শাহবাগের আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল বলা চলে শুধুমাত্র একটি দাবির উপর ভিত্তি করে, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই! কিন্তু কী করে কী করে সেটা এক্কেবারে শেকড় ধরে টান দিয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে বাংলার বুকে লেপ্টে থাকা, বিশ্বের দিকে দিকে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিকে আছড়ে এনে ফেলল নিজেদের বিবেকের কাছে! শুধু বিবেকবানদের কথা বলছি কেন, কু-বিবেকবানদের উপরও পরিষ্কার আলো ফেলতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধটি ইতোমধ্যে জয়ের মুখ দেখে ফেলেছে!

এক কাদের মোল্লার ফাঁসি হোক বা না হোক, ফাঁসির প্রয়োজনীয়তা যখন লাখ লাখ বাঙালির কাছে স্বীকৃত হয়ে গেল, যুদ্ধজয়ের আর বাকি কী থাকে তখন? কাদের মোল্লার নিজেরই কি গলায় দড়ি পরতে ইচ্ছে করে না তাতে! এত ঘৃণার বাষ্পে জীবন্মৃত বেঁচে থাকারই বা কী মানে!

তরুণরা বলে দিল, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার উপর তাদের এতটুকু আস্থা নেই; আজ কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন তো কাল কাদের মোল্লার বেকসুর খালাস এ দেশে সম্ভব। এ দেশে গোলাম আযম, কাদের মোল্লরা চল্লিশ বছর বেয়াদবি করে গেছে, এ দেশে সব সম্ভব! শাহবাগের তরুণরা তর্জনী তুলে দেখিয়ে দিল, ‘ওই দেখো, মুক্তিযুদ্ধের ক্রিম-খাওয়া হায়েনারা ওখানে বসে চোস্ত বাংলায় বক্তৃতা-বমি করেছে এতকাল!’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মুলা-ঝুলানো রাজনৈতিক দলগুলোর অকার্যকারিতা আর কে এমন করে দেখাতে পারে শাহবাদের তরুণরা ছাড়া? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার দলটির রংচটা জামা আর তা থেকে যে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে, যা তাদের আত্মার সঙ্গে মিলে গেছে বলে তাদের নজরে পড়ছে না; সে জামার গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে গেল শাহবাগের তরুণরা।

গাঁয়ের যে বৃদ্ধ, শহরের যে রিক্সাওয়ালা মুক্তিযোদ্ধা কোনোদিন সুশীলদের (!) ভিড়ে মুখ খুলতে পারেনি, তাদের গলা মেলানোর বাতাস এনে দিল শাহবাগের মোড়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফেরি করে করে বেড়ানো লোকগুলোর গালে যে সশব্দ চড় মেরে দিল শাহবাগ চত্ত্বর, সে শব্দ সাত-সমুদ্দুর তেরো নদীর ওপারের টরন্টোতে বসে আমি শুনতে পেলাম! শাহবাগ চত্বর এখন একটি ইনস্ট্রুমেন্টের নাম, যা ছোঁয়ানো মাত্র জেনে যাওয়া যেতে পারে, জামায়াতিদের প্রাণের দোসররা কেমন পেখম মেলে, ময়ূরপুচ্ছ ধারণ করে কোণে কোণে ঘাপটি মেরে আছে।

শাহবাগ আন্দোলন পরিষ্কার জানিয়ে দিল যে, লম্বা-জামা টুপি মাথায় দেওয়া মানেই জামায়াত-শিবির নয়, ধার্মিক মুসলিমও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জ্বল বাঙালি হয়। আবার কোট-টাই-পারফিউমমাখা শেয়ালও কেমন বিজ্ঞাপন করে! শাহবাগ ক্রিস্টাল ক্লিয়ার করে দিল যে, আমাদের কিছু পরিচিত আর বন্ধু-বান্ধবের মুখ যেখানে বেদনার প্রবল ঘনঘটা বয়ে যাচ্ছে ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে, ভদ্রতার তুমুল মুখোশেও কোনোমতে বেদনার সে জল তারা ঢেকে রাখতে পারছে না, অথচ দিব্যি তো তাল দিয়ে দিয়ে প্রগতির ফেনা তুলেছে গত চল্লিশটি বছর ধরে! আজ কেন তারা আর তাল সামলাতে পারল না? আজ কেন তাদের লাল চোখ আর ফোঁস ফোঁস দেখে ফেললাম? এত আলো তবে ছড়াতে পারল শাহবাগ চত্বর? কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের তলায় নয়, নিজের বিবেকের জবাবদিহিতা যাচাই করতে এগিয়ে আসা একক তরুণরা, লক্ষ তরুণরা যে প্রশ্ন তুলে দিল, তার চাবুকে দূরে-কাছে কে-কে বিদ্ধ নয়!

ব্লগার রাজীব খুন হয়েছেন এর জের ধরে। বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় তা। শুরু হয়ে গেছে চোরাগুপ্তা হামলা। জানি না আর কাকে কাকে বলি হতে হয় কণ্ঠস্বর আর চিন্তাশক্তি মুক্ত রাখার অপরাধে, নিজের মগজ বিক্রি না করে দেওয়ার অপরাধে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ যেমন একটি চেতনার নাম, ‘জামায়াত’ও তেমনি একটি চেতনার নাম। হত্যা, গুম, খুন আর জবাইয়ের নাম জামায়াত। যারা সরাসরি জামায়াত করে, তাদের কথা বলছি না- বলছি তাদের কথা, যারা গোপনে জামায়াতের সুরভিতে সুরভিত তাদের কথা। রাজীবের খুনে এসব প্রগতিশীলদের আত্মা খানিকটা তৃপ্ত হয়েছে যারা গত দু’সপ্তাহ ধরে ভাজা ভাজা হচ্ছিলেন শাহবাগের স্ফূলিঙ্গে!

জলজ্যান্ত মানুষকে জবাই করে ফেলার ঘটনায় অবশ্য তাদের মানবিকতা তেমন জেগে উঠতে দেখা যায় না, যেমন জেগে ওঠে কাদের মোল্লার ফাঁসির কথা উঠলে। তারা মুখে ফেনা তুলে ফেললেন, চোখের জলের নদী বানিয়ে ফেললেন বাংলাদেশের সব সমস্যার জন্য কাঁদতে কাঁদতে! কেন শাহবাগের ছেলেরা অমুক হত্যা, তমুক অ্যাকসিডেন্ট, দারিদ্র্য ইত্যাদি নিয়ে আন্দোলনে এল না? তাদের কাছে জানতে চাই, ‘আচ্ছা, আপনাদের কেমন কঠিন হৃদয়, শুধু বাংলাদেশের সমস্যার কথাই ভাবলেন, সারা পৃথিবীর সমস্যা নিয়েই শাহবাগের তরুণদের যুদ্ধ করার দরকার ছিল। পৃথিবীও ছোট হয়ে যায়, গ্রহ-নক্ষত্রের সমস্যা নিয়ে তাদের সমাবেশ করা দরকার ছিল। ছিল না কি?’ দেশে-বিদেশে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে এসব অন্ধকারের আততায়ীদের পক্ষে। ডলার খরচা-করনেওয়ালাদের চোখও যে বিস্ফারিত হচ্ছে শাহবাগের প্রাণের ঢল দেখে, সে কথা চোখ বুঁজে কি বলে দেওয়া যায় না?

আর কোন জয়ের আশা করেন শাহবাগ চত্বরের কাছ থেকে যখন আইনের দীর্ঘ সংসদীয় প্রক্রিয়া সংক্ষেপিত হয়ে যায়, যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তার সমর্থন ঘোষণা করেন সংসদ থেকে, যখন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের দীর্ঘ পোস্টার নতুন করে শোভা পায় হাজার মানুষের মাথার উপরে, যখন ঘোমটা-টানা গৃহবধু চত্বরে এসে বলেন, “আর ঘরে থাকতে পারলাম না”! আর কোন জয় আশা করা যায় শাহবাগের কাছ থেকে যখন ‘চৌকস সাইবার বাগ্মী’রা ভাষা হারিয়ে ‘হাইবারনেশনে’ যায় আর আমরা প্রবলভাবে তা টের পাই! এ কথা বলতে আমি অবশ্যই দ্ব্যর্থহীন, নতুন প্রজন্মের সাইবার যোদ্ধাদের নৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছে! যে কথা বলতে ভীরু ঠোঁট এতকাল কেঁপেছে আমাদের, সে কথা টর্ণেডোর মতো করে জানান দিয়ে গেছে শাহবাগ চত্ত্বর!

সেরীন ফেরদৌস‘নতুন দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক

Responses -- “শাহবাগের তরুণরা যে কথা বলে দিয়ে গেল”

  1. Rasha

    একটা মেয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে রাত তিনটা সময় রাস্তা দিয়ে একা একা হেঁটে গেলেও আপনার বা আর কারও কোন অধিকার জন্মায় না তাকে ধর্ষণ করার। এই সহজ কথাটা যখন পর্যন্ত না বুঝবেন তখন পর্যন্ত ইনিয়েবিনিয়ে ধর্ষণকে জাস্টিফাই করেই যাবেন।
    ধর্ষণ ধর্ষণই। মারাত্মক অপরাধ। তা সে আপনি সেক্স ওয়ার্কারের সাথে করুন বা রাত তিনটায় ঘোরা কোন মেয়ের সাথে বা নিজের স্ত্রীর সাথেই করুন না কেন, একে বৈধতা দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
    #কথাশেষ

    Reply
  2. বিপ্লব রহমান

    সেরীনকে ধন্যবাদ চমৎকার বিশ্লেষণের জন্য।

    আপনি যথার্থই বলেছেন যে, শাহবাগের তারুণ্যের আন্দোলন প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার গালে একটি চপেটাঘাত, এমনকি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও। কারণ এ গণজাগরণ বুঝিয়ে দিয়েছে যে, এদেশের বিচার ব্যবস্থা কতটা ফাঁপা ও জনবিচ্ছিন্ন। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও তাই। একই সঙ্গে আগামীদিনের নেতৃত্ব তরুণ প্রজন্ম যে সব রাজনৈতিক দলকে দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম— সেটি খুব মোটা দাগেই স্পষ্ট।

    তবে আপনার বিশ্লেষণে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো একেবারেই উপেক্ষা করা হয়েছে, তা হচ্ছে, আন্দোলনটি ক্রমেই ‘আর কোনো দাবি নাই, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’— এ একদফা থেকে ছয়দফায় পরিণত হওয়া, এর আত্নঘাতী উগ্র জাতীয়তাবাদী চরিত্র এবং এর বিপরীতে একাত্তরের মতোই ধর্মীয় উস্কানিতে মৌলবাদী আস্ফালন।

    এছাড়া শুরু থেকেই গণজাগরণের আন্দোলনটি সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদী দর্শনে পরিচালিত হচ্ছে; এ কারণে আন্দোলনটিতে ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার আদিবাসীরা সেভাবে মিশে যেতে পারছেন না [‘তুমি কে? আমি কে? বাঙালি!বাঙালি!’, গণজাগরণের শ্লোগান]। আদিবাসীর এই মর্মবেদনার কথা লেখাটিতে একেবারেই প্রকাশ পায়নি। বরং চলতি লেখাটিতে সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়বাদী দর্শন সমর্থন করা হয়েছে!

    ভাবনাটিকে উস্কে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। চলুক।

    Reply
  3. Sazzad Ali

    লেখাটি পড়ে ভালো লেগেছে, সময়োপযোগী তো বটেই। অনেক দিন পরে আপনার লেখা পেলাম। আমাদের সবার মনের কথাটিই যেন আপনার কলমে, ধন্যবাদ।

    Reply
  4. abdus sobhan baschu

    সেরীন, অনেক দিন পর আপনার একটি চমৎকার লেখা পড়লাম। পড়লাম কেন বলছি, যেন নিজের কানে আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। কঠিন কথাগুলো কত সহজ করে বলা যায় এবং তাতে যে কথার গুরুত্ব কমে যায় না তা আপনার কাছে শেখা যায়। ধন্যবাদ।

    Reply
  5. এরশাদ মজুমদার

    ধন্যবাদ প্রিয় সেরীন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মুল্যবান একটি লেখার জন্যে।

    শুরুতেই বলে রাখা দরকার যে, আমি সেক্যুলার বা ধর্মহীন মানুষ নই। তাই বলে আমি মৌলবাদীও নই। একাত্তরে আমার বয়স ছিল ৩১। মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি খুব কাছ থেকে। যারা বাংলাদেশের ভিতরে ছিলেন তাদের সংখ্যা ছিল ৬৫ মিলিয়ন। ভারতে বা পশ্চিম গিয়েছিলেন প্রায় ১০ মিলিয়ন। নয় মিলিয়ন গিয়েছিলেন প্রাণ বাঁচানোর জন্যে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় দুই লাখ তরুণ, কৃষক শ্রমিক, পুলিশ, বিডিআর ও সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈনিক। আর কিছু কবি লেখক গায়ক,গীতিকার ও সাংবাদিক মিডিয়াতে কাজ করেছেন। রাজনীতিকরা সবকিছুর সমন্বয় করেছেন। রাজনীতিকদের বেশিরভাগই মোটামুটি স্বচ্ছন্দ্যে ছিলেন। ভারতে যারা ছিলেন তাদের কারও প্রাণের ভয় ছিল না।

    মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র নিয়ে ফ্রন্টে যুদ্ধ করেছেন, তাদের পঁচানব্বই ভাগ ছিলেন মুসলমান। ৩০ লাখ লোক প্রাণ দিয়েছেন, তাদের পঁচানব্বই ভাগই ছিলেন দেশের ভিতরে। এরাও ছিলেন মুসলমান। এটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। এদের নব্বই ভাগই ধর্মপ্রাণ। দশভাগ মানুষ মুসলমান হলেও নিজেদের সেক্যুলার ভাবতে ভালবাসেন। বাংলাদেশে ধর্মহীন দশ হাজার লোকও নেই।

    আমার মনে এদেশে সেক্যুলারিজম একটা ফ্যাশন। একেই আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতা বলে মনে করা হয়। ইদানিং কিছু লোক প্রচার করছেন যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে ধর্মহীনতা, সামাজিক ঐতিহ্য অস্বীকার করা, বাপ-দাদার ইতিহাস ভুলে যাওয়া বা অস্বীকার করা ইত্যাদি।

    বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারির ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান।’ তাঁর আত্মজীবনী পড়লেই বোঝা যাবে যে, তিনি মুসলমানের অধিকারের জন্যে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন।

    আর এখন শুনতে পাচ্ছি তিনি শুধুই বাঙালি ছিলেন!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—