Feature Img

Raihan Abirদুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে লিখতে বসেছি। প্রতিদিনের মতো ৩ এপ্রিল, ২০১৪ সকালবেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে বের হয়েছি। রাস্তায় দেখা হল এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। কলেজ-পর্বের সমাপ্তি টানার মাধ্যমে জীবনের অন্যতম একটি মাইলফলক অতিক্রমের জন্য আজ তারা প্রস্তুত। বাস-সিএনজি-রিকশায় তারা চলছে নিজ নিজ পরীক্ষাকেন্দ্রে। কোনো সন্দেহ নেই, এই চমৎকার, হাস্যোজ্জ্বল ছাত্রছাত্রীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশের ভবিষ্যত।

ভিড়ের মুখগুলোর মাঝে আমি আমার ছোট ভাইকে খুঁজে পাই, খুঁজে পাই আপনার ছোট ভাই-বোন, আত্মীয়, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশি ছেলেটি বা মেয়েটিকে। আরও থাকার কথা ছিল চট্টগ্রামের মাহমুদর রহমান রায়হান (রায়হান রাহী) এবং উল্লাস দাশের। কিন্তু কই, তাদের মুখ তো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।

পাবার কথাও নয়, সতের-আঠার বছর বয়সী নিষ্পাপ এই দুই কিশোর আজ মৌলবাদীদের চক্রান্তের শিকার হয়ে বন্দি জেল-হাজতে। এ শক্তিকে আমরা একাত্তরে পরাজিত করলেও বাংলাদেশ থেকে তাদের নির্মূল করতে পারিনি বহুবিধ কারণে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী দুই জেনারেলের কার্যকলাপসহ অনেক কিছুই আছে। একসময় রাজনীতির আলো-বাতাসে ঘাপটি মেরে থাকা পরাজিত সে শক্তি আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। যদিও সেটা আমরা অনেক সময়ই স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করি।

ঘটনার সূত্রপাত ৩০ মার্চ, ২০১৪। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহের জন্য রাহী ও উল্লাস যখন কলেজে যাচ্ছিল বেলা এগারোটার দিকে, তখন স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংঘ ইসলামী ছাত্র শিবিরের পঞ্চাশ থেকে ষাটজন ক্যাডার তাদের উপর হামলা চালায়। অবশ্যই ধর্মানুভূতির জুজু পুঁজি করে।

হামলাকারীরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, প্রস্তুত ছিল তাদের মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা-সম্বলিত উস্কানিমূলক পাঁচ পাতার ছাপানো লিফলেট। প্রথমে রাহী ও উল্লাসকে স্থানীয় মসজিদে নিয়ে মারধর করা হয় এবং পরে রাস্তায় নামিয়ে লিফলেট দেখিয়ে ও অন্য অনেকভাবে আশেপাশের মানুষদের উত্তেজিত করে নির্মম গণধোলাইয়ের আয়োজন করা হয়।

ব্লগ ও পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি, জনতার ধর্মীয় জোশ উজ্জীবিত করতে কৈশোর-অতিক্রান্ত ছেলে দুটোকে ‘নারায়ে তাকবির’ শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে পিটিয়ে মুমূর্ষু করা হয়। শাহবাগ আন্দোলনের পর থেকে আমরা দেখেছি, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা মানুষের জোয়ার প্রতিহত করতে স্বাধীনতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে তাদের সরকারও যেন একাট্টা।

রাহী-উল্লাসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উত্তেজিত জনতা যখন শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে এই ছেলেগুলোকে হত্যা-চেষ্টায় মগ্ন, সে সময় আগমন ঘটে স্থানীয় চকবাজার থানার পুলিশের। জনতার হাত থেকে ছাড়িয়ে এবার তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। যারা রাহী ও উল্লাসকে হত্যা-চেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার পরিবর্তে, তাদেরই চাপে পড়ে পুলিশ উল্টো ছেলে দুটোর নামে মামলা করে।

বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থী কালাকানুন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০১৩)-এর ৫৭ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আটক রাখা হয়।[১]

২০০৬ সালে মেয়াদের শেষ সময়ে এসে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার সর্বপ্রথম ‘তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬’ প্রণয়ন করে। এই আইনের হাস্যকর, অযৌক্তিক ৫৭ ধারাটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তাদের গতবারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে সংশোধন করে সেটাকে আরও ভয়াবহ রূপ প্রদান করে। ৫৭ ধারার আপাতত অসংজ্ঞায়িত ‘অপরাধ’কে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য, সর্বনিম্ন শাস্তির সীমা ৭ বছর করে তারা সংশোধিত আইনটি পাশ করে।

আইনটি নিয়ে কথা বলার আগে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সেটি কীভাবে পাশ হয়েছিল, পাঠকদের সে কথাও সবিনয়ে জানিয়ে রাখতে চাই। জনগুরুত্বপূর্ণ এই আইনটি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা হবে, এমনটা জনগণের চাওয়া হলেও সংসদকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এটি সংশোধন করা হয়।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল সংসদের অধিবেশন না থাকার কথা। যদিও সেটা সর্বৈব মিথ্যা; কারণ ২০ আগস্ট, ২০১৩ সালে অধ্যাদেশ জারির দুদিন আগে ১৮ আগস্ট, ২০১৩ রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের উনিশতম অধিবেশন জারি করেন। মাত্র তিন সপ্তাহ পরেই সংসদ অধিবেশন থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের সংবিধান এবং ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই আইনটি কেন তড়িঘড়ি সংশোধন করা হল, তা আজও আমাদের বোধগম্য হয়নি।

এ ধরনের আইনে নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানির আশংকা থাকে এবং সে আশংকা সত্যি করতে আমরা দেখেছি ব্লগার রাসেল পারভেজ, সুব্রত শুভ, মসিউর রহমান বিপ্লব, আসিফ মহিউদ্দীনকে গ্রেফতার করা হয়। মূলত হেফাজতে ইসলাম নামের এক ধর্মান্ধ শক্তিকে সন্তুষ্ট করতে এবং সরকার নিজের নাস্তিক তকমা অপসারণের চেষ্টা হিসেবে ধর্মানুভূতির অভিযোগ এনে তাদের গ্রেফতার করেন।

শুধু তা-ই নয়, ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে ইন্টারনেট মডেম, ল্যাপটপ সামনে রেখে তিন ব্লগারের ছবি তুলে দেশের সকল শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করে তাদের ব্যক্তি, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের সকল নিরাপত্তা এক নিমেষে শেষ করে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই ৫৭ ধারার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন নিরাপরাধ মানুষ।

পাকিস্তানে আমরা জানি, জমিজমা সংক্রান্ত ঝামেলা হলেও অনেক সময় ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা ঠুকে ব্যক্তিবিশেষকে রাষ্ট্রীয় এবং মৌলবাদী ঝুঁকির ফুলে ফেলে দেওয়া ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। ঠিক তেমনি এক আইন এখন আমরা তৈরি করেছি। সেই কালা-কানুনেরই নতুন শিকার রাহী ও উল্লাস।

তাদের অপরাধ কী? ধর্মানুভূতিতে আঘাত? কার ধর্মানুভূতিতে আঘাত হেনেছে তারা? ধর্মানুভূতি প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের কথা, যিনি নিজেও চিন্তার স্বাধীনতার আন্দোলনের কারণে জীবন দিয়েছিলেন মৌলবাদীদের হাতে। ‘ধর্মানুভূতির উপকথা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন–

একটি কথা প্রায়ই শোনা যায় আজকাল, কথাটি হচ্ছে ‘ধর্মানুভূতি’। কথাটি সাধারণত একলা উচ্চারিত হয় না, সাথে জড়িয়ে থাকে ‘আহত’ ও ‘আঘাত’ কথা দুটি; শোনা যায় ‘ধর্মানুভূতি আহত’ হওয়ার বা ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’ লাগার কথা। আজকাল নিরন্তর আহত আর আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে মানুষের একটি অসাধারণ অনুভূতি, যার নাম ধর্মানুভূতি।

মানুষের শুধু একটি এলাকাই আছে, যেখানে যুক্তি চলে না; সেটি খুবই ভিন্ন রকম এলাকা, সেখানকার সব সত্য লাভ করা যায় অযুক্তি আর অন্ধবিশ্বাস দিয়ে। মানুষের এই অন্ধবিশ্বাসই অভিহিত হয়ে থাকে ধর্মানুভূতি নামে।

পাঠক লক্ষ্য করুন, আইসিটি আইন ২০০৬-এর ৫৭ (১) ধারায় কী বলা রয়েছে।

‘‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ৷’’

এর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সচলায়তন ব্লগে সাঈদ আহমেদ ‘আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা: ‘আইন কানুন সর্বনেশে!’ শিরোনামের প্রতিক্রিয়ায় লিখেছিলেন– [২]

হাকিম হইয়া হুকুম করে, পুলিশ হইয়া ধরে।

কাউকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশকে সাধারণত আদালতের কাছে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু খুন, খুনের প্রচেষ্টা, ধর্ষণ বা ধর্ষণ-প্রচেষ্টার মতো গর্হিত অপরাধ ‘আমলযোগ্য’ বিবেচনায় আদালতের অনুমতি ছাড়াই পুলিশ সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেফতার ও তদন্ত করতে পারে। আইসিটি আইনে অনলাইনে মতপ্রকাশ ‘আমলযোগ্য’ করা হয়েছে।

ফলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বা ইচ্ছাকৃতভাবে অনলাইনে মতপ্রকাশের কারণে যে কাউকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করে এবং নির্দোষ প্রমাণের আগ পর্যন্ত জামিনবিহীনভাবে আটক রেখে কার্যত একাধারে ‘জাজ, জুরি ও এক্সিকিউশনারের’ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এখানে কোনো কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধের অর্থ বিচার করে তা ‘আমলযোগ্য’ অপরাধ কি না, তার এখতিয়ারও বিজ্ঞ আদালতের বদলে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের হাতেই বিচারের ভার দেওয়ার ভয়াবহতা নিয়ে তিনি তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। সেই উদ্বেগের যথার্থতাই প্রমাণ করল চট্টগ্রামের চকবাজার থানার পুলিশ। জানতে পেরেছি, রাহী ও উল্লাসের উপর শিবিরের সন্ত্রাসীদের হামলা শুরু হবার তিন ঘণ্টা দশ মিনিট পর উপস্থিত হয়ে এবং রাহীর মোবাইল ফোন নিয়ে তার মেসেজ পড়ে পুলিশ জনতার সামনেই তাদের আবার দোষী সাব্যস্ত করে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে–

…দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাইয়া দেখিতে পাই যে, দুই জন লোককে ৫০/৬০ জন উত্তেজিত জনতা মারধর করিতেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ধৃত আসামীদ্বয়কে উত্তেজিত জনতার কবল হইতে উদ্ধার করিয়া উপস্থিত জনসাধারণকে জিজ্ঞেস করিয়া জানিতে পারি যে, উক্ত আসামিদ্বয় ফেইসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও আয়েশা (রাঃ) সম্পর্কে বিভিন্ন অবমাননাকর ও মানহানিকর ধর্মীয় উস্কানিমূলক বক্তব্য পোস্ট করিয়াছে। এই সময় ঘটনার বিষয়ে ধৃত আসামিদ্বয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করিলে তাহারা উপস্থিত লোকজনের সামনে নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে ফেসবুকে প্রকাশিত কটূক্তির বিষয় স্বীকার করে।

পাঠক লক্ষ্য করুন, এজাহারে কেমন করে নিষ্পাপ ছেলে দুটোকে ‘আসামি’ এবং যারা হত্যাচেষ্টায় লিপ্ত তাদের ‘উপস্থিত জনসাধারণ’ তকমা প্রদান করে ‘সাধু’ সাব্যস্ত করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা নাকি ফারাবী শফিউর রহমান নামে একজনের ফেসবুক দেওয়ালে গিয়ে ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করা বক্তব্য দিয়েছেন। ঠিক একই ধরনের অভিযোগ উল্লাসের বিরুদ্ধেও।

প্রতিদিন একজন করে মানুষকে ‘নাস্তিক’ প্রমাণ শেষে তাকে হত্যা করার আহবান জানিয়ে ফারাবী আজ ইন্টারনেটের পরিচিত মুখ। ‘অপরাজেয় সংঘ’ নামক জামায়াত-মনস্ক এক সন্ত্রাসী সংগঠনের আড়ালে থেকে ফারাবী গংই রাহী ও উল্লাসের উপর আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে।

নিজেকে কখনও নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘হিজবুত তাহরির’, কখনও ‘শিবিরের’ অনুসারী বলে প্রচার করা ফারাবীর ব্লগে আগমন ঘটেছিল মূলত সহব্লগার মেয়েদের বিরক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। তার প্রথম পোস্টও ছিল অজানা অচেনা মেয়েদের ‘বিয়ে করার অনুরোধ জানিয়ে’। মূলত বিভিন্ন ভুয়া আইডি খুলে ফেসবুক এবং ব্লগে মেয়েদের অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়াই ছিল তার কাজ।

ফেসবুকে আপনারা যারা নিয়মিত, তারা খেয়াল করে দেখবেন, বাংলা ভাষায় ফেসবুকে যে সকল নারীবিদ্বেষী, অশ্লীল, যৌন সুড়সুড়ির পাতা রয়েছে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এরা ইন্টারনেট থেকে নারীদের বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে সেটা তাদের অনুসারীদের সামনে উপস্থাপন করে এবং একই সঙ্গে আরও একটা বিষয়ে তারা সমান কম্পাঙ্কে পোস্ট করে।

কী সেই বিষয়টা? ধর্ম। যেহেতু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ইসলাম, তাই এই অশ্লীল পাতাগুলোর কাছেও ধর্ম বলতে কেবল ইসলাম। ফারাবী যেন এই মানুষগুলোরই প্রতিনিধি। যার একমাত্র কাজ ছিল নারীদের উত্যক্ত করা এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে পোস্ট দেওয়া।

মৌলবাদীদের চাপাতির আঘাতে নিজ বাসার সামনে খুন হওয়া আহমেদ রাজীব হায়দারের জানাজার ইমামকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে গ্রেফতার হয় ফারাবী। জামিনে বের হয়ে আসার পর থেকে নিজেকে শোধরানো তো দূরের কথা, উল্টো ব্যাপক উদ্যমে সে ইসলাম ধর্মকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করে সন্ত্রাস কায়েমের আহবান জানানো শুরু করে।

সিলেট থেকে প্রকাশিত ‘যুক্তি’ পত্রিকার সম্পাদক অনন্ত বিজয় দাশ মুক্তমনায় তার ‘ফারাবীর ফাতরামি’ লেখায় এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন– [৩]

এরপর ফারাবী আবির্ভূত হয় ইসলামের খেদমতগার হিসেবে। হেফাজতকারী হিসেবে। আমাদের এখানে একটা কথা প্রচলিত আছে, এরশাদ যদি আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির রক্ষক হয় তবে এই রাজনীতিকে ধর্ষণ করার জন্য বাহির থেকে কোনো শত্রু আসার প্রয়োজন নেই, তেমন ফারাবীর মতো লুইচ্চা যদি হয়ে যায় ইসলামের খেদমতগার, তবে ইসলামের মুখে চুনকালি মাখাতে কোনো ইসলামবিরোধী, ইসলামবিদ্বেষীর প্রয়োজন নাই।

ইমামকে হত্যার হুমকির অভিযোগে ফারাবীকে আটক করা হলেও সে অস্থায়ী জামিনে জেলহাজত থেকে বের হয়ে আরও বেশি উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ফেসবুকের অসংখ্য ভুয়া আইডি নিয়ে। আল্লাহ ও রাসূলকে– তার ভাষায়– যারা অপমান করে, তাদের হত্যা করা জায়েজ। এই ফতোয়া দিয়ে সে একের পর এক শুভবুদ্ধির লেখক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের হত্যার হুমকি প্রদান শুরু করে।

ফারাবীর ভাষ্যমতে–

ইসলাম অর্থ শান্তি নয়, ইসলাম অর্থ হল আত্মসমর্পণ। ইসলামের ভিতরে জিহাদ, ক্বিতাল সবই আছে। আল্লাহ-রাসূলকে যারা ঠাণ্ডা মাথায় গালিগালাজ করবে আমরা তাদেরকে হত্যা করব এতে লুকোচুরির কিছু নাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও ‘নাস্তিক’ আখ্যায়িত করে তাঁকে গুলি করে হত্যা করার জন্য ফারাবী সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে একাধিক উস্কানিমূলক পোস্ট করেছে।

খুব সম্প্রতি ফারাবীর উস্কানিমূলক আক্রমণের শিকার হন মুক্তমনা’র সম্পাদক এবং খ্যাতনামা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। ফারাবী অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকি দিয়েছে প্রকাশ্যেই। বিডিনিউজে প্রকাশিত ‘জঙ্গিবাদ প্রচারকারীর উস্কানিতে চট্টগ্রামে দুই কিশোর গ্রেপ্তার’ শিরোনামের রিপোর্টে রীতিমতো স্ক্রিনশট উল্লেখ করে ফারাবীর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে-–

অভিজিৎ রায় আমেরিকা থাকে। তাই তাকে এখন হত্যা করা সম্ভব না। তবে সে যখন দেশে আসবে তখন তাকে হত্যা করা হবে।

[৩৯তম মন্তব্য]

যে কোনো দেশের প্রেক্ষাপটেই এ ধরনের হুমকি রাষ্ট্রীয় অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। অথচ দেশের আইনরক্ষকেরা এ ব্যাপারে নির্বিকার। অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকির পর ফারাবী তার বই বিক্রির দায়ে বাংলাদেশের অনলাইন বই কেনার সাইট ‘রকমারি ডটকম’-এর অফিসের ঠিকানা প্রদান করে পোস্ট দেয়। বাংলাদেশে নাস্তিকতা ছড়ানোর অপরাধে সে তার অনুসারীদের রকমারির অফিস আক্রমণের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে স্বত্বাধিকারীর প্রোফাইল উল্লেখ করে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

এরপর বাংলাদেশের শুভবুদ্ধির সব মানুষকে অবাক করে দিয়ে রকমারির স্বত্বাধিকারী মাহমুদুল হাসান সোহাগ তার স্ট্যাটাসে অভিজিৎ রায়সহ অন্যান্য লেখকদের বিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তার বই বিক্রি করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। কিন্তু তারপরও ফারাবী সন্তুষ্ট না হওয়ায় রকমারি ডটকম তার দেওয়া লিস্ট ধরে নিমেষেই সকল বই তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রত্যাহার করে বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক ধরে এই ঘটনার সময় থেকেই আমি রকমারি ডটকমের সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করি, ফারাবীর ভয়ে ভীত হওয়ার বদলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। আমাদের সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে ওরা মৌলবাদী তোষণকেই তাদের নীতি হিসেবে গ্রহণ করে এবং ‘নাস্তিক’দের বই (পড়ুন বিজ্ঞান, যুক্তিবাদী এবং প্রগতিশীল বই) বিক্রি চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

অবশ্য বন্ধ করার আগে নিজেদের মেরুদণ্ডহীনতা ঢাকতে তারা জানিয়ে দেয়, ফারাবীর হুকমির আগে থেকেই তারা এ ধরনের বই সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল এবং সে উদ্যোগের কারণেই এখন বইগুলো চিরতরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অপকর্মের হোতা ফারাবীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেনি।

রকমারির মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চা লাথি খেলেও ঠিকই জিতে যায় ফারাবী এবং নতুন উদ্যমে শুরু করে হত্যা-হুমকি প্রদান।

রকমারির ঘটনা শেষ হতে না হতেই আবারও ফারাবী লাইমলাইটে। বিভিন্ন জায়গায় আত্মঘাতী বোমা হামলার পরে আল-কায়েদা যেভাবে দায় স্বীকার করে বক্তব্য দেয়, ঠিক তেমনিভাবে রাহী ও উল্লাস গ্রেফতার হবার পর ফারাবী তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে জানায়–

আমার এই status এ কাজী রায়হান রাহীর কমেন্ট দ্বারাই আজকে পুলিশ কাজী রায়হান রাহীকে গ্রেফতার করেছে। উম্মুল মুমেনিনদেরকে নিয়ে কাজী রায়হান রাহী এত বাজে বাজে কমেন্ট করেছে যে তাকে কোনো ভদ্রঘরের ছেলে বলা যায় না। … এখন সময় এসেছে যেইসব নাস্তিক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে অশ্লীল কথা বলবে তাদেরকে থাবা বাবার ন্যায় তিলতিল মৃত্যু যন্ত্রণা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যা করা। বাংলাদেশে হয় আমরা মুসলমানরা বেঁচে থাকব, নয় নাস্তিকরা বেঁচে থাকবে।

এজাহারেই অপরাধের উল্লেখ করা হয়েছে। তারা দুজন ইসলাম ধর্ম এবং তার নবীকে কটাক্ষ করেছেন। যদিও যে প্রমাণ সামনে হাজির করা হয়েছে সেটার দিকে তাকালে আমরা দেখি কটাক্ষ নয় বরঞ্চ কিছু মৌলিক প্রশ্নই তারা করেছে। যদিও প্রশ্নগুলো করা হয়েছে সম্পূর্ণ ভুল জায়গায়, ভুল মানুষের কাছে, যারা যুক্তির বদলে মূলত অন্ধবিশ্বাস পুঁজি করে জীবন ধারণ করে।

তাদের প্রশ্ন করলে তারা উত্তরের বদলে সরাসরি প্রশ্নকেই ধামাচাপা দিতে চায়– কখনও সরাসরি হত্যা করে, কখনও-বা হত্যার হুমকি দিয়ে। রাজীবের মতো রাহী আর উল্লাসের অপরাধও তাই। যে সমাজে প্রশ্ন করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, ফারাবীর পা চাটা হয়, সে সমাজে তারা প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখিয়েছে।

পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যার সমালোচনা হয় না। ছাত্রদের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে কোনো ঐতিহাসিক ভয় পান না এই ভেবে যে, চেঙ্গিস খানের সমালোচনা করা যাবে না, পাছে ‘চেঙ্গিসানুভূতি’ আহত হয়! কেউ ইতিহাস চর্চা করতে গিয়ে ভাবেন না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের অত্যাচার কিংবা জাপানি বর্বরতার কথা অথবা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর নৃশংসতার কথা বলা যাবে না। কেউ বলেন না, এতে কারও ইতিহাসানুভূতিতে আঘাত লাগছে, মামলা করে দেবে!

সমালোচনার ব্যাপারটা আরেকটু খোলসা করা যাক। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখব, আওয়ামী লীগ বিএনপির সমালোচনা করছে, বিএনপি আওয়ামী লীগের। আমেরিকায় রিপাবলিকানরা করছে ডেমোক্রেটদের দর্শনের সমালোচনা কিংবা বিরোধিতা, অন্যদিকে ডেমোক্রেটরা রিপাবলিকানদের। সমাজতান্ত্রিক আর পুঁজিবাদী ঘরানার লোকেরা যে যার দৃষ্টিকোণ থেকে পরস্পরের সমালোচনা করছে। সমাজ, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ক্রীড়াতত্ত্ব, প্রযুক্তি-– কোনোটাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

কিন্তু ধর্মের বেলাতেই ধর্মবাদীরা যেন তালগাছটি বগলে নিয়ে বসে থাকার পণ করেছেন। তারা ধর্মের যে কোনো প্রাসঙ্গিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ কিংবা সংশয় চিরতরে নিষিদ্ধ করতে চান। কখনও ধর্মানুভূতির দোহাই দিয়ে, কখনও জনমতের দোহাই দিয়ে, কখনও-বা আবার জনশৃংখলা রক্ষার ধোয়া তুলে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার অপছন্দনীয় বিষয়ের নির্দয় সমালোচনা ধর্মবাদীরা করেন না তা নয়। খুব ভালোভাবেই করেন। ডারউইনের গলার সঙ্গে বাঁদরের দেহ জুড়ে দিয়ে কার্টুন আঁকেন। মেয়েরা তাদের পছন্দসই কাপড়-চোপড় না পরলে ফতোয়া দেন। বিজ্ঞানের বই লেখার জন্য মুরতাদ ঘোষণা করে লেখক, প্রকাশককে হত্যার হুমকি দেন। অথচ ধর্মের বেলায় তারা হাস্যকরভাবে সমস্ত নিয়মের ব্যতিক্রম চান।

যৌক্তিক প্রশ্ন করার জন্য বাংলাদেশকে অস্বীকারকারী শক্তি যেমন রাজীব, উল্লাস, রাহীকে আক্রমণ করেছে, ঠিক তেমনি ‘বাকস্বাধীনতা’ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে রাষ্ট্রও যেন সর্বশক্তি দিয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

আদলতে রাহীর কান্নাভেজা চেহারা দেখে আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। আমার ভাইয়ের কান্না দেখে আমি তাকে সান্ত্বনাও দিতে পারি না। নিস্ফল আক্রোশে আমরা শুধু লিখতে পারি। যে লেখার জন্য মুহূর্তের মধ্যে আমরাও পরিণত হতে পারি মৌলবাদীদের কিংবা পুলিশের হামলা-মামলার শিকার।

সত্যিকারের অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা জরুরি । প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. মো. আনোয়ার হোসেনও বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সম্প্রতি ‘স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দ্রুত ব্যবস্থা নিন’ শিরোনামে বিডিনিউজের মতামত বিশ্লেষণে সময়োপযোগী লেখা লিখেছেন। তিনিও বলেছেন–[৪]

আক্রমণকারী ছাত্রশিবিরের ক্যাডার ও তাদের নেতা ফারাবী শফিউর রহমান। এই ফারাবীর উস্কানিতেই ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্মমভাবে খুন হন ব্লগার রাজীব। এরপর ফারাবী তার ফেইসবুক পেইজে লিখে– ‘যেই ইমাম থাবা বাবার (রাজীবের) জানাজা পড়াবে, সেই ইমামকেও হত্যা করা হবে।’

সে বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ফারাবী গ্রেফতার হয়। কিন্তু কী আশ্চর্য! হাইকোট থেকে জামিন নিয়ে দিব্যি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে সে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার হুমকি দিয়ে লিখে– ‘আমি সেনাবাহিনীকে বলছি, আপনারা আর কতদিন অস্ত্র সাজগোজ করে রাখবেন। আপনাদের কি উচিত না এখন গণভবন আক্রমণ করে ড্রাকুলারূপী শেখ হাসিনার হাত থেকে দেশবাসীকে বাঁচানো।’

বাংলা কমিউনিটি ব্লগ অ্যালায়েন্স থেকে অবিলম্বে দুই কিশোরের মুক্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছি আমরা। একই সঙ্গে নিবর্তনমূলক ৫৭ ধারার অবলুপ্তি চাওয়া হয়েছে [৫]।

এটা দুর্ভাগ্যজনক যে বাংলাদেশের মতো স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে ফারাবীরা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর উল্লাস-রাহীর মতো মুক্তচিন্তার পথিকেরা আটকে থাকে কায়েদখানায়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি অনলাইন মাধ্যমটি ব্যবহার করে শাহবাগ-পরবর্তী সময়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেশ অস্থির করে তুলেছিল, তাদের কিছু প্রিন্ট, অনলাইন মিডিয়া ও ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের শত্রু কারা সেটা তো আমাদের বোঝার আর বাকি নেই। তাদের প্রতিহত না করে কেন নিরপরাধ মানুষদের ‘নাস্তিক’ হবার কারণে হামলা-মামলার স্বীকার হতে হচ্ছে? রাহী, উল্লাস কিংবা রাসেল পারভেজরা তো কোনোদিন কাউকে হত্যা করার হুমকি দেননি, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াননি!

এমন একটি আইন করা কি এতই কঠিন যে আইন এই দুই পক্ষকে আলাদা করতে শিখাবে? মৌলবাদীদের হাত থেকে ব্লগারদের নিরাপত্তা দেবে যে আইন? বাংলাদেশে বসে আজ কেন যেন সে আশা করতেও বুক কাঁপছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতি দাবি ও অনুরোধ থাকবে– রাহী আর উল্লাস নয়, যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের আইনের আওতায় আনুন।

আমরা যারা আজ এই দুই কিশোরকে অপরাধী ভেবে নির্লিপ্ত থাকছি, মনে মনে ফারাবীদের সমর্থন করছি, তারা আশা করি পাদ্রী মার্টিন নেইমলার কথাটাও মাথায় রাখব–

First they came for the communists,
and I didn’t speak out because I wasn’t a communist.
Then they came for the trade unionists,
and I didn’t speak out because I wasn’t a trade unionist.
Then they came for the Jews,
and I didn’t speak out because I wasn’t a Jew.
Then they came for me
and there was no one left to speak out for me.

আবহাওয়া খারাপ বলার জন্য রেডিও জকিদের উপর মামলা-হামলা কতদিন চলবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র:

[১] ব্লাসফেমির কাগজ


http://www.sachalayatan.com/shehab/51901

[২] আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা: ‘আইন কানুন সর্বনেশে!’

http://www.sachalayatan.com/blog/syeed_ahamed

[৩] ফারাবীর ফাতরামি


http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=40189

[৪] স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দ্রুত ব্যবস্থা নিন

http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/16540

[৫] নিবর্তনমূলক ৫৭ ধারার অবলুপ্তিসহ আটক দুই কিশোর ব্লগারের মুক্তি ও নিরাপত্তা চাই

http://nirmanblog.com/admin/9028

রায়হান আবীর: ব্লগার ও পিএইচ-ডি গবেষক।

Responses -- “উল্লাস ও রাহী বৃত্তান্ত: এখনও গেল না আঁধার”

  1. কাজী রায়হান রাহী

    আবীর ভাই, অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের ছেড়ে না যাওয়ার জন্য। বস্তুত কারাগারে এতটা হতাশার মাঝেও যখন শুনতাম অনলাইনে আপনারা আমাদের সঙ্গেই আছেন তখন সাহস পেতাম।

    দেখা হবে বিজয়ে!

    Reply
  2. কাজী রায়হান রাহী

    শুভেচ্ছা রইলো আবীর ভাই। আপনাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নিজদেরকে গর্বিত মনে করছি।

    Reply
  3. তানভীর আলম

    ১। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান কি মৌলবাদী শক্তি ছিল?

    যদি হয়ে থাকে তবে আজ তাদের উত্তরসূরীরা মৌলবাদীদের আক্রমণের মুখে পড়বার কথা না। নয় কি?

    আমার মনে হয়ে মৌলবাদের ধারণা আরও স্পষ্ট করা দরকার। সে সময় তারা আমাদের স্রেফ শোষণের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করেছে, তা যে নাম দিয়েই করুক না কেন। মৌলবাদ সম্পূর্ণ আলাদা ইস্যু। এই সূক্ষ পার্থক্যগুলো আসলে পরিষ্কার থাকা খুব দরকার। না হলে অনুভূতির েো গভীর ব্যাপার নিয়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধতা থেকে যেতে পারে।

    ২। অনুভূতির ব্যাপারটা খুবই দৃষ্টিভঙ্গি-নির্ভর একটা ব্যাপার। কেউ একজন আপনার বন্ধুকে নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করলে আপনি তা হেসে উড়িয়ে দেন, আপনার বাবা-মা কে নিয়ে ওই একই মন্তব্য করলে আপনিই হয়তো মন্তব্যকারীর প্রতি কঠোর হয়ে উঠবেন। অন্য একজন হয়তো এটাকেও হেসে উড়িয়ে দেবে। আবার কেউ মারমুখী হয়ে উঠবে। তখন আপনি মারমুখী ব্যক্তির যতই নিন্দা করুন না কেন– তাকে থামাতে পারবেন না।

    তবে হ্যাঁ, তার এই মারমুখী হয়ে ওঠাটা যদি নিছকই একটা অর্থহীন আবেগতাড়িত বিষয় হয় বা এর সঙ্গে কোনো আত্মকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র স্বার্থ জড়িত থাকে– আপনি বা শাসক তার উপর শক্তি প্রয়োগ করে তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলতে পারবেন। এমনকি সে হয়তো তার নিজের ভুল বুঝতেও পারবে। কিন্তু সে যদি আসলেই সত্যপন্থী হয়ে থাকে– তাহলে সাময়িকভাবে তাকে পরাভূত করলেও-, সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হবে না।

    সত্য কি?

    সেটা নিয়ে এখন আর আলোচনায় না যাই।

    ৩। পরিশেষে বলতে চাই, এখানে আপনি যা বলতে চাচ্ছেন তার সারমর্ম হল– সাধারণ মানুষের অনুভূতি নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যারা বাকস্বাধীনতার কথা বলছেন, তারা যেন আজ কোণঠাসা।

    লক্ষ্য করুন, আজকের পরিস্থিতি যদি ঠিক উলটো হত– একবার ভাবুন তো– যদি এখানকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী হত (আপনার লেখা অনুযায়ী বর্তমান ক্ষমতাসীন ও সাধারণ মানুষ বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়; অন্তত সবক্ষেত্রে নয়) –- আর ধর্মানুভূতি সম্পন্ন লোক সংখ্যালঘু ও কোণঠাসা হত– তবে তারাও কিন্তু আপনার ভাষাতেই কথা বলত। অর্থাৎ তারা অন্যদের জেগে ওঠার আহবান জানাত, কারণ তার জন্য তার বিশ্বাসটা গুরুত্বপূর্ণ। তারাও এ উদ্ধৃতি ব্যবহার করত–
    “এরপর তারা (বাকস্বাধীনতার ধর্মে বিশ্বাসী ও অন্যান্যরা) আমার কাছে এল, কিন্তু আমার পক্ষে কথা বলার মতো কেউ আর ছিল না”।

    এ দুই মতবাদ তো একসঙ্গে ঠিক হতে পারে না। যে কোনো একটা অপরটার উপর জয়ী হবার কথা– সেটা আজ হোক বা কাল হোক। আর ইতিহাস বলে, শেষ পর্যন্ত মিথ্যারই বিলুপ্তি হয় এবং ভিত্তিহীন দর্শন তত্ত্বকথা হিসেবে বই-পুস্তকেই রয়ে যায়, বাস্তব জীবনে ঠাই পায় না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—