“জিততে জিততে হেরে যাওয়া আর জয় দুটোর মধ্যে পার্থক্য অনেক। এটা আমাদের বুঝিয়েছিলেন কোচ ডেভ হোয়াটমোর। বলেছিলেন, জয় জয়ই। ভাল খেলা মানে ভাল খেলে হার নয়, ভাল খেলা মানে জয়। আমাদের মধ্যে এভাবেই জয়ের ক্ষুধা জাগিয়ে তুলেছিলেন হোয়াটমোর।” কথাগুলো বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট তথা সিরিজ জয়ী অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনের।

বাঙালির চিরায়ত আবেগপ্রবণতা, কিন্তু-যদির মারপ্যাঁচে ব্যর্থতার মধ্যে সান্ত্বনা খোঁজার পাঁয়তারা সুবিদিত। কিন্তু হোয়াটমোরের মতো পেশাদার কোচের কাছে ওসবের কোনো পাত্তা ছিল না। তার দর্শনও ছিল সরলরেখার মতো-জয় মানে জয় এবং হার মানে হার। শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপজয়ী কোচের ছোঁয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেটের দর্শন বদলে গিয়েছিল। ওই দর্শন রপ্ত করাইকেই টেস্ট তথা সিরিজ জয়ের সবচেয়ে বড় কার্যকারণ বলে মনে করেন হাবিবুল।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ৫ বছর এবং ৩১ ম্যাচের দীর্ঘ অপেক্ষার পর পরম কাঙ্ক্ষিত জয়ের নাগাল পায় বাংলাদেশ। ২০০৫ সালে জানুয়ারি মাসে সফরকারী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজে জয় আসে ১-০ ব্যবধানে। প্রথম টেস্ট জেতার পর দ্বিতীয় টেস্টে খাদের কিনার থেকে হার এড়াতে সমর্থ হয় হাবিবুল অ্যান্ড কোং। প্রথম টেস্ট জয়ের আনন্দের উপলক্ষটা আরও রঙিন হয় সিরিজ জয়ের উৎসবে। 

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই টেস্ট সিরিজে খেলতে নামার আগে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হাবিবুল বলেন, “ওই সময় আমরা বেশ ভাল ক্রিকেট খেলছিলাম। পাকিস্তানের বিপক্ষে মুলতান টেস্টে জয়ের খুবই কাছাকাছি ছিলাম। ঘরের মাটিতে একটা ওয়ানডে ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জিতেছিলাম। জিম্বাবুয়ে সফরে একটা ওয়ানডে জিতেছিলাম। কিন্তু টেস্ট জয়ের নাগাল পাচ্ছিলাম না। এদিকে ওই সময়টাতে সমস্যর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট। আমরা সুযোগটা কাজে লাগাতে চাচ্ছিলাম। যদিও তারা যথেষ্ট ভাল দল ছিল। তবে আমরা প্রথমেই সিরিজ জয়ের কথা ভাবিনি। কমপক্ষে একটা টেস্ট জিততে হবে, এটাই ছিল আমাদের ভাবনা।”

সে ভাবনা সত্যি হলো সিরিজের প্রথম টেস্টে। ২০০৫ সালের ৬ জানুয়ারি।  চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম। টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলেন হাবিবুল। প্রায় পৌনে দু দিন ব্যাট করে চার ফিফটি ও তিনটি ত্রিশোর্ধ রানের ইনিংসে ভর দিয়ে ৪৮৮ রানের সৌধ গড়ে বাংলাদেশ। উদ্বোধনী জুটিতে ৯১ রান যোগ করে দলকে বেশ শক্ত ভিত এনে দিয়েছিলেন জাভেদ ওমর (৩৩) ও নাফিস ইকবাল। 

এ রান উৎসব আর থামেনি। অল্পের জন্য সেঞ্চুরি পাননি হাবিবুল (৯৪) ও রাজিন সালেহ (৮৯)। বাকি দুই হাফ সেঞ্চুরিয়ান নাফিস (৫৬) ও মোহাম্মদ রফিক (৬০)।  হাফ সেঞ্চুরির দোরগোড়া থেকে ফেরেন খালেদ মাসুদ (৪৯) ও মাশরাফি মর্তুজা (৪৮)। জবাবে জিম্বাবুয়ের ইনিংস থামে ৩১২ রানে। প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রানের লিড টাইগারদের।

এরপর দ্বিতীয় ইনিংসের চ্যালেঞ্জ। তা জয়ের পরিকল্পনা নিয়ে হাবিবুল জানান, “আমরা জিম্বাবুয়েকে ফলো অন করাতে চেয়েছিলাম। যাতে করে আমাদের আর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে না হয়।  কিন্তু ওরা খুব ভাল ব্যাট করে ফলোঅন এড়ায়। আমরা দ্বিতীয় ইনিংস ব্যাট করার আগে দ্রুত রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করার পরিকল্পনা করলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে আমাদের রান রেট ছিল চারের মত (৩.৯৮)।  জেতার জন্য এটা দরকার ছিল। চতুর্থ দিনের বিকালে পরিকল্পনা মতই ইনিংস ঘোষণা করে জিম্বাবুয়েকে ব্যাট করতে পাঠালাম।”

দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৪/৯ নিয়ে ইনিংস ঘোষণা করলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। জয়ের জন্য চতুর্থ ইনিংসে ৩৮১ রান করার চ্যালেঞ্জের সামনে ৩ উইকেটে ৪২ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শেষ করল জিম্বাবুয়ে। জয়ের সুবাস তখন বাংলাদেশ শিবিরে।  প্রথম টেস্ট জয় থেকে দূরত্ব ৭ উইকেট। হাতে পুরো দিন। শেষ ভালোর পরীক্ষায় নামল স্বাগতিক বোলাররা।

ম্যাচ বাঁচানোর জন্য পঞ্চম দিনের শুরু থেকেই দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিরোধের দেঁয়াল তুলে দেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান হ্যামিল্টন মাসাকাদজা ও ব্রেন্ডন টেইলর। প্রথম ঘণ্টায় নিজেদের উইকেট অক্ষত রাখলেন দুজনে। টেইলরকে (৪৪) আউট করে জুটি ভাঙলেন প্রথম ইনিংসে কোন উইকেট না পাওয়া বাহাতি স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি ১৮ বছরের এ তরুণ। তার ঘূর্ণিজালে মাত্র ১৫৪ রানেই শেষ জিম্বাবুয়ের ইনিংস। বাংলাদেশ জিতল ২২৬ রানে। শেষ দিনে পতন হওয়া ৭ উইকেটের ৬টিই এনামুলের শিকার।

শেষ আঘাতটিও হানলেন এনামুল। তার বলে ক্রিস্টোফার এমপোফু সিলি পয়েন্ট অঞ্চলে ধরা পড়েন মোহাম্মদ আশরাফুলের হাতে। উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে উঠল এম এ আজিজ স্টেডিয়াম। সে ঢেউ মুহূর্তেই আড়ছে পড়ল চারদিকে। প্রথম জয়ের সুখস্মৃতি এখনো হাবিবুলের স্মৃতিতে উজ্জ্বল, “প্রথম কয়েক মিনিট কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এমপোফুর আউট হওয়ার আগে আর পরে মনে হচ্ছিল  দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগত!”

টেস্টে প্রথম চারদিন নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি হোয়াটমোরের পছন্দে দলে জায়গা পাওয়া এনামুল। শুধু শেষ দিনে নয়, ম্যাচেরও নায়ক বনে যান পরে। ২২.২ ওভার বোলিং করে মাত্র ৪৫ রান খরচায় ৬ উইকেট নিয়ে কোচের আস্থার প্রতিদান দেন এই টিন এজার বাঁহাতি। 

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক বললেন, “এটা আমার জীবনের সেরা দিন। এ দলের একজন সদস্য হতে পেরে আমি ভীষণ খুশি। আমার অধিনায়ক হওয়াটাও এর চেয়ে বড় কিছু নয়।”

কোচ হোয়াটমোর হয়েছিলেন দারুণ এক প্রশ্নের মুখোমুখি। একটা দেশের প্রথম বিশ্বকাপ জেতা, নাকি একটা দেশের প্রথম টেস্ট জয়, আপনার কাছে কোনটা বেশি তৃপ্তিদায়ক- সংবাদ সম্মেলনে  হোয়াটমোরকে এভাবেই প্রথম প্রশ্নটি করলেন ওই সময়ে ইত্তেফাকের ক্রীড়া সাংবাদিক দিলু খন্দকার। হোয়াটমোর কোন তুলনাতেই গেলেন না, “দুটোই আনন্দের। আর বাংলাদেশের কোচ হিসেবে এটা আমার সেরা দিন। এ জয়ের পুরো কৃতিত্ব ছেলেদের। একটা অসাধারণ জয় এনে দিয়েছে তারা।”

সেদিনের সেই জয় নিয়ে আজও একইরকম শিহরণ অনুভব করেন এনামুল, “সাধারণত টেস্ট ম্যাচ বেশি মানুষ দেখে না। কিন্তু সে দিনটি ছিল অন্যরকম। গ্যালারিতে উপচে পড়া দর্শক। রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম লেগে গিয়েছিল। আমাদের হোটেলে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।” 

পঞ্চম ও শেষ দিনে খেলতে নামার আগের রাতটিকে কোনদিনও ভুলতে পারবেন না বলে জানান এনামুল। বলেন, “ভীষণ চাপ ছিল। শেষ কাজটুকু সম্পন্ন করার দায়িত্ব ছিল বোলারদের। বিশেষ করে স্পিনারদের উপর। রফিক ভাই পুরো ফিট ছিলেন না। ওই রাতেই  মা আমাকে ফোন করলেন। দেশের জন্য মনে রাখার মত একটা কিছু করার জন্য বললেন। ভালো একটা কিছু করার তাড়না আরও ভালোভাবে বোধ করলাম। দিনের শুরুতে চমৎকার খেলছিলেন মাসাকাদজা ও টেইলর। বিপজ্জনক  হয়ে ওঠা এ জুটি ভাঙতে সমর্থ হই। এরপর আর প্রতিরোধ গড়তে পারেনি ওরা।”

প্রথম জয়কে সম্মিলিত প্রয়াসের ফল হিসেবে দেখেন হাবিবুল, “প্রথম ইনিংসে ব্যাটসম্যনেরা প্রায় সবাই রান পেয়েছে। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা সবাই দ্রুত রান তোলার চেষ্টা করে গেছি। প্রত্যাশামত বোলিং করেছে আমাদের স্পিনাররা। প্রথম ইনিংসে রফিকের শিকার ৫ উইকেট আর দ্বিতীয় ইনিংসে এনামুল নেয় ৬ উইকেট। আমাদের দুই পেসার মাশরাফি ও তাপস বৈশ্য খুবই কার্যকরী বোলিং করেছিল বলে আমি মনে করি। আসলে এই দুজন দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।   প্রয়োজনীয় সময় ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছিল এই দুজন।” দুই ইনিংস মিলিয়ে মাশরাফি নেন ৫ উইকেট।  আর তাপসের শিকার ৩টি।

টেস্ট জেতার পর সামনে চলে আসে সিরিজ জয়ের বিষয়টা। সংবাদ সম্মেলনেই, ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। জিতলে তো বটেই শুধু হার এড়ালেই প্রথমবারের মত সিরিজ জয়ের সুযোগ। এর আগে এই ধরনের পরিস্থিতির মুখে কখনো পড়েনি বাংলাদেশ। এদিকে বাংলাদেশের কাছে টেস্টে হার সহজে মেনে নিতে পারছিল না জিম্বাবুয়ে। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া ছিল তারা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দলের ওপেনার জাভেদ ওমর বেলিম গুল্লু বলেন, “ঢাকা টেস্ট শুরুর আগে সোনারগাঁও হোটেলে  জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক আমাকে বলল, দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের পতাকার উপর আমরা পতাকা ওড়াব। এ কথাটা খুবই গায়ে লেগেছিল।”

প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের পর কাপ হাতে সেসময়ের ক্যাপ্টেন হাবিবুল বাশার সুমন।

তাইবু যে ফাঁকা আওয়াজ দেননি, তার প্রমাণ জিম্বাবুয়ে দিতে থাকল ঢাকা টেস্টের শুরু থেকে। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে সফরকারীদের সংগ্রহ দাঁড়াল ২৮৮ রান। তাইবু অপরাজিত থাকলেন ৮৫ রানে। প্রত্যুত্তরে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস শেষ ২১১ রানে। ৮৭ রানের লিড নেওয়া জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয়  ইনিংসে জমা করল ২৯৮ রান। তৃতীয় দিন শেষে সফরকারীদের স্কোরবোর্ডে ছিল ২০৩/৬। তখনও তাইবু অপরাজিত ৮১ রানে। সফরকারীদের লিড ২৯০ রানের। হাতে  ৪ উইকেট। সবথেকে বড় কথা ডেঞ্জারম্যান তাইবু উইকেটে।

তৃতীয় দিন শেষে হাবিবুল বাহিনী হারবে, এর বাইরে ভাবনাও ছিল কঠিন। তৃতীয় দিন শেষে হোয়াটমোরও বললেন, ঢাকা টেস্টে সম্ভবত জিম্বাবুয়ে জিততে যাচ্ছে।  চতুর্থ দিনের শুরুটাও হল তাইবু রাজত্বের মধ্য দিয়ে। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হলেন ১৫৩ রান করে। ৩৭৩ রানের লিড জিম্বাবুয়ের। বাংলাদেশের সামনে তখন চ্যালেঞ্জ পাহাড়সমান। জিততে হলে ৩৭৪ রানের এভারেস্ট শৃঙ্গসম উচ্চতায় আরোহণ করতে হবে।  হার এড়াতে চতুর্থ ইনিংসে পৌনে দুদিন আগলে রাখতে হবে উইকেট।

সিরিজ জিততে হলে এ দুটো দুরূহ বিকল্পের যে কোন একটাকে বেছে নিতে হবে। সিরিজ জয়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইনিংস উদ্বোধন করলেন জাভেদ-নাফিস। প্রকৃত টেস্ট ম্যাচ কী, সেটাই যেন বুঝিয়ে দিলেন এ দুজনে। চার ঘণ্টারও বেশি সময় প্রতিপক্ষ বোলারদের সব আক্রমণ শুষে নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শেষ করলেন দুই ওপেনার। ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার দারুণ দৃষ্টান্ত গড়লেন নাফিস-জাভেদ জুটি।

পঞ্চম দিনেও এ দুজনকে টলাতে গলদঘর্ম হতে হল সফরকারী বোলারদের। প্রায় পাঁচঘণ্টা ব্যাটিং করে ৪৯৮ বলের রেকর্ড জুটি গড়লেন দুজনে। বাংলাদেশের হয়ে বলের হিসেবে সর্ব্বোচ্চ এ জুটির রেকর্ডটির স্থায়িত্ব ছিল ৮ বছর। ২০১৩ সালে গল টেস্টে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫১৮ বল খেলে এ রেকর্ড নিজেদের করে নেন মুশফিকুর রহিম ও মোহাম্মদ আশরাফুল। 

ড্রয়ের সম্ভাবনা ধরে রাখতে চতুর্থ দিন যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই শুরু করেন জাভেদ ও নাফিস। যতক্ষণে জুটি ভাঙল, ততক্ষণে ‘ড্র’ চলে এসেছে বাংলাদেশের নাগালে। ৩৪০ মিনিট উইকেট আঁকড়ে থেকে ২৫৮ বল সামলে ৪৩ রান করে আউট হন জাভেদ। স্ট্রাইক রেট ১৬.৬৬। সঙ্গীহারা হলেও লক্ষ্যে অবিচল থাকেন নাফিস। আর তাই হাবিবুল (২৭ বলে ২) ও আশরাফুল ( ৩ বলে ৩) চটজলদি ফিরে গেলেও বিপদ বড় হয়ে ওঠেনি। নাফিসের লক্ষ্যপূরণের এ অঙ্গীকার সংক্রমিত হয় বাকিদের মধ্যেও। 

নাফিস ৪৭০ মিনিট উইকেট আগলে রেখে আউট হন ১২১ রানে। পতন ঘটে চতুর্থ উইকেটের। নাফিসের দেখানো পথেই হাঁটেন রাজিন সালেহ;  ১৪০ বলে হার না মানা ৫৬ রানের ইনিংস। খালেদ মাসুদ পাইলটও ৫৭ বলে ২৮ রানে থাকেন অপরাজিত। মাঝে আফতাব আহমেদ (১৬ বলে ৫) বিদায় দিলেও কোন অঘটন ঘটতে দেননি রাজিন-খালেদ মাসুদ। ড্র মেনে নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় তাইবুদের। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪২ ওভার ব্যাট করে ৫ উইকেট হারিয়ে ২৮৫ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।

এ ম্যাচকে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যটাস প্রাপ্তির যৌক্তিকতা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন বলে জানান নাফিস ইকবাল। বললেন, “পাঁচটা বছর আমরা টেস্ট খেলেও সেভাবে নিজেদের প্রমাণ করতে পারছিলাম না। সমালোচনাও হচ্ছিল খুব। টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেওয়া হতে পারে, শোনা যাচ্ছিল এমন গুঞ্জনও। তাই আমরা সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছিলাম।”  এ ড্র-কে জয়ের চেয়েও বেশি বলে উল্লেখ করেন জাভেদ ওমর বলেন, “আমি ক্যারিয়ারে ৪০টা টেস্ট ম্যাচ খেলেছি। সেঞ্চুরি করেছি। ব্যাট ক্যারি (ইনিংসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ) করেছি। তারপরও আমি এই ৪৩ রানের ইনিংসটিকে আমার ক্যারিয়ারে সেরা অর্জন বলে মনে করি।”

ওই টেস্টে জয়ের সুযোগও ছিল বাংলাদেশের সামনে। যথেস্ট সময় হাতে থাকার পরও সে চেস্টা না করা প্রসঙ্গে অধিনায়ক হাবিবুল বাশার জানালের ঝুঁকিটা নিতে চাননি তারা, “জয়ের চেষ্টা করাটা ঝুকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারত। আমাদের কাছে সিরিজ জেতাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের নায়ক নাফিক ইকবাল (ডানে) এবং এনামুল হক জুনিয়র (ডানে)।

ওই সিরিজের নায়ক এনামুল ও নাফিস দুজনই ছিলেন টিন এজার। নাফিসের বয়স ছিল ১৯ আর এনামুলের ১৮। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে সামনে থেকে লড়াই করা এ দুজনই হারিয়ে গেছেন ক্যারিয়ারের মাঝপথ পেরোনোর আগেই। পুরো ক্যারিয়ারে মাত্র ১৫ টেস্ট  আর ১০ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন এনামুল। আর নাফিস খেলেছেন ১১ টেস্ট আর ১৬ ওয়ানডে। এর জন্য ব্যক্তিগত দায়ের সঙ্গে দুর্ভাগ্যকেও দায়ী করেন দুজনই।

নাফিসের কথায়, “২০০৬ সালে ব্যাক টু ব্যাক ইনজুরির কারণে প্রায় দেড় বছর বাইরে থাকতে হয়। এটা আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের উপর প্রভাব ফেলে।” যোগ করেন, “আমি কিছুটা দুর্ভাগাও। আমাদের সময়ে এক/দুইটা ম্যাচ খারাপ খেললেই দল থেকে বাদ দেওয়া হত। এখন কিন্তু পরিস্থিতির অনেকটায় উন্নতি হয়েছে। তরুণদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।” একই কথা প্রতিধ্বনিত হল এনামুলের কণ্ঠেও , “নিজেদের প্রমাণ করার জন্য এখনকার তরুণ ক্রিকেটাররা অনেক বেশি সুযোগ পাচ্ছে। আমি মনে করি এটাই হওয়া উচিৎ। আমাদের সময়ে এমনটা হয়নি।” 

ক্রিকেটার হিসেবে নতুন করে আর স্বপ্ন দেখেন না নাফিস। তবে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখেন এনামুল। সে স্বপ্নকে সামনে রেখে ঘরোয়া আসরে এখনো খেলে যাচ্ছেন বলে জানালেন। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার অনেক আগে থেকেই জাভেদ ওমর বেলিমের গায়ে লেগে গিয়েছিল ‘টেস্ট ব্যাটসম্যান’ ট্যাগ। তার ক্যারিয়ারও যে খুব দীর্ঘ হয়েছে, এমনটা কিন্তু বলা যায় না। ২০০৭ সালে ৩১ বছরেই শেষ হয়েছে এই ওপেনারের ক্যারিয়ার।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে উদ্বোধনী জুটি নিয়ে। সেই ধারা চলছে এখনও। একটা সময় জাভেদ নির্দিষ্ট ছিলেন, অন্য জায়গাটি নিয়ে চলত গবেষণা। এখন তামিম আছেন তার জায়গায়, আর অন্য জায়গাটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার  অন্ত নাই। এ প্রসঙ্গে জাভেদের ভাষ্য, “আমার ক্যারিয়ারে আমি দশ জনের সঙ্গে ইনিংস ওপেন করেছি। শুরুটা হয়েছিল আতহার আলীর সঙ্গে আর শেষ করেছি তামিমের সঙ্গী হিসেবে।”

টেস্ট ক্রিকেটের মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি, এ নিয়ে একমত প্রথম সিরিজ জয়ের নায়কেরা। হাবিবুল জানান, “লংগার ভার্সনে যতখানি এগুনোর কথা ছিল সেটা হয়নি।”

জাভেদের মতে, “টেস্ট ম্যাচ বলতে আমি বুঝি সোয়া দুশো থেকে আড়াইশ ওভার ব্যাটিং করা। তেমনটা কি আদৌ দেখা যাচ্ছে?”

জাভেদ ওমর বেলিম

নাফিসের ভাষ্য, “আমাদের ক্রিকেট  ওয়ানডে কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে। প্রিমিয়ার লিগ খুবই মান সস্মত ছিল। সেখান থেকে ক্রিকেটার  উঠে আসত। লংগার ভার্সনের দিকে সেভাবে নজর দেয়া হয়নি।”

এনামুলের উপলব্ধি, “লাল বলে গুরুত্ব না দিলে খুব বেশিদূর যাওয়া যাবে না।”

সব কথার এক কথা, দু দশক পার হওয়ার পরও টেস্ট খেলাটাকে রপ্ত করতে পারেনি বাংলাদেশ। লংগার ভার্সন উপযোগী কাঠামো তৈরি করতে না পারা, ক্রিকেটারদের উদ্দীপ্ত করার মত মেন্টরের ঘাটতি, টেস্ট খেলার প্রতি অনীহা কিংবা সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দু/একটা সাফল্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা-সব মিলিয়ে টেস্ট স্ট্যটাস প্রাপ্তির শুরুতে যৌক্তিকতা প্রমাণের যে  চ্যালেঞ্জ ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

নাজমুল হক তপনজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—