২০১৬ সালে জাপানের নাগোয়ায় জি-সেভেন আউটরিচ বৈঠকের ফাঁকে আলাপচারিতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে না পারলে কি হতো তা ভাবলেও শিউরে উঠি। তখনকার সময়ে আমরা যুবক হিসেবে রাজপথে থেকেছি। আমাদের অজানা নয় এ কী হয়েছিল আর কী বা হতে পারতো! বাংলাদেশ যে একটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক রাষ্ট্র সে কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম আমরা। জেনারেল জিয়াউর রহমানের কৌশল ও চাতুরি আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চক্রান্ত শেষ না হতেই দেশ শাসনে এসেছিলেন সামরিক জেনারেল এরশাদ। প্রয়াত এই জেনারেল ছিলেন ধুরন্ধর। তার আমলের আগেও আওয়ামী লীগ ছিল বটে তবে তা খাতা কলমে। আমি নত মস্তকে স্বীকার করি সে সব নেতাদের অবদান যারা দু:সময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরে ছিলেন। তারা না থাকলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কখন কীভাবে হতো বলা মুশকিল। কিন্তু তাদের সাধ্য ছিল না আওয়ামী লীগের ভাঙ্গন রোধ করেন।  আওয়ামী লীগ, বাকশাল, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও দেওয়ান ফরিদ গাজীর আওয়ামী লীগ মিলে অনেকধারা তখন।

সে ধারাগুলো নদী যেমন সাগরে মেশে তেমনি বিলীন হয়ে গেল আওয়ামী লীগে। কোন আওয়ামী লীগে? শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ যে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং তার কন্যার হাতে নিরাপদ এটা বোঝার পরপরই মানুষ মন-প্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সে দলের পেছনে। একদিকে বিএনপি ও তখনকার মুসলিম লীগার আর রাজাকারদের দৌরাত্ম্য, আরেকদিকে এরশাদের কূটকৌশল। সে সময় আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীলদের শোচনীয় বাস্তবতায় ফিরলেন নেত্রী শেখ হাসিনা। কেমন ছিল সেদিন?

রাজনীতির মতোই প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। ১৯৮১ সালের সেই দিনটি ছিল রোববার। ঠিক এবছরের মতোই! ছিল কালবৈশাখীর হাওয়া, বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। গ্রাম-গঞ্জ-শহর-নগর-বন্দর থেকে অধিকারবঞ্চিত মুক্তিপাগল জনতা ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়, তাদের একমাত্র আশার প্রদীপ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনাকে বরণ করতে। মুষলধারার বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে তারা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল ‘নেত্রী’ কখন আসবেন এ প্রতীক্ষায়। অবশেষে বিকাল ৪টায় কুর্মিটোলা বিমানবন্দর দিয়ে জনসমুদ্রের জোয়ারে এসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি। তাকে এক নজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত রাস্তাগুলো রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্রে।

পর্যায়ক্রমে দেশ শাসনে আসা আওয়ামী লীগের পেছনে তার অবদান পাহাড়ের মতো অটল। তিনি না ফিরলে এদেশে স্বাধীনতার ঘাতক দালালদের বিচার ও শাস্তি ছিল দিবাস্বপ্নের মতো। জাহানারা ইমামের গণ-আদালতের ধারাবাহিকতা্য় শাহবাগের জন্ম হলেও সে কাজ ছিল কঠিন। শেখ হাসিনা আমেরিকার জন কেরির ফোন তুচ্ছ করে নানা দেশের নেতাদের অন্যায় অনুরোধ পাত্তা না দিয়ে পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে এ দেশ ও ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন। জাতির পিতার হত্যা ও ১৫ অগাস্টের বিভীষিকাময় কলঙ্কের বিচার করে মুক্তি দিয়েছেন আমাদের। দেশ ও জাতির বুকের ওপর বসে থাকা সেসব পাথর আর কেউ সরাতে পারতো না।

শেখ হাসিনার শাসনভার গ্রহণ কোন সহজ কাজ ছিল না। আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানুষ এখনো পাকিস্তানের স্বপ্নে বিভোর। এরা সংখ্যায় যাই হোক ষড়যন্ত্রে পটু। তাদের ছিল টাকা, মধ্যপ্রাচ্যের লবিং, ছিল পাকিস্তানের মদদ। আজও সে চক্রান্ত চলমান। সম্প্রতি আল জাজিরার প্রতিবেদনে যুক্তি ও প্রমাণহীনতায় মূলত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধাচারণ ছিল আসল বিষয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস বিরোধী শক্তি কতোটা ভয়ানক। শেখ হাসিনার শক্তি , দেশ শাসন পোক্ত হওয়ার পরও  এরা বেপরোয়া। বলাবাহুল্য বিলেতে এক ঘাঁটি আছে যেখান থেকে শেখ হাসিনা ও প্রগতি বিরোধী অভিযান আর ষড়যন্ত্র চালানো হয় । সে ঘাঁটি সবার জানা। বিএনপি জনগণের ভেতর এখনো তার আসন টিকিয়ে রেখেছে। সরকারের দূর্বলতা আর নানবিধ কেলেঙ্কারী আর্থিক ও সামাজিক অপঘটনায় তাদের জন্য সহানুভূতি জাগলেও মানুষ বুঝতে পারে তারা পারবে না। কারণ তাদের সে ধরনের সাংগঠনিক শক্তি নাই। তারা তাদের শীর্ষ নেতা একাধিকবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেই কারামুক্ত করতে পারেনি। পারেনি দেশব্যাপী কোন আন্দোলন বা জনমত গড়ে তুলতে। এদের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার কারণ কিন্তু দুর্বল নেতৃত্ব। সে জায়গায় নিজেদের ঘর ঠিক না করে তারা ভর করে আছে বিলেতের ওপর। সে ভরসার আরেক নাম ভুল।  

শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলায় হত্যা করতে ব্যর্থ সে অপরাজনীতি আজও তার পেছনে লেগে আছে। তারা জানে তিনি যতদিন ততদিনই নিরাপদ থাকবে বাংলাদেশ। 

আমি একথা বলি না তার সরকারের আমলে সমাজে সাম্য বা ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বরং এমন এমন সব কেলেঙ্কারী আর আর্থিক দুর্নীতির খবর আসে যাতে মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। তাদের মনে হাজারো প্রশ্ন , লুটপাট রিজার্ভ উধাওসহ আর্থিক কেলেঙ্কারী কোনও জবাব মেলেনি এখনো। উত্তর মেলেনি হত্যাকাণ্ডগুলোর। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সবাই জানেন শেখ হাসিনা আছেন বলেই সমাজ এখনো সচল। দেশ নিরাপদ। তিনি না থাকলে এদেশের প্রগতিশীলতা মূলত এতিম। এই নির্ভরতা একদিকে যেমন জাতিকে নির্ভার রেখেছে অন্যদিকে আছে ভয়। তাকে আমরা দীর্ঘসময় চাই সাথে এটাও চাই তিনি থাকতে থাকতেই যেন দেশ পেয়ে যায় বিকল্প নির্ভরতার কোন জায়গা। 

এখন তার শাসন আমলের চতুর্থবারে তিনি অনেক বেশি পরিণত। তার নেতৃত্বহীন দেশ ও সরকার ভাবাও অসম্ভব। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুফলে আজ উন্নয়নের রথে বাংলাদেশ। এমনকি কঠিন করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময়েও বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। এখন তার কাছে প্রত্যাশা আগামী নেতৃত্ব। যা তার প্রত্যাবর্তনের পর পাওয়া আশা ও সম্ভাবনাকে আরো ফলবতী করবে। আমরা তার কাছে এটাই আশা করি। জনগণের প্রত্যাশা গণতন্ত্র ও সামাজিক সাম্য আর অসাম্প্রদায়িকতার এক সুবর্ণ স্বদেশ। শেখ হাসিনা দেশ ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আজ সমাদৃত। একসময় আমাদের নেতারা যে কোন সম্মেলন বা আন্তর্জাতিক ফোরামে ছিলেন দ্বাদশতম খেলোয়াড়। সবার সাথে দাঁড়িয়ে ফ্রেমবন্দি ছবিতে থাকার বাইরে আর কোন কাজ ছিল না তাদের। শেখ হাসিনা সে দৃশ্য পাল্টে দিয়েছেন। তাকে জার্মান চ্যান্সেলর থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, চীনের প্রধানমন্ত্রী থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী- সবাই গুরুত্ব দেন, দিতে বাধ্য হন। কারণ তিনি দেশ ও দেশের ইমেজ নিয়ে গেছেন সে পর্যায়ে। তবু একদল মানুষ তা পছন্দ করে না। দেশে দেশের বাইরে সমানে ষড়যন্ত্র করছে তারা। কোন লাভ হয় নি। আশাকরি ভবিষ্যতেও তাদের ষড়যন্ত্র কোন কাজে আসবে না। বাংলা বাঙালির মনের মানুষ শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা। তার কাছেই নিরাপদ স্বদেশ ও বাঙালির ভবিষ্যত। 

সিডনি

১৬/০৫/২১

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

One Response -- “কেবল ফ্রেমবন্দি ছবি হয়ে থাকার নেতা নন শেখ হাসিনা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—