Feature Img

monjur-f111১৭ জুন থেকে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ঢাকার পাশের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে তাদের সেক্টরের সব কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। মালিকপক্ষ অভিযোগ করেছে, প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে যে অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল, জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙ্গচুর চলছিল, শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দিচ্ছিল; তারই পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

দিন দশক ধরে আশুলিয়ার অশান্ত পরিস্থিতি সত্ত্বেও কিছু কিছু কারখানায় উৎপাদন কম-বেশি অব্যাহত ছিল। বর্তমানে সবই বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে তিনশ’র বেশি কারখানার কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বেতন-ভাতা ছাড়া নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। মালিকরাও বিপুল লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিদেশি ক্রেতারাও তাদের অর্ডার বাতিল করতে শুরু করেছেন। এলাকার দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্যেও অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।<

আশুলিয়ার এই ঘটনার ধাক্কা অন্যান্য শিল্প এলাকায় এসে লাগছে এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

গার্মেন্ট সেক্টরে বর্তমান সঙ্কটের পেছনে শুধু একটি নয়, বেশ কিছু কারণ আছে। সেই কারণগুলো বোঝা দরকার। কারণগুলো দূর করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে না পারলে ঘুরে-ফিরে সঙ্কটের আবর্তেই ঘুরতে থাকবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সেক্টর। শিল্পখাতে এককভাবে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পে চল্লিশ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন।

গার্মেন্ট শিল্পের সাফল্য, মুনাফা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সামনে থাকার অন্যতম কারণ বাংলাদেশের সস্তা শ্রম। সস্তা শ্রম মানে শ্রমিকদের বঞ্চনা, শ্রমিক-শোষণ। এখান থেকেই সঙ্কটের একটা বড় দিকের উদ্ভব। গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি কম। দুই বছর আগে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ৫০০০ টাকা নুন্যতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। তখন দেশের অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই এ দাবির ন্যায্যতা স্বীকার করেছিলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি ‘অমানবিক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু পরে মিনিমাম ওয়েজ বোর্ড তিন হাজার টাকা নুন্যতম মজুরি নির্ধারণ করে। এই মজুরি অপ্রতুল হওয়ায় সেই সময় কিছু কিছু জায়গায় শ্রমিকরা স্বত:স্ফুত ধর্মঘট করে এবং রাস্তায় নেমে আসে। সরকার শ্রমিকদের ওপর তীব্র দমননীতি চালায়, হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই-বরখাস্ত হন। অনেকে গ্রেফতার হন, মন্টু ঘোষসহ অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হন, গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করা হয়। মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ইতিমধ্যে দ্রব্যমূল্য ও জীবনধারণের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দফায় দফায় ঘরভাড়া বৃদ্ধি, যাতায়াত-শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে। শ্রম মন্ত্রনালয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক গার্মেন্ট শ্রমিক ঘোষিত নুন্যতম মজুরিও পাচ্ছেন না। এছাড়া সোয়েটারে এবং পিস রেটের ক্ষেত্রে নানা অসঙ্গতি বিরাজ করছে। রেশনিং চালু করার কথা বলেও তা চালু করা হয়নি। এছাড়া যা পাওনা তা ঠিকমতো এবং ঠিক সময় শ্রমিকরা পান না। উল্লেখযোগ্য, সম্প্রতি সরকার যে মজুরি কমিশন গঠন করেছেন তাতে নুন্যতম শ্রম মজুরি ৪,১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ম্যানেজমেন্টের কিছু লোকজন কর্তৃক শ্রমিক হয়রানি, দুর্বব্যবহার নিত্যদিনের ব্যাপার। তাছাড়া শ্রমিকদের এই সমস্যাগুলো তুলে ধরার কোনও সুযোগ নেই। শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয় না। কেউ চেষ্টা করলে নেমে আসে দমন-পীড়ন। শ্রমিকরা কেউ তাদের দু:খের কথা মালিকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করলে তার ওপর নেমে আসে দমননীতি, মাস্তানদের হামলা, পুলিশের নির্যাতন, ছাঁটাই-বরখাস্ত। এ সব কারণে শ্রমিকদের ক্ষোভ-দু:খ যখন কোনও ভাবে প্রকাশ করার সুযোগ থাকে না, তখন ক্ষোভ জমা হতে হতে একসময় ফেটে পড়ে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ বিদ্রোহে রুপ নেয়।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে নানা স্বার্থান্বেষী মহল নানা রকম চক্রান্তে মেতে ওঠে। কিছু মালিক তাদের পকেট ইউনিয়ন বা দালাল ইউনিয়ন বানায় অথবা কিছু নেতাকে টাকা দিয়ে কিনে নেয়। অন্যদিকে শ্রমিকদের স্বার্থে সংগ্রামী গঠনমূলক ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে দেওয়া হয় না। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোটি টাকা নিয়ে বাংলাদেশে তথাকথিত শ্রমিক সংগঠনের কয়েকটি এনজিও পরিচালনা করা হচ্ছে। ওরা আসলে শ্রমিক স্বার্থে নয়, মার্কিন অথবা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই কাজ করে।

এছাড়া আর একটি ফ্যাক্টর এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কাজ করে। গার্মেন্ট শিল্প এলাকাগুলো ঘিরে ঝুট ব্যবসায়ীরা টিফিনের কন্ট্রাক্ট বা এই জাতীয় নানা ব্যবসা ও সুযোগ-সুবিধা মালিকদের কাছে থেকে আদায় করে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে কারখানার ম্যানেজমেন্টের মধ্যে কিছু দুর্নীতিবাজ লোকদের সঙ্গে মিলে একটি কায়েমী স্বার্থ গড়ে ওঠে। শ্রমিকদের পাওনা টাকা আত্মসাৎ করে। এই সব টাকা-পয়সা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে যেমন দ্বন্দ্ব থাকে- তেমনি মালিক, ম্যানেজমেন্ট বা কারখানার ওপর হামলা হয়। এদের ভাগাভাগির সঙ্গে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন যুক্ত হয়ে যায়। এরা সবাই শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগায়।

এই সব কায়েমী স্বার্থবাদী মহল কখনও শুধু শ্রমিক আন্দোলন বানচাল করার জন্য, মালিকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের সুবিধা আদায় করার জন্য অথবা দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করে নিজেদের বা তাদের বিদেশি প্রভুদের স্বার্থ হাসিলের জন্য অরাজকতার দিকে শিল্পকে ঠেলে দেয়। কখনও কখনও কিছু মালিক নিজেরাই কারখানায় ভাঙচুর ও আগুন লাগাবার উস্কানি দেয়। শ্রমিকদের ওপর দোষ চাপিয়ে তাদের পাওনা শোধ না করেই ছাঁটাই-বরখাস্ত করে। কম মজুরিতে নতুন শ্রমিক নিয়োগ করে। মালিকের যে ক্ষতি হয় তার চেয়ে বেশি টাকা সে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে আদায় করে। একজন সত্যিকার শ্রমিক সাধারণত কখনও ভাঙচুরের মধ্যে যায় না। সে জানে তার রুটি-রুজি নির্ভর করে শিল্পে উৎপাদন চালু থাকার ওপর।

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আরও কিছু ঘটনার যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায়। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় এসেছিলেন। উনি গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য মায়াকান্না করে সরকার ও মালিকদের হুমকি দিয়ে গেছেন। যে আমেরিকার নিজ দেশে কোটি মানুষ বেকার, লাখো মানুষ ফুড স্ট্যাম্প বা নোঙ্গরখানার খাবার খেয়ে বাঁচে, যারা ইরাকে-আফগানিস্তানে নারী-শিশু-বৃদ্ধকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, তাদের মুখে এ সব কথা শোভা পায় না। শ্রমিকস্বার্থে ‘আইএলও’ কাজ করে বলে যুক্তরাষ্ট্র আইএলও ছেড়ে দিয়েছিল। এর মাঝে আইএলও-র পাওনা পরিশোধ না করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা বকেয়া রেখে আইএলও-কে অচল করতে চেয়েছিল। সেই আমেরিকা আজ শ্রম আইন এবং আইএলও সনদ কার্যকর করতে গার্মেন্টে কমপ্লায়েন্স-এর কথা বলে কোন মুখে! ইরাকে মানববিধ্বংসী অস্ত্র আছে, আফগানিস্তানে ইসলামী জঙ্গী (তালেবানদের জন্ম ও ট্রেনিং দিয়েছিল আমেরিকা এবং এ কাজে পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছিল মার্কিনীরা) রয়েছে, লিবিয়াতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে- এমনই নানা অজুহাত দেখিয়ে মার্কিনীরা এসব দেশ দখল করেছে, বর্বর গণহত্যা চালিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও তারা কমপ্লায়েন্সের নামে অথবা মানবাধিকার, শিল্পশ্রম, দুর্নীতি ইত্যাদি অজুহাত সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তরিকভাবে এসব সমস্যার সমাধান চাইত তাহলে কিছু বলার থাকত না। ১৯৭৪ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য-অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরের পথে খাদ্য শস্যবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগর থেকে ঘুরিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল। ওই পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে মার্কিন স্বার্থে বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। আজ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কমপ্লায়েন্স (শ্রমিকদের প্রাপ্য অধিকার ও সুযোগ সুবিধার বাস্তবায়ন), মানবাধিকার, শিশুশ্রম, দুর্নীতি ইত্যাদি প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিনীরা প্রকাশ্যে টিক্কা চুক্তি, স্ট্র্যাটেজিক (সামরিক) অংশীদারত্ব চুক্তি ও সংলাপ, তেল-গ্যাসের সামুদ্রিক এবং স্থলভাগের ব্লকগুলো মার্কিন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া, বাংলাদেশের সমুদ্রে সম্ভাব্য নৌবাহরের আনাগোনা এবং মার্কিন নৌ-শক্তি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

প্রাক্তন গার্মেন্ট শ্রমিক এবং পরে আমেরিকান এক এনজিওর কর্মি আমিনুল হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা করেছি আমরা। সম্প্রতি আশুলিয়া এবং কাঁচপুরে গার্মেন্ট শ্রমিক কামরুন্নাহার ও সনিয়াকে হত্যা করা হয়। খোদ হিলারি আমিনুল হত্যাকান্ডের নিন্দা করেছেন কিন্তু অন্যরা যারা গামেন্টে কর্মরত থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন তাদের কথা বলেননি। গামেন্ট শ্রমিকদের ওপর অতীতেও দমন-পীড়ন হয়েছে। এখনও হচ্ছে। হাজার হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে, ছাঁটাই-বরখাস্ত-গ্রেফতার হয়েছেন অনেকে, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতা এ্যাডভোকেট মন্টু ঘোষকে গ্রেফতার করে ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়েছে, নারী শ্রমিকদের গ্রেফতার করে দৈহিক নির্যাতন করা হয়েছে, মোশরেফা মিশুসহ শত শত কর্মীকে গ্রোফতার করা হয়েছে। তখনকিন্তু শ্রমিক-দরদী হিলারি টু শব্দটিও করেননি। লক্ষ্য করার বিষয়, হিলারি ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিলেন। সেই দিনই মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিজিএমইএ অফিসে গার্মেন্ট মালিকদের সঙ্গে দেখা করে অনেক কথা বললেন। তার দু’একদিন পরেই আশুলিয়ায় এই পরিস্থিতি।

কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যেতে পারে?

প্রথমত, শ্রমিকদের অসন্তোষ যাতে কোনও স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগাতে না পারে সে জন্য শ্রমিকদের সমস্যাগুলো সহানুভূতির সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। শ্রমিকের দু:খ ও প্রয়োজনের বিষয়টি যাতে মালিকদের শান্তিপূর্ণভাবে জানানো যায় সে জন্য দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন যা দেশের আইন দ্বাড়াও সমর্থিত তাকে অবাধে কাজ করতে দিতে হবে। শ্রমিকদের দাবিকে যাতে সংঘাত ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হওয়ার পথে ঠেলে দেওয়া না হয় সে জন্য আইনের বিধান অনুসারে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিস্পত্তির উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

যে সব দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল এবং কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নানা অপতৎপরতায় লিপ্ত- সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, তাদের দমন করতে হবে, শ্রমিকদের নয়।

দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ও শিল্পের স্বার্থে অবিলম্বে শ্রমিক-মালিক আলোচনা শুরু করা উচিত।

অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ও কারখানা পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা দরকার। শ্রমিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে এবং দেরি না করে কারখানাগুলো চালু করতে হবে।

মনজুরুল আহসান খান: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি।

Responses -- “গার্মেন্ট মালিকদের ধর্মঘট”

  1. Sm Mashiur Rahman

    সবাইকেই সহনশীল হতে হবে। এত দিন শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছেন। এখন মালিকেরা করছেন। শ্রমিক ভাই-বোনদের বোঝা উচিত যে আমরা গরিব। আমাদের একদিন বসে থাকা মানে একদিন উপোষ থাকা । আর মালিকেরা লাভ-বঞ্চিত হন মাত্র । তাদের লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন এবং সে লক্ষ্যেই কিন্তু অর্থ বিনিয়োগ করেন। আমরা খেটে-খাওয়া মানুষ। আমাদের লক্ষ্যে কিছু ডাল-ভাতের ব্যবস্থা। যেহেতু মেধা, অর্থ সবই তাদের- সেহেতু তাদের মুনাফা অর্জনের পরিমাণ বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা চাইলেই তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিতে পারব না। আলোচনার মাধ্যমে যা করা সম্ভব তা জোর-জুলুমের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের উপার্জনের অন্যতম এই মাধ্যমকে যে বা যারাই অস্থিতিশীল করে তুলছে, তাতে দেশের সার্বিক অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। আর আমরা খেটে-খাওয়া মানুষগুলোই তার পরিণতি ভোগ করি।

    সুতরাং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। মালিক বাঁচলে আমি-আপনি কাজ করে খেতে পারব। আর কারখানা বন্ধ রেখে, বেকার-অভুক্ত থেকে লাভ নেই। মালিক ভাইয়েরাও একটু সচেতন হোন। যে শ্রমিকরা কাজ করছেন আপনার প্রতিষ্ঠানে, তারা তো আমাদের দেশেরই মানুষ । এ দেশের মানুষের উন্নয়ন না হলে কি সার্বিকভাবে আপনার বা দেশের উন্নয়ন সম্ভব ?? একজন সৎ ব্যবসায়ী কেয়ামত দিবসে শহীদের সঙ্গে থাকবেন- এ কথাটা একজন মুসলমান হিসেবে আপনাদের বিশ্বাস করা উচিত। তাহলে আসুন সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি। কষ্ট করলে জাতি একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই দাঁড়াবে। সে বিশ্বাস কি আমাদের মধ্যে নেই ???????????????????????????????

    Reply
  2. shikdar

    গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র শুরু হয় এ শিল্পের যাত্রার শুরু থেকেই । এ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া মহাদেশীয় প্রতিনিধি এদেশের গার্মেন্টস শিল্পের উপর একটা ডকুমেন্টরী প্রচার করে আমাদের দেশের বায়ারদের কাছে – তা হল বাংলাদেশে প্রচুর শিশুশ্রমের বিনিময়ে তারা অনেক কম দামে তোমাদের কাছে পোষাক বিক্রি করছে । তখন প্রফেসর ইউনুস তদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তোমরা যাদেরকে শিশু বলে এ শিল্পের অগ্রযাত্রাকে রহিত করতে চাচ্ছ, তারা মূলত আমাদের দেশের বাস্তবতায় এক একটা পরিবারের কর্মের হাতিয়ার। এই অযুহাতে যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাো এবং এই অসংখ্য কর্মী যদি বেকার হয় তাহলে দেশটাতে চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটবে এবং সেটা হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লংঘন । তারা প্রফেসর ইউনুসের বক্তব্যের প্রমাণ পেয়েছিলেন বলেই আজকে এ শিল্পটা টিকে আছে । যারা শ্যমিক অসোন্তষের বাহানা তুলছেন, তারা কারা ? বাস্তবে একটা কারখানার ভেতের প্রবেশ করে দেখুন, অসংখ্য শ্রমিকরা বলছে, যারা এভাবে লাঠী শোঠা নিয়ে আনছে, তারা কারা ? তাদেরকে এসব শ্রমিকরা কোনদিন দেখেন নাই । এসব তথা কথিত শ্রমিকদের অন্দোলনের সাথে যারা একাত্মতা ঘোষণা করেছেন, তাদের পরিচয় কি ? একটু গভীরে যেয়ে দেখুন, সেই সময়ে যারা ঐ এ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া মহাদেশীয় প্রতিনিধিকে ডকুমেন্টরী তৈরী করতে এবং প্রচার করতে সহায়তা করেছিলেন , তারা ।
    একজন শ্রমিক বলেন, আমি বেকার হলে কি এরা আমাকে বাসায় কাজের বুয়া হিসেবে দেখতে চায় ? আমাকে গরম খুন্তির ছ্যাকা না দিতে পারলে বা উনাদের লোলুপ কামনার শীকারে পরিণত না করলে উনাদের বুঝি শান্তি লাগছে না ?
    আমি এই শ্রমিকের একমত পোষন করে বলতে চাই , এখুনি যদি এসবরে নাটের গুরুদের ধরে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে ঐ গোষ্ঠী কিন্তু থেমে থাকবে না। তারা আগামী কয়েকবছরের মধ্যেই এ শিল্পকে মৃত্যুকূপে ডুবিয়ে দিবেই । একটা মহলের আসল উদ্দেশ্য কিন্তু সেটাই ।

    Reply
  3. কামাল

    সিপিবির জনাব মঞ্জুরুল আহসান খানের দেওয়া সমাধানের উপায়গুলো পড়ে (কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যেতে পারে) বোঝা গেল না তিনি কোন পক্ষের হয়ে এই সমাধানগুলো প্রস্তাব করেছেন। মালিকপক্ষের হয়ে নাকি শ্রমিকপক্ষের হয়ে? যদি শ্রমিকপক্ষের হয়ে করে থাকেন তাহলে প্রশ্ন, কেবল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার আদায় কখনও হয় কি? অধিকার কি কেউ কাউকে এমনি এমনি দেয়? পৃথিবীর ইতিহাসে কখনও কি এমনটা হয়েছিল? শ্রমিকের অধিকার আদায়ের জন্য তাকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে বললেন না কেন তিনি? তবে কি এই সব সমাধানের প্রস্তাবগুলো আপনি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে করলেন? কিন্তু সেখানেও যে আরেক প্রশ্ন রয়ে যায়: যে সমাজে প্রকট বৈষম্য বিরাজমান সে সমাজে নিরপেক্ষ বলে কোনও কিছু আছে কি?

    Reply
  4. কামরুল আখন্দ

    মঞ্জুরুল আহসান সাহেব আমার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন একজন। রাজনীতি করেন, তার চেয়ে বড় যেটা, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা যেমন একটু সুযোগ পেলেই শান-শওকতে গা ভাসিয়ে দেন, তিনি সে রকম নন। আমার জানা মতে, তিনি এখনও মেহনতি মানুষের জন্য পায়ে হেঁটে ছাতা হাতে নিয়ে সমাবেশ সথলে আসেন। আমি তার বক্তব্যের দারুণ ভক্ত। তবে এখানে তাঁর লেখা পড়ে কয়েকটি বিষয় চোখে পড়লো যেটা উল্লেখ না করলেই নয়।

    প্রথমত, প্রবন্ধটিতে একচেটিয়া আমেরিকা-বিদ্বেষ ঝড়িয়ে গেছেন তিনি যেটাকে বরাবরের মতোই আমার কাছে একটু বাহুল্য মনে হয়েছ। এমন না যে, এই শ্রমিক অসন্তোষে আমেরিকা ইন্ধন দিয়েছে। (পাঠকরা আমাকে আবার আমেরিকার বন্ধু বা দালাল ভাববেন না, সে রকম হওয়ার চেয়ে আত্মহত্যা করা অনেক স্রেয়, আমেরিকা কি সেটা মঞ্জুরুল আহসান সাহেবেরর মতো আমরাও বুঝি। আমেরিকা হলো “দুই পাশের করাত” নিচে টানলেও কাটে, উপরে টানলেও কাটে, অর্থাৎ যে জাতির মরার সাধ হয়েছে সেই জাতির শাসকরাই আমেরিকার সঙ্গে ভুল করে মোহে পড়ে সম্পর্ক করে)।

    দ্বিতীয়ত, ১৯৭৪-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগর থেকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলে- এ ধরনের অভিযোগ ডকুমেন্টারিলি করা উচিত। আমি অনেকের কাছেই এই কথা শুনি, কিন্তু এর কোনও এভিডেন্স ইন্টারনেট বা বইপত্র ঘেঁটে পাইনি। জনাব মঞ্জুরুল আহসান সাহেব এটার কোনও রেফারেন্স দিতে পারলে আমি উপকৃত হতাম। আরেকটা কথা, ১৯৭২ সালের যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশ আমেরিকা ছাড়া রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয়া দেশ এবং কিঊবা থেকেও সাহায্য পেয়েছে। এর সঠিক ব্যাবহার করলে আমেরিকার এক জাহাজ পরিমাণ খাবারের অভাবে ৭ কোটি মানুষের দেশে দুর্ভিক্ষ হতো না। বরং বঙ্গবন্ধুর চ্যালা-চামুন্ডা, আর চামচাদের দুর্নীতিতে দেশ ভরে না গেলে সেই বাংলা আজ মালয়েশিয়ার মতো হতো। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর নিজের মুখে বলা “ সবাই পাইল সোনার খনি আর আমি পাইলাম চোরের ক্ষনি,“ এই কথাটিও আমি মঞ্জুরুল আহসান সাহেবেরর মুখে এক টিভি টক শোতে শুনেছিলাম।

    তৃতীয়ত, মালিকপক্ষের শোষণ, শ্রমিকদের অমানবিক বেতন, দ্রব্যমুল্যের লাগামহীন উর্র্ধ্বগতি, সামাজিক জীবনের অস্থিরতা- এ সবই সাম্প্রতিকের শ্রমিক অসন্তোষের কারণ। কিন্তু পাশের দেশ ভারতের ইন্ধনে যে আমাদের দেশের গার্মেন্টস শিল্পে এই অস্থিরতা চলছে, সেটা তিনি কি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন? নাকি তিনি এ ব্যাপারে একবারেই জানেন না? একটা চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রও জানে আমাদের দেশের এই গার্মেন্টস খাত ধ্বংস হলে কোন দেশ লাভবান হবে। তাই আমাদের এই বৃহৎ রফতানি খাতকে ধ্বংস করার যে চক্রান্ত চলছে তাতে একটা প্রতিবেশি দেশের হাত যে থাকবে তা সহজেই বোঝা যায়। যেটা বিএনপি প্রকাশ্যেই বলে দিয়েছে।

    আমার কথা হলো, আমাদের এখন সময় এসেছে গার্মেন্টস খাতকে টিকিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার। এ জন্য সবার আগে মালিকপক্ষের সীমাহীন শোষণ বন্ধ করতে হবে, শ্রমিকের বেতন অবিলম্বে নুন্যতম ৬০০০ টাকা করতে হবে। এ বছরের ভিতরেই তাহলে দেখবেন আমাদের এই সেক্টরটা কেমন সুন্দর চলতে পারে।

    আরে ভাই মালিক, আপনি ১০০ টাকা লাভ করতে চান কেন? আমার স্রমিক ভাইদের একটু বেশি মজুরি দিয়ে আপনি ৪০ অথবা ৫০ টাকা কামান। দেখবেন আর কখনও শ্রমিক অসন্তোষ হবে না। উল্টো আমার শ্রমিক ভাইয়েরাই আপনার ফ্যাক্টরি রক্ষা করবেন। ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া অথবা শ্রীলংকার গার্মেন্ট শ্রমিকের মজুরির তথ্য নিন। একটু কম লাভ করুন। একটু কম শোষণ করুন।

    আর পার্শবর্তী দেশের ইন্ধন!! আমার মনে হয়, উপরের সমস্যার এ রকম সমাধান হয়ে গেলে আর ইন্ধন দিয়েও তেমন ফায়দা লাভ করতে পারবে না ওরা। কারণ এরা সাধারণত একটা দেশের স্বার্থের বিরোধী কাজ করতে গিয়ে এ রকম ক্ষোভ বা অসন্তোষকে পুঁজি করেই আসে। আর সর্বোপরি এটা দেখার দায়িত্ব সরকারের। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগের সরকার তা পারবে। কারণ ভারত তো তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু।

    Reply
  5. Salauddin

    বিজিএমইএ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে পাঁচ হাজার দু’শ গার্মেন্টস ছিল। যা আজকে এসে দাঁড়িয়েছে তিন হাজারে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভাবতে গেলে যে কোন পাগলও বলবে – গার্মেন্টসের অবস্থা বেশ খারাপ। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী তো বটেই, খোদ বর্তমান বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে নিয়ে ভাবুক মানুষরা বলছেন- বাংলাদেশের গার্মেন্টসের অবস্থা বেশ ভালো। আর যদি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ ভালোকে ব্যাখ্যা করি, তাহলে বলতে হয়- বিশ্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে এ শিল্পে। ব্যাপারটি কেমন কেমন লাগে তাই না? তবে ব্যাপারটি বেশ গর্বের এবং ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক অবশ্যই।

    অপরদিকে কখনও এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে কিনা জানি না- সে হারিয়ে যাওয়া অথবা ধংস হয়ে যাওয়া আনুমানিক আড়াই হাজার গার্মেন্টসের কী হলো অথবা তার মালিকদের কী হয়েছিল? খোদ বিজিএমইএ এ নিয়ে কোনও গবেষণা অথবা কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়টা নিয়ে পিএইচডি হয়েছে কি না জানি না। যা হারিয়ে যায় তাকে নিয়ে এ দেশে মাথা ঘামানোর মতো লোকজন কই? তবে ভবিষ্যতে এ শিল্পের স্বর্থেই এই গবেষণাটি হওয়া উচিত।

    Reply
  6. azharul

    বিজিএমই-র নির্দেশে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ। রহস্য এখানে। বিজিএমই মানে মালিকদের সংগঠন। তারা রাজনীতি ভালোভাবেই জানেন। সুতরাং এটার কোনও সমাধান নাই। দেশটাকে অকার্যকর করে একে সিকিম বানানোর পাঁয়তারা চলছে। আর কিছু নয়।

    Reply
  7. shourav

    হ্যাঁ, এটাই সত্যি যে দুটো পক্ষের একসঙ্গে বসে সমস্যা নিয়ে আলাপ করা উচিত। কিন্তু সমস্যা এখানেই যে দু’পক্ষই আত্মকেন্দ্রিক। নেতারা শুধু নিজেদের স্বার্থের কথাই ভাবেন। মনের দিক থেকে এরা সবাই দরিদ্র।

    Reply
  8. লিটন

    আপনার কথার সঙ্গে একমত। গার্মেন্ট মালিক ও শ্রমিকদের আলোচনায় বসে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে।

    Reply
    • Mahbubul Islam

      সমস্যার সমাধানের জন্য আপনার প্রস্তাবনার সঙ্গে আমি একমত।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—