Feature Img

subashish-front-111একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতি সমব্যথী পাকিস্তানিদের নিয়মিত বিরতিতে সামনে এনে হাজির করছে দুই/চারটি দৈনিক পত্রিকা। কর্নেল নাদের আলী, সাংবাদিক হামিদ মির, ক্রিকেটার ও রাজনীতিবিদ ইমরান খান (যুদ্ধাপরাধী নিয়াজির আত্মীয়), সেনা কর্মকর্তা শাহাবজাদা ইয়াকুব খান থেকে শুরু করে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের নাম প্রায়শ নানা ইস্যুতে শোনা যায়। শর্মিলা বসু, একাত্তরের যুদ্ধকে বিকৃত করে উপস্থাপনকারি পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন তাঁদের গবেষণায় ফয়েজের কবিতার কথা উল্লেখ করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল ত্রিশ লক্ষ বাংলাদেশিকে। পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী কিংবা আম-জনতা এই বর্বরোচিত অপরাধের কোনো প্রতিবাদ করেন নি। বাংলাদেশে ঘটা নির্মমতা নিয়ে কবি ফয়েজের সেই আমলে লেখা একটা বা দুটো কবিতা আসলে কোনো পাপস্খলন করে না। পাকিস্তানের এতো মানুষের নিশ্চুপ আচরণকে না দেখিয়ে এই কবিতার উল্লেখ করা মানেই হচ্ছে পুনর্মিত্রতার প্রতি বাড়াবাড়ি আগ্রহ। রাষ্ট্র পাকিস্তান এখনো তাদের কৃতকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করে নি। এদিকে ইমরান খান, হামিদ মির, নাদের আলীরা উপরসর্বস্ব ক্ষমা চাওয়ার ওপর জোর দেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা মুখেও আনেন না। অন্যদিকে এরা সকলেই শর্মিলা বসুর মূল সূত্র (হত্যা-ধর্ষণ দুই পক্ষই করেছে। কেউ একটু কম, কেউ একটু বেশি- এই যা) মানেন। একাত্তরের হতের সংখ্যা ত্রিশ লক্ষ থেকে কমিয়ে কুখ্যাত হামুদুর রহমান কমিশনের ছাব্বিশ হাজারের রায়ের প্রতি তাদের আগ্রহ।

ডিসেম্বরের বারো তারিখে ‘একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে আমি মাফ চেয়ে নিচ্ছি’ নামের চটকদার শিরোনামে নাদের আলীর একটা বক্তৃতার অনুবাদ প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। অনুবাদ করেছেন এয়ার কমোডর ইসফাক ইলাহী চৌধুরী (অব.)। নাদের আলীর পরিচয়- তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি কর্নেল। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে গণহত্যাকারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এই নাদের আলী। ইতিহাসের জঘন্যতম এই হত্যামিশনে তাঁর পদোন্নতিও ঘটে। যদিও তিনি উল্লেখ করেছেন- তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়ান নি। নাদের আলীর বক্তব্য থেকে আরো জানা যায়, নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭৩ সালে তাঁকে মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিতে হয়। এখানে উল্লেখ্য, চলতি বছর ১৬ মার্চ ব্র্যাক ইউনিভারসিটি আয়োজিত একটি সেমিনারে পঠিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর প্রথম আলো বিজয়ের মাসে প্রকাশ করেছে।

নাদের আলীর বক্তব্য উদ্দেশ্যমূলক। পাকিস্তানিরা আসলেই বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যায় দুঃখপ্রকাশ করছে- এই ধরণের একটা অনুভব মানুষের মধ্যে তৈরি করার জন্য কোনো একটা গোষ্ঠী কাজ করছে। ঠারে ঠারে নির্মমতা বা অত্যাচার অতো বিশাল কিছু হয় নাই বা ভাইয়ে ভাইয়ে ভুল বুঝাবুঝির কারণে এই যুদ্ধ কিংবা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশের আম-জনতা এমনকি আর ভালো আছে- টাইপের বাণী প্রচার করছে তারা। প্রথম আলোতে নাদের আলীর লেখার অনুবাদের কোনো সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। তবে আন্তর্জালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তৃতার একটা লিঙ্ক পাওয়া যায়। প্রথম আলোর অনুবাদকর্মটি এই লেখারই বাংলা রূপান্তর। নাদের আলী বলেছেন-
“I unfortunately, was a witness and participant in those events, though I never killed anyone or ordered anyone to be killed. Still, I knew and heard about a lot of killing and other atrocities. I may have a thousand stories to tell of what I saw from early April 1971 to early October. But one persons, experience is not history nor its accurate picture.” (আলি: ১৬ মার্চ, ২০১১)

অতো বিশদে না গিয়ে এই একটা প্যারার অনুবাদে নাদের আলীকে কিভাবে ভালো মানুষের উর্দি পরানো হয়েছে সেটা খেয়াল করি। নাদের আলী বলেছেন এইসব হত্যাকাণ্ডের তিনিও একজন ‘participant’ (অংশগ্রহণকারী); প্রথম আলো পুনর্মিত্রতায় জোর দিতে গিয়ে এই শব্দ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছে। ‘witness and participant’ এর বাংলা করা হয়েছে ‘প্রত্যক্ষ সাক্ষী’।

“দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি ছিলাম এসব ঘটনার একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী, যদিও আমি নিজে কাউকে হত্যা করিনি বা হত্যা করার আদেশ দিইনি। আমি অনেক কিছু দেখেছি ও শুনেছি, কিন্তু আমি এও জানি যে একজনের অভিজ্ঞতা তো আর ইতিহাস হতে পারে না।” (প্রথম আলো: ১২ ডিসেম্বর, ২০১১)
শর্মিলা বসু আর রুবাইয়াত হোসেনের মতো নাদের আলীও তাঁর বক্তৃতায় ফয়েজকে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি ফয়েজের কবিতার উল্লেখ করেছেন ইংরেজিতে-
“After how many Shraban rains,
Shall be washed the blood stains
After friendly intimacy.
We became strangers again.” (আলী: ১৬ মার্চ, ২০১১)
এদিকে প্রথম আলোর অনুবাদকের বাড়াবাড়ি আগ্রহ উর্দু ভাষায়।
‘কব নজর মেঁ আয়েগি সবজকি বাহার, খুঁন কে দাঁগে ধুলায়ে তো কিতনা বারসাতোঁ কে বাদ, হামকো কাহতে তেরে আজনাবি ইতনি মুলাকাত কে বাদ।’
‘কখন দেখব সবুজ বসন্ত এসেছে বয়ে, কত বর্ষা লাগবে রক্তের দাগ মুছে যেতে, এতবার দেখা হওয়ার পরেও আমরা রয়ে গেলাম অপরিচিত।’ (প্রথম আলো: ১২ ডিসেম্বর, ২০১১)

হামিদ মির থেকে নাদের আলী- পুনর্মিত্রতা তৈরির রেসিপিতে নতুন কোনো উপাদান নাই। গৎবাঁধা সব একই বিষয়-আশয়। ফয়েজের কবিতা, হতাহতের সংখ্যা কমানো, ধর্ষণ-হত্যা দুইপক্ষই সমান পাল্লায় করেছে বলে উল্লেখ, সব পাকিস্তানি সেনা খারাপ না কিংবা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদীদের গুন্ডামির কারণেই সামরিক হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই- এইসব মিথ্যা তথ্যের প্রচার-প্রসার। এছাড়া পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলা হয়- খেলা আর রাজনীতি এক পাল্লায় মাপা উচিত নয়, খালি যুদ্ধ নয় একাত্তরে ভালোবাসাবাসিও হয়েছে (প্রমাণস্বরূপ- চলচ্চিত্র মেহেরজান) অথবা চাল-ডালের দাম বাড়ছেরে ভাই, বিচার ক্যান ওয়েট।

আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে নিজেদের সামনের কাতারে নিয়ে আসতে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষ অদম্য আগ্রহে কাজ করে যাচ্ছেন। পুনর্মিত্রতার স্বপ্নে বিভোর হওয়ার আগে আমাদের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার-আচার নিয়ে তাঁরা একবারের জন্যেও ভাবিত হন না। ত্রিশ লক্ষ না, আসলে তিন লক্ষ বা তারো কম কিংবা হয়তোবা ছাব্বিশ হাজার- এই গাণিতিক ফ্যালাসি তৈরি করতে বা এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই তাঁরা ব্যস্ত। ব্লগার কুলদা রায় এই ত্রিশ লক্ষ হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে গুলিবিহীন আরো অজস্র হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচলায়তনে।

“যারা বলছেন, বলার চেষ্টা করছেন—পাকবাহিনী গণহত্যা করেনি, পাকবাহিনী তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেনি—পাকবাহিনীর হত্যা করার সংখ্যা খুবই কম, তারা—তারা কি বলবেন এই গুলিবিহীন লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাকে? গণহত্যার হিসাবের মধ্যে এই সংখ্যা কি যোগ হবে না? কত—পঞ্চাশ হাজার, এক লক্ষ, দুই লক্ষ, দশ লক্ষ… বিশ লক্ষ… তিরিশ লক্ষ….” (সচলায়তন: ১৩ ডিসেম্বর, ২০১১)
নাদের আলীর আরেকটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর ডিসেম্বরের ১৬/১৭ তারিখের দিকে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতায় ক্ষমা প্রার্থনার কথা থাকলেও এই লেখায় তা নাই। গবেষক সাইকিয়া ইয়াসমিন সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ (Women, War, and the Making of Bangladesh: Remembering 1971) করেছেন। এই বইতে নাদের আলীর কথা আছে। সেখানে তিনি লিখেছেন-
নাদের আলী কোনো পক্ষ নেননি। আর তিনি পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাননি। (সাইকিয়া ২০১১: ২২৭)

ইয়াসমিন সাইকিয়ার বইটি শর্মিলা বসুর বইয়ের মতো সম্পূর্ণ প্রোপাগাণ্ডায় ভরপুর না হলেও শর্মিলা বসুর মূলসূত্রকে মেনে নিয়েই কথা এগিয়েছেন। একাত্তরের বাংলাদেশের নারীদের ওপর নেমে আসা ধর্ষণের বিবরণ বইতে আছে। বিহারি নারীদের ওপর নেমে আসা অত্যাচার/ধর্ষণের কথাও সমান পাল্লায় মেপে উল্লেখ করেছেন গবেষক সাইকিয়া। নাদের আলী তার লেখায় ইয়াসমিন সাইকিয়ার প্রসঙ্গ এনেছেন।

ড: ইয়াসমিন সাইকিয়া আমাকে একবার একটা মজার কাহিনী বলেন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমন মেয়েদের খুঁজে পেতে নাকি তার ব্যাপক কষ্ট হয়েছে। ধর্ষণের শিকার এক মেয়ে তাকে জানিয়েছেন- “আমাদেরকে যারা পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছে- তারাই তো দেশ চালায়।” (আলী: ১৭ ডিসেম্বর, ২০১০)

ইয়াসমিন সাইকিয়ার এই প্রতিপাদ্য শর্মিলা বসু কিংবা রুবাইয়াত হোসেনের প্রতিপাদ্যের সাথে বেমানান নয়। যেকোন ধরনের অতি সরলীকরণ বক্তব্য অনেক সময় যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধকে হালকা করে দেয়। ইয়াসমিন সাইকিয়ার গবেষণাটাও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের কিছুটা পক্ষে গেছে। শর্মিলা বসু নিয়েছিলেন তিন ডজন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার। ইয়াসমিন নিয়েছেন ১২৩ জন যুদ্ধাপরাধী সেনার সাক্ষাৎকার। গণহত্যাকারি ও ধর্ষকেরা তাঁর কাছে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করবেন- এই ধারণা তার মাথায় কীভাবে আসলো কে জানে। এরা নিজেদের সাফাই গেয়েছে- আর ইয়াসমিন সাইকিয়া সেটা বইতে ছাপিয়ে একাত্তরে ধর্ষিতাদের আরো এক দফা অপমান করেছেন।

প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, নাদের আলীর এই বক্তৃতা ও এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তুলেছিলেন সচলায়তনের ব্লগার সাঈদ আহমেদ (সচলায়তন: ২১ শে মার্চ, ২০১১)। নাদের আলী তাঁর লেখায় এবং বক্তৃতায় অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেকে নিরপরাধ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন বারবার। তবে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে যুক্ত না থাকলেও এই অপরাধ থেকে তিনি মুক্ত নন বলে লেখাটিতে জানিয়েছেন। বক্তৃতায় সেটা বলেননি। আবার বক্তৃতায় ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তাঁর প্রকাশিত লেখায় ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গ আসেনি। ইয়াসমীন সাইকিয়াও বলেছেন- নাদের আলী ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। এদিকে আবার ইয়াসমিন সাইকিয়ার সাথে আলাপে তিনি সফলভাবে একটা হত্যাযজ্ঞের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলে জানিয়েছেন-
“১৯৭১ সালে ১৫ জুলাই আমি একটা সফল গেরিলা অপারেশন চালাই। এটা ছিল একটা কুখ্যাত ট্রেন হামলা যাতে অনেক লোক মারা গিয়েছিল। ভারতীয় সীমান্তে এটাই প্রথম সফল হামলা। বিকেলে ঢাকায় ফিরে বিবিসিতে জানলাম- এই হামলায় ৫৬ জন মারা গেছে। আমরা নিজেদের বোঝালাম- ভারতীয়রা আমাদেরকে মারছে, এই বদলা নেয়া তাহলে ঠিকই আছে। আমার নিজের খুব গর্ব হচ্ছিল। জেনারেল এসে আমার পিঠও চাপড়ে দিলেন।” (সাইকিয়া ২০১১: ২২৮)

সুতরাং, এটা স্পষ্ট- “নাদের আলী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত নন” কথাটি মিথ্যা। তিনি সত্যমিথ্যা গুলিয়ে দিয়ে একটা মানবদরদী অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছেন। নাদের আলীকে সামনে হাজির করে আমাদের সামনে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি বাড়ানোর চেষ্টা করাও একটা প্রোপাগান্ডার অংশ। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ প্রশ্নোত্তর পর্বে নাদের আলী কূটনৈতিকের মতো কথা বলেছেন-
“আমাদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীরা বেশ ভালোই আছে। আসল হোতারা বিচার-আচারের উর্ধ্বে। গরীবগুর্বো আর রাজনৈতিকভাবে হেনস্থা করার জন্য বিচারের প্রহসন হবে।”(আলী: ১৬ মার্চ, ২০১১)

মানে দাঁড়াচ্ছে, একাত্তরের রাজাকার-আলবদরদের বিচার এই লোকের কারণে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যমূলক মনে হচ্ছে। দৈনিক সমকাল নাদের আলীর একটা সাক্ষাৎকার ছাপিয়েছে। সেখানেও নাদের আলীর নোংরা কূটচাল চোখে পড়ার মতো-
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করতে গেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারের বিষয়টি সামনে আসবে উল্লেখ করায় সাবেক কমান্ডো কর্নেল এ ব্যাপারে সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, অভিযুক্ত অনেকেই এখন মৃত। এ ব্যাপারে বিস্তারিত তার জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে তিনি সে সময়ের ঘটনাবলির জন্য পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন। (সমকাল: ২০ মার্চ, ২০১১)

ঠিক আছে, অনেকেই নাহয় মৃত। আবার নাদের আলীর মতো অনেকেই তো জীবিত। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিচার নাহয় নাদের আলীকে দিয়েই শুরু হোক।

পাকিস্তানিরা অনলাইনে শর্মিলা বসুর রেফারেন্স টেনে এনে একাত্তরের মূল আখ্যানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টায় রত। একদম সম্প্রতি (ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ) মিহির আলির একটা লেখা ছাপানো হয়েছে পাকিস্তানের ‘দা ডন’ পত্রিকায়। চিরাচরিত সেই পুরানো প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পাকিস্তানের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা।
একাত্তরে বাংলাদেশি হতদের আসল সংখ্যা প্রশ্নবিদ্ধ- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রচারিত সেই ভয়ানক ত্রিশ লক্ষ থেকে শুরু করে নামমাত্র দুই লক্ষ পর্যন্ত সেটা গিয়ে ঠেকে। (দা ডন: ১৩ ডিসেম্বর ২০১১)

বিজয়ের মাসে নাদের আলীরা চুলোয় যাক, আমরা বরং এইসব অপতৎপরতা হটিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সোচ্চার হই। নাদের আলীকে মানবদরদী হিসেবে পাত্তা না দিয়ে যুদ্ধাপরাধী ও মিথ্যাবাদী হিসেবেই গণ্য করে তাকে শাস্তির আওতায় আনার চিন্তা করা অনেক বেশি যৌক্তিক।

শুভাশীষ দাশ: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

সূত্র:
১। Ali, Nadir, Liberation War-Historicizing a Personal Narrative, BRAC University, Bangladesh, 16 March, 2011 (http://dailyalochona.blogspot.com/2011/03/alochona-please-read-col-nader-alis.html)
২। আলী, কর্নেল (অব.) নাদের, ‘একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে আমি মাফ চেয়ে নিচ্ছি’, প্রথম আলো, ১২ ডিসেম্বর, ২০১১ (http://www.prothom-alo.com/detail/news/208058)
৩। রায়, কুলদা, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা : ভিন্ন অধ্যায়, সচলায়তন, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১১ (http://www.sachalayatan.com/porimanob/42397)
৪। Saikia, Yasmin, Women, War, and the Making of Bangladesh: Remembering 1971, Duke University Press Books, July 20, 2011
৫। Ali, Nadir, A khaki dissident on 1971, 17 December , 2010 (http://www.viewpointonline.net/a-khaki-dissident-on-1971.html)
৬। আহমেদ, সাঈদ, একজন নাদির আলি এবং পাকিস্তানে কাউন্টার ন্যারেটিভ, সচলায়তন, ২১ মার্চ ২০১১ (http://www.sachalayatan.com/syeed_ahamed/38140)
৭। আলী, নাদের, সাক্ষাৎকার, গোলাম আযম-ফকা চৌধুরীরা মুক্তি বাহিনী আ’লীগ ও হিন্দুদের হত্যার তাগিদ দিত, সমকাল, ২০ মার্চ, ২০১১ (http://goo.gl/k4RYB)
৮। Ali, Mihir, The Second Partition, The Dawn, 13 December, 2011 (http://www.dawn.com/2011/12/14/the-second-partition.html)

Responses -- “বিজয়ের মাসে নাদের আলীদের সত্যমিথ্যা”

  1. Farida Farida

    তারা ত্রিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে। তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।

    Reply
  2. সহিদুল হক

    নাদের আলীর বক্তব্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছেন বিধায় মনে করেছিলাম, সমাধানও ভিন্নভাবে দিবেন, কিন্তু তাও দিলেন সেই প্রথম আলোর মতই! আমি বলি, পাকিস্তান থেকে শুধু ক্ষমা আদায় করাই যদি যথেষ্ঠ হত তাহলে আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমা চাইলেই কি সব শেষ হয়ে যাবে? যেই জাতি ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন শেষ করে দিয়ে ৪০ বছরেও অনুতপ্ত পর্যন্ত হয় না, সেই জাতির বা নাদের আলীর ক্ষমা প্রার্থনার জন্য বসে থাকার কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে করি না। আমরা যদি স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও আমাদের যুদ্ধাপরাধীদের আদালতের কাঠগড়ায় দাড় করাতে পারি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম দরকার হলে ৮০ বছর পরে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিকী বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করাবে । আর আমরাই যদি এই চিন্তায় বসে থাকি, পাকিস্তান মুখে একটু “ক্ষমা” শব্দটা বলার সাথে সাথে আমরা বড় মানবতাবাদী হয়ে তাদের সাথে ভাই ভাই আলিঙ্গন শুরু করব, তাহলে বলব, আমাদের কাছে ৩০ লক্ষ বা ২৬ হাজার কোনো ব্যাপারই না।

    Reply
  3. কুলদা রায়

    শুভাশীষ দাশের লেখাটি ভালো লেগেছে। তাঁর লেখায় আমার নাম রেফারেন্স যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে একটু ভুল রয়েছে। লেখাটির লেখক শুধু একা কুলদা রায় নয়, দুজন–কুলদা রায় ও এমএমআর জালাল।

    লেখাটির শিরোণাম–১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা : ভিন্ন অধ্যায়

    ধন্যবাদ।

    Reply
  4. কাজী মাশরেকুস সিদ্দিকীন

    নাদের আলীর ক্ষমা প্রার্থণাকে আমি মনে করি- ডিসেম্বরে আমাদের জন্য কিছুটা পাওনা তো বটেই।বর্তমান সরকার থাকলে আরো পাকিস্তানী ক্ষমা চাইবে। সাধারণ পাকিস্তানী জানেই না ৭১-এর বর্ররতা।আসলে আমাদের পূর্বের সরকারগুলোর ব্যর্থতাই এর জন্য দায়ি।

    Reply
  5. ফাহিম হাসান

    পত্রিকার পাতায় ক্ষমা চাওয়ার কাঁদুনি স্রেফ প্রহসন। কবিতার অমল-ধবল পংক্তির আড়ালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যা, লুন্ঠন ও ধর্ষণের দায় চাপা পড়ে না। পাকিস্তানকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্ষমা চাইতে হবে – এর সাথে কোন আপোষ নেই।

    শুভাশীষদাকে ধন্যবাদ চমৎকারভাবে বিষয়টা তুলে ধরার জন্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—