ঢাকা শহরের বস্তি বাড়ছে না কমছে– এ তথ্য আমরা ইদানীং জানতে পারছি যেহেতু বেশকিছু বস্তি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা কর্তৃপক্ষ ভাবছে। সাধারণভাবে বস্তিতে যারা থাকে তাদের আমরা খুব একটা দুশ্চিন্তা না করে গরিব বলতে পারি। এটার জন্য কোনো প্রশিক্ষণ বা গবেষণা লাগে না। কিন্তু যে তথ্যটি বের হয়ে আসছে সেটা হচ্ছে, বড়লোক আর গরিবের বৈষম্যের সূচক যদি জানতে হয় তাহলে এ দুই শ্রেণির আর্থিক অবস্থা দেখলে বোঝা যায়।

বাংলাদেশে বড়লোকদের প্রধান আবাসভূমি যদি গুলশান হয় তাহলে ঠিক তার পাশে বসে থাকা কড়াইল বস্তি গরিবের আস্তানা। মজার বিষয় হল কড়াইল ঢাকার বস্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে; অন্যগুলোর অবস্থা অনেক খারাপ। তারপরও যারা এ বস্তির জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত তারা জানে, টিকে থাকা এ মানুষগুলোর জন্য কত কঠিন।

সামান্য একটা তথ্য আমাদের বিচলিত করে। কারণ বৈষ্যমের যত সূচক আছে তার মধ্যে গড়পড়তা আয় অন্যতম। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, ঢাকার ওপর তলার মানুষের গড় মাসিক আয় প্রায় তিন লাখ টাকা, আর গরিবের গড় আয় আট হাজার টাকা। প্রতীকী অর্থে হলেও আমাদের যে বৈষ্যমের ভিত্তি করে সমাজ, প্রকারান্তরে রাষ্ট্র টিকে আছে তা এই দুই হিসাবের মাঝখানে বর্তমান।

প্রতীকের কথা বলতে গিয়ে এ তথ্যটি এসেই পড়ে: ঢাকায় বড়লোকদের জীবনযাত্রার ওপর তেমন কোনো গবেষণা হয় না। বড়লোকরা পর্দার আড়ালে জীবনযাপন করে। এই পর্দার যে উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সম্ভ্রম ও ইজ্জত রক্ষা করা সেটা বড়লোকরা বেশ ভালোই পারে। কারণ ‘সামাজিক হিজাবে’র অন্তরালে তারা কী করে– সেটার খবর আমরা পাই না, শুধু মাঝেমধ্যে আঁচ পাই। ঠিক তেমনভাবে তাদের সঙ্গে লাগতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হয় সেটার দিকে তাকাতে হয়।

প্রসঙ্গটা এ কারণে আসছে যে মহাখালী এলাকাতে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বস্তি ও বাসস্থানে আগুন লেগেছে। অনেকে এটাকে বলছে ‘আগুন থেরাপি’, অর্থাৎ গরিব এখন ক্ষত বা রোগের মতো, সেটা সারানোয় আগুন ব্যবহার করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের গরিবের সহ্য ক্ষমতা এতই বেশি যে আগুনে ছ্যাঁকা খাওয়ার পরও তারা রয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আগুনে কাজ হচ্ছে– এমনটা বলা যায় না।

কিন্তু গরিব তাড়িয়ে ঢাকায় সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। বেশ কিছু গবেষণার কাজ চলছে বিত্তহীন মানুষের ওপর যা প্রমাণ করে গরিব ঢাকায় বেশ গেড়ে বসেছে, অর্থাৎ তারা ঢাকা আর না-ও ছাড়তে পারে। এই ঢাকা শহর না-ছাড়া গরিবদের নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। কীভাবে তাড়াতে হয় সেটা বড়লোক শ্রেণি এবং প্রশাসন বুঝতে পারছে না। কোনো বা কোনোভাবে তারা টিকেই থাকছে।

 

21_Karhail+Slum_Fire_AMO_041216_0037
দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের গরিবের সহ্য ক্ষমতা এতই বেশি যে আগুনে ছ্যাঁকা খাওয়ার পরও তারা রয়ে যাচ্ছে

 

বড়লোকদের তথা ক্ষমতাবানদের রাগের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ও আমলাদের বইতে ঢাকায় বস্তিবাসীদের ওপর তাদের আক্রমণ ও ঘৃণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তারা এদের ভয়ও পেয়েছিল। যে কারণে পঁচিশে মার্চের রাতে আক্রমণ হয়েছিল বস্তিগুলোর ওপর, যদিও সেগুলো প্রতিরোধকেন্দ্র ছিল না।

কিন্তু এখনকার তুলনায় একাত্তরের বস্তিবাসী অনেক সাহসী ছিল। কারণ তাদের সামনে ছিল ইতিহাস। তারা আশা করার সাহস পেয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৫০ বছর পরে বস্তিবাসীর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে আর তারা ভাবে না এই শহর তাদের, বড়জোর ভাবতে পারে বস্তিগুলো তাদের সাময়িক বাসস্থান।

কিন্তু তেমন দুশ্চিন্তায় ভোগে না ঢাকায় বড়লোক শ্রেণি। তাদের দম্ভ এবং আত্মবিশ্বাসের শ্রেষ্ঠতম প্রতীক হচ্ছে বিজিএমইএ বিল্ডিং। বাংলাদেশের প্রতি, ঢাকার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা যে এটা তুলতে পেরেছে, তা প্রমাণ করে তারা কতটা ক্ষমতা রাখে। যখন এটা নির্মাণ শুরু হয় তখনই অনেকে বলেছিল, ওটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হবে। কিন্তু গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিকরা সেসবে পাত্তা দেয়নি। তারা জানত তাদের পক্ষে কারা আছে, কারা থাকবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের প্রাক্তন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সেখানে গেছেন এবং তাদের উপস্থিতি ‘হালাল’ করেছেন। এর ফলে তাদের মনে সাহস হয়েছে যে, এটাকে আইনের চোখ তারা অস্বীকার করতে পারে।

আইনের কথাটা সবাই জানে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন যে, এটা সরাতে হবে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর সবসময় থাকে এবং নিয়মের দীর্ঘায়ন সবসময় থাকে। এবং সে কারণে হাতিরঝিলের মতো পরিবেশগতভাবে নাজুক জায়গায় তারা ভবন তুলতে পারে, রাখতে পারে এবং বিচারব্যবস্থাকে উপেক্ষা করতে পারে।

কথাটা এই প্রসঙ্গে আসছে যে ঢাকার উত্তরের মেয়র নিজেও একজন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিক। তিনি মহাউৎসাহে ফুটপাত পরিস্কার করে থাকেন এবং তাঁর দাবি, এতে ঢাকার উন্নতি হচ্ছে। এর সঙ্গে আমি একমত। কারণ, একজন ফুটপাত ব্যবহারকারী হিসেবে আমি গরিব মানুষের কোনো দোকান দেখতে পাই না, দেখতে পাই বড়লোকের বড় বড় গাড়িগুলো ফুটপাতকে পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে এর ওপর কয়েকটি স্টোরিও করেছে এবং এই বিনা পয়সার পার্কিংয়ে কতটা ক্ষতি হয়, সেটার ইঙ্গিতও করা হয়েছে। তবে যেহেতু এটা বড়লোকের ব্যবহার তাই বিষয়টা বেশি দূর এগোয় না।

সে কারণে শহরের ফুটপাত পরিণত হয়েছে একধরনের প্রতীকী পরিসরে, যেখানে বেআইনি গরিব মানুষ ও তাদের রুজি উচ্ছেদ করে বড়লোকের গাড়িগুলো বেআইনিভাবে রাখা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধে কোন শ্রেণি জয় করেছে সে বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। গরিব ঢাকা ছাড়ছে না, বড়লোক তাদের সহ্য করবে না– এটা কোনো সংঘাত তৈরি করবে না। কারণ আমাদের গরিবদের মধ্যে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা চলে গেছে। তাদের পক্ষে কথা বলার মানুষও নেই। যেটা হচ্ছে সেটা খুব সরল।

আমার এক বন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় বলেছিল যে, বিজয় সে দেখতে চায় না, তার আগে শহীদ হতে চায়। কারণ সে জানত স্বাধীন দেশে কী হবে।

মনে হয় সে শহীদ হয়েছিল। কিন্তু তার চেয়ে বড় সত্য সে আগামীকে দেখতে পেয়েছিল।

 

অনুলিখন: হাসান ইমাম

আফসান চৌধুরীলেখক, সাংবাদিক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক

১৭ Responses -- “ঢাকার বস্তি উচ্ছেদে ‘আগুন থেরাপি’”

  1. abdul Kader

    মাদক ব্যবসা বন্ধ করে দেন, দেখবেন বস্তিবাসির সংখ্যা কমে যাবে। পোষাক কারখানাকে শহর থেকে দূরে সরিয়ে দিন, বস্তিরবাসির সংখ্যা কমে যাবে। পোষাকশ্রমিকদের ওভারটাইমের টাকা সঠিক হিসাবে পরিশোধ করলেও বস্তীর সংখ্যা কমে যাবে…

    Reply
  2. মো. লুৎফর রহমান প্রধান

    ক্ষমতা, বৈষম্য, অনাচার, শোষণ এ বিষয়গুলি নিয়ে সচেতন সুধীজনদের আরো বেশি সোচ্চার হওয়া উচিত।

    Reply
  3. R. Masud

    নিজে যা বিশ্বাস করি তা আমি বলতে চাই–

    “একজন মানুষ তার নিজের বর্তমান অবস্থার জন্য নিজেই দায়ী ৮০%, সমাজ বা দেশ হলো শুধু ২০%।”

    Reply

Leave a Reply to shahed Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—