“We are not going to leave a single of them alive, down to the babies in their mother’s wombs- not even they must live. The whole people must be wiped out of existence, and none be left to think of them and shed a tear.”

[ ট্রয় নগরী পতনের পর আগামেমননের নির্দেশ]

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার পূর্ব অংশের ( বর্তমান বাংলাদেশ, ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব বাংলা) স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তা শেষ হয় ঐ বছরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের অক্সিলারি ফোর্স রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ এর মাধ্যমে।

এই ২৬৬ দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের অক্সিলারি ফোর্সগুলোর তাণ্ডবকে নানা শব্দপ্রয়োগে প্রকাশ করা হয়।  এ ক্ষেত্রে ‘গণহত্যা’ শব্দটি সবথেকে বেশি প্রচলিত। বাংলাদেশ সরকার ও ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ পালনের ঘোষণা  দিয়েছে।

কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে রাষ্ট্র পাকিস্তানের নির্দেশে তাদের সেনাবাহিনী ও অক্সিলারি ফোর্সগুলো যে কার্যক্রম চালিয়েছিলো তা কি ‘গণহত্যা’ ছিলো অথবা ‘শুধুই গণহত্যা’?
গণহত্যা- এই বাংলা শব্দটির ইংরেজি ধারণা হলো ‘মাস কিলিং / মাস মার্ডার/ ম্যাসাকার’।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এর মতে ‘ কোন ঘটনায়, কোন বিরতি ছাড়াই যদি চারের অধিক মানুষকে হত্যা করা হয় সেটা মাস মার্ডার’। ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর লাস ভেগাসের মিউজিক ফেস্টিভ্যালে স্টিফেন প্যাডক নামে এক ঘাতক গুলি করে ৫৮ জনকে হত্যা করে সুনির্দিষ্ট কোন কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়াই। এটিও মাস মার্ডার, যদি আমরা বাংলায় বলি- তাহলে গণহত্যা।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালি জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংগঠিত কার্যক্রমকে স্রেফ ‘গণহত্যা’ বলে সংজ্ঞায়িত করা- বিষয়টির গুরুত্বকে ‘সামান্যকরণ’ করে কিনা ভাবার সুযোগ রয়েছে।

‘জেনোসাইড শব্দচয়ন, ‘রাফায়েল লেমকিন’ ও জাতিসংঘ কনভেশন

‘জেনোসাইড’ শব্দ হিসেবে তুলনামুলক নতুন কিন্তু প্রয়োগ ও ব্যবহারের সম্ভবতঃ মানুষের ইতিহাসের সমান পুরনো।

এই শব্দটি চয়ন ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একজন মানুষের প্রায় একক প্রচেষ্টা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তার নাম- রাফায়েল লেমকিন, একজন পোল্যান্ডবাসী ইহুদী যাকে নাৎসী অধিকৃত পোল্যান্ড থেকে নানা দেশ ঘুরে শেষ পর্যন্ত শরনার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে হয়।

লেমকিন প্রথম ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং এর পক্ষে  ক্যাম্পেইন শুরু করেন। ‘জেনোসাইড’ যে একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য- এটি স্রেফ গণহত্যা নয়, ঐতিহাসিক নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি এটা প্রমাণ করেন এবং ‘Axis Role in Occupied Europe’ বইটি লিখেন।

রাফায়েল লেমকিনের একক এবং জোরালো ক্যাম্পেইনের  প্রেক্ষিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে প্যারিসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ‘The Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide’  গৃহিত হয় যা ‘জেনোসাইড কনভেশন’ নামে পরিচিত ।

এই কনভেনশনের আর্টিকেল-২ এ  জেনোসাইডের একটা স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা হয়ঃ

any of the following acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnical, racial or religious group, as such:

(a) Killing members of the group;

(b) Causing serious bodily or mental harm to members of the group;

(c) Deliberately inflicting on the group conditions of life calculated to bring about its physical destruction in whole or in part;

(d) Imposing measures intended to prevent births within the group;

(e) Forcibly transferring children of the group to another group.

 

অর্থাৎ একটা জাতি/ নৃতাত্ত্বিক / গোত্র/ ধর্মীয় গোষ্ঠিকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সংগঠিত কার্যক্রমগুলো ‘জেনোসাইড’। রাজনৈতিক কারণে যতো বেশি সংখ্যক হত্যাকাণ্ডই ঘটুক না কেনো সেটি গণহত্যা হতে পারে কিন্তু জেনোসাইড বলে স্বীকৃত হবেনা।

লক্ষ্যণীয় এই আর্টিকেলে ‘Intent to destroy’ কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে অর্থাৎ ধ্বংস করার ইচ্ছাটা ও জেনোসাইড।

আর্টিকেল ৩ আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে নীচের সবগুলোই শাস্তিযোগ্য অপরাধ:

Article 3 defines the crimes that can be punished under the convention:

(a) Genocide;

(b) Conspiracy to commit genocide;

(c) Direct and public incitement to commit genocide;

(d) Attempt to commit genocide;

(e) Complicity in genocide.

একটা জাতি/ নৃতাত্বিক/ গোত্র/ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে ফেলার প্রকাশ্য ঘোষণা বা ধ্বংস করার জন্য কাউকে উৎসাহিত করা ও জেনোসাইড এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 

প্রেক্ষিত ১৯৭১, বাংলাদেশ

এবার ১৯৭১ এর প্রেক্ষিতে যদি আমরা দেখি- যে সকল নির্যাতনমুলক কার্যক্রমকে জেনোসাইড বলা হয়েছে অর্থাৎ হত্যা, শারীরিক ও মানসিক আঘাত, সম্পদ লুট, ধর্ষণ এর সব কিছুই পাকিস্তানি পক্ষ কর্তৃক এখানে সংগঠিত হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- এইসব জেনোসাইডাল অ্যাক্টগুলো সংগঠিত হয়েছে একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে আর তা হলো বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেয়া, আর্টিকেল দুইয়ে জেনোসাইডের সংজ্ঞায় যা বলা হয়েছে ‘Intent to destroy’ । এই ইন্টেন্ট বা অভিপ্রায়ের শুরু ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ নয় বরং পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির শুরু থেকেই।

১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলি  জিন্নাহ কর্তৃক  উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে গুলি করে হত্যা, রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ,  আরবী হরফে বাংলা লেখানোর চেষ্টা এগুলো যেমন ছিলো বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধ্বংস করার অভিপ্রায় তেমনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের মাধ্যমে ও বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করা চেষ্টা করা হয়েছে।

বাঙালি ‘প্রকৃত মুসলমান নয়’ ‘দুর্বল, কালো, বেটে’ এরকম চিহ্নিত করে বাঙালি জাতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে। মূলতঃ ১৯৪৮ থেকেই জেনোসাইডের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে এবং ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত থেকে তার কার্যক্রম শুরু।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনী, ইহুদীদের বিরুদ্ধে যে জেনোসাইড ঘটায় সেটি হুট করে ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিলোনা। এর আগের কয়েকবছর ধরে প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে, ইহুদীদের বিরুদ্ধে সামাজিক ঘৃণা তৈরি করা হয়েছে, নিজেদেরকে উৎকৃষ্টের গরিমা প্রচার করে রাষ্ট্রীয় সকল সমস্যার কারণ হিসেবে ইহুদীদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সমস্যার সমাধান হিসেবে ইহুদীদের নির্মুল করে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায়- সর্ব্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে।

২০ জানুয়ারি ১৯৪২, Wannsee Conference প্রণিধানযোগ্য। জার্মান শহরতলীর সুন্দর মনোরম পরিবেশে সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নানা বাহিনীর লোকজন সারাদিন ধরে আলোচনা করে- দুপুরে লাঞ্চ ও বিকেলের কফি পান করতে করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অধিকৃত ইউরোপের নানা দেশ থেকে ইহুদীদের তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পোল্যান্ডে- তারপর সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হবে। এই পরিকল্পনার একটা সুন্দর নাম ও গৃহীত হয়েছিলো সেই কনফারেন্সে- Endlösung der Judenfrage [ Final solution to the Jewish question]

Robert Payne তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ Massacre এ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি গোপন সভার কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছে- ‘Kill three million of them,and the rest will eat out of our hands.’

যদিও আর্টিকেল ২ এ আলাদাভাবে ধর্ষণকে জেনোসাইডাল অ্যাক্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবু পরবর্তীতে  বিশেষজ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করেছেন- ‘জেনোসাইডাল রেপ’ একটা জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে পরিকল্পিত ভাবে সংগঠিত হয় বলে- এটিও জেনোসাইডাল অ্যাক্ট।

Smith, Roger W  Genocide and the Politics of Rape  বইয়ে লিখেছেন,  “One objective of genocidal rape is forced pregnancy, so that the aggressive actor not only invades the targeted population’s land, but their bloodlines and families as well. However those unable to bear children are also subject to sexual assault. Victims ages can range from children to women in their eighties.”

বাংলাদেশ প্রসংগে জেনোসাইড বিশেষজ্ঞদের দেয়া তথ্য হচ্ছে

 “ During the 1971 Bangladesh Liberation War, members of the Pakistani military and supporting Bihari and Razaker militias raped between 200,000 and 400,000 Bangladeshi women in a systematic campaign of genocidal rape. Some women may have been raped as many as eighty times in a night.”  [Brownmiller, Susan;  Against Our Will: Men, Women, and Rape]

“Raped between 200,000 and 400,000 Bangladeshi women and girls. Resulted thousands of pregnancies, births of war babies, abortions, incidents of infanticide and suicide and led  to ostracisation of the victims.”

[ Herbert L. Bodman, Nayereh Esfahlani Tohidi 1998 Sharlach, Lisa (2000). Rape as Genocide: Bangladesh, the Former Yugoslavia, and Rwanda]

“Raped between 200,000 and 400,000 Bangladeshi women and girls. Resulted thousands of pregnancies, births of war babies, abortions, incidents of infanticide and suicide and led  to ostracisation of the victims”

[Herbert L. Bodman, Nayereh Esfahlani Tohidi 1998 Sharlach, Lisa (2000). Rape as Genocide: Bangladesh, the Former Yugoslavia, and Rwanda]

এই ধর্ষণগুলো স্রেফ যৌনতাড়না ছিলো না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাদের সৈনিকদের উস্কে দিয়েছে, এমনকি ধর্মীয় ফতোয়াও জারি করা হয়েছিলো। এইসব ধর্ষণের উদ্দেশ্য ছিলো- বাঙালি জাতিস্বত্বার স্বকীয়তা শেষ করে দেয়া, বাঙালি নারীর গর্ভে পাকিস্তানি সন্তান জন্ম দেয়া- যারা অনুগত থাকবে তাদের পিতৃগোষ্ঠির প্রতি। জাতি ধ্বংসের এই অভিপ্রায়ই জেনোসাইড, তাই বলা হয় এসব ‘ Genocidal Rape’

এ আলোচনায় আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- ২৬৬ দিনে টার্গেট কিলিং হয়েছে কী রকম? শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। এই হত্যাগুলোর উদ্দেশ্য ছিলো বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শূন্য করে দেয়া। একটা গবেষণায় দেখানো হয়েছে-

Systematically executed an estimated 991 teachers, 13 journalists, 49 physicians, 42 lawyers, and 16 writers, artists and engineers.

[Khan, Muazzam Hussain (2012). Killing of Intellectuals]

আরো ভুলে গেলে চলবেনা- এক কোটি মানুষকে ভারতে দুঃসহ শরণার্থী জীবন বেছে নিতে হয়েছিলো। দেশের ভেতরে আরো দুই থেকে চার কোটি মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে আভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতির শিকার হতে হয়েছে।

www.1971archive.org এর কাজ করতে গিয়ে আমরা আরো কিছু বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি, যেগুলো সাধারনতঃ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনায় অনুল্লেখ্য।

এককোটি শরনার্থীর মধ্যে কয় লক্ষ রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলো? মেঘালয়ের খাসিয়া হিলসে বালাট শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন- সিলেট,সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাম্মনবাড়িয়া, নরসিংদী অঞ্চলের কয়েকলক্ষ মানুষ। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মারা গিয়েছিলেন কলেরা ও ডায়রিয়ায়।

আমরা স্বাক্ষ্য পেয়েছি- নারীদের পাশাপাশি পুরুষ শিশু ও কিশোরেরা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন উল্লেখযোগ্য মাত্রায়।  বেসামরিক গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে বোমারু বিমানের আঘাতে। হাসপাতালে ঢুকে হত্যা করা হয়েছে কর্মরত চিকিৎসক ও সেবিকাদের।

একাত্তুরের ২৬৬ দিনে এখানে পাকিস্তান আর্মি ও তাদের অক্সিলারি ফোর্স যা ঘটিয়েছে সেটা কেবল হত্যা বা গণহত্যা নয়। গণহত্যা অবশ্যই ঘটেছে কিন্তু সেটা জেনোসাইডের একটা উপাদান হিসাবে, স্রেফ গণহত্যা বলে একাত্তুরের বিভীষিকাকে প্রকাশ করা যায়না। জেনোসাইডের বাংলা গণহত্যা নয়, জেনোসাইড নিজেই একটা অর্থবোধক শব্দ হিসেবে প্রচলিত, এর অনুবাদ জরুরী নয়।
নিজেদের প্রয়োজনেই এই সব শব্দ ব্যবহারে আমাদের জানা বোঝা ও বোধগম্যতার প্রয়োজন আছে, প্রয়োজন আছে সচেতনতা  ও সতর্কতার। জাতিসংঘ কর্তৃক জেনোসাইডের স্বীকৃতি বিষয়টি নিয়ে ভাবলেই এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে।

জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ীই ১৯৭১ এর ধ্বংসযজ্ঞ একটি স্পষ্ট  জেনোসাইড-  কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটি এখনো জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত জেনোসাইড নয়।

পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন আমেরিকান কনস্যুল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ওয়াশিংটনে যে জরুরি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন তার শিরোনাম ছিলো ‘Selective Genocide’ অ্যান্থনি মাসকারেন্স এর সেই বিখ্যাত রিপোর্টটিরও শিরোনাম ছিলো ‘ Genocide’.

 

উপলব্ধি ও স্বীকৃতি

বাংলাদেশ জেনোসাইডের পরে সংগঠিত কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা এবং বসনিয়া-হার্জেগোবেনিয়ার জেনোসাইড জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশেষ করে  বসনিয়া-হার্জেগোবেনিয়ার জেনোসাইড অতি দ্রুত স্বীকৃতি পেয়েছিলো।

এর পেছনের কিছু কার্যকারণ বিবেচনা করা জরুরি। যখনই কোন জেনোসাইড জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে যায় তখন আর সেটি কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন বিষয় থাকেনা, এটি তখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। জাতিসংঘ এবং রাষ্ট্র সমুহের তড়িৎ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় জেনোসাইড বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলে ও। শুধু তাই নয়, জেনোসাইড থামানোর পর এর জন্য দায়ীদের শাস্তি বিধান করা ও জাতিসংঘের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

বসনিয়ায় যখন সার্বিয়ানরা জেনোসাইড শুরু করে, ইউরোপের মানবাধিকার গোষ্ঠী ও রাষ্ট্র সমুহ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা জাতিসংঘকে বাধ্য করে দ্রুত এই জেনোসাইডকে স্বীকৃতি দিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে থামানোর এবং পরবর্তীকে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বসনিয়ান জেনারেলদের শাস্তি নিশ্চিত করে।

কম্বোডিয়া এবং রুয়ান্ডার ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। জেনোসাইডের জন্য  দায়ী ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক উদ্যোগে শাস্তি প্রাপ্য হয়- কোন কোন বিচার এখনো চলমান।

এই প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ইস্যু ও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক কোন পক্ষ কখনোই একে জেনোসাইড বলছেনা কারণ জেনোসাইড বললেই দায়িত্ব এসে পড়বে এটি বন্ধ করার এবং বিচার করার। যুক্তরাষ্ট্র ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলেছে যা আইনি কাঠামোতে শাস্তিযোগ্য বলে এখনো স্পষ্ট নয়।

জেনোসাইড বাংলাদেশ- জাতিসংঘ কর্তৃক এখন পর্যন্ত স্বীকৃত না হবার পেছনে আমাদের নিজেদের জানা বোঝা এবং কুটনৈতিক ও একাডেমিক উদ্যোগের অভাব তো অবশ্যই রয়েছে , সেই সাথে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও জড়িত আছে। বিশ্বের পরাক্রমশীল দুই পরাশক্তি চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ভূমিকা  তখন অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পাবে।বিষয়টি তাই সহজ নয়।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নৃশংস এই জেনোসাইডের স্বীকৃতি অবশ্যই জাতিসংঘকে দিতে হবে মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে। এই জেনোসাইডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের একাংশ যারা বাংলাদেশের নাগরিক- বাংলাদেশ নিজস্ব আদালতে তাদের বিচার করছে। যদি ও এই বিচারে জেনোসাইডের কথা বলা হয়নি, তাদের দ্বারা সংগঠিত অপরাধগুলোকে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’  হিসাবে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ এর মাধ্যমে বিচার চলছে।
কিন্তু যদি ১৯৭১ জেনোসাইডের জাতিসংঘ স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হয় তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচার এবং ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হবে।

এই বৃহৎ প্রেক্ষাপটের শুরু হতে পারে আমাদের ‘জেনোসাইড’ বিষয়টি বোঝা এবং একাত্তরের প্রেক্ষিতে ‘গণহত্যা’র বদলে ‘জেনোসাইড’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে।

হাসান মোরশেদপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান গবেষক, www.1971archive.org

Responses -- “গণহত্যা ও জেনোসাইড বিতর্ক: জাতিসংঘের স্বীকৃতি”

  1. BD24TOUR

    বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডকুমেন্টারী ২৬ মার্চ ১৯৭১, এসকে এন্টারটেনমেন্ট দ্বারা উপস্থাপিত।
    ভিডিও লিঙ্কঃ https://youtu.be/z-PpwQoz2Vc

    Reply

Leave a Reply to BD24TOUR Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—