পদার্থবিদ্যায় ও রসায়নে এই বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার ওন্টারিওর ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর সহযোগী অধ্যাপক ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেকের অধ্যাপক ফ্রান্সেস এইচ আর্নল্ড ।

ছয়টি ক্যাটাগরিতে প্রতি বছরই নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এটা নিয়ে আলোচনা করার তেমন কিছু নেই। তবে এই বছর এটি নিয়ে সারা বিশ্বে বেশ জোরেসোরে কথাবার্তা চলছে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার কয়েকদিন আগ থেকে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদেন নিয়ে আলোচনা চলছিল। বিজ্ঞানে নারী ও নারীকেন্দ্রিক বিজ্ঞান এবং তার সম্ভাবনা কতোটা প্রয়োগিক হয়েছে তা নিয়ে পুরুষ গবেষকদের দৃষ্টি ভঙ্গিতে আলো এসেছে।

১৯০৩ সালে প্রথম নারী হিসাবে ম্যারি কুরি এবং ১৯৬৩ সালে জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মারিয়া গ্যোপের্ট-মায়ার দ্বিতীয় নারী হিসেবে পদার্থে নোবেল পাওয়ার প্রায় ৫৫ বছর পর নোবেল পেয়ে স্ট্রিকল্যান্ড পদার্থে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে তৃতীয় নারী হিসাবে তার নাম উঠে আসে।

স্ট্রিকল্যান্ড হয়তো তিন দশক আগে তার গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কিন্তু বর্তমানের চিত্রে নারীদের বিজ্ঞান সংখ্যালঘুৃর সারিতে গিয়ে ঠেকেছে।

প্রশ্ন হলো সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের জয়জয়কার যখন হচ্ছে, নারী নেত্রীরা যখন ফেমিনিজম নিয়ে ব্যস্ত, তখন তারা বিজ্ঞান গবেষণায় পিছিয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞান গবেষণায় নারীদের উৎসাহ কিংবা পুরুষদের সমকক্ষতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কোথাও করা হচ্ছে না। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যতীত বিজ্ঞান গবেষণায় গত কয়েক দশকে নারীদের সাফল্য তেমন লক্ষ্যণীয় নয়। এর মূল কারণ, নারীরা বিজ্ঞানে ফিরছে না।

যারা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছে তারা কেবল সনদ নির্ভর চাকুরির জন্য পড়াশুনা করে নিজেদের গুটিয়ে ফেলছে। ফলে বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারীরা কয়েকগুণ পিছিয়ে গেছে।

তাহলে কি নারীদের বিজ্ঞান নিয়ে চিন্তাশীলতা পুরুষের চেয়ে কম? নাকী নারীদের বিজ্ঞান ফোবিয়ায় আক্রান্ত?

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়া বেশ প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বে পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীদের এগিয়ে চলার স্পৃহা বিজ্ঞানে গিয়ে নিস্পৃহ হয়ে যাওয়ার হেতু কী তা অনুধাবন করার সময় বুঝি এসেছে।

সারা বিশ্বে মোট গবেষকের সংখ্যা ৭৮ লাখ। সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাথমেটিকস যাকে সংক্ষপে এসটিইএম বা স্টেম, সেখানে নারী গবেষকরা দিন দিন এতোটা কমে যাচ্ছেন, যা অন্য পেশায় এই হারে দেখা যায় না।

সারা বিশ্বে ফলপ্রসূ উন্নয়ন কৌশল ঠিক করতে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো সম্প্রতি ‘বিজ্ঞান লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০’ বিষয়ক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে বলা হচ্ছে, ৫৩ শতাংশ নারী যারা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন, তাদের মধ্যে থেকে ৪৩ শতাংশ পিএইচডি করার সুযোগ পাচ্ছেন।  আর পিএইচডিধারীদের মধ্যে তা হ্রাস পেয়ে গবেষক হিসেবে থাকছে ২৮ শতাংশ।

তবে মজার বিষয় হলো, ভৌগোলিক অক্ষরেখায় সেই সংখ্যা আর থাকছে না। পূর্ব ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারীরা। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানসর্ম্পকিত কর্মসংস্থানে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপে নারী গবেষক রয়েছেন ৩৩ শতাংশ। এরমধ্যে ফ্রান্স ও জার্মানিতে ২৫ শতাংশেরও কম নারী গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন।

পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া সবার চেয়ে এগিয়ে। যেখানে নারী গবেষক সংখ্যা মোট গবেষকের ১৮ শতাংশ আর জাপানে মাত্র ১৫ শতাংশ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো নারীরা কেন বিজ্ঞানে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ছেন না? কেন নারীদের একজন পুরুষ ছাত্রের চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা দেয়ার পরও বিজ্ঞানে প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে না?

ইউরোপের শতকরা ২০ ভাগ অধ্যাপক নারী সদস্য হলেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তার সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে ইউরোপের গবেষণা সাময়িকীগুলো আগেভাগে আঁচ করে সর্তকর্তা জারি করছে।

এরপরও থেমে নেই। ক্রমে ক্রমে বিজ্ঞান বিমুখ নারী, পুরুষকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থার গ্যাড়াকলে বিজ্ঞান সম্প্রদায়ের কাছে নারী থেকে যাচ্ছে অসম সমীকরণে।

নারীরা কতটা পিছিয়ে তা একটা পরিসংখ্যান থেকে আঁচ করা যায়। ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত (অক্টোবর ৩, ২০১৮) ৯৩১ জন তা পেয়েছেন। যার মধ্যে নারী নোবেল জয়ীর সংখ্যা মাত্র ৫০।

এই পঞ্চাশ জনের মধ্যে আবার ২১ জন নারী নোবেল পুরস্কার পেয়েছে ২০০০ সালের পর। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে নোবেল জয়ীদের তালিকায় মাত্র ৯ ভাগ নারী সদস্য।

দীর্ঘদিন থেকে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে মেয়েরা ভৌত বিজ্ঞানে ভালো করতে পারে না। তারা পদার্থ, রসায়ন, গণিত ও জৈব বিজ্ঞানে মেয়েরা নিজেদের মেলে ধরতে চায় না। উচ্চশিক্ষালয়গুলো এইসব বিভাগগুলোতে হাতেগোনা মেয়ে অংশ গ্রহণ করছেন।

বিশ্বের এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নারীরা শিক্ষাদীক্ষায় গত কয়েক দশকের চেয়ে কয়েকগুণ এগিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ বিভাগগুলোতে নারীরা শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন। তবে তারা বিজ্ঞানে যেসব বিভাগগুলোতে এগিয়ে তার মধ্যে বায়োলজিক্যাল সায়েন্স সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে অসম্ভব ভাল করছেন।

প্রতি বছর দেশের চিকিৎসাবিদ্যায় যারা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে তাদের মধ্যে সিংহভাগই নারী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মেয়েরা মূলত ভৌত বিজ্ঞানের চেয়ে ফলিত বিজ্ঞানে নিজেদের সেরাটা প্রদর্শন করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে দেখা যাচ্ছে, নারীরা নিজেদের ক্যারিয়ার গবেষণায় গড়ছেন না। মেয়েদের বায়োলজিক্যাল দুর্বলতার চেয়ে মানসিকতায় ভঙ্গুরতা তাদের এই পথে এগিয়ে যেতে মন্থর গতি এনে দিচ্ছে।

নারীদের বিজ্ঞান গবেষণা ভিত্তিক ক্যারিয়ার থেকে পিছিয়ে থাকার অন্যতম একটি কারণ হলো, যৌন হয়রানি। অন্য পেশার মত এই পেশায় যৌন হয়রানি ভয়ানক আকার ধারণ করেছে।

সম্প্রতি এক যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অ্যাকাডেমিক সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিসিনের গবেষণার তথ্য মতে, সেই দেশের শতকরা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

যৌন হয়রানি রোধ করতে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট’ বিভাগ খোলা হলেও সেটা দিয়ে যৌন হয়রানি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে আন্তর্জাতিক সাময়িকীদের তথ্য।

এছাড়া নারীদের পুরুষদের বেতন-বৈষম্য অন্যতম একটি কারণও বটে। অনেক সময় দেখা যায়, বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একজন পুরুষ সহকর্মী যা বেতন পান, তার চেয়ে ২০-৩০ শতাংশ কম বেতনে চাকরি করতে হয় নারীদের।

দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা এই বৈষম্য বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রগুলোতে এখনো বিদ্যমান।

অনেক সময় ঘর সামলানো নারীদের চিরায়িত কাজ হলেও বিজ্ঞানের প্রতি একনিষ্ঠতা ও দীর্ঘ সময় কাজ করার মানসিকতার চিড় ধরায়।

তাই নারীদের বিজ্ঞানমুখী ক্যারিয়ারে উৎসাহ দিতে প্রথমে পুরুষ ও নারীদের মধ্যে লিঙ্গ দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। তাদের অর্জনকে যেমন মূল্য দিতে হবে তেমনি তাদের সফলতা উদযাপনও করতে হবে।

নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে জার্মানিতে ২০১৩ সালে শতকরা ৩০ ভাগ নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সংরক্ষন করার বিধান চালু হয়। জাপানে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গবেষণা ফান্ড বরাদ্দের সময় নারী গবেষক ও কর্মচারী নিয়োগের নিয়ম মেনেই বরাদ্দের নিয়ম আছে।

শুধু লিঙ্গ বৈষম্যের অজুহাতে অন্যন্য পেশার মত সায়েন্স সম্পর্কিত ক্যারিয়ারগুলোতে নারীদের বেতন পুরুষদের বেতনের পার্থক্য নারীদের গবেষক হিসেবে স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্তরায়। তাই এই বিষয়ে গবেষণায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং পুরুষদের উদারতা দেখাতে হবে। নারীদের মেধা কখনো পুরুষদের চেয়ে কম নয়। তাদের যোগ্যতায় অর্জিত পদগুলো তাদের দখলে দিতে হবে।

নারীদেরকে বুঝতে হবে, পুরুষরা যদি কেবল বিজ্ঞানী, গবেষক হয়, তাহলে তারা কখনো পূর্ণতা পাবে না। ঘর সামলানোর অজুহাত নয়, পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিজ্ঞানটা এগিয়ে নেয়ায় নারীর ব্রত হোক এমন প্রত্যাশা করি।

নাদিম মাহমুদজাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—