১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার ৪১ বছর পরও তার ঘটনাপ্রবাহ ক্রমে নতুন নতুন আঙ্গিকে আবিষ্কৃত হচ্ছে। ৭ নভেম্বরের সাংগঠনিক উত্তরাধিকার ও দায় বহন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের তিনটি অংশই। জাসদ এ দিনটিকে ‘সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ নামে পালন করে। বিএনপি দিনটিকে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ নামে পালন করলেও এবং ক্ষমতার সুফল ভোগ করলেও এর সাংগঠনিক দায় বহন করে না। ৭ নভেম্বরের রাজনীতিকে তারা তাদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, অদৃশ্য কোনো শক্তি এসে ৭ নভেম্বর ঘটিয়ে দিয়ে গেছে! আর আওয়ামী লীগ একে দেখে প্রতিকূল ঘটনা হিসেবে।

৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যারা বহন করেন তাদের অনেকের মধ্যে একটা দ্বিধা কাজ করে সিপাহি গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লবী গণবাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আবু তাহেরের বীরত্ব, ফাঁসির মঞ্চে বীরোচিত আত্মদান প্রভৃতি গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করতে তাঁরা অকপট হলেও ৭ নভেম্বরের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে বিব্রত বোধ করেন। বিভিন্ন কারণে এমনটি হয় বলে আমার ধারণা।

এর একটি কারণ হচ্ছে, কেউ কেউ মনে করেন, সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানকে গৌরবান্বিত করলে জাসদ পুনরায় সিপাহিদের নিয়ে রাজনীতি করবে– এমন একটা ধারণা গণতান্ত্রিক মহলে বদ্ধমূল হবে। ফলে যে রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন (যেহেতু নিকট ভবিষ্যতে বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেই!), সে রাজনীতিতে জাসদ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলের কাছে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হবে না। এঁরা মনে করেন, ৭ নভেম্বর ও তাহেরকে নিজের বলে গণ্য করলে বা তাঁর উত্তরাধিকারী বলে স্বীকার করলে দেশি-বিদেশি মহল ধরে নেবে জাসদের রাজনীতির সাধারণ রূপ হিসেবে বুঝি সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন, সিপাহিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা জাসদের নিত্যকার রাজনৈতিক কাজ। গণতন্ত্রমনা মহলের কাছে জাসদ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী একটা দল বলে স্বীকৃতি পাবে না। ফলে জাসদের বিকাশে অনাবশ্যক বাধার সৃষ্টি হবে।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি জাসদকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখবে এ কারণে যে, সুযোগ পেলেই তারা ‘গণবাহিনী’ গঠন করবে ও সিপাহিদের নিয়ে রাজনীতি করবে। এ আশঙ্কা থেকেই তারা ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে নিজেদের বিযুক্ত করতে চান, দূরে থাকতে চান। আর দল ভাগাভাগির রাজনীতির সুযোগ নিয়ে অতীত বৈপ্লবিক তৎপরতার জন্য একে অপরের ওপর দায় চাপাতে চান। এটা একটা আত্মঘাতি প্রবণতা বটে!

দ্বিতীয় কারণটা অনেকটা প্রথম কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটা হল, জাসদের দুটি অংশ এখন ১৪ দলের শরিক হিসেবে মহাজোট সরকারের অংশীদার। আরেকটি অংশ নিকট অতীতে ঐক্যমতের সরকারে অংশীদার ছিল। এ বিবেচনা থেকে তাদের কেউ কেউ ৭ নভেম্বরকে তুলে ধরেন ১৫ আগস্টের ‘প্রতিবাদ’ হিসেবে, যা সঠিক নয়। (প্রকৃতপক্ষে ৭ নভেম্বর ঘটেছিল ৩ নভেম্বরের ‘ক্যু দেতা’র বিপরীতে দাঁড়িয়ে। এটা ঠিক যে, ১৫ আগস্টের ক্যু দেতার পরে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে জাসদের বিপ্লবী প্রক্রিয়া (কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি-সিওসি) বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে ১৫ আগস্টের পরমুহূর্ত থেকেই। কিন্তু পূর্ণ প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়ার আগেই ঘটে যায় ৩ নভেম্বরের ক্যু দেতা।)

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আবু তাহেরের বোঝাপড়ার ভিত্তিতে (সেটা যদিও স্বল্পস্থায়ী ছিল) যে সিপাহ গণঅভ্যুত্থান ঘটে সেটা এ মতের নেতারা খুব একটা আলোচনা করেন না অথবা প্রসঙ্গটি সংক্ষিপ্ত করে তাহের ও জাসদ নেতৃবৃন্দের গোপন সামরিক বিচারের বিস্তারিত আলোচনায় চলে আসেন। কারণ, বিচারের প্রসঙ্গটি আসলে জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতার কালিমালিপ্ত ইতিহাস সামনে এসে যায়। সেদিন কোন বাস্তবতায় সেনাপ্রধান জিয়াকে সঙ্গে নিতে হয়েছিল তা সময়ের বিবেচনায় না এনে যাঁরা বলে বসেন, “জিয়ার সঙ্গে তাহেরের ঐক্য ভুল ছিল”, তাঁদের এ অতি সরলীকৃত বক্তব্য পাল্টা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতার দায় যদি তাহেরকে নিতে হয়, তাহলে খন্দকার মোশতাকের দায় কি বঙ্গবন্ধু নেবেন! মীর জাফরের দায় নেবেন সিরাজুদ্দৌলা! এমনকি তাঁরা এ কথাও বলে বসেন যে, “বঙ্গবন্ধুকে ত্যাগ করে জাসদ গঠনটাই ভুল ছিল।” (বঙ্গবন্ধুকে জাসদের প্রতিষ্ঠাতাগণ ত্যাগ করেননি, বঙ্গবন্ধু তাদের ত্যাগ করেছেন!)

তৃতীয় কারণটা হচ্ছে, সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী কোনো কোনো তাত্ত্বিক মনে করেন, ৭ নভেম্বর তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা যে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটিয়েছে, তার কোনো বিপ্লবী তাৎপর্যই নেই, এটা স্রেফ নৈরাজ্য। কারণ, মার্কস-লেনিন-মাওয়ের বইয়ে এ ধরনের ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই! তারা সৈনিকদের ১২ দফা দাবিনামা নিছক ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ মার্কা দাবি দাওয়া বলে উপেক্ষা করেন।

আমেরিকান সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ যখন ৭ নভেম্বর ও আবু তাহেরের বিপ্লবী অভিঘাতের ওপর আলো ফেলতে শুরু করেন, তখন তাঁরা একটু একটু করে নড়েচড়ে বসেন। তবে সেখানেও পুরোপুরি তাঁরা ৭ নভেম্বরের বাস্তবতাটা মানতে চান না। তাহেরকে জাসদ থেকে আলাদা করে দেখাতে চান। ভাবখানা এই– তাহের ভালো, জাসদ খারাপ! তাহের বিপ্লবী, জাসদ বিপ্লববিরোধী!

আবার উল্টো প্রবণতাও আছে। যাঁরা প্রথম ও দ্বিতীয় কারণে ৭ নভেম্বর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁরা বলেন, “জাসদ নিয়মতান্ত্রিক পথেই ছিল; তাহেরই জাসদকে গণবাহিনী গঠন, সৈনিক সংস্থা গঠন ও সিপাহি বিপ্লবের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন। নইলে আজ আমরা…” ইত্যাদি, ইত্যাদি। তাঁরা জাসদকে ১৯৭২ সালের আওয়ামী লীগের তরুণ সংস্করণ মনে করেন।

৩১ অক্টোবর আওয়ামী লীগ থেকে গুণগতভাবে আলাদা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের জন্মটা যে ছিল অনিবার্য এবং মুক্তিযুদ্ধের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ, সমাজ বদলের আকাঙ্ক্ষাই যে ছিল মূল প্রেরণা– সেটা সবাই একভাবে স্বীকার করেন না। আবার কেউ কেউ একে ‘ষড়যন্ত্র’ বলারও চেষ্টা করেন।

এ থেকে শুরু হয় জাসদ, ৭ নভেম্বর, কর্নেল তাহেরকে দৈত্যায়ন (demonize) করার চেষ্টা। দু-একজন লেখক এ চেষ্টা শুরু করেছেন। কেউ কেউ টেলিভিশনের ‘টক শো’ বা পত্রপত্রিকার সাক্ষাৎকারে তেমনটা বলার চেষ্টা করছেন।

আসলেই কি গণতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতিতে সফলতার জন্য অতীতের সশস্ত্র বিপ্লবী প্রচেষ্টার উত্তরাধিকার থেকে নিজেকে ত্যাজ্য করা জরুরি? নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি কিভাবে ২০০৮ সাল থেকে নিজেদের সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে দু-দুবার সরকার গঠন করেছে? কিভাবে বাকি সময়টাতে তারা প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকাতে আছে? (যে দলটি ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল!)

লাতিন আমেরিকাতে ষাটের দশক থেকে শুরু করে নব্বই দশক পর্যন্ত যেসব দেশে (সর্বশেষ কলম্বিয়া) বিপ্লবীরা সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ করেছেন, তাঁরা কিভাবে সশস্ত্র যুদ্ধে ইতি টেনে সংসদীয় রাজনীতিতে সফলতা পেয়েছেন? তাঁরা কি নিজেদের অতীত বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রকাশ্যে নিন্দা করে নাকে খত দিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন? নাকি বাস্তবতা অনুধাবন করে শান্তিপূর্ণ প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার জন্য যথাযথ রাজনৈতিক নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছেন?

এটা রাজনীতির যে কোনো কর্মীই বলবেন যে, রাজনীতির সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যকলাপ। রাজনীতির প্রয়োজনে ব্যতিক্রমধর্মী কার্যকলাপ কি শুধু সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী দলগুলোই করে? ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানভিত্তিক ফলাফলে জয়ী হয়েও পাকিস্তানের সরকার গঠন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ, শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। যার পরিণতিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে। (অবশ্য চীনপন্থী গোপন বিপ্লবীরা– যেমন সিরাজ শিকদার– মনে করতেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করা সম্ভব নয়। এ হিসাবটা তাদের রাজনীতির অন্যতম দিকবদলের কারণ ছিল।)

সশস্ত্র যুদ্ধটা কি নিয়ম, না ব্যতিক্রম? অন্য উদাহরণ দেখুন। ১৯৯০ সালে মিয়ানমারে সংসদ নির্বাচনে অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ৮১% আসন লাভ করলেও ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা সে নির্বাচন বাতিল করে। এনএলডি সরকার গঠন করতে পারেনি। তার প্রতিবিধান করতে কি এনএলডি ’৭১-এর বাংলাদেশের মতো সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে? নাকি দীর্ঘ ২৬ বছর শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম জারি রেখে অবশেষে জয়ী হয়েছে? একেক দেশে একেক বাস্তবতায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সংগ্রাম চলেছে।

১৯৭২ সালের ৭ জুন ছাত্রলীগ-ডাকসু-শ্রমিক লীগ নেতৃবৃন্দ (যারা পরবর্তীতে জাসদ গঠনে নেতৃত্ব দেন) জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে বিপ্লবী সরকার গঠনসহ যেসব দাবি তুলে ধরেছিল তার সবগুলো কি এখন বাস্তবায়ন সম্ভব? তাহলে এখন কি ’৭২-এর ৭ জুনের তোলা দাবিগুলোর নিন্দা করব? ঠিক তেমনি ১৯৭৫ সনের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পরে বাংলাদেশ বেতারে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যবৃন্দ যে ১২ দফা দাবিনামা দিয়েছিলেন তার সবগুলো কি এখন বাস্তবায়নের দাবি তোলা বাস্তবসম্মত? সবাই বলবেন, সেটা বাস্তবসম্মত নয়। তাহলে কি ৭ নভেম্বর ও কর্নেল তাহের মিথ্যা হয়ে গেলেন?

অতীত রাজনীতির সবটুকুই সঠিক ছিল– এটাও জেদ ধরে বলার বিষয় নয়। অতীত রাজনীতির নীতি-কৌশলে কোথাও না কোথাও গলদ ছিল বলেই সফলতা আসেনি। কিন্তু বিপ্লবী চেতনাকে হাসিমুখে যারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন সেই শহীদদের অবশ্যই সম্মান দিতে হবে, তাদের স্মৃতি শিরোধার্য করতে হবে, তবেই না নতুন সংগ্রামে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা যাবে। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তা কি বিতর্কের ঊর্ধ্বে? ভারতীয় রাজনীতিবিদেরা কি তা নিয়ে নোংরাভাবে চরিত্রহনন করেন? আবার মহাত্মা গান্ধী যে পদ্ধতি নিয়েছিলেন, তাও কি সর্বাংশে আদর্শস্থানীয় ছিল? তা নিয়ে কি আমরা চরিত্রহননের জন্য ইতিহাসের উপাদান খুঁজে বেড়াব?

কর্নেল আবু তাহেরের বিপ্লবী প্রচেষ্টা ও ৭ নভেম্বর নিয়ে অনেক প্রশ্ন, তাত্ত্বিক বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আজও কর্নেল তাহের কেন স্মরণীয়? তিনি বিপ্লবী সাহস দেখিয়েছিলেন প্রচলিত শোষণমূলক ব্যবস্থাটাকে ঝাঁকি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। লরেন্স লিফশুলৎজের ভাষায়–

“সাতই নভেম্বরের অভ্যুত্থানকে এখন নতুন দৃষ্টিতে দেখতে হবে, বিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে। ইতিহাসের এ পর্যায় থেকে শিক্ষা নেওয়াটা খুবই তাৎপর্যবহ।… নিকারাগুয়ায় যারা জেনারেল অগাস্টো সানডিনোর আদর্শে উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন তারাই ঊনিশ শো চৌত্রিশে তাঁর মৃত্যুর অর্ধ-শতাব্দী পর আবারো উঠে দাঁড়ান। তাহেরের মত সানডিনোও বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়েছিলেন, তাঁকেও হত্যা করা হয়েছিল।… হয়তো আবু তাহেরের দৃষ্টান্ত এমনি বুদ্ধিদীপ্ত অনুপ্রেরণার জোয়ার আনবে। চারপাশে নির্যাতিত মানুষের ভীড় দেখে যারা আত্মজিজ্ঞাসায় ব্রতী হবেন, জানতে চাইবেন তাদের মধ্যে কেউ কোনদিন পৃথিবী বদলে দিতে উঠে দাঁড়িয়েছিল কি না, তাদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করবে হয়তোবা।”

মুশতাক হোসেনজাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য

Responses -- “৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে বাধা?”

  1. তৌফিক

    অসাধারন লেখা। ৭ নভেম্বর ইস্যুতে নতুন কিছু চিন্তার উপাদান রয়েছে এখানে। ধন্যবাদ লেখককে।

    Reply
  2. ABSIDDIQUE

    `Main criminal’ of JSD is Sirajul Alam Khan.. He has created problems in the politics of Bangladesh through his creation of JSD. . Many students lost their lives because of so called socialism. Virtually they do not belong to that ideas except creating anarchy. He should have been punished.

    Reply
  3. ওয়াসীম সোবাহান

    ৩রা নভেম্বর সকাল নয়টার সময় করে ফোর বেঙ্গলে ব্যাটালিয়ান হেডকোয়ার্টার এসে উপস্থিত হয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডালিম ও মেজর নূর। ডালিম জানায় দুপক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে যা করা প্রয়োজন তা সে করবে। খালেদ তাকে আশ্বস্ত করেন তিনিও সংঘর্ষ চান না। ডালিম খালেদের কাছে জেনারেল জিয়ার কথা জানতে চায়।খালেদ তাকে বলেন “নো হার্ম উইল বি ডান টু হিম। হি ইজ ইন সেইফ কাস্টডি।” ডালিম এবার জানতে চায় “স্যার আপনারা কি চান? আপনাদের দাবি কি?” বিগ্রেডিয়ার খালেদ একে একে তিনটি শর্ত ডালিমকে বলেন।ডালিম বলে “আমি বঙ্গভবনে যেয়ে রশিদকে বুঝাবার চেষ্টা করবো।” বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ কর্নেল মালেক এবং কর্নেল মান্নাফকে তার প্রতিনিধি হিসাবে ডালিমের সাথে বঙ্গভবনে যেতে নির্দেশ দেন। খন্দকার মোশতাকের কাছে পরিস্কার হয় খালেদ মোশাররফ সংঘর্ষ ও হত্যা এড়াতে চান। মোশতাক মান্নাফ এবং মালেককে বলেন “Well I have heard you patiently, go back and tell the people at the cantonment, if they want me to continue as the President then I shall execute my responsibilities at my own terms. I am not at all prepared to remain as the head of state and government to be dictated by some Brigadier. Khaled should withdraw the troops from the relay station so that the national radio can resume normal broadcasting. My priority at this time is to bring back normalcy in the country. আমার নির্দেশ যদি খালেদ মানতে রাজি না হয়; তবে তাকে বলবে he should come over to Bangabhaban and takeover the country and do whatever he feels like. আমি একটা রিক্সা ডাইকা আগামসী লেনে যামুগা।” বিগ্রেডিয়ার খালেদ ডালিমকে বলেন “লিসেন ডালিম, খন্দকার মোশতাক যখন আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে রাজি হচ্ছেন না সে ক্ষেত্রে তিনি প্রধান বিচারপতি জাস্টিস সায়েমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।”জাস্টিস সায়েমকে মঞ্চে আনার প্রস্তাবে ডালিম বুঝতে শুরু করে তারা হেরে যাচ্ছে। সে খালেদের অনুমতি নিয়ে বঙ্গভবনে রশিদকে ফোন করে। সে রশিদকে বলে “তুমি এখানে এসে বিগ্রেডিয়ার খালেদের সাথে কথা বল।” রশিদও তখন বুঝে গেছে তাদের পায়ের নিচে মাটি সরে যাচ্ছে। সে রাজি হয় না ক্যান্টনমেন্টে আসতে।এক পর্যায়ে ডালিম ও রশিদ বাগবিতন্ডায় জরিয়ে পড়ে।ডালিম রাগত স্বরে রশিদকে বলে “ডু নট বি ‍এ্যা কাওয়ার্ড!ফেইস থিংস ব্রেইভলি। নো বডি ইজ গোইং টু কিল ইউ।হেয়ার উই আর এন্ড নো বডি হ্যাড টাচড আস।” রশিদ এক পর্যায়ে ডালিমকে প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ করে।এত ডালিম দ্বিগুণ ক্ষিপ্ত হয়ে বলে “আই ডু নট রেকগনাইজ খন্দকার মোশতাক! হু ইজ হি ইন দিজ ম্যাটার? আই আম টকিং টু ইউ রিগার্ডিং আওয়ারসেলভ্স এন্ড ফর ইউ এন্ড ফারুক, আই স্ট্যান্ড কমিটেড টু এনসিওর ইউর সেফটি”। এত ভরসাও রশিদকে টলাতে পারে না; সে স্পস্ট জানিয়ে দেয় ক্যান্টনমেন্টে সে আসবে না। ফোন রেখে ডালিম হতাশ চোখে বিগ্রেডিয়ার খালেদের দিকে তাকালে খালেদ বলেন “বল ইজ ইন ইউর কোর্ট ডালিম!” হতাশ ডালিম নূর কে নিয়ে বঙ্গভবনে চলে যায়।

    ১০

    বিগ্রেডিয়ার নুরুজ্জামান বলেন “হাউ এ্যাবাউট উই এ্যারেস্ট খন্দকার মোশতাক বিফর হিজ আল্টিমেটাম এন্ডস”? কর্নেল শাফায়েত জামিল এ মতকে সমর্থন দেন। কিন্তু খালেদ এটা নাকচ করে দেন। নুরুজ্জামান প্রস্তাব রাখেন জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিতে। খালেদ এটাও নাকচ করে দেন।খালেদ ঠিক করেন বঙ্গভবনে রশিদ-ফারুক-ডালিম গং কে এবং খন্দকার মোশতাকের উপর মনস্তাত্তিক ও স্নায়ুবিক চাপ প্রয়োগ করবেন। তিনি স্কোয়ার্ডন লিডার লিয়াকতকে নির্দেশ দেন আবার দুটি যুদ্ধ বিমান ও মিসাইল সজ্জিত হেলিকপ্টার নিয়ে বঙ্গভবনের উপর লো ফ্লাইং করতে এবং কর্নেল শাফায়েতকে বলেন এ্যান্টি-ট্যাংক কামানগুলো বঙ্গভবনের কাছেধারে ডিপ্লয় করতে। খন্দকার মোশতাক এক পর্যায়ে তাদেরকে বলেন “তোমরা বরং ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাও”। রশিদ এর উত্তরে বলে “ওরা আমাদের ছেড়ে দেবে বলে মনে করেছেন? প্রত্যেককে কোর্ট মার্শাল করবে।এর চেয়ে বরং আমাদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিন।” রশিদের প্রস্তাব মনে ধরে ফারুক বাদে সবার। তাদের মনে হয় দেশ ছেড়ে পালালেই ফাঁসির দড়ি এড়ানো যাবে।শুধু ফারুক গোয়াড়ের মতন সংঘর্ষে যেতে চায়; তার ধারনা ষোলটি ট্যাংক নিয়ে সে ক্যান্টনমেন্ট দখল নিতে পারবে। রশিদ ও ডালিম তাকে বুঝিয়ে শান্ত করে। এবার খন্দকার মোশতাক ঘাবড়ে যান। গর্তে পড়ে তার আঞ্চলিক টান বেরিয়ে আসে; তিনি রশিদকে বলেন “বাবা আমার পাসপোর্ট আমার লগেই আছে”। রশিদ তাকে আশ্বস্ত করে বলে “বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ আপনাকে যেহেতু প্রেসিডেন্ট পদে রাখতে চাচ্ছেন সে আপনার কিছুই করবে না।” এবার জেনারেল ওসমানী ফোন করেন ফোর বেঙ্গলে। তিনি খালেদকে জানান সব দাবী মেনে নেয়া হবে। এরপর তিনি অনুরোধ করেন ফারুক,রশিদ এবং তাদের অন্যান্য সঙ্গীরা যারা দেশ ত্যাগ করতে চাইবে তাদের দেশ ছেড়ে যেতে দিতে হবে। খালেদ ওসমানীকে বলেন “আমি কিছুক্ষণ পর আপনাকে আমার সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি।” ফোন রেখে খালেদ উপস্থিত সবার সাথে আলোচনায় বসেন।সবাই স্বস্তি পায় বঙ্গভবন পরাজয় মেনে নিয়েছে জেনে।বিগ্রেডিয়ার নুরুজ্জামান অবশ্য বলেন এদেরকে দেশের বাইরে যেতে দেয়া ঠিক হবে না; বঙ্গবন্ধুর হত্যার জন্য এদেরকে দায়ী করে বিচার করা হোক। কিন্তু অন্য কেউ নুরুজ্জামানের কথার খুব একটা গুরুত্ব দেন না। সিন্ধান্ত নেওয়া হয় জেনারেল ওসমানীর দেয়া প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে। সেই মোতাবেক বঙ্গভবনকে জানিয়ে দেয়া হয়। বিমান বাহিনীর প্রধান এম জে তোয়াব দায়িত্ব নেন দেশ ত্যাগে ইচ্ছুক অফিসারদের পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যবস্থা করার।তিনি বঙ্গভবনে ফোন করে রশিদকে বলেন যারা যাবে তাদের নামের লিস্ট দিতে। রশিদ সতের জনের নাম দেয়। তোয়াব নামগুলো নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে যান পরবর্তী ব্যবস্থা নেবার জন্য।

    ১১

    বঙ্গভবনে অবস্থিত অফিসারদের পলায়নী-প্রবৃত্তি বিগ্রেডিয়ার খালেদের এবং অভ্যূত্থানের সাথে জড়িত সবার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। এবার খালেদ বিগ্রেডিয়ার রউফকে পাঠান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর নেয়ে আসার জন্য। বিগ্রেডিয়ার রউফ সেখানে পৌছলে জিয়া কোন উচ্চবাচ্চ্য করেন না। তিনি পদত্যাগ পত্রে উল্লেখ করেন যে রাজনীতিতে নিজেকে জড়াতে চান না এবং এ কারনে সেনাবাহিনী থেকে সরে দাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই পত্রে তাকে যেন পূর্ণ পেনশন সুবিধাদি দেয়া হয় তার অনুরোধ করেন জেনারেল জিয়া। বিগ্রেডিয়ার রউফ পত্রটি নিয়ে ফেরত আসেন ফোর বেঙ্গলে। উপস্থিত সবাই পূর্ণ পেনশন সুবিধাদির অনুরোধে বিস্মিত হন। একজন আর্মি চীফ এই অনুরোধ কিভাবে করেন তাদের বোধগম্য হয় না তবে তার মত একজন সৎ অফিসারের পক্ষে সামান্য পেনশন দিয়ে পরিবার চালনা কঠিন হবে অনুধাবন করেন অনেকেই। বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বলেন “ইফ পসিবল উই শ্যাল পোস্ট হিম ইন দ্যা ইউএন।”
    লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল রশিদ যখন বঙ্গভবন থেকে তেজগাঁও এয়াপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হয় তখন তাদের বিমর্ষ দেখা যায়। ফারুকের অনুগত বেঙ্গল ল্যান্সারের সদস্যরা এবং রশিদের অনুগত টু-ফিল্ড আর্টিলারির সদস্যরা নিজেদের ভবিষ্যতের সঙ্কায় ভেঙ্গে পরে। গত ৮১ দিন তারা বেশ হম্বিতম্বি করে কাটিয়েছে।ফারুক-রশিদ তাদের গরম গরম কথা বলে বেশ উদ্দীপ্ত করে রেখেছিল। আজ এই দুই অফিসারের পলায়নপরতা বেঙ্গল ল্যান্সার ও আর্টিলারি সদস্যদের মনস্তাত্তিকভাবে দুর্বল করে দেয়। তারা আশা করে ফারুক, রশিদ তাদের কোন স্বস্তির বাণী শোনাবে; কিন্তু ফারুক-রশিদের মুখে কোন বাণীই আসে না। কোন কোন সৈনিক কেদে ফেলে; রশিদ, ফারুক তা না দেখার ভান করে গাড়ীতে উঠে বসে। Colonel Shafat Jamil Bir বাংলাদেশ বিমানের ফকার-২৭ উড়োজাহাজটি ব্যাংককের উদ্দেশ্যে উড়ে যাওয়ার পর বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ফোর বেঙ্গল ব্যাটেলিয়ান হেডকোয়ার্টার থেকে বঙ্গভবনের দিকে রওনা দেন। সাথে কর্নেল শাফায়েত জামিলকে নেন না এই আশঙ্কায় যে খন্দকার মোশতাকের সাথে সে দূর্ব্যবহার না করে ফেলে। খালেদ মোশাররফ মনেপ্রাণে চাইছেন সবকিছু সংবিধান মোতাবেক, আইন অনুযায়ী করতে; তাই তিনি চান খন্দকার মোশতাককেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাখতে। অভ্যূত্থানের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভবনে বসে রশিদ-ফারুকের কার্যক্রম বন্ধ করা এবং আর্মির মধ্যে চেইন অফ কম্যান্ড ফেরত আনা। রশিদ, ফারুকের দেশ ত্যাগে সেটা সফল হয়েছে। খালেদ বঙ্গভবনে ঢুকেন রাত নয়টায়। সাথে আছেন বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জে তোয়াব ও নৌবাহিনীর প্রধান কমোডর এম এইচ খান। খালেদ প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাককে জানান যে জেনারেল জিয়া দুপুরে আর্মি চীফ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। খালেদ মুখে বলেন না তাকে প্রমোশন দিয়ে চীফ অফ আর্মি স্টাফ বানাতে হবে তবে ততক্ষণে সবার কাছে এটা বেশ স্পস্ট যোগ্য প্রার্থী তিনি একাই। মোশতাক এটা শুনে বলেন তিনি তো প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়ে দিয়েছেন তাই তিনি আজ রাতেই চলে যাবেন আগামসী লেনে অবস্থিত নিজ বাসায়।খালেদ মোশাররফ মোশতাককে অনুরোধ করেন প্রেসিডেন্ট পদে থাকতে। খালেদ মোশাররফ চৌকশ সেনা অফিসার, মিলিটারি স্ট্র্যাটেজিতে তার জোর দখল কিন্তু জাতীয় রাজনীতি ও সাংবিধানিক ব্যাপারে তিনি অজ্ঞ। খালেদ মনে করলেন মোশতাক প্রেসিডেন্ট থাকলেই সংবিধান অক্ষুন্ন থাকবে। তার মনে আসল না যে এই খন্দকার মোশতাকই বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করে আছেন।তার মনে আসল না যে রশিদ-ফারুক-ডালিম গংয়ের উপর ভর করে মোশতাক ৮১ দিন ধরে দেশ চালাচ্ছেন।তার মনে এও আসল না মোশতাক কোন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন।খালেদ অভ্যূত্থান করেছেন আর্মির মধ্যে চেইন অব কম্যান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এবং তিনি এই একটি লক্ষ্যেই স্থির থাকলেন।ঘাঘু রাজনীতিবিদ মোশতাক বিগ্রেডিয়ার খালেদের এই দূর্বলতা বুঝে ফেলে খালেদকে বললেন “আমি প্রেসিডেন্ট পদে থাকতে পারি যদি সেনাবাহিনী আমার প্রতি অনুগত থাকে এবং তিন বাহিনীর প্রধান আমার মন্ত্রীসভার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়।” খালেদ জানালেন আর্মি অনুগত আছে। তখন তোয়াব ও এম এইচ খান ইঙ্গিত করলেন খালেদ মোশাররফকে আর্মি চীফ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হোক। মোশতাক তাদেরকে জানালেন সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানী ও কেবিনেটের অনুমোদন ছাড়া তিনি নতুন চীফের নিয়োগ দেবেন না।খালেদ এটা শুনে একটু ক্ষুণ্ণ হলে মোশতাক জানান আগামীকালই, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর কেবিনেট মিটিং আছে; সেখানেই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাত তখন ১১ টা।

    Reply
  4. Truth

    ৭ নভেম্বর আমাদেরকে জাতীয় দুর্যোগে সকলের মধ্যে সংহতি গড়ে তুলে তা মোকাবিলার প্রত্যয় জন্মায়, শিক্ষা দেয় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপতৎপরতাকে রুখে দেয়ার চেতনা ও শক্তি যোগায়, নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে একনিষ্ঠ হতে শেখায়। জাতীয় জীবনের সকল অনাচার, ব্যভিচার ও অত্যাচারকে দূরীভূত করে সুখী-সুন্দর জীবন গড়ার প্রেরণার চেতনা যোগায় ৭ নভেম্বর। ৭ নভেম্বর আমাদের জাতীয় সংহতি, শিক্ষা, চেতনা ও আনন্দের উৎস। ৭ নভেম্বরের সৃষ্টি মূলত ১৫ আগষ্ট উত্তর বাংলাদেশের অবস্থার করুণ পরিণতির জন্য।
    স্বাধীনতা উত্তর আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন বছর তাদের মাথাব্যথা ছিল তরুণদের দল জাসদ। প্রথম থেকেই এ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মেজর জলিল, আ.স.ম রব, শাহজাহান সিরাজ, মীর্যা সুলতান রাজা, মোহাম্মদ শাহজাহান প্রমুখ। রহস্য পুরুষ সিরাজুল হক দাদা ভাই ও কর্ণেল তাহের ছিলেন এ দলের অদৃশ্য ক্ষমতাধর ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর আমলে শত শত জাসদ নেতা-কর্মী কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করার ঘোষণা দিয়ে জাসদ আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। সাড়ে তিন বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জাসদের অভিযোগ ও প্রতিবাদী সংগ্রাম এবং এ সময় হাজার হাজার জাসদ কর্মী হত্যার কলঙ্কময় ইতিহাস তৈরি হয়েছিল।
    সিপাহীরা নিজেদের মতো করে একটা চার্টার অব ডিমান্ড-খসড়া তৈরি করলেও সিরাজুল আলম খান, তাহের, ইনুরা মিলে সেটা পরিমার্জন ও সংযোজন করে ১২ দফা রচনা করেন। এর প্রথম দফা হচ্ছে এ রকমঃ ‘আমাদের বিপ্লব, নেতা বদলের জন্য নয়, বিপ্লব হয়েছে সাধারণ মানুষের স্বার্থে। এতদিন আমরা ছিলাম ধনীদের বাহিনী, ধনীরা তাদের স্বার্থে আমাদের ব্যবহার করেছে। পনেরই আগস্ট তার প্রমাণ। তাই এবার আমরা ধনীর দ্বারা বা ধনীদের স্বার্থে অভ্যুত্থান করিনি। আমরা বিপ্লব করেছি জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ‘গরীব শ্রেণীর স্বার্থক্ষাকারী’-গণবাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের কাজ।
    ১২ দফার চার দফায় রয়েছেঃ অফিসার এবং জওয়ানদের ভেদাভেদ দূর করতে হবে। অফিসারদের আলাদাভাবে নিযুক্ত না করে, সামরিক শিক্ষা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সামরিক বাহিনী থেকেই পদমর্যাদা নির্ণয় করতে হবে। অফিসার ও জওয়ানদের এক রেশন এবং একইরকম থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। যে সমস্ত সামরিক অফিসার এবং জওয়ানদের বিদেশ পাঠানো হয়েছে, তাদের দেশে ফেরত আনতে হবে। জওয়ানদের বেতন হবে সপ্তম গ্রেডে, ফ্যামিলি এ্যাকোমোডেশন ফ্রি দিতে হবে। পাকিস্তান ফেরত সামরিকবাহিনীর লোকদের আঠারো মাসের বেতন দিতে হবে।
    রেডিও স্টেশন তখনও তাহেরের সৈনিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণে। তাহের জানেন, বিকালে সায়েম আসবেন নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাষণ দিতে, সাথে থাকবেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মোশতাক এবং জিয়াও উপস্থিত থাকবেন। সন্ধ্যার দিকে জিয়া রেডিও স্টেশনে গেলে সৈনিকরা তাকে ঘিরে ধরেন এবং দাবি-দাওয়াগুলো পেশ করেন। সৈনিকরা তখন উদ্ধত। তারা বলেন, দাবি মেনে নেয়া না হলে জিয়াকে রেডিওতে ঢুকতে দেয়া হবে না, এমনকি রাষ্ট্রপতিকেও না।
    পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আবারও প্রমাণ হলো সৈনিকদের দাবি-দাওয়া বিবেচনা কিংবা অন্য কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর করার মূল কেন্দ্রবিন্দু জিয়া। যারা বিপ্লব করেন, তারা কারও কাছে দাবি পেশ করে তা বাস্তাবয়নের প্রতীক্ষায় থাকেন না। কর্মসূচি প্রণয়ন করে তারা নিজেরাই বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু তাহের সৈনিক সংস্থা ও জাসদের হাত থেকে ঘুড়ির নাটাই ফসকে গেছে। উপস্থিত মতে, বেশ কিছু দাবি জিয়া মেনে নেন। তাহের দাবিনামায় জিয়ার সই দাবি করেন। জিয়া তিন কপি দাবিনামায় সই করে এক কপি নিজের কাছে রাখেন। জিয়া তাহেরের সাথে আর কোন কথা না বলে রেডিও স্টেশনে ঢুকে যান। সন্ধ্যায় নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি সায়েম ভাষণ দেন।
    খালেদ মোশাররফকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। জাসদ-সৈনিক সংস্থা এই হত্যাকান্ডে তাদের কোন হাত না থাকার কথা দাবি করলেও তখন মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত; ফারুক-রশিদরা ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা এবং জিয়া ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। তখন ক্যান্টনমেন্টে একমাত্র উর্দিধারী সৈনিক সংস্থার সদস্য ও জাসদের গণবাহিনীর সদস্যরাই বন্দুক হাতে অফিসারদের হত্যার নেশায় উন্মত্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কার শক্তি আছে যে জেনারেল খালেদ মোশাররফকে দেখামাত্র গুলী করে হত্যা করবে? এই হত্যার তদন্ত ও বিচারও আজ সময়ের দাবি। এ ছাড়া বঙ্গভবনে ব্রিগেডিয়ার সাফায়াত সৈনিক সংস্থার আক্রমণ থেকে বাঁচতে দেয়াল টপকে পালাতে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেলেন।
    কর্ণেল তাহেরের বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সামরিক-অসামরিক ব্যক্তিদের আদালতে ডেকে সাক্ষী নেয়া হয়েছে। সাক্ষীরা বিজ্ঞ বিচারকের মতোই মুক্তাছার বয়ানে জানিয়েছেন যে, গোপন সামরিক আদালতে তাহেরের বিচার করা যুক্তিযুক্ত হয়নি। ফাঁসীর মঞ্চে ওঠার আগে কর্ণেল তাহের বলেছেনঃ ‘লং লিভ মাই কান্ট্রিমেন।’
    মুক্তিযোদ্ধারা সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক। সুতরাং দেশের মানুষের প্রতি তাহেরের এমন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা খুবই স্বাভাবিক। এ রকম নিখাদ দেশপ্রেমের জ্বলন্ত চেতনার কমরেড সিরাজ সিকদারসহ আরও ত্রিশ হাজার দেশপ্রেমিককে হত্যা করা হয়েছে। জাসদের বিপ্লবী রাজনীতিতে উদ্দীপ্ত হয়ে যেসব প্রতিবাদী-টগবগে তরুণ-যুবা আওয়ামী ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে জীবন দিয়েছেন, তাদের হত্যার বিচার জাসদ নেতারা চাইছেন না কেন? অসমাপ্ত-অপরিপক্ক বিপ্লবের অগ্নিশিখায় যারা জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয়েছেন, তাদেরকে তো ওরা স্মরণও করেন না!
    তাহেরের বিপ্লব সফল হলে জেনারেল জিয়াকেও ফাঁসীতে ঝুলতে হতো। সৈনিক সংস্থার সশস্ত্র সিপাহীদের হাতে বেশ কয়েকজন অফিসারের বিনাবিচারে মৃত্যু হয়েছে। এদের পরিবার এসব হত্যার বিচার পাবেন কিনা? অফিসার নিধন ছিল তাদের বিপ্লবেরই অন্যতম লক্ষ্য। অফিসারশূন্য পিপলস আর্মির কাঠামোতে কোন সেনা অফিসারেরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—