জন্মে যে জীবনের জয়গান গেয়েছেন, আজীবন তা বহতা নদীর মতোই প্রবহমান ছিল। নশ্বর এ পৃথিবীতে অমৃতসুধা পান করে আজও তিনি অবিনশ্বর, আপন সৃষ্টিতে। সৃজনের নন্দন কাননকে রাঙা আলোয় আলোকিত করেছেন আপন সৃষ্টি দিয়ে। তার সৃষ্টিকর্মের পরতে পরতে যেমন উৎসারিত হয়েছে যাপিত জীবনের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না, তেমনি প্রকৃতির সাথে মানব হৃদয়েরও এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।

আমরা প্রকৃতির মাঝে খুঁজে পাই ভালোবাসা ও প্রেমের এক অবিমিশ্র উপাদান । কবিতা, উপন্যাস, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রকর্ম, সংগীত- প্রতিটি বিষয় দিয়েই তিনি সুনিপুণভাবে জীবনের মালা গেঁথেছেন, মানব হৃদয়কে ভালোবাসায় আর্দ্র করেছেন । এমন সৃষ্টিশীল মানুষ আর দেখেনি বাংলা সাহিত্য । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আধিপত্যবাদের মধ্যেও তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে।

সামাজিক অচলায়তন ভাঙার কারিগররূপে সাহিত্য প্রেমিক প্রতিটি বাঙালির অন্তরাত্মায় বেঁচে থাকবেন কাল থেকে কালান্তরে । তার দর্শন আর জীবনবোধের উপলব্ধি বাঙালির রোজকার জীবনে অহর্নিশ জোগায় সীমাহীন প্রেরণা ।

আজ থেকে ১৫৯ বছর আগে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখের এমনই এক রোদ ঝড় বৃষ্টি মাখানো মন্দমধুর দিনে মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সারদা দেবীর ঘরে প্রভাতের সূর্যের মতোই আলো ছড়াতে এলেন আলোকজ্জ্বল এক রবি, যিনি একক আলোয় উদ্ভাসিত করে গেছেন বাংলা সাহিত্যকে ।

দেবেন্দ্র ঠাকুর ছিলেন রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের প্রধান সংগঠক, সমাজ সংস্কারক। সেই সনাতন সময়েই জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর বাড়ি ছিল সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র । চার বছর বয়স থেকেই রবির বিদ্যা শিক্ষা শুরু হয়, শৈশবেই উত্‍সরিত হতে থাকে তার মেধা ও বুদ্ধির বিচ্ছুরণ। ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি ছিল তার মুগ্ধতা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ লাইনটি বাল্যকালেই তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। বয়স যখন সাত আট তখন থেকেই তার কবিতা লেখা শুরু। কলম থামেনি আর বাকি জীবনে কখনো ।

১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য নোবেল পুরস্কার পান, যা এখনও পর্যন্ত সাহিত্যে কোনও বাঙালির প্রথম নোবেল অর্জন। আবার দেশের প্রতি প্রবল মমত্ববোধ থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দমননীতির পৈশাচিক বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড উপাধি বর্জন করেন।

“অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহো প্রাণ, তুমি করুণামৃতসিন্ধু করো করুণাকণা দান”।

রবীন্দ্র চর্চাই পারে মানুষে মানুষে হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি বন্ধ করে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু উজাড় করে দিয়ে গেছেন তাঁর সৃষ্টির সবকিছু। সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার । তার দর্শন চেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

বর্তমান এ মহামারীর প্রেক্ষাপটেও কবিগুরু সামনে এসে দাঁড়ালেন। আজ থেকে একশ বছর আগেও হানা দিয়েছিল মহামারী, সেই কবিগুরুর কালেও। এখনকার মত তিনিও মহামারীর ভয়ংকর রূপ দেখেছিলেন। আজ যখন গোটা বিশ্ব ভীতসন্ত্রস্ত, করোনাভাইরাস তাণ্ডবে দিক-দিশাহীন, নিত্যদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, তখন সেই সময়ের ইতিহাস আমাদের জানিয়ে দেয় বীভৎসতার রূপ কতোটা রাক্ষুসে ।

তখনকার ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘যুদ্ধজ্বর’ নামে পরিচিত হয়েছিল । অন্যান্য স্থানের মতো রেহাই পায়নি শান্তিনিকেতনও। কলাগাছের শেকড়, নিম, গুলঞ্চ, নিশিন্দা এবং থানকুনি একসঙ্গে পানিতে ফুটিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক পাঁচন। রবি ঠাকুর এ পাঁচন তৈরি করে প্রত্যেক আশ্রমবাসীকে নিয়ম করে দিনে দু বেলা খাওয়াতেন। ফলে, অন্যান্য জায়গায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলেও এর মাধ্যমে সে সময়ে শান্তিনিকেতনে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি আটকেছিলেন কবিগুরু।

সেইসময় আরেক মহামারি প্লেগের বীভৎসতা দেখেও ঠিক থাকতে পারেননি তিনি। প্লেগ হানা দিয়েছিল ঠাকুরবাড়ির অন্দরেও, মারা যায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যাসহ আরো অনেকেই। অসংখ্য মানুষের মৃত্যু দেখে কবিগুরুর হৃদয় বিদীর্ণ হয়, প্লেগ থেকে মানুষকে বাঁচাতে তিনি হাসপাতাল তৈরিতে নিযুক্ত হলেন।

আমার কাছে কবিগুরুর জন্মদিন বলে আলাদা কিছু নেই । প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি ক্ষণ তিনি আমার সাথে আছেন । জীবনে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পাই তার সৃষ্টিকর্মের মাঝে । সুখ-দুঃখের প্রতিটি সময়ে তার গান প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে নিজের অন্তরকে। ব্যথিত করে, আলোকিত করে, স্বস্তি দেয়, শান্তি দেয়। কখনো আনন্দাশ্রু বয়ে যায় দু’চোখ বেয়ে, কখনো বা দুখের জল। হালকা হয়ে আসে ভেতরটা ।

আমি কেমন করিয়া জানাব আমার জুড়ালো হৃদয় জুড়ালো-

আমি   কেমন করিয়া জানাব আমার পরান কী নিধি কুড়ালো–

ডুবিয়া   নিবিড় গভীর শোভাতে’।

ভাবি, বাঙালি হয়ে জন্ম না হলে জীবনের এই বোধ থেকেই তো বঞ্চিত হতাম।

আজকের শত নৈরাশ্যের যাপিত জীবনে একখণ্ড প্রত্যয় আর প্রত্যাশার প্রতীক হিসেবে তিনি আমাদের হৃদয়ে সাহস জোগান । তার বিশাল ভাণ্ডার থেকে যদি এক বিন্দুও ধারণ করা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জীবনের বোধ বদলে যাবে। তার সৃষ্টির বৈচিত্র্য আর প্রাচুর্যে বিমূর্ত হয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতির মূল পরিচয় আর শেকড়ের অস্তিত্ব। তাই এ বোধহীন সমাজকে বিবেকবান করতে হলে তার লেখাকে পৌঁছে দিতে হবে হবে সর্ব সাধারণের কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—