১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮। নিউ ইয়র্ক শহরে আরকেটি সুন্দর দিনের শুরু, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে আবাসন খাত সমস্যাসংকুল সময় অতিবাহিত করছিল। তারপরও কে ভেবেছিল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কী এক মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করে আছে?

এটা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক অর্থনৈতিক সহায়তা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর যখন ১৫৮ বছরের পুরনো বিনিয়োগ ব্যাংক ‘লেহম্যান ব্রাদার্স’ নিজেদের চাপ্টার ১১ দেওলিয়া ঘোষণা করে। একই দিন ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’ ধুঁকতে থাকা অপর এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘মেরিল লিঞ্চ’কে সম্ভাব্য পতনের হাত থেকে রক্ষার নিমিত্তে কেনার ঘোষণা দেয়।

অবিশ্বাস্য এক সপ্তাহ! বিশ্ববাসী একের পর এক বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পতন প্রত্যক্ষ করতে থাকে।

সেপ্টেম্বরের ১৬ তারিখে আর এক মহিরুহ কর্পোরেট হাউস ‘আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ’-এর শেয়ারের মূল্যের ৯৫% দরপতন ঘটে। প্রতিষ্ঠানটি বছরের প্রথম ছয় মাসে রেকর্ড ১৩.২ বিলিয়ন ডলার লোকসান ঘোষণা করে এবং একই সঙ্গে চরম তারল্য সংকটে নিপতিত হয়। এরকম এক অসহনীয় পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি যখন অন্য কারো কাছ থেকে ঋণ পেতে ব্যর্থ, তখন তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ফেডারেল রিজার্ভ ৭৯.৯% মালিকানার বিনিময়ে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা প্রদান করতে সম্মত হয়।

একের পর এক দুঃসংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের তাবৎ বৃহৎ শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস নামে। যদিও অক্টোবরের ১ তারিখ থেকে দরপতনের শুরু, কৃষ্ণ সপ্তাহের শুরু অক্টোবরের ৬ তারিখে যা অব্যাহত থাকে টানা পাঁচ কর্মদিবস পর্যন্ত।

মধ্য অক্টোবরে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিলেও ওই মাসের শেষে দ্বিতীয় বারের মতো নামে ধস। ‘ডাও জোনস’, ‘স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর ৫০০’, ‘নাসডাক’সহ সব সূচকের নজিরবিহীন পতন ঘটে। তারপরের ঘটনা আমাদের সবার জানা।

সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে তথাকথিত ‘বেলআউট প্যাকেজ’-এর জন্য মার্কিন করদাতাদের ব্যায় করতে হয় আকাশচুম্বী ৯.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা পুণরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাজ্যসহ অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর বরাদ্দের পরিমান দাঁড়ায় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার।

 

N Roubini

 

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন এসে যায়: এটা কি কোনো দৈবদুর্বিপাক? কেউ কি ঘুণাক্ষরেও এই মহাবিপর্যয়ের আভাস পায়নি? বিশ্বখ্যাত নামিদামি গবেষণা কিংবা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর মেধাবী, সদা সতর্ক চোখ কীভাবে এড়িয়ে গেল এরকম এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসযজ্ঞ?

তথ্যপ্রমাণ বলে নৌরিয়েল রুবিনি নামের এক অর্থনীতিবিদ এই আসন্ন বিপদের আঁচ আগে থেকেই করতে পেরেছিলেন। ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল’ কর্তৃক ২০০৬ সালে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি তাঁর এই আশংকার কথা প্রথম ব্যাক্ত করেন। তিনি যখন থেকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার কথা বলতে শুরু করেন তখন অনেক প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদে তাঁকে ‘জনাব নেতিবাচক’ (Mr. Negative) বা ‘জনাব নিয়তি’ (Mr. Doom) বলে আখ্যায়িত করেন।

দুই বছর পর যখন সত্যি বিপর্যয় ঘটে তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এই রীতিবিরুদ্ধ অর্থনীতিবিদ। সবাই তখন তাঁর দ্বারস্থ: আর কি কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে? এ থেকে মুক্তিরই বা কী উপায়?

জনাব রুবিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির একজন অধ্যাপক। ইতোপূর্বে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে তাঁর জন্ম। দুই বৎসর বয়সে পরিবারসহ তাঁরা ইরানের রাজধানী তেহরানে স্থানান্তরিত হন। অতঃপর তেল আবিব এবং পরবর্তীতে ইতালিতে বসতি স্থাপন করেন, যেখানে তাঁর বেড়ে ওঠা।

কলেজ পর্যন্ত শিক্ষা তিনি ইতালিতেই সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গমন, সেখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। অধ্যাপক রুবিনি বহু ভাষাবিদ হিসেবেও খ্যাত। তিনি ফার্সি, হিব্রু, ইতালিয়ান ও ইংরেজি ভাষায় সমানভাবে দক্ষ।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্দ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন রুবিনি তাঁর বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি একইসঙ্গে উচ্চতর গণিত, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে ছিলেন সমানভাবে পারঙ্গম। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাকস, যিনি হার্ভার্ডে রুবিনির পরামর্শক ছিলেন, স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন:

“সে ছিল এক দুর্লভ দক্ষতার সংমিশ্রণ, একটা সম্পূর্ণ প্যাকেজ যা সচরাচর একজন মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় না।”

১৯৮৮ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে যোগদান করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আরেক স্বনামখ্যাত অর্থনীতিবিদ রবার্ট সিল্লারের সঙ্গে, যিনি ১৯৯০ সালে সংঘটিত ‘টেক বাবল’ নিয়ে ক্রমাগত সতর্ক করে গেছেন।

কী বলেছিলেন তিনি ২০০৬ সালের সেই সেমিনারে? রুবিনি মূলত তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন–

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতের সমস্যা অচিরেই দূর হবে না বরং তা খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে;
দ্বিতীয়ত, উপমুখ্য বন্ধকি বাজারের (subprime mortgage market) দুর্বলতা আর্থিক খাতের জন্য আরও বড় সমস্যার কারণ হবে এবং
তৃতীয়ত, তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার সমুহ ঝুঁকির ব্যাপারে আলোকপাত করেন।

তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণীর দুই বছরের মাথায় বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করল সেই ভয়ানক মন্দা পরিস্থিতি।

বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ যখন একান্তভাবে ইকনোমেট্রিক সূত্রের উপর নির্ভর করেন, অধ্যাপক রুবিনি মনে করেন, কেবলমাত্র সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতি বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বিশ্লষণে যথেষ্ট নয়। যে কারণে তিনি তাঁর বিশ্লষণে ঐতিহাসিক উপমিতি (historical analogies), অবস্থাগত পর্যবেক্ষণ (circumstantial observation), অন্তর্জ্ঞান (intuition) ইত্যাদি বিষয়ের উপর সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান করেন।

তাঁর বেশিরভাগ পূর্বাভাস একেবারেই সাধারণ উপাত্ত, যেমন চাহিদা যোগান মডেল, আবাসন মূল্য ও বাড়ি ভাড়ার অনুপাত ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে অনুমিত হয়। রুবিনির সহকর্মী ক্রিস্টিয়ান মেনেগেটটি বলেন:

“অন্য অর্থনীতিবিদরা যখন উপাত্ত বিশ্লষণে পুরোমাত্রায় কম্পিউটার সফটওয়্যায়ের উপর নির্ভরশীল, তখন রুবিনি নির্ভর করেন তাঁর মস্তিষ্কের উপর।”

এটা এখন প্রমাণিত যে, অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত পদ্ধতি সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রশমনে যথেষ্ট কার্যকরী নয়। বিশ্ববাসীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে এই শিক্ষা পেতে। নীতিনির্ধারক মহল যদি অধ্যাপক রুবিনির কথায় কান দিতেন, সম্ভবত এরকম বিপর্যয় এড়ানো যেত।

সাজ্জাদুল হাসান
চেয়ারম্যান  ও  ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিএএসএফ বাংলাদেশ লিমিটেড

One Response -- “নৌরিয়েল রুবিনি: একজন ব্যতিক্রমী অর্থনীতিবিদ”

  1. mesbah

    অর্থনীতিবিদরা সাধারণত কোন বিপর্যয়ের পর তার কারণ খুঁজে বের করতে সিদ্ধহস্ত। ২০০৭-২০০৮ বিশমন্দার আগেই আমেরিকার হাউজিং সেক্টর বাবল যে এর জন্য দায়ী এবং একজন অর্থনীতিবিদ তা আভাষ দিয়েছিলেন তা এই প্রথম জানা গেল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—