Feature Img

Avijit Roy প্রবন্ধের শিরোনামটি ভারতের একসময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহার একটি উদ্ধৃতি থেকে ধার করা। যারা বিজ্ঞানচর্চার নামে অপবিজ্ঞান চর্চা করেন, আর প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব তালাস করেন, তাদের উদ্দেশে এই তাৎপর্যময় উক্তিটি করেছিলেন ড. সাহা, সেই ত্রিশের দশকে। তবে সাম্প্রতিক কিছু সংবাদের প্রেক্ষিতে এই প্রাতঃস্মরণীয় বিজ্ঞানীর উদ্ধৃতিটি উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে অনুভব করলাম।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী খবরের শিরোনাম হয়েছেন, তবে মন্ত্রিত্বের কারণে নয়, হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আর মহাকাব্যগুলোতে আধুনিক বিজ্ঞানের খোঁজ পেয়ে। মুম্বাইয়ে আম্বানি পরিবার আয়োজিত একটি ভাষণে মোদী অভিমত দিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ের বিজ্ঞানের যে নব নব আবিষ্কারের জন্য আমরা গর্ববোধ করি, তার সবই নাকি আসলে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানের চর্বিতচর্বন। ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় শিরোনাম করা হয়েছে–

Indian prime minister claims genetic science existed in ancient time

[Guardian, 28 October, 2014]

মোদীর মতে, মহাভারতের উপকথা অনুযায়ী কর্ণের জন্ম হয়েছিল জরায়ুর বাইরে। তাই কর্ণ নির্ঘাত ‘টেস্ট টিউব বেবি’ কিংবা হয়তো ‘জেনেটিক ক্লোনিং’এর ফল। কর্ণের জন্ম ঠিক কীভাবে হল তা স্পষ্ট করে না বললেও এটা স্পষ্ট করেই বলেছেন, প্রাচীন ভারতের ঋষিরা ‘জেনেটিক সায়েন্স’ জানতেন।

মোদী অভিমত দিয়েছেন, বিজ্ঞানের যে নব নব আবিষ্কারের জন্য আমরা গর্ববোধ করি, তার সবই নাকি আসলে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানের চর্বিতচর্বন
মোদী অভিমত দিয়েছেন, বিজ্ঞানের যে নব নব আবিষ্কারের জন্য আমরা গর্ববোধ করি, তার সবই নাকি আসলে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানের চর্বিতচর্বন

এ প্রসঙ্গে কিছু বলা প্রয়োজন বোধ করছি। কর্ণ আসলে ছিলেন পাণ্ডবজননী কুন্তীর প্রথম পুত্র। তবে তিনি এক অর্থে কুন্তীর ‘বৈধ সন্তান’ ছিলেন না। তার আদি নাম ছিল বসুষেণ। তবে অনেক পরে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময়, নিজের অঙ্গ কেটে তার মৃত্যু-প্রতিরোধক কবচ ও কুণ্ডল দান করায় তিনি ‘দাতা কর্ণ’ নামে খ্যাত হন। কর্ণের জন্মকাহিনি অবশ্য মজার। রগচটা মুনি দুর্বাসা এক সময় অতিথি হিসেবে কুন্তীর ঘরে এসেছিলেন। তখন কুন্তী কুমারী, বিয়ে-থা কিছুই করেননি। কুন্তী খাইয়ে দাইয়ে দুর্বাসার সেবা-যত্ন করলে, ওই ঋষি খুশি হয়ে তাকে একটি মন্ত্র শিখিয়ে দেন। এই মন্ত্র পড়লে কুন্তী যে দেবতাকে ডাকবেন, সে দেবতাই কুন্তীর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসবেন এবং তার ঔরসে কুন্তীর পুত্রলাভ হবে।

এখন মন্ত্র কাজ করে কিনা দেখতে হবে তো। আর কুন্তীর বয়সও তখন খুব বেশি না। টিনএজ হবেন– কৌতূহল তো আছেই। একদিন বাড়ির এক কোনায় গিয়ে কুন্তী মন্ত্র পড়ে সূর্যকে আহবান করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সূর্যদেব এসে পড়লেন। কুন্তী তখন ভয়ে অস্থির। মন্ত্র পড়লেই যে এটা ঘটবে তা বুঝতেই পারেননি তিনি। তার উপর তিনি কুমারী। সূর্যের ঔরসে পুত্র হলে সমাজে মুখে দেখাবেন কী করে! এখন সূর্যও নাছোড়বান্দা। সুন্দরী কুন্তী মন্ত্র পড়ে নিয়ে এসেছে, এখন কি আর তিনি সব কাজ শেষ না করে ফিরে যাবেন? তাহলে আর দেবতা কীসে! কাজেই মিলন হতেই হল।

অবশ্য মিলনের আগে সূর্য কথা দিলেন, এর ফলে পুত্র লাভ করলেও সমাজে কুন্তী ‘কুমারী’ই থাকবেন। এর সূত্র ধরেই কর্ণের জন্ম হল। কিন্তু এই পুত্র নিয়ে কুন্তী তো পড়লেন মহাফ্যাসাদে। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে তিনি পুত্রকে একটি পাত্রের মধ্যে পুরে নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন। পরে সুত বংশীয় অধিরথ আর তার স্ত্রী রাধা সেই শিশুকে নদী থেকে উদ্ধার করে তাদের পরিবারে ‘বসুষেণ’ নাম দিয়ে প্রতিপালন করেন। কর্ণ বড় হয়ে কৌরবদের পক্ষ নিয়ে পাণ্ডবদের (কুন্তীর বিবাহিত জীবনের পঞ্চ পুত্র, নিজের তিনটি ও সতীন মাদ্রীর দুটি মিলিয়ে) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। সে নিয়ে আরও কাহিনি আছে।

কিন্তু সেটা কথা নয়। কর্ণের এই জন্মকাহিনিতে নিখাদ রূপকথার ছোঁয়া ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমি তা বললে কী হবে, মোদীর মতো জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারের অবতারেরা এর মধ্যে একেবারে আধুনিক ‘জেনেটিক সায়েন্স’ খুঁজে পেয়েছেন!

কর্ণের এই জন্মকাহিনিতে নিখাদ রূপকথার ছোঁয়া ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না
কর্ণের এই জন্মকাহিনিতে নিখাদ রূপকথার ছোঁয়া ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না

মোদী তার ভাষণে আরও একটি উদাহরণ হাজির করেছেন। হিন্দু দেবতা বাবা গণেশের ধড়ে যে হাতির মাথা, তা দেখে নাকি মনে হয় প্রাচীন ভারতের ‘প্লাস্টিক সার্জন’দের কাজ এটি। এখানে উল্লেখ্য, গণেশ হচ্ছেন শিব এবং পার্বতীর পুত্র। হিন্দুরা গণেশকে ‘সিদ্ধিদাতা’ ভেবে পুজো করেন। এখন গণেশের মাথায় হাতির মুণ্ডু এল কীভাবে এ নিয়ে নানা উপকথা প্রচলিত আছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়টি হল, গণেশের জন্ম হবার পরে অনেক দেবতার সঙ্গে শনিও দেখতে এসেছিলেন নবজাতককে। কিন্তু শনির স্ত্রী একসময় তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি যার দিকে দৃষ্টি দেবেন, তারই বিনাশ হবে। তাই শনি নবজাতকের মুখের দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু পার্বতী এ সময় শনিকে তার পুত্রের চেহারা দেখার জন্য বার বার অনুরোধ করতে থাকেন। শনি তার অভিশাপের কথা প্রকাশ করার পরেও পার্বতী নাছোড়বান্দা ছিলেন এবং তাকে গণেশের চেহারা দেখতে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন।

বাধ্য হয়ে শনি গণেশের মুখের দিকে তাকালেন। শনির দৃষ্টি শিশুমুখে পড়া মাত্র শিশুর মুণ্ড দেহচ্যুত হয়ে গেল। এ নিয়ে স্বর্গে তোলপাড় দেখা দিলে সে খবর শেষ পর্যন্ত বিষ্ণুর কাছে পৌঁছায়। তড়িঘড়ি করে আসার পথে বিষ্ণু মাঠে একটা হাতিকে শুয়ে থাকতে দেখে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সেটির মাথা কেটে নিয়ে এলেন আর গণেশের গলার সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন। এই হল কাহিনি।

তবে পুরাণ ভেদে এই কাহিনির কিছু উনিশ-বিশ আছে। যেমন ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, শিবের প্রতি কশ্যপের অভিশাপের ফলে গণেশের মুণ্ডচ্ছেদ ঘটেছিল। আবার স্কন্দ-পুরাণের মতে, সিন্দুর নামে এক দৈত্য পার্বতীর গর্ভে অষ্টম মাসে প্রবেশ করে গণেশের মস্তকচ্ছেদন করেছিলেন।

রূপকথায় যাই হেরফের থাকুক, সেটা রূপকথাই, কোথাও কেউ প্লাস্টিক সার্জন খুঁজে পাননি। অবশ্য আমি আপনি না পেলে কী হবে, মোদী সাহেব ঠিকই খুঁজে পেয়েছেন।

শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোর বিভিন্ন আয়াত বা শ্লোককে বিভিন্ন চতুর অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ইদানিং তার ভেতর আধুনিক বিজ্ঞান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা ‘বিজ্ঞান-জানা’ কিছু শিক্ষিত মানুষের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে যেন। বাংলাদেশেও শিক্ষিত কিছু মানুষ ‘বিজ্ঞানময় কিতাব’ তত্ত্ব গোগ্রাসে গিলছে।

বিজ্ঞানচর্চার জন্য বিজ্ঞানের বই না পড়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের আয়াত বা শ্লোকের ব্যাখ্যা-প্রতিব্যাখ্যার মাঝে কী আনন্দ আমি জানি না; তবে হয়তো পশ্চিমা জ্ঞান অস্বীকার না করতে পারলেও, আমাদের প্রাচীন গ্রন্থতেই এগুলোর উল্লেখ আছে ভেবে এক ধরনের আত্মগর্ব এবং আত্মপরিচয়ের সন্ধান লাভ করেন কেউ কেউ। আবার অনেকে ভাবেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সরাসরি প্রমাণ না করা গেলেও, তাঁর প্রেরিত গ্রন্থগুলোতে আধুনিক বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে বলতে পারলে গ্রন্থগুলো হয়তো ‘ঐশ্বরিক কিতাবের’ মর্যাদা পাবে।

যুক্তির কষ্টিপাথরে এ ধরনের ধারণা ভ্রান্ত এবং পুরো ব্যাপারটাই কুসংস্কার হলেও, বাংলাদেশের জনপ্রিয় ধারার বইপত্র কিংবা টিভি অনুষ্ঠান দেখলে বোঝা যায়, মরিস বুকাইলি থেকে শুরু করে হারুন ইয়াহিয়া, জাকির নায়েক এবং বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শমশের আলীসহ অনেকেই এই ধরনের অপবিজ্ঞানচর্চার আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন; কেউ কেউ এখনও দিচ্ছেন ক্রমাগত। সত্যিকার বিজ্ঞানচর্চা আর বৈজ্ঞানিক অবদানে আমরা হাজার বছর পিছিয়ে থাকলেও, ধর্মগ্রন্থের আয়াত বা শ্লোকে আধুনিক বিজ্ঞান খুঁজে পেতে আমরা নিঃসন্দেহে সারা বিশ্বে অগ্রগামী।

আমি বছর খানেক আগে ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ (শুদ্ধস্বর, ২০১২) নামে একটা বই লিখেছিলাম। বইটির তৃতীয় সংস্করণ ‘জাগৃতি প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি। বইটিতে হারুন ইয়াহিয়া, শমশের আলীদের পাশাপাশি হিন্দু ভাববাদীদেরও অপবিজ্ঞানচর্চার কিছু উদাহরণ হাজির করেছিলাম। বলেছিলাম, এরা কেউই আসলে ধোয়া তুলসি পাতা নয়; বরং, একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। কিছু হিন্দু ভাববাদী ‘বৈজ্ঞানিক’ আছেন যারা মনে করেন, মহাভারতে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন তা ‘বিগ ব্যাং’ ছাড়া অন্য কিছু নয়।

মৃণাল দাসগুপ্ত ভারতের জাতীয় বিজ্ঞান আকাদেমীর বিখ্যাত বিজ্ঞানী। উনি দাবি করেন, আজ আধুনিক বিজ্ঞান যে সমস্ত নতুন তত্ত্ব ও তথ্য প্রতিদিনই আবিষ্কার করছে, তার সবকিছুই নাকি প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা বের করে গেছেন, ‘বেদ’এ নাকি সে সমস্ত আবিষ্কার ‘খুবই পরিষ্কারভাবে’ লিপিবদ্ধ আছে। মি. দাসগুপ্তের ভাষায়, রবার্ট ওপেনহেইমারের মতো বিজ্ঞানীও নাকি ‘গীতা’র বিশ্বরূপ দর্শনে এতই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন যে, ল্যাবরেটরিতে আণবিক শক্তির তেজ দেখে ‘গীতা’ থেকে আবৃত্তি করেছিলেন–


দিবি সূর্য্যসহস্রস্য ভবেদ যুগপদুত্থিতা।
যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ ভাসন্তস মহাত্মনঃ

বিজ্ঞান-জানা কিছু শিক্ষিত হিন্দু বুদ্ধিজীবী আছেন যারা ভাবেন, আধুনিক বিজ্ঞান আজ যা আবিষ্কার করছে, তা সবই হিন্দু পুরাণগুলোতে লিপিবদ্ধ জ্ঞানের পুনরাবৃত্তি। হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশন তাদের মুখপত্র ‘উদ্বোধন’-এ বলা শুরু করেছে যে, ‘কৃষ্ণ গহ্বর’ কিংবা ‘সময় ধারণা’ নাকি মোটেই নতুন কিছু নয়। হিন্দুধর্ম নাকি অনেক আগেই এগুলো জানতে পেরেছিল। কীভাবে? ওই যে বহুল প্রচারিত সেই আপ্তবাক্যে, ‘ব্রহ্মার এক মুহূর্ত পৃথিবীর সহস্র বছরের সমান’।

‘কৃষ্ণ গহ্বর’ কিংবা ‘সময় ধারণা’ নাকি মোটেই নতুন কিছু নয়
‘কৃষ্ণ গহ্বর’ কিংবা ‘সময় ধারণা’ নাকি মোটেই নতুন কিছু নয়

কিছু ধর্মবাদীর দৃষ্টিতে, মহাভারতের কাল্পনিক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ছিল আসলে এক ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’ (Atomic War)। প্রশান্ত প্রামাণিক নামে ভারতের এক ‘জনপ্রিয়’ বিজ্ঞান লেখক ‘ভারতীয় দর্শনে আধুনিক বিজ্ঞান’ বইয়ে তার কল্পনার ফানুস মহেঞ্জোদারো পর্যন্ত টেনে নিয়ে বলেছেন– ‘সম্ভবত দুর্যোধনেরই কোনো মিত্রশক্তি পারমাণবিক যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে থাকবে মহেঞ্জোদারোতে’।

‘সবই ব্যাদে আছে’ মার্কা এইসব বকচ্ছপ ভাববাদীরা অবলীলায় দাবি করে ফেলেন যে, নলজাতক শিশু (TestTubeBaby) আর বিকল্প মা (SurrogateMother) আধুনিক বিজ্ঞানের দান মনে করা হলেও তা হিন্দু সভ্যতার কাছে নাকি নতুন কিছু নয়। দ্রোণ-দ্রোণী, কৃপ-কৃপীর জন্মের পৌরাণিক কাহিনিগুলো তারই প্রমাণ। এমনকি কিছুদিন আগে উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহৃত স্কাড আর প্যাট্রিয়ট মিসাইল নাকি হিন্দু পুরাণে বর্ণিত ‘বরুণ বাণ’ আর ‘অগ্নিবাণ’ বই কিছু নয়। তারা সবকিছুতেই এমনতর মিল পেয়ে যান।

যেমনিভাবে ভারতের ‘দেশ’-এর মতো প্রগতিশীল পত্রিকায় ২২ এপ্রিল, ১৯৯৫ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান ও ভগবান’ নিবন্ধের লেখক হৃষীকেশ সেন বেদান্তে বর্ণিত উর্ণনাভ বা মাকড়শার মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মডেলের মিল পেয়ে গেছেন। অনেকেরই হয়তো মনে আছে ২০১২ সালের জুলাই মাসের ৪ তারিখে সার্নের হিগস বোসনপ্রাপ্তির খবরের পর জিনিউজ সংবাদ পরিবেশন করেছিল এই শিরোনামে– ‘ইনসান খুঁজে পেল ভগবান’।

এ প্রসঙ্গে আবারও বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার (১৮৯৩-১৯৫৬), যিনি বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি অবদান রেখেছেন কুসংস্কার বিরোধিতাতেও, সেই বিখ্যাত ঘটনাতে ফিরে যেতে হবে। মাসিক ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় মেঘনাদ সাহা ‘একটি নতুন জীবন দর্শন’ (১৩ নভেম্বর, ১৯৩৮) শিরোনামের একটি প্রবন্ধে, ‘সবই ব্যাদে আছ’ নামে একটি কটাক্ষমূলক উক্তি করেছিলেন। উক্তিটি নিয়ে অনিল বরণ রায় নামের এক হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি জলঘোলা করা শুরু করলে, এর ব্যাখ্যায় মেঘনাদ সাহা যা বললেন, তা এক কথায় মণিমাণিক্য–

“… প্রায় আঠারো বৎসর পূর্বেকার কথা। আমি তখন প্রথম বিলাত হইতে ফিরিয়াছি। বৈজ্ঞানিক জগতে তখন আমার সামান্য কিছু সুনাম হইয়াছে। ঢাকা শহরবাসী লব্ধপ্রতিষ্ঠিত এক উকিল আমি কী বৈজ্ঞানিক কাজ করিয়াছি তাহা জানিবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমি উৎসাহভরে তাহাকে আমার প্রথম জীবনের তদানীন্তন গবেষণা সম্বন্ধে সবিশেষ বর্ণনা দিই। তিনি দু-এক মিনিট পরপরই বলিয়া উঠিতে লাগিলেন, ‘‘এ আর নতুন কী হইল, এ সমস্তই ব্যাদ-এ আছে।’’

আমি দু একবার মৃদু আপত্তি করিবার পর বলিলাম, ‘‘মহাশয়, এ সব তত্ত্ব বেদের কোন অংশে আছে তাহা অনুগ্রহপূর্বক দেখাইয়া দিবেন কি?’’

তিনি বলিলেন, ‘‘আমি তো ব্যাদ পড়ি নাই, কিন্তু আমার বিশ্বাস তোমরা নূতন বিজ্ঞানে যাহা করিয়াছ বলিয়া দাবি কর, তাহা সমস্তই ‘ব্যাদে’ আছে।’’

উক্তিটি নিয়ে অনিল বরণ রায় নামের এক হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি জলঘোলা করা শুরু করলে, এর ব্যাখ্যায় মেঘনাদ সাহা যা বললেন, তা এক কথায় মণিমাণিক্য
উক্তিটি নিয়ে অনিল বরণ রায় নামের এক হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি জলঘোলা করা শুরু করলে, এর ব্যাখ্যায় মেঘনাদ সাহা যা বললেন, তা এক কথায় মণিমাণিক্য

বলা বাহুল্য যে, বিগত কুড়ি বৎসর ধরিয়া বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ইত্যাদি সমস্ত হিন্দুশাস্ত্র এবং হিন্দু জ্যোতিষ ও অপরাপর বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রাচীন গ্রন্থাদি তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়া আমি কোথাও আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই নাই যে, এই সমস্ত প্রাচীন গ্রন্থে বর্তমান বিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব নিহিত আছে।

অনেকে মনে করেন, ভাস্করাচার্য একাদশ শতাব্দীতে অতি স্পষ্টভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, সুতরাং তিনি নিউটনের সমতুল্য। অর্থাৎ নিউটন আর নতুন কী করিয়াছে? কিন্তু এই সমস্ত ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’ শ্রেণির তার্কিকগণ ভুলিয়া যান যে, ভাস্করাচার্য কোথাও পৃথিবী ও অপরাপর গ্রহ সূর্যের চারিদিকে বৃত্তাভাস (elliptical) পথে ভ্রমণ করিতেছে– এ কথা বলেন নাই। তিনি কোথাও প্রমাণ করেন নাই যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ও গতিবিদ্যার নিয়ম প্রয়োগ করিলে পৃথিবীর এবং অপরাপর গ্রহের পরিভ্রমণ পথ নিরূপণ করা যায়। সুতরাং ভাস্করাচার্য বা কোনো হিন্দু, গ্রিক বা আরবি পণ্ডিত কেপলার, গ্যালিলিও বা নিউটনের বহু পূর্বেই মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন, এইরূপ উক্তি করা পাগলের প্রলাপ বই কিছু নয়। …”

কিন্তু মুশকিল হল, হিন্দু সমাজে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার দর্শন নয়, অনিল বরণ রায়রাই দাপটে রাজত্ব করছেন, মাথার উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন অবিরত। একই কথা মুসলিমদের ক্ষেত্রেও হয়তো প্রযোজ্য। তাদের অনেকেই ‘বিগ ব্যাং’এর গাণিতিক মডেল কিংবা সাম্প্রতিক ‘স্ফীতি তত্ত্ব’এর ভিতরকার বিষয়গুলো না বুঝেই কেবল ধর্মগ্রন্থের আয়াতের মধ্যে ‘বিগ ব্যাং’এর সন্ধান করেন। এখন কথা হচ্ছে, ‘বিগ ব্যাং’এর মডেল কখনও ভুল প্রমাণিত হলে কিংবা পরিবর্তিত/পরিশোধিত হলে কী হবে? তখন কি ধার্মিকেরাও ‘বিগব্যাং’এর সঙ্গে ‘সঙ্গতিপূর্ণ’ আয়াত বদলে ফেলবেন? তাহলে তখন ‘আকাশ ও পৃথিবী একসাথে মিশেছিল’– এই আপ্তবাক্যের কী হবে?

এই ধরনের আশঙ্কা থেকেই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন বিশ্বাসী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানের ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বকে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে মেশাতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন—

‘‘‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বের সাম্প্রতিক ভাষ্যটি বর্তমানে মহাবিশ্বের উৎপত্তির সর্বোৎকৃষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করছে। কিন্তু আগামীকাল যদি এর চাইতেও কোনো ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে কী হবে? তাহলে কি নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ধর্মগ্রন্থের আয়াত বদলে ফেলা হবে?’’

পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম বলতেন---  আগামীকাল যদি এর চাইতেও ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে কি নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলাতে ধর্মগ্রন্থের আয়াত বদলে ফেলা হবে?
পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম বলতেন--- আগামীকাল যদি এর চাইতেও ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে কি নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলাতে ধর্মগ্রন্থের আয়াত বদলে ফেলা হবে?

খুবই যৌক্তিক শঙ্কা। ঠিক একই কারণে ১৯৫১ সালে যখন Pope Pius XII বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের মিল খুঁজে পেলেন, তখন জ্যোর্তিবিজ্ঞানী এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজক জর্জ হেনরি লেমিত্রি (১৮৯৪-১৯৬৬, যাকে ‘বিগ ব্যাংএর ফাদার’ বলে মনে করা হয়, ‘বিগ ব্যাং’ প্রতিভাসের অন্যতম প্রবক্তা) পোপকে বিনয়ের সঙ্গে এ ধরনের যুক্তিকে ‘অভ্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরামর্শ মানছে কে?

লেমেত্রির বিনীত প্রস্তাব তো মানা হয়ইনি, কিছু খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী যেন পণ করেছেন উল্টোদিকে হাঁটবেন। যেমন, ফ্রাঙ্ক টিপলার পদার্থবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ইদানিং যত না বিখ্যাত, তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন খ্রিস্টধর্মকে ‘বিজ্ঞান’ বানানোর জন্য। ‘ওমেগা পয়েন্ট’ নামে একটি ধারণা দিয়েছেন টিপলার যা মহাসংকোচন (বিগ ক্রাঞ্চ)-এর সময় সিংগুলারিটির গাণিতিক মডেলকে তুলে ধরে।

এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু টিপলার মনে করেন, এই ওমেগা পয়েন্টই হচ্ছে ‘গড’। শুধু তাই নয়, যিশুর অলৌকিক জন্মকে (ভার্জিন বার্থ) তিনি বৈজ্ঞানিক বৈধতা দিতে চান যিশুকে বিরল xx male বানিয়ে, তাঁর পুনরুত্থানকে ব্যারন অ্যানাইহিলেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন, ইনকারনেশন বা অবতারকে বলেছেন বিপরীতমুখী ডিম্যাটেরিয়ালাইজেশন পদ্ধতি, ইত্যাদি। এ সমস্ত রঙ-বেরঙের গালগপ্প নিয়েই তার সাম্প্রতিক বই The Physics of Christianity (2007)!

বলা বাহুল্য মাইকেল শারমার, ভিক্টর স্টেংগর, লরেন্স ক্রাউসসহ অনেক বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকই টিপলারের যুক্তি খণ্ডন করেছেন, কিন্তু তাতে অবশ্য আধুনিক ‘বিজ্ঞানময়’ খ্রিস্ট-ধর্মোন্মাদনা থেমে যায়নি, যাবেও না।

ফ্রাঙ্ক টিপলারের অনেক আগে, ১৯৭৫ সালে ফ্রিজোফ কাপরা একই মানসপটে লিখেছিলেন The Tao of Physics — প্রাচ্যের তাওইজমের সঙ্গে বিজ্ঞান জুড়ে দিয়ে। চীনের প্রাচীন দার্শনিকেরা ইন এবং য়্যান (yin and yang) নামে পরস্পরবিরোধী কিন্তু একীভূত সত্তার কথা বলেছিলেন মানুষের মনে ভালো-মন্দ মিলেমিশে থাকার প্রসঙ্গে। ফ্রিজোফ কাপরা সেই ইন এবং ইয়াংকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলেন কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার জগতে পদার্থের দ্বৈত সত্তার (dual nature of matter) বর্ণনা হাজির করে, পদার্থ যেখানে কখনও কণা হিসেবে বিরাজ করে, কখনও-বা তরঙ্গ হিসেবে। আধুনিক পদার্থবিদ্যার শূন্যতার ধারণাকে মিলিয়ে দিয়েছেন তাওইজমের ‘চী’ (ch’i or qi)এর সাথে–

‘যখন কেউ জানবে যে, মহাশূন্য ‘চী’দিয়ে পরিপূর্ণ, তখনই কেবল সে অনুধাবন করবে, শূন্যতা বলে আসলে কিছু নেই’।

সংশয়বাদী লেখক অপার্থিব জামান ধর্মগ্রন্থের মধ্যে ‘বিজ্ঞান খোঁজার’ এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে একবার একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন–

‘‘প্রায়শই ধর্মবাদীরা ধর্মগ্রন্থের একটি নির্দিষ্ট আয়াত বা শ্লোকের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞান খুঁজে পান। এটি একটি হাস্যকর অপচেষ্টা। ওমনিভাবে খুঁজতে চাইলে যে কোনো কিছুতেই বিজ্ঞানকে খুঁজে নেওয়া সম্ভব। যে কোনো রাম-শ্যাম-যদু-মধু আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের অনেক আগে কোনো কারণে বলে থাকতে পারে–- ‘সবকিছুই আসলে আপেক্ষিক’। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের পর সেই সমস্ত রাম-শ্যাম-যদু-মধুরা যদি দাবি করে বসে এই বলে– ‘হুঁ! আমি তো আইনস্টাইনের আগেই জানতাম আপেক্ষিক তত্ত্বের কথা’– তবে তা শুধু হাস্যকরই নয়, যে সমস্ত নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী তাদের শ্রমলব্ধ গবেষণার মাধ্যমে নিত্য-নতুন আবিষ্কারে পৃথিবীবাসীকে উপকৃত করে চলেছেন, তাদের প্রতি চরম অবমাননাকরও বটে।

সবাই জানে, আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য আইনস্টাইনকে কখনওই কোনো ধর্মগ্রন্থের সাহায্য নিতে হয়নি, বরং আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের পর পরই তা ধর্মবাদীরা নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে জুড়ে দেওয়ার জন্য নানা জায়গায় মিল খুঁজে পেতে শুরু করলেন। বলা বাহুল্য, আধুনিক বিজ্ঞান যে সমস্ত প্রশ্নের উত্তরদানে এখনও অক্ষম, সেই সমস্ত জায়গায় ধর্মবাদীরাও কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নিরব। যেমন, বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিতভাবে জানে না যে আমাদের এই মহাবিশ্ব বদ্ধ, খোলা নাকি ফ্ল্যাট। তাই ধর্মবাদীদেরও কেউ তাদের ঐশী কিতাব থেকে আমাদের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করে কোনো ধরনের আলোকপাত করতে পারছেন না। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, বিজ্ঞানের কল্যাণে কখনও যদি এর উত্তর বেরিয়ে আসে, তবে সঙ্গে সঙ্গে ধর্মবাদীরা বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের কতকগুলো অস্পষ্ট আয়াত অথবা শ্লোক হাজির করে এর অতিপ্রাকৃততা দাবি করবেন।

হেনরি লেমিত্রি পোপকে বিনয়ের সঙ্গে এ ধরনের যুক্তিকে ‘অভ্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন
হেনরি লেমিত্রি পোপকে বিনয়ের সঙ্গে এ ধরনের যুক্তিকে ‘অভ্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন

মূলত প্রতিটি ক্ষেত্রেই (গোঁজা) মিলগুলো পাওয়া যায় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর, তার আগে নয়। এ কি স্রেফ ঘটনার কাকতালীয় সমাপতন?

আসলে বিজ্ঞানের দায় পড়েনি ধর্মগ্রন্থ থেকে দীক্ষা নিয়ে আলোর সন্ধান লাভ করতে, বরং ধর্মগুলোই জেনে গেছে, বিজ্ঞান ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারবে না। কাজেই নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্য ধর্মবাদীরা এখন মুখিয়ে থাকে। একটা সময় বাইবেল–বিরোধী সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রকাশের জন্য কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, ব্রুনোর ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছিল বাইবেল-ওয়ালারা। সেই তারাই এখন বাইবেলের নানা জায়গায় সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের ‘আলামত’ পেয়ে যান!

কিছুদিন আগেও দেখতাম একাডেমিয়ায় বহুভাবে পরীক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত ডারউইনের বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে অনেকে রীতিমতো জিহাদ শুরু করেছিলেন ধর্মগ্রন্থের নানা আয়াত উদ্ধৃত করে। আজকে বিবর্তন তত্ত্বের সপক্ষের প্রমাণগুলো এতই জোরালো হয়ে উঠেছে যে, সেগুলো আর অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তাই শুরু হয়েছে বিবর্তনবাদের সপক্ষে আয়াত খোঁজা। পেয়েও গেছেন কিছু কিছু। পোপ সম্প্রতি বিবর্তনবাদকে ক্যাথলিক ডগমার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে রায় দিয়েছেন।

একই সূত্র ধরে কিনা জানি না, একটা ইসলামি ওয়েবসাইটে দেখলাম, ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে, কোরআনের কিছু আয়াত নাকি বিবর্তন তত্ত্বের ‘সরাসরি’ প্রমাণ। এ সমস্ত আয়াতে ‘সৃষ্টি’ বোঝাতে ‘খালাকা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘গ্র্যাজুয়াল চেঞ্জ’– অতএব ‘ইহা বিবর্তন’। অনুমান আর কয়েক বছরের মধ্যে শুধু বিবর্তন নয়, অচিরেই তারা মাল্টিভার্স, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন, স্ট্রিং তত্ত্ব, প্যান্সপারমিয়া, জেনেটিক কোড, মিউটেশন এধরনের অনেক কিছুই ধর্মগ্রন্থে পেয়ে যাবেন (কিছু কিছু হয়তো এর মধ্যেই পেয়েও গেছেন)।

তবে এ ধরনের সমন্বয়ের চমৎকার খেলা দেখিয়েছে হিন্দু ধর্মবাদীরাই। যখন বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে ফ্রেডরিক হয়েল, হারমান বন্দি আর জয়ন্ত নারলিকার মিলে স্থিতিশীল মহাবিশ্ব তত্ত্বের (Steady state theory) অবতারণা করেছিলেন, তখন তা ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কারণ এটি বেদে বর্ণিত ‘চির শাশ্বত’ মহাবিশ্বের ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের (Cosmic background radiation) খোঁজ যখন বিজ্ঞানীরা পেলেন, তখন তা স্থিতিশীল মহাবিশ্বকে হটিয়ে ‘মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব’ বা ‘বিগ ব্যাং’কে বৈজ্ঞানিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দিল। হিন্দুত্ববাদীরাও সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টে ‘চির শাশ্বত’ মহাবিশ্ব বাদ দিয়ে ‘অদ্বৈত ব্রহ্ম’-এর খোঁজ পেয়ে গেলেন। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের সৃষ্টি থাকুক না থাকুক, চিরশাশ্বত হোক আর না হোক, স্থিতিশীল হোক আর অস্থিতিশীলই হোক, সবই কিন্তু তাদের ধর্মগ্রন্থে আছে!

মোদী সাহেবও হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের সেই ‘যখন যেমন তখন তেমন’ মার্কা খেলা খেলছেন তা বোধ হয় না বললেও চলবে। মোদী জানেন, নানা পদের ইন্টারপ্রিটেশনের এই খেলার আবেগী এবং অনুরাগী ‘সাপোর্টার’ অনেক। তবে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ দেখিয়ে দেন, এই খেলার আসল নাম ‘গার্বেজ ইন, গার্বেজ আউট’!

অভিজিৎ রায়: ব্লগার এবং বিজ্ঞান লেখক।

অভিজিৎ রায়আমেরিকা-প্রবাসী গবেষক, ব্লগার এবং মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক

৬০ Responses -- “‘সবই ব্যাদে আছে’”

  1. Humanity First

    আসলে সমস্ত ধর্মের মূলকথা এক ও অভিন্ন এবং একই খোদার থেকে সৃষ্ট। তাই প্রায় প্রত্যেক ধর্মেই কিছু না কিছু বৈজ্ঞানিক কথা পাওয়া যায়। তবে এটা বলা ভুল হবে যে বিজ্ঞানের পুঙ্খানুপুঙ্খ আবিষ্কারের তত্ত্ব ধর্মগুলো থেক আভিরভুত হয়েছে। আসলে বিজ্ঞান সম্বন্ধিত এসব ধর্মীয় আয়াত অথবা শ্লোক ধর্মের সত্যতা প্রমাণ করে।

    Reply
  2. গনী আদম

    এ ক্ষতির কোনো পূরণ হয় না। এ পরিতাপের কোনো সীমা নেই। অভিজিৎ, আপনার মৃত্যুতে কী যে হারালাম আমরা!

    Reply
  3. রৌরব

    আপনার লেখা আমি প্রথম পড়লাম এখানে, আপনাকে আমি চিনতাম না। আপনার মৃত্যুর খবর আমাদের পরিচয় ঘটিয়েছে। আপনার বিপুল জ্ঞ্যান আমায় মুগ্ধ করেছে। ভালো থাকবেন

    Reply
  4. আরিফ আনোয়ার

    বিষয়টাকে লেখক এভাবে দেখছেন যে “বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পরে ধর্মগুরু বা ধর্মগ্রন্থগুলো তার বাহবা নিতে চাচ্ছে গ্রন্থে উল্লেখ থাকা পূর্বাভাস থেকে। এবং গ্রন্থে উল্লেখ থাকা তত্ত্বগুলো থেকে যেহেতু কোন ধর্ম বিশ্লেষক এই আবিষ্কার আগে করতে পারেনি-তাই এই দাবি নিতান্তই হাস্যকর” — যদি ভুল না বুঝে থাকি। অনেকের অনেক প্রশ্নের জবাব ধৈর্য ধরে দিয়েছেন লেখক। চেষ্টা করেছেন সম্পূর্ণটা পরিষ্কার করে বুঝাতে। অবশ্যই ধন্যবাদের দাবিদার আপনি। আমারও একটা ছোট প্রশ্ন ছিল:

    ধর্মগ্রন্থগুলোতে যে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল তা কি আপনি মানেন? ধর্মগ্রন্থ বলতে সবগুলো ধর্মের প্রধান কিতাবগুলোকেই বুঝিয়েছি। এই ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করলে ভালো হয়।

    Reply
  5. sohael Hossain

    আপনার লেখা আমার খুব ভালো লাগে। হিজড়াদের নিয়ে আপনার লেখা বইটির নাম জানতে চা্ই। অনুগ্রহ করে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব। আপনার মেইল আইডিটা দয়া করে একটু জানাবেন।

    Reply
  6. Mahbub

    ধর্ম সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ব্যাপার আর বিজ্ঞান পুরোপুরি যুক্তির। বিজ্ঞানের বিষয়গুলি না দেখলে বা যুক্তি না দিলে আমরা মেনে নিই না; অর্থাৎ বিশ্বাস করি না বা অবিশ্বাস থেকে যায়।

    তাহলে ধর্মকে যারা যুক্তিযুক্ত করতে চান তারা নিজেরাই কি প্রথমে ধর্ম অবিশ্বাস করছেন না, যুক্তি খুঁজে ফিরছেন না? একটু ভেবে দেখুন তো। আর তাই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে প্রথমে নিজেকে অতঃপর অন্যদেরকে আশ্বস্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন! তাই নয় কি?

    লেখককে অনেক ধন্যবাদ এমন একটি লেখা উপহার দেওয়ার জন্য। লেখার মান অসাধারণ।

    Reply
  7. পঙ্কজ

    আপনার প্রায় প্রতিটি লেখাই আমি পড়েছি। অসাধারণ যুক্তিপূর্ণ লেখা। এ রকম যুক্তিপূর্ণ লেখা যুক্তিবাদীদের কাছে খুব দামী। আপনার লেখার মাধ্যমে আমার জ্ঞান লাভের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই এবং সঙ্গে জানাই অভিনন্দন।

    আপনার লেখাটি ভারতীয় যুক্তিবাদী সমিতির ওয়েবসাইট-এ তুলে দিতে চাই। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে আগ্রহী।

    Reply
    • অভিজিৎ

      অবশ্যই লেখাটি ভারতীয় যুক্তিবাদী সমিতির ওয়েবসাইট-এ রাখতে পারেন চাইলে।

      Reply
  8. Sujit Das

    দয়া করে ‘বেদ’এর সঙ্গে ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ ও ‘গীতা’কে মিলিয়ে ফেলবেন না।

    আমি এটাও মনে করি না যে, যা কিছু ‘বেদ’এ লেখা আছে তার সবই সায়েন্টিফিক। তবে বিজ্ঞানীরা এখন বেদ পড়ছেন এবং তারা মনে করছেন যে, এর কিছু কিছু শ্লোকে শক্তিশালী চিন্তা রয়েছে। যেমন, তারা Singularity তে বিশ্বাস করেন।

    সবাইকে অনুরোধ করব ‘বিবিসি’র নতুন সায়েন্স শো Human Universe দেখার জন্য। এটি উপস্থাপনা করছেন CERN পার্টিকলের ফিজিসিস্ট প্রফেসর ব্রায়ান কক্স। তিনি ‘বেদ’এর কিছু বিষয় ব্যাখ্যা দেন, চার হাজার বছর আগে সেখানে এমন কিছু ভাবনা ছিল যাকে খুব খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে করছেন তিনি।

    Reply
    • অভিজিৎ

      দয়া করে ‘বেদ’এর সঙ্গে ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ ও ‘গীতা’কে মিলিয়ে ফেলবেন না।

      দয়া করে ভাববেন না যে আমি ‘বেদ’এর সঙ্গে ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ ও ‘গীতা’কে গুলিয়ে ফেলেছি। এগুলো আলাদা আলাদা গ্রন্থ, সে সম্বন্ধে আমি খুব ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল।

      বিজ্ঞানীরা এখন বেদ পড়ছেন এবং তারা মনে করছেন যে, এর কিছু কিছু শ্লোকে শক্তিশালী চিন্তা রয়েছে। যেমন, তারা Singularity তে বিশ্বাস করেন।

      এটা আর নতুন কী! খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসীরা বলেন, সব বিজ্ঞানীরা নাকি বাইবেল পড়ছেন। মুসলিমরা বলেন, বিজ্ঞানীরা নাকি এখন কোরান পড়ছেন! আর আপনি বলছেন, বিজ্ঞানীরা সব নাকি বেদ পড়ছেন!

      যাই পড়ুন, Singularityএর ধারণা পদার্থবিজ্ঞান থেকেই এক সময় এসেছিল। মজার বিষয় হচ্ছে, সেই ধারণা এখন অনেকটাই পুরনো। ১৯৭০ সালে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং গণিতবিদ রজার পেনরোজ, পেনরোজের আগের একটি উপপাদ্যের আলোকে প্রমাণ করেন যে, ‘বিগ ব্যাং’এর শুরুতে ‘সিংগুলারিটি’ বা অদ্বৈত বিন্দুর অস্তিত্ব ছিল। সাধারণ আপেক্ষিকতাকে শূন্য সময়ের আলোকে বিবেচনা করার মাধ্যমে দেখা যায় যে, বর্তমান থেকে পেছনে যেতে থাকলে মহাবিশ্বের আকার ক্রমশ ছোট এবং ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। পেছনে যেতে যেতে যখন মহাবিশ্বের আকার শূন্য হয় তখন সাধারণ আপেক্ষিকতার গণিত অনুযায়ী এর ঘনত্ব হয় অসীম। মহাবিশ্ব তখন অসীম ভর ও ঘনত্ববিশিষ্ট একটি বিন্দু যার নাম ‘পয়েন্ট অব সিংগুলারিটি’। ধর্মবেত্তারা যারা বিগ ব্যাংকে ঈশ্বরের কেরামতি হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে চান তাঁরা বলেন, তখন সময় বলেও কিছু ছিল না।

      তারপর থেকে এভাবেই চলছে। ‘বিগ ব্যাং’এর আগে অসীম ভর ও ঘনত্বের বিন্দুতে সবকিছু আবদ্ধ ছিল, তখন ছিল না কোনো সময়। তারপর ঈশ্বরের ‘ফু’ দানের মাধ্যমে এক মহাবিস্ফোরণ ঘটান, সূচনা হয় মহাবিশ্বের, সূচনা হয় সময়ের। যেমন, আমেরিকার রক্ষণশীল লেখক ডি’সুজা তাঁর একটি বইয়ে বলেছেন:

      ‘‘বুক অব জেনেসিস যে ঈশ্বরপ্রদত্ত মহাসত্যগ্রন্থ, সেটা আরেকবার প্রমাণিত হল। আধুনিক বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছিল শক্তি ও আলোর এক বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। এমন নয যে, স্থান ও সময়ে মহাবিশ্বের সূচনা ঘটেছে, বরং মহাবিশ্বের সূচনা ছিল সময় ও স্থানেরও সূচনা।’’

      ডি’সুজা আরও বলেন:

      ‘‘মহাবিশ্বের সূচনার আগে সময় বলে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। অগাস্টিন অনেক আগেই লিখেছিলেন, মহাবিশ্বের সূচনার ফলে সময়ের সূচনা হয়েছিল। এতদিনে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান নিশ্চিত করল, অগাস্টিন এবং ইহুদি-খ্রিস্টানদের মহাবিশ্বের সূচনা সম্পর্কে আদিম উপলব্ধির সত্যতা।’’

      একই ধরনের কথা মুসলিম জগতের জনপ্রিয় ‘দার্শনিক’ হারুন ইয়াহিয়াও (আসল নাম আদনান অকতার; যার নামে বিবর্তন তত্ত্বকে বিকৃত করে সৃষ্টিবাদের রূপকথা প্রচার, নারীধর্ষণ, মাদক চোরাচালানসহ বহু অভিযোগ আছে এবং তাকে বিভিন্ন সময় কারাবাসেও যেতে হয়েছিল) বলেছেন একাধিকবার, প্রাচ্যের খ্রিস্টীয় সৃষ্টিবাদীদের ধারণাগুলোর পর্যাপ্ত ‘ইসলামিকরণ’ করে:

      ‘‘বিজ্ঞানীরা এখন জানেন, মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছে সিংগুলারিটি থেকে এক অচিন্ত্যনীয় মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে, যাকে আমরা ‘বিগ ব্যাং’ নামে চিনি। অন্য কথায় মহাবিশ্ব সৃষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহই একে বানিয়েছে।’’

      ইসলামি পণ্ডিত জাকির নায়েকও প্রায়ই তাঁর বিভিন্ন লেকচারে কোরানের একটি বিশেষ আয়াতকে ‘বিগ ব্যাং’এর ‘প্রমাণ’ হিসেবে হাজির করেন। ডি’সুজা, হারুন ইয়াহিয়া আর জাকির নায়েকরা সুযোগ পেলেই এভাবে ‘বিগ ব্যাং’এর সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থের আয়াত জুড়ে দিয়ে এর একটা অলৌকিক মহিমা প্রদান করতে চান। কিন্তু আদতে বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার প্রাচীন এ সমস্ত ধর্মগ্রন্থের সত্যতার কোনো রকমের নিশ্চয়তা তো দেয়ই না, বরং এই ধর্মগ্রন্থ এবং আরও অনেক ধর্মগ্রন্থে থাকা সৃষ্টির যে গল্প এত দিন ধার্মিকেরা বিশ্বাস করে এসেছেন তা কতটা ভুল এবং অদ্ভূত সেটাই প্রমাণ করে।

      যাই হোক, ‘সিংগুলারিটি’এর কথা বলে ধার্মিকদের মাঝে গভীর সাড়া ফেলা স্টিফেন হকিং ও পেনরোজ প্রায় বিশ বছর আগে ঐকমত্যে পৌঁছান যে, বাস্তবে ‘সিংগুলারিটি’ নামের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব আসলে ছিল না এবং নেই। সাধারণ আপেক্ষিকতার ধারণায় হিসাব করলে অবশ্য তাদের আগের হিসাবে কোনো ভুল ছিল না। কিন্তু সেই ধারণায় সংযুক্ত হয়নি ‘কোয়ান্টাম মেকানিকস’। আর তাই সেই হিসাব আমলে নেওয়া যায় না।

      ১৯৮৮ সালে হকিং আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইতে বলেন:

      There was in fact no singularity at the beginning of universe.

      অর্থাৎ মহাবিশ্বের সূচনার সময়ে সিংগুলারিটির অস্তিত্ব ছিল না। ডি’সুজা, হারুন ইয়াহিয়া কিংবা জাকির নায়েকের মতো মানুষেরা আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম বইটিতে এক নজর চোখ বুলিয়েছেন সেটা সত্যি। কিন্তু পড়ে বোঝার জন্য নয়। তাঁরা খুঁজেছেন তাঁদের মতাদর্শের সাথে যায় এমন একটি বাক্য এবং সেটা পেয়েই বাদবাকি কোনো দিকে নজর না দিয়ে লাফিয়ে উঠেছিলেন। তারা বিভিন্ন সময় হকিংকে উদ্ধৃত করে বলেন:

      ‘‘মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে একটা বিন্দু (সিংগুলারিটি) থেকে ‘বিগ ব্যাং’এর মাধ্যমে।’’

      তারা মূলত হকিং-এর কথার আংশিক উদ্ধৃত করেন, মূল বিষয়টা চেপে গিয়ে। উদ্ধৃতির সামনের পেছনের বাকি বাক্যগুলো উপেক্ষা করার মাধ্যমে এমন একটি অর্থ তারা দাঁড় করান, যা আসলে হকিংয়ের মতের ঠিক উল্টো। হকিং আসলে বলছিলেন তাঁদের ১৯৭০-এ করা প্রাথমিক এক হিসাবের কথা, যেখানে তাঁরা ‘সিংগুলারিটি’এর কথা আলোচনা করেছিলেন। সম্পূর্ণ কথাটি ছিল এমন:

      ‘‘আমার ও পেনরোজের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল ১৯৭০ সালে একটি যুগ্ম প্রবন্ধের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়, যেখানে আমরা প্রমাণ করে দেখাই যে, বিগ ব্যাং-এর আগে অবশ্যই ‘সিংগুলারিটি’এর অস্তিত্ব ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয় এবং এ-ও ধরে নেওয়া হয় যে, বর্তমানে মহাবিশ্বে যেই পরিমাণ পদার্থ রয়েছে আগেও তাই ছিল।’’

      হকিং আরও বলেন–

      “একসময় আমাদের (হকিং ও পেনরোজ) তত্ত্ব সবাই গ্রহণ করে নিল এবং আজকাল দেখা যায় প্রায় সবাই এটা ধরে নিচ্ছে যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে একটা বিন্দু (সিংগুলারিটি) থেকে ‘বিগ ব্যাং’এর মাধ্যমে। এটা হয়তো একটা পরিহাস যে, এ বিষয়ে আমার মত পাল্টানোর পরে আমিই অন্য পদার্থবিজ্ঞানীদের আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করছি যে, এমন কোনো সিংগুলারিটি আসলে ছিল না– কারণ, কোয়ান্টাম প্রভাব হিসাবে ধরলে সিংগুলারিটি বলে কিছু আর থাকে না” ।

      অথচ ধর্মবেত্তারা আজ অব্দি সেই ‘সিংগুলারিটি’ পয়েন্টকে কেন্দ্রে করে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণবিষয়ক অসংখ্য বই লিখে চলছেন। আপনার মতো অনেকেই পদার্থবিজ্ঞানের রিসেন্ট ডেভেলপমেন্ট না জেনে অযথা ‘সিঙ্গুলারিটি’এর চর্চা করে যাচ্ছেন।

      আসলে কি জানেন, স্টিফেন হকিংয়ের প্রথম প্রবন্ধ এত ভালোভাবে পড়লেও পরবর্তীতে আর কিছু পড়ে দেখার ইচ্ছে হয়তো তাদের হয়নি। কিংবা পড়লেও, নিজেদের মতের সঙ্গে মেলে না বলে তারা সেটা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে বের করে দিয়েছেন আরেক কান দিয়ে। তারা অবিরাম ঘেঁটে চলছেন সেই পুরনো কাসুন্দি, যে কাসুন্দি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছেন কাসুন্দি প্রস্তুতকারী মানুষটি নিজেই। এই হল ব্যাপার।

      সবাইকে অনুরোধ করব ‘বিবিসি’র নতুন সায়েন্স শো Human Universe দেখার জন্য। এটি উপস্থাপনা করছেন CERN পার্টিকলের ফিজিসিস্ট প্রফেসর ব্রায়ান কক্স। তিনি ‘বেদ’এর কিছু বিষয় ব্যাখ্যা দেন, চার হাজার বছর আগে সেখানে এমন কিছু ভাবনা ছিল যাকে খুব খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে করছেন তিনি।

      বিবিসির নতুন প্রোগ্রামটি না দেখলেও ব্রায়ান কক্সের অনেক সিরিজই আমার দেখা আছে। Wonders of the Universe নামে তার একটা সিডিই আছে আমার কাছে। মিশরের পিরামিড, ইনকা, মায়া সভ্যতা নিয়েও ‘ইন্টারেস্টিং’ বলে অনেকেই লেকচার দেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেগুলো কোনো অপার্থিব কারণে বা কল্পিত দেবতাদের দিয়ে তৈরি হয়েছে। আসলে সে সময়কার মানুষই বানিয়েছে প্রাচীন সভ্যতা।

      বেদ অবশ্যই ইন্টারেস্টিং, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেটা ঐশ্বরিক। কোনো কিছু ইন্টারেস্টিং বলা আর কোনো কিছু ঐশ্বরিক বলার মধ্যে পার্থক্য আছে, অন্তত ব্রায়ান কক্সের মতো বিজ্ঞানী এই ‘সুডো-সায়েন্স’এর চর্চা করবেন না বলেই মনে হয়।

      ভালো থাকুন।

      Reply
  9. Sujit Das

    মি. অভিজিত রায়ের কাছে জানতে চাই, আপনি কি বেদ পড়েছেন?

    সিরিয়াসলি, কেবল আপনিই উত্তরটি দিবেন।

    Reply
    • অভিজিৎ

      আমি যদি বলি পড়েছি তাইলেই বা আপনি মানবেন কেন, তাই না? আমার জ্ঞান নিয়ে পরীক্ষা না হয় নাই নিলেন, আমি লেখক হিসেবে একটি লেখা পত্রিকায় লিখেছি – তার ভিত্তিতে বরং আলোচনা করুন।

      Reply
      • Sujit Das

        আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে কি ভয় পাচ্ছেন?

        যাহোক, নরেন্দ্র মোদী একজন পলিটিশিয়ান, আবোল-তাবোল বলতেই পারেন। আপনি তো তা নন। তিনি যা বলেছেন তাতে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে না। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে সত্য খুঁজে বের করার ক্ষমতা আমাদের থাকা উচিত।

        সে জন্যই, আমার সুপারিশ হল, বেদ পড়ুন এবং তারপর এ নিয়ে লিখুন।

  10. সুশান্ত কুমার রায় শান্ত

    এতদিন জানতাম, সূর্যের একটি দিব্য তেজের অংশ থেকে কর্ণের জন্ম। ‘স্টার প্লাস’ এবং ‘স্টার জলসা’তেও সে রকমটাই দেখলাম। তাহলে কি এতদিন ভুল জানলাম আর দেখলাম?

    Reply
    • অভিজিৎ

      ভাই, ‘স্টার প্লাস’ এবং ‘স্টার জলসা’ কোনো অথেনটিক বই বা রেফারেন্স নয়। আপনি ‘মহাভারত’ খুলে পড়ুন এবং দেখুন কীভাবে কর্ণের জন্ম হয়েছিল বলে লেখা আছে। আমি আরেক জনের উত্তরে রেফারেন্স দিয়েছিলাম, এখানেও আরেকটু বিস্তৃতভাবে দিলাম।

      ‘মহাভারত’এ আছে–

      [রেফারেন্স: কাশীদাসী মহাভারত » ০৫.উদ্যোগপর্ব্ব » ৩১. কর্ণের জন্ম বিবরণ]:

      জন্মেজয় জিজ্ঞাসিল কহ তপোধন।
      কুন্তীগর্ভে জন্মে কর্ণ বিখ্যাত ভুবন।।
      কৌরবের পক্ষে কেন কুন্তীর নন্দন।
      দেখিয়া ধরিল কুন্তী কীরূপে জীবন।।
      মুনি বলে, শুন কুরুবংশ চূড়ামণি।
      কৌরবের রণে গেল কর্ণ বীরমণি।।
      বিদুরের মুখে শুনি এসব বচন।
      চিত্তেতে চিন্তিয়া কুন্তী ভাবে মনে মন।।
      আমার নন্দন কর্ণ কেহ না জানিল।
      সূর্য্যের ঔরসে জন্ম কর্ণের হইল।।

      আরেকটা রেফারেন্স দিই রাজশেখর বসু অনুদিত ‘মহাভারত’ থেকে (পৃঃ ৪৭):

      “… কৌতূহলবশে কুন্তী সূর্যকে ডাকলেন। সূর্য আবির্ভূত হয়ে বললেন, অসিতনয়না, তুমি কী চাও? দুর্বাসার বরের কথা জানিয়ে কুন্তী নতমস্তকে ক্ষমা চাইলেন। সূর্য বললেন, তোমার আহবান বৃথা হবে না, আমার সঙ্গে মিলনের ফলে তুমি পুত্র লাভ করবে এবং কুমারীই থাকবে।…”

      সূর্য এবং কুন্তীর ‘মিলনে’ই যে কর্ণের জন্ম হয়েছিল, তা সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত ‘পৌরাণিক অভিধান’ (পৃঃ ৮৩) এও পাওয়া যায়। উদ্ধৃত করছি–

      “… কৌতূহলবশে কুন্তী সূর্যকে আহবান করলেন। সূর্য এসে বললেন যে, তোমার আহবান বৃথা হবে না, আমার সহিত মিলনের ফলে তোমার পুত্রলাভ হবে এবং তুমি কুমারীই থাকবে। ফলে কবচ-কুণ্ডলধারী কর্ণের জন্ম হল…।”

      Reply
      • সুশান্ত

        কৃত্তিবাস যেমন বাল্মীকি রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কিছু নিজের মনগড়া কাহিনিনী ঢুকিয়ে দিয়েছে, ঠিক সে রকম কাশীদাসও ‘বেদব্যাস মহাভারত’ বাংলা করতে গিয়ে মূল মহাভারতে কিছু স্বরচিত কাহিনি ঢুকিয়ে দিয়েছে।

        কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত ‘বেদব্যাস মহাভারত’এ সম্ভবত কুন্তী আর সূর্যদেবের মিলনের কথা বলা হয়নি।

      • অভিজিৎ

        কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত ‘মহাভারত’টি আমার কাছে নেই, ফলে আপনার এ কথার সত্যতা নিরূপণ করতে পারছি না। তবে কালীপ্রসন্ন সিংহকে সোর্স ধরে পরবর্তীতে যারা লিখেছেন, তাদের সবার লেখাতেই সূর্য এবং কুন্তীর মিলনের কথাই আছে। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র ‘কৃষ্ণকর্ণসংবাদ’এ লিখেছেন–

        কর্ণ মহাবীরপুরুষ। তিনি অর্জুনের সমকক্ষ রথী। তাঁহার বাহুবলেই দুর্যোধন আপনাকে বলবান মনে করেন। তাঁহার বলের উপর নির্ভর করিয়াই প্রধানত তিনি পাণ্ডবদিগের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে প্রবৃত্ত। কর্ণের সাহায্য না পাইলে তিনি কদাচ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইবেন না। কর্ণকে তাহার শত্রুপক্ষের সাহায্যে প্রবৃত্ত দেখিলেই অবশ্যই তিনি যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইবেন। যাহাতে তাহা ঘটে, তাহা করিবার জন্য কর্ণকে আপনার রথে তুলিয়া লইলেন। বিরলে কর্ণের সঙ্গে কথোপকথন আবশ্যক।

        কৃষ্ণের এই অভিপ্রায় সিদ্ধির উপযোগী অন্যের অজ্ঞাত সহজ উপায়ও ছিল।

        কর্ণ অধিরথনামা সূতের পুত্র বলিয়া পরিচিত। বস্তুত তিনি অধিরথের পুত্র নহেন— পালিত পুত্র মাত্র। তাহা তিনি জানিতেন না। তাঁহার নিজ জন্মবৃত্তান্ত তিনি অবগত ছিলেন না। তিনি সূতপত্নী রাধার গর্ভজাত না হইয়া, কুন্তীর গর্ভজাত, সূর্যের ঔরসে তাঁহার জন্ম। তবে কুন্তীর কন্যাকালে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল বলিয়া কুন্তী, পুত্র ভূমিষ্ঠ হইবার পরেই তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন।

        কাজেই আপনার উক্তি সন্দেহজনক। আমার ধারণা কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত মহাভারতও একই জিনিসই আছে। আপনি নিজেও খুলে দেখেননি, সেজন্য ‘সম্ভবত কুন্তী আর সূর্যদেবের মিলনের কথা বলা হয়নি’ বলেছেন। আর কেবল কাশীদাসই তো নয়, আমার মন্তব্যে রাজশেখর বসু অনুদিত ‘মহাভারত’ কিংবা সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত ‘পৌরাণিক অভিধান’-এরও রেফারেন্স দিয়েছি। এদের সবাই ‘স্বরচিত কাহিনি’ ঢুকিয়ে দিয়েছেন সেটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না।

      • সুশান্ত

        আপনি একটা কথা ঠিকই বলেছেন যে, আমি আসলেই নিশ্চিত নই। এটা আমার ধারণা যে, কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত মহাভারতে কুন্তী ও সূর্যের মিলনের কথা বলা হয়নি, আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। তবে আমি একেবারেই খুলে দেখিনি তা নয়। অনেক আগে পড়েছিলাম তো, এখন অত মনে নাই। আপনার কথাও সত্যি হতে পারে।

        সে যাই হোক, একটা ব্যাপারে আমি ১০০% নিশ্চিত যে, ‘‘কৃত্তিবাস যেমন বাল্মীকি রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কিছু নিজের মনগড়া কাহিনি ঢুকিয়ে দিয়েছে, ঠিক সে রকম কাশীদাসও ‘বেদব্যাস মহাভারত’ বাংলা করতে গিয়ে মূল মহাভারতে কিছু স্বরচিত কাহিনি ঢুকিয়ে দিয়েছে।’’

        সুধীরচন্দ্র সরকার, রাজশেখর বসু এদের কথা জানি না। কাশীদাস যে মহাভারতে কিছুটা গোঁজামিল দিয়েছে, এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

  11. মীজান রহমান

    বরাবরের মতো অভিজিৎ রায়ের এই লেখাটিও দারুণ উপভোগ্য মনে হয়েছে আমার কাছে। কথাগুলো সবই আমার নিজস্ব মতামতের সঙ্গে মিলে যায়। বিড়ম্বনা হল এই যে, অভিজিতের এই যুক্তিগুলো যতই বিজ্ঞানসম্মত হোক, কোনো ধর্মবাদী সম্ভবত তাদের গ্রন্থসমূহের মধ্যে এগুলো খুঁজে দেখবার চেষ্টা করবেন না।

    যদিও তাদের নিজেদের যুক্তি অনুযায়ী, পৃথিবীর কোনো জ্ঞানই– অভিজিতের জ্ঞান সহকারে– ধর্মগ্রন্থের বহির্ভূত নয়!

    Reply
    • অভিজিৎ

      অধ্যাপক মীজান রহমান,

      আপনার মন্তব্য আমার জন্য বিশাল প্রেরণা হয়ে রইবে।

      Reply
  12. sumon roy

    লেখক একজন ‘অতিমাত্রায়’ নাস্তিক। এসব ফালতু কথা লিখে সুযোগসন্ধানী কিছু মৌলবীকে উসকে দিচ্ছেন। মূল কথা হল, সনাতন ধর্ম পৃথিবীর একমাত্র আদি ধর্ম; আর বাকিসব ধর্ম হল একেকটা মতবাদ যার সৃষ্টি সনাতন থেকে হয়েছে।

    লেখক শর্টকাট পাবলিসিটির আশায় এমন অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

    Reply
    • অভিজিৎ

      হে হে, ঠিকই বলেছেন– ‘‘লেখক ‘অতিমাত্রায়’ নাস্তিক, তার ‘ফালতু কথা’ মৌলবাদীদের উস্কে দিচ্ছে’’– তো সেই কথা না শুনলেই হয়!

      🙂

      একটা কথা আছে জানেন তো, মসজিদ ভাঙে ধার্মিকেরা, মন্দিরও ভাঙে ধার্মিকেরা, তারপরও তারা দাবি করে তারা ‘ধার্মিক’! আর যারা ভাঙাভাঙিতে নেই তারা অধার্মিক বা আপনার কথামতো ‘অতিমাত্রায় নাস্তিক’। তারপরেও যত দোষ নাকি এই নাস্তিকদেরই, আর কৃষ্ণের বেলায় বরবাবরই ‘লীলা’। মজা না?

      যাহোক, সনাতন ধর্মের জাবর কেটে লাভ নেই। ক্রমশ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে রূপান্তরিত হওয়া সনাতন ধর্মের পায়েস মেখে যত ইচ্ছা মুড়ি খেতে চান খান, কিছু আসে যায় না আমার। তবে কি জানেন, ‘শর্টকাট’ পাবলিসিটি হয় তাদেরই যারা ‘র’ বলতেই রাম বোঝে, আর ‘ব’ বলতেই ‘বিগ ব্যাং’। এরাই ধর্মগ্রন্থে বিজ্ঞান খুঁজে পায়, এরাই ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে জাকির নায়েক, শমশের আলী আর সত্য সাঁই হয়।

      আর আকাশ্চুম্বী জনপ্রিয়তা ও পাবলিসিটি পায় কীভাবে জানেন? আপনাদের মতো বান্দাদের অগাধ বিশ্বাস ‘পুঁজি’ করে।

      এই অপোগণ্ডামি খণ্ডন করতে লাগে অনুসন্ধিৎসা, বিজ্ঞানমস্কতা ও যুক্তির প্রতি দায়বদ্ধতা, যার কোনোটাই দুর্ভাগ্যবশত আপনাদের করোটিতে নেই বলে মনে হয়।

      Reply
  13. রুদ্র

    সবই ‘কোরানে’ আছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আর্টিকেল ছাপাক দেখি!

    ‘বেদ’কে ‘ব্যাদ’ লিখে হিন্দুবিদ্বেষ প্রচার করে কি দেশে অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করবেন এনারা? নিজের দেশের গণ্ডমূর্খদের রেখে ভারতের দিকে এদের নজর কেন?

    Reply
    • অভিজিৎ

      ‘বেদ’কে ‘ব্যাদ’ এই লেখক লেখেনি, লিখেছিলেন স্বনামখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। আর কেন বলেছিলেন, কাদেরকে নিয়ে বলেছিলেন তা প্রবন্ধের একেবারে শুরুতেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

      বোঝা যাচ্ছে লেখাটা ‘ব্যাদওয়ালা’দের একদম জায়গামতোই গিয়ে লেগেছে।

      Reply
  14. অরূপ

    “…. এ প্রসঙ্গে কিছু বলা প্রয়োজন বোধ করছি। কর্ণ আসলে ছিলেন পাণ্ডবজননী কুন্তীর প্রথম পুত্র। তবে তিনি এক অর্থে কুন্তীর ‘বৈধ সন্তান’ ছিলেন না। তার আদি নাম ছিল বসুষেণ। তবে অনেক পরে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময়, নিজের অঙ্গ কেটে তার মৃত্যু-প্রতিরোধক কবচ ও কুণ্ডল দান করায় তিনি ‘দাতা কর্ণ’ নামে খ্যাত হন।

    কর্ণের জন্মকাহিনি অবশ্য মজার। রগচটা মুনি দুর্বাসা এক সময় অতিথি হিসেবে কুন্তীর ঘরে এসেছিলেন। তখন কুন্তী কুমারী, বিয়ে-থা কিছুই করেননি। কুন্তী খাইয়ে দাইয়ে দুর্বাসার সেবা-যত্ন করলে, ওই ঋষি খুশি হয়ে তাকে একটি মন্ত্র শিখিয়ে দেন। এই মন্ত্র পড়লে কুন্তী যে দেবতাকে ডাকবেন, সে দেবতাই কুন্তীর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসবেন এবং তার ঔরসে কুন্তীর পুত্রলাভ হবে।

    এখন মন্ত্র কাজ করে কিনা দেখতে হবে তো। আর কুন্তীর বয়সও তখন খুব বেশি না। টিনএজ হবেন– কৌতূহল তো আছেই। একদিন বাড়ির এক কোনায় গিয়ে কুন্তী মন্ত্র পড়ে সূর্যকে আহবান করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সূর্যদেব এসে পড়লেন। কুন্তী তখন ভয়ে অস্থির। মন্ত্র পড়লেই যে এটা ঘটবে তা বুঝতেই পারেননি তিনি। তার উপর তিনি কুমারী। সূর্যের ঔরসে পুত্র হলে সমাজে মুখে দেখাবেন কী করে!

    এখন সূর্যও নাছোড়বান্দা। সুন্দরী কুন্তী মন্ত্র পড়ে নিয়ে এসেছে, এখন কি আর তিনি সব কাজ শেষ না করে ফিরে যাবেন? তাহলে আর দেবতা কীসে! কাজেই মিলন হতেই হল।”

    উপরোক্ত বাক্যগুলোর বিষয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। হিন্দু ধর্মে ‘বরপুত্র’ নামক একটি শব্দ আছে, অর্থা‌ৎ কোনো দেবতার আশীর্বাদ বা বর প্রাপ্ত হয়ে পুত্র লাভ করা, শারীরিক মিলনের ফলে নয়। এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদীর মতো আপনিও আবার বিজ্ঞান খুঁজতে যাবেন না। হিন্দুশাস্ত্রের ইতিহাসে এমন বরপুত্র আরও অনেকে আছেন। খ্রিস্টান ধর্ম অনুযায়ী যীশু খ্রিস্ট, যাঁকে আমরা ইসলাম মতে হযরত ঈসা (আ:) বলে জানি, তাঁর জন্ম হয়েছিল কুমারী মাতা মেরীর গর্ভে যেখানে কোনো ঔরসদাতা ছিলেন না।

    লেখককে কোনো ধর্ম সম্পর্কে লেখার সময় এমন আদিরসাত্মক বাক্য ব্যবহার না করার এবং যথাযথ ধর্মীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে পরামর্শ করে এই ধরনের লেখা প্রকাশের অনুরোধ করছি।

    Reply
    • অভিজিৎ

      হিন্দু ধর্মে ‘বরপুত্র’ নামক একটি শব্দ আছে, অর্থা‌ৎ কোনো দেবতার আশীর্বাদ বা বর প্রাপ্ত হয়ে পুত্র লাভ করা, শারীরিক মিলনের ফলে নয়।

      বোঝাই যাচ্ছে হিন্দুধর্ম নিয়ে আপনার পড়াশোনা কম, সে তুলনায় আবেগ বেশি। বরপুত্র নয়, সূর্যের ‘ঔরসে’ কর্ণের জন্ম হয়েছিল, তা মহাভারতেই আছে এভাবে–

      জন্মেজয় জিজ্ঞাসিল কহ তপোধন।
      কুন্তীগর্ভে জন্মে কর্ণ বিখ্যাত ভুবন।।
      কৌরবের পক্ষে কেন কুন্তীর নন্দন।
      দেখিয়া ধরিল কুন্তী কীরূপে জীবন।।
      মুনি বলে, শুন কুরুবংশ চূড়ামণি।
      কৌরবের রণে গেল কর্ণ বীরমণি।।
      বিদুরের মুখে শুনি এসব বচন।
      চিত্তেতে চিন্তিয়া কুন্তী ভাবে মনে মন।।
      আমার নন্দন কর্ণ কেহ না জানিল।
      সূর্য্যের ঔরসে জন্ম কর্ণের হইল।।

      [রেফারেন্স: কাশীদাসী মহাভারত » ০৫.উদ্যোগপর্ব্ব » ৩১. কর্ণের জন্ম বিবরণ]

      আর ‘বরপুত্র’ই যদি ব্যাপার হত, তবে কুন্তী কলঙ্কের ভয়ে ভীত হতেন না, কর্ণকে ত্যাগও করতেন না। সূর্য এবং কুন্তীর ‘মিলনে’ই যে কর্ণের জন্ম হয়েছিল, তা সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত ‘পৌরাণিক অভিধান’ এও পাবেন।

      আর বরপুত্রের কথা বলে কতই-বা ‘শাক দিয়ে’ মাছ ঢাকবেন, বলেন? এই প্যাণ্ডোরার বাক্স খুললে আর পালাতে পারবেন না। কয়েকটা দৃষ্টান্ত দিই কেবল।

      মৎস্যপুরাণে লেখা আছে, ব্রহ্মা নাকি একদিন মেয়ে শতরূপাকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি। আদি মানব মনুর জন্ম হয় ব্রহ্মা আর শতরূপার মিলন থেকেই। শুধু ব্রহ্মাই নন, নিজের মেয়ের সঙ্গে মিলনের কাণ্ড ঘটিয়েছেন দেবতা প্রজাপতিও। ঊষা ছিলেন প্রজাপতিকন্যা। প্রজাপতি ঊষার রূপে কামাসক্ত হন এবং মিলিত হতে চান। তখন ঊষা মৃগীরূপ ধারণ করেন। প্রজাপতি মৃগরূপ ধারণ করে তার সঙ্গে মিলিত হন।

      [মৈত্রায়ন সংহিতা, ৪/২/২২]

      আর জানেন তো? হিন্দুরা ভগবান ডেকে যাকে পুজো করেন সেই ভগবান ব্যাপারটাই অশ্লীল। ‘ভগবান’ বলতে ঈশ্বরকে বোঝানো হলেও এটি আসলে হচ্ছে দেবরাজ ইন্দ্রের একটি কুখ্যাত উপাধি। তিনি তার গুরুপত্নী অহল্যার সতীত্ব নষ্ট করায় গুরুর অভিশাপে তার সর্বাঙ্গে একহাজার ‘ভগ’ (স্ত্রী যোনি) উৎপন্ন হয় এবং তাতে ইন্দ্রের নাম ‘ভগবান’ (ভগযুক্ত) হয়।

      [পঞ্চ পুরাণ, ষষ্ঠ খণ্ড, ৬৯০ পৃষ্ঠা, মহাভারত, কৃত্তিবাসী রামায়ণের আদিকাণ্ডের ৬৫১ পৃষ্ঠা]

      ইন্দ্র থেকে কৃষ্ণ পর্যন্ত প্রত্যেকেই ছিলেন ব্যাভিচারী। জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দা ও শঙ্খচূড়ের স্ত্রী তুলসীকে প্রতারিত করে বিষ্ণু তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। সপ্তর্ষির সাত স্ত্রীকে দেখে অগ্নি একসময় কামার্ত হয়ে পড়েন। উপথ্যের স্ত্রী ভদ্রাকে দেখে বরুণ কামনাপীড়িত হয়ে অপহরণ করেন। ইন্দ্র গৌতমের স্ত্রীকে প্রতারিত করে ধর্ষণ করেন আগেই বলেছি। সপ্তর্ষির সাত স্ত্রীকে দেখে অগ্নি কামার্ত হন। চন্দ্রের ৬০ কোটি বারবনিতা থাকা সত্ত্বেও বৃহস্পতির স্ত্রী তারাকে অপহরণ করেন। তাকে ধর্ষণের পরিণতিতে জন্মানো সন্তান হল বুধ।

      আসলে ওই বিকৃত কল্পনাগুলো করেছিল বৈদিক যুগের পুরুষেরা। তারা নিজেরা ছিল কামাসক্ত, বহুপত্নীক এবং অজাচারী; তাই তাদের কল্পনায় তৈরি দেব-দেবীও তাদের মতোই। এ জন্যই সমস্ত বই-পুস্তকে শুধু অযাচিত কাম আর মৈথুনের ছড়াছড়ি। পান থেকে চুন খসলে সে সময়কার মুনি-ঋষিরা রাগে কাঁপতে কাঁপতে শাপ দিতেন। বিয়ে করতেন। তারপরও রাজাদের আমন্ত্রণে হাজির হতেন রানিদের গর্ভে সন্তান উৎপাদন করতে। সুন্দরী অপ্সরা আর বারবনিতা দেখলে এতই উত্তেজিত হয়ে যেতেন যে, রেতঃপাত হয়ে যেত। আর সেখান থেকেই নাকি সন্তান জন্মাত। অগস্ত্য, বশিষ্ঠ, দ্রোণের জন্মের উদাহরণই এর প্রমাণ।

      আর আপনি এসেছেন মশাই ‘বরপুত্র’ নিয়ে!

      Reply
  15. কেউ একজন

    কুরআন বিজ্ঞানের বই নয়, বরং নিদর্শনের বই, বিশ্বাসীদের জন্য।

    অনেকেই এখানে বলেছেন, গবেষণা করে নতুন কিছু আবিস্কার করে দেখাতে পারেননি কোনো ধর্মগুরুই, কিন্তু মজার ব্যাপার হল, অনেক মুসলিম বিজ্ঞানী রয়েছেন যাদের আবিস্কার কুরাআনের আয়াত নিয়ে পড়াশোনা করে। এসব ব্যাপারগুলি কিন্তু তথাকথিত সুশীলগণ দেখেও না দেখার ভান করেন। আবার তারাই ডারউইনের গাঁজাখুরি থিওরিতে অপবিজ্ঞানচর্চা খুজে পান না, কারণ তা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়!

    কুরআনে আপনারা বিশ্বাস না করেন সেটা আপনাদের ব্যাপার, কিন্তু বিশ্বাসীরা যদি কুরআনে নিদর্শনের খোঁজ করেন তাতে আপনার খারাপ লাগে কেন?

    নাস্তিকতাকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণের চেষ্টাতে অপবিজ্ঞানচর্চা হয় না, আর আস্তিকরা বিজ্ঞানের কোনো আবিস্কারকে নিদর্শন বললেই অপবিজ্ঞানচর্চা হয়!

    জানি হয়তো আমার কমেন্ট পাবলিশ হবে না, কিন্তু বিডিনিউজের অন্তত একজন মডারেটরকে আমার কথাগুলো জানাতে পারলাম। আশা করি আপনাদের পাবলিশ করার সেই সাহস আছে।

    🙂

    Reply
    • Abul Hussain

      এই লেখাটির মূল লক্ষ্য ধর্মকে কটাক্ষ করা। লেখায় আকারে-ইঙ্গিতে পবিত্র কোরআনকেও কটাক্ষের চেষ্টা করা হয়েছে।

      মজার ব্যাপার হল, এই ধরনের আঁতেলরা পবিত্র কোরআনের সংস্পর্শে যেতে ভয় পান এবং কোরআন না পড়েই অন্ধ বিদ্বেষে ভোগেন। এ ধরনের মানসিকতাও এক ধরনের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ।

      Reply
      • অভিজিৎ

        ঠিক বলেছেন, কটাক্ষের শাস্তিস্বরূপ লেখককে শরিয়া মোতাবেক পাথর মারা হোক, কেমন? 🙂

        তবে ঘটনা কি জানেন, ধর্মকে কটাক্ষ করার জন্য অভিজিৎ রায় লাগে না, ধর্মে যা লেখা আছে, তাই যথেষ্ট। 🙂

    • অভিজিৎ

      কুরআন বিজ্ঞানের বই নয়, বরং নিদর্শনের বই, বিশ্বাসীদের জন্য।

      তাহলে সেটা আপনি হারুন ইয়াহিয়া, জাকির নায়েক আর শমশের আলীদের গিয়ে বোঝাচ্ছেন না কেন? তারা যখন কোরানে ‘ব’ দেখলেই ‘বিগ ব্যাং’ খুঁজে পায়, আর ‘ই’ দেখলেই ইলেকট্রন, তখন তো আপনাদের ‘কুরআন বিজ্ঞানের বই নয়, বরং নিদর্শনের বই’ বলে পাড়া কাঁপাতে শুনি না, কিন্তু আপনাদের মুখ দিয়ে এ সুফি-বচন বেরিয়ে আসে বিপরীতপক্ষের কেউ এ সমস্ত অপবিজ্ঞান খণ্ডন করলেই!

      🙂

      Reply
  16. রুপনাথ নন্দী

    আপনাদের ভারত নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই, তার থেকে নিজেদের বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলুন। আপনাদের লেখালেখির জন্য আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে।

    Reply
    • ম্যানিলা নিশি

      এই লেখায় ভারতপ্রীতি অতিমাত্রায় দৃশ্যমান!

      আমি বরং অভিজিৎ রায় বাবুকে ভারতীয় সাইটে এ জাতীয় লেখা প্রকাশ করতে অনুরোধ করব।

      Reply
      • Subhadeep

        আর আপনার লেখায় মনে হচ্ছে আপনি স-অ-ব বুঝে ফেলেছেন! কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যে আদিস্তরের পারমাণবিক যুদ্ধ ছিল না, এ আপনি কোত্থেকে জানলেন? কীভাবে বুঝলেন, ‘চরক-শুশ্রুত’এর দেশে প্লাস্টিক সার্জারি বা টেস্ট টিউব বেবি একেবারেই অসম্ভব ছিল?

        আমি বলছি না যে, ‘বেদ-পুরাণ’এর সব কিছুই নির্ভেজাল সত্য। কিন্তু আপনি অবান্তর ‘বিজ্ঞান বিজ্ঞান’ করে ড. সাহার নাম নিয়ে ফুটেজ খাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। আপনার অভিপ্রায়টাই স্পষ্ট নয়।

      • অভিজিৎ

        কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যে আদিস্তরের পারমাণবিক যুদ্ধ ছিল না, এ আপনি কোত্থেকে জানলেন? কীভাবে বুঝলেন, ‘চরক-শুশ্রুত’এর দেশে প্লাস্টিক সার্জারি বা টেস্ট টিউব বেবি একেবারেই অসম্ভব ছিল?

        দর্শন শাস্ত্রে Burden of Proof বলে একটি টার্ম প্রচলিত আছে যার মর্মার্থ হল, যে কোনো উটকো দাবির যথার্থতা প্রমাণ করার দায়িত্ব দাবিদারের। আপনি যদি পরীতে বিশ্বাসী হন, জ্বীনে বিশ্বাসী হন, পূর্বজন্মে বিশ্বাসী হন, অ্যালিয়েনে বিশ্বাসী হন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে পারমাণবিক যুদ্ধ মনে করেন কিংবা মনে করেন গণেশের ধড়ে হাতির মাথা হচ্ছে প্লাস্টিক সার্জারির ফল– তাহলে আপনাকেই এই সমস্ত বিষয়ের অস্তিত্বের যথার্তা প্রমাণ করতে হবে। যারা এগুলোতে বিশ্বাস করে না, তাদের দায়িত্ব নয় ‘অঙ্ক কষে’ আপনার দাবি ভুল প্রমাণ করা কিংবা নস্যাৎ করা। কার্ল স্যাগান একটি কথা খুব বলতেন–

        Extraordinary claims require extraordinary evidence.

        কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে পারমাণবিক যুদ্ধ হিসেবে চালানো অবশ্যই একটি ‘এক্সট্রা-অর্ডিনারি ক্লেইম’। আমার মতে, এর জন্য ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি এভিডেন্স’ লাগবে।

        এখন আসি নেতিবাচক অস্তিত্বের প্রস্তাবনার ব্যাপারে। যিনি ভূতে বিশ্বাস করেন অথচ ভূতের অস্তিত্বের প্রমাণ চাইলেই উল্টে প্রতিপক্ষের কাঁধে দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে বলেন, ‘প্রমাণ করুন তো, ভূত বলে কিছু নেই’– তিনি আসলে নিজের অজান্তেই একটি যৌক্তিক ভ্রান্তিতে (logical fallacy) আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, দর্শনে যার একটি সম্ভ্রান্ত নাম আছে– Shifting the Burden of Proof, সহজ বাংলায় যাকে বলে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানো। এই ভ্রান্তিটিকে দর্শনশাস্ত্রে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে–

        The burden of proof is always on the person asserting something. Shifting the burden of proof is the fallacy of putting the burden of proof on the person who denies or questions the assertion. The source of the fallacy is the assumption that something is true unless proven otherwise.

        [Ref: The Atheism Web, Logic & Fallacies]

        বার্ট্রান্ড রাসেলকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল উনি ঈশ্বরের অনস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারবেন কিনা। তার জবাবে উনি বলেছিলেন:

        ‘যদি আমাকে বলা হয় প্রমাণ করতে যে জিউস, পসেইডন, হেরা কিংবা অন্যান্য অলিম্পিয়ানদের অস্তিত্ব নেই, তাহলে হতভম্ব হয়ে বসে থাকা ছাড়া আমি কোনো যুক্তি খুঁজে পাব না!’

        কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে যদি পারমাণবিক যুদ্ধ হিসেবে মেনে নিতে হয়, তবে সে একই যুক্তিতে জিউস, হেরা, ব্রক্ষ্মা, কালী, থর, পশুপতি, অশ্বত্থামা, ট্যাশ গরু, রামগরুড়ের ছানা সবকিছুকেই ‘বিনা প্রমাণে’ মেনে নিতে হয়; কারণ কেউ এখন পর্যন্ত ‘অঙ্ক কষে’ এগুলো যে আদপেই নেই কিংবা অসম্ভব, তা প্রমাণ করতে পারেনি।

        অবশ্য না পারার সঙ্গত একটি কারণও আছে। কারণ দর্শনশাস্ত্র আমাদের শিখিয়েছে যে, নেতিবাচক অস্তিত্বের প্রস্তাবনা (negative existential proposition) কখনওই প্রমাণযোগ্য নয়।

        ব্যাপারটি আপনার বক্তব্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

    • আহমেদ

      ক্যান দাদা, আমাদের ভারত নিয়ে চিন্তা করলে কী সমস্যা? আপনারা কি আমেরিকা, ইরাক, ইরান রাশিয়ার রাজনীতি নিয়ে ভাবেন না? আপনাদের পেপারে কি খালি ভারতের খবরই ছাপে? ওবামাকে নিয়ে তো কম চিন্তা নাই আপনাদের।

      আর আপনারই-বা বাংলাদেশের পত্রিকায় এসে মন্তব্য ছাড়ার দরকার কী? ভারতে পত্রিকার ঘাটতি পড়েছে নাকি?

      Reply
    • অভিজিৎ

      আপনাদের ভারত নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই, তার থেকে নিজেদের বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলুন।

      লেখকরা কী নিয়ে আর কোন বিষয় নিয়ে লিখবে, সেটা তাদের উপরেই ছেড়ে দিলে হয় না? 🙂

      আর লেখাটা ভারত বা বাংলাদেশের কোনো স্পেসিফিক বিষয় নিয়ে নয়। লেখাটা মূলত অপবিজ্ঞান এবং কুসংস্কারের উপর। এর দেশ নেই, নেই সীমানা। তাই লেখাটিতে মোদীর কথা যেমন আছে, তেমনি আছে শমশের আলী, হারুন ইয়াহিয়াদের কথাও।

      আপনাদের লেখালেখির জন্য আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে।

      ওরে ব্বাপ! আমার একটা লেখাতেই ‘পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ নষ্ট হয়ে গেল? সম্প্রীতি এত ঠুনকো হলে হবে? আপনারা সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ‘চুমুর বিপ্লব’ শুরু করেছেন, তারাই আবার বাংলাদেশের পেপারে একটা লেখা দেখলেই হুমকি দেন, বন্ধ করার? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে অপোগণ্ডামির চাষে বোধকরি কারও সমস্যা নেই।

      বাই দ্য ওয়ে, কেবল আমি নই, স্বনামখ্যাত বিজ্ঞানী পারভেজ হুদোভয়ও একটি লেখা লিখেছেন, ডন পত্রিকায়, The rise of unreason নামে। লেখাটা পড়ে নেবেন। এখন কি উনাকেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির তাগিদে লেখা বন্ধ করতে বলবেন?

      আপনারা পারেনও!

      Reply
  17. রাশেদ মেহেদী

    অসাধারণ একটি লেখা। মজার বিষয় হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা নতুন কিছু আবিস্কারের পরই ধর্মীয় মৌলবাদী গুরুরা গবেষণা করে তার ধর্মগ্রন্থে তার আগেই উল্লেখ দেখতে পান!

    কিন্ত আজ পর্যন্ত কোনো একটি ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে, গবেষণা করে নতুন কিছু আবিস্কার করে দেখাতে পারেননি কোনো ধর্মগুরুই….

    Reply
  18. রেজাউল কবীর বাদল

    চমৎকার লিখেছেন, বিষয়টির উপর অগাথ পাণ্ডিত্য আমাকে মুগ্ধ করে। যদিও খুবই সম্প্রতি আপনার লেখার খোঁজ পেয়েছি।

    Reply
  19. Md.Ali Azam

    সবই তো আছে দেখছি, কিন্তু মহাপণ্ডিতেরা তার খোঁজ পান কেবল বিজ্ঞানের আবিষ্কারের পরে। কেন?

    বোধ করি তাও কোথাও না কোথাও থেকে থাকবে!

    Reply
  20. AVIJIT DAS

    খুব ভালো একটি নিবন্ধ পড়লাম। লেখককে যেমন ধন্যবাদ দিতে চাই, তেমন ধন্যবাদ দিতে চাই শ্রদ্ধেয়া লেখিকা তসলিমা নাসরিনকেও। কারণ ওনার টুইটার প্রোফাইলের পোস্টে লিঙ্কটি না দেখলে এত ভালো একটা লেখা পড়াই হ’ত না আমার।

    এ রকম ধরনের লেখা আমাদের সমাজের জন্যে, মানবতার জন্যে খুবই প্রয়োজন। শুভেচ্ছা রইল।

    — অভিজিৎ দাস, কোলকাতা

    Reply
    • অভিজিৎ

      আপনাকেও ধন্যবাদ দিতে চাই। খ্যাতিমান লেখিকা তসলিমা নাসরিন যে আমার এ লেখাটি টুইটারে শেয়ার করেছেন তা আপনার থেকেই জানলাম।

      লেখাটি পড়ার জন্য এবং কষ্ট করে মন্তব্যটুকু করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
  21. গীতা দাস

    মোদী রাজনীতিবিদ। আর রাজনীতিবিদরা এমন ভেল্কিবাজি মার্কা কথা বলেই থাকেন। এদের কথা মানুষ বিশ্বাস করে না, উজবুকরা ছাড়া। কিন্তু ভারতের জাতীয় বিজ্ঞান আকাদেমীর বিখ্যাত (?) বিজ্ঞানী (?) মৃণাল দাসগুপ্তরা বেশি harmful…

    যাহোক, সময়োপযোগী লেখাটি চমৎকার লাগল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—