২০১১ সালের মার্চে সেই সময়ের জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী কার্ল থিওডোর সু গুটেনবার্গ (Karl-Theodor zu Guttenberg) সংসদে ক্ষমা চেয়ে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। সেই সময়ে জার্মানি জুড়ে, বিশেষত গবেষক, শিক্ষার্থী এবং জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের কাছে এই ঘটনার গুরুত্ব ছিলো অন্যরকম। কারণ গুটেনবার্গ পদত্যাগ করেছিলেন গবেষণায় অসততার (এই ক্ষেত্রে, প্লাজিয়ারিজম) অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে।

খুব সহজ করে সংক্ষেপে বলতে গেলে ‘প্লাজিয়ারিজম’ হচ্ছে লেখা চুরি। অপরের কোনও লেখা, ছবি ইত্যাদি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কেউ যদি ব্যবহার করে অথবা নিজের বলে দাবি করে তাহলে সেটা হচ্ছে প্লাজিয়ারিজম। জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গুটেনবার্গ তার পিএইচডি থিসিসের সামান্য অংশ অন্যদের থেকে ‘কপি’ করেছিলেন। এই হচ্ছে তার অপরাধ। এই অপরাধে গুটেবার্গের পিএইচডি ডিগ্রি ফিরিয়ে নেয় জার্মানির বেইরুথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেষ হয়ে যায় তার উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

প্লাজিয়ারিজমের অভিযোগে সকল অর্জন শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা একটি নয়। গুটেনবার্গের পদত্যাগের দুই বছর পর, প্লাজিয়ারিজমের অভিযোগের মুখে পদত্যাগ করেন জার্মানির শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক মন্ত্রী আনেটে শাভান (Annette Schavan)। মন্ত্রিত্বের সঙ্গে সঙ্গে শাভানও হারান তার পিএইডি ডিগ্রি। চলতি বছরের জুলাই মাসে মাত্র একসপ্তাহের ব্যবধানে প্লাজিয়ারিজমের অভিযোগে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন চেক প্রজাতন্ত্রের দুইজন মন্ত্রী!

মনে হতে পারে এই ঘটনাগুলো রাজনৈতিক কিংবা রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই কেবল এরকম হয়। কিন্তু বাস্তবতা সেরকম নয়। আমি রাজনীতিকদের উদাহরণ এইজন্য দিয়েছি যে, যাদের কর্মজীবন বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তেমন পরাক্রমশালী ব্যক্তিদের সকল অর্জনও বিজ্ঞানে অসততার অভিযোগে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাহলে যারা বিজ্ঞান গবেষক, অথবা গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষার্থী, তাদের কর্মজীবনে গবেষণায় অসততার প্রভাব কী হবে?

উদাহরণ দেই, ২০০২ সালে বিশ্বখ্যাত বেল ল্যাবসের গবেষক ইয়ান হেন্ডরিক শোন তার চাকরি, পিএইচডি ডিগ্রি এবং কর্মজীবনের প্রায় সকল অর্জন হারান গবেষণায় অসততার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়। অথচ শোন ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় তারকাখ্যাতি পাওয়া গবেষক। যে ন্যাচার অথবা সায়েন্স সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য গবেষকরা স্বপ্ন দেখেন, সেই দুটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে কেবল ২০০১ এবং ২০০২ সালেই শোন-এর প্রকাশনা ছিলো ১৬টি! গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১-০২ সালে শোন পেয়েছিলেন ৩টি উল্লেখযোগ্য সম্মাননা।

এমআইটি’র সহযোগী অধ্যাপক লুক পারিজে চাকরি হারান ২০০৪ সালে। প্রায় রাতারাতি তারকাখ্যাতি পাওয়া স্টেমসেল গবেষক হুয়াং উ সুক তার অধ্যাপনার চাকরি এবং ‘সুপ্রিম সায়েন্টিস্ট’ সম্মাননা হারান ২০০৬ সালে। ২০১১ সালে জার্মানির য়োয়াখিম বোল্ডট হারান গিজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অধ্যাপনার চাকরি। জাপানের ইয়োটাকা ফুজি ২০১২ সালে হারিয়েছেন সহযোগী অধ্যাপনার চাকরি। দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মানো আমেরিকান সহকারী অধ্যাপক ডঙ পিউ হাস তার চাকরি হারান ২০১৩ সালে। সেইসঙ্গে দণ্ডিত হন ৫ বছরের কারাদণ্ডে, আর তাকে জরিমানা করা হয় টাকার হিসেবে প্রায় ৬১ কোটি টাকা। ১৯৮৯ সালে সম্মানজনক অর্ডার অব কানাডা’য় ভূষিত গবেষক রনজিত চন্দ্রের সম্মাননা ফিরিয়ে নেয়া হয় গবেষণায় অসততার অভিযোগে ২০১৫ সালে। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মিলেনা পেঙ্কোয়া চাকরি এবং পিএইচডি ডিগ্রি হারিয়েছেন ২০১৭ সালে।

এই সকল ঘটনার কারণই গবেষণায় অসততা। এই প্রসঙ্গে উদাহরণ দেয়াও খুব সহজ। খুঁজলেই হাজারো উদাহরণ মেলে।

আমেরিকান ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সংজ্ঞায়, ‘বিজ্ঞানের অসততা হচ্ছে, প্রয়োজনানুসারে তথ্য তৈরি করা।’ গবেষক মাত্রই তার গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান/তথ্য সৃষ্টি করেন। কিন্তু কেউ যদি নিজের পছন্দমত তথ্যকে গবেষণালব্ধ তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেন, অথবা কোন গবেষণায় পাওয়া তথ্য কোনরকম বিকৃত করেন (বদলে নেন) তবে সে বিজ্ঞানে অসততা হিসেবে গণ্য হয়। দেশ এবং প্রতিষ্ঠান ভেদে গবেষণায় অসসতার বিস্তৃত ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে সকলক্ষেত্রেই গবেষণায় অসততার মূল সংজ্ঞা একরকম। এবং বেশিরভাগক্ষেত্রেই, গবেষণাপত্রে প্লাজিয়ারিজমকে গবেষণায় অসততা হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্লাজিয়ারিজম কী?

প্লাজিয়ারিজম হচ্ছে অন্যের লেখা, বক্তব্য বা মতামত চুরি, অন্যের ছবি চুরি, অথবা অন্য কোনও মাধ্যমের তথ্য চুরি। সেই চুরি অংশবিশেষ হলেও সেটা প্লাজিয়ারিজম হিসেবে গণ্য হয়। অন্য কারো লেখা চুরি করে সেটা খানিকটা বদলে নিয়ে প্রকাশ করাটাও প্লাজিয়ারিজম। কেউ যদি নিজের কোন রচনার প্রয়োজনে অন্য কারো লেখার তথ্য/উপাত্ত ব্যবহার করতে চায়, তাহলে খুব স্পষ্টভাবে সেটা উল্লেখ করে দিতে হয়। স্পষ্টভাবে লিখে দিতে হয় কতটুকু তথ্য কোন সূত্র থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। অসম্পূর্ণ অথবা ভূল তথ্য সূত্রের ব্যবহারও প্লাজিয়ারিজম ।

মনে রাখা ভালো, ‘ইন্টারনেট’ কোনও সূত্র নয়। কোনও লেখা বা ছবি ইন্টারনেটের কোনও সাইট থেকে নিয়ে প্রকাশ করে ‘সূত্র- ইন্টারনেট’ লিখে ফেললেই সেটা চুরির দায় থেকে লেখককে অব্যাহতি দেয় না।

গবেষণাপত্রের লেখক সম্পর্কে এইখানে কিছু বিষয় স্পষ্ট করা ভালো। যদি কোন নবীন শিক্ষার্থীর জানা না থাকে, সেইজন্য সহজভাবে বলার চেষ্টা করছি।

গবেষণাপত্র বলতে এই লেখাটিতে বলা হয়েছে কোনো গবেষণার বর্ণনা দিয়ে বিজ্ঞান-সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধের কথা। বিজ্ঞান পত্রিকার কিন্তু রকম রয়েছে। কোনো পত্রিকার সামান্য অংশে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা প্রকাশিত হতে পারে। সচারচর দৈনিক পত্রিকাগুলোতে আমরা যেরকম দেখি। শুধুমাত্র বিজ্ঞানের খবর/লেখা বা বিজ্ঞান সম্পর্কিত অন্যান্য আয়োজন নিয়ে সকলের জন্য যে পত্রিকা প্রকাশিত হয় সেসব হচ্ছে জনপ্রিয় বিজ্ঞান পত্রিকা। এসব বিজ্ঞান পত্রিকার উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিজ্ঞানের তথ্য সর্বসাধারণের কাছে সহজ ভাষায় প্রকাশ করা। জনপ্রিয় বিজ্ঞানের কোনও লেখা সহজে বুঝতে হলে সেইজন্য বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী বা বৈজ্ঞানিক হওয়ার প্রয়োজন নেই। পদার্থবিজ্ঞানের কোনও বিষয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞানের লেখা সেইজন্য পদার্থবিজ্ঞানে যার অনেক জ্ঞান রয়েছে তিনি যেমন বুঝতে পারেন, তেমনি বুঝতে পারেন জীববিজ্ঞান, সাহিত্য বা রাজনীতিতে যিনি শিক্ষা নিয়েছেন তিনিও।

এবার আসি গবেষণাপত্র প্রসঙ্গে। Scientific journal বা article, বাংলায় যাকে গবেষণাপত্র বলছি, তার অনেকগুলো রকম রয়েছে। এই লেখাটিতে সবগুলোর বিস্তৃত ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলি, গবেষণাপত্র (জনপ্রিয় বিজ্ঞান নয়) লেখার উদ্দেশ্য কোন গবেষণার পূর্বকথা, গবেষণার প্রক্রিয়া এবং ফলাফল খুব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা। গবেষণাপত্র লেখার সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। এবং গ্রহণযোগ্য গবেষণাপত্র মানেই সেটা ‘পিয়ার রিভিউড’।

কেউ যদি কোন গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে গবেষণাপত্র লিখে বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশের জন্য পাঠায়, তাহলে সেই সাময়িকীর সম্পাদক ওই গবেষণাপত্রটি যাচাই করার জন্য একই বিষয়ের একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত নেন। বিশেষজ্ঞরা ওই গবেষণাপত্রটি পড়েন, গবেষণার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেন, তারপর ঠিক করেন ওই গবেষণার পদ্ধতি ঠিক ছিলো কিনা, গবেষণার ফলাফল ঠিকভাবে উপস্থিপিত হয়েছে কিনা, এবং সর্বোপরি গবেষণাপত্রটি প্রকাশের যোগ্য কিনা। গবেষণাপত্র এভাবে যাচাই করা হলেই সেই গবেষণাপত্রকে বলা হয় ‘পিয়ার রিভিউড’। ‘পিয়ার রিভিউড’ হয়ে গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি পেলেই কোনও গবেষণার ফলাফল সত্যিকারের গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতে পারে। এরকম একটি গবেষণাপত্র থেকে তখন সারা পৃথিবীর শিক্ষার্থী এবং গবেষকরা ওই প্রসঙ্গে জানতে পারেন। এরকম এক বা একাধিক গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যতের গবেষণা সাজিয়ে নিতে পারেন।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, অসংখ্য বিজ্ঞান সাময়িকী রয়েছে যারা যেকোনও গবেষণাপত্র যাচাই-বাছাই না করেই প্রকাশ করে। এমনকি যেসব গবেষণাপত্রে চুরি করা তথ্য/উপাত্ত রয়েছে (প্লাজিয়ারিজম) সেসবও। ‘পিয়ার রিভিউ’ করার দাবি করলেও, বাস্তবে তারা সেটা করেনা অথবা দায়সারাভাবে করে। এসব সাময়িকীর মূল উদ্দেশ্য গবেষণাপত্রের ‘অথর’দের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। এসব বিজ্ঞান সাময়িকীকে ‘প্রিডেটরি জার্নাল’ অথবা ‘স্যুডো জার্নাল’ বলা হয়। বলাবাহুল্য, এসব বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সত্যিকার কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্য নেই।

সত্যিকারের গবেষণাপত্র বিজ্ঞান গবেষণায় গবেষকের সাফল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। যিনি গবেষণা করে গবেষণাপত্রটি লিখেছেন তাকে বলা হয় ‘অথর’। একটি গবেষণাপত্রে একাধিক ‘অথর’ থাকে, থাকতে পারেন। কোনও গবেষণাপত্রের ‘অথর’ কে হবেন তারও রয়েছে গ্রহনযোগ্য নীতিমালা। গবেষণাপত্রের ‘অথর’দের ভেতর সবার প্রথমে যার নাম থাকে, সাধারণভাবে, তার অবদান ওই গবেষণায় সবচে বেশি।

যদি কেউ কখনো কোনো গবেষণায় কারো অবদানকে লুকান, অর্থাৎ কোন গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন এমন কারো নাম ‘অথর’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করেন। তাহলে সেটা বিজ্ঞানে অসততা হিসেবে ধরা হয়। ‘অথর’ হওয়ার মতো অবদান থাকার পরেও যদি গবেষণাপত্রে কাউকে ‘অথর’ হিসেবে উল্লেখ না করা হয়, তাহলে তাকে বলে গোস্ট ‘অথরশিপ’ (ghost authorship)।

গোস্ট ‘অথর’শিপের উল্টোটাও রয়েছে। ‘অথর’ হওয়ার মতো যথেষ্ঠ অবদান না থাকলেও যদি কোনো গবেষণাপত্রের ‘অথর’ হিসেবে কারো নামোল্লেখ করা হয় তাহলে তাকে বলে গেস্ট ‘অথরশিপ’ (guest authorship)।

‘ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব মেডিক্যাল জার্নাল এডিটরস’ ১৯৭৮ সালে গবেষণাপত্র লেখা এবং প্রকাশনার উপর একটি নীতিমালা সুপারিশ করে। ভ্যাঙ্কুভার রুলস নামে পরিচিত এই নীতিমালাটি এখন পর্যন্ত অনুসরণ করে প্রায় ৩৫০০ বিজ্ঞান সাময়িকী। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য প্রণীত হলেও বিজ্ঞানের অন্য শাখাতেও প্রায়ই এই নীতিমালা (অথবা এর ছায়া) অনুসরণ করা হয়। ভ্যাঙ্কুভার রুলস অনুযায়ী, কোন গবেষণাপত্রের ‘অথর’ (এবং কো-’অথর’) হওয়ার ৪টি শর্ত রয়েছে। ২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী এই চারটি শর্ত হচ্ছে (সরাসরি উদ্ধৃত করছি),

1.Substantial contributions to the conception or design of the work; or the acquisition, analysis, or interpretation of data for the work; AND 2. Drafting the work or revising it critically for important intellectual content; AND 3. Final approval of the version to be published; AND 4. Agreement to be accountable for all aspects of the work in ensuring that questions related to the accuracy or integrity of any part of the work are appropriately investigated and resolved.

খানিকটা সহজ করে অনুবাদ করলে, ভ্যাঙ্কুভার রুলস অনুযায়ী, কোন গবেষণাপত্রের ‘অথর’ হওয়ার জন্য সেই গবেষণার ধারণা এবং রূপরেখা তৈরিতে, অথবা গবেষণার তথ্য সংগ্রহ, পর্যালোচনা এবং ব্যাখ্যায় উল্লেখযোগ্য অবদান থাকতে হবে। থাকতে হবে গবেষণাপত্রের খসড়া তৈরি, পূণর্পাঠ এবং সংশোধনে উল্লেখযোগ্য অবদান। গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য যে চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হবে সেটিতে সম্মতি থাকতে হবে। সর্বোপরি, ওই গবেষণার সকল অংশের দায় নিতে সম্মত থাকতে হবে। নিশ্চয়তা দিতে হবে যে ওই গবেষণার যথার্থতা ও শুদ্ধতা সঠিকভাবে যাচাই করা হয়েছে।

বলে রাখা ভালো, ভ্যাঙ্কুভার রুলসের চারটি শর্তের শুধুমাত্র একটি, দুটি বা তিনটি পূরণ করলেই কোনো বিজ্ঞান প্রবন্ধের ‘অথর’ হওয়া যাবেনা। কোনও গবেষণাপত্রের ‘অথর’ হওয়ার জন্য ভ্যাঙ্কুভার রুলসের সবকটি শর্তই পূরণ করতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ‘অথরশিপে’র এই নীতিমালা জেনেশুনে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে একটা বড় অংশের বিজ্ঞান গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে নিন্ম-মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ৭৭ ভাগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে গেস্ট ‘অথরশিপ’ (কোন অবদান ছাড়াই ‘অথরশিপ’) দেয়া হয়।  বাংলাদেশ এই অনিয়মের বাইরে নেই। এখানে শিক্ষার্থীর গবেষণায় যথেষ্ঠ অবদান না রেখেও অনেকক্ষেত্রেই গবেষণাপত্রে ‘অথর’ হিসেবে শিক্ষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। বলে নেয়া ভালো, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক যেসব ক্ষেত্রে একসঙ্গে গবেষণা কাজে যুক্ত থাকেন, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করলে সেসবক্ষেত্রে গবেষণাপত্রে উভয়েরই নামোল্লেখ করা জরুরি। শিক্ষার্থীর গবেষণায় শিক্ষকের অংশের মতো, উল্লেখযোগ্য অবদান ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠানের নিম্নপদের কর্মীর গবেষণাপত্রে উঁচুপদের কর্তার নামোল্লেখও অনেকক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা।

এই পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকাশন এবং বিজ্ঞান সাময়িকী গবেষণাপত্রের ‘অথরশিপ’ বিক্রি করে। কেবল ‘অথরশিপ’ নয়, টাকা দিলে নতুন গবেষণাপত্র লিখে দেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে ভারতের চাইতে চীনের পরিস্থিতি বেশি চমকপ্রদ! চীনে গবেষণাপত্রের ‘অথরশিপ’ বিক্রির অবিশ্বাস্য এই পরিস্থিতির উপর বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স ২০১৩ সালে একটি নিউজ ফোকাস প্রকাশ করে China’s publication bazar শিরোনামে। স্বনামধন্য বিজ্ঞান সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বায়ো-কেমিস্ট্রি এবং সেল বায়োলজি’তে কো-ফার্স্ট ‘অথরশিপ’ বিক্রির একটি ঘটনা থেকে সায়েন্সের প্রতিবেদক চীনের বিজ্ঞান গবেষণা পরিমণ্ডলের এই অন্ধকার দিক আবিষ্কার করেন। এই প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয় কীভাবে খ্যাতনামা বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিতব্য গবেষণাপত্রের ‘অথরশিপ’ বিক্রী হয় চীনে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা যেতে পারে, চীনে ২০০২ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্র প্রকাশের পরিমাণ বেড়েছে অবিশ্বাস্য ৬ গুণ!

কেবল চীন বা ভারত নয়, বিজ্ঞনের অসততার এরকম সংস্কৃতি রয়েছে অনেক দেশেই। আর এসব দেশের ভেতর দুর্ভাগ্যবশত নিন্ম-মধ্য আয়ের দেশগুলোই রয়েছে বেশি। কিন্তু এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করা সম্ভব। এই সময়ে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় বিজ্ঞানে অসততা, প্লাজিয়ারিজম ইত্যাদি খুব সহজেই সনাক্ত করা যায়। পৃথিবীর সকল নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব শক্তভাবে প্লাজিয়ারিজম ইত্যাদি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব গবেষণা/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন গবেষক বা শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের অসততার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে কঠিন মূল্য দিতে হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরাও তাদের ছাত্রত্ব হারাতে পারেন গবেষণায়/গবেষণাপত্রে সামান্য অসততার অভিযোগে। বিজ্ঞানে অসততার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যে কতশত গবেষক, অধ্যাপকের কর্মজীবনের সকল অর্জন ধ্বংস হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞানে অসততা, প্লাজিয়ারিজম ইত্যাদি অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া কতটা শক্ত আমার জানা নেই। কিন্তু যেহেতু আমরা একটা সমৃদ্ধ দেশ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখি, সেহেতু এই প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। একটি স্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহনযোগ্য নীতিমালা অনুসরণ করে নিজেদের জন্য এরকম একটি নীতিমালা তৈরি করা কঠিন কাজ নয়। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে শিক্ষার্থিদেরকে তাদের উচ্চশিক্ষার শুরুতেই প্লাজিয়ারিজম এবং গবেষণার অসততা সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান দেয়া জরুরি। এমনকি এই প্রক্রিয়া সরলভাবে শুরু হতে পারে স্কুল থেকেই।

ডিসক্লেইমার: সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে আমি ‘অথরশিপ’ কেনার প্রস্তাব পেয়েছি। দীর্ঘদিন দেশে থাকিনা বলে এই বিষয়টি আমার কাছে একটা চমক হয়ে এসেছে। পরে জেনেছি, এই সংস্কৃতি আমাদের শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে দিনদিন। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখেও পড়েছি। সেই সঙ্গে ‘অথরশিপ’ বিক্রেতার কাছ থেকে পেয়েছি স্বপরিবারে কারাগারে যাওয়ার হুমকি (সম্ভবত এই প্রসঙ্গে কথা বলে তার সম্মানহানি করায়)। এই অভিজ্ঞতার পর দেশের বিজ্ঞান গবেষণা, বিজ্ঞানে অসততা, এবং বিশেষত ‘অথরশিপ’ বাজার সম্পর্কে জানতে গিয়ে চমৎকৃত হয়েছি। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে বিস্তারিত লেখার আগে, বিজ্ঞানে অসততা উপলব্ধি করার জন্য প্রাথমিক এই লেখাটি তৈরি।

তথ্যসূত্র:

১. International Committee for Medical Journal Editors. ICMJE | Recommendations. http://www.icmje.org/recommendations/. Published 2017. Accessed August 20, 2018.

২. Rohwer A, Young T, Wager E, Garner P. Authorship, plagiarism and conflict of interest: views and practices from low/middle-income country health researchers. BMJ Open. 2017;7(11):e018467. doi:10.1136/bmjopen-2017-018467

৩. Bolshete PM. Authorship for Sale: A Survey of Predatory Publishers and Journals | Peer Review Congress. https://peerreviewcongress.org/prc17-0154. Accessed August 20, 2018.

৪. Hvistendahl M. China’s publication bazaar. Science. 2013;342(6162):1035-1039. doi:10.1126/science.342.6162.1035

Responses -- “বিজ্ঞানে অসততা, প্লাজিয়ারিজম এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গ”

  1. শুভ্র

    বাংলাদেশ এই অনিয়মের বাইরে নেই। এখানে শিক্ষার্থীর গবেষণায় যথেষ্ঠ অবদান না রেখেও অনেকক্ষেত্রেই গবেষণাপত্রে ‘অথর’ হিসেবে শিক্ষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। that is the hard reality. just because students are bound to work under a supervisor, that supervisor considers it as his/ her right to be an author. it’s really sad. যারা সত্যিকার অর্থে ছাত্রছাত্রীদের গবেষনায় অবদান রাখে তাদের গবেষনার ফলাফল থেকে রিসার্চ পাবলিকেশন বের হলে সুপারভাউজরদের নাম থাকতে পারে। অন্যদের ক্ষেত্রে থাকা খুবই অন্যায়। একচুয়ালি সুপারভাইজারদের কাছ থেকে স্কলারশিপের রেকমেন্ডেশন নিতে হয় বলে তাদের ছাত্রদের অর্জন সুপারভাইজররা নিজেদের সম্পদ মনে করে। আর দেশে যে সকল PhD হয় তাদের অনেকগুলোকে আমি বলি “ভাগাভাগি PhD”, কেন্ডিডেট কোন নামিদামি অর্গানাইজেশনের এমপ্লয়ি হয়, সুপারভাইজার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। সুপারভাইজর কেন্ডিডেটের পিএইচডি পেপার করে দেন, কেন্ডিডেট সুপারভাইজরের বাসায় বিভিন্ন উপঢৌকন পাঠাবার পাশাপাশি সুপারভাইজরকে বিভিন্ন প্রকল্পের কনসালটান্ট হিসেবে রাখেন, বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে দাওয়াত করেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বিদেশ ভ্রমনের ব্যবস্থা করেন। a win-win situation( but in an unethical way)

    Reply
  2. Mukot Manob

    Authorship, Patent, Copyright – all are stupid and selfish ideas.
    Idea and Knowledge should be Open Source and License Free. The concept of stealing idea is also nonsense.

    If you really want to monetize your idea – create solutions on that and sell it to make money. World is moving towards the Open end.

    Getting money just from license and royalty is absurd !

    Reply
  3. Asahabur Rahman

    প্লাজিয়ারিজমের বাংলা হচ্ছে কুম্ভীলকবৃত্তি ৷ এখন গবেষণা প্রবন্ধ অথবা পিএইচডি থিসিসে কুম্ভীলকবৃত্তি ধরার বেশ কিছু সফটওয়ার তৈরি হয়েছে যা ব্যবহর করে গবেষণা প্রবন্ধ রিভিউয়ার ও থিসিস পরীক্ষকরা চুরি বা সূক্ষ্ম নকল ধরে ফেলতে পারেন ৷ তাই এখন কুম্ভীলকবৃত্তি করে বিদ্বান হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে ৷

    Reply
  4. আমিত কুমার

    দেশ কপি করে হলেও উন্নত দের অনেক কিছু শিখে নিয়েছে। বর্তমানে অনেক গবেষেক আছেন যারা ব্যাংকার, রাজনৈতিক, বিশিষ্ট্য ব্যবসায়ী, প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা এরুপ অসংখ্য পদকর্তা। যারা দিনে রাতে খাওয়ার সময় ট্টুকুও ঠিকমত পাননা। তাদের ক্ষেত্রে অথরশিপ বিলাসীতা। তাদের হাতে পর্যাপ্ত প্রক্রিয়া আছে, ফলে সেড়েও ফেলতেছেন একাধিক (ক্ষেত্রবিশেষে সহস্রাধিক) গবেষনা, যেগুলোর ২ পয়সাও উপকার দেশ/বিশ্ব পাচ্ছে না। এমনিতেই আমাদের দেশে গবেষনার সু্যোগ সুবিধা কম। অযথা ব্যয়িত মূলধন আন্ডার গ্রাজুয়েট/মাস্টার্স এর ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হলে তারা আরোবেশি পরিমানে অবদান রাখতে পারতো।

    Reply
  5. taifur rahman

    আগে তথ্যের অবাধ সরবারহ ছিল না, তখন কেউ কারোও লেখা চুরি করলে সহজে ধরা কঠিন ছিল. এখন গুগল এ সার্চ দিলে সহজেই বের হয়ে আসতে পারে লেখাটি অন্য কারো কিনা বা লেখার কোনো একটা লাইনের সাথেও অন্য কারও লেখার মিল আছে কিনা! অথচ এখন এই লেখা চুরি একটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। আমি নিজে যুক্তরাজ্যে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করি। নিজে সরাসরি এইধরণের কাজ ,কিন্তু প্রচুর শুনি। লেখা চুরি না হয় বুঝলাম পুরাতন ব্যবসা কিন্তু , অথরশিপ বিক্রির চেয়ে ভয়ানক কিছু শুনি নাই! তাজ্জব বনে গেলাম! জানি যারা সিরিয়াস বিজ্ঞানী তাদের জন্য এইসব কোনো সমস্যা না, কিন্তু এই ব্যাধি বিগ্গণের প্রসারের জন্য বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াবে! অজ্ঞ লোক প্রফেসর হবে- সে নিজে কিভাবে গবেষণা শিখাবে আগামী দিনের প্রজন্ম কে?

    Reply
  6. ff

    একটা প্রশংসনীয় লেখা। বিজ্ঞানী ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মীদের এব্যাপারে সতর্ক থাকা সদা প্রয়োজন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—