আইএস-ভাবাদর্শী জঙ্গিগোষ্ঠী কর্তৃক গুলশান হামলার পর দেশের জননিরাপত্তা ও সন্ত্রাস বিষয়টি যেমন করে সামনে এসেছে তা আগেই আসা উচিত ছিল। অর্থাৎ সন্ত্রাস বিস্তার ও তা রোধ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকাটি আগেই উন্মোচিত হওয়া উচিত ছিল। নানা কারণে সেটা ঠিক সময় হয়ে ওঠেনি। এর দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সমাজের। এ ক্ষেত্রে সমাজকাঠামোর ভূমিকাটা কম নয়। আঘাতটি বিদেশিদের উপর না আসলে এবং দেশের বিত্তশালী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আক্রান্ত না হলে এটা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে হয়তো বিবেচিত হত। এ প্রেক্ষিতে এই হামলা বা হামলার প্রচার আইএস অথবা আইএস-সমর্থিতদের সাফাল্য হিসেবে ধরে নিতে হবে।

ঘটনার পর রাজধানীতে বসবাসকারী বিত্তবান মানুষের মনে স্বস্তি নেই। নিরাপত্তাবোধ নেই কোথাও। এর ওপর ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সন্ত্রাসের আখড়া বলে ভিক্টিমাইজড করা, মাদ্রাসা ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে এক মাপে এনে ‘কার্পেট ব্লেমিং’ করার প্রয়াসটি দেশের বুদ্ধিভিত্তিক জগতে এবং সামষ্টিক মননে মেয়াদি বোমার বীজ বুনে দিচ্ছে। এটা কেবল ‘ব্রেইন ড্রেইন’ (বা মেধাপাচার) বেগবান করবে না, অনেককে শেকড়ছাড়া করবে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং শহুরে মানুষের মনোজগতে নিরাপত্তা অনুভবে যে চিড় ধরছে তা মেরামত করা কঠিন হয়ে উঠছে।

এ প্রেক্ষিতে উন্নয়ন সহযোগী তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বলয়টি যেমন নিশ্ছিদ্র করা প্রয়োজন, তেমনি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পারসেপশন সর্বতোভাবে অনুভবযোগ্য করা প্রয়োজন।

ডিপ্লোমেটিক জোন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কর্মক্ষেত্রগুলো নিরাপত্তা দেয়াল বা অনতিক্রম্য লোহার জালে ঘিরে দেওয়া প্রয়োজন। এজন্য ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরাসহ দেশের কিছু নির্বাচিত অঞ্চলকে ‘হাই সিকিউরিটি জোন’ বলে বিবেচনা করতে হবে। এসব এলাকায় সাধারণ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস বন্ধ করে বুলেট-প্রুফ বাস সার্ভিসসহ জোনাল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং স্টিকারযুক্ত গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করা দরকার।

১০ আগস্ট নিয়ন্ত্রিতভাবে গুলশান এলাকার মধ্যে বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তবে এতেই হবে না; ওই এলাকায় স্টিকারবিহীন গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা দরকার। বিশেষ প্রয়োজনে নিরাপত্তা চৌকি থেকে পাস নিয়ে ভিজিটরগণ চলাচল করবেন। রাত ১০টার পর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। হাই-সিকিউরিটি জোনের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ‘মেশিন রিডেবল জোনাল আইডি’ (বা যন্ত্রে পাঠযোগ্য আঞ্চলিক পরিচয়পত্র) থাকবে। এই জোনের ভেতরে চলাচল নিয়ন্ত্রিত হবে নানাভাবে।

এ জোনের প্রবেশপথে নিরাপত্তা ক্যামেরাসহ চেকিং পোস্ট (তল্লাশি চৌকি) কার্যকর থাকবে। জিপিএস সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি জোনে সার্বিক চলাচল মনিটরিং করা হবে। হাই-সিকিউরিটি জোনের প্রতিটি স্থাপনা ও গাড়ি রাখতে হবে র‌্যানডম চেকিংয়ের আওতায়।

মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী সন্ত্রাস দমন পরিকল্পনায় ব্যক্তির নষ্ট পরিচয় বর্জন এবং সুস্থ পরিচয় অর্জন বা আইডেনটিটি পুননির্মাণের বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধ করার জন্য তাদের অর্থের প্রবাহ, অস্ত্রের যোগান এবং পারস্পারিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। যেসব শব্দ ব্যবহার করে বা সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে ভাব ও কর্মনির্দেশনা আদানপ্রদান করে তার একটি ক্ষুদ্রকায় ডিজিটাল অভিধান তৈরি করতে হবে। এটি ব্যবহার করে তাদের যোগাযোগ যেমন নির্বাচিত ও র‌্যানডম পদ্ধতিতে রোধ করা সম্ভব, তেমনি ছদ্মপরিচয় ধারণ করে তাদের জগতে অনুপ্রবেশও সম্ভব– প্রলোভনের ফাঁদ পেতে বা বিভ্রান্ত করে তাদের বন্দী করাও সম্ভব। যে মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরক তারা ব্যবহার করে তার মাঝেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কৌশলে আপন স্বাক্ষর রাখতে পারে।

একই সঙ্গে প্রতিবেশি দেশ থেকে অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান রোধ করে তাদের শক্তি ও উন্মাদনা যেমন কমিয়ে আনা যায়, তেমনি সমাজে নষ্ট চিন্তানির্ভর ধ্বংসাত্মক কর্মের বিকাশ রোধ সম্ভব। এ ব্যাপারে প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে নানামুখী মিথস্ক্রিয়া করে এ-সংক্রান্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ দৃশ্যমান করতে হবে।

সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাসীর পেছনে ব্যবহার করে তাদের যেমন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব, তেমনি উন্নত বিশ্বের সহযোগিতায় উপগ্রহের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ ও চলাচল সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যাবে। তথ্যপ্রবাহ-সংক্রান্ত গেটলক নির্মাণ করে সন্ত্রাসীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে হবে। সামাজিক পুলিশিংকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তাদের চলাচল সীমার মাঝে আনা সম্ভব। ভিন্নমাত্রায় শিক্ষার মধ্য দিয়ে মূল্যবোধের দীক্ষার মধ্যে দিয়ে নষ্ট কাজে প্রণোদনা কমিয়ে আনতে হবে। সমাজ শুদ্ধ না হলে, ভালো মানুষের উত্থান সম্ভব না হলে, সামাজিক সমঝোতা দৃঢ় না হলে এর কোনোটাই করা যাবে না।

এ প্রেক্ষিতে নানা প্রক্রিয়ায় তরুণ-হৃদয়ে নষ্ট পরিচয়ের অনুপ্রবেশ রোধ করার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ চিন্তা ও সৃষ্টিশীল কর্মে তাদের সক্রিয় করতে হবে। এ জন্য এদের সম্পৃক্ত করতে হবে রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কর্মে ও নানামুখী শুভকর্মে, প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া ও উদ্ভাবনে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি প্রতিরোধে এবং সন্ত্রাস প্রতিরোধে তরুণ সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। তরুণরাই হবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অগ্রসৈনিক।

অন্যায়ের প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় বা প্রশাসনিক দুর্বলতা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকেই দুর্বল করবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের খেলা এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নানা অনাচার ও সন্ত্রাসের বিস্তার বেগবান করে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তিধরদের নেতিবাচক কর্ম এবং ‘ডবল স্ট্যান্ডার্ড’ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে ঘৃতাগ্নি সংযোগ করছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতির নীরবতা তরুণদের হৃদয়ে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।

ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার রোধকল্পে Demonizationএর অস্ত্রটি নিষ্ক্রিয় বা ভোঁতা করতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজকে। Xenophobiaকে ‘না’ বলতে হবে সবাইকে। ন্যায় কর্মগুলো ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হতে হবে সোশ্যাল মিডিয়াতে। আলোচনায় আসতে হবে পাশ্চাত্যের Xenophobia, আরব ও ইজরাইলিদের Xenophobia। পাশ্চাত্যে বিশ্বে বিকাশিত ইসলাম-বিদ্বেষ, এর কারণ এবং সমাধানের বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হতে হবে। এসব নিয়ে ব্যাপক ঝড় উঠুক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে।

সব ধর্মের সারকথা এবং মূল্যবোধের মূল বিষয়কে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও তথ্যপ্রবাহে সঞ্চারিত করতে হবে দৃশ্যমান তথা বোধযোগ্য প্রক্রিয়ায়। সব ধর্মের উপসনালয়গুলোকে এক আঙিনায় নিয়ে Interfaith Dialogueকে উঁচুস্তরে নিয়ে যেতে হবে।

ধর্মভিত্তিক দর্শন এবং যুক্তিভিত্তিক দর্শনের পাঠ বিদ্যালয়গুলোতে চালু করতে হবে। লক, হবস, বেকন, শোপেনআওয়ার, কান্ট, মার্কস, হেগেল, রাধাকৃষ্ণন, ইবনে রুশদ ও রুমিকে পাঠ করাতে হবে সব বিদ্যালয়ে। তাওরাত, যবুর (Old Testament) ইনজিল (বাইবেল), কোরআন, গীতা এবং বৌদ্ধ ধর্মের সারকথা জানতে হবে সবাইকে। আল কায়দা ও আইএসের উত্থানের পেছনে ভূরাজনীতির নষ্ট প্রভাব এবং হীন ইহুদি অভিসন্ধি এবং আইএস যে ইহুদি এবং ওয়াহাবি রাজতন্ত্র-সমর্থিত একটি চক্র সে সবও বলতে হবে।

ওয়াহাবি ও সালাফিস্টরা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এদের লক্ষ্য মুসলিমদের সঙ্গে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের দ্বন্দ্ব প্রকট করে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষা করা। এরা জঙ্গিদের মধ্যে অপ্রতিরোধ্য ক্রোধ ও ঘৃণা জাগিয়ে Demonized করে ভিন্নমতের মানুষদের। এতে Demonized হয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী সবাই। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি নৃশংস মৃত্যুর পরোয়ানা হিসেবে ঘোষিত হয়। আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব মসীলিপ্ত করার জন্যই এমন খেলা। ধর্ষণসহ শিশু ও নারী নির্যাতনে আইএসের ভূমিকা ব্যাপকভাবে সামনে আনা প্রয়োজন। তাদের নেতিবাচক কর্মগুলো প্রমাণসহ হাজির করা প্রয়োজন। মতপ্রকাশের সুস্থ কৌশল এবং হৃদয় জয়ের সুন্দর পথগুলো তরুণদের দেখাতে হবে।

জ্ঞানবিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে, সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য দিয়ে বিশ্বজয়ের কৌশল তাদের জানতে হবে। তরুণরাই এটা রপ্ত এবং নতুন পথ উদ্ভাবন করতে পারে। লক্ষাধিক সিরীয় শরণার্থী নেওয়ার পরও জার্মানির মতো সহনশীল দেশগুলোতে কেন আইএসের হামলা এবং কেন সেখানে জনমত মুসলিমদের বিপক্ষে যাচ্ছে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এতে ভেঙে যাচ্ছে ইউরোপের শুভশক্তি এবং তাদের সুন্দর মন। দুর্বল হচ্ছে তাদের জাতীয় সমর্থন। এর প্রভাব থাকবে দীর্ঘদিন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সারা বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠী। ভালো কাজ ও বন্ধুত্ব দিয়ে জয় করতে হবে সারা বিশ্ব।

দেশের উন্নয়নে, দুর্নীতিমুক্ত সুস্থ সমাজ নির্মাণে, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী জাতির মনন গঠনে তরুণ সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ভারসাম্যপূর্ণ Code of Conduct কীভাবে নির্মাণ করা যায় সে আলোচনায় আনতে হবে দেশের তরুণ সমাজ, সুশীল সমাজ এবং চিন্তাশীল মানুষদের। ন্যায়, শান্তি, সমঝোতা, বিনয় ও শুদ্ধতাকে সমাজ ভাবনায় অন্তর্ভুক্ত করে সমাজ গঠনে সবার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবকের মধ্যে যেমন দূরত্ব কমাতে হবে তেমনি কমাতে হবে শিক্ষালয় ও অভিভাবকের মধ্যে। পরিবার হবে শিক্ষালয়ের ক্ষুদ্র সংস্করণ। শিক্ষালয় হবে পরিবারের স্বপ্ন নির্মাণের কারখানা। উভয় স্থানে রোষ ও অহংকার বর্জন করে, Arrogance ও Violence নির্বাসিত করে, সহমর্মিতা ও ভালোবাসাকে শীর্ষে নিয়ে যেতে পারে। লোভ, শঠতা, ঔদ্ধত্য বর্জন না করলে, ইতিবাচক ও শুদ্ধ ভাবনাচিন্তা দিয়ে মনের শূন্যতা পূরণ না করলে, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি দিয়ে বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম না করলে, সন্ত্রাস রোধ অধরা থেকে যাবে।

ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা প্রতিহত করতে নানামুখী কাউন্সিলিং, সমঝোতা ও ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তির মনোজাগতিক শূন্যতা এবং হতাশাচ্ছন্ন চিন্তারোধে কাউন্সিলিং কার্যক্রম যেমন ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে নিতে হবে, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়টিকে সামাজিক পর্যায় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি। এ কাজগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের অধীনে প্রত্যক্ষ সংযোগভিত্তিক সেবা এবং দূরচিকিৎসা কার্যক্রমভিত্তিক কাউন্সিলিংয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।

একই সঙ্গে সামগ্রিক ইন্টিগ্রেশনের কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য Social Integration Service এবং কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে। এসব কাজে যথাযথ অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এই সেবার মাধ্যমে Identity Reconstructionএর কাজটি করতে হবে। মূল্যবোধভিত্তিক সদাচার শিক্ষা দেওয়ার কাজে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মিডিয়াকে নিতে হবে সমান ভূমিকা।

সন্ত্রাসে দীক্ষা নেওয়া তরুণসহ কারারুদ্ধ সন্ত্রাসীদের ডির‌্যাডিক্যালাইজেশনের কাজটি করতে হবে প্রফেশনাল সহযোগীদের মাধ্যমে। Social Integration Commission তৈরি করে তার অধীনে বড় পরিসরে ডির‌্যাডিক্যালাইজেশন টিমকে কাজ করতে হবে এবং সেটি হবে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর সহযোগী হিসেবে। এ কাজে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে আত্মপরিচয় এবং মূল্যবোধের ভিত কাঁপানো র‌্যাডিকালাইজেশন প্রক্রিয়াটি রোখার জন্য সৃষ্টিশীল তথা গঠনমূলক উদ্যোগ নিতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। এনজিও উদ্যোগ এবং প্রস্তাবিত জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ভূমিকা এ কাজে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে Social Integration Service & Reconciliation Department নামক একটি সরকারি অধিদপ্তর এ বিষয়ে রাখবে বড় মাপের ভূমিকা।

জাতিকে সন্ত্রাসী মোটিভেশন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে National Center for De-radicalization নামক একটি বড় ছাতাযুক্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে। সন্ত্রাস-সম্পর্কিত আগাম সংকেত পাওয়ার জন্য এবং এদের উত্থান প্রতিহত করার জন্য Counter Terrorism Database Center তৈরি করা প্রয়োজন।

Social Integration Identity বর্জন এবং Identity Reconstruction ইত্যাদি কাজগুলোসহ নানামুখী মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা, জাতীয় হতাশা, সামাজিক ভারসাম্যহীনতা এবং অসন্তোষ বিষয়ে কাজ করতে হবে। সমন্বিতভাবে এসব করার জন্য গঠন করতে হবে একটি জাতীয় কমিটি। মেধা ও মননভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সুচিন্তিত তথা সুপরিকল্পিত কার্যক্রমই বিপদমুক্ত করতে পারে দেশকে।

কেবল আবেগ ও তাৎক্ষণিক কর্মকাণ্ডের প্রলেপ দিয়ে টেকসই সেতু নির্মাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক সমাজ এবং সামষ্টিক শান্তি ও মর্যাদাভিত্তিক সামাজিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া সন্ত্রাসমুক্ত শান্তিময় জীবন দূর কল্পনার বিষয় হয়ে থাকবে।

ডা. এম এ হাসানবাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক

Responses -- “সন্ত্রাসের ছায়া থেকে উত্তরণ”

  1. Alhaj A.S.M. Wahidul Islam

    ডা. এম এ হাসান, তরুনদের সম্পর্কে আপনার যে উপদেশ তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত -এর দ্বিতীয় খলিফা (খলিফাতুল মসীহ) আলহাজ্ব হযরত্ব মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা:) বলেন, ”যুবকদের সংশোধন ব্যতিত জাতি সমূহের সংশোধন সম্ভব নয়” কাজেই এই দিকটায় সকলের নজর দেয়া দরকার।

    Reply
  2. মোঃ মোখলেছুর রহমান আকন্দ

    লেখাটিতে চিন্তার যথেষ্ট খোরাক রয়েছে নীতি নির্ধারকদের জন্য। তবে, আমি মনে করি, মানবেতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, কোনো জাতিই নিরঙ্কুশ শান্তি-সম্প্রীতিতে ছিল না। সেদিক বিবেচনায়, তুলনামুলক কয়েক শতক ধরে যেসব জাতিগোষ্ঠী সামাজিক ও রাষ্ট্রিকভাবে সবোর্চ্চ সংখ্যক মানুষের স্বস্তি, কল্যাণ ও অগ্রযাত্রা নিশ্চিতে সফল হয়েছে সেসব দেশের কিংবা সমাজের কাঠামো, আইন, শাসনব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা ইত্যাদি সম্যক গবেষণা করে আমাদের সমাজ বিনির্মাণে কাজ শুরু করা যায়। সে ক্ষেত্রে কনফুসিয়াসের চিন্তা-চেতনার বুননে নির্মিত চীনা সমাজ আমাদের জন্য একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

    Reply
  3. Fazlul Haq

    সারা দেশের ধুলা অপসারণ বা সমাজের সকল অন্ধকার দূর করার মত বিশাল কর্মযজ্ঞ করা কোন ব্যক্তি বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় অথবা তা করতে পারলেও সেটা স্থায়ী হয় না। ব্যক্তির পা জুতায় মুড়লে এবং ব্যক্তির হাতে মশাল দিলে যথাক্রমে ধুলা ও অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। প্রত্যেক ব্যক্তির হাতে মশাল দেয়ার একমাত্র উপায় শিক্ষা এবং উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—