Feature Img

Prokash Biswasরাষ্ট্র চাইলে দ্রুত যে কোনো মামলার নিষ্পত্তি করতে পারে। এর প্রমাণ হিসেবে বলব সিলেটের শেখ সামিউল আলম রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যা মামলার বিচারের প্রসঙ্গ। তবে রাজনৈতিক হত্যার বিচার এর ব্যতিক্রম। আবার জটিল হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচার করতে গেলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে। এ জন্য দরকার আসলে পরিমিতিবোধের।

রাজন, রাকিব হত্যায় আসামিপক্ষ জেরা ও যুক্তিতর্কের জন্য কেমন সময় পেয়েছে জানি না।তবে রাজনৈতিক মামলার বিচার কেন তাড়াতাড়ি শেষ হয় না আর রাজনৈতিক এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের এই পীড়িত হালে মামলার বিচারের গতি কী ধরনের বিষয়ের ওপর নির্ভর করে তা সবাই জানেন। আমাদের আইন-আদালতের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে নেই। আর সে কারণে ওই সব মামলার বিচারের বিষয় এ আলোচনায় আনব না।

মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট যখন মানুষের পকেটে ছিল না, ছিল না যখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুক– সেই সময়কার দৈনিক পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত প্রচারিত আলোচিত অনেকগুলো হত্যা মামলা পঁচিশ, ত্রিশ, এমনকি চল্লিশ বছরেও বিচারে নিষ্পত্তি হয়নি। ১৯৭৭ সালে সে সময়কার গণমাধ্যমে খুব আলোচিত হয় ত্রিভুজ প্রেমের জটিলতায় বন্ধুর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র জগন্নাথ হলের বীরেনের হত্যা যার বিচার এখনও মাঝপথেই আসেনি। প্রায় বছর বিশেক আগে সংঘটিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক নুবান আহম্মদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১০ বার রায়ের তারিখ রেখেও রায় দেয়নি ঢাকার একটি আদালত। জগন্নাথ সাহা রোডের উর্দুভাষী পরিবারের সীমা হত্যার বিচার ২৭ বছরেও শেষ করতে পারেনি ঢাকার একটি আদালত। ১৯৯৮ সালে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয় ভবনের পানির ট্যাংকে ডিবিরই সোর্স জালালের লাশ মিলে। সেই হত্যা মামলার, ২০১১ সালের ১৮ জুলাই আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ৬ ছাত্র হত্যা– কোনোটিরই বিচার শেষ করতে পারেনি ঢাকার বিভিন্ন আদালত।

শিশু-হত্যার বিচারেও একইভাবে রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে সিলেটের শিশু সাঈদ, রাজধানী ঢাকার আদাবরের সামিউল, নারায়ণগঞ্জের ত্বকি, পুরান ঢাকার হাজারীবাগের রাজা মিয়াসহ অসংখ্য শিশু-হত্যার মামলা। যার কোনো কোনোটির বিচারই শুরু হয়নি; আবার কোনো কোনোটি শুরু হলেও শেষ হয়নি।

দেশে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন ২৬৭টি উন্নয়ন সংস্থার সর্ববৃহৎ জোট বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুসারে, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে ৯৬৮টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে ঘটে ২০৯ টি, ২০১৩ সালে ২১৮ টি, ২০১৪ সালে ৩৫০ টি এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৪৬টি। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলারই বিচার শেষ হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুর সংখ্যা ২০১২ সালে ১২৬, ২০১৩ সালে ১২৮, ২০১৪ সালে ১২৭ আর এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৫৬। আরেক হিসাবে দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৬৯ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ জন শিশুকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়।

গুরু বাক্য বলে, ফুল থেকে মৌমাছি নেয় মধু আর মাকড়শা নেয় বিষ। সংস্কার নয়, আমাদের বাঙালি মূল্যবোধে যে সব আচার-বিচার বেমানান, আমাদের সঙ্গে সাযুজ্য তৈরি করতে পারে না এমন সকল বিষয় আমাদের আরও মাতাল করে তুলেছে। ভয়ঙ্কর রকম বিকৃতি আর উন্মাদ ব্যবস্থার গর্তে আমরা আটকে পড়েছি। সেই সঙ্গে ধর্ম পড়েছে মধ্যযুগের কূপমণ্ডূক, বর্বরদের হাতে। এ গভীর অন্ধকার থেকে উদ্ধার করার মতো সামাজিক নৈয়ায়িক শক্তির বিকাশ অথবা বোধন নেই। আকাশ-সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির নঞর্থক পড়ছে সমাজ ও পরিবারে। তা বলে তো প্রযুক্তিকে পর্দা দিয়ে আড়ালে রাখা যাবে না।

মাদকের প্রভাবও রয়েছে শিশু-হত্যার মতো ঘটনার পেছনে। আবার অনেক বিদেশি সিনেমায় ও নাটকে অনৈতিক সম্পর্ক, বেপরোয়া জীবন-আচার এবং শিশু-হত্যার ঘটনা দেখানো হচ্ছে হরহামেশা। অথচ এ ধরনের সংস্কৃতি দেশের সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে পারিবারিক অশান্তি ব্যাপক হারে বাড়ছে, যার শিকার হচ্ছে শিশুরা। কোথাও ‘বাধা’ সরাতে বা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে সরল অপাপবিদ্ধ শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। কোথাও চলছে চরম নির্যাতন। অনেক শিশু এখন বেড়ে উঠছে অস্বাভাবিক অসুস্থ পরিবেশে।

অথচ আন্তরিক হলে কম সময়ের মধ্যে রাজন-রাকিব হত্যার মতো এতটা দ্রুত না হলেও মানানসই গতিতে হত্যা মামলার বিচার এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। গত ৮ নভেম্বর রাজন হত্যা মামলায় চারজনের এবং রাকিব হত্যা মামলায় দুজনের ফাঁসির রায় হয়েছে। রাজন হত্যা মামলার রায় দেওয়া হয়েছে ১৭ কার্যদিবসে। আর রাকিব হত্যা মামলার রায় হল ১০ কার্যদিবসে। দুটি মামলারই বিচার হয়েছে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে।

২০০২ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন প্রণয়নের পর দেশের চারটি বিভাগীয় নগরে স্পর্শকাতর, জনগুরুত্বসম্পন্ন মামলার বিচারের জন্য দ্রুত বিচার শুরু হয়। ঢাকা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে জামায়তুল মুজাহেদীনের (জেএমবি) বিরুদ্ধে বেশ কিছু আলোচিত মামলারও বেশ তাড়াতাড়ি বিচার শেষ হয়ে রায়ের মুখ দেখা যায়। কিন্তু এখন আর সে গতি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। এ আইনে ১৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। এ সময়ে বিচার শেষ করতে না পারলে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক যদি মনে করেন তবে যতদিন এর অধীনে মামলার বিচার শেষ না হবে ততদিন তিনি বিচার চালিয়ে যেতে পারবেন। ২০০৮ সালে এ সিদ্ধান্ত এসেছিল আপিল বিভাগের কাছ থেকে।

বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধিত ২০০৩ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। যদি এ মেয়াদে শেষ না করা যায় তবে রাষ্ট্রপক্ষকে (প্রসিকিউশন পক্ষ) এ সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না করার উপযুক্ত কারণ উচ্চ আদালতকে ব্যাখ্যা করে বিচারের সময় বাড়িয়ে আনতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, খুব কম ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হয়।

আমাদের দেশে বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫ জি (২) ধারায় বলা হয়েছে, আদালত তার ইচ্ছাধীন ক্ষমতাবলে কোনো সাক্ষীর জেরা অন্যান্য সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্থগিত রাখতে পারবেন। অথবা কোনো সাক্ষীকে আরও জেরা করার জন্য পুনরায় ডাকতে পারবেন। এ বিধান অনুযায়ী কিন্তু দ্রুত একনাগাড়ে সাক্ষ্য নেওয়ার অবারিত সুযোগ বিচারককে দেওয়া হয়েছে।

এই তো গত ৯ নভেম্বর সোমবার ময়মনসিংহের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত পাঁচ বছর আগের ঘটনায় মুক্তাগাছার আট বছরের স্কুলছাত্র ফরহাদকে হত্যার দায়ে ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। তার সঙ্গে এক জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। একই দিন ঢাকার চার নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জুভেনাইল কোর্ট হিসেবে শিশু আইনে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানিতে আট বছরের শিশু মাহফুজকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দুই কিশোরকে ১০ বছরের সাজার আদেশ (আটকাদেশ) দেয়। এ মামলার ঘটনা ২০১২ সালের ৫ জুলাইয়ের। বেশ তাড়াতাড়ি এ মামলার রায় দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ ও বিচারক, সবাই মনে করলে কম সময়ের মধ্যেই হত্যাসহ যে কোনো ফৌজদারি অপরাধের বিচার শেষ করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে দেশের আইন জগতের অনেক কৃতী মানুষ অনেক কথা বলেন। কিন্তু আইনের বিষয়গুলো নিয়ে বলেন না। পর্যাপ্ত আইন আগে থেকেই রয়েছে। যেটা নেই সেটি হচ্ছে আইনের অ-প্রয়োগ। আর অনেক বিচারকেরই বিচারিক মনোভাব ও মনোজগতে প্রগতির পক্ষের সাংস্কৃতিক চেতনার অভাব রয়েছে। রয়েছে দুনীর্তির সমস্যাও।

দেশজুড়ে নিষ্ঠুর নৃশংসতার নানাবিধ কায়দায় শিশু-হত্যার মহোৎসব অপ্রতিরোধ্য সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে যেভাবে, ঠিক সেভাবে ওইসব হত্যাকাণ্ডে বিচার হয়নি। বিচারিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না ঘটলে বিকৃত উন্মাদ এই রাষ্ট্রসভায় পৈশাচিক ঘটনা আরও বাড়বে।

যে কোনো ফৌজদারি মামলারই বিচারকালীন পর্যায়ে যে বিষয়টি আমাদের বিচারালয়ে উপেক্ষিত থাকে তার প্রধানতম হল, সাক্ষীদের সুরক্ষা দেওয়া। অনেক সময় সাক্ষীদের সঙ্গে দুব্যর্বহারও করা হয়। রয়েছে সাক্ষীদের রাহা-খরচ প্রদানের সঙ্কট; সাক্ষীদের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য পুলিশের জবাবদিহির অভাব; রিভিশন মামলার নথি ব্যবহারের জন্য নেওয়া নিম্ন আদালতের নথি শুনানি শেষে তা আবার নিম্ন আদালতে তাড়াতাড়ি ফেরত পাঠানো; আসামিপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তাদের সাক্ষীদের প্রস্তুত না করে ফিরিয়ে দেওয়া।

সবার উপরে রয়েছে বিচারে হস্তক্ষেপ। সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ। তবু কেউ বলছে, রাজা তো মিহি মসৃণ কাপড় পরা, তাই খালি চোখে তা ধরা পড়ছে না। সুসংবাদ যে, প্রধান বিচারপতি বলেছেন, অতীতে যাই হোক, এখন থেকে সেটি মেনে নেওয়া হবে না। আমরা তেমন সুদিন বরাবরই দেখতে চাইব।

প্রকাশ বিশ্বাস: আইনজীবী ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আদালত প্রতিবেদক।

প্রকাশ বিশ্বাসআইনজীবী, লেখক এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আইন বিষয়ক সংবাদ প্রতিবেদক

Responses -- “দুটো রায় ও দ্রুত বিচারের সংস্কৃতি”

  1. মুহা. আবিদুর রহমান

    সুন্দর সময়োপযোগী আলোচনা। আমাদের বিচারকেরা বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বাধীন নয়। আর তাই সব বিচার এক তাগাদায় হয় না।
    ক্ষমতার লালচোখ ডিঙ্গীয়ে বিচার করবার মতো বিচারক ও পরিবেশ কোনটা নেই। ফলে বিচার কাজটা চলছে জোরযার মোল্লোক তার গতিতে।

    Reply
  2. Manowar

    দাদা,
    শুভেচ্ছা রইল। অনেক দিন পর আইন ও বিচার ব্যাবস্থা নিয়ে একটি ভাল লেখা পড়লাম । আরো ভাল লেখা আশা করছি।
    ধন্যবাদ,
    মনোয়ারুল ইসলাম (উজ্জল)
    এডভোকেট
    ঢাকা জজকোর্ট ।

    Reply
  3. মোঃ সিরাজুল ইসলাম সুজন

    আমি মনে করি অবৈধ সরকার যা কিছু করবে সব কিছুই হবে অবৈধ। কাজেই এ সরকারের বিচার ব্যবস্তা সম্পর্কে আর মন্তব্য করে কোন লাভ নাই। বিবেক বান জনগণ এর সঠিক জবাব দিবে সঠিক সময়ে ইনশাআল্লাহ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—