প্রাচীনকালে নিয়েন বলে এক ভয়ানক জন্তু বা প্রেতাত্মা ছিল। সে প্রতিবছর গ্রামে এসে গ্রামবাসীর কাছে খাবার চাইতো। খাবার না পেলে সে শিশুদের ধরে খেয়ে ফেলতো। গ্রামবাসীরা তাই বাধ্য হতো নিয়েনকে বিপুল পরিমাণে খাদ্য জোগাতে। এছাড়া নিয়েন গবাদি পশুও খেয়ে ফেলতো। তারপর একবার নিয়েন গ্রামে এলো। সেখানে সে লাল রঙের পোশাক পরা এক শিশুকে দেখতে পেয়ে ভয়ে চিৎকার করে পালিয়ে গেল। তখন গ্রামবাসী বুঝতে পারলো নিয়েন লাল রঙ ভয় পায়। এরপর থেকে তারা লাল রঙের কাগজে মন্ত্র লিখে বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখে, নিজেরা লাল কাপড় পরে।

প্রচুর পরিমাণে আতশবাজি এবং পটকা ফুটানো হয়। বাজির শব্দে নিয়েন ভয় পেয়ে আর গ্রামে আসে না। এটি চীনের বসন্ত উৎসব সংশ্লিষ্ট লোকজ কাহিনী। চীনের বসন্ত উৎসব এখন জাতিসংঘ ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উৎসব বর্ণাঢ্যভাবে পালন করা হয়।

গ্রেকো-রোমান পুরাণেও রয়েছে বসন্ত উৎসবের কাহিনী। পার্সিফোনে ও দিমিতিরের কাহিনী গ্রেকো-রোমান পুরাণের একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়। গল্পটি প্রায় সকলেই জানে, তবু যারা ভুলে গেছেন তাদের আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি।

ধরিত্রী দেবী দিমিতিরের সুন্দরী হাসিখুশি কুমারী কন্যা পার্সিফোনে। সাথীদের সঙ্গে সে ফুল তুলছিল গ্রিসের উন্মুক্ত প্রান্তরে। হঠাৎ পাতালের গভীর থেকে উঠে আসে পাতালপুরীর রাজা হেডিস। পার্সিফোনেকে এক ঝটকায় তুলে নেয় তার রথে। তারপর টেনে নিয়ে যায় অন্ধকার রাজ্যে। মেয়ের শোকে স্তব্ধ হয়ে যান দিমিতির। তাকে খুঁজে বেড়ান মর্ত্যের সব জায়গায়। শোকার্ত মা ফসল ফলানো বন্ধ করে দেন। পৃথিবীতে নেমে আসে শীতকাল। মরে যায় ফসল। শস্যের ফলন বন্ধ হয়ে গেছে দেখে দেবরাজ জিউস তার দূত পাঠান হেডিসের কাছে। ফেরত দিতে হবে পার্সিফোনেকে। কিন্তু এর আগেই চারটি ফলের বীজ খেয়ে ফেলেছিলেন পার্সিফোনে। বলতে গেলে হেডিসই বুদ্ধি করে ফলের বীজ খাইয়ে দিয়েছিলেন তাকে। পাতালপুরীর খাদ্য খেয়ে ফেলায় আর পুরোপুরি ফিরে আসার সুযোগ পান না তিনি। বছরের চার মাস তাকে থাকতে হয় মৃত্যুরাজ হেডিসের রানী হিসেবে অন্ধকার জগতে। এই সময় মর্ত্যে চলে শীতকাল। আর যখন মায়ের কাছে রোদ ঝলমল পৃথিবীর বুকে ফিরে আসেন তিনি তখন শুরু হয় বসন্ত। গ্রিক মিথোলজির এই গল্পটি বসন্তের সঙ্গে সঙ্গে নতুন জীবন, নতুন ফসলের কথা বলে।

বিশ্বের বিভিন্ন পুরাণে রয়েছে বসন্ত নিয়ে গল্প। বৈদিক মিথোলজিতে বসন্তের প্রতীক হলেন কামদেব বা কন্দর্প। শিব তাকে ভস্ম করে দিয়েছিলেন বলে তার অন্য নাম অনঙ্গ বা অতনু। তিনি সুদর্শন যুবক। তার গায়ে বকুলের ঘ্রাণ। তিনি পুষ্পবাণ বহন করেন। তাঁর তূণীতে থাকা পাঁচ প্রকার ফুলের শর হলো- অশোক, শ্বেত পদ্ম, নীল পদ্ম, মল্লিকা ও আমের মঞ্জরী। অর্থাৎ যে ফুলগুলো মূলত বসন্তে ফোটে। তার স্ত্রী হলেন রতি যার জন্ম আকাঙ্ক্ষা থেকে। দেবী বসন্ত হলেন কামদেবের সঙ্গী। দেবী বসন্তের জন্ম হয় হতাশার দীর্ঘশ্বাস থেকে।

সুমেরীয়, মিশরীয় এবং ব্যাবিলনীয় পুরাণেও রয়েছে শীত ও বসন্ত নিয়ে নানা রকম কাহিনী। ব্যাবিলনীয়, আসিরীয় ও ফিনিশীয় পুরাণে সকল জীবের মাতা এবং প্রধান দেবী হলেন ইশতার। তার প্রেমিক হলেন ফসলের দেবতা তামুজ। প্রতি হেমন্তে তামুজের মৃত্যু হয়। সারা শীত ইশতার শোক করেন তার জন্য। আবার বসন্তে জীবিত হয়ে ওঠেন তামুজ।

বাঙালির বসন্ত উৎসব উদযাপনের রীতিও বেশ প্রাচীন। দোল উৎসব ও রাস পূর্ণিমা উদযাপন সুপ্রাচীন বসন্ত উৎসবের সঙ্গে জড়িত। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে হয় দোলযাত্রা। প্রাচীনকাল এবং বিশেষ করে মধ্যযুগ থেকে সাড়ম্বরে দোলউৎসব পালনের রীতি রয়েছে। এর পিছনে রয়েছে বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের ও গোপী-গোপিনীদের আবিরখেলার পৌরাণিক গল্প। বৈষ্ণব ধর্মমতে এই তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে তার সাথীদের নিয়ে রংখেলায় মেতেছিলেন। দোল ও বসন্তবরণ উপলক্ষে মেলা বসতো গ্রামেগঞ্জে। বাংলার বাইরে অবিভক্ত ভারতের অন্যান্য স্থানে এটি হোলি উৎসব নামে প্রচলিত ছিল। এখনও ভারতে বাংলার বাইরে হোলি এবং বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে দোল উৎসব হয়ে থাকে। বসন্তকালে রাসমেলা বা রাসযাত্রারও প্রচলন হয় মধ্যযুগে। মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের জন্য খ্যাত নবদ্বীপ থেকেই রাসমেলার উৎপত্তি। এটিও মূলত বসন্তকালেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশের খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রাসমেলা হয়ে থাকে। রাসমেলায় কীর্তনগানের আসর, নৃত্য ইত্যাদির আয়োজন থাকে। এছাড়া গ্রামে গ্রামে শীতলাদেবী বা বসন্তদেবীর পূজার রেওয়াজ ছিল প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার অনুপ্রেরণায়। শীতলা বা বসন্তদেবী ছিলেন বাংলার লোকজ দেবী।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় বসন্তবরণের আরেকটি অনুষ্ঠান ছিল বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ফাল্গুনী পূর্ণিমা উদযাপন। মধ্যযুগে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলী সনের প্রবর্তন করেন। সেসময় ১৪টি উৎসব পালনেরও রীতি প্রবর্তিত হয়। এর অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব। সেসময় বাংলার সকল সম্প্রদায়ের মানুষই বসন্ত বরণে বিভিন্ন লোকজ উৎসব ও মেলায় অংশ নিতেন। পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উদযাপনের রীতিও ঐতিহ্যবাহী।

ইংরেজ শাসনামলে শহরে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি পাশ্চাত্যের অনুকরণের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসেছিল। শান্তিনিকেতনে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নতুন করে আমাদের দেশজ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রয়াস থেকে বসন্ত উৎসব উদযাপনের রীতি প্রবর্তন করেন। দোল পূর্ণিমাকে সামনে রেখেই এটা করা হয়। তবে দোলের সঙ্গে বিশেষ ধর্মের সম্পৃক্ততার কারণে রবীন্দ্রনাথ ধর্মনিরপেক্ষ বসন্ত উৎসব উদযাপনের কথা চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই শান্তি নিকেতনে এখনও প্রতিবছর বসন্ত বরণ উৎসব হয় যাতে সব সম্প্রদায়ের মানুষই অংশ নেন।

পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির উপর একের পর এক আঘাত হানতে থাকে পাকিস্তানি শাসকরা। অন্যদিকে প্রতিবাদস্বরূপ বাঙালি আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে আগ্রহী হয়। ষাট দশক থেকেই পহেলা ফাল্গুনে হলুদ শাড়ি পরা নতুনভাবে শুরু হয়। ছোটবেলায় (স্বাধীনতার পর) আমার নানীকে দেখেছি পহেলা ফাল্গুনের আগে শাড়িতে ফুল দিয়ে রং ছাপ করতে। তখন বাজারে ফাল্গুনের এত রকম শাড়ি বা পোশাকের বাহার ছিল না। তবে হলুদ শাড়ি বা বাসন্তী রঙের শাড়ি, গাঁদা ফুলের মালা পরার রীতি সীমিত পর্যায়ে হলেও ছিল।

১৯৯৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসব উদযাপন শুরু হয় ঢাকার চারুকলায়। জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন কমিটি তখন থেকেই নিয়মিত চারুকলার বকুলতলায় এবং ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরে বসন্ত বরণের জন্য উৎসবের আয়োজন করছে। তবে বসন্ত বরণের এসব উৎসব নগরকেন্দ্রিক। গ্রামে কিন্তু বসন্ত বরণের জন্য লোক সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী সেই দোল, রাস উৎসব টিকে আছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে।

ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গ্রামে গঞ্জে বিভিন্ন উপলক্ষে মেলা বসারও রেওয়াজ আছে।

বসন্ত বরণ আমাদের লোকজ ঐতিহ্যবাহী উৎসব। বসন্তের সঙ্গে সারা বিশ্বেরই লোক সংস্কৃতির যোগ রয়েছে। পহেলা ফাল্গুনের বসন্তবরণ উৎসব ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে উৎযাপিত আনন্দ উৎসব। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের এই ধরনের সম্প্রদায় নির্বিশেষে পালন করা যায় এমন উৎসবের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এতে একদিকে যেমন লোকজ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ হবে তেমনি জাতিগত ঐক্যও বৃদ্ধি পাবে। নতুন প্রভাতে বসন্তের ফুল ফুটবে। বসন্তের সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনেও ফুটুক শুভবোধ, শুভ চেতনা।

শান্তা মারিয়ালেখক; সাংবাদিক।

One Response -- “গল্পগুলো বসন্তের”

  1. প্রিসিলা রাজ

    দেশীয় উৎসব ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার বর্ণীল উদযাপন এবং সেই চেতনার উদযাপন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জন্য জরুরি তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ধর্মপরায়ণ মানুষও উপলব্ধি করেছিলেন। এই বার্তা ক্রমশ ধর্মান্ধতার পথে আগানো আমাদের সমাজকে যেন দিশা দেখাতে পারে। লেখককে ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—