মহাত্মা গান্ধীর জীবনীর উপর দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান সিনেমা পরিচালক রিচার্ড অ্যাটেনবরো নির্মিত ‘গান্ধী’ ছবিটি ১৯৮২ সালের ৩ ডিসেম্বর লন্ডনে মুক্তি পেলে, ছবিটির প্রথম প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস এবং তাঁর তখনকার স্ত্রী প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়না। দিল্লিতে ৩০ নভেম্বর এই ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নিউ ইয়র্কের প্রথম প্রদর্শনীতেও বিশিষ্ট এমন কেউ উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু এখন তাঁর নামটি মনে করতে পারছি না। রিচার্ড অ্যাটেনবরো গত ২৪ আগস্ট নব্বই বছর বয়সে মারা গিয়েছেন।

‘গান্ধী’ ছবিটির জন্য অ্যাটেনবরো ১৯৮৩তে ৫৫তম অস্কার আয়োজনে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কারটি জিতে নেন। ‘গান্ধী’র নাম ভূমিকায় অভিনয় করে বেন কিংসলে পেয়েছিলেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার। বস্তুত ছবিটি ১১টি শ্রেণিতে মনোনয়ন পেয়ে পরে ৮টিতে অস্কার পেয়েছিল। স্পষ্ট মনে আছে, জেদ্দায় অস্কার ঘোষণার আগের কয়েক দিন খুব টেনশনে ছিলাম, ছবিটি ক’টি পুরস্কার পাবে এই চিন্তায়।

ছবিটি রিলিজ হওয়ার পরই জেদ্দায় ভিডিও ক্যাসেট জোগাড় করে ‘ভিসিআর’এ বাসায় বসে সকলকে নিয়ে দেখেছিলাম। দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম প্রত্যাশিতভাবেই। মহাত্মা গান্ধীর প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতার একটি প্রধান কারণ, ১৯৭৩-৭৫এ দিল্লিতে আমাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার সময়, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তাঁকে যে বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়, বিড়লাদের সেই বাড়িটি আমাকে প্রায়ই আকর্ষণ করত। আকর্ষণ করত রাজঘাট যেখানে গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, সে জায়গাটিও। তারপরেও যতবার দিল্লি গিয়েছি, ততবার এই দুই জায়গায় গিয়ে সমৃদ্ধ হতে চেষ্টা করেছি।

 

‘গান্ধী’ ছবিটির জন্য অ্যাটেনবরো ৫৫তম অস্কার আয়োজনে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কারটি জিতে নেন

 

আমার শৈশবের প্রথম দিকের যে দুটি স্মৃতি এখনও ভালোই মনে আছে তার একটি হল, তখন শিশু শ্রেণিতে পড়ি, ক্লাসের শিক্ষক সুরেশ ঠাকুর বললেন, ‘মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে, সুতরাং আজ স্কুল ছুটি’। দিনটি কি গান্ধীকে হত্যার পরদিন, ৩১ জানুয়ারি ছিল, নাকি তারও পরদিন তা এত বছর পর এখন মনে নেই। কারণ তখন তো এত দ্রুত খবর পাওয়া যেত না।

‘গান্ধী’ ছবিটি ১৮৩ মিনিট দৈর্ঘের। শুরু হয় বিড়লা ভবনের লনের দিকে যখন গান্ধী তাঁর দুই তরুণী আত্মীয়া, মনু ও আভার কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে আসছিলেন তখন তাকে নাথুরাম গডসের গুলি করার দৃশ্য দিয়ে। তারপর দিল্লির রাজপথ ধরে তাঁর মরদেহ যখন যমুনা নদীর পাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিল, তখন তিন লাখ মানুষকে রিচার্ড অ্যাটেনবরো জড়ো করেছিলেন বলে ইন্টারনেটে দেখছি। গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ওই সংখ্যাটিকে একটি রেকর্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিউনারেল প্রসেশনের ধারা বর্ণনায় এক বিদেশি ভাষ্যকার বলতে থাকেন, ‘‘আলবার্ট আইনস্টাইন মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে মানুষজন বিশ্বাস করবে না যে রক্ত-মাংসের এমন একজন মানুষ এই ধরাভূমিতে হাঁটাহাঁটি করেছিলেন’।’’

আর আইনস্টাইনের বিপরীতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ভারতের স্বাধীনতার আগে তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন, ‘নেকেড ফকির অব ইন্ডিয়া’ বলে!

 

আইনস্টাইন মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, ভবিষ্যতে মানুষজন বিশ্বাস করবে না যে রক্ত-মাংসের এমন একজন মানুষ এই ধরাভূমিতে হাঁটাহাঁটি করেছিলেন

 

দুই

হাজারভাবে মহাত্মা গান্ধীকে বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর জীবিতাবস্থায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর, গত ছেষট্টি বছর ধরে। ধারণা করি, অনাদিকাল পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে লেখালেখি, বন্দনা, আলোচনা, সমালোচনা চলতে থাকবে। গান্ধী জীবিতাবস্থায় নোবেল খ্যাতি, পুরস্কার পাননি। এই অস্বীকৃতি নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিরুদ্ধে অতি বড় একটি যৌক্তিক অভিযোগ। তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া না হলেও তাঁর অনুসারী, গান্ধীবাদে প্রবল বিশ্বাসীদের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এই ক্যাটেগরির উজ্বলতম উদাহরণ হচ্ছেন মার্টিন লুথার কিং এবং এই বছরের শান্তি পুরস্কারের দুই বিজয়ীর একজন, ভারতের কৈলাশ সত্যার্থী।

কিন্তু আমাকে অভিভূত করেছে ‘গান্ধী’ ছবিটির নির্মাণের পেছনে অতিসাধারণ একজন গান্ধীভক্তের নন্দিত ভূমিকা। ছবিটির শুরুতে যখন টাইটেল দেখানো হতে থাকে, তখন এক মিনিটের মধ্যেই ইংরেজিতে এই কথাগুলো ভেসে উঠে পর্দায়:

‘‘ছবিটি এই ৩ জনকে উৎসর্গ করা হল, মতিলাল কোঠারি, আর্ল মাউন্ট ব্যাটেন অব বার্মা এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু।’’

 

‘‘ছবিটি এই ৩ জনকে উৎসর্গ করা হল, মতিলাল কোঠারি, আর্ল মাউন্ট ব্যাটেন অব বার্মা এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু’’

 

জওহরলাল নেহেরুকে আমরা সকলেই চিনি, জানিও; ‘আর্ল মাউন্ট ব্যাটেন অব বার্মা’ মানে লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন, ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের শেষ ব্রিটিশ এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল। কিন্তু মতিলাল কোঠারি কে? যাকে রিচার্ড অ্যাটেনবরো মাউন্টব্যাটেন এবং নেহেরুর আগেই, এক নম্বরে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন?

জেদ্দাতে ছবিটি প্রথম দেখার পর থেকেই মতিলাল কোঠারি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করে আসছি, কিন্তু তেমন সফল হইনি। রিচার্ড অ্যাটেনবরোর মৃত্যুর পর, ১৪ সেপ্টেম্বর ‘হিন্দুস্থান টাইমস’এ প্রকাশিত রামচন্দ্র গুহ নামের এক লেখকের ‘দ্য আম আদমী বাহাইন্ড অ্যাটেনবরোস গান্ধী’ শিরোনামের এক লেখায় মতিলাল কোঠারি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পেলাম।

তিন

কোঠারি ও অ্যাটেনবরো সম্মতি আদায় করেন ইন্দিরা গান্ধীর (সৌজন্য: Gujarati world)

মতিলাল কোঠারি লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনে ছোটখাট একটি পদে কাজ করতেন। ১৯৫০এর দশকের শেষ দিকে তাঁর হার্টে সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৬১তে তাঁর অসুস্থতা সত্ত্বেও, মহাত্মা গান্ধীর উপর একটি ছবি নির্মাণের কমিটমেন্ট নিয়ে এগুতে থাকেন। কোঠারি শুরুতেই গান্ধীর জীবনীকার লুই ফিশারের কাছে তাঁর বইটি নিয়ে ছবি নির্মাণের অনুমতি চান। ফিশার কোনো টাকা পয়সা ছাড়াই তাঁকে বইটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। ১৯৬২ সালের জুলাইতে কোঠারি রিচার্ড অ্যাটেনবরোকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি ছবিটি পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন কিনা। ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাটেনবরো তাঁর সম্মতি জানান।

তারপর কোঠারির প্রস্তাবেই, অ্যাটেনবরো কথা বলেন মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে। তাঁকে তাঁরা রাজি করান নেহেরুর সঙ্গে কথা বলে তাঁর সম্মতি আদায় করার জন্য। তাঁরা নেহেরুর সম্মতি আদায়েও সফল হন। ১৯৬৪তে নেহেরু হঠাৎ মারা যান। তখন তাঁরা সম্মতি আদায় করেন প্রথমে নেহেরুর উত্তরসূরী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরী ইন্দিরা গান্ধীর। এতসব সাফল্যের পরও অর্থের জোগানটা অ্যাটেনবরোর সমস্যা থেকেই যায়।

ইতোমধ্যে কোঠারি এবং অ্যাটেনবরোর সম্পর্কে কিছুটা ফাটল ধরে। কোঠারি তখন প্রস্তাব দেন দুনিয়ার আরেকজন শ্রেষ্ঠ পরিচালক ডেভিড লিনকে। লিন রাজি হন প্রস্তাবে, কিন্তু ইতোমধ্যে মতিলাল কোঠারি ১৯৭০এ মারা যান হার্ট অ্যাটাকে। লিনও তখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু অ্যাটেনবরোর আগ্রহ নতুন গতি পায় কোঠারির মৃত্যুতে। এই পর্যায়ে তখন পণ্ডিত রবিশংকরও অ্যাটেনবরোকে উৎসাহ দিতে থাকেন। ‘গান্ধী’ ছবিটির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তিনিও যুক্ত হন অ্যাটেনবরোর সঙ্গে।

১৯৭৫ সালে ভারতে মিসেস গান্ধী ‘ইমার্জেন্সি’ জারি করলে ছবিটি নির্মাণের পরিবেশও বাধাগ্রস্ত হয়। তারপর, ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মিসেস গান্ধী তো ক্ষমতাচ্যুত হলেন। ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর ছবির শুটিং শুরু হয়। ১৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং খরচে নির্মিত ছবিটি প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। মনে আছে, ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করায় তখন দেশের একমাত্র চ্যানেল, বিটিভিতে সপ্তাহের ছবি হিসেবে প্রথম দেখানো হয়েছিল ‘গান্ধী’ ছবিটি। শাহরিয়ার ইকবাল, বঙ্গবন্ধুর শেষ দিনগুলোতে তাঁর সহকারী এক সচিব, ১৯৯৬ সালে ছিলেন বিটিভির মহাপরিচালক। শেখ হাসিনার ক্ষমতাগ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই ‘গান্ধী’ ছবিটি বিটিভিতে দেখানোর অভিযোগে শাহরিয়ার ইকবালকে আক্রমণ করে ‘খবর’ নামের ‘ইনকিলাবী আবর্জনা’ ছাপা হয়েছিল। আর এই ছবিটির প্রদর্শনীর কারণে শেখ হাসিনার ‘ভারত-তোষণ’ও খুঁজে পেয়েছিল ইনকিলাবী দুর্বৃত্তরা।

 

১৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং খরচে নির্মিত ছবিটি প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে

 

ছবিটি সম্পর্কে আমার বড় দুটো অভিযোগের একটি হল, ছবিতে মহাত্মা গান্ধীকে নোয়াখালিতে মোল্লা গোলাম সরোয়ারদের উস্কানিতে সংগঠিত দাঙ্গা দমনের জন্য সেখানে তাঁর প্রায় তিন মাস অবস্থানের কিছৃুই দেখানো হয়নি। অথচ গান্ধীর এই সফর তাঁর দাঙ্গা দমন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় খুব বড় সাফল্যগুলোর একটি ছিল বলে সারা দুনিয়ায় স্বীকৃত।

দ্বিতীয় অভিযোগটি হল, ছবিতে নেহেরু শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কলকাতায় রায়টে মুসলমানদের উস্কানি দেওয়ার জন্য সরাসরি দায়ী করেন। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, নেহেরু গান্ধীর অনশন ভাঙাতে সোহরাওয়ার্দীকে গান্ধীর কোলকাতার অনশনস্থলে নিয়ে গেলেন; কিন্তু সোহরাওয়ার্দী একটি হরফও উচ্চরণ করেননি এই দৃশ্যগুলোতে, তাঁকে নেহেরুর পাশে নিরবেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

আমোদ এবং উৎসাহের সঙ্গে লক্ষ্য করি, সারা দুনিয়ার কতসব দেশে মহাত্মা গান্ধীকে স্মরণ করার কতসব আয়োজন। দুনিয়ার এইসব দেশে তাঁর নামে সড়ক, স্কোয়ার, বাগানের নামকরণ করা হয়েছে। মূর্তি নির্মিত হয়েছে অনেক দেশে। জাতিসংঘ ২০০৭ সালের ১৫ জুন গান্ধীর জন্মদিন ২ অক্টোবরকে ‘অহিংস, বিশ্ব শান্তি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ‘গান্ধী’ ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায়, ‘সেডিসিন’এর অভিযোগে মহাত্মা গান্ধীকে আদালতে আনা হলে, তিন ব্রিটিশ বিচারক দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান দেখান।

বাংলাদেশে কতসব রাস্তাঘাটের লোকজনের জন্য কতসব স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি! কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর নামে? ‘নো, নাথিং, নেভার’! এতে কি আমাদের মান-মর্যাদা বাড়ছে, না আমরা ছোট হচ্ছি? আমরা কি জানি যে, পাকিস্তান এবং মুসলমানদের প্রতি গান্ধীর বেশি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেই তখন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘আরএসএস’ (রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ) পরিকল্পনা করে তাঁকে হত্যা করছিল?

ভারতের জাতির জনকের সমাধিতে বাঙালির জাতির জনকের শ্রদ্ধাঞ্জলি, ১৯৭৪ সালে, বাঁয়ে লেখক (লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত)

চার

মহাত্মা গান্ধী ভারতের জাতির জনক। আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও আমাদের জাতির জনক। ভারতের আর এক নেতা বাঙালি সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে প্রবল ভূমিকা রেখেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সফল হয়েছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। আমাদের অনেক অনেক ব্যর্থতা। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রী-নেত্রী-কর্মীদের ব্যর্থতাগুলো বেশি বেশি চোখে লাগে। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দিন আহমেদ এবং বঙ্গবন্ধুর আশেপাশের নেতাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের বিপরীতে প্যালেস্টাইনিদের ছেষট্টি বছরের ব্যর্থতা তুলনা করলে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর সাফল্য আরও বেশি স্পষ্ট হয়। দুনিয়ার আরও কতসব অঞ্চলে কতসব মানুষ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কত সমুদ্র পরিমাণ রক্ত দিয়ে চলেছে। ইউক্রেইন এবং স্পেনের কাতালোনিয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন সর্বসাম্প্রতিক দুটি উদাহরণ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এতবড় সাফল্যের পরও গান্ধীভক্ত মতিলাল কোঠারির মতো ক’জন ‘বঙ্গবন্ধুভক্ত’ আছেন এই দেশে?

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর করার আগ পর্যন্ত দাঁড়ি কাটবেন না বা জুতা পরবেন না এমন কিছু বঙ্গবন্ধুভক্তের খবর কখনও কখনও পড়েছি। বঙ্গবন্ধুর মাজারে একজন ভক্ত সারাদিন কোরান তেলাওয়াত করেন, দেখে এসেছি। কিন্তু একই সঙ্গে সাত-আট বছর আগে বঙ্গবন্ধুর মাজার কমপ্লেক্সের ছোট ছোট কিওস্কগুলোর কয়েকটিতে ভারতীয় হিন্দি ছবির নায়ক-নায়িকাদের বিশাল বিশাল পোস্টার বিক্রির জন্য ঝুলিয়ে রাখতেও দেখেছি। আর কয়েকটিতে হিন্দি ছবির গানও মাইকে বাজানো হচ্ছিল। প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুভক্ত তাজুল ইসলামসহ আমরা কয়েকজন। তখন বিএনপি-জামাতিদের অপশাসন চলছিল। ওখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেছিলেন, তারা কয়েক মাস বেতন পাচ্ছিলেন না।

এই বাংলাদেশে মতিলাল কোঠারির মতো অনেক অনেক বঙ্গবন্ধু অনুসারীর দরকার আজ। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগে তাদের পাওয়া যাবে না। এরা বরং বঙ্গবন্ধুকে বেইজ্জত করে চলেছে।

শিউলীতলা, উত্তরা; শনিবার, ১ নভেম্বর, ২০১৪।

মহিউদ্দিন আহমদপররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব, কলাম লেখক; শৌখিন মিডিয়া মনিটর

১৯ Responses -- “মহাত্মা গান্ধীর ছিলেন মতিলাল কোঠারি, বঙ্গবন্ধুর কে”

  1. ম্যানিলা নিশি

    স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার বছরের মাথায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাহেব দেশবাসীকে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে লংমার্চের ডাক দিয়েছিলেন।

    মওলানা সাহেব কি ভারত-বিরোধী ছিলেন?

    মওলানা সাহেব বেঁচে নেই। ভারত আজও একের পর এক অভিন্ন নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে চলেছে। যে প্রেক্ষিতে মওলানা সাহেব লংমার্চের ডাক দিয়েছিলেন এখন অবস্থা তার চেয়েও খারাপ হয়েছে। কিন্তু মওলানা সাহেবের মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার দেখা এখন আর মেলে না … মেলে অন্য কিছু!

    আজকে গান্ধীজির নামে সড়ক নামকরণের প্রসঙ্গ উঠেছে।

    একচল্লিশ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার কথা বলে প্রায় চার দশক ধরে দেশকে মরুভূমিতে পরিণত করার প্রধান হাতিয়ার ফারাক্কা বাঁধ যিনি চালু করেছিলেন, এরপর হয়তো তার নামেও কিছু একটা করা হবে!

    Reply
  2. Shibgatur Rahman

    আপনার শেষ কথাটি, “এই বাংলাদেশে মতিলাল কোঠারির মতো অনেক অনেক বঙ্গবন্ধু অনুসারীর দরকার আজ। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগে তাদের পাওয়া যাবে না। এরা বরং বঙ্গবন্ধুকে বেইজ্জত করে চলেছে”– যুগোপযোগী, সাহসী ও এক কথায় চমৎকার।

    Reply
  3. Arin Amir

    কত কত সুবিধাবাদীরা বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে সুবিধা নিচ্ছে। কেবল খুব সামান্য ক’জন সত্যিকারের শ্রদ্ধা করেন তাঁকে, স্মরণ করেন জাতির জন্য তাঁর বিশাল অবদান।

    মহাত্মা বলেছিলেন–

    The world has enough to meet evrybodies need
    the world has nothing to meet anybodies greed…

    Reply
  4. কান্টি টুটুল

    এদেশের সম্প্রচার মাধ্যমে হিন্দি ভাষায় ডাবিংকৃত কার্টুন, ভারতীয় সিরিয়ালের পর এখন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের আমাদের চিন্তায়-মননে চাপিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে!

    দেরি হওয়ার আগেই এই প্রবণতা বন্ধ করা উচিত।

    Reply
    • ম্যানিলা নিশি

      আর সব ইস্যু না হয় বাদই দিলাম। কেবল ভারত-বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা অভিন্ন নদীগুলোতে আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ভারত যেভাবে একের পর এক বাঁধ দিয়ে চলেছে সেটি এদেশের কৃষক তথা সমগ্র দেশবাসীর গলা টিপে ধরার নামান্তর।

      আসন্ন এই বিপদ নিয়ে মাথা ঘামানোর পরিবর্তে দেশের সচেতন মহল যখন গান্ধী, নেহেরু, মতিলালদের নিয়ে গবেষণায় মেতে উঠেন তখন এদেশের মরুকরণ প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়।

      Reply
      • Mahbub

        বোধহয় লেখাটি ভালোভাবে পড়েননি অথবা পড়লেও বুঝতে পারেননি!

        যাই হোক, মর্মার্থ বুঝে মন্তব্য বাঞ্ছনীয়।

      • আরণ্যিক

        এ রকম হীন মানসিকতার জন্যই আমাদের আজ এই অবস্থা। সব সময় ভারত-বিরোধিতা না করে যে প্লাটফর্মে যেটা করা উচিত সেটা করুন।

  5. Adnan

    অসাধারণ একটি লেখা। ঠিক দিন দুই আগেই চিন্তা করছিলাম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমরা এখনও কোনো জীবনী কিংবা সিনেমা করতে পারিনি কেন? অনেকেই বিক্ষিপ্ত কিংবা এলোমেলো নানা রকমের তথ্য বা ইতিহাস সংগ্রহ করে চলেছেন, কিন্তু বড় পরিসরে কোনো কাজ যেগুলো ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তেমন দেখা যায় না।

    আমাদের নিজেদের স্বার্থেই তেমন উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

    Reply
  6. Md. Shakhawoat Hossain Jony

    সম্মানিত মহিউদ্দিন আহমেদ,

    আপনার তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি পড়লাম। পড়ে একই সঙ্গে আনন্দিত ও ব্যথিত হলাম।

    ১.

    আনন্দিত হলাম এই কারণে যে, গান্ধীজিকে আমরা কমবেশি সবাই জানি, তিনি একজন দেবতুল্য ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। এ রকম মানুষ শতাব্দীতে শুধু একবারই জন্মান, আর তাও অল্প সময়ের জন্য। স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে যথার্থই বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে মানুষজন বিশ্বাস করবে না যে রক্ত-মাংসের এমন একজন মানুষ এই ধরাভূমিতে হাঁটাহাঁটি করেছিলেন’। এর পরে আমাদের মতো অর্বাচীনের আর কী-ই-বা বলার থাকে?

    বেশ কয়েকবার ভারত গিয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে একটা ব্যাপার দেখলাম, ভারতের মানুষ যে যে ধর্মে, গোত্রে বা দলে বিশ্বাসী হোক না কেন, গান্ধীজিকে তারা সবাই তাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে রেখেছেন। গান্ধীজি যে তাদের ‘জাতির জনক’, এটা মেনে নিতে দ্বিধা তো করেনই না বরং এই ব্যাপারটাই তাদের কাছে সম্মানের।

    আমাদের দেশে একবার বিবিসি থেকে জরিপ করা হয়েছিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচনের জন্য। বিবিসির এই জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পেছনে ফেলে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন। এই জরিপ নিয়েও নিন্দুকেরা কম কানাঘুষা করার কিংবা জল ঘোলা করার চেষ্টা করেনি, যদিও তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি।

    বিবিসি ঠিক এই রকম একটা জরিপের আয়োজন করার চেষ্টা করেছিল ভারতে যে, কে হবেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ভারতীয়, যদিও শেষ পর্যন্ত জরিপটা হতে পারেনি ভারতীয়দের বিরোধিতার কারণে। কারণ তাদের একটাই কথা ছিল, বিনা জরিপেই আমাদের শ্রেষ্ঠ ইন্ডিয়ান হলেন আমাদের জাতির জনক মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধী। যদি বিবিসি মনে করে, দ্বিতীয় ইন্ডিয়ান কে হবেন, তাহলে তারা জরিপটা করতে পারেন। কী অভূতপুর্ব আবেগের কথা!

    ২.

    ব্যথিত হলাম এ কারণে যে, এই উপমহাদেশে গান্ধীজির পরে যাঁর কথা প্রথম আসে তিনি হলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। তাঁকে আমরা প্রাপ্য সম্মানটুকু তো দিই-ই না, বরং পদে পদে বিতর্কিত করার চেষ্টা করি। আসলে আমরা বুঝতে পারি না যে, এতে করে আমরা নিজেরাই নিজেদের বিতর্কিত করি। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হই।

    আরেকবার ধন্যবাদ সম্মানিত মহিউদ্দিন আহমদকে সুন্দর এবং তথ্যবহুল এই লেখাটি উপহার দেবার জন্য।

    Reply
  7. michaelds

    আমার খুব ভালো লাগল যে কেউ সাহস করে এই কথা লিখলেন। আসলে প্রত্যেককে জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কথা বলা উচিত।

    Reply
  8. সাইফুল ইসলাম

    আবদুল গাফফার চৌধুরী অনেকদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা চলচ্চিত্র বানানোর। কিন্তু তিনি ভালো সিনেমার চেয়ে প্রচারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি অমিতাভ বচ্চনসহ আরও অনেকের কাছে গেছেন।

    Reply
  9. shakhawat hossain

    এই বাংলাদেশে মতিলাল কোঠারির মতো অনেক অনেক বঙ্গবন্ধু অনুসারীর দরকার আজ। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগে তাদের পাওয়া যাবে না। এরা বরং বঙ্গবন্ধুকে বেইজ্জত করে চলেছে।

    Reply
    • Gregory Hawee

      গান্ধী সত্যিই ছিলেন বিশ্বের মহান নেতাদের একজন। তিনি ভারতের জাতির জনক, যেখানে মানুষ বর্ণ ও গোত্রের ভাগ সত্ত্বেও একসঙ্গে বাস করছে। তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত, তাঁর শান্তির আদর্শ অনুসরণ করা উচিত। কেবল বিশ্বের মানুষের মনে শান্তিই দেওয়া যায়।

      একইভাবে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির পিতা, তাঁকেও আমাদের শ্রদ্ধা করতে হবে। তাঁর মহান উদ্যোগ ও চিন্তা ছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এটা ঈশ্বরেরই আশীর্বাদ যে তাঁরা মানুষকে ভালোবেসেছেন, যে মানুষ তৈরি করেছেন স্বয়ং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরই।

      এই পৃথিবীর সব মানুষের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

      Reply
    • আতিউর রহমান

      মহাত্মা গান্ধী অবিভক্ত ভারতের মহান নেতা। তিনি বিশ্বনেতাও বটে। লেখকের সঙ্গে আমারও দাবি, এ মহান নেতার নামে বাংলাদেশেও কিছু একটা করা হোক। হতে পারে পদ্মা সেতুর নাম।

      তাতে বিশ্বে বাংলাদেশের মান বাড়বে বই কমবে না।

      Reply
      • সৈয়দ আলী

        সহমত। তবে আমাদের স্মরণে রাখা উচিত, সেই ১৯৫৫ সালে কাগমারী সম্মেলনে গান্ধী, সুভাষ বসু, নেহেরু, ওয়ালী খানের নামে তোরণ নির্মাণ করে মওলানা ভাসানী তীব্র আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিলেন।

        এখন তো মৌলবাদীদের পৌষ মাস, তাই সাহসের সঙ্গে গান্ধীর নামাঙ্কিত কোনো কিছু স্থাপন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—