই দুইটা ভিডিও-র শুরুতে যে অংশ আছে তা কোনওভাবেই ৭ মার্চের না। এটা জনগণের সঙ্গে নির্ভেজাল প্রতারণা করা হয়েছে এবং এর জন্য দায়ী সরকারি কয়েকটা প্রতিষ্ঠান। তথ্য মন্ত্রণালয় প্রদত্ত ডক্টর কবির চৌধুরী সম্পাদিত ভিডিও চিত্রটার ২৭ সেকেন্ড পর্যন্ত সচল চিত্র কোনভাবেই ৭ মার্চের না। ২৮ সেকেন্ডের সময় যে ছবিটা আসছে, সেটা একজন বিদেশি মহিলা সাংবাদিকের ধারণা করি। এই অংশটুকু ৭ মার্চের কিনা সেটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না, তবে ২৯ সেকেন্ডের সময় যে ছবিটা এসেছে সেটা নিঃসন্দেহে ৭ই মার্চের। ঠিক একই রকম বৈসাদৃশ্য আছে আইসিটি বিভাগের রঙ্গিন রূপান্তরে। এই ভিডিওতে ঝামেলা শুরু হয়েছে ৫৭ সেকেন্ডের পরে। এখানেও মাঝে সেই বিদেশিনীর ছবি তারপর হঠাৎ দৃশ্যপট পালটে গেল ৫৯ সেকেন্ডের সময়। শুধু বঙ্গবন্ধু আছেন আর উধাও হয়ে গেছেন অন্যসব লোকজন। এসে হাজির হয়েছেন নতুন লোকজন বঙ্গবন্ধুর পাশে, যেন জাদুর ছোঁয়া।

এই ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পেতে হলে পুরো ভিডিওটা পর্যালোচনা করা দরকার। সে ক্ষেত্রে আমরা আইসিটি বিভাগের রঙিন সংস্করণটি নেব, তাতে ভাল বোঝা যাবে সবকিছু। কারণ এই ভিডিওটা গুণগত মান খুবই ভাল। এই ভিডিওর  ৬ সেকেন্ডের সময় দেখানো হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ রঙিন রূপান্তর সৌজন্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আইসিটি ডিভিশন। সাত সেকেন্ডের সময় দেখানো হয়েছে ইস্টার্ন মার্কেনটাইল ব্যাংক লিমিটেডের সামনের কিছু চিত্র জনগণ প্রতিবাদরত, কিন্তু এটা কোনওভাবেই প্রমাণ করে না যে এই চিত্রগুলো ৭ মার্চের। ৬ সেকেন্ডের সময় বলা হয়েছে যেটা ৭ মার্চের ভাষণ, এরপরে অন্য কোনওদিনের ভিডিও চিত্র এখানে সংযোজন করা কোনভাবেই ন্যায় সঙ্গত না, যুক্তিযুক্ত না এবং যখন সেটা করা হয় সেটা অবশ্যই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ কোনও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র না, যে এখানে অন্যদিনের সচলচিত্রের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এটাকে আকর্ষণীয় করতে হবে।

২৩ সেকেন্ডের সময় দেখানো হয়েছে যারা চিত্রগ্রহণ করেছেন তাদের নাম- মবিন, রউফ, বাবু ও আমজাদ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটা মন্ত্রণালয় এতো তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এবং অবহেলার সাথে এই জাতীয় বীরদের নাম এখানে লিখেছে এটা খুবই দুঃখজনক। তাদের পুরো নামটাও লেখা হয়নি।

সেদিন চিত্রগ্রহণের কাজে যে দলটা কাজ করেছিল সেখানে ছিলেন ৭ জন। আমাকে আমজাদ আলী খন্দকার সে রকমই বলেছেন। তারা হলেন- প্রয়াত ক্যামেরাম্যান জি জেড এম এ মবিন, প্রয়াত ক্যামেরাম্যান এম এ রউফ, সহকারী ক্যামেরাম্যান আমজাদ আলী খন্দকার, সহকারী ক্যামেরাম্যান এস এম তৌহিদ, সহকারী ক্যামেরাম্যান সৈয়দ মাইনুল হাসান, লাইট বয় হাবিব চাকদার ও জুনায়েদ আলী।

২৯ সেকেন্ড এর সময় যে চিত্রটা আমরা দেখছি তাতে এটা বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই যে এটা ৭ মার্চের সচল চিত্রের অংশ। এখানে বেশ কিছু ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে যেটা অসম্ভব। আমি এ পর্যন্ত এই ভাষণ নিয়ে যারা মাঠে উপস্থিত ছিলেন অন্তত ৪০/৪৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছি, সবাই বলেছে মাঠ পরিপূর্ণ ছিল সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। সেক্ষেত্রে এখানে যে ফাঁকা জায়গা দেখছি এরপরে এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য না যে এটা ৭ মার্চের চিত্র। তাছাড়া সহকারী ক্যামেরাম্যান আমজাদ আলী খন্দকার সাহেব আমাকে বলেছেন, উনি যখন ভিডিও চিত্র নিচ্ছিলেন তখন বঙ্গবন্ধুকে যে ক্যামেরাটা তাক করেছিল সেটাতেই উনি ছিলেন আর উনার একজন সহকারী দূরের চিত্রগুলো নিচ্ছিলেন। কিন্তু উনি বলেছেন যে ক্যামেরার আওতার মধ্যে কোনও ফাঁকা জায়গা ছিলনা। তাছাড়া যতদূর যাবার পর ফাঁকা জায়গা থাকতে পারত ততদূর জনগণের ভিড় ঠেলে

ক্যামেরাম্যানদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না, আর প্রশ্নও উঠে না। উনারা উনাদের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আমি আমজাদ আলী সাহেবকে বিশেষ একটা প্রশ্ন করেছিলাম যে, বঙ্গবন্ধু যখন গাড়িতে আসেন আপনি কি দেখেছিলেন? এই গাড়িটার নম্বর কী ছিল? আপনারা কি সে চিত্র নিয়েছিলেন? উনি জানিয়েছেন, গাড়ি যে জায়গায় পার্ক করেছিলেন সেটা আমার ক্যামেরার আওতার বাইরে ছিল। যখন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠেন শুধু তখন থেকে উনি চিত্র ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাই আমি জনাব হাজী গোলাম মোর্শেদ সাহেবের বক্তব্যে। উনি আমাকে বলেছেন যে ৭ মার্চ উনি বঙ্গবন্ধুকে উনার নিজের সাদা টয়োটা কালো কাঁচে ঘেরা গাড়িতে করে ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং গাড়ির নাম্বার ছিল ঢাকা গ-১। উনি আরও বলেছেন, মঞ্চের কাছে উনি সেদিন প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে যেতে পারেননি, মঞ্চ থেকে বেশ খানিকটা দূরে ওই দিন গাড়ি রাখতে হয়েছিল।

৩৯ সেকেন্ডের সময় থেকে ভিডিওতে একটা জিপ দৃশ্যমান হল তারপর ৪২ সেকেন্ড পর্যন্ত একে একে তিনটা জিপ দেখা গেল। এরপর ৪৫ সেকেন্ডের পর একটা পতাকাসহ সাদা গাড়ি সেটার নাম্বার কোনওভাবেই ‘ঢাকা গ-১’ না।

৪৫ সেকেন্ড থেকে ৪৮ সেকেন্ড বা তার একটু বেশি কিন্তু উনপঞ্চাশ সেকেন্ড না গাড়িটাকে আসতে দেখা যায় ৪৮ সেকেন্ড পার হওয়ার পরে গাড়ির নাম্বার প্লেটটা খুব পরিষ্কার দেখা গেছে যে, এটার নাম্বার ঢাকা ক -৮৪৭৭।

এসব কিছু দেখার পর আমি হাজী গোলাম মোরশেদ সাহেবকে একটা ইমেইল পাঠিয়েছিলাম ছবি সহ। উনাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম- যে আপনি আমাকে বলেছিলেন যে গাড়িতে করে আপনি বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই গাড়ির নাম্বার ছিল ঢাকা গ-১। আমি পত্রিকাতেও ঠিক সেইরকমই পড়েছিলাম। কিন্তু এখানে যে গাড়িতে বঙ্গবন্ধু এসেছেন তার নম্বর মিলছে না। পরে উনি আমাকে ইমেইলে জানালেন যে, এটা কোনও অবস্থায়ই ৭ মার্চের ভিডিও চিত্র না। এ অংশ সম্ভবত ৩ জানুয়ারির ভিডিও চিত্র। পরে আমি উনাকে ফোন করি। উনি জানালেন নিজের গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুকে সেদিন ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই গাড়ির সামনে কোনও ফ্ল্যাগ ছিল না। কিন্তু এই গাড়ির সামনে একটা ফ্ল্যাগ আছে। আর একটা ব্যাপার উনি বলেছেন, ওইদিন মাঠে তিল ধারণের জায়গা ছিল না, সেখানে মঞ্চের অতো কাছে গাড়ি নিয়ে যাওয়া তো সম্ভব হয়নি। কিন্তু ভিডিও চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে একটা গাড়ির বহর আসলো প্রথমে ৩টা জিপ তারপর বঙ্গবন্ধু পিছনে সাদা গাড়ি থেকে নামলেন। কিন্তু হাজী গোলাম মোরশেদ সাহেব বললেন সচলচিত্রে দেখা যাচ্ছে  ওইদিন একটা রাস্তা করা ছিল গাড়ি আসার মতো। এই রকম কোনও রাস্তা ৭ মার্চ ছিল না। উনি অনেক কষ্টে গাড়ি চালিয়ে যতটা সম্ভব গিয়েছিলেন। কিন্তু মঞ্চের কাছাকাছি ৭ মার্চ উনি যেতে পারেননি। একটু দূরে গাড়ী রাখতে হয়েছিল।

৭ মার্চ গাড়ি চালাচ্ছিলেন হাজী গোলাম মোর্শেদ। বঙ্গবন্ধু ওনার বাম পাশে বসা ছিলেন। গাড়ির সামনে পিছনের সিটে ছিলেন মহিউদ্দিন আর গাজী গোলাম মোস্তফা। এইদিন যখন উনারা রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন উনাদের সামনে কোন গাড়ির বহর ছিল না। বাকি নেতারা- তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক সাহেব আগেই একটা অন্য গাড়িতে মঞ্চে চলে গিয়েছিলেন। হাজী গোলাম মোর্শেদ সাহেব একটা ব্যাপারেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানালেন যে, ওইদিন যদি ওই গাড়ির বহরে সবাই রেসকোর্সে যেত তাহলে বঙ্গবন্ধু যাবার আগেই মঞ্চে পৌঁছাল কেমনে তারা সবাই? আব্দুর রাজ্জাক সাহেবও তার স্মৃতিচারণের সময় এই কথায় বলেছেন যে তিনটা গাড়ির বহরে ৭ মার্চ রেসকোর্সে গিয়েছিলেন।

এব্যাপারে আমি যখন হাজী মোরশেদ সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করি উনি বলেছেন, রাজ্জাক বিস্মৃত হয়ে থাকবে।  এটা অবশ্য খুব সহজেই প্রমাণ করা যাচ্ছে যে আব্দুর  রাজ্জাক দুটো দিনকে গুলিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু হাজী গোলাম মোর্শেদ সাহেবের কথার মধ্যে আমি কোন অসংলগ্নতা দেখছি না এবং এখানে বিস্মৃতির কোনও কারণ আমি দেখছি না। এমনকি উনি আমাকে বলেছেন, যে ওই সময় ঢাকা শহরে কত গাড়ি নিবন্ধিত ছিল, এবং এর একটা পরিসংখ্যান পর্যন্ত নিয়ে আমাকে দিয়েছেন। যে গাড়িতে উনারা ৭ মার্চ গিয়েছিলেন সে গাড়িটা উনি কার কাছ থেকে কিনেছিলেন। এই ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর জামাতা যে বই লিখেছেন- সেখানেও কিছু তথ্য এরকম আছে যে একটা তিনটা গাড়ির বহর গিয়েছিল।  তারপরের ঘটনাগুলো কোনভাবেই মিলছে না।

এরপর আমি টেলিফোনে কথা বলতে বলতেই হাজী গোলাম মোর্শেদ সাহেবকে অনুরোধ করেছিলাম ৭ মার্চের ভিডিওটা দেখার জন্যে। পরে উনি ভিডিও দেখে আমাকে পরিষ্কার বলেছেন বঙ্গবন্ধু যখন মঞ্চে উঠছেন এটা ঠিক আছে। এ অংশ ৭ মার্চের মতো মনে হচ্ছে, কিন্তু তার আগের যে চিত্র এটা কোনও অবস্থাতেই ৭ মার্চের না। এটা ৩ জানুয়ারির হবার সম্ভাবনাই বেশি। তবে সেদিন উনি সেখানে ছিলেন না। ওখানে যে বিদেশি একজন মহিলাকে দেখানো হচ্ছে, এটাও উনি ঠিক করে বলতে পারেননি যে- সে অংশ ৭ মার্চের না তার আগের। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যখন বিদেশিনী ওই মহিলাকে দেখানো হচ্ছে সেটা ৫৭ সেকেন্ড থেকে ৫৮ সেকেন্ড পর্যন্ত, এটাই আমাদের সীমানা। হয় এখান থেকে অথবা এরপর থেকে ৭ই মার্চের ভিডিও চিত্র শুরু হয়েছে।

তবে এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে ৫৯ সেকেন্ড থেকে ৭ মার্চের ভিডিও চিত্র শুরু হয়েছে এবং সেটা খুব সহজে প্রমাণ করা সম্ভব। যে ৫৭ সেকেন্ডের সময় যখন বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে উঠছেন এটা দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এইদিন ওনার সঙ্গে যে লোকজন আছে ৫৮/৫৯ সেকেন্ডের সময় আমরা দেখছি তখন এসব লোকজনগুলো সব উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঠিকই আছেন। বঙ্গবন্ধুকে দেখে বুঝতে পারা খুবই মুশকিল কারণ ওনার পোশাক সব সময় একই রকম। ৩ জানুয়ারিতে উনি একই রকম পোশাকে ছিলেন এবং ৭ মার্চেও। যদি আমরা আশেপাশের মানুষগুলোকে সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখি তাহলে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে এই দুইটা চিত্রের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। তবে ৫৯ সেকেন্ড থেকে শুরু করে বাকি চিত্রের মধ্যে যে ধারাবাহিকতা আছে তাতে বলা যায় যে ৫৯ সেকেন্ড থেকেই ৭ই মার্চের সচল চিত্র শুরু হয়েছে। তার আগের চিত্রগুলো ৭ই মার্চের না।

হাজী মোর্শেদ সাহেব আর একটা দিকও নির্দেশ করেছেন, সেটা হল বঙ্গবন্ধু গাড়িতে ওনার বাঁ পাশে বসেছিলেন পিছের আসনে গাজী গোলাম মোস্তফা ও মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। সেক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির বাম দিক থেকে নেমে আসার কথা। কিন্তু এইদিন ভিডিও চিত্রতে দেখা যাচ্ছে যে বঙ্গবন্ধু ঢাকা ক-৮৪৭৭ সংখ্যার গাড়িটার ডান দিক দিয়ে বেরিয়েছেন। আর মহিউদ্দিন সাহেব যে এইদিন গাড়ির মধ্যে ছিলেন না এটা একেবারে পরিষ্কার। ৪৬ সেকেন্ড এর সময় এর ছবিটা যদি আমরা দেখি তাহলে দেখা যাবে শেষের যে জিপটা এসেছে সম্ভবত মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সেই জিপ থেকে নেমেছেন। বঙ্গবন্ধু গাড়ির ডান পাশ দিয়ে যখন বেরিয়েছেন তখন উনি পিছন থেকে প্রায় দৌড়ে অনেককে টপকে সামনে চলে আসেন গাড়িটার বাম দিক দিয়ে। ৪৮সেকেন্ড পার হওয়ার পরে আমরা যে চিত্র দেখি তখনো বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে নামেননি। এরপরে ৪৯ সেকেন্ডের সময় দর্শককে দেখানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি গাড়ি থেকে নামতে দেখানো হয়নি। কিন্তু ৫১সেকেন্ডে আমরা দেখেছি যে বঙ্গবন্ধু গাড়ির বাইরে ডানদিকে আর গাড়ির সামনে তখন যতটা চিনতে পারি মনে হচ্ছে তাজউদ্দিন আহমেদ সাহেব দাঁড়িয়ে। আর এই সময়ে প্রায় দৌড়ে মহিউদ্দিন সাহেব গাড়ির বাম দিক দিয়ে তাজউদ্দীন সাহেবের পাশ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পিছে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর সামনে মঞ্চের দিকে এগুতে থাকলেন। ৫৬-৫৭ সেকেন্ডে আমরা দেখতে পাই বঙ্গবন্ধু মঞ্চের সিঁড়ির যে বেড়া সেটা ধরে উপরে উঠছেন এবং উনার ঠিক পিছে মহিউদ্দিন। তারপরে ৫৭ সেকেন্ডের শেষে এবং ৫৮ সেকেন্ডে একজন বিদেশিনীকে দেখানো হল। তারপর ৫৯ সেকেন্ডের সিঁড়ির যে চিত্র দেখানো হল সেখানে মহিউদ্দিন সাহেব সহ আশেপাশের সমস্ত লোকজন উধাও শুধু বঙ্গবন্ধু ছাড়া। ৫৯ সেকেন্ডের পর থেকে চিত্রে আর ৫৭সেকেন্ডের চিত্রের একজন মানুষকেও দেখা যাচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী গাড়ি থামার আগেই মহিউদ্দিনকে বাইরে দেখা গেছে। সেক্ষেত্রে ৭ মার্চ যেহেতু মহিউদ্দিন, বঙ্গবন্ধু হাজী গোলাম মোর্শেদ এবং গাজী গোলাম মোস্তফা এক গাড়িতে ছিলেন এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তথ্যমন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ভিডিও চিত্রের প্রথম ২৭ বা ২৯ সেকেন্ড এবং আইসিটির প্রকাশিত ভিডিও চিত্রের প্রথম ৫৭ সেকেন্ড কোনভাবেই ৭ মার্চের না, এবং এটা প্রমাণযোগ্য। ৫৭ থেকে ৫৮ সেকেন্ড পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এখানে একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে, এটা দুই দিনের চিত্রের একটা সংমিশ্রণ। এরপরও এক মিনিট ৭ সেকেন্ডে প্রথমে নীল আকাশ তারপর বাংলাদেশের বর্তমান পতাকাটা দেখানো হয়েছে ১ মিনিট ৯ সেকেন্ড পর্যন্ত। এটাও কোনওভাবেই ৭ মার্চের চিত্র হতে পারে না। অন্তত বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত আমাদের পতাকা এটা ছিল না। লাল সূর্যের মাঝে হলুদ রঙের মানচিত্র অঙ্কিত ছিল।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে হলুদ মানচিত্রটা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। সে কথা উনি বিদেশি সাংবাদিকের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। আমি যতদূর মনে করতে পারি ডেভিড ফ্রস্টের সাথে। আমি জানিনা কিসের স্বার্থে সরকারের দুইটা মন্ত্রণালয় জনগণের সাথে এই নিয়ে প্রতারণা শুরু করেছে। এতে ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে, সাংবাদিক, নিবন্ধকার এবং ছাত্র-ছাত্রীরা যারা ভিডিও দেখে লিখছেন ভুল লেখালেখি হচ্ছে। এসব কারণেই এ কে খন্দকার, আতাউস সামাদ, নির্মল সেন ও বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মতো কিছু লোকজন সহজেই ইতিহাস বিকৃত করতে প্রয়াস পেয়েছে। সবাই এদের মতো উদ্দেশ্যমূলকভাবে লিখছে না, কিন্তু সরকারের অবহেলার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার ভুল তথ্য সংক্রামিত হচ্ছে। অথচ সরকার খুব সহজেই পুরো ভাষণটাকে উন্মুক্ত এবং সঠিক চিত্র এর সাথে সংযোজন করে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে।

এব্যাপারে কথা বলার জন্য আমি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে বেশ কয়েকবার টেলিফোন করেছি কিন্তু উনাকে ধরতে পারিনি। ৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ১২ মিনিটে যখন উনাকে ফোন করি উনি একটা এসএমএস পাঠালেন I’m in a meeting. এরপর উনাকে অনেকবার ফোন করে আমি পাইনি। তবে জুন/জুলাই মাসের দিকে একদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে উনাকে ফোন পেয়েছিলাম। পরিচয় দিয়ে বললাম বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে কথা বলতে চাই উনি কি কিছুটা সময় দিতে পারবেন। আমাকে উনি বললেন- এখনই কথা বলবেন নাকি ১০ মিনিট পরে কথা বললে চলে? আমি এইমাত্র বাসায় ঢুকছি। ভদ্রতার খাতিরে আমি উনাকে বললাম- অসুবিধা নেই আমি ১০ মিনিট পরেই ফোন করছি। ঠিক দশ মিনিট পরেই আমি ফোন করেছিলাম, কিন্তু উনি আর ফোন ধরেননি। বন্ধ করে রেখেছিলেন।

এতক্ষণ আলোচনা করেছি ভিডিও নিয়ে এবার আসি আলোকচিত্রে। অসংখ্য পত্রিকায় ৭ মার্চের ভাষণের উপর বিভিন্ন নিবন্ধে, রিপোর্টে, সম্পাদকীয়তে যে  আলোকচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে সেটা ৭ মার্চের না। এই কাজটা বিবিসি বাংলা বিভাগের মতো গণমাধ্যমও করেছে। সাংবাদিকরা সারা বিশ্বের ভুল ত্রুটি নিয়ে খোঁচাখুঁচি করেন এটা তাদের কাজ। অথচ তারা যখন এইরকম ঐতিহাসিক ব্যাপারগুলো নিয়ে ভুল ছবি ছাপে এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।

আর এই জাতীয় ভুলগুলো মানুষের মধ্যে এমন ভাবে সংক্রামিত হয় যে দিনে দিনে ইতিহাস বিকৃত হতে থাকে। মানুষ ভুল জানতে জানতে মিথ্যার সাথে অভ্যস্ত হতে থাকে। অনেক দামি নামি পত্রিকা বা বিবিসির মতো গণমাধ্যম যখন এগুলো করে তখন সাধারণ মানুষ এটাকে খুঁটিয়ে দেখবার প্রয়োজন মনে করে না। তারা এই মিথ্যাকে সত্যি বলে মনে গেঁথে নেয় এবং অহেতুক তর্কে লিপ্ত হয়, যে মিথ্যাটাই ঠিক বিবিসি ছেপেছে এটা মিথ্যা হতে পারে না। কত হাজার হাজার জায়গায় যে এই ছবিটা ৭ মার্চের ভাষণের ছবি বলে চালানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু ছবিটা কোনোভাবেই ৭ মার্চের না, এখন প্রশ্ন উঠবে যে আমি কীভাবে এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছি যে এটা ৭ মার্চের ভাষণের ছবি না। যারা ৭ মার্চের ভিডিওটা দেখেছেন তারা যদি খেয়াল করেন, দেখবেন এই দিন মঞ্চের উপরে যে মঁচ (Podium) ছিল সেটা সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে জনগণকে দু হাত তুলে সম্ভাষণ জানান। তখন উনার বাম হাতে পাইপটা ছিল। তারপর পাইপটা কোটের বাম পকেটে রাখেন আর চশমাটা খুলে পডিয়ামের উপর রেখেছিলেন। এটাই ৭ মার্চের একটা বিশেষত্ব। কিন্তু উপরের ছবিতে তা নেই। বিভিন্ন পত্রিকায় ওয়েব পেজে উপরের ছবিটা আছে। সাহস নামে একটা পত্রিকায় আমার ৭ মার্চ নিয়ে লেখা প্রথম নিবন্ধটায় এই ছবিটাই ব্যবহার করেছিল ২০১৭ সালে। এখানে পরিষ্কার একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে যে মঁচের উপরে কোন কাপড় নেই এবং বঙ্গবন্ধুর চশমাটাও নেই।

অতএব এ নিয়ে বিতর্কের কোন সুযোগই নেই যে এটা ৭ মার্চের ছবি না। যারা এটা করছে তারা ধীরে ধীরে ইতিহাসকে বিকৃত করছে। সেটা জেনে করুন আর না জেনে করুন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কোন জায়গায় কোন ছবি ব্যবহার করতে হলে বা একটা পত্রিকার দায়িত্ব কোন নিবন্ধকারের কোন নিবন্ধ যখন ৭ মার্চের বলে কোন ছবি ব্যবহার করছে সেটাকে আগে ঠিক ভাবে জেনে নেয়া- যেটা আসলেই ৭ মার্চের ছবি কি না।

এর দায় দায়িত্ব অবশ্যই নিবন্ধকারের উপরে বর্তায় না যখন ছবিটা পত্রিকা ব্যবহার করে এই দায় সম্পূর্ণভাবে পত্রিকার। আমার মনে হয় সরকারেরও এখানে যথেষ্ট পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন আছে। যারা এজাতীয় ভুল করছে তাদের জরিমানা এবং শাস্তির ব্যবস্থা রাখা উচিত।

 

Responses -- “৭ মার্চ: সরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে”

  1. সেলিম রহমান

    ৭ই মার্চ ভাষণের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষণ এবং বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা । জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ একটি জাতির জন্মের ভাষণ, সমগ্র বঞ্চিত মানবতার মুক্তির ভাষণ যা অতিশয় খাঁটি এবং সম্পূর্ণ ভাবে মৌলিক।
    লেখাটিতে ভাষণের উপরে যে সংক্রমণ সংঘটিত হয়েছে তার উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাস বিখ্যাত একটি মৌলিক বিষয়কে আক্রমণ এবং তার মৌলিকত্ব ধ্বংস করছে এমন কিছু বিষয় লেখক অতিশয় ধর্যের সাথে ভাষণের প্রতিটি সেকেন্ড বিশ্লেষণ করেছেন, এবং প্রমাণ করেছেন ভাষণটির ভিডিওতে অসংখ্য অসংলগ্ন বিষয়ের উপস্থাপন রয়েছে যা কোন ভাবেই ওই সময়ের সাথে যায় না । এবং তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথেও কথা বলেছেন তার সত্যতা নিরুপনে।
    যদিও লেখক এই সব সংযোজনকে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভুলের কারণে হয়েছে বলে ধারণা করছেন, এই ক্ষেত্রে লেখকের সাথে আমার দ্বিমত এবং তা হল এটি মোটেও কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভুলের কারণে নয় । এই গুরুত্ব বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হয় কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই ঐটিহাসিক ভাষণের মৌলিকত্ব ধ্বংসে সরাসরি জড়িত।
    লেখকের সাথে আমার আরেকটি বিষয়ে মতান্তর রয়েছে তা হল ভাষণের রঙ্গিন ভিডিও নিয়ে। সাদা কালো একটি মৌলিক উপাদান, সেটাকে রঙিন করলে সাদা কালো তার মৌলিকত্ব হারায়।
    লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ তার অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী লেখার জন্য।

    Reply
  2. কাজি ফারুখ আহমেদ

    জ্ঞানি ও গুনি লোকেরা এসব কি শুরু করেছেন? জোয়ারদার সাহেবের লেখা পড়ে আমার তো মনে হচ্ছে আরও পঞ্চাশ বছর পর এই ধরনের পণ্ডিতরা বলবেন ওই ৭ মার্চের ভাষণ শেখ মুজিব নামক লোক তো দেয় নাই।
    আমি একজন সাধারন মানুষ হিসাবে বলছি ১৯৭১ এর বাংলার মানুষ আর কিছু চায় নাই শুধু চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা আর তা পেয়েই তারা যুদ্ধে যায়।
    আমি এবং আমার প্রয়াত খালাত ভাই ৭ই মার্চের রেসকোর্সের ময়দানে সকাল ১০টার ভিতরেই গিয়ে বসেছিলাম, মহিলাদের পিছনের সারিতেই ছিলাম।
    বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘আমি যদি হুকুম দেবার না পাড়ি যার যা আছে তা নিয়ে শত্রুকে মকাবেলা করবে, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ধন্যবাদ।

    Reply
    • Momtajul Ferdous Joarder

      আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে। আপনার ফোন নাম্বারটা দিলে খুশি হব।

      Reply
  3. সৈয়দ আলি

    সমস্যা হয় যখন কিছু প্রক্ষিপ্ত বা আরোপিত হয়। ইতিহাসকে ইতিহাসের মতো থাকতে দিলে সত্যও লঙ্ঘিত হয় না, বিব্রতও হতে হয় না। উৎসাহীরা ভেবে দেখুন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—