এক.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিজ্ঞানের সবচেয়ে অবদান আমার কাছে মনে হয়, জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড বা ডিএনএ মডেল আবিষ্কার। আর এর মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব পরিবর্তন শুরু হয়। মানুষের খাদ্য থেকে রোগবালাই সনাক্তকরণ ও তা প্রতিরোধে নিত্যনতুন ওষুধ তৈরিসহ অনেককিছুই সম্ভব হয় ওয়াটসন ও ক্রিকের বিজ্ঞানে দেয়া সেরা উপহারের বদৌলতে। অনুজীব বিজ্ঞান বা মলিকিউলার বায়োলজির মাদার হিসেবে বিজ্ঞানীরা ডিএনএ নিত্যদিনই প্রশস্ত করে চলছেন।

কয়েক দশক ধরে, মানুষ-পশু-পাখি-উদ্ভিদের জিনম রহস্য বা জেনিটিক ম্যাপ উম্মোচন করে এটাই প্রমাণ হয়েছে যে, ডিএনএ জীবের সকল ট্রেটইস বা বৈশিষ্ট্য ধারক। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে বিশ্ব যখন হুমকির মুখে ঠিক তখনই বিজ্ঞানীদের মাথায় ডিএনএ প্রকৌশল বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে তা সমাধানের ব্যাপারটি মাথায় এলো। ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে হারব্রেট বয়ার ও স্ট্যানলি কোহেন জেনেটিক মডিফাইড অর্গানিজম বা জিএমও বিষয়ক ধারণা দিয়েছিলেন, যা থেকে আজ অবধি আমরা মাছ, মাংস, সবজি, শস্যের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে আমাদের চাহিদা মেটানোর লড়াই অব্যাহত রেখেছি।

জিএমও খাদ্যের উৎকর্ষতায় আমরা যে ডিএনএ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছি, তার সবই সম্ভব হয়েছে ‘জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা জিন প্রকৌশল বিদ্যার যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে। আজ আমরা এই জিন প্রকৌশলকে কাজে লাগিয়ে রোগ-বালাই বিরুদ্ধে লড়াই করছি। নতুন একটি বিশ্বকে ভবিষৎ প্রজন্মের কাছে উপহার দিয়ে চলেছি। এই যে আমরা ডায়াবেটিস রোগ হলে যে ইনসুলিন নিই, তা কিন্তু আমাদের হাতের নাগালে এনে দিয়েছে জিন প্রযুক্তি।

নব্বই দশকের পর থেকে আমরা ফলমূল বর্ধিতকরণ থেকে শুরু করে নিজেরাই তার স্বাদ কেমন হবে তা নির্ধারণ করে দিচ্ছি। ১৯৯৮ সালের দিকে আমরা এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিন বাবা-মা-বাবা জিন একত্রিকরণ করে প্রথমবারের মানব সন্তান হতেও দেখেছি। যা এর আগে কখনো সম্ভব হয়নি। অ্যাকোয়ারিয়ামে যে রঙ্গিন মাছগুলো আমাদের মনের আনন্দ যোগান দিয়ে যাচ্ছে, তাও জিন প্রযুক্তিরই ফসল।

ডিএনএ যে চারটি নিউক্লিওটাইড বা রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি, এ চারটি উপাদানের নাড়াচাড়া করালেই তৈরি নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যর প্রোটিন তৈরি হয়। আর জিন প্রকৌশলে আমরা যে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছি তাহলো মেগানিউক্লিয়েজ, জিংক ফিঙ্গার নিউক্লিয়েজ (জেএফএন) এবং ট্রান্সক্রিপশন আক্টিভেটর লাইক এফেক্টর নিউক্লিয়েজ বা ট্যালেন।
ব্যাকটেরিয়া নি:সৃত এনজাইম যাকে আমরা রেস্টিকশন এইনজাইম বলি, তা দিয়ে ডিএনএ কোনও নিদিষ্ট অংশ কেটে অন্য একটি অংশ সেখানে এনে জোড়া দেয়ার প্রযুক্তি হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তি সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও জটিলতার অভিযোগ গবেষকদের মুখে মুখে ছিল। তবে তা সমাধানের লড়াই বিজ্ঞানীদের অব্যাহত ছিল।

দুই.

আমরা এক সময় কল্পবিজ্ঞানের বা সায়েন্স ফিকশনের বিভিন্ন গল্পে পকেটে রাখা হচ্ছে কম্পিউটার। সায়েন্স ফিকশনের এসব ধারণা যেন বাস্তবে রূপান্তর শুরু করেছে। বর্তমানে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় কম্পিউটারকে কয়েক মিলিমিটারের যন্ত্রে পরিণত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া এক সময় আমাদের মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলোর মধ্যে ছিল, ইস আমরা যদি আইনস্টাইন কিংবা নিউটনের মতো মেধাবী হতে পারতাম, কিংবা দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলা চোখ কিংবা মানুষের কোনও অঙ্গ নিজেরাই তৈরি করতে পারতাম, রোগবালাই মুক্ত মানব জীবন উপহার পেতাম অথবা আমরা যদি চিরসবুজ বা এভারগ্রিন হতে পারতাম তাহলে কতই না খুশি হতাম?

আমাদের এই কল্প বিজ্ঞানের চিন্তাগুলোকে ঠিক বাস্তবিক রূপ দেয়ার সময়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন গবেষকরা। ২০১২ সালের আগেও আমরা যেমন এই বিষয়গুলোকে কেবল নিজেদের ভ্রান্তিবিলাস মনে করে দু:খ পেতাম, তার দিন মোটামুটি শেষ হয়েছে।

আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন, একবিংশ শতাব্দীর এই দিনে বিজ্ঞান আমাদের এমন একটি আর্শীবাদ এনে দিয়েছে যা দিয়ে আমরা ইচ্ছে করলে, মানবভ্রুণ সম্পাদনা বা নিজেদের চাহিদামত বুদ্ধিমত্তা, শক্তিশালী ও আকার-আকৃতির তৈরি করতে পারবো। তাতে যে বিন্দু পরিমাণ বাধা থাকবে না তা ইতোমধ্যে গবেষকদের আবিষ্কারই বলে দিয়েছে। (তথ্যসূত্র ১)

অনেকটা কম্পিউটার গেইমের মতো। নিজেদের প্রয়োজনে পছন্দমত কোন চরিত্র তৈরি করা যেমন কঠিন কিছু নয়, ঠিক তেমন নতুন আবিষ্কৃত জিন প্রকৌশল প্রযুক্তি দিয়েও বাস্তব রূপায়নে প্যানডোরার বাক্স খুলতে যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতের মানুষ।

Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats যাকে আমরা ক্রিসপার (CRISPR) বলি। যদিও এর সাথে একটি সহযোগী এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাকে আমরা ক্যাস ৯ (Cas9)। দ্বৈতভাবে এই প্রযুক্তিকে বলা হচ্ছে ‘ক্রিসপার-ক্যাস ৯’। দেখতে যা কিনা জিংক ফিঙ্গার কিংবা ট্যানেলের মতো। এটি জিন প্রকৌশলের অনুরূপ একটি প্রযুক্তি। ২০১২ সালে বিজ্ঞানীদের সামনে এই প্রযুক্তি আসার পর এখন পর্যন্ত একবিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার বলে বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন।

তিন.

পৃথিবীর শুরু থেকে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের এক ধরনের যুদ্ধ চলে আসছে। ব্যাকটেরিয়াফাজ নামের এক ধরনের ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার জিনমে এক ধরনের ডিএনএ প্রবেশ করিয়ে ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেল। ব্যাকটেরিয়াফাজ বা ফাজ ভাইরাসের এই জিনটি প্রতিরোধক হিসেবে ব্যাকটেরিয়াও এক ধরনের অ্যান্টি ভাইরাস তৈরি করে। ব্যাকেটিরিয়ায় প্রবেশকৃত ভাইরাসের ডিএনএ প্রতিরূপী ডিএনএ সিকোয়েন্স যাকে ক্রিসপার বলা হচ্ছে, সেটি পরবর্তীতে ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ ধরনের এনজাইম ক্যাস৯ সহায়তা নিয়ে ক্ষতিকর ভাইরাসের ডিএনএকে ভেঙ্গে দেয়, ফলে ভাইরাসের আক্রমণের বিপরীতে ব্যাকটেরিয়া নিজেদের অস্তিস্ত্ব টিকে রাখতে পারে। ক্যাস ৯ ব্যাকটেরিয়ার ভিতর অনেকটায় ডিএনএ সার্জন হিসেবে কাজ করে।

ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের এই আদিম লড়াই থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পারে যে ব্যাকটেরিয়ার ক্রিসপার সিস্টেম প্রোগামেবল বা ক্রিসপার ডিএনএ সিকোয়েন্সকে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন করা সম্ভব হয়।

তবে অ্যাকাডেমিকভাবে ক্রিসপার-ক্যাস৯ বলতে বোঝানো হয়, কোন কাঙ্ক্ষিত সিকোয়েন্সকে যাকে আমরা গাইড আরএনএ বলছি। তা যখন কোন জিনোম (সমগ্র ডিএনএ) সিকোয়েন্সের সাথে মিলে যায়, তখন ক্যাস৯ এনজাইম, যাকে আমরা ধরে নিতে পারে এক জোড়া কাঁচি তা ওই ডিএনএকে কেটে দেয়।

ধরুন, আপনি একটি রোগের প্রোটিন কোন প্রাণীর দেহে সনাক্ত করতে চাচ্ছেন। আপনি যদি ওই প্রোটিনের জেনেটিক নকশা বা কোডন বা ডিএনএ সিকুয়েন্স বা ক্রিসপার জানেন, তাহলে ওই ডিএনএ সিকোয়েন্স ওই প্রাণীর দেহে প্রবেশ করানো হয়। পরবর্তীতে এই ক্রিসপার ওই প্রাণীর দেহে অনেকটা জিপিএস সিস্টেমের মতো কাজ করে। কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ সিকোয়েন্স যখন ওই প্রাণীর দেহেরে জিনোম (সমগ্র ডিএনএ) সাথে মিলে যায়, তখন আমরা সেই জিনের বিষয় জানতে পারি।

১৯৮৭ সালে ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়োশিজুমি ইশিনু ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রিসপারের ডিএনএ সিকোয়েন্স আবিষ্কার করলেও তিনি তার সঠিক ব্যবহার জানতেন না । পরবর্তীতে বিভিন্ন বিজ্ঞানী এই বিষয়ে কাজ করলেও ক্রিসপার প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যার্লিফোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনিফার ডোডানা এবং সুইডেনের ইউমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমানুয়েল শরপেনটির।

২০১২ সালে ১৭ অগাস্ট (অনলাইন ভার্সন ২৮ জুন) বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ এ ‘A Programmable Dual-RNA–Guided DNA Endonuclease in Adaptive Bacterial Immunity’ শীর্ষক এক গবেষণা নিবন্ধে ক্রিসপার-ক্যাস৯  শক্তিশালী এই প্রযুক্তির প্রথম ধারণা দেন। (সূত্র-৯)

তবে মজার বিষয় হলো, প্রায় ছয় মাস পর ‘সায়েন্স’ ২০১৩ সালের ৩ জানুয়ারি ইমানুয়েল শরপেনটির সাবেক ছাত্র ব্রড ইনস্টিটিউটের ফেং জাং ক্রিসপার-ক্যাস/৯ ব্যবহার নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তবে এই প্রযুক্তির মেধাস্বত্ত্ব নিয়ে তৈরি হয়ে ঝামেলা। ডোডানা ও শরপেনটির ২০১২ সালের তাদের প্রকাশনার আগেই মে মাসে দিকে পেটেন্টের (মেধাসত্ত্ব) আবেদন করে।  (সূত্র-৪-৫-৭)

পরবর্তীতে ফিং জাং এবং প্রায় এক ডজন গবেষক পেটেন্টের জন্য আবেদন করলে তিনি ২০১৪ সালে ক্রিসপার-ক্যাস বিষয়ক পেটেন্ট অনুমতি পান। ফলে ক্রিসপাস-ক্যাস৯ মূল নায়ক ডোডানা ও শরপেনটির বেকায়দায় পড়ে যান।

পেটেন্ট বিষয়ক একটি মামলা যুক্তরাষ্ট্রের আদালত করে ক্যার্লিফোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। দুই পক্ষের তুমুল লড়াই শেষে চলতি বছরের ১৯ জুন ক্রিসপার-ক্যাস৯ মেধাসত্ত্বধিকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালত জেনিফার ডোডানা ও ইমানুয়েল শরপেনটির নাম ঘোষণা করেন। (সূত্র: ৪)

ক্রিসপার-ক্যাস৯ বিজ্ঞানীদের কাছে এতটায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে গত ছয় বছরে প্রায় ১৪ হাজারের বেশি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে এ নিয়ে। যা এযাবতকালে বিজ্ঞানীদের নতুন কোনও গবেষণা কেন্দ্রিক সর্বোচ্চ প্রকাশনা।  তবে বিজ্ঞানী মহলে গত কয়েক বছর ধরে ক্রিসপার-ক্যাস৯ নোবেল পাওয়ার শোরগোল থাকলেও মূলত পেটেন্ট নিয়ে আদালতের রায় না আসায় তা দেয়া হয়নি বলেই মনে করা হয়।

তবে পেটেন্টের রায় পাওয়ার পর পুরো বিশ্বজুড়ে চলতি বছরে কেমিস্ট্রি কিংবা চিকিৎসাশাস্ত্রের নোবেল পুরষ্কার ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ ছিনিয়ে নিতে পারে ধারণা করা হচ্ছে।

চার.

ক্রিসপার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ২০১৩ সালে চীনের একদল গবেষক মানবদেহের অপ্রতিরোধ্য রোগ এইচআইভি বিরুদ্ধে ৪৮ শতাংশ সফল হয়। ২০১৬ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ক্রিসপার-ক্যাস৯ ক্লিনিক্যালি অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ডিএনএ’র মধ্যে মাত্র একটি নিউক্লিওটাইডের হেরফের হলেই জেনেটিক রোগ তৈরি হয়। প্রায় তিন হাজারের মতো জেনেটিক রোগ আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে সনাক্ত করেছেন।

 

ভ্রুণের জেনেটিক রোগের কারণে ইউরোপে ১৯ শতাংশ গর্ভপাত করা হয়। জেনেটিক ডিফেক্ট বা ত্রুটি সংশোধনের কোনও চিকিৎসা না থাকায় নিরাপদ পৃথিবী গড়তে ইউরোপের বাবা-মা এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেন বলে মনে করা হচ্ছে। হ্যানটিংটন, অ্যালঝেইমার, বর্ণাদ্ধতা, হেমোফিলিয়ার মতো জেনিটিক রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকায় আর্বিভুত হয়েছে ক্রিসপার-ক্যাস৯।

বার্ধক্যজনিত কারণে আমাদের এই পৃথিবীতে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। আমাদের দেহের ক্রোমোজোমের টেলোমেয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা বয়স্ক বা এজিং হয়ে পড়ি। ক্রিসপার-ক্রাস৯ সিস্টেম নিয়ে গবেষকরা ইতোমধ্যে টেলোমেয়ার মেরামত করে এজিং বা বয়স্ক হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে ফেলছে।

২০১৬ সালের এক গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, যে ক্রিসপার-ক্যাস৯ কে কাজে লাগিয়ে এজিং থেরাপি তৈরি করা সম্ভব, যা চিরসবুজ থাকার নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। (সূত্র-২)

ক্যান্সারের মত দূরারোগ্যব্যধি প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও জিন থেরাপির গবেষণাও চোখে পড়ার মতো। ক্রিসপার-ক্যাস৯ যে বিজ্ঞানের জাদুর কাঠিতে পরিণত হয়েছে তাতে কারও দ্বিমত নেই। অ্যানিমিয়া থেকে শুরু করে স্তনক্যান্সার প্রতিরোধে ডিএনএ প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ এখনই দেখা যাচ্ছে।

 

২০১৭ সালে ‘নেচার’ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, হৃদপেশির অন্যতম জটিল রোগ হাইপারট্রপিক ক্যার্ডিওমায়োপ্যাথ প্রতিরোধে মানব ভ্রণে ডিএনএ সংশোধনের সুযোগ করে দিয়েছে ক্রিসপার-ক্যাস৯।

তাছাড়া অধিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফল কিংবা তাতে এলার্জি অনুসঙ্গ কমানোর চেষ্টা গবেষকদের দীর্ঘদিনের। সেটাতে পানি এনে দিয়েছে ক্রিসপার-ক্যাস৯। দক্ষিণ কোরিয়ার একদল গবেষক ইতোমধ্যে তার সফলতাও পেয়েছেন। সুতরাং বলা যেতে পারে কৃষিতে যে জিএমও প্রযুক্তি এতোদিন ব্যবহার করা হতো, তার চেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক ফলনশীল খাদ্যশস্য উদ্ভাবন করা সম্ভব হচ্ছে।

আমরা অনেকেই জানি বর্তমানে অনেক ব্যাকটেরিয়ার আন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। যার কারণে ড্রাগ রেজিস্টেন্স বিশ্বব্যাপী ভয়ানক সমস্যা তৈরি করছে। আশার কথা হলো ক্রিসপার সহায়তায় আরো বেশি শক্তিশালী আন্টিবায়োটিক ও আন্টিভাইরাল তৈরি করার লক্ষ্য গবেষকরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।

ম্যালেরিয়া কিংবা ইবোলার মতো ঘাতকব্যাধি রুখতে ক্রিসপার-ক্যাস৯ কে কাজে লাগানো হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ক্রিসপারের এই যুগান্তকারী ভূমিকার প্রশংসা করে বলেছে এই প্রযুক্তি আগামী বিশ্বকে অন্য রকম একটি বিশ্বের দ্বারপান্তে নিয়ে যাবে।

ধর্মীয় ও নৈতিকতার প্রশ্নে ‘মানব ভ্রণ’ ডিজাইন করার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী এখনো অনুমোদন মেলেনি। তবে চীন ও যুক্তরাজ্য মানুষের রোগের থেরাপি কিংবা জিনগত ক্রুটি সংশোধনের অনুমতি দিয়েছে। যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আমরা এরইমধ্যে জেনেছি যে,  চীনের একটি গবেষণাগার দুইবার মানব ভ্রণ দুই সপ্তাহের জন্য নিজেদের ইচ্ছেমত ডিজাইন করে গবেষণাগারে সফল হয়েছেন। তবে নৈতিকতার প্রশ্ন নিয়ে চীন একদম নিরব। (সূত্র-১-৮)

ক্রিসপার নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অধিকাংশ বিজ্ঞানী এই জিন প্রকৌশলকে মানব ইতিহাসের যুগান্তকারী আবিষ্কার মনে করলেও অনেকে বিপরীত মত দিয়েছেন।

ভবিষ্যত পৃথিবী যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই নিয়ন্ত্রিত হতে চলছে তাতে কারও কোন সন্দেহ নেই। তবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে কাজে লাগিয়ে সঙ্কর মানব অর্থাৎ শক্তি, বুদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষম করা যে সম্ভব তাতে কারও দ্বিধা নেই।

যদি মানুষের ভ্রুণকে গবেষণাগারে ডিএনএ বাছাই করে অসুর শক্তিধারী করে তোলা হয়, তাহলে এই শৃঙ্খল পৃথিবীতে ধর্ম ও ঐশ্বরিক বিশ্বাসে আঘাত হানবে, যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে। পবিত্র ধর্মের প্রতি মানুষের বিশ্বাসবোধ আমাদেরকে চলার পাথেয় হলেও বিজ্ঞানের এইসব আবিষ্কার, ধর্মীয় সংঘাত তীব্রতর করে তুলতে পারে।

এছাড়াও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিউক্লিয়ার শক্তির চেয়ে ভয়ানক কিছু হতে পারে। যদি এর অপব্যবহার করা হয়, দেখা যাবে সংকর মানুষের, প্রকৃতির সৃষ্টি মানুষের মতো আবেগ অনুভূতি ও ভালোবাসা নাও থাকতে পারে। ফলে আমাদের শান্তির পৃথিবী হয়ে যেতে পারে অশান্তির প্রতীক।

এ কথা অকাট্য যে, যেভাবে পৃথিবীতে রোগ বালাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে তার বিরুদ্ধে ক্রিসপার ক্যাস-৯ আলাউদ্দিনের জাদুর চেরাগ। আমরা যদি ক্যান্সার মতো মরণব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, দৃষ্টিহীনদের দৃষ্টি, হৃদপিণ্ড অকেজোদের হৃদপিণ্ড ফিরিয়ে দিতে পারি তাহলে সেটা হবে আমাদের জন্য আর্শীবাদ।

বিজ্ঞানীরা মূলত সেই লক্ষে ক্রিসপার-ক্যাস৯ কে মানব উপকারে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠছে। আমরা বিশ্বাস করি, অদূর ভবিষত ক্ষুধা, রোগ-বালাইবিহীন নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখছি।

 

লেখক: নাদিম মাহমুদ, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত

 

তথ্যসূত্র

১. https://www.nature.com/news/second-chinese-team-reports-gene-editing-in-human-embryos-1.19718

২. https://www.nature.com/articles/gim201628.pdf?origin=ppub

৩. http://news.berkeley.edu/crisprpatent/

৪. http://news.berkeley.edu/2018/06/19/doudna-charpentier-team-awarded-u-s-patent-for-crispr-cas9/

৫. http://science.sciencemag.org/content/361/6405/866

৬. http://www.sciencemag.org/news/2017/02/round-one-crispr-patent-legal-battle-goes-broad-institute

৭. https://www.quantamagazine.org/crispr-natural-history-in-bacteria-2015020

৮. http://science.sciencemag.org/content/337/6096/816.long

নাদিম মাহমুদজাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত

Responses -- “পৃথিবী বদলে দেয়া জিন-প্রযুক্তির নাম ক্রিসপার”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    আমাদের অনেকের মধ্যেই এমন একটি ধারণা কাজ করে যে, বিজ্ঞান কুরআনের প্রতিদ্বন্দ্বী। বিষয়টি মোটেই সে’রকম নয়। বরং, বিজ্ঞান পবিত্র কুরআনেরই অনুগামী। (আমার দেয়া তথ্য এবং ব্যাখ্যা ভুল হলে আল্লাহ্‌ আমাকে মাফ করুন) আমি কুরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ এবং তাফসির পড়তে গিয়ে এমন একটি তথ্য পেয়েছি যেখানে বলা হয়েছে, “বিজ্ঞান নতুন কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না; কুরআনের সত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে মাত্র।” তাই, বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারে বিস্মিত বা ভীত হবার কোন কারণ নেই। এগুলো কুরআন দ্বারা সমর্থিত।

    তাছাড়া, পবিত্র কুরআনে যেখানে বলা হয়েছে, একজন মানুষ তার সারাজীবনের সর্বোচ্চ মেধা প্রয়োগ করেও সৃষ্টি-রহস্যের সর্বোচ্চ দশভাগের একভাগ মাত্র আবিষ্কার করতে পারে সেখানে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি কেন? নয়ভাগতো অজানাই থেকে যাচ্ছে যেগুলো আল্লাহ্‌তা’’লার এখতিয়ারে!

    তবে, আমাদের মনে রাখা উচিত আল্লাহ্‌তা’লা সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। মানব কল্যাণের লক্ষ্যে বিজ্ঞানের যে কোন আবিষ্কারই স্বীকৃতিযোগ্য এবং প্রশংসনীয়।

    Reply
      • সরকার জাবেদ ইকবাল

        সুপ্রিয় সুদীপ,
        আমি ভীষণভাবে লজ্জিত। আমি সেই অর্থে কোন আলেম নই; নগণ্য পাঠক মাত্র। হয়তোবা বিশিষ্ট কোন আলেম এ বিষয়ে আপনাকে সহায়তা করতে পারেন।

  2. Salman

    “পবিত্র ধর্মের প্রতি মানুষের বিশ্বাসবোধ আমাদেরকে চলার পাথেয় হলেও বিজ্ঞানের এইসব আবিষ্কার, ধর্মীয় সংঘাত তীব্রতর করে তুলতে পারে।”

    যারা সুস্থ্য চিন্তাধারা আর আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, তারা বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কারেই মুগ্ধ হয়ে আল্লাহর উপর বিশ্বাস হারাবে না। কারণ বিজ্ঞানের সব চমকপ্রদ আবিষ্কারের পেছনে মানুষের মস্তিষ্কের বুদ্ধি বা ইন্টেলিজেন্স কাজ করে। আর মানুষের ব্রেনের এই ইন্টিলিজেন্স সৃষ্টির পেছনে অন্য একজন সুপার ইন্টিলেজেন্সের ভূমিকা থাকতেই হবে। সেই সুপার ইন্টিলেজেন্সই হচ্ছেন আল্লাহ। মানুষের ডিএনএ, আরএনএ, জেনেটিক কোড একজন সুপার ইন্টেলিজেন্সের উপস্থিতিরই প্রমাণপত্র।

    Reply

Leave a Reply to সুদীপ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—