শৈশবে স্কুলের আঙিনায় মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আগাছা পরিষ্কার অভিযান পরিচালনা করতেন আমাদের প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকরা। তো আগাছা বলতে কিছু দীর্ঘদেহী বুনো ঘাস এবং আপনাআপনি গজিয়ে ওঠা কচু গাছই ছিলো বেশি। মাঝে দু একটা কাঁটা ও ফুল সহ জঙলি গাছ। একটা করে কাস্তে বা দা মিলতো কারো ভাগে, বাকিরা ছোট লাঠি-কাঠি হাতে সহকারী। যারা ওই দা-কাস্তে ভাগে পেতোনা তাদের মন খারাপ হতো। এমনই এক পরিচ্ছন্নতা অভিযানের দিনে মন খারাপের দলের একটু ডানপিটে কেউ পিছন থেকে বলে উঠেছিলো- ভালো করে কাট, এক কোপে কাট, এরকম কচু গাছ কাটতে কাটতে একদিন মানুষ কাটতে শিখে যাবি। বিস্ময়ে থমকে গিয়েছিলাম। সত্যিই কী!

 

হ্যা, ছোট্ট ছোট্ট অপরাধ করতে করতেই তো একজন ক্রমে বড়সড় অপরাধ করবার সক্ষমতায় পৌঁছে যায়। এটা খুবই সত্যি কথা। একদিনেই কেউ দাগী অপরাধী হয়ে যায় না। তার উপর অপরাধ করে সাজা না পাওয়ার বাস্তবতা যদি বিদ্যমান থাকে তো অপরাধ এবং অপরাধীর জন্য সেটা স্পষ্টতই একটা জোরালো প্রণোদনা। অপরাধীরা বিপুল বিক্রমে আরো ভয়াবহ রকমের অপরাধ সংঘটনের জন্য মুখিয়ে উঠতে থাকে।

আমাদের এদেশে পথে পথে নিত্য দিন যতো অঘটন, দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটে। সেসবের বিচারহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব নিত্যই এসব অপরাধ সংঘটনকারীদের লাগামহীন অপরাধের সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে। আমরা কদাচই এর গভীর নেতিবাচকতাটুকু উপলব্ধি করে উঠতে পারি। যা যতোটুকু কেউ কেউ পারে তারা হয় সরাসরি ভুক্তভোগী, নয় সেই ভুক্তভোগীর পরিবার পরিজন।

 

প্রতিদিন সব নিউজ চ্যানেল এবং দৈনিকের খবরের একটা বড় অংশ অপমৃত্যুর সংবাদ। তার ভিতরে সিংহভাগই দেশ জুড়ে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী রোজ অন্তত ১২ (বারো) জন মানুষ এদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ দেয়। আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করার সংখ্যাটিও প্রায় সমান এবং এ ১২ জনের হিসাবের বাইরে।

 

পরিবহন খাতে এমনই একটা অপরাধ ও অপরাধীর জন্য চরম ভাবে বিদ্যমান যে, একে এমন দুর্ঘটনার জন্য ইন্ধন যোগানো একটা পরিবেশই বলা যায়। দেশে ৩৫ লক্ষ গাড়ি, ১৯ লক্ষ চালক এবং প্রতিদিন দুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জনের প্রাণহানি। এই তিনটা তথ্য পরিবহন খাতের অরাজক অবস্থার চিত্রটা খুব স্পষ্ট করেই তুলে ধরে। তবে এখানেই শেষ নয়। সময়ে সময়ে এর সাথে আরো অনেক রকমের ভয়াবহ দিকও বিকট ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

 

সম্প্রতি পরিবহন খাতে যে অপরাধটি সবচেয়ে ভয়াবহভাবে ঘটে যাচ্ছিলো, তা হলো বাস কর্মচারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। পর পর বেশ কিছুদিন এরকম খবর এদেশের মানুষকে চমকে দিয়েছে। তবে এতো কিছুর পরও কতোটা হতবিহ্বল মানুষ আসলে হয়েছে, তা বলা মুশকিল। কেননা নিত্য দিন হতাহতের খবরের সাথে পরিবহন সেবা খাতে অপরাধের তালিকায় গণধর্ষণের মতো সংবাদ প্রায় নৈমিত্তিক হয়ে ওঠার পরও গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র এক প্রকার বিকারহীন অভিব্যক্তিই বজায় করেছে। অন্তত এসবের বিপরীতে প্রতিকার ও প্রতিরোধের অপ্রতুল উদ্যোগ সেরকমই জানান দেয়।

 

এমন অরাজক ব্যবস্থাপনার কারণেই অনেক সময় দুর্ঘটনাগ্রস্তের সাহায্যে এগিয়ে আসতেও মানুষ ভয় পায়। আন্ত:নগর পরিবহনগুলো এক রকম দাপটের সাথে পথে চলে তাদের শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিকদের অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক সংযোগের জোরে। তার উপর রাজধানীসহ অন্যান্য বড় শহরের ভিতরে নিত্যদিনের দুর্ভোগের বিপরীতে সরকারী মালিকানাধীন পাবলিক ট্রান্সপোর্টের দৈন্য দশা এবং দুর্ঘটনায় রোজ রোজ জান-মালের ক্ষয় ক্ষতির বিপ্রতীপ অবস্থায় বিরাজ করে ভিকটিমের সুবিচার ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার। এর পেছনে কারণ উদঘাটন করতে হিমালয় সরানোর মতো কঠিন কিছু করতে হবে না। স্রেফ শহরের ভিতরে গণ পরিবহনগুলোর মালিকানা কাদের সেটা খুঁজে বের করলেই অনুধাবন করতে পারা যাবে। যদি খুঁজে দেখেন তো দেখতে পাবেন আন্ত:শহর গণপরিবহনগুলোর মালিক হয় কোনো আইন-শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ নয় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কেউ কিংবা এই উভয় পক্ষের যৌথ মালিকানায়। ফলতঃ ভিকটিমরা বিচার চাইতে গেলে উলটা হেনস্তা হতে হয়।

 

রাস্তায় মানুষকে ধাক্কা মেরে মরণাপন্ন সেই ভিকটিমের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। টেনে হেঁচড়ে আহতকে হত করে তবে ক্ষান্ত হয়। এইসব হজম করছে দেশের মানুষ নিয়মিতভাবে। সময়ে সময়ে দু-এক ক্ষেত্রে পথচারীরা সেই হন্তা বাহন আটকালেও, চালককে ধরে পুলিশে সোপর্দ করলেও, তা ওই পর্যন্তই। ট্রাফিক নিয়ম না মানার একটা প্রবণতা এদেশে সবার মধ্যেই কম বেশি বিদ্যমান। সেখানে সড়ক পথে দুর্ঘটনা কমবার সম্ভাবনা ক্ষীণ বটে। তবে বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার নির্বিকারতা এই ভয়াবহতার পৃষ্ঠপোষকতার কাজটিই যে করে যাচ্ছে সেটা সাধারণ মানুষ কিছুটা বুঝলেও নীতি প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকর্তারা উচিৎ ভূমিকা থেকে যোজন যোজন দূরত্ব অবস্থান করছেন।

 

এহেন অবস্থার জের সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পায়েলকে আহত করবার পর পরিস্থিতি ধামাচাপা দিতে তাকে মেরে নদীতে ফেলে দেবার অবিশ্বাস্য অমানবিক ঘটনা। আমাদের অনুভূতি নিত্য দিন এমন বর্বর অমানবিক অসংখ্য খবরে এমনই অভ্যস্ত ও সহনশীল হয়ে পড়েছে যে, এমন অনাচারের কান্না একটা পরিবারের সীমানা ডিঙিয়ে খুব একটা বাইরে এসে পৌঁছায় না। অল্প বিস্তর পৌঁছালেও তার আয়ু বড়জোর এক দিন।

 

এদেশের সাধারণ মানুষ এবং নীতি নির্ধারক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাদের সম্মিলিত মেধা ও সক্ষমতা এমনই কী সংকীর্ণ ও অকার্যকর যে আমরা এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে এবং এর প্রতিকারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতেই পারছি না! এভাবেই চলবে !

আমি বলছি না আজই সিঙ্গাপুরের মতো গাড়ি গুণে তার অনুপাতে বার্ষিক পুরাতন গাড়ি বাতিল এবং নতুন গাড়ি আমদানির নীতি হোক। কিন্তু কিছু একটা তো করতেই হবে। আমার সামান্য দু-তিনটা উপলব্ধি আছে প্রতিবেশী দুটি দেশে ভ্রমণ সূত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে।

 

১.

কলোম্বো শহরে এক বন্ধুর গাড়িতে যাচ্ছিলাম কিছু কাজে, একা। ঠিকানা খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়ায় বন্ধুকে ফোন দিলাম পথ বাতলে দিতে। বললো শোফারকে দিতে তাকেই বুঝিয়ে দেবে। আমি ঠিক খুঁজে পাবো না। তো আমি মোবাইলটা পেছনের সিট থেকে বাড়িয়ে ধরে আছি ড্রাইভারের দিকে। সে নির্বিকার। আমি অধৈর্য হয়ে উঠছি আমার প্রতি এমন আচরণে। তো কিছুক্ষণের মধ্যে সে রাস্তার একপাশে, যেখানে সে দাঁড়াতে পারবে, সেখানে গাড়ি দাঁড় করালো। তারপর আমার কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে কথা বললো। আমার সব রাগ অপমানের অনুভূতি উবে গিয়ে ভিতরে ভিতরে লজ্জায় মরে গেলাম। একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে মাথায়ই আসেনি আমার কেন সেই ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে ফোনটা নিয়ে কথা বললো না।

 

২. গভীর রাতে ক্যাণ্ডি থেকে সিগিরিয়ার পথে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চলছে। আশি থেকে একশো কিলোতে। প্রথমে ভয় পেলাম। পরে আশ্বস্ত ও অভ্যস্ত হলাম অল্পক্ষণেই। একটু পরে হঠাৎ এক ধীর গতির মাল বোঝাই পিক আপ সামনে পড়লো বলে আমাদের গাড়িটাও অকস্মাৎ চল্লিশ কিলো গতিতে চলতে থাকলো। উসখুস লাগছিলো। ওদেশি বন্ধু বুঝতে পেরে বললো, রোড সাইন বলছে ওভারটেকিং নিষেধ। একটু পর ওভারটেকিং অ্যালাউড সাইন এলো। আমরা ওভারটেক করে আবার জোর গতিতে ছুটলাম। গভীর মধ্যরাতে সেখানে নাই কোনো ট্রাফিক, এমন কী কোনো স্পিড ডিটেক্টর বা সিসি ক্যামেরা তবুও নিয়মের কি প্রতিপালন!

 

৩. কোলকাতায় যে কোনো রাতে হাজার হাজার গাড়ি পথের পাশে বা খোলা জায়গায় পার্ক করা থাকে। না, কোনো গাড়ির একটা নাট বা স্ক্রুও চুরি হয় না। কেননা সেই চোরাই জিনিসটা কোথাও কেউ বিক্রি করতে পারবে না।

 

আরো বলা যায়। কিন্তু সেইসব বলাটাই আমার উদ্দেশ্য না। যা বলতে চাইছি তা এই যে, এই উপমহাদেশেই ওরা যা পারছে, তা কোনো আলাউদ্দিনের চেরাগের কল্যাণে নয়। আইন প্রয়োগের নিষ্ঠা মানুষকে তা প্রতিপালনের শক্ত অভ্যাসে পৌঁছে দিয়েছে। হ্যা, এক দিনে হয়নি। কিন্তু হয়েছে। আমাদের হচ্ছে না, কারণ আমরা আসলে চাইছি না। বিপরীতে ওই কচু কাটার অভ্যাসটাকেই এমন পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছি প্রশ্রয়ে ও অব্যবস্থাপনায়। যে ‘কচু কাটা’র ধারাবাহিকতায়  পরিবহণ খাত আজ পাকা ও পেশাদার খুনির মতো প্রতিদিন বোঁটা থেকে ফুল খসাবার চেয়েও সহজ অবলীলায় মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে রোজ। কতদিন চলবে এমন অব্যবস্থার ভোজ !

লুৎফুল হোসেন

Responses -- “কতোদিন চলবে পথে পথে মৃত্যুর ভোজ?”

  1. AB Siddique

    Better remove Shahjahan Khan from ministry. He has got not that importance in Awami League. Orginally he belongs to JSD. His past performance is best known to us. The sooner he is removed from Awami Cabinet the better for Awmai League. Otherwise bad days are ahead for Awami League. Election is ahead. Do not distrub the students.

    Reply
  2. Qudrate Khoda

    ভাই, সময় খরচ করে লেখার জন্য ধন্যবাদ।
    কিন্তু, বাংলাদেশে “চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী” কিংবা “ বামুনে বচন পড়ে, পাঁঠায় বলে ভঁ ভঁঅ্যাঁ—-”

    Reply
  3. সরকার জাবেদ ইকবাল

    মূল্যবোধের এমন অবক্ষয়ের দেশে আমরা শুধু আহাজারিই করতে পারবো, প্রতিকার করতে পারবো না। ইলিয়াস কাঞ্চন অনেক কান্নাকাটি করেছেন। কোন লাভ হয়েছে কি? অভিশাপ দিচ্ছি না, তবে আমার মনে হয় কর্তাব্যক্তিদের আপনজনদের কেউ ধর্ষণের শিকার বা এভাবে প্রাণ না হারানো পর্যন্ত সম্ভবত তাদের টনক নড়বে না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—