Feature Img

সম্প্রতি যুবলীগের এক ইফতার পার্টিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ের একটি বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এবং অন্য কেউ কেউ তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও এটি একটি ব্যাপক আলাচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

২৩ জুলাই, ২০১৩ রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যুবলীগ আয়োজিত ইফতার-পূর্ব আলোচনাসভায় তিনি বলেন, “আমার কাছে তথ্য আছে আওয়ামী লীগ আগামীবার আবার ক্ষমতায় আসবে। বিএনপির মিথ্যা প্রচার মোকাবেলা করতেই হবে।”

আগামী ছয় মাস তরুণ ভোটারদের কাছে বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসন, দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরারও আহ্বান জানান জয়।

এ বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় তোলার মতো কোনো সারবত্তা আছে বলে আমাদের মনে হয় না। এটি একটি সাধারণ রাজনৈতিক বিবৃতি মাত্র। যে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে নিশ্চিত জয়ের কথা খুব জোর দিয়েই বলে থকে। এটা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে একটি অতিপরিচিত কৌশল মাত্র।

মাত্র মাস খানেকের মধ্যেই একযোগে দেশের চারটি সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন হয়ে গেল। আলোচিত এ্ নির্বাচনে সকল দলের প্রার্থীরাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘নির্বাচনে আমিই জয়ী হব’। প্রতিটি কর্পোরেশনে জয়ী একজনই হয়েছেন। কিন্তু আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সবাই। এটা তো দোষের কিছুই নয়।

তাছাড়া এ ধরনের বক্তব্য তো বিএনপির নেতানেত্রীরা হরমহামেশাই দিয়ে আসছেন। আগামী সাধারণ নির্বাচনের এখনও মাস ছয়েক বাকি আছে। কিন্তু নির্বাচনি কৌশল হিসেবে বিএনপির নেতানেত্রীরা ইতোমধ্যেই নানা পর্যায়ে বলেছেন যে, আগামী নির্বাচনে তাদের দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। এমনকি তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা এ কথাও বলেছেন যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমন অবস্থা হবে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালাতেও পথ পাবেন না!

এগুলো যদি ষড়যন্ত্রের অংশ না হয়ে থাকে, কারচুপির পরিকল্পনা না হয়, তাহলে জয়ের এ্ বক্তব্য নিয়ে এতটা হৈচৈ এবং এর মধ্যে কারচুপি বা ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজতে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? এটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয় মোটেই। কোনো যুক্তিতেই আমরা জয়ের ওই বক্তব্য নিয়ে অতটা শোরগোলের কোনো কারণ দেখি না।

বিগত চারটি সিটি কর্পোরেশনে একযোগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেছে। এরপর গাজীপুরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। এসব কারণে দেশে একটা গুঞ্জন আছে যে, আওয়ামী লীগ আগামী সাধারণ নির্বাচনে ভালো করতে পারবে না।

এই ধারণার কিছুটা প্রভাব আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের ওপর কিছুটা পড়তে পারে। এটা খুব স্বাভাবিক। সে অবস্থায় আওয়ামী লীগে একজন নির্বাচন কৌশলবিদ হিসেবে পার্টির মরাল বুস্ট আপ করার জন্যও সজিব ওয়াজেদ জয় ওই বক্তব্যটি দিয়ে থাকতে পারেন। তাছাড়া তিনি নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত আছেন। সে জন্যই তার কাছে জরিপভিত্তিক তথ্য থাকতে পারে।

এই দুই বিবেচনার যে কোনো দিক থেকেই জয় এ কথা বলে থাকুন না কেন, একে রাজনৈতিক এবং নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ কোনো লোকই ষড়যন্ত্র বা কারচুপির বিষয় হিসেবে দেখবেন–এটা হতে পারে না। নিতান্তই যুক্তি ও বিচারবিবেচনাহীন ব্যক্তিরা এটা বলে থাকতে পারেন। অথবা এমনও হতে পারে নির্বাচনের পরিবেশ আরও জটিল করার জন্যই কিছু রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এসব কথা বলছেন বলে আমাদের মনে হয়।

এর সঙ্গে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটি লক্ষ্য থাকতে পারে। জনগণকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশলও হতে পারে এটা।

প্রসঙ্গক্রমে আমার একটি কথা মনে পড়ল। খুব বেশিদিন আগের কথা নয় সেটা্। বিএনপির নির্বাচনি মুখপাত্র শামসুজ্জামান দুদু তারেকের দুর্নীতির সমালোচনা করা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের উদ্দেশে বলেন, ‘‘সাবধান, তারেক রহমান ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী। তার সম্পর্কে এসব কথা বলবেন না।’’

তাহলে এখন প্রশ্ন ওঠে, বিএনপি কি ধরেই নিযেছে যে, আগামী নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় যাবে? তারা কি নিশ্চিত যে তখন তাদের প্রধানমন্ত্রী হবেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান?

বিএনপি নেতারা যদি এতটাই নিশ্চিত হয়ে থাকেন, ভোটের আগেই যদি তারা জেনে গিয়ে থাকেন যে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান দেশের ‘ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী’— সেটা কি কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের অংশ নয়?

তা যদি না হয়— সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্রকে ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণাতেও যদি কোনো ষড়যন্ত্র না থাকে— তাহলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের নির্বাচনি আশাবাদ নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করে ফায়দা লোটার কৌশল খুব একটা কাজ দেবে বলে মনে হয় না।

শামসুজ্জামান খানমহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

Responses -- “জয়ের বক্তব্য: ষড়যন্ত্র না রাজনৈতিক আশাবাদ”

  1. সৈয়দ আলি

    জনাব শামসুজ্জামান খান বাংলা ভাষায় সুপণ্ডিত। তাই তার রচনার ভাষা বিশ্লেষণ করা আমার জন্য মহাবেয়াদবি হবে। তবে আমি মহামান্য দুই যুবরাজ জয় ও তারেককে নিয়ে নিশ্চয়ই কিছু আলোচনা করার অধিকার রাখি; বিশেষত যখন দুজনেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সম্ভাবিত। আমি আনন্দিত যে কটা চুল-নীল আঁখি-রক্তিম মুখবর্ণের কেউ শিগগিরই গদিনশিন হচ্ছেন না।

    জনাব খান, মহামান্য জয়ের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের সুনিশ্চিত ‘খবর’ আছে বলে কথিত বক্তব্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, বিএনপির নেতা দুদুর দেওয়া বক্তব্যে তারেককে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী সম্ভাষণ করাকে তুল্য মনে করেছেন (বেয়াদবি না নিলে বলি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির নেতার বক্তব্য একই পাল্লায় মাপা কি ঠিক হল)। অবশ্য তিনি জানাননি যে দুদু ভবিষ্যৎ বলতে ঠিক আগামী নির্বাচনকেই ‘মিন’ করেছেন কি না। তাই এই দুই বক্তব্য তুল্য কি না তা আমার চেয়ে জ্ঞানী-গুণীরাই ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

    আর আমি তো জনাব শামসুজ্জামান খানের ভাষা ব্যবহারের প্রশ্ন তোলার যোগ্যতাই রাখি না। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, মহামান্য জয় যা বলেছেন তাকে ‘ডিফেন্ড’ করার জন্য মহামান্য যুবরাজের মাতাকে রাজনৈতিক মাঠে নামতে হল কেন? মহামান্যা মাতৃদেবী অবশ্য ‘অগা’ জনগণকে জানিয়েছেন যে মহামান্য যুবরাজ জয় একটি জরিপ চালিয়ে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত জয়ের উপাত্ত পেয়েছেন।

    এর আগে এই আওয়ামী লীগই যত জরিপ চালিয়েছিল, তার ‘খবর’ সাংবাদিকেরা মিডিয়ায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। এবারের জরিপের সুলুক-সন্ধানও সাংবাদিকেরা জানেননি। সোনার দেশ আমেরিকার গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষমতা ও সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের যোগ্যতা দেখে আমরা ধন্য ধন্য করছি।

    দেশের ভূমি স্পর্শ করার চারদিনের মাথায় মহামান্য যুবরাজের জরিপকর্ম চালিয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ক্ষমতা দেখে আমরা আম-জনতা অভিভূত হয়েছি। এখন ভাবছি, এই অভিভূতরূপ প্রকাশের জন্য হাততালি দেওয়া বেয়াদবি হয়ে যায় কি না। তাই অনুমতির অপেক্ষায় আছি। অন্য মহামান্য যুবরাজ বা তার চামচেরা কী বয়ান করেন তা শোনার জন্য একই সঙ্গে অপেক্ষায় আছি।

    অলমিতি বিস্তরেণ।

    Reply
  2. ashikur rahman

    ‘আমরা জিতব’ এ ধরনের আশাবাদ সব প্রার্থীকে প্রকাশ করতে হয়– তা না হলে মাঠে থাকেন কীভাবে? সাধারণ ভোটারদের আস্থা জাগিয়ে রাখতে আশাবাদের বিকল্প আছে কি?

    Reply
  3. শরিফ

    “এ বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় তোলার মতো কোনো সারবত্তা আছে বলে আমাদের মনে হয় না। এটি একটি সাধারণ রাজনৈতিক বিবৃতি মাত্র। যে কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে নিশ্চিত জয়ের কথা খুব জোর দিয়েই বলে থকে। এটা বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে একটি অতিপরিচিত কৌশল মাত্র।”

    এর মানে লেখক স্বীকার করেছন যে জয়ের কথা ডাহা মিথ্যা?

    Reply
  4. SHAHID

    বিএনপি বললে লীলাখেলা আর আ্ওয়ামী লীগ বললে চোর-বদমাশ– বিষয়টা ঠিক এমনই।

    শামসুজ্জামান খান সাহেবের লেখাটি ধন্যবাদের সঙ্গে গ্রহণ করছি।

    Reply
  5. আ হ ম ফয়সল

    সাম্প্রতিক টক অব দ্য কান্ট্রি– জয়ের বক্তব্য। আপনার লেখায়, বিএনপির শামসুজ্জামান দুদুর বক্তব্য ‘‘সাবধান, তারেক রহমান ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’’ বিষয়টি উঠে আসায় ধন্যবাদ। অপরপক্ষে ‘‘রাজনীতির মাঠ গরম করে ফায়দা লোটার কৌশল খুব একটা কাজ দেবে বলে মনে হয় না’’– যে মতামত ব্যক্ত করেছেন তা ভালো লেগেছে।

    সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশটি যেন ৫ বছরের জন্য একটি রাজনৈতিক দলের কাছে ইজারা দিয়ে দেওয়া হয়। ইজারা নিয়ে যে যার মতো করেই দেশ চালাবেন, কথা বলবেন। আমরা এ ধরনের অসম্প্রীতির রাজনীতি থেকে মুক্তি চাই।

    Reply
  6. ড. মিল্টন বিশ্বাস

    শামসুজ্জামান খান অসাধারণ একটি লেখা দিয়েছেন। তাঁর মতামত ও যুক্তিগুলো অকাট্য। তিনি বিএনপি-জামাতের নীল নকশা, নাশকতা ও ভোটচুরি সম্পর্কে স্পষ্ট কথা বলেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। তাঁর মতো যুক্তিবাদী লেখকের বড্ড বেশি দরকার এ মুহূর্তে।

    Reply
    • ফরহাদ হোসেন

      ধন্যবাদ শামসুজ্জামান খান সাহেব। আপনার লেখাটি খুবই অসাধারণ। বিএনপি-জামাতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও তাদের নানা রকম অরাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি অকাট্য সত্য কথা।

      লেখাটির জন্য আবারও ধন্যবাদ।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—