Feature Img

পরিচয়পত্র হাতে মৃত এক পোষাকশ্রমিক
পরিচয়পত্র হাতে মৃত এক পোষাকশ্রমিক
একটি ফটোগ্রাফ। ইট-বালু-সিমেন্ট-রডের গুঁড়োর ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে শুধু একটি মুখ। আর পুরো শরীরই ডেবরিসের তলায়। তবে ডেবরিসের উপর দৃশ্যমান আছে শরীরের আরও একটু অংশ; একটা হাতের কবজি আর আঙুলে ফিতা দিয়ে পেঁচানো আইডি কার্ড।

বয়স কত হবে ফটোগ্রাফের মানুষটির? মুখ দেখে বোঝা যায়, ছেলেটির বয়স কোনোক্রমেই আঠারোর বেশি নয়। নিতান্ত কিশোর। আঙুলে এমনভাবে প্যাঁচ দিয়ে সে তার আইডেন্টিটি কার্ড বেঁধে রেখেছিল যেন শরীর-মুখ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও প্রিয়জন-পরিজন তাকে চিনে নিতে পারে।

অস্তিত্ববাদের দার্শনিক কিয়ের্কেগাদের তত্ত্ব তার জানা নেই সেটা ধরে নিয়ে বলব- অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার এ ব্যাপকতাগ্রাসী আতঙ্ক মানুষের সাধারণ ইন্সটিংক্ট, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নিও-ক্যাপিটালিজম, নিও-লিবারালাইজেশনের সমাজ-অর্থনৈতিকতার বাস্তবতায়। কিন্তু ওই ফটোগ্রাফের কিশোর আঙুলে যতগুলো প্যাঁচ দিয়ে পরিচয়পত্র আটকে রেখেছে, তা তার সাম্প্রতিক বাস্তবতার রিফ্লেকশন নয় কি? অস্তিত্বময় থেকে তাদের হঠাৎ অস্তিত্বহীন করে ফেলার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটি পোর্ট্রেইট।

প্রিয় নারী ও পুরুষ পাঠক, সাভারের নয়তলা রানা প্লাজা যখন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে ক্লাব স্যান্ডউইচের মতো ল্যাপ্টাল্যাপ্টি খেয়ে গেল- মালিক সোহেল রানা তার অস্তিত্বরক্ষার জন্যই প্রভাবশালী ‘হস্ত’ স্থানীয় সাংসদ মুরাদ জংয়ের সহায়তায় পালিয়ে গেল। কিন্তু শ্রমিকদের তো কোনো প্রভাবশালী হস্ত, পদ, মস্তক কোথাও থাকে না- তাই তাদেরই নাম-পরিচয়-ঠিকানাহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি।

গার্মেন্টসের ভয়াবহ সব সিরিয়াল দুর্ঘটনা শ্রমিকদের মগজে এ কোড পাঠিয়ে দিয়েছে যে, ‘‘তুমি হয়ে পড়তে পার বেওয়ারিশ, আঞ্জুমানে মফিদুলের গাড়ি এসে তোমাকে সাঁই সাঁই করে নিয়ে গিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দিবে। আর তোমার পরিবার-পরিজন সারাজীবন অপেক্ষা ও হাহাকারের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবে!’’

বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোরের ফটো গ্যালারিতে যখন কিশোরটির মুখ ও আঙুলে বাঁধা আইডি কার্ডের ফটোগ্রাফটা দেখছিলাম, আরও অনেকের মতো আমার মনেও একটি প্রশ্ন জাগছিল- মৃত্যুর কতটা কাছাকাছি গিয়ে বা কোন পর্যায়ে তার সচেতনতা তাকে একমাত্র এ বার্তাই দিয়েছিল যে, শক্ত করে বেঁধে রাখ তোমার পরিচয়পত্র; এ শহরে, এ দেশে খুব সহজেই, স্থায়ী নাম-পরিচয়-ঠিকানাওয়ালা জীবিত মানুষেরা গার্মেন্টেসে ভয়াবহ আগুন বা সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনির হাতে মরে হয়ে যায় ‘বেওয়ারিশ’ লাশ। লাশকাটা ঘর থেকে শুরু করে নদীতে ভেসে ওঠা বেওয়ারিশ লাশ- কত কত ঘটে যাচ্ছে আমাদের যাপনে-উদযাপনে।

গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, উদ্ধারকর্মীরা নিখোঁজের যে তালিকা তৈরি করেছেন, তাতে উঠে এসেছে ৬৫৯ জনের নাম। যে ৩০৬ লাশ পাওয়া গেছে, তার মধ্যে অর্ধশতের নাম-পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। এরা কোথায়? ঠিক ৫ মাস আগে, সেটাও ছিল ২৪ তারিখ, নভেম্বরের ২৪, সেদিন তাজরীন গার্মেন্টসের আগুনে পুড়ে ছাই-কয়লা হয়ে যাওয়া ৫২ লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানরা। এসবই তো ‘বেওয়ারিশ’ হয়ে পড়ার আতঙ্কের মনোভূমি।

ন্যাশনাল আইডি কার্ড এবং ভোটার আইডি কার্ড নামে একটা মহাযজ্ঞের ডাটাবেজ ব্যাপক ঘোষণা দিয়ে করা হয়েছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়টায়; এবং তা নিয়মিত আপডেট করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নাম-পরিচয়হীন লাশ অথবা নিখোঁজ ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটা কাজে দিয়েছে কি? অথচ ভারতে ও নেপালে এ ডাটাবেজ নিখোঁজদের খুঁজে বের করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

গার্মেন্টস শ্রমিকরাই তো মালিকদের বিত্তবান বানাচ্ছেন, ঝনঝনে মুদ্রা তাদের পকেটে ভরিয়ে দিয়ে। মালিকদের যে সংগঠন বিজিএমইএ, সেখানে কি সব শ্রমিকের নাম-পরিচয়-ঠিকানা বা তালিকা আছে? নিশ্চিতভাবেই নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক চাপা পড়ে মরে গেছেন, যাচ্ছেন অথবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন- ওইসব প্রতিষ্ঠানের মালিক কি শ্র্রমিকদের তথ্য সরবরাহ করতে পারে না? তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে কত তথ্যই তো কতদিকে পাওয়া যাচ্ছে। অথচ সর্বাধিক বিদেশি মুদ্রা অর্জনের কারিগর শ্র্রমিকদের তথ্য কোথাও ঠিকঠাক নেই!

কেন নেই? ওরা গরিব। সাবঅল্টার্ন। অস্ত্র ঠেকায় না। দুর্নীতি করতে পারে না। ভোট দেওয়াকে নাগরিক অধিকার মনে করে ভোটের বাক্সে একটা ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দিয়ে আসে। বিশ্বাস করে রাজনৈতিক নেতাদের। যত বয়স্কই হোক না কেন, তবু ওরা সবসময় ‘ছোট’। আর পঁচিশ থেকে পঁচাত্তর সব বয়সী শ্রমিককেই লাঠির ভয় দেখিয়ে রানা প্লাজার মতো মৃত্যুকূপে ঢুকিয়ে দিতে পারে মালিকরা। হরতাল-হরতাল খেলায়। কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি দেখানোর কাজে সহজেই ব্যবহার করা যায় ওদের। এভাবেই যেন ওরা সুমন চট্টোপাধ্যায় ওরফে কবির সুমনের গানের এসেন্স নিয়ে হাজির হয়: ‘বাহবা সাবাস বড়দের দল এই তো চাই/ ছোটরা খেলবে, আসুন আমরা বোমা বানাই’।

বিশ্বজোড়া খবর হওয়া এ ঘটনায়, এখানে লাক্ষ্ণৌতে বিভিন্ন দেশের বন্ধুরা চরম বিস্ময় নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, ‘ওটা কি আসলে শপিং মল ছিল, নাকি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি? কত বছরের পুরনো ভবন? মাত্র তিন বছর?’ কম্বোডিয়ার ভোনন চিন বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘ইটস অল অ্যাবাউট মিসম্যানেজমেন্ট আ্যান্ড করাপশন’।

savar-pic-2704

পাঠক, আমরা আমাদের কমনসেন্স দিয়েই বুঝি, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে শেকড়-বাকড়, ডালপালা নিয়ে দুর্নীতি কতখানি ছড়িয়ে পড়লে এমন নৃশংসতার সাক্ষী হতে হয় আমাদের। যে কনস্ট্রাকশন ফার্ম কাজ করেছে, যে সাপ্লাইয়ার সরবরাহ করেছে ইট-বালি-রড-সিমেন্ট, কেউ এর বাইরে নয়। এটি একটি সমন্বিত ‘প্রযোজনা’, প্রতিটি সেক্টরের দুর্নীতির ফলে সংঘটিত নৃশংসতম দুর্ঘটনা-আখ্যান। সিস্টেমেটিক ও আর্থিক, দু’ধরনের দুর্নীতিই এখানে ঘটেছে- প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে।

আর একে জায়েয করার ‘জিহাদ’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, যিনি বাজারে ভবনধসের জন্য ‘নাড়াচাড়া’ ও ‘ঝাঁকুনি-তত্ব’ হাজির করেছেন। তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে যা শিখেছেন- কেবল বিএনপি আর জামায়াতকে (জনগণের রাজনৈতিক দল হওয়ার সামান্যতম যোগ্যতাও যেগুলোর নেই) সবছিুর জন্য দায়ী করা- যেটি তার বয়সের ভার ও সত্যিকারের রাজনীতিক হয়ে উঠতে না পারার অক্ষমতা- সেটি এরমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

ওখানে আসলে কত শ্রমিক ছিল, তার নির্দিষ্ট তথ্য নেই। যদি পাঁচ হাজার বা সাড়ে তিন হাজার (দুটো সংখ্যাই সম্ভাব্য হিসেবে গণমাধ্যমে এসেছে) হয়, সেখানে একই বিপর্যয়ে বাঁচার চেষ্টা করা বা মরে যাওয়ার সময় প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গল্প তৈরি হয়েছে। বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোরের ‘আমার মুক্তির কথা পত্রিকায় দেন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি থেকে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করা এক নারী, কবিতা যার নাম, তার গল্পটি শেয়ার করতে চাই।

৪৮ ঘন্টা পর উদ্ধার পেয়ে কবিতা জানাচ্ছেন: ‘‘রক্ত গড়িয়ে আমার পিঠ ভিজে ওঠে। পানি মনে করে মুখে দিতেই রক্তের গন্ধ পাই। পরে হাত দিয়ে আমার ব্যাগের পানির বোতল বের করি। অর্ধেক বোতল পানি ছিল। ওই পানি মুখে দিতে গেলেই পাশে চাপাপড়া আরেক ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে কেড়ে নিতে চান। না দিলে খামচে শরীরের জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলেন। হাতের চামড়া তুলে রক্তাক্ত করে ফেলেন।’’

প্রিয় পাঠক, মানুষের তৈরি ভয়াবহ দুর্যোগ ও নৃশংসতার নতুন নতুন ফেনোমেনা তৈরি হচ্ছে, আর আমরা আ্যকটিভলি-প্যাসিভলি সে অভিজ্ঞতা নিচ্ছি!

স্টিল ফটোগ্রাফগুলোর মাধ্যমে যে ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন দেখি: ইট-বালি-সুড়কির স্তুপে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা নারী, যার এক হাতের ভেতর দিয়ে একটি রড ঢুকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে রেখেছে; নুপুর-পরা একটি পা, শরীরটা স্তুপের তলায় আটকাপড়া; মৃত এক নারীর উপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা এক পুরুষ; শুধু একটি হাত; ফর্মাল প্যান্টের সঙ্গে ফর্মাল সু-পরা একটি পা; একলা ঝুলে থাকা একটি আইডি কার্ড; সে কিশোর, যে হাতের আঙুলে আইডি কার্ড পেঁচিয়ে মরে গিয়েও ঘোষণা দেয়, ‘তবু আমারে দেব না ভুলিতে’।

এসব দেখতে দেখতেই মনে পড়ছে, ‘কেউ কি দেখেছ মৃত্যু এমন’, বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘চাকা’। যখন বাস্তবতা আরও নৃশংস, মৃত্যু ও বেঁচে থাকার লড়াই আরও অভূতপূর্ব মর্মান্তিকতা নিয়ে হাজির হয়, তখন এসব আসলে সফিস্টিকেটেড প্রেজেন্টেশন।

খেয়াল করুন প্রিয় নারী ও পুরুষ পাঠক, তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লাগার পর উদ্ধারের যন্ত্রপাতির অভাবে যত মানুষ পুড়ে ছাই হল, সেই গা-ভারি হয়ে যাওয়া ভয়াবহতা ছাড়িয়ে গেল রানা প্লাজার ভবনধস। এত মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণটাও পুরনো- উদ্ধারের যন্ত্রপাতির অভাব্। নিকট ভবিষ্যতে এ অভাব হয়তো আরও ভয়ঙ্করতা নিয়ে হাজির হতে পারে। শুধু বিশেষণ যোগ হবে ‘ভয়াবহতম’ দুর্ঘটনা।

আর তখনও নাম-পরিচয়-গোত্রহীন হয়ে পড়ার শূন্যতার আতঙ্ক থেকে যাবে। আমরা তো এর মধ্যেই বুঝে গিয়েছি, আমাদের কোনো পার্টি নেই। এখনকার কোনো পার্টিই আমাদের নয়, তাহারা শুধু তাহাদেরই।

তাহাদের অস্তিত্বশূন্য বা বেওয়ারিশ করে দেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদেরই, কারণ দেশটা আমাদের, আর সংখ্যায় আমরাই বেশি।

শামীমা বিনতে রহমান : লেখক ও সাংবাদিক। ভারতের লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।

Responses -- “একটি অস্তিত্ববাদী ফটোগ্রাফ এবং অস্তিত্বহীনের বাস্তবতা”

  1. মোঃ শাহজালাল

    সবকিছু দেখেশুনে শুধু একটি কথাই মনে হচ্ছিল, তা হল বাংলাদেশ আসলে গরীবের জন্য নয়। এটা বড়লোক, পিশাচ, শয়তান, খুনি আর ধ্বংসের রাজনীতি যারা করেন তাদের দেশ। এখানে তারাই বাস করবে যারা অন্যর রক্ত নিয়ে টাকা কামানোর স্বপ্ন দেখে, আর সুযোগ পেলে মানুষকে মাতৃহারা-পিতৃহারা-সন্তানহারা, স্বামী/স্ত্রী হারা করে দেয়। এসব দেখে মনে হয় আমরা বাংলাদেশিরা ভালো নই।

    কী লিখব, কার কথা লিখব, কাকে নিয়ে মন্তব্য করব যারা জীবন দিয়ে রক্তের কালি দিয়ে লিখে গেল বিশাল এক গল্প। যে গল্পের শেষ নেই। আমার চিন্তা ও চেতনার বাইরে চলে যাওয়া এ গল্প নিযে আমি আর কী বলব।

    Reply
  2. S. Alam

    আঁতাত, আপোস, দুর্নীতি কী নেই আমাদের সমাজে। সবকিছুর লক্ষ্য আমাদের কথিত সাবঅলটার্ন কিংবা গরিব মানুষ। তারা কিনা এখন আর আমাদের, মানে কথিত লেখাপড়া-জানাদের ভাষা বোঝে না। ভোগ, যাপন, উদযাপনে তাদের সঙ্গে আমাদের বিস্তর ব্যবধানে। আমরা কথিত শিক্ষিত লোকজন, যারা অচলায়তনের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছি, আমরাও কিনা আবার অন্যায্য এ ব্যবস্থার তৈরি। অনেক টাকাকড়ি খরচ করে কারখানায় আমাদের মতো লোকজন তৈরি করে অন্য এক বাস্তবতা, আবেগ, আকাঙ্খা, দুঃখ, হাসি এসব উৎপাদন করে চলেছে। যার সঙ্গে মানুষের প্রজাতি সত্ত্বার কোনো মিল নেই।

    জনাব নিটশে কিনা বলেন, রাষ্ট্রের অবসান না হলে মানুষের শুরুই হবে না। শামীমাকে ধন্যবাদ তার লেখাটির জন্য।

    Reply
  3. বিপ্লব রহমান

    [“খেয়াল করুন প্রিয় নারী ও পুরুষ পাঠক, তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লাগার পর উদ্ধারের যন্ত্রপাতির অভাবে যত মানুষ পুড়ে ছাই হল, সেই গা-ভারি হয়ে যাওয়া ভয়াবহতা ছাড়িয়ে গেল রানা প্লাজার ভবনধস। এত মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণটাও পুরনো- উদ্ধারের যন্ত্রপাতির অভাব্।”]

    নোটটিতে মানবিক আবগের কমতির সমান্তরালে রয়েছে অহেতুক বিষোদগার, ত্রুটিপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ। যান্ত্রিক বস্তবাদ তথা তসলিমাজাত উগ্র নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পাঠগতিকে বারবার হোঁচট খাওয়ায়।

    নির্বাচন কমিশন কখনওই ‘ভোটার আইডি কার্ড’ তৈরি করেনি; তারা তৈরি করেছে ছবিসহ ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র।

    তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লাগার পর ‘উদ্ধারের যন্ত্রপাতির অভাবে’ মানুষ মারা যায়নি; জরুরি নির্গমন সিঁড়ি না থাকা, গেটে তালাবদ্ধ করে রাখা ও ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মাণের কারণেই তাজরীনে শতাধিক প্রাণের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে– যা আসলে নিছকই হত্যাকাণ্ড।

    অন্যদিকে ফাঁটল দেখা দেওয়ার পরও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে জোর করে কাজে যোগ দেওয়ায় বাধ্য করার জেরে ভবন ধসে রানা প্লাজায় প্রাণহানি ঘটেছে। এটিও আরেকটি হত্যাকাণ্ড।

    কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞাতার অভাবে চলতি নোটে অদ্ভুত কায়দায় চেষ্টা করা হয়েছে, ওই দুই ঘটনাকেই ‘উদ্ধারের যন্ত্রপাতির অভাব্’ বলে চালানোর!

    লক্ষ্যনীয়, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর ‘৭২ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার ২৯ জনকে’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, ‘সাভারে ভবন ধসের ৮০ ঘণ্টা পরও ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষের সন্ধান মিলেছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে জীবিত আরো মানুষ আটকে থাকতে পারে বলে উদ্ধারকর্মীদের ধারণা, সেজন্য ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্ধার অভিযান এখনি চালানো হচ্ছে না।’

    পাঠক, নিছক পাঠকই, লিঙ্গ ভেদজ্ঞানে বারবার ‘নারী ও পুরুষ পাঠক’ সম্বোধন চেয়ারের পা’গুলোর আব্রু রক্ষায় মোজা পরানোর মতো হাস্যকর, শ্রুতিকটু, অপরিপক্কতার নির্দেশক; এবং আগেই যেমন বলা হয়েছে, সংকটটি দর্শনজাত, এমনকি দৃষ্টিভঙ্গীরও।

    এছাড়া পুরো নোটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘হাওয়াই’ তত্ত্বের সমালোচনা করা হলেও, রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে রেহাই দিতে তার নাম সাভার যুবলীগের তালিকায় নেই বলে সংসদ অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য, সরকার দলীয় সাংসদ মুরাদ জং-এর সঙ্গে ভবন মালিকের গভীর সখ্য, বিজিএমই-এর যোগসাজসে ও সরকার পক্ষের উদাসীনতায় এ পর্যন্ত দোষী গার্মেন্ট মালিক একজনেরও শাস্তি না হওয়া ইত্যাদি বিষয় এতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে পুরোপুরি।

    যেখানে খোদ ইউরোপেই সাভার ট্র্যাজিডি নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ হচ্ছে, সেখানে এ দেশের জাতীয় আয়ে অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পোশাক শ্রমিকদের জানমাল ও কাজের নিরাপত্তা, কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ, নূন্যতম বেতন-মজুরি, উপযুক্ত বাসস্থান, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার ইত্যাদি মৌলিক মানবিক অধিকারের শর্তসমূহ পুরোপুরি উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়সমূহ চলতি নোটে বিস্ময়করভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।

    গুরুতর বিষয়ে গুরুতর লেখনি আবশ্যক।

    Reply
    • জুয়েল তাজিম

      জনাব বিপ্লব রহমান,

      আপনাকে ধন্যবাদ। উপরের লেখাটির কিছু অংশ পড়ে বাকিটা পড়তে পারিনি। কারণ কোনো লেখক সাধারণ পাঠকদের “প্রিয় নারী ও পুরুষ পাঠক” এভাবে লিঙ্গভেদ করে সম্বোধন করতে পারেন না। আপনার মন্তব্য দেখার পর পুরো লেখাটি পড়ে দেখি যা আপনার এ সমালোচনার মাধ্যমে পরিপূর্ণতা পেল।

      আবারও ধন্যবাদ আপনাকে।

      Reply
  4. HOROLAL ROY SAGAR

    লেখাটি পড়ে মনে হল যেন আমারই লেখা। আমার মতো অতিসাধারণ মানুষেরই মনের কথা। শামীমা, আপনাকে অ-নে-ক ধন্যবাদ লেখাটির জন্য। আমিও আপনার কাতারের একজন। ঘটনাস্থলে যেতে পারিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছুটেছি। এখানে হতাহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও ছবি দেখে রীতিমত আঁৎকে ওঠে প্রাণ। বুক শুকিয়ে যায়। কত নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, বীভৎসতা। আর এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর নির্লজ্জতা, বেহায়াপনা। ধিক! সোহেল রানাকে ধরিয়ে দিন, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না- স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রীর এ আহবানে ছি ছি ছি দেওয়া ছাড়া কী করার আছে?

    রানা তাদের দলের লোক, তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল তাদেরই লোক তৌহিদ জং। আর রানাকে খুঁজছেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী! রানাদের কোনোদিনই পাবেন না, যেমন বিগত দিনে পাননি বড় বড় দুর্ঘটনার হোতাদের। কারণ একটাই, তাদের টাকা আছে। এরকমের ঘটনায় একটি পক্ষ আর্থিকভাবে লাভবান হয়। টাকাই তো সব! যেমন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যারহস্য আটকে আছে এ টাকায়।

    হে ভগবান, তোমার কাছে করজোড়ে প্রার্থনা, উনাদের মতো রাষ্ট্র ও দেশ পরিচালনাকারীদের কাড়ি কাড়ি টাকা কামাইয়ের পথ হাজির-নাজির করে দাও। আর আমরা উনাদের মরে মরে শুধুই ভোট দিয়ে যাই।

    Reply
  5. অনি আলমগীর

    শামীমা আপা,

    আপনার লেখাটা খুবই ভালো লাগল। হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

    কিন্তু যাদের হৃদয় আসলে ছোঁয়া দরকার, সেসব গার্মেন্টস মালিকের হৃদয়ে কি সামান্য দ্বিধা দেখা দেবে?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—