সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৯তম একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত স্নাতক (পাস ও সম্মান) শ্রেণির সকল ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ নম্বরের বাধ্যতামূলক সাবজেক্ট চালুর সিদ্ধান্ত হয় এবং একটি পাঠ্যবইও তৈরি করা হয়েছে। এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বইতে যদি ভুল তথ্য থাকে তাহলে সকল ছাত্রছাত্রীরা ভুল ইতিহাস শিখবে। যার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
বইয়ের “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা” অংশে প্রথম প্যারাতে লেখা আছে “বঙ্গবন্ধু বন্দি হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এম.এ. হান্নানের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী প্রেরণ করেন।” (ছবি -১)। এই রকম একটা তথ্য ইতিহাসের অধ্যাপকবৃন্দ কোথায় পেলেন! এটা একটা ভুল তথ্য ।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস গ্রন্থের পৃষ্ঠা

 

হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ডে

 

দ্বিতীয়ত, বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য ডঃ হারুন-অর-রশিদকে। উল্লেখ্য, তিনিই বইয়ের অনুমোদনকারী।

 

বইটির নাম “স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস”।
লেখক বৃন্দ ১। ডঃ মুনতাসীর মামুন ও ২। ডঃ মোঃ মাহবুবুর রহমান।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
বঙ্গবন্ধু বন্দি হওয়ার পূর্বেই চট্টগ্রামস্থ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব এম.এ. হান্নানের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী প্রেরণ করেন। বাণীটি স্বাধীন। দলিলপত্র তৃতীয় খণ্ডে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে (পৃ.১)। বাণীটি নিম্নরূপ :
“This may be my last message. from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.

বাংলা অনুবাদ এর বেলায় কোন সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। বাংলা অনুবাদ কি লেখকের নিজেদের করা ?
(বাংলা অনুবাদ) : আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এই আমার শেষ কথা । যে যেখানেই থাকুন না কেন সকলের প্রতি আমার আবেদন রইল, যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে দখলদার বাহিনীর মোকাবিলা করুন এবং বাংলার মাটি থেকে পাক দখলদার বাহিনীকে সমূলে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় না-হওয়া পর্যন্ত লড়ে যান।
হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ডে ,
নিচের ছবিটি   দেখুন,  এখানে বাংলা অনুবাদ নাই ।


হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ড

এছাড়া সংবিধান-এ যে বাংলা অনুবাদ আছে তার সাথেও মিল নাই ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা
২৭ মার্চ কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ) থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটিও স্বাধীনতার দলিলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে পাদটীকায় মন্তব্য করা হয়েছে যে, “মেজর জিয়াউর রহমানের ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঐতিহাসিক মূল কপিটি নিরাপত্তার কারণে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। মেজর জিয়া পঠিত ঘোষণাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :
Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh,
I also declare, we have already framed a sovereign, legal government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution. The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace. I appeal to all government to mobilize public opinion in their respective countries against be brutal genocide in Bangladesh. The Government under Sheikh Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nation of the world.’
পাক সেনাবাহিনীর অঘোষিত যুদ্ধের প্রতিবাদে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে যে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয় তা চলে নয় মাস । অতঃপর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করে ।
এখানে লক্ষ্য করুন বলা হচ্ছে “ মেজর জিয়া পঠিত ঘোষণাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :” কিন্তু আমরা দেখছি “Major Zia, Provisional Commander-in-Chief of the Bangladesh Liberation Army hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh,” ।
ইংরেজি ঘোষণার প্রথম প্যারাটি শুরু হয়েছে Major Zia দিয়ে। শুরুতে ইংরেজি “I” অক্ষরটি নেই। (যদি থাকতো, I Major Zia” – তাতে অর্থ হতো “আমি মেজর জিয়া’)। তাছাড়া একই বাক্যে hereby proclaims লেখা – এতে বোঝা যায় এই অংশটি একজন তৃতীয় ব্যক্তির বক্তব্যের আকারে গঠিত হয়েছে। First person হিসেবে বক্তব্যটি থাকলে হবার কথা ছিলো “hereby proclaiming” বা এরকম কিছু।
আবার দ্বিতীয় বাক্য শুরু হয়েছে “I” অক্ষর দিয়ে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে এটি first person এর মত করে বর্ণিত। তাহলে দুটো বিষয় পরস্পর সাঙ্ঘর্ষিক।
দলিল এর বিজ্ঞ সম্পাদকবৃন্দ এবং চার গবেষক তাহলে ওনারা কী গবেষণা করলেন? তাদের একজন গবেষক তো টেলিভিশনে অনেক বড় বড় গবেষণার কথা বলেন এই দলিলের উপর।

হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় খণ্ডে ;

এছাড়া দলিলে সূত্র হিসেবে লেখা আছে “ স্বাধীন বাংলা বেতার প্রচারিত অনুষ্ঠান মালার টেপরেকর্ড , ২৭ মার্চ ১৯৭১ ; দি স্টেটসম্যান । দিল্লী ,২৭ মার্চ, ১৯৭১ ।“
এখানেও আমরা দেখি প্রথম সূত্র “ স্বাধীন বাংলা বেতার প্রচারিত অনুষ্ঠান মালার টেপরেকর্ড , ২৭ মার্চ ১৯৭১” এর কোন টেপ আমাদের জানামতে কোথাও নাই । থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র , ৫ম খণ্ডে “ টেপ থেকে উদ্ধৃত “, ২৬-৩০ মার্চ, ১৯৭১ এ পৃষ্ঠা ১ – ১২ তে এই জাতীয় কোন লেখা নাই কেনো ? ,

 


হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৫ম খণ্ডে ;

আর অন্য সূত্র “দি স্টেটসম্যান । দিল্লী ,২৭ মার্চ, ১৯৭১” তো কোনভাবেই হতে পারে না কারণ ২৭ মার্চ কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ) থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। পত্রিকাতে উঠলে তো ২৮ তারিখের পত্রিকাতে আসবে। আমাদের কাছে “দি স্টেটসম্যান , দিল্লী ,২৭ মার্চ, ১৯৭১” , পত্রিকাটি আছে । সেখানে মেজর জিয়াউর রহমান এর কোন নাম নাই ।

 

এখানে স্পষ্ট ভাবে বলা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র , ৩য় খণ্ডে মেজর জিয়াউর রহমান এর ২৭ মার্চ, ১৯৭১ এর যে টেক্সট লেখা আছে তার কোন সঠিক সূত্র নাই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কোর্সে বাধ্যতামূলক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইতে ভুল তথ্যের দায় কার? এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

সূত্র – হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র । ৩য় এবং ৫ম খণ্ড, ।

১১ Responses -- “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কোর্সে বাধ্যতামূলক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইতে ভুল তথ্যের দায় কার?”

  1. মানিক বৈরাগী

    এখানে কয়েকজনের আঁতে ঘা লাগা কমেন্ট দেখলাম
    যা অনুমান নির্ভর।
    এরা দেখি শোনা উল্লাহ ও বকা উল্লাহ।
    এরা তথ্য প্রমাণের ধারই ধারে না।
    এদের আরো কয়েকটি বই এর উদাহারণ দিতে পারেন
    ১-শহীদ জয়া বেগম মুস্তারি সগফি
    ২-আবুল কাসেম সন্দিপ
    ৩-বেলাল বেগ
    ৪-মুক্তিযোদ্ধা সিরু বাঙ্গালী
    ৫-বিএনপি নেতা ও এরশাদ এর বন্ধু মীর শওকত আলী।

    Reply
  2. Samsul Arefin

    বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ
    শামসুল আরেফীন

    ঢাকায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ১১ টা থেকে ১১.৩০টার মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির উপর আক্রমণ শুরু করার পরে প্রায় ১১.৩০ টায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর পরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ আসে। এ কথা আজ সকলেরই জানা। বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশী এ কে এম মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে টেলিফোনে আসা এই মেসেজ রিসিভ করেন জহুর আহমদ চৌধুরীর স্ত্রী ডা. নুরুন নাহার জহুর। টেলিফোন নং: ৮০৭৮৫। মোশাররফ হোসেন পরবর্তীকালে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পরে বিসিআইসির চেয়ারম্যান, শিল্পসচিব ও মন্ত্রী হয়েছিলেন। শিল্পসচিব ছিলেন ১৯৯০ সালে। তাঁর প্রদত্ত উক্ত মেসেজের অগ্রভাগে একটি নোট লক্ষণীয়:
    A historic message from Bangabandhu Sk. Mujibur Rahman conveyed to Mr. Zahur Ahmed Chowdhury on 25th March, 1971 at 11-30 Hours- immediate after crack-down of Pak-Army. মেসেজটি নিম্নরূপ:
    Pak Army suddenly attacked E.P.R. Base at Pillkhana, Rajarbag Police Line and killing citizens; street battle are going on in every street of Dacca, Chittagong. I appeal to the Nations of the World for help. Our freedom-fighters are gallantly fighting with the enemies to free the motherland. I appeal and order you all in the name of Almighty Allah to fight to the last drop of blood to liberate the country. Ask E.P.R., Bengal Regiment and Ansar to stand by you and to fight No compromise; Victory is ours. Drive out the last enemy from the holy soil of motherland convey this message to all Awami League leaders, workers and other patriots and lover of freedom. May Allah bless you.
    “JOY BANGLA”
    Sk. Mujibur Rahman

    মেসেজটি আসার পর তা আন্দরকিল্ল¬ার বিনোদা ভবনে বাংলায় অনুবাদ করা হয়। এরপর সাইক্লোস্টাইল কপি ও মাইকিং এর মাধ্যমে তা প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। বলা বাহুল্য, ২৫ মার্চ রাত ১১টা থেকে ১১.৩০ টার মধ্যে মেসেজটি ঢাকার বলধা গার্ডেন থেকে অয়ারলেসেও প্রচার করা হয়। ২৬ মার্চ সকালে ডা. নুরুন নাহার জহুর চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট সলিমপুর অয়ারলেস স্টেশনে মেসেজটি টেলিফোনে প্রেরণ করেন। সেদিন এই অয়ারলেস স্টেশনের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার এ.কে.এস.এম.এ হাকিমের অনুপস্থিতিতে মেসেজটি রিসিভ করেন টি টি আর জালাল আহমেদ। তারপর হাকিমের নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনায় এই স্টেশন থেকে টি টি আর জালাল আহমেদ মেসেজটি বহির্বিশ্বে প্রচারের ব্যবস্থা করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন এই স্টেশনের টি টি আর জুলহাস উদ্দিন ও ইঞ্জিনিয়ারিং সুপারভাইজার শফিকুল ইসলাম, পাহাড়তলি অয়ারলেস অফিসের ক্যাশিয়ার আবুল ফজল, পাহাড়তলি ট্রান্সমিটিং স্টেশনের টি টি আর আবুল কাশেম খান। দেশে ও বহির্বিশ্বে মেসেজটির প্রচারকার্যে মনির আহমদ চৌধুরী, মোজাফফর হোসেন, শাহ্ আলম, নুরুল হক, বদরুল হোসেন কোরাইশি ও বদিউল আলম প্রমুখ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী উৎসাহ-অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। ২৬ মার্চ দুপুরে ও সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান স্বকন্ঠে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে এই মেসেজ অনুসারে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা প্রচার করেন।
    এদিকে ২৬ মার্চ ভোরে মগবাজার অয়ারলেস স্টেশনের ভিএইচএফ নেটওয়ার্কের সার্ভিস চ্যানেল ও মেরিটাইম মোবাইলেও সারা দেশের অনেক স্থানে মেসেজটি প্রেরণ করা হয়। সেদিন সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে পৌণে সাতটার ভিতর তা আবার চট্টগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসায় তাঁর স্ত্রী ডা. নুরুন নাহার জহুরের কাছে পৌঁছে । বস্তুত এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রথম মেসেজ।
    বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দ্বিতীয় মেসেজ হলো:
    This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.
    Sheikh Mujibur Rahman.

    চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী অফিসের টেলিপ্রিন্টারে ২৬ মার্চ রাত ১.১০ টায় এই মেসেজ আসে। এই রাতের শেষ দিকে মেসেজটি মগবাজার অয়ারলেস অফিস থেকে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট অয়ারলেস অফিসে রিসিভ করেন এই অফিসের সুপারভাইজার মোঃ নুরুল আমিন। ভোর রাতে মোঃ নুরুল আমিন থেকে নন্দনকানন অয়ারলেস অফিসে অয়ারলেস অপারেটর হিসেবে ডিউটিরত অবস্থায় মাহতাব উদ্দীন মেসেজটি রিসিভ করে চট্টগ্রামের তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, এম আর সিদ্দিকী, মান্নান, এম এ হান্নান প্রমুখকে মেসেজটি সম্পর্কে অবহিত করেন। রাতের মধ্যেই জহুর আহমদ চৌধুরীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা মাহতাব উদ্দীন থেকে মেসেজটি সংগ্রহ করেন। মাহতাব উদ্দীন ও তাঁর অন্যান্য সহকর্মীরা মেসেজটি ২৬ মার্চ দুপুর পর্যন্ত প্রচার করেন। এই সহকর্মীদের মধ্যে ফজলুল হক মজুমদারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাহতাব উদ্দীনরা উক্ত সময়ে সব জেলা অয়ারলেস অফিসেও মেসেজটি প্রেরণ করেন এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধকালীন জেনারেল নিয়াজির প্রেস সেক্রেটারি সিদ্দিক সালিক তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ (ইউপিএল,১৯৯৭) গ্রন্থে এই মেসেজের কথা স্বীকার করেছেন :
    ‘‘অনেকে রাস্তায় বিলম্ব হতে পারে, এই ধারণা থেকে রাত প্রায় ১১.৩০টা থেকে সেনানিবাস ত্যাগ করতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে যারা বেতার, টেলিভিশন কেন্দ্র, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, বিদ্যুৎ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক ইত্যাদির নিরাপত্তার জন্য শহরে অবস্থান করছিল, অপারেশন আরম্ভ হওয়ার অনেক পূর্বে তারা নির্ধারিত অবস্থানে পৌঁছে যান। …নির্ধারিত সময়ের পূর্বে আক্রমণ শুরু হয়। … ইচ্ছাকৃতভাবে নরকের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হলো। প্রথম গুলিবর্ষণের পর পর, শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষীণ শব্দ পাকিস্তান সরকারের বেতারের কাছাকাছি তরঙ্গে শুনা যায়। শব্দেও অনুমান করা যায়, এতে হয়তো, শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্বে ধারণকৃত বার্তার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ছাড়কৃত ঘোষণাপত্রের সম্পূর্ণ অংশটি বাংলাদেশ দলিল পত্রে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ হতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশ্যে বলছি, যে যেখানে আছেন এবং আপনার যা আছে, তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করেন। বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সর্বশেষ সৈন্য বিতাড়িত এবং পূর্ণ বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’’

    বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার এই দু’টি মেসেজ ছাড়াও আরও একটি মেসেজ রয়েছে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও সংসদ সদস্যগণ আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকীর বাটালি হিলের প্যানোরমা নামক ভবনে মিটিং করার সময় বঙ্গবন্ধুর এই মেসেজ সেখানে টেলিফোনে আসে। মেসেজটি প্রদান করেন প্রাগুক্ত এ কে এম মোশাররফ হোসেন। মেসেজটিতে লেখা ছিল :
    Liberate Chittagong
    Proceed to Comilla
    Take over the local administration.
    মেসেজটি পাওয়ার পর নেতৃবৃন্দ করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। তারপর এই মেসেজ ও আলোচনার উপর ভিত্তি করে রাত ৮.৪০ থেকে ৯টার মধ্যে চট্টগ্রামের হালিশহর ইপিআর সদর দপ্তরের অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিক পাকিস্তানি বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, , Chittagong to the fore অর্থাৎ চট্টগ্রাম সবার আগে। ২৫ মার্চ রাত ৮.৪০ থেকে ৯ টার মধ্যে চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন রফিকের মুক্তিযুদ্ধ সূচনার মধ্য দিয়ে একথা আবার প্রমাণিত হয়। এখানে উল্লেখনীয়, প্রাগুক্ত এ কে এম মোশাররফ হোসেন ১৯৯০ সালে শিল্পসচিব থাকাকালে একটি দাপ্তরিক পত্রে মেসেজটির কথা স্বীকার করেন। দাপ্তরিক পত্রটির নং: সচিব/শিল্প-৬৯/৯০, তাং-০৭/০৩/১৯৯০।

    (২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত শামসুল আরেফীনের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দুর্লভ দলিল অবলম্বনে)

    শামসুল আরেফীন : কবি, লোকগবেষক ও সহকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়- চট্টগ্রাম।

    Reply
    • Md Razibul Bari

      ১। ২৫ তারিখ সাড়ে এগারোটায় মেসেজ দিয়েছে – জহুর আহমেদের ছেলের সম্পাদনার বইয়ের কাভার পর্যন্ত পড়েই কমেন্ট করে দিলেন। ২। তারপরে আবার লিখলেন ২৬ তারিখ ভোরে মিসেস জহুরের কাছে আবারো গেল মেসেজ। এখন বলছেন এটা প্রথম মেসেজ। তাহলে ২৫ তারিখ সাড়ে এগারোটার মেসেজটা কয় নাম্বার? ৩। আর বলদা গার্ডেনের গল্প আপনার মত গবেষক লিখবে আশা করি নাই। আরও পড়াশোনা করে মন্তব্য আবার লেখেন। ৪। আবার লিখছেন আজাদির কাছে রাত ১ টা ১০ মিনিটে মেসেজ আসে – কোন রেফারেন্স নাই। ৫। কয়েকটা গল্পের বই থেকে কপি পেস্ট করে পরস্পর সাঙ্ঘর্ষিক একটা রচনা লিখলেন। ৬। আবার লিখছেন সিদ্দিক সালিক নাকি স্বীকার করেছে। আপনি কি বইটা কোনোদিন পড়েছেন? নাকি দেখেছেন? সেখানে স্পষ্ট বলা আছে উনি নিজে কানে সেসব শোনেন নাই। তাহলে স্বীকার কী জিনিস? ৭। সব শেষে নিজের লেখা গল্পের বইটার রেফারেন্স ফুটাইলেন। সোজা করে লিখতে পারতেন আপনার দুর্লভ বই আছে। সবাই দলে দলে কিনতে যেতো। ভালোই দেখাইলেন। কবি মানুষ – একটা কথা ভুললে চলবে না। ইতিহাস কোন কবিতা নয়।

      Reply
      • Samsul Arefin

        আমি বলেছি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ১১ টা থেকে ১১.৩০টার মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির উপর আক্রমণ শুরু করার পরে প্রায় ১১.৩০ টায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর পরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার মেসেজ আসে। আরও বলেছি, সেই মেসেজটিই ২৬ মার্চ ভোরে মগবাজার অয়ারলেস স্টেশনের ভিএইচএফ নেটওয়ার্কের সার্ভিস চ্যানেল ও মেরিটাইম মোবাইলেও সারা দেশের অনেক স্থানে মেসেজটি প্রেরণ করা হয়। সেদিন সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে পৌণে সাতটার ভিতর তা আবারও চট্টগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসায় তাঁর স্ত্রী ডা. নুরুন নাহার জহুরের কাছে পৌঁছে । আমি এখানে একটিমাত্র মেসেজের কথ‍াই বলেছি। সেটিকে প্রথম মেসেজ হিসেবে অভিহিত করেছি। আপনার পড়ালেখার দৌড় এত বেশি যে, বাক্যের অর্থ পর্যন্ত বোঝেন না। আপনি এখানে দুইটি মেসেজ খুঁজে পেয়েছেন।
        রেফারেন্সের কথা বলি, যেহেতু আমি বলেছি, এই লেখাটি আমার গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার দুর্লভ দলিল‘ অবলম্বনে। এর অর্থ লেখাটির সব রেফারেন্স সেই বইতে দেয়া আছে। বইটিতে অনেক দলিলও ছবি আকারে দেয়া আছে। সিদ্দিক সালিকের বই থেকে হুবহু উদ্ধৃতি দেয়ার পরও তা কেন অস্বীকার করছেন? কেন আপনার মনে হলো, আমি বইটি পড়িনি? সিদ্দিক সালিক কি কথাগুলো লিখেননি? আপনি প্রমাণ করতে পারবেন? শুনুন, সিদ্দিক সালিকের এই উদ্ধৃতি সম্বলিত বক্তব্য প্রবন্ধাকারে মেজর জিয়‍ার ঘনিষ্ঠ ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী কর্ণেল অলি আহমেদ তাঁর পিএইচডি থিসিসেও ব্যবহার করেছেন। আরও অনেকেও নিজেদের লেখায় ব্যবহার করেছেন। বলদা গার্ডেনের বিষয়টি সম্পর্কে শুনুন, মুক্তিযুদ্ধের পরে বিভিন্ন পত্রিকায় এই বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে।
        বস্তুত আমার লেখাটি আপনার কাছে গল্প মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস। তবে আপনারা কোনদিন মানতে পারবেন না। আপনি একটি মারাত্মক কথা বলেছেন,কপি পেস্টের কথা। আমি কপি পেস্ট করে লিখি না। একটু সতর্ক হয়ে লিখবেন।

  3. শিব্বির আহমদ আবির

    আহমেদ আবির
    আমাদের দেশটা এখন তোষামোদ আর তৈল মর্দনকারীদের দখলে। উল্লেখিত বইয়ের অন্যতম প্রধান লেখক এই তালিকায় অনেক আগে থেকেই অন্তর্ভূক্ত। আর নতুন করে যোগ হলে ঢাবি’র বর্তমান ভিসি আখতারুজ্জান জনাব। শিক্ষকরা জাতি গঠনের নিপুন কারিগরের তকমা গায়ে মেখে যখন ইতিহাস বিকৃতি,তোষামোদি আর বক্র মানসিকতা শিক্ষা দেন আর যাই এই জাতি কখনও উন্নত হতে পারবে না।

    Reply
  4. কাদের

    ভাড়ায় ইতিহাস চর্চা করলে এ ধরনেরই হয়। মুক্তিযুদ্ধ আবেগের, ব্যবসার না। এই মুনতাসীর মামুনের নিজের বইয়েই মুক্তিযুদ্ধ ও ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সাংঘর্ষিক তথ্য আছে এখন আছে সরকারি প্রজেক্ট নিয়ে।

    Reply
  5. শুভ্র

    বিস্মৃত ইতিহাসের কৃষ্ণগহ্বর থেকে উৎসরিত বিকিরণ গবেষণা করিয়া যদি প্রকৃত সত্য কিছু উৎঘাটন করা যায় নচেৎ আত্না বিক্রিত বুদ্ধিজীবীদের গোজামিল দেওয়া মনগড়া ইতিহাসকেই ধ্বংসাবশেষের ভষ্ম মনে করিয়া মিথ্যা সান্তনায় গৌরবময় ইতিহাসের পিপাসা নিবারণ করিতে হইবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—