রোজার ঈদকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকায় সেমাই তৈরির পর শুকিয়ে নিচ্ছেন কারিগররা। ছবি: সুমন বাবু

পিতলের সেমাইকলের সময়টায়  আমাদের  শৈশবকাল কেটেছে, সেমাই ছাড়া  আমরা ঈদুল ফিতর কল্পনা করতে পারিনি! এখনো সেমাই ছাড়া বাঙালি মুসলমানের ঈদুল ফিতর অসম্পূর্ণ থেকে যায়। 

ঈদুল ফিতরের আরেক নাম রোজার ঈদ হলেও বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে এ ঈদ ‘সেমাইয়ের ঈদ’ নামেও বেশ পরিচিত। ঈদের দিন অতিথি আপ্যায়ন সেমাই ছাড়া একেবারে চলে না! সেমাইয়ের সঙ্গে ঈদুল ফিতরের সম্পর্কটা কীভাবে ও কখন তৈরি হলো এ ভূখণ্ডে, তার আমূল ইতিহাস পাওয়াটা বেশ মুশকিল। 

আমাদেরও তো বয়স কম হলো না, সেই পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের সময় যে ঈদ আমাদের সময়ে ছিল, তা ছিল আমাদের শৈশবের ঈদ, অল্পকিছু ইচ্ছে পূরণ করেও, সেই সময়ে ঈদে আমরা আনন্দে মেতে উঠতাম। ঈদে এত পোশাক-আশাকের প্রচলন তখন ছিল না,  এতটা আয়োজনও তখন সামাজিকভাবে বিস্তৃত হয়নি, এখন যেমনটা হয়েছে। 

যাই হোক, আমাদের শৈশবের ঈদ আর এখনকার প্রজন্মের ঈদ উদযাপনের মধ্যে সময় ও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। 

সেমাইকলের হাতল ঘোরানোর কাজটি আমরাই করতাম- কি আনন্দে! যদিও শ্রমসাধ্য ছিল তা, তবু ছোটদের ওপর এ-দায়িত্ব এসে পড়তো, আমাদের কাছে কাজটি নিরানন্দ ছিল না- ঈদের আগেই এক ধরনের উৎসবের আমেজ আমরা অনুভব করতাম। বাসার উঠানে, বাসার বাইরে ফাঁকা জায়গায় সেমাই তৈরির আসর বসে যেত। আনন্দের বিদ্যুৎ নিয়ে যেন আমরা একেকজন বাল্ব হয়ে জ্বলে উঠতাম, পাড়ার এ-ঘরে ও-ঘরে; যদিও তখন বিদ্যুৎ পৌঁছেনি পাড়ার সকল ঘরে ঘরে। আমি বলছি মফস্বল শহরের কথা। হ্যারিকেনের আলোই ছিল রাত্রিতে  ভরসা।

পাড়ার প্রত্যেক ঘরে ঘরে ছিল না তখন সেমাইকল, দু-চারটি ছিল মাত্র- কিন্তু ঈদের আগেই, পাড়ার সকল পরিবারের প্রয়োজনে এক এক করে সেসব সেমাইকল পৌঁছে যেত, হাতে হাতে ঘুরতো; ও-গুলোর ব্যক্তিগত মালিকানা থাকলেও- তা হয়ে উঠেছিল সমষ্টির ও পাড়া-মহল্লার। পিতলের সেমাইকল চেয়ার অথবা টেবিলে নাটবল্টু দিয়ে আটকে রেখে আমরা সেমাই তৈরিতে মেতে উঠতাম, সেমাই তৈরির পর, তা রোদে শুকিয়ে মা-ভাই-বোন মিলে ভাণ্ড নিয়ে তাতে ভরে তুলতাম, শুধু ভাণ্ড ভরতো না- সেইসাথে আমাদের মনের ভাণ্ড কি এক খুশির জলে ভরে যেত, এমন কি তা উপচে পড়তো। সেই জল বেড়ে যেন হয়ে যেত সমুদ্রদয়িতা।

ঈদের আনন্দে,  নানা রকম লোভনীয় খাবারের সঙ্গে, সেমাইয়ের অনুপস্থিতি কল্পনা করিনি কোনোদিন, আজও সেমাইয়ের কদর রয়েছে ঘরে ঘরে। ঘরে বানানো সেমাই, শিশু-কিশোরের হাত-ছোঁয়ানো সেমাই, আমরা এখন কমই ব্যবহার করি, আমরা এখন সবাই বাজারমুখী, আমাদের দেশের প্রায় সবখানে এখন মেশিনে তৈরি সেমাই প্যাকেটজাত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঈদে সেমাই অপরিহার্য হলেও আমাদের শৈশবকালে, মফঃস্বল শহরে প্যাকেটজাত সেমাই এতটা সহজলভ্য ছিল না। বাজারের সেমাই এখন আমরা ঘরে তুলি- রান্না করি। হাতে তৈরি সেমাইয়ের বদলে এখন লাচ্ছা সেমাই, ঘিয়ে ভাজা সেমাই, খোরমা সেমাই, খোচা সেমাই। এ বয়সে এসে দেখি, বাজারে কত রকমের সেমাই! 

ভাগ হয়ে যাওয়া বহু রকমের সেমাইয়ের মত ঈদের আনন্দ ভাগ হয়ে যায়- হতদরিদ্রের ঈদ এক ধরনের, ধনী লোকের ঈদ আর এক ধরনের। যে শিশুটি বস্তিতে বা ফুটপাতে ঘুমিয়ে ভাঙ্গারি টোকায়, তার ঈদ এক ধরনের, অভিজাত এলাকায় ধনী শিশুটির ঈদ আর এক ধরনের। চরের শিশুটি ঈদের দিনে ডাংগুলি খেলে চরের ধুলোয়, শহরের শিশুটি ঈদের দিনে ইচ্ছেমত যেকোনও রাইডে ওঠে খেলা করে শিশুপার্কে। শহুরে শিশুরা উৎসবের দিনটি সাজায় কতভাবে! আগে থেকেই চলে এর প্রস্তুতি। নানা সাজে নিজেকে তারা সাজায়। বন্ধুদের নিয়ে উৎসব ও আনন্দে মাতে। খাবার টেবিলে থাকে নানা স্বাদের রকমারি খাবার। অনেকেই ঘুরে বেড়ায় বাবা-মার সাথে।

চাঁদ দেখা ও খানিক সেমাই মুখে দেওয়ার মত  ঈদের আনন্দ নিয়ে দেশের অনেক অঞ্চলের অনেক লোকের ঈদ-উৎসবের দিনটি সাধারণত কেটে যায়। দারিদ্রের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে প্রতিটি দিন যাদের কেটে যায়, তাদের কাছে বছরের অন্য দিনের মত ঈদ উৎসবের বিশেষ দিনটিও একইরকম। বছরের অন্য দিনের মত ঈদের দিনেও কেউ কেউ শ্রম দেয় গেরস্থালি কাজে, হাটে-বাজারে, নদীতে মাছ ধরে, মুরগি-গরুর খামারে।

ঘরের ভাঙা বেড়া দিয়ে যখন সূর্যের আলো প্রবেশ করে, সেই আলো চোখের পাতায়  ঠিকরে পড়লে যাদের ঘুম ভাঙে, ঘুম ভাঙার পর উৎসবের দিনেও দেখে- তেল নেই, নুন নেই, নেই ঘরে চালের ভাত, মিষ্টি আলু খেয়ে রাতে  যে ঘুমিয়েছিল, সেই মিষ্টি আলুও নেই আজ। অভিভাবক হিসেবে কী করবে আজ? এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের দিতে পারে না ঈদে নতুন জামা, ভালো খাবার। 

ঈদের দিন সকালে সন্তানদের থালায় একটু সেমাই দিতে পারলেই তাদের আনন্দের সীমা থাকে না। আর যখন কেউ বা কোনও সংস্থা  সেমাই, চিনি ও এক প্যাকেট গুঁড়া দুধ নিয়ে উপস্থিত হয় তাদের নিকটে, তখন তারা হাতের মুঠোয় পেয়ে যায় যেন আসমানী চাঁদ। যদিও তা করুণামিশ্রিত।

আমরা জানি, দেশের মোট ৬ কোটি ১০ লাখ শ্রমশক্তির মধ্যে মাত্র ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিও  পেয়েছে, তারা ঈদ উৎসবেও বোনাসও পাবেন। আবার অন্যদিকে অনেকে শ্রম দেওয়ার পরও ঠিকমত বেতন পাবেন না, বোনাস তো দূরের কথা। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে পাটকলের অনেক শ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন প্রতিনিয়ত, তাদের বেতন ও অন্যান্য বকেয়ার জন্য। এ ঈদ উৎসবে অন্যান্যদের জীবন কীভাবে চলবে, তা বিবেচনা করা হয় না। সাধারণ মানুষের মজুরি ও আয় যদি না থাকে, তাহলে তাদের কাছে উৎসব কীভাবে ধরা দিবে, তা তো অধরাই থেকে যাবে। দেশের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু এ প্রবৃদ্ধিতে কাদের কতটুকু অবদান, তা বিবেচিত হয় না। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি-মানুষ সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রণোদনায় বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রেখে প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন। অনেক সেক্টরের সম্মিলিত অবদানও কম নয়। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি হলেই এর সুফল সবাই ভোগ করতে পারছেন, তাও না। সমাজে বৈষম্যও বাড়ছে। আর বৈষম্যের পটভূমিতে উৎসবের রঙ একেকজনের কাছে একেকরকম।

উৎসবের সঙ্গে আনন্দ মিলেমিশে থাকে, সংকীর্ণতাও উবে যায়, মিলবার আকাঙক্ষাও থাকে, সম্প্রীতির আলো দেখা যায়। আর একারণে শিকড়ের টানে, পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ তাদের কর্মক্ষেত্র ছেড়ে পাড়ি জমান- কেউ বাসে, কেউ লঞ্চে কিংবা ট্রেনে, সামাজিকভাবে বেশি সুযোগপ্রাপ্তরা বাড়িতে যান আকাশপথে। 

ঈদকে কেন্দ্র করে এ বিপুল সংখ্যক মানুষ একসাথে আবারো প্রান্তিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছেড়ে বাড়ির দিকে পাড়ি জমানোর এমন ঘটনা বিশ্বের অন্যান্যখানে প্রায় বিরল। ২০১৭ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ষাট লাখ মানুষ ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকা ছেড়েছিল, এখন তা বেড়ে আরও বেশি হয়েছে। এসব মানুষ ছুটে গিয়ে এ ঈদে একটু সেমাই মুখ, একটু মিষ্টিমুখ- পরিবার, স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীর সাথে করতে পেয়ে যে আনন্দ লাভ করে, তা অনুরণিত হতে থাকে সারা বছর। আবার অপেক্ষায় থাকে, আবার কবে এ উৎসব আসবে। 

বিধি-নিষেধের মধ্যেও এ করোনাকালেও মানুষ পরিবার-আত্বীয়-স্বজনের সাথে মিলে ঈদ করবার জন্য কীভাবে ছুটছে- আমাদের বিস্ময় লাগে।

স্বর্ণসূত্রমিশ্রিত স্বপ্ন নিয়ে আমরা পরিবারে ও সমাজে একসাথে বেঁচে থাকি। তাই, যেকোনও উৎসব হোক- মানবিকতায় মোড়ানো ও সবার গ্রহণীয়, যেন গ্রহণ না লাগে তাতে- অন্ধকার যেন গ্রাস না করে, ব্লাকহোলে যেন পরিণত না হয়। ঈদ উৎসবে- ঐকসূত্র নিয়ে, ঐকতান নিয়ে, তানপুরা বাজাতে বাজাতে যেন সুষম সৌন্দর্যে আমরা সকলে উষালোক ও রৌদ্ররাগে পরিব্যাপ্ত হতে পারি, প্রসারিত হতে পারি।

গোলাম কিবরিয়া পিনুকবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক

Responses -- “ঈদ উৎসব: পিতলের সেমাইকল ও সুষম সৌন্দর্য”

  1. গনী আদম

    চমৎকার নস্টালজিয়া পিনু ভাই। সুখপাঠ্য লেখা পড়তে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

    পিতলের একটা সেমাইকলের ছবি দিতে পারলে বেশ হতো।

    Reply
  2. সরকার জাবেদ ইকবাল

    আপনি যে পিতলের সেমাইকলের কথা বললেন তার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তবে আমাদের গ্রামে (বিষ্ণুপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) হাতের তালুতে পিষে এক ধরনের সেমাই তৈরি করা হতো; এখনও হয় যাকে স্থানীয় উচ্চারণে ‘সোয়াই’ বলে। ছোটবেলায় আমিও এ কাজে হাত লাগিয়েছি। তবে, আমার দাদী-ফুফুরা যেভাবে ছন্দে ছন্দে হাত চালিয়ে নিখুঁতভাবে ঐ সেমাই বানাতেন আমার পক্ষে তা সম্ভব হতো না। আমাদের দেশের বিলিয়মান এসব ঐতিহ্য নিয়ে আরও লেখার জন্য অনুরোধ রইলো।

    কথা প্রসঙ্গে কারখানায় লাচ্ছা সেমাই তৈরির একটি স্মৃতি সহভাগ (শেয়ার) করতে চাচ্ছি। ১৯৮৪ সাল। একটি মফস্বল শহরে চাকুরি করছি। একটি টিনশেড ঘরে ভাড়া থাকি। জানালা খুললেই চোখে পড়ে একটি লাচ্ছা সেমাইয়ের কারখানা। এক সকালে দেখলাম সেমাই তৈরি করার জন্য একটি তক্তার উপর বিশালাকৃতির মণ্ড রাখা আছে। কিছুক্ষণ পর লুঙ্গি উল্টো করে অর্ধেক ভাঁজ করা খালি গায়ে ঘর্মাক্ত দেহে এক শ্রমিক এগিয়ে এলো। মণ্ডের পাশে রাখা আরেকটি তক্তায় দাঁড়িয়ে পায়ের পাতায় এক মগ পানি ঢাললো। তারপর উঠে গেল মণ্ডের উপর। দারুণ নিপুণতায় পায়ের পাতা দিয়ে মণ্ড পিষতে লাগলো। আর, তার দু’পা বেয়ে দর দর করে নামা ঘামের ধারা মিশে যেতে থাকলো ঐ মণ্ডে! চমৎকার মোড়কে আবৃত হয়ে ঐ লাচ্ছা সেমাই নিশ্চয়ই পৌঁছে যায় আমাদের ঘরে ঘরে!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—