Feature Img
ছবি. নাসিরুল ইসলাম
ছবি. নাসিরুল ইসলাম

অক্টোবর ৯, ১৯৬৭। বুলেটে ঝাঁঝরা একজন বিপ্লবীর, বিশ্ববিপ্লবের স্বপ্ন দেখা একজন মানুষের শরীর। বিশ্ববিপ্লব না হোক অন্তত শোষিত, নির্যাতিত দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বিপ্লবের অগ্নিশিখা জ্বেলে সফল মুক্তি সংগ্রামের সূচনা ঘটাতে চেয়েছিলেন এর্নেস্তো চে গেবারা, সংক্ষেপে ‘চে’ যে-নামে বিশ্বের মানবিক চেতনার মানুষ তাকে চেনে, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, তার নির্মম হত্যাকান্ডে অসুর পরাশক্তির প্রতি মানুষের মনে ঘৃণার জোয়ার বয়ে যায়। ‘চে’ হয়ে ওঠেন একটি ‘মিথ’, তরুণদের চোখে আদর্শের ‘আইকন’, যেন এক বিপ্লববাদী যিশু। যে ভাগ্যকে মেনে নেয় না। বরং ভাগ্যকে জয় করতে চায়।

পেরুর লেখক মারিও বার্গাস য়োসা এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর হিসাবে (১৯৯২) ‘পাঁচ মহাদেশের তরুণদের কাছে বিপ্লবী আকাংখার সমার্থক চে এখন প্রায় অধৈক, ভুলে যাওয়া এক ব্যক্তিত্ব যিনি কাউকে আর আগের মতো অনুপ্রেরণা বা উৎসাহ  যোগান না। যার মতাদর্শ বইয়ের পাতার নিচে প্রাণ পড়ে আছে। সেসব বইয়ের আজ আর তেমন পাঠক নেই।’ এমনি অনেক কথাই বলেছেন মারিও। কে জানে এর কতটা মন-জোগানো বুলি! আর কতটা সঠিক।

তবে একথা ঠিক যে একক পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণে পৃথিবী আজ পীড়িত, দুষিত। এখন বিপ্লবের জন্য প্রতিকুল পরিবেশ । বরং রক্ষণশীল ধর্মীয় জঙ্গিবাদের জন্য এখন অনুকুল সময়। সে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির সীমাহীন লোভ। লোভ কর্তৃত্বের এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের, সর্বোপরি প্রভুত্বের। কিন্তু সময় এক ধারায় চলে না, যে বদলায় কখনো চক্রাকারে, কখনো অনিয়মের টানে।

এই বিপরীত স্রোতেও কিন্তু ‘চে’-প্রশস্তি থেমে থাকেনি। এখনো দেশে দেশে ‘চে’র মৃত্যু দিবস  উপলক্ষে ‘চেকে নিয়ে লেখা হয় কবিতা আর স্মৃতিচারণ, বিশেষ করে সমাজ সচেতন তরুণদের দৃপ্ত শপথ দেখা যায় চে গেবারার মতাদর্শের অনুসরনে। প্রতিবিপ্লবী পদকপ্রাপ্তরা যাই বলুন বিশ্বের অস্থির তরুণ সমাজে  ‘চে’ এখনো একটি আদর্শের প্রতীক, বিপ্লবের প্রতীক। তাদের বিশ্বাস চে গেবারার আত্মদান বৃথা যাবে না। বিপ্লব এক সময় ঠিকই মাথা তুলে দাঁড়াবে, এখন সময় যতই দুঃসময় হোক।

এখনো তাই দেখি চে’র ডায়ারিগুলোর পেপার ব্যাক বিশেষ করে ‘বলিভিয়ান ডায়ারি’ ২০০৯ সালেও ছাপা হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে। মার্কিনি প্রকাশকও পিছিয়ে নেই চে বন্দনায়। তারুণ্যের ‘চে’ বন্দনার অন্যতম প্রধান কারণ সম্ভবত সমাজের, রাজনীতির দশা দেখে দেখে তারা হতাশ, অস্থির, তারুণ্যের স্বাভাবিক নিয়মে অস্থির। তাই তারা আঁড়কে ধরতে চায় এমন এক আদর্শ যা তার দেশটাকে বা তাদের গোটা পৃথিবীকে আমুল পালটে দেবে।

ছবি. কু্বার মুদ্রা পেসোতে মুদ্রিত চে'র প্রতিকৃতি
ছবি. ইন্টার্নেট সূত্রে

‘চে’র জীবনাদর্শে তারা এমন কিছুই খুঁজে পায়। দেখতে পায় এমন একজন মানুষকে যে বিপ্লবের নেশায়, পরিবর্তনের আশায় ঘরের নিশ্চিন্ত আরাম ছেড়ে সেই যৌবনকাল থেকে পথে বেরিয়ে পড়েছে, চষে বেড়িয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে। বেরিয়ে পড়েছেন যেখানে বিপ্লবের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা লক্ষ্য করেছেন। বিপ্লবের বাঁশী বাজাতে বাজাতে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনতে ক’জন পারে? পেরেছেন চে গেবারা। বিপ্লবের স্বার্থে জীবনটাকে অবহেলায় ছুঁড়ে দিয়েছেন বিনা আফসোসে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, এ যেন ‘জেনে শুনে বিষপান করা।’

সন্দেহ নেই চে বিপ্লবী, কিন্তু সেই সঙ্গে কবি। নেরুদার ‘ক্যান্টো জেনারেল’ কবিতার ভক্ত পাঠক চে-গেবারা তার চৈতন্যের বিচারে একজন কবি, যদিও কবি হিসাবে তার পরিচিতি নেই। কবি পাবলো নেরুদা ঠিকই বলেছেন ‘তার জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কবিতা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড দিয়ে।’ চে’র জীবনও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কবিতা ও বিপ্লবী কর্মকান্ড দিয়ে। বলা যায়, কবিতা তার ছুটে চলার, তার বিপ্লবী নেশার প্রেরণা। বলিভিয়ার শেষ দিন গুলোতেও তার সঙ্গী নেরুদার ‘ক্যান্টো জেনারেল’ কবিতার বই। ভাবা যায় না।

কবিতা যে তার জীবনের কতটা জুড়ে ছিল তার প্রমাণ মেলে তারুণ্যে, তার পাঠাভ্যাসে। সেখানে মার্কস-এঙ্গেলস, ফ্রয়েড  ছাড়িয়ে কবিতাই প্রধান। আর সে কবিতার মধ্যে সবার সেরা মনে হয়েছে লাতিন আমেরিকার কবিতা। যতটা না লেখা তার চেয়ে অনেক বেশী টান কবিতা পড়ায়, কবিতা আবৃত্তিতে। এই চে গেবারাকে আমরা অপেক্ষাকৃত কম চিনি। ছোট্ট একটি তথ্য।

সময়টা জানুয়ারি ১৭, ১৯৪৭ সাল। কতই বা বয়স তখন এর্নেস্তো চে গেবারার? বয়স বড়ো জোর ১৯ বছর। জন্ম তো তার ১৪ জুন, ১৯২৮। প্রিয় পিতামহীর মৃত্যু নিছক উপলক্ষ্য মাত্র। ভেতরের আবেগই বেরিয়ে আসে কবিতার পঙক্তি হয়ে। লেখেন একটি গদ্য কবিতা।

It is my destiny: to day I must die!

But  no, will-power can overcome everything—

The bullets, what can the bullets do to me if

my destiny is to die by drowning.

But I am going to overcome destiny.—

Die, yes, but riddled with

bullets, destroyed by bayonets, it not, no…

a memory more lasting than my name

Is to fight, to die fighting.

সেই উনিশ বছর বয়সে যখন বিপ্লবের স্বপ্ন তার মাথায় জেগে ওঠেনি তখনই এর্নেস্তো দেখছেন তার বুলেটে ঝাঁঝরা দেহ, বেয়নেটে ক্ষতবিক্ষত দেহ। তিনি কি ভবিষ্যতকে দেখতে পেয়েছিলেন? বলিভিয়ার অখ্যাত গ্রামে বুলেটে-ঝাঁঝরা তার দেহ?  নিজ মৃত্যু নিয়ে লেখা পংক্তিগুলো শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং মনে করিয়ে দেয় স্পেনীয় কবি গারথিয়া লোরকার নিজ মৃত্যু নিয়ে লেখা কবিতা। দুয়ে আশ্চর্য মিল! দুটোই অদ্ভূতভাবে সত্য হয়ে ওঠে তাদের জীবনে, তাদের যেন ভবিষ্যতদ্রষ্টার মর্যাদায় পৌঁছে দেয়। হ্যাঁ, সত্য তার কাব্যপংক্তি। লড়াইয়ের মধ্যেই তার মৃত্যু।

হয়তো তখন থেকেই মনোভূমিতে কবিতার চাষাবাদ শুরু হয় যা চাষাবাদেই রেখে দেন এর্নেস্তো চে গেবারার । সম্পন্ন ফসল ফলানোর চেষ্টা করেননি। সময়-সুযোগ মেলেনি। কারণ তার আগেই প্রবল আরেক নেশা রাজনীতির পাঠ এবং সে ধারাবাহিকতায় মার্কস এঙ্গেলস-লেনিন মাও পাঠ তার জীবন চৈতন্য বদলে দিতে থাকে। দক্ষিণ আমেরিকাকে জানা তার জন্য  এক বিশ্বাসীর বাইবেল-পাঠের মত বিষয় হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক চেতনার অ্যাডভেঞ্জারিজম তাকে পেয়ে বসে। শিক্ষা শেষ হতে তখনো বছর খানেক বাকি, বেরিয়ে পড়েন তার চৈতন্যের স্বদেশ লাতিন আমেরিকার অন্তরবাহির খুঁটিয়ে দেখতে। এবং দেখেনও।

দেখে দেখে শুধু হতাশাই বাড়ে। বাড়ে ইয়াংকি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি ঘৃণা, এবং ক্রমশ বাড়তেই থাকে যা তার জীবনের জন্য ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ায়।
চে গবেষক কেউ কেউ তাকে চিহ্নিত করেছেন ‘বোহেমিয়ান’ রূপে। বোহেমিয়ান শব্দটি সাধারণত যে অর্থে ব্যবহৃত হয় চে সে অর্থে বোহেমিয়ান নন। তার অ্যাডভেঞ্জার বা যাবাবর মানসিকতা বিশেষ উদ্দেশ্য-নির্ভর। তার ডায়রি, তথ্য, বহুখ্যাত নোটসগুলো পড়লে তা বোঝা যায়। ঠিকই বোঝা যায় তার ভ্রমণ উদ্দেশ্যহীন নয়। লাতিন আমেরিকাকে জানা বোঝা, সেখানে শোষণের কারণ ও উৎস বুঝে নেওয়া ছিল তার উদ্দেশ্য। তার ভ্রমণ তাই ফলপ্রসু। আর এই বোঝার কারণেই এর্নেস্তো চে গেবারা হতে পেরেছেন এর্নেস্তো চে গেবারা । মনে প্রাণে একজন খাঁটি বিপ্লবী।

তার আত্মপরিচয়ের দিনলিপি তার ডায়রি বা নোটখাতা। এগুলোতে ধরা আছে এর্নেস্তোর ‘চে’ হয়ে ওঠার ইতিকথা। এবং চে গেবারা নামক মানুষটির আদ্যন্ত স্বরূপ-তার ভাবনা, তার স্বপ্ন, তার ভুলক্রটি সবই রয়েছে ডায়ারিগুলোতে। হয়তো তাই এগুলো এত পাঠকপ্রিয়। আশ্চর্য, তার প্রথম নোটবইটি ১৬৫ পৃষ্ঠার। পরে দশ বছরে লিখেছেন আরো ৭টি নোটবই। এগুলোতে রয়েছে তার জীবন, তার আকাক্সক্ষা, তার প্রিয় বিষয়-আশয়, সর্বোপরি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ অর্থাৎ কবি চে গেবারা ।

One Response -- “কবি-বিপ্লবী চে’র মৃত্যু নেই”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—