যদিও প্রতিটা প্রক্রিয়াই খুব একটা সহজ বা ভিকটিম-বান্ধব ছিল না, ভিকটিমদের পেরুতে হয়েছে নানা চড়াই-উতরাই, তারপরও খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে নারী নির্যাতনের তিনটি ঘটনা যে আইনের আওতায় এসেছে– এটাকে সাফল্য হিসেবে না দেখে উপায় নেই।

প্রথম ঘটনাটা রিপোর্টেড হয়েছে তিন মাস পর।

এই তিন মাস ধরে ওই দুই ভিকটিম কী কী মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, সেটা সহজেই অনুমেয়। তিন মাস ধরে প্রতিটি মুহূর্তে তাঁরা বুঝেছেন তাঁরা নির্যাতিত এবং এই নির্যাতনের প্রতিকার পাওয়ার অধিকার তাদের আছে, কিন্তু সেই প্রতিকার পাওয়ার উপায়টি হয়তো তাঁরা খুজে পাননি।

উপরন্তু নির্যাতনকারী তো বটেই, অন্যদের দ্বারাও হয়তো নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাঁরা। এটা যে কতটা অমানবিক, কতটা নির্দয়, কতটা ভেঙেচুড়ে দিতে পারে ভিকটিমকে, শুধু ভিকটিমকেই নয়, সংশ্লিষ্ট অন্য সবাইকেও– অন্যদের জন্য তা অনুমান করাও কঠিন।

দ্বিতীয় ঘটনাটা অবশ্য ঘটার পরপরই রিপোর্টেড হয়।

কোনো হয়রানি, সমঝোতা প্রস্তাব, কালক্ষেপণ ছাড়াই প্রতিকার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়।
এটা ধরে নেওয়া কি ভুল হবে যে এখানে প্রথম ঘটনার যেসব কর্তৃপক্ষীয় গাফিলতি ছিল, তা সংশোধনের একটি প্রচেষ্টা দেখা গেছে? তা যদি হয়, নিঃসন্দেহে তা একটি আশার কথা, উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা।

এবার আসি আসল ঘটনায়। আগের দুই ঘটনায় নির্যাতনকারী স্বল্প পরিচয়ের একজন বহিরাগত। মানুষ সাধারণত এ ধরনের স্বল্প পরিচয়ের বহিরাগতদের সংস্রবে খুব একটা আসে না। আর ঘনিষ্ঠ হয় আরও কম। তারপরও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু সহজেই অনুমিত যে সেগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক কিছু নয়।

আবার কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে, সে সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা চালালে, রিপোর্টেড ঘটনাগুলো এভাবে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হলে, এগুলো প্রতিরোধ আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব। কিন্তু তৃতীয় ঘটনাটা এসব দিক দিয়ে ব্যতিক্রম।

একজন নারীর সবচেয়ে নিরাপদ যে স্থান, সেই নিজের ঘরে যৌন নিগ্রহের মুখোমুখি হওয়ার মতো ঘৃণ্য ঘটনা আর কী হতে পারে, আমার জানা নেই। আবার তা যদি ঘটে পিতৃস্থানীয় কারো হাতে– সংস্কৃতিগত, ইতিহাসগত, ধর্মীয় ইত্যাদি নানাভাবে যার বা যাদের হওয়ার কথা ওই নারীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সবচেয়ে বড় রক্ষাকারী।

প্রশ্ন হল, এ রকম একটা জঘণ্য ব্যাপার আট বছর ধরে কীভাবে ঘটে যেতে থাকল? আর কেউ কি তা আঁচ করেনি? করলেও কি তার প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি?

আট বছরেও আঁচ করতে না পারাটা অসম্ভবই মনে হয়। আর আঁচ শুধু না, ভালোভাবে জানার পরও প্রতিকারে কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারার কারণ অনুমান করে নেওয়া যায়।

এ ধরনের একটি ঘটনা যত কষ্টেরই হোক, আমাদের বোধ বলে, “এটা জানাজানি হলে লোকে কী বলবে?”

এরপরই আসে সেই ভাবনা, “কথাটা কাকে বলি? সেই না আবার আমাকেই দোষী ভেবে বসে।”

আইনের আওতায় আনার কথা ভাবা তো আরও কঠিন। এ দেশের বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আমাদের যে ধারণা তাতে করে যে কোনো ভিকটিমেরই এক হয়রানি থেকে বাঁচতে নিজে যেচে আরেক হয়রানি মাথা পেতে নিতে অনীহা জাগারই কথা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম, কেউ কেউ বলেছে: মেয়েটির (বা তাঁর মায়ের) উচিত ছিল ঘরের মধ্যেই কিছু একটা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার।

ভাগ্যিস তাঁরা তা নেননি। তাহলে আজ যে শুধু তাঁরা অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতেন, তা-ই নয়, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের একটা সুযোগ যে পাওয়া গেছে– সেটা পাওয়া যেত না।

আসুন দেখি, কী কী সুযোগ এসেছে এসব প্রতিরোধের?

প্রথমত, এই স্টেরিওটাইপিংয়ে নাড়া দেওয়া গেছে যে নারীর একজন হলেও আশ্রয়ের জায়গা আছে। কারণ, একলা নারীর জন্য আসলেই কোনো নিরাপত্তা নেই। নিশ্চিত কোনো আশ্রয় নেই। একজন একলা নারী শুধু শারীরিক নয়, যৌন নির্যাতনেরও সম্মুখীন হতে পারেন যে কোনো পুরুষের দ্বারা, তা তিনি যত নিকটাত্মীয় বা যত রক্ত-সম্পর্কীয় হোন না কেন।

এটার অর্থ এই না যে সব পুরুষ খারাপ। বরং এটার অর্থ হল এই যে, একজন নারী যখন নিগৃহীত হওয়ার অভিযোগ করবেন, অভিযোগটা যত ঘনিষ্ঠজনের বিরুদ্ধেই হোক না কেন, তা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সেটাকে একটা পদ্ধতিগত তদন্তের আওতায় আনতে হবে। আর সম্ভব হলে, ঘনিষ্ঠতা যত নিকট ‘বার্ডেন অব প্রুভ’ তত বেশি অভিযুক্তের ওপরে বর্তানো।

 

53504453

 

এ দেশে কোনো ভিকটিমই যে একেবারেই কোনো প্রতিকার পায় না, এমন কিন্তু নয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সেই প্রতিকার পাওয়ার জন্য তার কোনো না কোনো মহীরূহর আশীর্বাদ পাওয়ার দরকার পড়ে। সেটা হতে পারে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অথবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

এই ব্যাপারটাকে তাই সাধারণ মানুষের জন্য মোটেও প্রতিকারবান্ধব পরিবেশ বলার জো নেই। কারণ, সাধারন মানুষ ওই পর্যন্ত পৌঁছাবে কীভাবে? তাই এ জন্য চাই এমন একটি পদ্ধতিগত সাহায্যব্যবস্থা যেখানে মামা-চাচা না ধরেই নারী তাঁর ওপর ঘটা নিগ্রহ বা সহিংসতার প্রতিকার পেতে পারেন।

বেশ কিছুদিন ধরেই নারী ও শিশু বিষয়ক ন্যাশনাল হেল্পলাইন এ ধরনের একটি পদ্ধতিগত সাহায্য দেওয়ার কাজ করছে। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘জয়’ নামক একটি অ্যাপস।

আগের তিনটা ঘটনার কোনোটতে এই অ্যাপস বা হেল্পলাইনের সহায়তা নেওয়া হয়েছে কি না, তা আমি জানি না। কিন্তু যদি তা হয়ে থাকে এবং সেখান থেকে সহায়তা পাওয়ার কারণেই যদি এই ঘটনাগুলো বিচারের আওতায় এসে থাকে, সেটা নিঃসন্দেহে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন, যা নীরবেই ঘটে গেছে নারীর নিরাপত্তা উন্নত করতে।

হয়রানির শিকার হয়ে একজন নারী কতটা বিধ্বস্ত বোধ করে, তা আমরা অনুমান করতে পারি। সেই রকম এক অবস্থায় ‘জয়’ অ্যাপস ব্যবহার করে কীভাবে একজন নারী অল্প সময়ে ‘ফাইট-ব্যাক’ করার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন, সেরকম একটা ঘটনা বলি।

গভীর রাতে অনলাইনে হ্যারাসড হয়ে একটি মেয়ে খুবই ভেঙে পড়ে। নিকটাত্মীয় ও পরিচিতদের কাছে সহায়তা চেয়েও সে ততটা সাড়া পায়নি। সবাই বরং তাকেই দুষেছে, হ্যারাসমেন্টের সুযোগ কেন তৈরি হল, সে জন্য। প্রায় ১২ ঘণ্টা অস্থির সময় কাটিয়ে মেয়েটি ঘটনাটা আমাকে জানায়।

প্রথমে আমি তাকে বললাম, ১০৯২১ হেল্পলাইনে কল দিয়ে ঘটনাটা জানাতে।

বলল, নম্বরটা কাজ করছে না।

খোঁজ নিয়ে বললাম, ১০৯ নম্বরে কল দিতে।

দেখা গেল, ওই নম্বরে কল যাচ্ছে কিন্তু তা রিসিভ হচ্ছে না। তখন বললাম, ‘জয়’ ইন্সটল করে সেখানে স্ক্রিনশটসহ কমপ্লেইন জানাতে।

কমপ্লেইন জানানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে কেউ একজন ফোন নম্বর চেয়ে ইমেইল করেন। আধঘণ্টার মধ্যে ফোনে যোগাযোগ করে বলেন:

“এক্ষুনি ওমুক থানায় যান, আমরা বলে রাখছি। আপনাকে একটা জিডি করতে হবে শুধু। আর তা করতে গিয়ে কোনো হয়রানি যে হবেন না, এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আপনার জিডি পেলেই হয়রানিকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শুধু এই তথ্য ও সহযোগিতাই নয়, যেভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ আবহ তৈরি করে আশ্বস্ত করে কথাগুলো হেল্পলাইনের থেকে জানানো হল, মেয়েটি তার হারিয়ে ফেলা সব আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। ব্যাপারটা সে শক্ত হাতে মোকাবেলা করে এবং পুরো ঘটনায় যে ট্রমার সম্মুখীন সে হয়েছিল, তা থেকেও সে বেরিয়ে আসে।

ঘটনাটা বললাম এ জন্য যে, একটা পদ্ধতিগত সাপোর্ট সিস্টেম থাকা যে কোনো অন্যায় মোকাবেলার জন্য ভিকটিমকে অভাবনীয় শক্তি দেয়। এতে করে তাঁর জন্য রুখে দাঁড়ানো সহজ হয়। আর কে না জানে, অপরাধী সবসময় দুর্বল হয়। তাই ভিকটিম রুখে দাঁড়াতে পারে, এই ভয়টা যেমন তাঁকে অপরাধের থেকে দূরে রাখবে, একইসঙ্গে এর মধ্য দিয়ে ক্রাইম প্রিভেনশনও করা সম্ভব হবে।

মনে রাখতে হবে, নিকটজনের কাছে নিগৃহীত হওয়ার এই ঘটনাটা কিন্তু একমাত্র ঘটনা না। এরকম অন্য ঘটনাগুলির সুরাহা করতে ‘জয়’ অ্যাপস এবং হেল্পলাইন ফ্যাসিলিটির কথা আরও বেশি বেশি প্রচার করা দরকার। স্কুল-কলেজে এ নিয়ে ওয়ার্কশপ করা দরকার।

প্রত্যেক নারী ও শিশুকে সচেতন করা দরকার যে দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যেই গোপনীয়তা রক্ষা করে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ আছে। আর তা পেতে তাদের খুব বেশি ঝামেলাও পোহাতে হবে না। এমনকি তাঁর নিজেরও অভিযোগ দেওয়ার দরকার পড়বে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর হয়ে অন্য কেউও তা করতে পারবেন।

প্রযুক্তির ব্যবহারে নারী কেন শুধুই অনিরাপদ হবে? এই প্রযুক্তি দিয়েই বরং নারীকে আরও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ করে দিতে হবে।

কাজী আহমদ পারভেজফ্রিল্যান্স লেখক ও গবেষক

Responses -- “নারীর নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি লেখা। কিন্তু আমার সেই রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’-এর কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে; রাজ্য থেকে ঝেঁটিয়ে ধুলো বিদায় না করে পা দু’খানা মুড়ে নিলেইতো হয়। অর্থাৎ, আমি বলতে চাচ্ছি আমার ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা নৈতিকতাবোধই পারে নারীর সম্ভ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তাহলে প্রযুক্তি আর পুলিশি ব্যবস্থার কোন প্রয়োজনই হয় না। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকেই সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশা করি বিষয়টি বোঝাতে পেরেছি।

    Reply
    • পারভেজ

      “আমি বলতে চাচ্ছি আমার ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা নৈতিকতাবোধই পারে নারীর সম্ভ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।” – পৃথিবীর এমন একটা দেশের নাম বলতে পারবেন, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ নৈতিকতাবোধ এর মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা রক্ষা হয়েছে?
      শুধু শুধু ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখে কি লাভ?
      নারীর নিরাপত্তা চাইলে অনিরাপদ করাটা রুখতে হবে। অন্য আর কোনো কিছুই কাজে দেবে না। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ…

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—