Feature Img

tareq-f1জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আপাততঃ থেমেছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য বর্ধিত কোন খরচ করতে হবে না। তারা অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতোই সুবিধা পাবে। আর প্রতিষ্ঠার ৫ বছর পর প্রতিষ্ঠানটি নিজ ব্যয়ে চলবে মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় আইনের যে ধারা এত বিপত্তির কারন ঘটিয়েছে –সেটাও পরিবর্তন করা হবে। গেল মাসের শেষ সপ্তাহে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা বিশেষ এই ধারাটি বাতিলের জন্য রীতিমতো আন্দোলন গড়ে তুলে। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশ আর সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের মাস্তানদের হাতে রীতিমতো লাঞ্ছনা আর গ্রেফতারের শিকার হয়। আসিফ মহিউদ্দিন নামে এক তরুন ব্লগার কেবলমাত্র এই বিষয়ে অনলাইনে লিখবার কারনে পুলিশের হাতে আটক হয়। থানায় নিয়ে তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার পর অবশেষে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি দেয়া হয় তাকে। মুক্তি দেয়ার সময় নীচের সারির এক পুলিশ কর্মকতা যেভাবে রীতিমতো ধর্মীয় বানী প্রচারের কায়দায় তাকে – ’ভাল হইয়া যান, ভাল হইতে পয়সা লাগে না ’– জাতীয় নসিহত করলেন ; তাতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি আসলেই কতখানি গনতান্ত্রিক — তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ জাগে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তাদের এই আপাতঃ বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করলেও তাদের সহপাঠী আর সমমনারা যে সরকারী পুলিশ আর দলীয় ছাত্র সংগঠনের কাছে পিটুনী খেল, নির্যাতনের শিকার হলো– তার কোন প্রতিকারের লক্ষন এখনও পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

ঘটনা চলাকালেই শিক্ষামন্ত্রী আর বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যকে বার বার টিভির পর্দায় দেখা যাচ্ছিল। মন্ত্রী মহোদয়কে রীতিমতো উদ্বিগ্ন দেখালেও উপাচার্যের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বরং উল্টো চিত্রই প্রকাশ পায়। ভিসিরা যে ছাত্র ছাত্রীদের মতামতের একেবারেই তোয়াক্কা করেন না — তা যেমন বোঝা গেছে, তেমনি শিক্ষার্থীরাও যে তার মিথ্যা আশ্বাসে মোটেই আস্থাশীল নয় — সে কথাও তারা সংবাদকর্মীদের প্রকাশ্যেই বলেছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে কীভাবে চলছে — তা এই ঘটনায় আরেকবার বোঝা গেল।

পুরনো ঢাকার এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেখে মনে পড়লো গত বছরের আরেকটি ঘটনার কথা। পেশাগত কাজে গুলশান এলাকায় যেতে হয়েছিল একটি মিটিংয়ে। শেষ বিকেলে রাস্তায় নেমে দেখি গোটা এলাকাই যানবাহনশূন্য। শত শত মানুষ কর্মব্যস্ত দিনের শেষে রাস্তায় যানবাহনের জন্য অপেক্ষায়। ব্যক্তিগত গাড়ীর মালিকরাও রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তখন তেজগাঁও -গুলশান লিঙ্ক রোড দিয়ে পালাবার চেস্টায় ব্যস্ত। জানা গেল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলমাল চলছে। আশেপাশের ইস্ট ওয়েস্ট , নর্থ সাউথ বা অন্য বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও একই অবস্থা। ছাত্র ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। টায়ার জালানো হয়েছে। ছাত্রদের কারো কারো হাতে লাঠি। যুদ্ধংদেহী অবস্থা চারিদিকে। কয়েকজন পুলিশ সার্জেন্টকে দেখা গেল অসহায় অবস্থায়। দাঙ্গা পুলিশ নামেনি। হয়তোবা ওপরের নির্দেশ নেই একারনে। কারন নির্দেশ যারা দেবেন, তাদেরও অনেকের সন্তান এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ে। সে রাতে ঘরে ফিরতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল। আর ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম — অবশেষে এই বড়লোকের ছেলে মেয়েগুলোও রাস্তায় নামলো। তাদের এই বিক্ষোভও ছিল মূলতঃ শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির জন্যই। গেল বছর বাজেটে সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের ওপর করারোপ করে, যা শেষ বিচারে শিক্ষার্থীদের বেতনসহ অন্যান্য ফি বৃদ্ধিতেই গড়াতো। সেই আশঙ্কাতেই সমাজের অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত ঘরের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। প্রতিবাদের এই ভাষায় তারা অভ্যস্ত না হলেও প্রতিবাদী তারুন্য বলে কথা।

তৃতীয় ঘটনাটি অবশ্যি এদেশের নয়। টেলিভিশনের বদৌলতে বেশ ক’মাস আগে বিলেতে বিশেষতঃ লন্ডন শহরে বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্র ছাত্রীদের যুদ্ধংদেহী অবস্থার কথা নিশ্চয়ই এখনও অনেকের মনে পড়বে। গোটা বৃটেনের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুলিশের জলকামান আর লাঠির আঘাত উপেক্ষা করে যে রাস্তায় নেমে পড়েছিল — তারও কারন কিন্তু শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি। বৃটেনের ক্ষমতাসীন টোরি সরকার আর্থিক ব্যয়ভার লাঘবে উচ্চ শিক্ষা খাতে সরকারী ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলশ্রুতিতে বৃটিশ বংশোদ্ভূত ছাত্র ছাত্রীদের টিউশন ফি কয়েক হাজার পাউন্ড বেড়ে যায় এক লাফে। বাধ্য হয়েই বিলেতী ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া তরুন তরুনীদের প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে লন্ডনসহ বড় বড় শহরগুলো।

কাজেই উচ্চ শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধির ইস্যুটি কেবল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ঘটনা নয় — নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির এই যুগে এটা দেশকালের গন্ডি ছাড়িয়ে গোটা দুনিয়া জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনা আজ জগন্নাথে ঘটেছে, কাল ঘটতে পারে নোয়াখালী বা দিনাজপুরের বিশ্ববিদ্যালয়ে। তেমনি পরশু যে তা মার্কিন যুক্তরাস্ট্র , কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর নামকরা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটবে না — সেই গ্যারান্টি দেয়া যাবে না। আর এর কারন খুঁজতে গেলে কেবল নিও লিব্যারাল ইকোনমিক পলিসির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। বিশ্বব্যাপী এই নীতির প্রধান বাস্তবায়নকারী হিসেবে বৈশ্বিক দুই প্রতিষ্ঠান বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও আই.এম.এফ অনুসৃত নীতি ও তাদের কার্যক্রমকেও বোঝার চেস্টা করতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাখাত নিয়ে নব্বই দশকের শেষদিকে বিশ্বব্যাঙ্ক :Bangladesh Education Sector Review নামে একটি গবেষনাপত্র প্রকাশ করে। এর ৩য় খন্ডেই মূলতঃ এদেশে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারনে নানা পরামর্শ তুলে ধরা হয়েছে। দুনিয়াব্যাপী বিশ্বব্যাঙ্কের কর্মকাণ্ডের সাথে যাদের পরিচয় আছে, সেরকম যে কেউই জানেন — তাদের মূল নীতিই হলো, রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যয় সংকোচন ও বাজার অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে বেসরকারী খাতকে আরো শক্তিশালী করা। বাংলাদেশের শিক্ষাখাত নিয়ে একদশক পূর্বে বিশ্বব্যাঙ্কের করা গবেষণাটিরও সেটাই ছিল লক্ষ্য। তিন খন্ডের এই গবেষণাপত্রে দেশের উচ্চ শিক্ষাকে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন বলে উল্লেখ করে সুস্পষ্ট ভাবেই cost sharing ধারণাটির ওর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যার অর্থই হলো, নিজেদের শিক্ষা ব্যয়ের একটা অংশ শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। একাজ শুধু যে বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমেই করা হবে, তা নয়। শিক্ষা ব্যয় ভাগাভাগির এই ব্যাপারটি ছাত্র ছাত্রীদের হলের আবাসনের ভাড়া বৃদ্ধি, ডাইনিংয়ের খাবারের দাম বাড়ানোসহ নানা কায়দায় তাদের ওপর আরোপ করা হবে। এমনকি গ্রাজুয়েশন শেষ করা শিক্ষার্থীদের ওপর করারোপের প্রস্তাবও বিশ্ব ব্যাঙ্কের সুপারিশমালায় রয়েছে। বলাবাহুল্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা খরচ তাতে যে অনেকাংশে বেড়ে যাবে — এতে সন্দেহ নেই। গবেষণায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ফলাফল অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দের সুপারিশও করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে একটি নজরদারী প্রতিষ্ঠান থেকে কীভাবে খবরদারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায় –সে বিষয়েও প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এক দশক পর আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইনের যে ধারা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে — তা মূলতঃ বিশ্বব্যঙ্কের সেই গবেষণাপত্র হুবহু অনুসরণ করেই করা হয়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় সৃস্টির এই আইনটি প্রনীত হয় ২০০৫ সনে। প্রায় একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ২০ বছর মেয়াদী একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। এই কৌশলপত্রটিও বিশ্বব্যাঙ্ক প্রণীত গবেষণা পত্রের আলোকেই তৈরি করা হয়। এই কৌশলপত্রেও বিশ্বব্যঙ্কের সুপারিশ অনুসরণ করেই শিক্ষাখাতে সরকারী ব্যয় সংকোচন ও নতুন সৃস্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা খরচের একটি অংশ শেয়ার করতেও বলা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সৃস্ট অচলাবস্থার কারণে শিক্ষাব্যয় সংক্রান্ত আইনের ধারাটি পরিবর্তনের কথা সরকার জানিয়েছে যা কুমিল্লা ও কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যলয়ের বেলাতেও প্রযোজ্য হবে বলে বলা হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে নতুন কোন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে সেখানে যে এ জাতীয় বাজারী কৌশল অবলম্বন করা হবে না — সে সম্পর্কে কিন্তু সরকার স্পস্ট করে কিছু জানায় নি।

এতো গেল শিক্ষা ব্যয়ের দিক। অন্যদিকে, বিশ্বব্যঙ্কের ফতোয়া মোতাবেক দেশের উচ্চ শিক্ষাখাতে জ্ঞান নয় — বাজারকেই এখন মূল প্রকল্প হিসেবে গ্রহন করা হয়েছে। ফলে, একদিকে ব্যঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোর ওপরতলায় একর পর এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে উঠছে। অন্যদিকে, মূল ধারার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সান্ধ্যাকালীন কোর্স চালু করা, বিপননযোগ্য বিষয় নিয়ে বিভাগ খোলার প্রবনতা ইত্যাদিও যেন বিশ্বব্যঙ্কের সুপারিশ মালারই প্রতিফলন মাত্র। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে অদূর ভবিষ্যতে যদি বিশ্বব্যাঙ্ক পরামর্শকদের বা তাদের এদেশীয় রুটি হালুয়ার ভাগীদারদের দেখা যায় –তাতেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। হয়তো তারাই দেশের উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারন করবেন। আর আমাদের সরকার ও বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদরা একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে বৈশ্বিক পুঁজির এ জাতীয় ফড়িয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থেই দায়মুক্তি দিয়ে দেবেন।

তবে দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের এই বাজারমুখী প্রবনতার দায় একা শুধু বিশ্বব্যাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপিয়ে লাভ নেই।আমাদের মতো দুর্বল আর অপশাসন কবলিত দেশগুলো যাদের নিজস্ব কোন ভিশন নেই — সেসব দেশেই কেবল নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির একচেটিয়া প্রবক্তা বৈশ্বিক এই প্রতিষ্ঠানগুলো খবরদারী করতে পারে। বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠির দীর্ঘকালের অপশাসন আর দলবাজীই এই পরিস্থিতি সৃস্টি করেছে। এ কারনেই আমাদের জ্ঞান সৃস্টির মূল উৎস যে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো –সেখানেও বিভক্তির সৃস্টি করেছে। বাংলাদেশের যে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দিলেই এর প্রমান মিলবে।

স্বাধীনতার চার দশক পর দেশে প্রথমবারের মতো একটি শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একদিকে যেমন জ্ঞান সৃস্টি করবে — অন্যদিকে মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহায়তা করবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থাটি কী? ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশের সবক’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সর্বমোট বাজেট বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। বলার অপেক্ষা রাখে না, বরাদ্দকৃত এই অর্থের প্রায় আশি ভাগই বেতন ভাতায় ব্যয় হয়ে যাবে। এরপর প্রশাসনিক ও অন্যান্য খরচ চালাবার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গবেষণার বরাদ্দ যে একেবারে তলানিতে ঠেকবে — সে সম্পর্কে আর বিস্তৃত না বললেও চলে। বছরের পর বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এভাবেই বরাদ্দ পেয়ে এলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতিনির্ধারন করেন যারা যেমনঃ সিন্ডিকেট বা সিনেট সদস্য, উপাচার্য বা ফ্যাকাল্টি ডীন এমনকি জাতির ’বিবেক’ বলে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃস্থানীয় শিক্ষকদেরও এ বিষয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যায় না।

অন্যদিকে, সমাজের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদেরও যে স্ট্যাটাস রক্ষা করতে হয় — এতো পরিচিত সিনিয়র ও সমবয়েসী শিক্ষক বন্ধুদের কাছে প্রায়ই শুনি। শিক্ষকরা অধিকাংশই আজকাল পাঠদান ও গবেষণার চাইতে অর্থের পেছনে ছোটাটাকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। এক্ষেত্রে ’৭৩এর বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্বশাসন অধ্যাদেশটি যেন তাদের একধরনের রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আজকাল ক্লাসে পড়ানোর চাইতে উন্নয়ন বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হওয়া বা কর্মকর্তা সেজে বসা, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মাধ্যমে অর্থ আয়সহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপশি কোন কোন শিক্ষকের চিংড়ি ঘেরের মালিক হওয়া বা রপ্তানীমুখী পোশাক কারখানার অংশীদার হবার ঘটনাও ব্যক্তিগতভাবে জানি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা দুটো পেশাই একসাথে চালিয়ে যান — কোন ধরনের জবাবদিহিতার বালাই নেই বলে। দুয়েকটি ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তবে দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতে গোনা ক’জন শিক্ষককে পাওয়া যাবে, যারা শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন পেশায় নিয়েজিত হয়েছেন। সরকারী কর্মকর্তাদের মতো প্রেষনে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন — এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কি খুব বেশী হবে ?

এজন্য অনেকেই দায়ী করেন ’৭৩এর স্বায়ত্বশাসন অধ্যাদেশটিকে। কিন্তু এই অধ্যাদেশ বলে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছেন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের এজাতীয় শিক্ষকেরা আর ছাত্রনেতা নামধারী একধরনের দলবাজ ফড়িয়ারা। গেল চার দশকে আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এজাতীয় মানুষদেরই কেবল সংখ্যা বেড়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক শিক্ষার মান ক্রমাগত নীচে নেমে গেছে। বিশেষতঃ ’৯০এর এরশাদ শাসনাবসানের পর দু’দশক ধরে অনির্বাচিত যে প্রেক্ষাপট দেশের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজ করছে –তাতে দেশের উচ্চ শিক্ষার পীঠস্থানগুলো যে এখনও অস্ত্রের গুদাম আর সর্বপ্রকার কু’কর্মের অভয়ারন্যে পরিনত হয়নি — সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কতিপয় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষক আর শিক্ষার্থীকে অবশ্যি ধন্যবাদ দিতে হবে। তাদের কারণেই এখনো দেশের উচ্চশিক্ষার পীঠস্থানগুলোতে মক্তবুদ্ধিও চর্চা হয়। দেশে যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদটিও তাদের দিক থেকেই আসে।

একথা না বললেও চলে যে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই অব্যাবস্থা আর শিক্ষার অধোগতির জন্য সরকারগুলোরই দায় সব চাইতে বেশী। প্রায় দেড় দশকের সামরিক শাসন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রীতিমতো দলবাজদের আখড়াতে পরিণত করেছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে– একেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেন তাদের তল্পিবাহকেই পরিণত হয়। অথচ,মুক্তচিন্তা আর জ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিস্থিতি এর উল্টোটাই হবার কথা ছিল। অন্তঃত এরশাদের স্বৈরশাসনামলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর তাদের ছাত্র -শিক্ষক সমাজ সে প্রমানই রেখেছেন।

আগেই বলেছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগই বেতন ভাতায় ব্যয় হয়। এক্ষত্রেও যেন দায় কেবল শিক্ষা মন্ত্রনালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে দেশের জন্য উপযোগী জ্ঞান ও গবেষণার কাজ করতে পারে– সেজন্য রাস্ট্র ও সরকারের সামগ্রিকভাবে যেন কোন দায় নেই।

অন্য কোন বিষয় বাদ দেই। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও তার বিরূপ প্রভাব নিয়ে সরকারী -বেসরকারী পর্যায়ে যে ধরনের নড়াচড়া লক্ষ্য করা গেছে — নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে যে বিপুল কর্মযজ্ঞের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে; তাতে কেবল গবেষণার কাজটুকুও যদি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হাতে ন্যস্ত করা হতো –তবে তা এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক নতুন নতুন উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল কর্মের সূচনা হতে পারতো। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাজে অংশ নেয়ার যোগ্যতা ও দক্ষ মেধা দুটোই ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দলবাজ প্রশাসন তো এই বিষয়ে কখনও সরকারী পর্যাযে কোন আলাপ চালিয়েছেন বলে শোনা যায় নি।

আমাদের উচ্চ শিক্ষাখাতের অব্যবস্থাপনা আর জ্ঞান সৃস্টির জন্য গবেষনার তথৈবচ অবস্থা বুঝতে দুটো নির্দিস্ট ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটো ঘটনাতেই সম্পৃক্ততা রয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি নামের একটি বেসরকারী গবেষনা প্রতিষ্ঠান বহুকাল যাবতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে তাদের কার্যালয় স্থাপন করে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরাই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন খাতের বরাদ্দকৃত অর্থে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা ও বাংলাদেশের উদ্ভিদ ও প্রাণী বিষয়ে কয়েক কেটি টাকার দুটো প্রকল্প সম্পন্ন করে। সরকারের একাধিক মন্ত্রনালয়ের বরাদ্দপ্রাপ্ত অর্থে পরিচালিত এই গবেষণা কার্যক্রমে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট উভয়প্রকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই অংশগ্রহন করেন। নামজাদা বেশ কয়েকজন শিক্ষক সম্পাদনার কাজেও জড়িত ছিলেন। প্রকল্প পরিচালনার কাজে নিয়েজিত শিক্ষকদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের পাশাপাশি প্রকল্প থেকেও নিয়মিত সম্মানী ও অন্যান্য ভাতা গ্রহণ করতেন। এজাতীয় কর্মকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য একান্তভাবে উপযোগী হলেও রাষ্ট্রীয় অর্থে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কী করে এজাতীয় গবেষণা কর্মে নিয়োজিত হলো — সে প্রশ্ন তোলার যেন কেউ নেই। যারা এজাতীয় প্রশ্ন যথাযথ ফোরামে উত্থাপন করবেন –তাদেরও কোন কোন জনকে গবেষণা কার্যক্রমে জড়িত থাকতে দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃর্পক্ষও তাদের সিন্ডিকেট বা সিনেট সভায় এই বিষয়ে কোন আলোচনা কখনও উত্থাপন করেছেন — এমন কোন সংবাদ এখনও পাইনি আমরা।

দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশন। ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু জড়িত থাকবার কারনে মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের নীচতলায় অবস্থিত এসোসিয়েশনের কার্যালয়ে যাবার সুযোগ হয়। বেশ সুসজ্জিত আর নানা আড়ম্বর যেন ছুয়ে আছে দেশের সবচাইতে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই এসোসিয়েশন কার্যালয়টিকে। নানা অনুষ্ঠানেও মাঝে মাঝে যেতে হয়েছে অ্যালামনাই এসেসিয়েশন প্রাঙ্গনে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এক ব্যবসায়ী এই বৃহৎ প্রাক্তন শিক্ষার্থী সম্মিলনির সভাপতি। বন্ধুর সুবাদেই একদিন জানা গেল, অ্যালামনাই এসোসিয়েশন তাদের কনফারেন্স কক্ষ, লাউঞ্জ সহ সাজ-সজ্জাকরনে নাকি কোটি টাকার ওপর অর্থ ব্যয় করেছে। যা নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে। মনে আছে, গেল বছরের মাঝামাঝি বীরসা মুন্ডার প্রয়ান দিবস উপলক্ষে এই প্রাঙ্গনে এক অনুষ্ঠানে যাবার সুযোগ হয়েছিল। সাতক্ষীরার আইলা কবলিত অঞ্চল আর উত্তরবঙ্গ থেকে আসা মুন্ডা ছাত্র ছাত্রীরা রীতিমতো ক্ষোভ আর বেদনার সাথে উচ্চ শিক্ষা নিতে এসে তাদের কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরছিলেন। তাদের অনেকেই তাদের পরিবার এমনকি গ্রামের বা সেই এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগ পেয়েছেন। সমাজের একেবারে প্রান্তিক অবস্থান থেকে উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা এই শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে শুনতে ভাবছিলাম–এই গোট অ্যালামনাই এসোসিয়েশন ভবনটিই যেন পরিহাস করছে এসব জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের সাথে । কারন,অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের কারো একবারও মনে হয়নি– সাজ সজ্জায় এত অর্থ ব্যয় না করে তা খুব সহজেই বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া যেত গবেষণা বা বৃত্তি প্রদানের জন্য। তাতে হয়তো সমাজের প্রান্তিক অবস্থান থেকে আসা এই মুন্ডা শিক্ষার্থীদের পড়বার সুযোগ আরো খানিক বৃদ্ধি পেত। সুযোগ পেত এজাতীয় আরো অনেক ছাত্র ছাত্রী। যাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ঠেকাতেই বিশ্বব্যাঙ্ক আর তাদের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক cost sharing প্রস্তাব আইনে পরিণত হয়েছিল।

বাংলাদেশের আপাতঃ বিভক্ত রাজনীতি আর বৈষম্য কবলিত সমাজের মতো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও কেবল বৈষম্যই টিকিয়ে রাখছে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান এ থেকে ভিন্ন নয়। উচ্চ শিক্ষাকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞান সৃস্টির আধারে পরিণত করতে যে দূরদৃষ্টি প্রয়োজন, যে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য প্রয়োজন —স্বাধীনতার চার দশক পরও এদেশে তা তৈরি হয়নি। রাজনীতিবিদদের দায়িত্বহীনতা, দল ও মতলববাজ শিক্ষকদের ধান্ধাবাজি, প্রায় স্থবির হয়ে পড়া আমলাতন্ত্র এবং মেধাহীন ছাত্রনেতা ও তাদের নীতিহীন রাজনীতি আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ফোপড়া করে ফেলেছে। এর সুযোগ নিয়েই বিশ্বব্যাঙ্ক আর এডিবির মতো বৈশ্বিক পুঁজির ফড়িয়া প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব এ্যজেন্ডা বাস্তবায়নে কৌশলপত্র প্রনয়ন করে তা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়নে তৎপর হয়েছে। এক শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আর সরকারী আমলাও তাদের এজাতীয় প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে সহযোগী হয়ে উঠেছে। এরাই আমাদের রাষ্ট্রীয় খাতের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিকীকরনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় আরো বৈষম্য সৃষ্টিতে তৎপর। আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতন শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের সক্রিয় প্রতিবাদ আর তৎপরতাই কেবল শিক্ষা সংকোচনের এই প্রক্রিয়া রুখতে পারে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই পথ আমাদের আবারও দেখালেন।

তারেক আহমেদ :চলচ্চিত্রকর্মী ও আদার ভিশন কম্যুনিকেশন-এর পরিচালক।

Responses -- “প্রকল্প নির্ভর শিক্ষা: উচ্চ শিক্ষার ফাঁদ পাতা ভুবন”

  1. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

    অতি দরকারি ও সময়োপযোগী লেখা। আসলে শিক্ষা শুধু নয়, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন, মায়া-মমতা নিয়েও বাণিজ্যমুখরতা শুরু হবে বলে মনে হচ্ছে। কর্পোরেট পুঁজি সবই হজম করে ফেলবে! এ সময়ে সচেতন মানবসম্প্রদায় এ নিয়ে ভাবার, কিছু করার সময় এসেছে।
    তারেক আহমেদকে তার এ লেখার জন্য অজস্র ভালোবাসা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—