‘উন্নয়ন তত্ত্বের ভবিষ্যত নিয়ে বললেন, কিন্তু আপনার বক্তব্যে অর্থনীতি ব্যাপারটি কি আরও বেশী করে আসা উচিত ছিল না?’, জানতে চাইছিলেন সাংবাদিক বন্ধুটি। পেশাগত চিন্তা-ভাবনা ও ব্যক্তিগত জীবনের ওপর  আমার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে এসে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে  আমার দেওয়া মুক্ত বক্তৃতাটির কথা উল্লেখ করছিলেন তিনি।
তার জিজ্ঞাসায় হাসলাম আমি – এ জাতীয় প্রশ্নের সন্মুখীন আগেও হয়েছি আমি এবং এ জিজ্ঞাসাও আমার জন্য নতুন নয়। আসলে যারা এ প্রশ্ন করেন, তারা মনে করেন যে উন্নয়ন মানে হচ্ছে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা উন্নয়ন শুধুমাত্র অর্থনীতি-সম্পৃক্ত। এ দুটো ধারণাই আংশিক এবং পূর্ণাঙ্গ নয়।
যারা উন্নয়নকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমার্থক মনে করেন, তারা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকেই উন্নয়নের লক্ষ্য বলে মনে করেন। সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এককভাবে  গুরুত্বপূর্ণ। এ জাতীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহাসিকভাবেই একটি সমাজের বস্তুগত সম্বৃদ্ধিকেই সামনে নিয়ে এসেছে এবং উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু থেকে মানুষকে প্রান্তসীমায় ঠেলে দিয়েছে।
আমরা  মৌলিক প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি – কিসের উন্নয়ন, কার জন্য উন্নয়ন এবং কার দ্বারা উন্নয়ন। আমরা বিস্মৃত হয়েছি শুধু উন্নয়নের জন্য উন্নয়ন নয়, উন্নয়নের আসল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষ – প্রত্যেকটি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, প্রতিটি মানুষের মঙ্গল, এবং প্রতিটি মানুষের পূর্ণ সম্ভাবনা যাতে সে অর্জন করতে পারে। যে উন্নয়ন মানব কল্যাণমুখী নয়, যে উন্নয়ন মানুষে মানুষে সমতা নিশ্চিত করে না, যে উন্নয়ন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদেনপক্ষে বর্তমান সুযোগের সমান সুযোগ সৃষ্টি করে না, উন্নয়ন শুধু যে অর্থনৈতিক, তা-ই নয়, তা বজায়যোগ্যও নয়।
এর পাশাপাশি এটাও মনে করে দরকার, যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণগত দিকই শেষ কথা নয়, এ প্রবৃদ্ধির গুণগত মানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কর্মহীনতা বাড়ায়, অসমতা বৃদ্ধি করে, পরিবেশকে নষ্ট করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে, সে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বজায়ক্ষম হতে পারে না।
এটায় কোনও ভুল নেই যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে একটি মূল্য দিতে হয় – সর্বকালে এবং সবদেশে হয়েছে। কিন্তু সে সব নেতিবাচক বিষয়গুলোর স্থিতি ক্ষণস্থায়ী এবং উন্নয়নের অগ্রসরের সঙ্গে সঙ্গে সে সব নেতিবাচক প্রভাব আস্তে আস্তে দূরীভূত হয়। কিন্তু ওই প্রভাব যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, যদি তা মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়, তা হলে  সে উন্নয়ন মানবকল্যাণমুখী নয়।
সুতরাং উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে সীমিত করা ঠিক নয়। সঙ্গে সঙ্গে ওই দ্বিতীয় ধারণাটাও ভুল যে উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি সম্পৃক্ত। প্রথমত, অর্থনীতির বহু ধ্যান-ধারণা আছে যাদের ব্যাপ্তি ও গভীরতা অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে। যেমন, সমতা শুধু একটি অর্থনৈতিক ধারণা নয়, এটি একটি ন্যায় বিচারেরও প্রশ্ন। প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু উৎপাদন উপকরণ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্ত:প্রজন্ম সাম্যের প্রশ্নটি।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের ভিত্তিভূমি হচ্ছে সর্বজনীন মানবাধিকার। এটি কোন অর্থনৈতিক ধারণা নয়, কিন্তু সমতা-ভিত্তিক উন্নয়নে এর একটি প্রায়োগিক মূল্য আছে। তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, সর্বজনীন মানবাধিকার তার অন্তর্নিহিত মূল্যের কারণেই মূল্যবান।
তৃতীয়ত, অর্থনীতি-বহির্ভূত নানান বিষয় যেমন, আইন কাঠামো, সুশাসন, প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের অন্যতম দিক এবং উপকরণ। মানুষের সামাজিক বন্ধন, অংশগ্রহণ, কণ্ঠ ও ভাষ্য ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। সেই সঙ্গে রয়েছে মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কৃতি। এর কোনটিই কিন্তু অর্থনীতির বিষয় নয়, কিন্তু উন্নয়নের জন্য মূল্যবান।
‘উন্নয়ন ভাবনার’ বক্তৃতায় এ কথাগুলোই তো উঠে এসেছে। উন্নয়ন শুধু অর্থনীতি উদ্ভুত কিংবা অর্থনীতি সম্পৃক্ত নয়। রাজনীতি, সমাজনীতি, ইতিহাস, নৃ-তত্ত্বও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। এবং উন্নয়ন তো শুধু প্রবৃদ্ধি নিয়ে, হর্ম্যরাজি নিয়ে নয়, শিল্প- কারখানা নিয়ে নয়। উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে মানুষ, কারন, চূড়ান্ত বিচারে, মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়নই তো প্রকৃত উন্নয়ন।

One Response -- “উন্নয়ন ভাবনা: মানব উন্নয়ন”

  1. Tanvir Zahir

    প্রকৃত প্রস্তাবে মানব উন্নয়নই হচ্ছে উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হল মানব উন্নয়নের বাই-প্রোডাক্ট। সৌভাগ্যের বিষয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী এটা জানেন। শিক্ষার উন্নয়নে তাই তিনি এতো জোর দিয়েছেন। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নও প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ পাচ্ছে গুরুত্বের সাথে। উন্নত মানবসম্পদ উন্নত অবকাঠামোর সুবিধা পেলে অর্থনীতিতে যে গতি আনবে তা আমরা দেখতে পাব আগামি এক দশকের মধ্যে। তখন সম্ভবত আলোচ্য ক্ষীণদৃষ্টি সাংবাদিকটি সন্তুষ্ট হবেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—